বছর দুয়েক পর পর্ব-১৯+২০

0
371

#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_১৯
#সারিকা_হোসাইন

কিছুক্ষণ আগের চকচকে আকাশটা হঠাৎই কালচে মেঘে ছেয়ে ফুইফুই বৃষ্টির সূচনা হলো সেই সাথে প্রবাহিত হলো শীতল ধীর বাতাস।এমন সুন্দর মেঘ বৃষ্টি সকলের মনে আনন্দ জাগালেও আনন্দিত হতে পারলেন না চৌধুরী নিবাসের মানুষ জন।মাঝবয়সী মেহেরিন বিশাল ড্রয়িংরুমের মেঝতে বসে বিধ্বস্ত অবস্থায় সামনে বিলাপ করে কেঁদে চলেছেন শুধু।মেয়ে আর নাতির দুর্দশার খবর শুনে বসে থাকতে পারেননি বৃদ্ধ মকবুল শেখ।বাড়ির সকল সদস্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন মেয়ের বাড়িতে।শেষপর্যন্ত বড় নাতি তার ছোট নাতির এতো বড় সর্বনাশ করে দেবে এটা ভেবেই ঘৃণায় বমি পাচ্ছে মকবুল শেখের।মেহেরিনের দুই ভাই আর ভাবি মেহেরিন কে সামলানোর চেষ্টা করছেন।কিন্তু মেহেরিন যেনো আজ অবুঝ।মেঝেতে বসে হাত পা ছড়িয়ে বিলাপ করে বলে যাচ্ছেন

“আমার ছোট বাচ্চাটাকে ওরা মেরে ফেলেছে বোধ হয় আব্বা।আমার অসুস্থ বাচ্চা টা।সকালে গরুর মাংস আর খিচুড়ি খাবার আবদার করেছিল।আমি টেবিলে সব গুছিয়ে রেখেছি।কিন্তু আমার মেয়ে তো আর নাই গো আব্বা!

নাতির ছোট সুন্দর মুখশ্রী মনে পড়তেই বেদনায় মুষড়ে বুকে চেপে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন মকবুল শেখ।এমন অনিষ্ট তার মেয়ের কপালে বিধাতা কি করে লিখলো?মেয়েটার জীবনে কি তবে কোনো দিন ও সুখ আসবে না?
যেই মেয়েকে নিজের সবটা উজাড় করে ভালোবেসে বড় করেছেন মকবুল সেই মেয়ের কপালে এতো কষ্ট কেনো?

মৌটুসী আর ইকবাল যখন চৌধুরী নিবাসে পৌঁছুলো তখন বৃষ্টির বেগ তুমুল।প্রায় কাক ভেজা হয়েই দুজনে প্রবেশ করলো মেহেরিন চৌধুরীর ড্রয়িং রুমে।ইকবাল এই নিয়ে ছ’বারের মতন সাইফ আজমীর বাড়িতে প্রবেশ করলো।আসে পাশে চোখ বুলিয়ে কোথাও মানুষ নামক অমানুষ টার দেখা মিললো না।মুহূর্তেই মনের সংকোচ কাটিয়ে ইকবাল মেহেরিনের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো

“আন্টি এভাবে কাঁদলে আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন।আপনার হাইপার টেনশনের প্রবলেম আছে।প্লিজ একটু ধৈর্য্য ধরুন।

কথাটি বলে ইকবাল মেহেরিনের বাহু ধরে সোফায় এনে বসিয়ে দিলো।ইকবাল কে দেখে আরো হুহু করে কেঁদে উঠলেন মেহেরিন।ইকবালের হাত চেপে ধরে মেহেরিন বলে উঠলেন

“তোমার বাসা থেকে আসার পথেই ও হারিয়ে গিয়েছে বাবা।ভিয়ান ভিয়ান করে নিঃশেষ ই হয়ে গেলো মেয়েটা।এসব দেখার জন্য কেনো এখনো বেঁচে আছি বলতে পারো?এতো মানুষ মরে আমাকে আর আমার মেয়েটাকে কেনো তখনই বিধাতা তুলে নিলো না?

মেহেরিনের প্রশ্নের উত্তর ইকবালের কাছে নেই।কেনো জানি তার নিজেকে আজ চূড়ান্ত দোষী মনে হচ্ছে।কি এমন হতো তাথৈ কে যদি সে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতো?বিগত দিন গুলোতে রহমানের গাড়ির পেছন পেছন বাইক নিয়ে এগিয়ে দিয়ে গেছে ইকবাল।তবে সেদিন কেনো করেনি এই কাজ?আর ভিয়ানের কাছে এই ঘটনার ব্যাখ্যাই বা জানাবে কি করে সে?

হঠাৎই মৌটুসী বলে উঠলো
“আন্টি তাথৈ বলেছিলো ওরা রেইন নামক কারো কাছে তাথৈকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিতে চায়।তাথৈএর একাকিত্বের সুযোগে বাপ ছেলে মিলে এই কাজ করেনি তো?

