#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#পর্ব:২২
মেহের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।কাঁদতে কাঁদতে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো,
-“কি এমন অপরাধ আমি করেছিলাম যে আজ আমায় এদিন দেখতে হচ্ছে? কেন আজ তুমি আমায় এখানে এনে দাঁড় করিয়েছ?কোথায় যাব আমি?আমি চাই না আমার জন্য আমার মা আর বাবার সম্মানহানি হোক।”
মেহেরের ভাবনার মাঝেই দুজন মহিলা এসে উপস্থিত হলো সেখানে।আর মেহেরকে উদ্দেশ্য করে একজন বলতে লাগলো,
-“কে তুমি মেয়ে?এখানে এভাবে কাঁদছ কেন?”
মেহের তৎক্ষনাৎ চোখ মুছে ফেললো।পাশ কাটিয়ে যেতে নিবে এমন সময় একটা মহিলা বলতে লাগলো,
-“এটা তো এদের বাড়ির বউ মনে হয়।”
এটা শুনে আরেকজন বলছে,
-“কি বলছো,এদের বাড়ির ছেলের কি বিয়ে হয়েছে নাকি?”
-“হ্যা হয়েছে গো।আমি শুনেছি।”
-“কি বলো,আমরা তো কিছু শুনলামও না।মেয়েও তো কিছু বলে না।”
-“দাঁড়াও।আমি জিজ্ঞেস করি।কি গো মেয়ে?কে তুমি গো?আজ এদের বাড়ির বউয়ের নাকি সাধের অনুষ্ঠান।”
মেহের জোরপূর্বক হেসে বললো,
-“জ্বী।”
-“তুমি কে?কি লাগো ওদের?”
মেহের আমতাআমতা করছে।এমন সময় সেই মহিলাদের পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
-“আমার ওয়াইফ ও।মেহের খান আলিশা।”
আরবাজের গলা শুনে মেহের মুখ তুলে তাকালো।আরবাজ দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। সেই দুজন আন্টিও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।একজন বললেন,
-“আরবাজ তুমি এখানে?তোমার বউ এটা?”
আরবাজ হেসে এগিয়ে এলো।মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“জ্বী।আমার একমাত্র বউ।”
মেহের নিচের দিকেই তাকিয়ে রইলো। দুজন আন্টি তাদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে একজন বললো,
-“কই তোমার মা তো আমাদের জানায়নি কিছু। দাওয়াতও পেলাম না।লুকিয়ে বউ তুলে আনলে নাকি?”
-“ধরতে পারেন তাই।দেখছেন তো,এত সুন্দর বউ দেখে আমার মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি।তবে সামনেই আমাদের বিয়ে।অনুষ্ঠান করে জমজমাট ভাবে।”
এটা শুনে মেহের আরবাজের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।চিমটি কেটে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
-“কিসব বলছেন?”
আরবাজ পাত্তা না দিয়ে বললো,
-“আপনারা ভিতরে যান না।আজই বাবা হয়ত সব এনাউন্সমেন্ট করবে।যান যান।”
সেই দুইটা আন্টি আবারো ফুসুরফাসুর করতে করতে চলে গেলেন।আসলে আন্টিদের কাজই হলো ফুসুরফাসুর করা।আরবাজ মেহেরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
-“আমি জানতাম তুমি এখনো এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।নিশ্চয় ভাবছ যে কোথায় যাবে।”
মেহের অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
-“সেটা জেনে আপনি কি করবেন?”
-“আমিও তো যাব।”
-“বললেই হলো নাকি?”
আরবাজ রাগী গলায় বললো,
-“আসার সময় কি বললে?ডিভোর্স পেপার পাঠাবে?”
-“হ্যা মুক্ত করে দিবো আপনাকে”(মলিন হেসে)
-“আমি মুক্ত হতে চাই না।”
-“মানে?”
-“মানে হলো আমাকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে?এটা আমি হতে দিব না।”
-“আমার ইচ্ছে, আমি কি করব না করব।”
আরবাজ মেহেরের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-“আমার সহ্য হবে না।”
মেহের অবাক হয়ে তাকালো।তারপর কিছুসময় আমতা আমতা করলো।আচমকা আরবাজের কলার চেপে ধরে বললো,
-“এতগুলো মিথ্যা কেন বললেন ওনাদের?”
