#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_৩৭
#সারিকা_হোসাইন
________
সকাল থেকেই মৌটুসী দের বাড়িতে এলাহী আয়োজন চলছে।মৌটুসীর বাবা আব্দুল মতিন হাঁক ডাক পেড়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছেন।ঘুম থেকে উঠেই ভদ্রলোকের এহেন কর্ম কাণ্ডের কোনো হেতু খুঁজে পেলো না মৌটুসী।আড়মোড়া ভেঙে ইতিউতি তাকিয়ে রান্না ঘরে মায়ের কাছে এসে মৌটুসী শুধালো
“কি হয়েছে মা?বাড়িতে কিসের এতো আয়োজন?মেহমান আসবে বুঝি?
পায়েসের হাড়িতে চামচ নাড়তে নাড়তে মৌটুসীর মা রোকসানা বললেন
“তোর বিয়ের মানুষ আসবে।গত রাতেই তোর বাবার থেকে জেনেছি এই বিষয়ে।তুই ঘুমে ছিলিস তাই তোকে বলা হয়নি।
আকস্মিক বিয়ে নামক শব্দটি মৌটুসীর কানে বজ্রপাতের বিকট শব্দের ন্যয় ঠেকলো।মনে হলো সে ভুল শুনছে।তার মা হয়তো তার সাথে মজা করছে।কিন্তু রোকসানা মোটেও রসিক মানুষ নন।তার মুখ সবসময় নিমপাতার তেতো রসে ভরা থাকে।তার মানে রোকসানা যা বলছে সবই সত্যি।কিন্তু মৌটুসী ইকবাল কে পছন্দ করে।যদিও মানুষটির নাগাল সে কোনো দিনও পাবে না।কিন্তু তার মনে যেই অনুভূতি রয়েছে ইকবালের জন্য তা মুছতেও তো একটা সময়ের ব্যপার।হুট করে কিসের বিয়ের আয়োজন শুরু করেছে তার বাবা মা?
বিষন্ন মুখে শুষ্ক ঠোঁট জোড়া জিহ্বার আঠালো লালা দিয়ে ভিজিয়ে মৌটুসী রোকসানার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো
“আমি এখনই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই মা।তুমি বাবাকে বলে মানা করে দাও।আমি কিছুতেই হুট করে আনা পাত্রের সামনে যাবোনা বলে দিলাম।
পায়েসে সামান্য বাদাম কুচি ঢালতে ঢালতে চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে রোকসানা ক্লান্ত কন্ঠে বললেন
“ছেলে নাকি লাখে এক।টাকা পয়সার ও কোনো অভাব নেই।ছেলের বাবা তোকে রাস্তায় দেখে পছন্দ করেছে তাই তোর ফারুক চাচার মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।তোর বাবা কেমন এক কথার মানুষ তা তুই ভালোই জানিস।তাই বলছি সকাল সকাল বাড়িতে কোনো ঝামেলার সৃষ্টি না করে নিজ ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক।
রোকসানার থেকে পাত্তা না পেয়ে মতিন সাহেবের নিকট উপস্থিত হলো মৌটুসী।মানুষটিকে খুবই উৎফুল্ল লাগছে আজকে।বাড়ির কাজের ছেলে তুরাব কে দিয়ে বাড়ি ঘরের সমস্ত কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে করাচ্ছেন তিনি।চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে চোখে মুখে বেদনার ছাপ একে নিভু নিভু মিহি কন্ঠে মৌটুসী বলে উঠলো
“বাবা একটা কথা বলতে চাই তোমাকে।
মেয়ের পানে একবার ব্যস্ত নজর বুলিয়ে পুনরায় তুরাবের দিকে মনযোগ দিয়ে মতিন সাহেব বলে উঠলেন
“কি কথা?
বুকে সামান্য সাহস সঞ্চয় করে মৌটুসী আমতা আমতা করে বলল
“ব ব বিয়ের জন্য…..