হঠাৎই বাসায় পুলিশ এসে সকল ইনফর্মেশন এর ভিত্তিতে বলে উঠলো

“আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি মিসেস চৌধুরী।কিন্তু কোথাও মিস তাথৈ কে দেখা যায়নি।এমনকি এয়ারপোর্ট এও তার কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা সাবমিট হয়নি।আর রইলো বাস,ট্রেন।সকল স্টেশনে খবর নেয়া হয়েছে।এমন গড়নের কাউকে কেউ দেখেনি।আমরা মিস তাথৈ এর ছবি দেয়ালে টানিয়ে ওয়ান্টেড পোস্ট দিয়েছি।সেখান থেকেও কোনো উত্তর আসেনি।ডিপার্টমেন্ট কেস ক্লোজ করে দিতে বলছে।কারন ক্লু আর প্রমান ছাড়া কোনো কেসের সমাধান হয়না।ডিপার্টমেন্ট এটাকে ভিত্তিহীন মনে করছে।আমাদের মতে আপনাদের ফ্যামিলি ম্যাটার আপনারা আপনারাই সলভড করলে ভালো হয়।আসছি।

পুলিশের হেয়ালিপনা দেখে বিতৃষ্ণায় চোখ মুখ কুঁচকে এলো মেহেরিন চৌধুরীর।ক্লান্ত অবসাদগ্রস্ত শরীর আরো খানিক মিইয়ে এলো।পুলিশের বিবৃতি শুনে বৃদ্ধ মকবুল অল্প গলা বাড়িয়ে বলে উঠলেন

“এমন নিকৃষ্ট সন্তান কি করে পেটে ধরেছিলি মা?

বেদনায় জর্জরিত হয়ে কারো প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না মেহেরিন।শুধু শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে সোফায় চোখ বুজে মরার মতো নিষ্প্রাণ পরে রইলেন।হৃদয়ের মৃত্যু তো হয়েছে আরো বছর পঁচিশ আগে।দৈহিক টাই বাকি।সেটাও বুঝি মেয়ের দুর্ভাবনায় এবার সংঘটিত হয়ে যাবে।

********
“ইউর হস্পিটালিটি মেইড মি ভেরি হ্যাপি মিস্টার নাওয়াফ”

কথাটি বলে নিজের এসিস্ট্যান্ট আর্থার কে চোখের ইশারা করলো রেইন।ইশারা পেতেই আর্থার একটি কন্ট্রাক্ট পেপার পরম সম্মানের সাথে ভিয়ানের দিকে এগিয়ে বলে উঠলেন

“উই উড লাইক টু বিল্ড বিজনেস ফ্রেন্ডশিপ উইথ ইউ।”

কন্ট্রাক্ট পেপারের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো ভিয়ান ।আয়াজ আমিরের ডায়মন্ড অর্নামেন্টস বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।বিশ্বাস যোগ্য খাঁটি ডায়মন্ড প্রোভাইড করে তারা।ভিয়ান টোপ হিসেবে নিজের ক্লথিং ব্র্যান্ড কে ইউজ করেছে শুধু।তার মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে ওই ডায়মন্ড ব্র্যান্ড নিজের নামে করে নেয়া।এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুদর্শন পুরুষটি এতো দ্রুত ভিয়ানের জালে পা ফেলবে এটা ভিয়ান কল্পনাও করতে পারেনি।কন্ট্রাক্ট পেপার টি ভালো করে পরখ করে মুখে প্রশস্ত হাসি ঝুলিয়ে ভিয়ান বলে উঠলো

“লেটস বি ফ্রেন্ড”

কথাটি বলে ঘসঘস করে সাইন দিয়ে কাগজ টি বাড়িয়ে দিলো আয়াজ আমিরের দিকে।ভিয়ানের সাইন দেখে অল্প ক্রুর হাসলো আমির।সেই হাসি ভিয়ানের দৃষ্টি এড়ালো না।আমিরের ক্রুর হাসি দেখে আরো খানিক ক্রুর হাসলো ভিয়ান এরপর থুঁতনিতে আঙ্গুলি ট্যাপ ট্যাপ করে মনে মনে বলে উঠলো

“ভিয়ান নাওয়াফ কে টেক্কা দিতে হলে তোমাকে আরেকবার জন্ম নিতে হবে আমির।যেই স্বপ্ন দেখতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করেছো আমার সাথে তা কখনোই পূরণ হবে না।কারন ভিয়ান নাওয়াফ শুধু নিতে জানে দিতে নয়।

নিজেদের কন্ট্রাক্ট সম্পন্ন করে বিদায় নিলো আয়াজ আমির।সে চলে যেতেই ক্লান্ত ভিয়ান অভীকের কাছে সমস্ত দায়িত্ত্ব বুঝিয়ে নিজের বাংলোর দিকে ছুটলো।আজ অনেক ধকল গিয়েছে।বড় বড় চারটা বিজনেজ মিটিং এটেন্ড করতে হয়েছে তাকে।সব গুলো মিটিংয়ে এতো এতো কথা খরচ হয়েছে যে তার এখন আর কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না।কোনো মতে অভীক কে বিদায় জানিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাংলোর সামনে এসে দাড়ালো।ভিয়ান কে দেখতে পেয়ে গার্ড গেইট খুলে ধরতেই দৌড়ে এলো আইজ্যাক নামের একটি ছেলে।তাকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে কীবক্স তার হাতে তুলে ভিয়ান ক্লান্ত কন্ঠে বলে উঠলো

“পার্ক দ্যা কার এন্ড গো ব্যাক হোম।

আর দাঁড়ালো না ভিয়ান।আজ ইকবালের থেকে তাথৈ এর খবর নেয়া হয়নি।সারাটা দিন চূড়ান্ত ব্যাস্ততায় কেটেছে।মেয়েটার জ্বর কমেছে কি না জানতে হবে।এতো এতো দূরত্ব আর ভালো লাগে না।খুব শীঘ্রই এই হাইড এন্ড সিক খেলার সমাপ্তি ঘটাতে হবে।না হলে দুদিন পর তাথৈ হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।মেয়েটা এতো পাগল কেনো এটা ভিয়ানের বুঝেই আসে না।কতো মানুষের গড়া সংসার ভেঙে যাচ্ছে।গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড একজন আরেকজন কে চিট করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।আর তাকে দেখো!একদম প্রাণ ছেড়ে দিয়েছে।উফ কি যন্ত্রনা!