-“তুমি রাস্তার মধ্যে এভাবে আমার কলার চেপে ধরেছ কেন?”
-“বেশ করেছি।আর এটা রাস্তা নয়।বাসার সামনে।”
-“কলার ছাড়ো বলছি।”
-“একশবার ধরবো।আপনি মিথ্যা বললেন কেন?”
-“আমি মিথ্যা বলিনি।”(ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে)
-“আপনি মিথ্যাই বলেছেন।মিথ্যুক একটা।”
-“কলার ছাড়বে কিনা?”
-“ছাড়ব না।”
বলে আরো জোরে চেপে ধরতেই আরবাজ মেহেরের কোমড় জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।এবার মেহের দমে গেল।আস্তে আস্তে হাত ঢিলে হয়ে গেল।মেহের চোখ নামিয়ে বললো,
-“আ..আপনি রাস্তার মধ্যে এ..এভাবে আমাকে ধরতে পারেন না।”
-“আমি সবই করতে পারি।আর এটা তো রাস্তা না।বাসার সামনে।”
বলেই চোখ টিপলো।মেহের গাল ফুলিয়ে বললো,
-“ছাড়ুন বলছি আমায়।চলে যাব আমি।”
-“ছাড়ব না।কি করবে শুনি?”
-“আমি কিন্তু চিৎকার করবো।”
-“করো।”
মেহেরের বেশ রাগ হলো।আরবাজ এমন করছে কেন তার সাথে।আগলা পিরিতি দেখাতে আসছে।মেহের আরবাজকে ছাড়ানোর জন্য মিনমিন গলায় বললো,
-“কে কোথায় আছো…”
-“আমিই তো শুনতে পারছি না।”
-“আপনি মশকরা করতে আসছেন?”
-“মোটেও না।আরো জোরে চিল্লাও।”
-“ছাড়ুন বলছি আমায়।”
-“তুমি চিল্লাও দেখি।তোমার গলা শুনে এখানে লোক জড়ো হবে।যেই বিয়েটা আমাদের ৭ দিন পরে হত সেটা নাহয় আজই হবে।”
-“সাতদিন পর মানে?”(অবাক হয়ে)
আরবাজ আস্তে আস্তে মেহেরকে ছেড়ে দিলো।কিন্তু কোমড় থেকে হাত সরালো না।মুচকি হেসে বললো,
-“তোমার আর আমার বিয়ে।”
-“মানেটা কি?”
-“হ্যা।আমাদের বিয়ে হবে।তোমাকে আমি তুলে আনব আবারো। কিন্তু এবার সেটা আলাদাভাবে। আলাদারকম করে।”
-“বললেই হলো নাকি।আমি বিয়ে করব না আপনাকে।আপনার ওই দজ্জাল মা…”
বলে জিভ কাটলো মেহের।আরবাজ মেহেরের চুল টেনে বললো,
-“আটকে গেলে গেল?”
-“আপনি আমার চুল টানলেন কেন?যান তো এখান থেকে।চলে যাচ্ছি, যেতে দিন।”
-“হ্যা তো যাও। আমি কি আটকেছি নাকি!”
মেহেরের চোখ ভরে এলো।গলা আটকে এলো।খুব অভিমান হলো আরবাজের উপর।
-“আপনি সত্যি আটকাবেন না?”(করুণ গলায়)
-“উহুম।”
মেহের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। পা বাড়িয়ে যেতে লাগলো কিন্তু মনে হলো পিছনে আরবাজও আসছে।তাকিয়ে দেখলো আসলেও তাই।আরবাজ তার পিছনে পিছনে আসছে আর তার আঁচল ধরে কি যেন করছে।মেহের ভ্রু কুঁচকে বললো,
-“কি করছেন টা কি আপনি?”
