#পিঞ্জিরা
#পর্ব_৫
#জান্নাত_সুলতানা
-“মিরা কি বলেছে?”
এই নিয়ে রিহান তিন বার এই একই প্রশ্ন শাহনাজ কে করলো।শাহনাজ বলতে চাইছে না। মানুষ টা যা রাগী। মিরা যা বলেছে সে কথা জানতে পারলে নির্ঘাত মিরা কে মাথার উপর তুলে আছাড় দিবে। শাহনাজ তখন থেকে ভেবে যাচ্ছে কোনো একটা মিথ্যা কথা বলার।কিন্তু রিহান ভাই এর সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা যেন গলা দিয়ে বের হতে চাইছে না কিংবা সাহস হচ্ছে না। এদিকে সত্যি বললে মিরা’র রক্ষে নেই।
রিহান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শাহনাজ এর দিকে। কাজল ইফাদ ও সাথে আছে। রিহান যে নিজে কে উপরে উপরে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছে সেটা ভালোই বুঝতে পারছে সবাই।
রিহান আবার গম্ভীর স্বরে জিগ্যেস করলো,
-“শাহনাজ বলো মিরা কি বলেছে?কেনো আসে নি?”
শাহনাজ ঢের বুঝতে পারে কোনো ভাবেই যে রিহান ভাই মিরা’র উত্তর না জানা পর্যন্ত তাকে ছাড়বে না।তাই বাধ্য হয়ে বলে,
-“বলেছে আপনার সাথে যখন-তখন দেখা করার মতো কোনো সম্পর্ক আপনাদের মাঝে নেই।”
রিহান ঘাড় বাঁকাল কিঞ্চিৎ।কথা টা বুঝতে তার সেকেন্ড এর মতো সময় লাগলো।তাকে ইগনোর করছে পুঁচকে মেয়ে? এর পরিণাম কি হতে পারে ধারণা আছে এই মেয়ের? এতো বড় দুঃসাহস কাকে দেখায়?রিহান শেখ কে? যার কথায় অনেক উচ্চ পদের লোকজন উঠে বসে তাকে? হাত মুঠোবন্দী করে রাগে।তবে কতো দিন থাকবে এভাবে লুকিয়ে? রিহান দেখে নিবে।অপেক্ষা করবে।
রিহান কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাজল ইফাদ দু’জনে এগিয়ে এলো।আমতা আমতা করে বলে,
-“ছোট মানুষ।বাদ দে,,,
-“দরদ দেখাস না।আমার ব্যাপার তো? আমাকে বুঝতে দেয়।”
রিহান গম্ভীর স্বরে বলে।অতঃপর হনহনিয়ে চলে গেলো জিপগাড়ির দিকে।অল্পস্বল্প অন্ধকার। ইফাদ দৌড়ে রিহানের পেছনে গেলো।সন্ধ্যা হয়েছে অনেক আগে। অন্ধকার চারদিকে। আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে মানুষজন।শাহনাজ তাকিয়ে ছিলো রিহান এর যাওয়ার পথে। কাজল এর কাশির শব্দে হঠাৎ চমকে উঠলো। মূহুর্তে চোখে মুখে ফুটে উঠলো লজ্জা। অন্ধকারে নজরে আসে না কাজলের। দুই কদম এগিয়ে এসে শাহনাজ এর পেছনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলো,
-“সন্ধ্যা হয়েছে।
বাড়ির ভেতরে যাও।”
শাহনাজ ঘাড় নাড়ে। পুরুষ টাকে দেখলে তার মন কেমন করে। বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করে।সামনে দেখলে লজ্জা করে।আবার ভালোও লাগে। কিন্তু সরাসরি তাকানোর সাহস পায় না।তাই তো লুকিয়ে দেখা হয় মাঝেমাঝে।দূর থেকে।শাহনাজ গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দিকে চলে গেলো।