নিজের পোশাক পাল্টে লম্বা হট শাওয়ার নিয়ে কোমরে একটা সাদা রঙের টাওয়েল জড়িয়ে ফিরে এলো ভিয়ান।শরীর ভালো করে না মোছার কারনে জিম করা পিটানো ফর্সা শরীরের পানির কণা গুলো হিরের মতো চকচক করছে।কপালের কাছে লেপ্টে থাকা লম্বা চুল গুলো থেকে অনবরত টুপটুপ করে পানি ঝরছে।সেসবে তার নজর নেই।সে তার ফোনটা খুঁজে চলেছে ।এই মুহূর্তে তাথৈ এর আপডেট শুনতে না পারলে ঘুম তো আসবেই না উল্টো প্রাণ বেরিয়ে যাবে।মেয়েটা একদম অস্থি মজ্জায় মিশে রয়েছে।এ কেমন ভালোবাসা?এতো গভীর ভাবে কেউ কাউকে কিভাবে ভালোবাসে?সারাটা ক্ষন ওই বাচ্চা মেয়েটাকেই কেনো এতো মনে পরে?

সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন মোবাইল খানা পাওয়া যাচ্ছে না তখন ভিয়ানের মেজাজের পারদ বেশ করে চটে গেলো।ফাঁকা মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করতেই মনে হলো নিজের ডেস্ক ড্রয়ার থেকে মোবাইল খানা বের করেনি সে।রাগে দেয়ালে শক্ত এক পাঞ্চ মারতেই কলিংবেল বেজে উঠলো

কলিংবেল এর শব্দে দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে নজর বুলালো ভিয়ান।রাত প্রায় দেড়টার কাছাকাছি।

“এতো রাতে কে এলো?

ঝটপট গায়ে একটা টিশার্ট আর শর্ট কার্গো জড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতেই দেখতে পেলো বাড়ির কুকিং বয় লেনিন দরজা খুলে দিয়েছে।

এতো রাতে অভীক কে দেখে কপালে চিন্তার সূক্ষ্ণ ভাঁজ পড়লো ভিয়ানের।আগ বাড়িয়ে কিছু প্রশ্ন করার আগেই অভীক বলে উঠলো

“ইকবাল ভাই আপনাকে ফোনে না পেয়ে আমাকে কল করেছে।অফিসের ডেস্কের ড্রয়ারে ফেলে এসেছিলেন ফোনটা।তাথৈ ম্যাম….

তাথৈ নাম শুনেই ভিয়ানের মুখের রঙ পাণ্ডুবর্ণ হলো।ছো মেরে নিজের ফোনটা অভীকের হাত থেকে নিয়ে লক খুলতেই ইকবালের পচিশটি মিসডকল এ দৃষ্টি আটকালো।ইকবাল কখনোই একটার বেশি ফোন দেবার ছেলে নয়।তবে আজ কেনো পচিশটি কল?
ভয়ে স্নিগ্ধ কপালের কিনারা গড়িয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরতে লাগলো।ঝটপট ইকবালের নম্বর ডায়াল করে কানে তুলতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো।দুশ্চিন্তা হতাশা আর জেদে ভিয়ানের চোয়াল শক্ত হলো সেই সাথে লাল হয়ে উঠলো গভীর ঈগলি চোখ জোড়া।ভিয়ানের মুখের হঠাৎ রঙ পরিবর্তন এর কারণ অভীক জানে।কিন্তু সে মুখ ফুটে বলতে চায়না।কারন ঘটনা পুরোটা শোনার পর যেই ঘূর্ণিঝড় এর সূচনা হবে তা অভীক সামলাতে পারবে না।একমাত্র ইকবাল ই সেই ব্যক্তি যে যেকোনো পরিস্থিতি তে ভিয়ান কে শান্ত রাখতে পারে।

দ্বিতীয়বার কল লাগাতেই রিং হলো এবং মুহূর্তেই রিসিভ হলো কল খানা।ওপাশ থেকে হ্যালো বলার আগেই গমগমে উদ্বিগ্ন স্বরে ভিয়ান উচ্চস্বরে শুধালো

“সত্যি করে বল তাথৈ এর কি হয়েছে ইকবাল?ওকে কি হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে?ও কি অনেক অসুস্থ হয়ে গেছে?ঠিক আছে তো নাকি?আমাকে কি আসতে হবে?

ভিয়ানের উদ্বিগ্নতা দেখে ভীত হলো ইকবাল।মুখে কোনো জবাব নেই।কিন্তু ভিয়ানকে সবটা জানাতে হবে।না হলে ঘটনা আরো বহুদূর চলে যাবে।রোধ হয়ে যাওয়া কন্ঠ খানিক ফাঁকা ঢোকে ভিজিয়ে ইকবাল বলে উঠলো

“তাথৈকে ….

ইকবাল কে কথা শেষ করতে না দিয়েই ভিয়ান গর্জে উঠলো

“কি শুরু করেছিস?এতো সময় নিয়ে কি কথা বলতে চাইছিস তুই আমাকে?আমার কথা শুনে বুঝতে পারছিস না আমি যে ডেসপারেট হয়ে যাচ্ছি?