-“শুনেছি বরেরা নাকি বউয়ের আঁচলের সাথে বাঁধা পড়ে।”
মেহের অবাক হয়ে আরবাজের মুখ পানে চেয়ে রইলো।আরবাজ মেহেরের দিকে করুণভাবে তাকিয়ে বললো,
-“আমাকে একটা সুযোগ দেবে মেহের? ”
মেহের অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আরবাজের দিকে।আরবাজ মেহেরের হাত ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
-“আমায় একটা সুযোগ দাও না মেহের।আমি জানি না তোমার প্রতি আমার ফিলিংস টা কেমন আমি জানি না কিন্তু যখন তুমি চলে যাচ্ছিলে আমার বুকটা কেমন কেপে উঠেছিল।মনে হচ্ছিল আমার বুকে কেউ ভারী পাথর রেখে দিয়েছে। তোমার কান্না আমার এখন আর সহ্য হয় না মেহের।প্রতিদিন তোমার সাথে ঘুমানো অভ্যাস হয়ে গেছে আমার।বিয়েটা যেভাবেই হোক না কেন,ভালোবাসি কি বাসি না জানি না আমি।শুধু এতটুকু জানি যে তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না মেহের। আমি কিভাবে থাকব তোমাকে দেখা ছাড়া?তুমি তো আমাকে দূর্বল করে দিয়েছ তোমার প্রতি।
আমাকে ডিপেন্ডেড করে দিয়েছ।”
মেহেরের চোখ ভরে আসছে।কিন্তু কিছু বলছে না।আরবাজ মেহেরের হাত দুইটা নিজের ঠোঁটের উপর চেপে ধরে বললো,
-“আমার শুধু তোমাকে চাই মেহের।বাচ্চা লাগবে না।আমি চাই না কোনো বাচ্চা। তুমি যেমনই হও না কেন,আমার তোমাকেই লাগবে।”
মেহের ঢোক গিললো।আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো মানুষ তাদের দেখে দেখে যাচ্ছে। মেহের নিম্ন স্বরে বললো,
-“রাস্তা দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। ”
আরবাজ মেহেরের কথাটা পাত্তা দিলো না।কিছুক্ষণ সময় নিলো।মেহেরের চেহারাটার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর বলে উঠলো,
-“এসব ফিলিংস তোমার হয় কিনা আমি জানি না।কিন্তু আমি নিরুপায়!যেখানে আমি ১ টা মিনিট ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি সেখানে আমি কি করে তোমাকে ছেড়ে থাকব?কিভাবে সহ্য করব তোমাকে অন্য কারোর সাথে?”
মেহের মুখ তুলে তাকালো আরবাজের দিকে।আরবাজ অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে মেহেরের দিকে।মেহের ঠান্ডা গলায় বললো,
-“এটা কি আপনার আকর্ষণ?অভ্যাস নাকি ভালোবাসা?”
-“আমি জানি না।”
-“হাহ।যেখানে আপনি আমাকে ভালোইবাসেন না সেখানে আমি কিভাবে থাকব আপনার সাথে?”
বলে মেহের পিছনের দিকে ফিরে হাঁটা ধরলো।গেইট টা পার হতেই আরবাজ পিছন থেকে বলে উঠলো,
-“এসব ফিলিংস এর নাম যদি ভালোবাসা হয় তাহলে….তাহলে আই লাভ ইউ।আই লাভ ইউ আ লট মেহের।প্লিজ গিভ মি আ চান্স।”
আরবাজের বলা কথাটা মেহেরের কানে বাজতে লাগলো।মেহের অবাক হয়ে তাকালো আরবাজের দিকে।আরবাজ করুণ চোখে তাকালো মেহেরের দিকে। তারপর বললো,
-“প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না।আমি কখনো চাইনি এসব সংসারে নিজেকে জড়াতে।এজন্যই তোমার থেকে দূরে থাকতাম।চাইতাম তুমি তোমার মত থাকো।কিন্তু দিনশেষে যে তুমিই আমার প্রয়োজন, আমার ভালোবাসা হয়ে উঠবে আমি ভাবতে পারিনি।আমি থাকতে পারব না তোমার সাথে ঝগড়া করা ছাড়া মেহের।”
-“আমি আপনাদের বাসায় আর এক মুহুর্তও থাকতে চাই না।”
-“তুমি আমার সাথে থাকবে মেহের।মা যাই বলুক না কেন!আমি তোমার পাশে আছি সবসময়।”
মেহের আরবাজের মুখপানে তাকিয়ে রইলো।দোটানায় পড়ে গেছে সে।আরবাজ কে ক্ষমা করে দিয়ে কি সে আরবাজের সাথে থাকবে?নাকি এই ভালোবাসা কে উপেক্ষা করে সে ফিরে যাবে।কিন্তু তার মা-বাবা তো…!