কাজল পেছনে দাঁড়িয়ে দেখলো।শাহনাজ দৃষ্টির সীমানার বাহিরে যেতেই কাজল দ্রুত পায়ে রাস্তায় গেলো।রিহান ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। হাতে তার সিগারেট জ্বলছে। ছেলে টার ছোট বেলা থেকে এতো রাগ।কাজল হচ্ছে রিহান এর মামাতো ভাই।ইফাদ হচ্ছে রিহান এর কাকাতো ভাই।তিনজন প্রায় সমবয়সী। সেই ছোট বেলা থেকে এক সাথে বড়ো হয়েছে তিনজন। রিহান কে তখন থেকে দেখে আসছে।গম্ভীর আর রাগ যেন পশমের গোঁড়ায় গোঁড়ায়। কাজল এসে রিহান এর পাশে বসলো।আজ আর পেছনে বসলো না। কাজল আসতেই রিহান হাতের সিগারেট শেষ টান দিয়ে দূরে ফেলে গাড়ি স্টার্ট করলো।কিছু টা পথ গিয়ে রিহান হঠাৎ করে বলে উঠলো,
-“এভাবে কত দিন চলবে?বিয়ের বয়স হচ্ছে বিয়ে করে নে।”
কাজল চমকে উঠলো। ইফাদ কিছু বুঝতে পারে না। কাকে বলছে রিহান।তবে পরবর্তী কথা শোনার জন্য আগ্রহী হলো।কাজল আমতা আমতা করে বলে,
-“আব্ তেমন কিছু না।বিয়ে করবো করব,,,
-“তো করে নে।কোন টার অভাব? ওর জন্য বিয়ে দেখছে। গ্রামের মেয়ে বুঝছিস তো।”
কাজল ভাবনায় বিভোর হলো।রিহান এর কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারে সে। সত্যি কথা। সে নাহয় শহরে থাকে।হঠাৎ হঠাৎ গ্রামে আসে। যদিও গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর ব্যাপার টা গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের তো আর বেশি দিন বাবা-র ঘরে থাকার সৌভাগ্য হয় না।ব্যাপার টা ভাবার বিষয়। সে তো রাজনীতি কোনো দিন করবে না। এসব বুঝেও না।বাবা মেয়র হলেও তার এসবে আগ্রহ নেই।সে নিজেদের ফ্যাক্টরিতে জয়েন করবে।এটার জন্য তো বাবা-র সাথে যত মনোমালিন্য।
—–
মিরা রাতে দাদির রুমে ঘুমবে আজ।মিরা’র মন টা বড্ড ছটফট করছে।শাহনাজ আপা বলেছিলো তার বলা কথা টা রিহান ভাই কে?আচ্ছা যদি বলেও থাকে তবে কথা গুলো শোনার পর রিহান ভাই এর রিয়াকশন কেমন ছিলো?পুরুষ টা কি খুব বেশি রেগে গিয়েছে? না-কি হেঁসেছে মিরা’র এরূপ কথায় শোনে? কত কত প্রশ্ন মনে।মিরা জানে না রিহান ভাই কোথায় আছে বর্তমানে। ঢাকা না-কি গ্রামে!বেশি ভাবলো ঢাকা।কারণ গতকাল শাহনাজ আপা যদি কথাখানি ওনার নিকট বলেই থাকে।তবে এলো না কেনো কাল?বা আজও তো এলো না।মিরা’র মন টা খারাপ হয়।সত্যি রিহান ভাই তাকে একটুও ভালোবাসে না।ভালোবাসলে অবশ্যই আসতো।দেখা করতে চাইতো।বুঝতে পারতো মিরা’র মন অভিমান করেছে। আসে নি মানে মানুষ টা কিছু টের পায় নি।রোকেয়ার ডাকে মিরা খাবার ঘরে গেলো।কমলা বেগম ছেলে বউয়ের সাথে খাবার ঘরে আছে। মিরা যেতেই দাদির পাশে নিচে ফ্লোরে বসে। রোকেয়া ভাত বাড়ে।তিনজন খাবার খেতে বসে।খাওয়ার মাঝপথে রোকেয়া বলে উঠলো,
-“আম্মা স্কুল থেকে কাল সব বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছে। একটা বাস যাবে। সারাদিন ঘুরবে। বিকেলে ফিরে আসবে।”
-“আগে কইলা না!
তা যায় কই?মিরারে সাথে নিবা?”