কথা শেষ করতে পারলো না মৌটুসী।আব্দুল মতিন নাকের পাটা ফুলিয়ে ভারী কন্ঠে বলে উঠলেন
“বয়স কতো হলো তোমার?তোমার বয়সী মেয়েরা সংসার ,স্বামী বাচ্চা সব সামলিয়ে বেড়াচ্ছে সমান তালে।এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত না হলে আর কবে হবে?আমি গোরস্থানে গেলে এর পর?
টাকা ওয়ালা ছেলে পেয়ে যে বাবা মা একদম বেঁকে বসেছে এটা মৌটুসী খুব ভালো বুঝলো।তাই আর বাক্য খরচ না করে ব্যাথিত মনে নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিলো।
ধপাস করে বিছানায় চিৎ হয়ে শুতেই দুই চোখে নোনতা জলের সমাগম হলো।কিছু ভাববার আগেই তা টুপ টুপ করে নরম তোষকে বিলীন হলো।
“তবে কি তার মনের সুপ্ত অনুভূতি ইকবাল জানতেও পারবে না?
দুপুরের একটু পরপর ই গাড়ির হর্ণে বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠলো মৌটুসীর।দূতলার নিজের কক্ষের বদ্ধ বেলকনি থেকে চোরা চোখে বাইরে একবার নজর বুলালো।তার বেলকনি থেকে বাইরের গেইটের সমস্ত চিত্র স্পষ্ট।ছোট গেটটার ওপারে দুটো দামি দামি গাড়ি দাঁড়ানো।একটা কালো আরেকটা ধূসর।ধূসর রঙা গাড়ি থেকে দুজন মধ্যবয়স্ক মহিলা নামলেন।চেহারা এবং পোশাক দুইয়েই আভিজাত্যের উপস্থিতি বিদ্যমান।
কালো গাড়ির ড্রাইভার দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা মেলে ধরতেই একজন বৃদ্ধ বের হলেন ক্রাচে ভর দিয়ে।বৃদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বেরিয়ে এলো আরেকজন সুঠামদেহী পুরুষ।কালো স্যুট বুট আর বয়স্ক লোকটার আড়ালে তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না।কিন্তু দূর থেকে তার গায়ের হলদেটে ফর্সা রঙটা বেশ চোখ ধাঁধালো মৌটুসীর।হঠাতই তার বাবা আব্দুল মতিন আর তুরাব দৌড়ে গেলো মেহমান দের অভ্যর্থনা জানাতে।বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখে মন খারাপ করে বেলকনির গ্রিল ধরেই দাঁড়িয়ে রইলো মৌটুসী।
এদিকে মৌটুসীর কক্ষের দরজা ক্রমাগত পিটিয়ে চলেছেন রোকসানা।একা হাতে চার দিক সামলাতে হচ্ছে তার।আরো দু’ একটা সন্তান সন্ততি থাকলে হয়তো সবকিছু একটু সহজ হতো।কিন্তু বিধাতা দেননি।কি আর করার।
দরজায় করাঘাতের শব্দে ধ্যন ভেঙে বেলকনি থেকে দৌড়ে এসে দরজা খুলতেই রোকসানা তাড়া দেখিয়ে বলে উঠলেন
“তোর ছোট খালামনি সেবার যেই কালো পাড়ের মেরুন রঙা শাড়িটা দিয়েছিলো সেটা পরে ঝটপট রেডি হয়ে যা।মানুষ গুলো এসে পড়েছে।নাটক করে নিজের বাপের নাক কাটিস না মানুষের সামনে।
কথা শেষ হতেই চলে গেলেন রোকসানা।রোকসানার যাবার পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৌটুসী বলে উঠলো
“দেখা হলেই তো আর বিয়ে হলো না তাই না?