এখন তো আরবাজ ছাড়া কেউ নেই তার।আরবাজ হাত বাড়িয়ে বললো,
-“ভালোবাসি মেহের!প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না।”
মেহের তাকিয়ে রইলো আরবাজের দিকে।কি করবে সে?আরবাজের সাথে নতুন করে জীবন শুরু করবে নাকি ফিরে যাবে?আরবাজ মেহেরের চুপ থাকা মেনে নিতে না পেরে বললো,
-“চুপ করে আছ কেন?”
-“কি বলব বুঝতে পারছি না।”
-“তুমি ভালোবাসো না আমায়।তাই না?আসলেই তো।আমার মত মানুষ কে কি ভালোবাসা যায়।”(মলিন হেসে)
মেহেরের বলতে ইচ্ছে হলো,
-“হ্যা আমিও ভালোবাসি আপনাকে। আপনার সাথে ঝগড়া করা আমারো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রোজ রোজ আপনার সাথে ঘুমানোও আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে!”
কিন্তু বলার সাহস হলো না।আরবাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
-“আচ্ছা বলো না সমস্যা নেই।কিন্তু প্লিজ আমায় ছেড়ে যেও না মেহের।”
মেহের নিজেকে খুব কষ্ট করে সামলে নিলো।আবারো গেইটের দিকে পা বাড়ালো। এমন সময় আরবাজ দৌড়ে এসে মেহেরকে কোলে তুলে নিলো।মেহের ছটফট করতে করতে বললো,
-“আরে কি করছেন টা কি আপনি।”
-“তোমাকে আমি যেতে দিলে তো যাবে।”(চোখ টিপে)
-“মানেটা কি!নামান আমায়।”
আরবাজ শুনলো না।নিজের মত হাঁটতে লাগলো।মেহের তাকে খামচি দিচ্ছে।তবুও আরবাজের কোনো হেলদোল হচ্ছে না।মেহেরের বেশ রাগ হচ্ছে। আবার কেন যেন ভালোও লাগছে।আরবাজের বুকে এসে শান্তি লাগছে।এই শান্তি ছেড়ে,আরবাজকে ছেড়ে কি মেহের থাকতে পারবে?
চলবে….
#প্রথম_ভালোবাসার_সুর❤️
#লেখনীতে:অনুসা_রাত(ছদ্মনাম)
#পর্ব:২৩
সেদিনের পর থেকে মেহের আর আরবাজ আলাদা বাড়িতে থাকে।আরবাজের বাবার একটা বাড়ি আছে গ্রামের দিকে।সেটা আরবাজের নামে করে দিয়েছিল শাহীন খান। সেই বাড়িটায়ই থাকে বর্তমানে আরবাজ আর মেহের।মাঝেমধ্যে শাহীন খান এসে দেখা করে যান।সেদিনের পর একটা পুরো সপ্তাহ কেটে গেছে এই বাড়িতে নিজেদের মানিয়ে নিতে।আরবাজ আর মেহের একটু একটু করে গুছিয়ে নিচ্ছে তাদের ছোট্ট সংসার।
আরবাজের মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয় নিজের মায়ের জন্য। মায়ের একমাত্র সন্তান তো!কিন্তু পরমুহূর্তেই একজন মেয়ের প্রতি এরকম আচরণের কথা চিন্তা করে আরবাজের মন ঘৃণায় বিষিয়ে উঠে।মেহেরের দিন কাটে একা একা। আরবাজ সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকে।রাতে বাড়ি ফিরে।আজ মেহের ভাবছে আরবাজের জন্য স্পেশাল কিছু রান্না করার কথা।
যেই ভাবা সেই কাজ।সুন্দর করে ফ্রিজ থেকে চিংড়ি মাছ বের করে রান্না করতে বসে গেল চিংড়ির মালাইকারি।মেহের চিংড়ি মাছ কাটছে আর ভাবছে আরবাজ তো ভীষণ খুশি হবে।
এমন সময় মনে হলো একজোড়া হাত মেহেরকে ঝাপটে ধরলো।পুরো বাড়িতে মেহের একা।ভয়ে মেহের কেঁপে উঠে চেঁচালো,
-“কেএএ!”