“ভিয়ান প্লিজ কাম ডাউন।এটা উত্তেজিত হবার সময় নয়।যেই কথা এখন বলবো এটা মাথা ঠান্ডা রেখে পুরোটাই শুনতে হবে তোকে।একটু এদিক সেদিক হলেই ভয়াবহ ক্ষতি টা কিন্তু তোর ই হবে।

“ইকবাল তুই ভনিতা না করে সিধা পয়েন্ট পার আ।তাথৈ নামটা আমার কলিজার সাথে জড়িয়ে আছে এই কথা খুব ভালো করেই জানিস তো নাকি?এতো নাটকীয় কথা শোনার মোডে আমি এই মুহূর্তে নেই ইকবাল।

ইকবাল ঠোঁট গোল করে লম্বা দম ফেলে ধীর নিচু কন্ঠে বলে উঠলো

“তাথৈকে কেউ কিডন্যাপ করেছে দুদিন আগে।রহমান চাচার সাথে আমার বাড়িতে এসেছিলো তোর একটা চুল নিয়ে।আমি তোর কথা না করায় কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছে।মাঝপথে রহমান চাচাকে কেউ গুরুতর আঘাত করে তাথৈকে তুলে নিয়ে গিয়েছে।এখনো কোনো খুজ মিলেনি।

ইকবালের মুখে তাথৈ এর কিডন্যাপ হবার ব্যাপার টা যেনো ভিয়ানের পুরো দুনিয়া দুলিয়ে দিলো।ফাঁকা মস্তিষ্ক ভো ভো শব্দে আন্দোলন করে উঠলো।চলাচল করা উত্তপ্ত শ্বাস টা শক্ত হয়ে বুকের কাছে আটকে রইলো।হৃদপিণ্ডের ধকধক বেঁচেইন ধ্বনি বন্ধ হলো সহসাই।নিজের কানকেই যেনো বিশ্বাস হলো না।দুই চোখের কোন বেয়ে দু ফোটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়লো।বলার মতো কোনো ভাষাই অবশিষ্ট রইলো না।শুধু ব্যথিত কন্ঠে আর্তনাদ করে বলে উঠলো

“ইকবাল আমার পাখিটা ভয়াবহ রকমের অসুস্থ”

তপ্ত শ্বাস ফেলে ইকবাল ভিয়ানের নিস্তব্ধ হৃদ ঝড়ের ক্ষতির পরিমাণ গণনায় ব্যস্ত হলো।কীয়তখন গড়াতেই ইকবাল বলে উঠলো

“মেহেরিন আন্টি থানায় এরিক আর সাইফ আজমীর নামে মামলা ঠুকেছে।কিন্তু পুলিশ সেরকম সন্দেহ জনক কিছুই পায়নি।সাধারণ পারিবারিক ঝামেলা মনে করে পুলিশ কেইস ক্লোজড করতে চাচ্ছে।যেখানে ঘটনা টি ঘটেছে সেখানে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই।তাই কালপ্রীট শনাক্ত করতে ঝামেলা হচ্ছে।

ইকবালের কথায় কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে গম্ভীর কন্ঠে ভিয়ান বলে উঠলো

“ওই গাড়িতে ড্যাস ক্যামেরা আছে।রহমান চাচাকে বলিয়ে লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলাম আমি।তুই উনার থেকে মেমোরি টা নিয়ে নে।আর ফুটেজ গুলো আমাকে পাঠা।সব গুলোকে খেয়ে ফেলবো একদম।আর এরিকের মাথা আমার চাই।চাই মানে চাই ই।বুঝেছিস তো কি বলেছি?নিজের বাহাদুরীর প্রমান দে।অনেক পশুকেই তো ওই হাতে জ*-বাই করেছিস।এবার এই নরপশু টা কে আমার জন্য ব*-লি দে।ওর তাজা র*-ক্তে হলি খেলবো আমি ইকবাল।তাথৈএর যদি কিছু হয় আমি সব জ্বালিয়ে দেবো ইকবাল আল্লাহর কসম।

#চলবে

#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_২০
#সারিকা_হোসাইন

******–—–******
ঝকঝকে বিশাল এক কক্ষের সফেদ তুলতুলে বিছানায় পা ভাঁজ করে হাঁটুতে মাথা রেখে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে তাথৈ।ধরনীতে রাত বা দিন কখন গড়াচ্ছে এ বিষয়েও সে কিচ্ছুটি অনুধাবন করতে পারছে না।কক্ষটিতে কোনো দেয়াল ঘড়ি বা সময় পরিমাপক জন্ত্র না থাকায় এখন সময় কতো সেটাও ঠাহর করতে পারছে না।দৃষ্টি থেকেও নিজেকে আজ দৃষ্টিহীন অন্ধ মানুস মনে হচ্ছে।দুদিন ধরে একই ঘরে বন্দি রয়েছে সে অথচ দরজা জানালা হীন ঘর থেকে বাইরের প্রকৃতি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না।কোন পাপের শাস্তি বিধাতা এমন নিষ্ঠুর ভাবে দিচ্ছে তাকে?
ভালোবাসার মানুষটির অকাল মৃত্যুতে সে তো এমনিতেই হৃদয়ে পচন ধরে আধমরা হয়ে পরেছিলো।এতেও কি বিধাতার মন গলে নি?আরো ভয়াবহতা দেখানোর কী বাকি রয়েছে!কথা গুলো এক মনে ভাবতে ভাবতে হাতের মুঠোয় থাকা চুলটি আরেকবার চোখের সামনে এনে জহুরী নজর বুলালো তাথৈ।

“কেনো মন মানতে চাইছে না যে এটা ভিয়ানের চুল নয়?যদি এটা ভিয়ানের চুল নাই হয় তবে সামান্য একটা উড়ো চুলের প্রতি কিসের এতো মায়া?