নিজেকে নিজেই বুঝ দিয়ে আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখা শাড়িটা বের করলো মৌটুসী।এরপর ফ্রেস হয়ে মুখে সামান্য ফেসক্রীম লাগিয়ে ঝটপট দক্ষ হাতে ম্যাচিং ব্লাউজের সাথে শাড়িটা পরে নিলো।মৌটুসীর ফর্সা শরীরে মুহূর্তেই অনিন্দ্য সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুললো শাড়ি খানা।সেফটিপিন দিয়ে ভালো করে আঁচল সেট করে সামান্য হালকা প্রসাধনী মেখে লম্বা চুলগুলো একটা বিনুনি পাকালো সে।এরপর সেই বিনুনি বুকের উপর ফেলে কপালে ছোট একটা কালো টিপ পরলো।চোখে মোটা কাজলের রেখা টেনে নিজেকে একবার আয়নায় পরখ করলো।এরপর্ তাচ্ছিল্য হেসে বলে উঠলো
“এভাবেই একদিন আপনাকে আকৃষ্ট করার জন্য সেজেছিলাম আমি।অথচ আপনি তাকিয়েই দেখেননি।আমার অব্যাক্ত অনুভূতি গুলো আমার কাছে আজীবন জমা থাকবে।আমার জীবনে চূড়ান্ত ভালো লাগার পুরুষ আপনি ইকবাল ভাই।বিয়ের পর অন্য কারো ঘরে গেলে হয়তো সেই মানুষটি ই আমার সব কিছুর দখলদার হবে।কিন্তু সে কি আপনার স্থান টা নিতে পারবে?প্রথম ভালো লাগার অনুভূতি কি দ্বিতীয়বার পাওয়া যায়?
“সে কি এখনো সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছিস?
রোকসানার প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠলো মৌটুসী।এরপর ইতস্তত করে ফট করে বলে উঠলো
“আমি তো তৈরি হয়েই গেছি মা।আর কি করবো?
মেয়েকে একবার ভালো করে পরখ করে রোকসানা বললেন
“সুন্দর একটা লিপস্টিক দে ঠোঁটে।
রোকসানার কথায় নিরুপায় এর ন্যয় মৌটুসী কাতর কন্ঠে ডেকে উঠলো
“বাদ দাওনা মা…কেনো জোর করছো?
কিন্তু রোকসানা মেয়ের রঙ ঢং এ পাত্তা দিলেন না।সাজগোজ এর জিনিস ঘেঁটে একটা নুড কালার এর লিপস্টিক মৌটুসীর হাতে গুঁজে দিয়ে বলে উঠলেন
“এটা লাগিয়ে আমার সাথে চল।সকলেই তোকে দেখতে চাইছেন।
অতি নিরুপায় হয়ে লিপস্টিক মেখে মাথা নিচু করে রোকসানার পিছু পিছু ছুটলো মৌটুসী।
এদিকে তুরাব ছেলেটি এক হাতে মেহমান দের চা নাস্তার আপ্যায়ন শেষে সব কিছু গুছিয়ে দুপুরের খাবারের পশরা গুছাতে ব্যস্ত হলো।ঢিপ ঢিপ বক্ষে সিঁড়ি বেয়ে রোকসানার সাথে নেমে এলো মৌটুসী।ড্রয়িং রুমে এসেই মায়ের শেখানো বুলি আওড়ালো
“আসসালামুয়ালাইকুম”
মহিলা দুটো আর বয়স্ক লোকটি সালাম ফিরিয়ে বলে উঠলেন
“বসো মা।
মাথা নিচু করেই পাশের একটি সোফায় বসলো মৌটুসী।এবং সে মনে মনে ভাবলো এখনই তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে পাগল করে তুলবে এই বয়স্ক মানুষ গুলো।কিন্তু মৌটুসী কে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বয়স্ক লোকটি বলে উঠলেন
,আমরা মেয়েটাকে অহেতুক প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চাইনা মতিন সাহেব।মেয়ে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে।যদি আপনারা কিছু মনে না করেন তাহলে ছেলে মেয়ে দুটোকে একান্তে কথা বলতে দিয়ে তাদের মতামত জানাই উত্তম কাজ হবে বলে আমি মনে করি।