বলতে বলতে মেহেরের আঙুলের খানিকটা অংশ কেটে গেল।মেহের ‘আহ’ বলে আর্তনাদ করে উঠলো।
সাথে সাথে পিছন থেকে আরবাজ বলে উঠলো,
-“আরে আরে আমি আমি।”
মেহের হাত ঝাঁকাচ্ছে।আরবাজ মেহেরের কোমড় ছেড়ে দিলো।মেহের পিছনে ফিরে বাম হাত দিয়ে আরবাজের কাঁধে চড় দিয়ে বললো,
-“এমন কেউ করে নাকি!”
-“ইশশ দেখি কতটা কেটেছে।”(হাসতে হাসতে)
বলে আরবাজ মেহেরের হাত ধরতে গেল।মেহের হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললো,
-“ও ঠিক হয়ে যাবে।”
-“কিচ্ছু ঠিক হবে না।চলো পানিতে হাত দিবে।”
-“ওরে বাবারে।হাত জ্বলবে আমার।”
-“জ্বলুক।”
বলে আরবাজ জোর করে মেহেরের হাত নিয়ে বেসিনের উপর নিয়ে গেল।পানি লাগতেই মেহের ‘আহ’ করে উঠলো আর বলতে লাগলো,
-“সব দোষ আপনার।”
-“বা রে।আমি কি করলাম?”
-“আপনিই তো হঠাৎ করে এসে চমকে দিলেন।আর এভাবে কেউ ধরে নাকি?”
-“তোমার বোঝা উচিত ছিল যে আমার আসার সময় হয়েছে। ”
-“হ্যা আমি তো ঘড়ি নিয়ে বসে আছি দেখছেন না?”
-“এখন তর্ক কম করো।”
মেহের হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললো,
-“সরুন।এবার রান্না করতে হবে।যান গিয়ে ফ্রেশ হন।”
আরবাজ অবাক হয়ে বললো,
-“মানেটা কি!তুমি এই হাত নিয়ে রান্না করবে?”
-“হ্যা।কিছু হবে না।”
-“আমি এটা একদমই করতে দিব না।চলো ওষুধ দিব।”
-“আপনি কি ফ্রেশ হতে যাবেন?এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে।”
-“এত কথা বলো কেন তুমি বলোতো?”
বলতে বলতে আরবাজ মেহেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মেহের বলছে,
-“আরে ওষুধ লাগবে না।পরে লাগিয়ে নেব।রান্না করতে হবে তো।”
-“রান্না করতে হবে না।”
-“না করলে খাব কি?”
-“সেটা পরের বিষয়।”
বলতে বলতে আরবাজ মেহেরকে সোফায় বসিয়ে তড়িঘড়ি করে মেডিসিনের বক্স এনে হাতে ব্যন্ডেজ করে দিতে লাগলো।মেহের চুপচাপ আরবাজের কান্ড দেখছে।লোকটার পরণে এখনো ফর্মাল ড্রেসআপ।এখনো সে ফ্রেশ হয়নি।সবে এসে হয়ত কোটটা খুলেছে। যেটা সোফায় পড়ে আছে। মেহেরের আঙুলে ওষুধ দিয়ে আরবাজ ব্যান্ডেজ করে দিল।তারপর সোফায় গা এলিয়ে বললো,
-“বাহিরে বড্ড শীত পড়েছে বুঝলে।”
-“আপনি থাকুন আপনার শীত নিয়ে।আমি গেলাম রান্না করতে।”
আরবাজ মেহেরের হাত ধরে নিজের পাশে বসিয়ে বললো,
-“তোমাকে না আমি বললাম আজ রাঁধতে হবে না।”
-“না খেয়ে থাকবেন?”