চুল নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎই সেদিনের ওই পুরুষটির কথা মনে পরে শরীর শিউরে উঠলো তাথৈ এর।লোকটির কথা বার্তা যথেস্ট ডিসেন্ট ছিলো।নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে তাথৈ তাকে আঘাত করেছে।তবুও লোকটি একটু আঃ শব্দ পর্যন্ত করেনি।এরিকের কাছে লোকটির নাম শুনতে শুনতে মনে একপ্রকার ঘেন্না ধরে গিয়েছিলো লোকটির প্রতি।সেই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এহেন কাজ করেছে সে।

“তার কাছে কি আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত?

অবচেতন মন এহেন চিন্তা করতেই মাথার সমস্ত নিউরন জাগ্রত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো

“সে যদি ভালো মানুষ ই হতো তবে তোর বাপ ভাইয়ের সাথে মিলে এভাবে তোকে কিডন্যাপ করে দূর দেশে আনতো না।এখানে তোর কেউ নেই।আদৌ এই বন্দি ঘর থেকে তোর মুক্তি মিলবে কি না সেটাও অজানা।

হঠাৎই মেহেরিনের কথা মনে পড়তেই কান্নার বেগ দ্বিগুন হলো তাথৈএর।না জানি কোথায় কোথায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে।

“আচ্ছা আমাকে খুঁজে না পেলে কি আম্মু মরে যাবে?আমি ছাড়া তো আম্মুর বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন ই নেই।

আর ভাবতে পারলো না তাথৈ।দরজা খোলার আওয়াজে সচেতন হয়ে বিছানায় বাবু হয়ে বসলো সে।নিজের ভীতি কমানোর জন্য বিছানায় থাকা বালিশ বুকে চেপে দরজার দিকে নজর পাতলো।

কিছু সময় অতিবাহিত হতেই একটি ফুড ট্রলি সহ কক্ষে প্রবেশ করলো রেইন।হাতে তার সফেদ ব্যান্ডেজ লাগানো। ফর্সা হাতে খামচির দাগ গুলো শুকিয়ে লাল হয়ে উঠেছে।কিছু সময়ের জন্য রেইন কে পরখ করে বিতৃষ্ণায় অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিলো তাথৈ।এই দৃশ্যে সামান্য মেপে হাসলো রেইন।এরপর গমগমে ভরাট কন্ঠে বলে উঠলো

“তুমি নাকি নিষেধ করেছো কেউ যাতে তোমাকে খাবার না খাওয়ায়?কিন্তু কেনো?না খেয়ে কি মানুষ বাঁচতে পারে?ইউ হ্যাভ টু ইট।

রেইনের কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো তাথৈ।এরপর এমারেল্ড গ্রীন চোখের মনির দিকে তাকিয়ে কাট কাট গলায় তাথৈ বলে উঠলো

“আমাকে দেখে কি আপনার মনে হচ্ছে আমি বেঁচে আছি?আমি তো আরো #বছর_দুয়েক_আগেই মরে গিয়েছি মিস্টার রেইন।

তাথৈ এর কথায় মুখের কোনো ভাবান্তর এর পরিবর্তন হলো না দাম্ভিক পুরুষটির।ট্রলি থেকে টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে আদুরে কন্ঠে বলে উঠলো

“ছোট বয়সে ওসব আবেগ জড়িত ভুল অনেকেই করে থাকে।আমার কাছে সেসব ডাজেন্ট ম্যাটার।

“আরেক জনের এঁটো জিনিস কেনো খাবেন?

তাথৈ এর প্রশ্নে থেমে গেলো রেইনের হাত ।বিস্ময় ভরা ক্রোধ নজরে তাথৈ এর মুখের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে শুধালো

“তুমি কি ইউজড?

কোনো কিছু না ভেবেই তাথৈ বলে উঠলো

“ইয়েস।এনি ডাউট?সাড়ে তিন বছরের সম্পর্ক ছিলো আমাদের।আমার বাসায় তার যাতায়াত ছিলো ডাল ভাতের মতো।সাইফ আজমি নিজেই এই পারমিশন দিয়েছিলেন।দেয়ার ইজ নট এন ইঞ্চ অফ মাই বডি দ্যাট হি হ্যাজেন্ট টাচ।

ভিয়ান সম্পর্কে এতবড় মিথ্যে বলে মনে মনে নিজেই চূড়ান্ত ব্যাথিত হলো তাথৈ।মানুষটি মাথায় হাত বুলানো ছাড়া আর কিচ্ছুটি করেনি তাকে।তাথৈ জেদ করতো মাঝে মাঝে জড়িয়ে ধরার জন্য।নিজেকে যথেষ্ট সেফ রেখে ভিয়ান তাথৈ এর সাথে ঘনিষ্ঠ হতো।বিশেষ কারন ছাড়া হাত টা ধরতেও তার সংকোচ ছিলো।কিন্তু নিজেকে বাঁচানোর জন্য এর থেকে বড় অবলম্বন আর কিচ্ছুটি খুঁজে পেলো না সে।

“আমাকে মাফ করো ভিয়ান।তুমি ব্যতীত আমাকে পাবার স্বপ্ন কেউ দেখুক তা আমি চাইনা।

কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে তাথৈএর পানে শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো রেইন।মনে মনে নিজের চরিত্র খানাও একটু ঝালাই করে কিছুটা নরম গলায় বলে উঠলো