ভদ্রলোকের কথায় মতিন সাহেব তাল মেলালেন।এরপর মেয়েকে নির্দেশ দিলেন
“তোমার ঘরে যাও মৌটুসী।নিজের মনের ব্যক্তিগত কোনো প্রশ্ন থাকলেও করে নিতে পারো।
বাবার আদেশ পেয়ে মাথা নিচু রেখেই উঠে এলো মৌটুসী।মৌটুসীর পেছন পেছন হাঁটা ধরলো উক্ত পুরুষ।ভয়ে জড়সড় হয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে লাগলো মৌটুসী।লজ্জা আর ইতস্তায় মাথা নুয়ে আসছে তার।এছাড়াও নিজ বাপ মায়ের উপর রাগের চোটে শরীর ফেটে ফানা ফানা হচ্ছে তার।মৌটুসী মনে মনে ভাবলো যদি পাত্র তার পছন্দ না হয় তবে একটা ভুজুং ভাজুং বলে বিয়েটাই ভেস্তে দেবে সে।দরকার পড়লে নিজের বাপের থেকে রেহাই পাবার জন্য পাত্রের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পরবে সে ।তবুও নিজের অমতে কাউকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
নানান আগডুম বাগডুম ভাবনা ভাবতে ভাবতেই নিজের কক্ষের সামনে এসে দাড়ালো মৌটুসী।এরপর কক্ষে প্রবেশ করতে করতে মিহি গলায় বললো
“ভেতরে আসুন।
আগত পুরুষ বিনা বাক্যে পেছন পেছন কক্ষে প্রবেশ করতেই মাথা নিচু রেখেই ওপর পাশে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মৌটুসী।তার নিজের ব্যাক্তি গত কোনো প্রশ্ন নেই।কিন্তু লোকটি তাকে কি প্রশ্ন করে সেটাই দেখার বিষয়।
এভাবেই কিছু সময় কেটে যাবার পর সকল নিস্তব্ধতা ভেঙে ভরাট দরদ ভরা স্বরে মানুষটি শুধালো
“আমাকে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই তো তোমার মৌটুসী?
আকস্মিক পরিচিত জবানে থরথর করে কেঁপে উঠলো মৌটুসী।শরীর তার ভার ছেড়ে দিতে চাইলো।ইষৎ ফাঁকা হলো ফিনফিনে ঠোঁট দুটো।কিন্তু কোনো শব্দ বেরোলো না।শক্ত হলো হাতের মুঠি দ্বয়।চোখ দুটোও বুঝি ছলছলে হলো।মানুষটি আরেকটু কাছে এগিয়ে এসেছে।তার গায়ের পুরুষালি মাদকতা মিশ্রিত সুবাস খুব করে মৌটুসীর নাসারন্ধে বাড়ি খাচ্ছে।মৌটুসীর নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সহ্য হলো না কঠিন পুরুষটির।তার হৃদয় ভেঙে খান খান হতে চাইছে।অজানা ভয় চারদিক থেকে তাকে গ্রাস করেছে।মৌটুসী যদি তাকে প্রত্যাখ্যান করে তবে এখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দেবে সে।মনের গোপন কুঠুরিতে অনেক গোপন রাখা হয়েছে এই ভালোবাসা ময় অনুভূতি।এবার আর তা প্রকাশ না করে বাঁচতে পারবে না ইকবাল।যদি মৌটুসী সেই অনুভূতি না জানতে চায় তবে কি উপায় হবে তার?
কাঁপা কাঁপা হাত খানা মৌটুসীর পানে বাড়িয়ে আবার গুটিয়ে নিলো ইকবাল।এভাবে চাইলেই মেয়েটিকে সে ছুঁতে পারেনা।কিন্তু মেয়েটি তার দিকে ফিরছে না কেনো ?
অধৈয্য হয়ে পুনরায় ভয় মিশ্রিত কন্ঠে ইকবাল বলে উঠলো
“তোমার কি অন্য কাউকে পছন্দ আছে মৌ?