-“আমি রান্না করবো।”
আরবাজের কথা শুনে মেহের শব্দ করে হাসতে লাগলো।আরবাজ ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
-“কি মেডাম? হাসছেন কেন?”
মেহের নিজেকে সামলে বললো,
-“আপনি করবেন রান্না?আমার পেট খারাপ করার আসলেও কোনো ইচ্ছে নেই।”
বলে মেহের উঠে যেতে নিলে আরবাজ বলতে লাগলো,
-“তাহলে আজ আর রান্না না করি।কালকে শুক্রবার।কালকে তোমাকে আমি স্পেশাল আইটেম বানিয়ে খাইয়ে চমকে দিবো।”
-“দেখা যাবে।”
মেহেরের আর চিংড়ির মালাইকারি হলো না।তাই ডিম ভাজতে আরম্ভ করলো।কিন্তু আরবাজ কি খেতে পারবে?ভাবতে ভাবতে আরবাজ এসে উপস্থিত হলো।
আর বলতে লাগলো,
-“বাহ!ডিম ভাজার ঘ্রাণ টাই আলাদা।তাই না বলো?”
মেহের হাসলো।আরবাজ মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“আমাকে কি করতে হবে?”
-“আপনাকে কিছুই করতে হবে না।আপনি আরং ওইযে চিংড়ি মাছগুলো তুলে রাখুন।”
মেহের আর আরবাজ গল্প করতে করতেই খাবার রেডি হয়ে গেল।আরবাজ মেহেরকে বসিয়ে খাইয়ে দিতে দিতে কতকিছু বলছে।আর মেহের ভাবছে এই লোকটাকে একসময় সহ্য হত না।কেননা সবসময় মেহেরের সাথে ঝগড়া করত।আর এখন এই লোকটাই তার সব হয়ে গেছে। কখন যে এতটা ভালোবাসা হয়ে গেল মেহের বুঝতেও পারেনি।সেদিন পারত মেহের আরবাজের ভালোবাসাকে ঠুনকো করে দিয়ে চলে যেতে।কিন্তু এতে আরবাজের জীবনটাও নষ্ট হত আর মেহেরের জীবনেও একটা দাগ লেগে থাকত।কারণ আরবাজ সেদিন নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছিল মেহেরের কাছে।আরবাজের চোখে ভালোবাসার নেশা দেখতে পেয়েছিল মেহের।কি করে পারবেন মেহের তাকে ফেরাতে?সারাজীবন যে মেহেরের আফসোস হত যে সে একজনের ভালোবাসা কে ফিরিয়ে দিয়েছিল আর তার জন্য সে কাঁদছে। মেহেরের ভাবনার মাঝেই আরবাজ বলে উঠলো,
-“কি এত ভাবছ?কতকিছু বলছি শুনছই না”
-“শুনছি তো।”
বলে মেহের শেষ লোকমা টা খেয়ে নিলো।তারপর বসে রইলো আরবাজের খাওয়া শেষ হওয়ার জন্য।
।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মেহের।জায়গাটা গ্রামের দিকে হওয়ায় মেহেরদের বাড়ির পিছনে অনেক বড় ক্ষেত।সকালে সূ্র্য উঠার সময় কি দারুণ লাগে!হালকা হালকা কুয়াশা!পাখির শব্দ।আর এই বারান্দা থেকে এই পুরো দৃশ্য দেখা যায়।আপাতত শো শো করে বাতাস বইছে। মেহের শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি অনেক দূরে থাকা একটা ছোট্ট বাড়ির লাইটের দিকে।তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে ছিল মেহের।হঠাৎ উদরে কারোর ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেলো সে।এবারে আর ভয় পেলো না।ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাসের আঁচড়ে মেহের কেঁপে উঠলো।কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে সরলো না।আরবাজ মেহেরের ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
-“কি এত ভাবছ?”