কমলা বেগম জিগ্যেস করলো। রোকেয়া পানি খায়।শাশুড়ী কে বলে,
-“যাওয়ার আগে থেকে কোনো প্রোগ্রাম ছিলো না। হঠাৎ সব হয়েছে। আমি যাব না ভাবছিলাম। মিরা’র পরীক্ষা কিছুদিন পর।কিন্তু এতোগুলা বাচ্চার দায়িত্ব। সব টিচার যেতে হবে। মিরা কে সাথে নিলো ওর কলেজ একদিন বন্ধ হবে। এমনিতেই অনেক দিন বন্ধ করেছে। সামনে পরীক্ষা এখন কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষা শেষ হলে আমরা তিনজন কোথাও থেকে ঘুরে আসবো।”
মিরা মায়ের কথা মন দিয়ে শুনে।কিছু বলে না।কমলা বেগম ছেলে বউয়ের মতামত এর উপর কখনো দ্বিধা মত পোষণ করার সুযোগ পায় না।সুযোগ পায় না বললে ভুল হবে।রোকেয়া সব সময় এমন ভাবে ডিসিশন নেয় যে ওনার ভুল মনে হয় না।ভালো মনে হয়।আর সঠিক সিদ্ধান্তই নেই রোকেয়া বেগম এতে করে ওনার আর বেশি কিছু ভাবতে হয় না।নিজে বলে,
-“দেখো তোমার যা ভালা মনে হয়।”
রোকেয়া মাথা নাড়ে। খাবার শেষ মিরা মায়ের সাথে সাথে সব গুছিয়ে রাখলো।যেহেতু সকালে উঠে রান্না করতে হয় তাই মা কে তরকারি কাটতে সাহায্য করলো।রোকেয়া বেসিনে এঁটো থালাবাটি সব মেঝে নেয়।কাজ শেষ মিরা দাদির রুমে এলো।রোকেয়া নিজের রুমে গিয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে। মিরা রুমে এসে দেখলো দাদি ঘুমিয়ে পড়েছে। ওনার ভারী নিঃশ্বাস এর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘুমের ঔষধ খান প্রায়। দিনে যা বাড়ির মধ্যে শাকসবজি আর গাছগাছালির সেবাযত্ন করেন রাত হলে একটু না ঘুমলে প্রেশার বাড়ে।মিরা লাইট অফ করে আসে।জানলায় পর্দা দেওয়া। মিরা সেগুলো সরিয়ে রাস্তায় তাকালো।না কিছু দেখা যাচ্ছে না। তাই জানলা বন্ধ করে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
মিরা যেতেই রিহান রাস্তায় থাকা খড়ের আড়ালে রাখা গাড়ি স্টার্ট করে। কাজল ইফাদ অবাক হয়।তবে কিছু বলার সাহস পায় না।এভাবে দেখার কি আছে সেটাও বুঝে না।সরাসরি কথা বললেই তো হয়।
—–
রোকেয়া ভোর পাঁচ টায় উঠে নামাজ পড়ে রান্না চাপিয়েছ।সূর্যের আলো ফুটতে ফুটতে রান্না শেষ হয়ে গেলো তার।মিরা নামাজ পড়ে বই নিয়ে বসে আছে ঘরে।
রোকেয়া রান্না করে সব গুছিয়ে রেডি হয়ে খাবার বেড়ে শাশুড়ী আর মেয়ে কে ডাকলো।তিনজন এক সাথে খাবার খেলো।রোকেয়া চলে গেলো সাত টা বাজতে বাজতে।
মিরাও রুমে গিয়ে শুয়ে রইলো কিছু সময়। খাবার খেয়ে শরীর টা ক্লান্ত লাগছে। কিছু সময় শুয়ে থেকে কলেজ এর জন্য তৈরী হলো।কমলা বেগম উঠোনে কাজ করছিলো।নাতনি রেডি হয়ে আসতে গেইট তালা লাগিয়ে নাতনি কে মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিলো।সেখান থেকে মিরা অটোরিকশা করে কলেজের উদ্দেশ্য চলে এলো।
কিছু টা পথ আসার পর অটোরিকশা থেমে গেলো।মিরা ড্রাইভার কে জিগ্যেস করলো,
-“কি হয়েছে কাকা?
আপনি গাড়ি কেনো থামালেন?”
-“সামনে রিহান শেখ মা।”
মিরা চমকে উঠলো। আজ বুঝি আর রক্ষে নেই। এখন কি হবে? মানুষ টা নিশ্চয়ই রেগে আছেন। মিরা নিশ্চিত তাকে সামনে পেলে তার নরম তুলতুলে গাল টা কে থাপ্পড় মে’রে তক্তা বানিয়ে দিবে।মিরা হতভম্ব ভাব কাটিয়ে মাথা উঁচু করে গাড়ির ভেতর থেকে উঁকি মারলো।
তৎক্ষনাৎ নজরে পড়লো সামনে জিপগাড়িতে বসে আছে রিহান শেখ চোখে কালো সানগ্লাস।গাল ভর্তি চাপদাড়ি।তার মাঝে সিগারেট পোড়া অধর।মাথা ভর্তি ঘনকালো চুল। গায়ে ব্ল্যাক জ্যাকেট তার নিচে হোয়াইট গেঞ্জি। উফ এতো কেনো সুন্দর পুরুষ টা?মিরা বারবার এই পুরুষের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে বসে।সেটা কি এই পুরুষ বুঝতে পারে? উঁহু।
মিরা’র মনের ভয় ভুলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ হাতে টান পড়তে মিরা’র ঘোর কাটে।নিজের হাত রিহান ভাই এর হাতের ভাঁজে বুঝতে সক্ষম হয়ে চমকে গেলে।ভয়ে গলা শুঁকিয়ে আসে।পুরুষ টা স্বাভাবিক। শান্ত। কিন্তু সত্যি কি মানুষ টা শান্ত? না-কি আকাশ যেমন ঝড় আসার আগে থম মেরে থাকে।তেমন কি?মিরা’র তাই মনে হলো এ যেন ঝড় আসার পূর্বাভাস।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]