ইকবালের এহেন প্রশ্নে ছলছল চোখে ইকবালের পানে ফিরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মৌটুসী।পাত্র হিসেবে ইকবাল কে সামনে দেখতে পাবে এটা তার কাছে দুঃসপ্নের মতো।ইকবাল কে ঘিরে হাজারো সুখময় অনুভূতি রয়েছে মৌটুসীর মনে।যা আজো কেউ জানেনা।মৌটুসী জানতেও দেয়নি।আজ মানুষটা নিজে থেকেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।এই প্রস্তাব ফিরানোর সাধ্য আছে কি মৌটুসীর?এদিকে মৌটুসীর কান্নায় বুক ভার হয়ে উঠলো ইকবালের।ইকবাল ভাবলো হয়তো মৌটুসীর অন্য কোথাও ভালো লাগার মানুষ রয়েছে।তাই মৌটুসী কে বিরক্ত না করাই উত্তম মনে করলো ইকবাল।নিজের মনের কষ্ট লুকিয়ে ভাঙা গলায় ইকবাল বললো
“কেঁদোনা মৌটুসী।আসলে ভুলটা আমার,না জেনে বুঝেই তোমাকে আপন করার দুঃস্বপ্ন দেখে ফেলেছি।তুমি ভয় পেয়ো না।আমি সুকৌশলে বিয়ে ভেঙে দেবো।আসছি,ভালো থেকে।
কথা গুলো বলতে বলতে ইকবালের গলা ধরে এলো।তবুও নিজেকে যথেষ্ট শক্ত রেখে কথা গুলো বলে কক্ষ ত্যাগ করতে চাইলো ইকবাল।কিন্তু তার আগেই ইকবালের শার্ট খামচে ধরে মৌটুসী বললো
“আমি আপনাকে ভালোবাসি ইকবাল ভাই।সে আরো বছর দুয়েক আগে থেকে।আমার জীবনে আপনিই একমাত্র পুরুষ যাকে আমার সব সময়ই ভালো লাগে।বামন হয়ে চাঁদে হাত দিলে যে হাত ঝলসে যায়।সেই ভয়ে আমি আপনার প্রতি জন্মানো আমার সকল অনুভূতি মাটি চাপা দিয়েছি।আপনাকে বিয়ে করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।আপনি যে আমার না বলা ভালোবাসা ইকবাল ভাই।
********
পেরিয়ে গিয়েছে তিনটি দিন।এই তিনদিনে কমপক্ষে বিশ বারের বেশি ভিয়ান নাওয়াফ এর বাংলোর সামনে এসে অপেক্ষা করছে রেইন।শুধু কি তাই?কারী কারী টাকা খরচা করে লাগিয়ে রেখেছে গুপ্তচর।কিন্তু তার এই জাসুস গুলো এখনো সেরকম কোনো প্রসন্ন জনক খবর তাকে দিতে পারেনি।এই তিনদিনে না কেউ এই বাড়ির গেট খুলেছে আর না কোনো অতিথি এসেছে।রেইন খুজ নিয়ে জেনেছে বাড়িটি ভিয়ানের বাবার।এবং ভিয়ান নাওয়াফ এখানকার নাগরিক।ভিয়ানের নিকট আত্মীয় স্বজন দের খুজ ও গোপনে গোপনে নিয়েছে সে।সেখানেও ফলাফল শূণ্য।নিজের চিড়বিড়িয়ে উঠা রাগ কোনো মতেই আয়ত্তে আনতে পারছে না রেইন।তার মনে হচ্ছে ভিয়ান নাওয়াফ এর রক্তাক্ত কুচি কুচি দেহ জার্মান সেপার্ড দিয়ে খাওয়াতে পারলে মনে কিঞ্চিৎ প্ৰশান্তি মিলতো।আর তাথৈ কে হঠাৎই তার কাছে নিয়ে যাবার কারন ই বা কি?কোথাও এই ভিয়ান নাওয়াফ ই তাথৈ এর প্রাক্তন নয় তো?
কিন্তু রেইন এরিকের থেকে জেনেছে তাথৈ এর প্রাক্তন গাড়ি এক্সিডেন্ট এ মারা গিয়েছে।তবে কি এখানেও গভীর কোনো সুড়ঙ্গ আছে?ঘটনার পেছনে অনেক ঘটনা থাকে।যে করেই হোক এরিকের থেকে যোগাযোগ করে জানতে হবে তাথৈ এর প্রাক্তন এর নাম কি ছিলো।যদি সেটা ভিয়ান নাওয়াফ ই হয় তবে বুঝতে হবে খিলাড়ি খুবই পাকা।
#চলবে…..