-“আপনাকে আরবাজ।”
আরবাজ হাসলো।মেহের আরবাজের হাতের উপর হাত রেখে বললো,
-“আপনি আমাকে এতটা ভালোবাসেন কেন আরবাজ?”
আরবাজ মেহেরকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো।কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো সরাতে সরাতে বললো,
-“তুমি কি চাও তোমায় রেখে অন্যকাউকে ভালোবাসি?”
মেহের গাল ফুলিয়ে আরবাজের কাঁধে চড় দিলো। আরবাজ হেসে উঠলো।মেহেরের কোমড়ে হাত দিয়ে মেহেরকে নিজের দিকে টেনে নিলো।তারপর ধীর গলায় বললো,
-“কারণ তুমি আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাস করো, তুমি না থাকলে আমার পৃথিবী শূন্য। আমি তোমাকে ভালোবাসি কারণ তুমি আমার জীবনের একমাত্র আলো, যেটি ছাড়া আমি অন্ধকারে হারিয়ে যাবো।”
মেহের আরবাজের মুখপানে তাকিয়ে রইলো।আরবাজ আর তার মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। আরবাজের প্রতিটা নিঃশ্বাস মেহেরের মুখের উপর পড়ছে।মেহের নরম গলায় বললো,
-“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন? আমি তো শুধু তোমার পাশে থাকতে চাই।আমাকে এত গভীরভাবে যে ভালোবাসছো, এর জন্য আমি কি যোগ্য?”
আরবাজ মেহেরের কপালে গভীর চুম্বন করলো।মেহের চোখজোড়া বন্ধ করে ফেললো।আরবাজ মেহেরের কপালে ঠোঁট লাগিয়েই বললো,
-“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো বলেই আমি তোমাকে এত ভালোবাসি, কারণ তোমার চোখে আমি আমার সব স্বপ্ন দেখতে পাই, তোমার হাসিতে আমি আমার পৃথিবী খুঁজে পাই। তুমি আমার জীবনের একমাত্র কারণ, আর তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না।”
মেহের অবাক হয়ে চোখ খুলোো।আরবাজ হেসে বললো,
-“এখন কি বলবে?ভালোবাসো না আমায়?”
মেহেরের গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল।আর থাকতে না পেরে আরবাজের বুকে আছড়ে পড়ে বললো,
-“হ্যা ভালোবাসি।”
আরবাজের ইচ্ছে হলো মজা করতে।তাই হেসে বললো,
-“কি বললে?শুনতে পাইনি!”
মেহের আরবাজের পিঠে চিমটি কাটলো।আরবাজ ‘আহ’ করে উঠে বললো,
-“তুমি আমায় মারলে তো।”
-“হ্যা তো।কি করবেম আপনি?কি করবেন শুনি।”
-“দাঁড়াও দেখাচ্ছি তোমায় মজা।”
বলতে বলতে একটা বাতাস এসে আরবাজ আর মেহেরকে ছুঁয়ে দিলো।মেহের কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
-“আর এখানে থাকা যাবে না।আমি তো গেলাম কম্বলের নিচে।”
বলে যেতে নিলে পিছন থেকে আঁচলে টান খেলো মেহের।পিছনে না ঘুরেই বললো,
-“আরবাজ আপনি আসবেন কি না?”
আরবাজ আর কোনো কথা বললো না।তৎক্ষনাৎ মেহের নিজেকে আরবাজের কোলে আবিষ্কার করলো।
মেহের কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
-“ক..কি করছেন আ..আপনি?”