“আই ডোন্ট কেয়ার হুয়াট ইউ ডিড বিফোর।
রেইনের কথায় নিজের ভর ছেড়ে দিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে বসে রইলো তাথৈ।শুধু সজল চোখে নিভু নিভু স্বরে বলে উঠলো

“আমার মা জানেনা আমি এখানে।উনি অনেক টেনশন করবেন।আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলতে চাই।

তাথৈ এর কান্নারত বড় বড় লালচে চোখের দিকে আহত নজর দিলো রেইন এরপর কি যেনো মনে করে রেইন বলে উঠলো

“যদি এই খাবার গুলো সব শেষ করো তবে তোমার মায়ের সাথে তোমাকে কথা বলার ব্যবস্থা করিয়ে দেবো।

এক মুহূর্তের জন্য তাথৈ এর মনে হলো সে যেনো দেহে প্রাণ ফিরে পেলো।শুষ্ক ফাটা ঠোঁটে খেলে গেলো প্রাপ্তির হাসি।দ্রুত হাতে চোখের জল মুছে মাথা ঝাকিয়ে বলে উঠলো

“আ উইল ইট……

মেয়েটির প্রতি অজানা এক দরদ কাজ করে সর্বক্ষণ রেইনের মধ্যে।অনেক মেয়ের সঙ্গ উপভোগ করছে সে।কামনার চোখ ছাড়া আর কোনো নজরেই দেখেনি তাদের।শুধু তাই নয়।সারা রাতের ভোগের পর তাদের চেহারা পর্যন্ত দেখেনি সে।অথচ কি আছে এই মেয়ের মাঝে?এক পলক না দেখলেও কেমন হাঁসফাঁস লাগে।নিজের চোখের শান্তির জন্য নিজেই গোপন একটা ছোট ক্যামেরা লাগিয়েছে এই বদ্ধ কামরায়।যদিও এটা অন্যায়।কিন্তু বেহায়া মন মানতে নারাজ।রেইন যখন বুঝতে পেরেছে মেয়েটি ড্রেস চেঞ্জ করবে বা শাওয়ার নিতে যাবে ঠিক তখনই সে স্ক্রিন অফ করে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে অন্যত্র।মেয়েটিকে দেখার আগে তার মনে খারাপ উদ্দেশ্য থাকলেও চোখের সামনে দেখার পর কোনো ধরনের নোংরা চিন্তা তো দূর তাকে হাত ধরে ছুঁয়ে দেখার সাহস পর্যন্ত করেনি সে।বন্দিনী মেয়েটির ছটফটানি রেইনের হৃদয়ের কোনায় কোনায় ব্যাথার উদ্রেক করে।কিন্তু এছাড়া আর উপায় নেই।কঠিন হৃদয়ের মানবী এই তাথৈ শেহতাজ।পোষ মানানোর জন্য একটু খাঁচায় রাখতেই হবে।একবার মেয়েটি দলিল রূপে রেইনের হয়ে গেলে পৃথিবীর সকল আজাদী খুশি তার পায়ের কাছে এনে সোপর্দ করবে রেইন।

রেইনের ভাবনার মাঝেই তাথৈ এর খাওয়া শেষ হলো।তাথৈ যখন পানির গ্লাসে চুমুক দিলো সেই দৃশ্যে রেইনের গলা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে উঠলো।তাথৈ এর সাথে মিলিয়ে ঢোক গিলে সেই তৃষ্ণা দূর করতে চাইল।বেহায়া মন জানান দিলো এই তৃষ্ণা পানির নয়।মোলায়েম ঠোঁট ছুঁইয়ে দেবার তৃষ্ণা এটা।নিজের নিষিদ্ধ ইচ্ছেকে মাটি চাপা দিতে দ্রুত এঁটো বাসন গুলো নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো রেইন।কিন্তু তার পায়ের গতি রোধ করে কাতর স্বরে তাথৈ শুধালো

“আম্মুর সাথে কখন কথা বলতে পারবো?..

নজর অন্য দিকে নিবদ্ধ করে ফট করে রেইন বলে উঠলো

“আমি সময় হলে তোমাকে ডেকে নেবো।

আর কোনো কথা হলো না।কক্ষ ত্যাগ করলো রেইন।যাবার আগে শুধু বলে গেলো

“আমাকে মেনে নেওয়াই বেটার অপশন তাথৈ শেহতাজ।কথা দিচ্ছি কখনো কষ্ট নামক জিনিসের দেখা পাবে না।আর একটা কথা!

“আম গিভিং সো মাচ এফোর্ট টু ইউ এলোন।মাইন্ড ইট।

*******
হসপিটালের ভিআইপি কেবিনে মুখোমুখি বসে আছে ইকবাল আর রহমান।বৃদ্ধ রহমান এখনো নিজেকে পুরোপুরি রিকোভার করতে পারেনি।চিকিৎসা চলছে পুরোদস্তুর।ইকবাল কে দেখতে পেয়েই কান্না জড়িত কন্ঠে রহমান বলে উঠলো

“ভিয়ান বাবার আমানত আমি রক্ষা করতে পারিনি ইকবাল।তাথৈ মামনির বাবা মা কেও রক্ষা করতে পারিনি আমি।আমার জীবন পুরোটাই নিমক হারাম হলো।আজীবন নুন খেয়েই গেলাম।কিচ্ছুটি ফেরত দিতে পারলাম না।

বৃদ্ধ রহমানের কান্নায় হৃদয় ব্যথিত হলো কঠিন পুরুষ ইকবালের।তবুও মুখে কোনো ভাব ভঙ্গির পরিবর্তন না করে শুধালো

“ড্যাস ক্যামেরার মেমোরী টা লাগবে আমার চাচা।গাড়ির চাবি কাছে?