আরবাজের কানে পৌঁছালো কিনা বোঝা গেল না।সে মেহেরের মুখপানে তাকিয়ে আছে।পরমুহূর্তেই মেহের নিজেকে নরম বিছানায় পেল।আরবাজের অবাধ্য হাত মেহেরের উদরে পড়তেই মেহের চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো।জোরে জোরে শ্বাস ছেড়ে বললো,
-“আ..আ..আপনি ক…কিন্তু আমার ক..কথা শুনছেন না।”
আরবাজ বাঁকা হাসলো।মেহেরের মাথার উপর হাত রেখে আধশোয়া হয়ে বললো,
-“তুমি বলো আমি শুনছি।”
-“আমি বলতে চাইছি যে…”
মেহেরের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরবাজ একটা মারাত্মক কাজ করে বসলো।মেহেরের অনুমতি ছাড়াই মেহেরের অধরজোড়া স্পর্শ করে বসলো।ঘটনার আকস্মিকতায় মেহেরের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে আরবাজকে কিছু বলতেও পারছে না।সেই অবস্থায়ও সে নেই।হঠাৎ এমন অনুভূতি তে মেহের যেন গলে যাচ্ছে। কিছু সময় পর আরবাজ মেহেরের কপালে কপাল ঠেকালো।তার জোরে জোরে নেয়া নিঃশ্বাস মেহেরের চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছে। মেহের কিছু বলার আগেই আরবাজ বলে উঠলো,
-“আ’ম সো সরি মেহের।আ-আমার উচিত হয়নি তো-তোমার পারমিশন ছাড়া এভাবে…আ’ম সরি।”
বলে আরবাজ মেহেরের উপর থেকে উঠতে নিলে মেহের আরবাজের কলার চেপে ধরলো। আরবাজ অবাক হয়ে তাকালো মেহেরের দিকে।মেহের ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে ঢোক গিলে বললো,
-“আমার দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন কেন?”
-“মানে?”
-“আপনি কি জানেন কখনো কখনো কিছু বলার জন্য কোনো শব্দের দরকার হয় না।”
আরবাজ মেহেরের গভীর নিঃশ্বাস অনুভব করছে।মেহের আরবাজের কপালে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো।আরবাজ হালকা হাসলো।নিজেকে কাঙ্ক্ষিত জবাব পেয়ে সে মেহেরকে নিজের বুকের মাঝে আবদ্ধ করে নিলো।এতদিনের লুকানো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে লাগলো।যার গভীরতর স্পর্শে মেহের নেতিয়ে পড়লো।আরবাজের ইচ্ছে হলো না মেহেরকে ছাড়ার।গলদেশে ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে মেহেরের নিঃশাস আরো ঘন হতে লাগলো।হাত জোড়া ক্রমশ কাঁপতে লাগলো।পরমুহূর্তেই তীক্ষ্ণ স্পর্শ পেয়ে মেহেরের চোখ খুলে গেল।আরবাজের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললো,
-“আপনি আমায় কামড়ালেন কেন?”
আরবাজের মনে হলো মেহেরকে একটা চড় মারতে পারলে ভালো লাগতো।এমন একটা মুহুর্তে কি এই কথাটা না বললে চলছিল না?আরবাজ তবুও পাত্তা না দিয়ে বললো,
-“তুমি আমায় বিরক্ত করছো মেহের।”
মেহের আর কিছু বললো না।চুপ করে রইলো।মন তো চাচ্ছে ভাল্লুক টাকে মেরেই ফেলতে।এতটুকু ভাবতেই মেহের আবারো গলদেশে তীক্ষ্ণ স্পর্শ অনুভব করলো।মেহের চোখ খিঁচে বন্ধ করে বললো,
-“ভাল্লুকের বাচ্চাআ!”
আরবাজ কানে হাত দিয়ে চেপে ধরে বললো,
-“জাস্ট শাট আপ।আর একটা কথা বললে কিন্তু আমি চলে যাবো।”
মেহের মুখ ফুলিয়ে বললো,
-“আপনি এমন করছেন কেন?আমার গলায় চিনচিন করছে।”
-“তুমি আমায় আবারো বিরক্ত করছ।তুমি ইচ্ছে করেই আমায় পারমিশন দিলে।এখন নিজেই এমন করছ তো?”
মেহের দমে গেল।আসলেই অতিরিক্ত আবেগে এসে আরবাজকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত হয়নি।যা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে। আরবাজের আরকি!সে তো নিজের প্রেয়সীকে নিজের করে নিতে মত্ত।যার আলাদারকম অনুভূতি পেয়ে মেহের আরবাজের পিঠ খামচে ধরলো।
চলবে…..