রহমান বিশ্ময়ভরা কন্ঠে বলে উঠলো

“ওই মেমোরির মাধ্যমে কি অপরাধী শনাক্ত করা যাবে?কিন্তু তাদের চেহারা তো ঢাকা।আর চাবি ম্যাডাম এর কাছে।

আর বসলো না ইকবাল।রহমান কে তাথৈ সম্বন্ধীয় ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে এলো।চৌধুরী নিবাস যেয়ে মেহেরিন চৌধুরীর থেকে চাবিটা নিতে হবে।কিন্তু বাড়িতে যদি সাইফ আজমী বা এরিক থাকে তাহলে বড্ড ঝামেলা হয়ে যাবে।সাইফ আজমীর কুৎসিত চেহারা ভুলেও দেখতে চায়না ইকবাল।এরকম চারটা সাইফ আজমিকে কিনে নেবার ক্ষমতা ইকবাল রাখে।কিন্তু নোংরা মনের সাইফ আজমী ইকবালের সরলতার সুযোগ নিয়ে যেই বিশ্ৰী খেলা খেলেছে তা মনে করতেই রাগে রিরি করে উঠলো ইকবালের সর্বাঙ্গ।
মনের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ফেলে ইকবাল যখন চৌধুরী নিবাস পৌঁছুলো তখন সূর্যটা মধ্যগগনে।ইকবাল কে দেখেই বাড়ির দারোয়ান বলে উঠলো
“ম্যাডাম তো বাড়িতে নেই।

ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে ইকবাল শুধালো
“কোথায় গিয়েছেন উনি?

“একটু আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন।কিন্তু কোথায় গিয়েছেন জানিনা।

দারোয়ান এর কথা শেষ হতেই নিজের ফোন বের করে ডায়াল করলো মেহেরিনের নম্বর।রিং হতেই কিছুক্ষণ পর ফোন রিসিভ হলো।
হ্যালো বলার আগেই ভরাট কন্ঠে ইকবাল বলে উঠলো
“রহমান চাচার গাড়ির চাবি কোথায় আন্টি?
চতুর মেহেরিন না ঘাটিয়ে বলে উঠলেন

“আমার রুমে বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ারে।

“সেই ঘরে কি প্রবেশের অনুমতি আছে আমার?
ঘটনা বেগতিক বুঝে মেহেরিন বলে উঠলেন
“ফোনটা চারুলতার কাছে দাও আমি বলে দিচ্ছি।
আর কথা বাড়ালো না ইকবাল।হনহন করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই উৎসুক চারুলতার দেখা মিললো।তার কাছে ফোন দিতেই মেহেরিন শক্ত কন্ঠে বললেন
“ইকবাল যা যা চায় সব দিয়ে দে।
মেহেরিনের নির্দেশ পেয়ে চারু বলে উঠলো
“আহেন আমার লগে।

*******
এরিকের ফর্সা মসৃন গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলেন সাইফ আজমী।রাগে তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।হৃদ গতিও বেড়েছে ঘোড়ার রেসের ন্যয়।দুই চোখ অস্বাভাবিক লাল।চড়ের দাপট সামলাতে না পেরে দেয়ালে বারি খেলো এরিক।নিজের স্থান থেকে হেঁটে এসে এরিকের শার্টের কলার চেপে ধরে সাইফ আজমী গর্জে উঠা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন

“কার অনুমতি নিয়ে এই কাজ করেছিস তুই?এতো বড় ব্ল্যান্ডার করার আগে আমার অনুমতি নিয়ে ছিলিস?

কথা বলে না এরিক।বলার মতো কিছু অবশিষ্ট ও নেই।রেইন ছেলেটি বড়োই ধূর্ত।তাকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাথৈকে হাত করেছে সে।তাথৈকে পাবার পর তার সাথে সকল যোগাযোগ এর মাধ্যম বন্ধ করেছে সে।শুধু তাই নয় টোপ হিসেবে যেসব বড় বড় কন্ট্রাক্ট এর লোভ দেখিয়েছিলো কোনো কারণ ছাড়াই সেগুলো ক্যানসেল করেছে সে।রেইন তো দূর তার সেক্রেটারি র সাথে যোগাযোগ করার ও কোনো অবকাশ রাখেনি।উপরন্তু যেসব শিপমেন্ট তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল কোনো এডভান্স ব্যতীত সেগুলোও সে রিজেক্ট করেছে।চারপাশে এতো এতো হতাশা কোনো ভাবেই মানতে পারছেন না সাইফ আজমী।সাইফ আজমী ভেবে রেখেছিলেন তাথৈকে গুটি হিসেবে চেলে রেইন এর থেকে সব আদায় করে নিবেন।কিন্তু মাঝপথে এই কুলাঙ্গার এমন করে দাবার চাল ভেস্তে দেবে সেটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি।

“পাপা আমার কথাটা শুনো প্লিজ।
আরেকটি চড় এসে দাগ করে দিলো এরিকের গালে।হিসহিস করে সাইফ আজমী বলে উঠলো

“কতো কোটি টাকার লস হয়েছে একবার ও ভেবে দেখেছিস?
এরিক আমতা আমতা করে বলে উঠলো
“আয়াজ আমির আমাকে ট্র্যাপে ফেলে এমন করেছে পাপা।

“জন্ম আমার হলেও মায়ের মতো গভেট ই থেকে গিয়েছিস।তোকে নিজের সন্তান পরিচয় দিতেই ঘেন্নায় মরে যাচ্ছি আমি।ঐ ছেলে কতবড় খেলোয়াড় তুই জানিস?ট্রাম কার্ড অনায়াসে ধরিয়ে দিলি তার হাতে।স্কাউন্ড্রয়েল।

এরিক কিছু বলতে যাবে ওমনি সাইফ আজমী ধমকে উঠলেন
“দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে।তোকে আর এক মুহূর্ত দেখতে ইচ্ছে করছে না।গেট আউট ফ্রম হেয়ার।

*******
নিজের ল্যাপটপে মাথার চুল খামচে ধরে ফুটেজ গুলো দেখে চলেছে ভিয়ান।শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেও ঘামে ভিজে একাকার অবস্থা তার।ভিডিও গুলো দেখে মুহূর্তে মুহূর্তে মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে চোয়াল শক্ত হচ্ছে তার।ঘাড়ের কাছের মোটা রগ গুলো আরো বেশি মোটা শক্ত হয়ে ফুলে উঠছে থেকে থেকে।ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুইটি বড় বড় ট্রাক ফলো করছে তাথৈ এর গাড়ি।গাড়ি গুলো বেসুরে ভাবে ক্রমাগত হর্ণ বাজিয়ে বিরক্ত করার চেষ্টা করছে রহমান কে।রহমান তাদের সাইড দিতেই সামনে থেকে ধেয়ে আসে আরো তিনটে কালো গাড়ি।অবস্থা বেগতিক বুঝে শক্ত ব্রেক কষেন রহমান।কোনো কিছু বুঝে উঠবার আগেই গাড়ি থেকে নেমে আসে চারটে লোক।শরীরের গড়নে যুবক ই মনে হচ্ছে তাদের।কালো পোশাকে আবৃত লোক গুলোর চোখ দুটো শুধু খোলা।এগিয়ে আসা এক লোক হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে রহমানের মাথায় আঘাত করতেই মাথা চেপে জ্ঞান হারায় বৃদ্ধ রহমান।মাঝখানের ছেলেটি ক্রুর দৃষ্টি তে গাড়ি থেকে টেনেহেঁচড়ে নামায় তাথৈকে।অবুঝ তাথৈ কিছু বুঝে উঠতে না পেরে দৌড়ে পালাতে চাইলো।গাড়ির সামনে থেকে চুলের মুঠি ধরে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে সজোড়ে এক চড় বসিয়ে দিলো লোকটি।চড়ের টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায় তাথৈ। এই দৃশ্য দেখে বসা থেকে চট করে উঠে দাঁড়ালো ভিয়ান।তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে।এনাকোন্ডার ন্যায় ফসফস শব্দ হলো নির্গত শ্বাসের।ফুলে উঠলো নাকের পাতা দুটো।রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো পুরো মুখশ্রী।সহসাই শক্ত হয়ে এলো হাতের মুঠি।নিজের হাতের শক্ত মুঠি দিয়ে পাঞ্চ করলো ল্যাপটপের স্ক্রিন।অবলা আইপিএস ডিসপ্লে নিমিষেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে অবহেলায় পরে রইলো ঝকঝকে টাইলসে।

দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে গর্জে উঠলো ভিয়ান

“আ উইল কিল ইউ বাস্টার্ড।যেই হাত দিয়ে আমার জানের গালে আঘাত করেছিস তুই সেই হাত আমি গুঁড়িয়ে দেবো।

রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ইকবালের নম্বর ডায়াল করলো ভিয়ান।ব্যস্ত ইকবাল ক্লান্ত স্বরে হ্যালো বলতেই গড়গড় করতে করতে ভিয়ান বলে উঠলো

“গাড়ির নম্বর প্লেট গুলো থেকে খুজ নে গাড়ি গুলো কার।আর মাঝখানের ব্যাট ম্যান এর ট্যাটু ওয়ালা ছেলেটিকে আমার চাই।খুজ লাগা কে করেছে এই ট্যাটু।

ইকবাল কিছুটা ইতস্তত করে বলে উঠলো
“এমন ট্যাটু অনেক মানুষ করে।স্পেসিফিক ভাবে ওই মানুষকেই কোথায় পাবো?

“প্রত্যেকটা ট্যাটু স্টুডিও তে খুজ নে।অবশ্যই ওদের কাছে নামের এন্ট্রি থাকে।আর ট্যাটু টা দেখে মনে হচ্ছে রিসেন্টলি করা হয়েছে।হাতের চামড়া এখনো লাল।আমার এতো কথা বলতে ভালো লাগছে না ইকবাল।একটা সহজ জিনিস কেনো এখন নতুন ভাবে বোঝাতে হচ্ছে তোকে?

ইকবাল সরি বলে ফোন কেটে দিতেই হাটু ভাঁজ করে ফ্লোরে বসে পড়লো ভিয়ান।দুই হাত মুঠি করে ঠোঁটের কাছে ছুঁইয়ে বলে উঠলো

“আমি তোমাকে কোথায় খুঁজবো তাথৈ?তুমি কি আদৌ ঠিক আছো?আমি যে প্রতিমুহূর্তে ভেঙে পরছি।কোথায় থেকে কি শুরু করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।

হাতের ফোনের লক খুলে পুনরায় ইকবাল কে মেসেজ পাঠালো ভিয়ান

“আগামী পরশু ঢাকা ফিরছি।এরিকের খেলা নিজ চোখে দেখা চাই।

#চলবে