#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_৩৮
#সারিকা_হোসাইন
_________
ব্ল্যাক টাউন,সিডনি।
সিডনির অন্যতম পাপাচারের রাজত্ব হিসেবে ব্ল্যাক টাউন বেশ প্রসিদ্ধ।এখানে এমন কোনো অন্যায় কাজ নেই যা সম্পন্ন হয় না।ড্রাগ সাপ্লাই,স্মাগলিং থেকে শুরু করে ফলস পাসপোর্ট, ফলস ভিসা এমনকি কিলিং ডিলিং পর্যন্ত প্রকাশ্যে চলে এই ব্ল্যাক টাউনে।আর এই ফলস পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে এই শহরে সবচেয়ে নামজাদা ব্যাক্তি হচ্ছে ডেভিড ওয়াটসন।তার হাতের তৈরি পাসপোর্ট দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা জেরক্স এবং কোনটা অরিজিনাল।ডেভিড তার এই কাজের জন্য গুনে থাকেন হাজার হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার।যত গুড় ততো মিষ্টি প্রবাদের ন্যয় জতো টাকা ততো গুছানো চাকচিক্যে ভরা পাসপোর্ট।শুধু তাই নয় প্রত্যেকটি এয়ারপোর্ট এর ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে পুলিশের সাথে পর্যন্ত তার হাত রয়েছে।পাসপোর্ট এ একটি বিশেষ চিহ্ন দেয়া থাকে।যা দেখে সহজেই বোঝা যায় ব্যাক্তিটি ডেভিডের মাধ্যমে এসেছে।ইমিগ্রেশন অফিসার অল্প নজর বুলিয়েই তার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে নেক্সট হাকেন।
মধ্য গগনের সূর্যটা যখন পশ্চিম আকাশে অস্ত যাবার জন্য তৈরি হলো ঠিক সেই সময়ে অভীক কে সাথে নিয়ে ব্ল্যাক টাউনে ডেভিড ওয়াটসন এর ছোট খুপরির ন্যায় বাড়িতে প্রবেশ করলো ভিয়ান।ভিয়ানকে চিনতে এক মুহূর্ত সময় অপচয় করলো না এই চতুর মাঝবয়সী ডেভিড।বিভিন্ন সময়ে টিভিতে দেখা হয়েছে এই যুবক কে।এক সময় সিডনি এভরিডে চ্যানেল এর প্রিয়মুখ ছিলো এই ভিয়ান নাওয়াফ।পরিশ্রমের মাধ্যমে কিভাবে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করতে হয় তার আলোচনা নিয়েই টক শো তে এটেন্ড করতো এই যুবক।সেই সময়ে হাজারো তরুণীর ক্রাস ছিলো ভিয়ান নাওয়াফ।শুধু তাই নয় তরুণ প্রজন্ম তাকে আইডল মানতে শুরু করেছিলো ।কিন্তু হঠাৎ কি এমন হয়েছিলো যার জন্য এই পুরুষটিকে আর কখনোই টিভিতে দেখা যায়নি।শুধু তাই নয় বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গিয়েছে সে আর অস্ট্রেলিয়া তে থাকেই না।হঠাৎ কেনো এই যুবক অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করেছিলো?আর বছর দুইয়েক পর এই মাঝবয়সী ডেভিড ওয়াটসনের কাছেই বা তার কি কাজ?
নিজের বিষ্ময় ভাব কাটিয়ে চশমাটা ঠিক করে চোখে পরে ভিয়ানের পানে তাকিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে শুধালো
“হুয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?
ডেভিডের প্রশ্নে পাশে থাকা একটা স্টিলের চেয়ার টেনে আয়েশ করে বসে পড়লো ভিয়ান।এরপর অভীক কে ইশারা দিতেই একটা ব্ল্যাংক চেক এগিয়ে ডেভিডের সামনে মেলে ধরলো অভীক।বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সেই চেক হাতে নিয়ে সামান্য নজর বুলালো ডেভিড।চেকটিতে ভিয়ান নাওয়াফ এর সিগনেচার চকচক করছে।কিন্তু এই বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী হঠাৎ তাকে চেক কেনো ধরিয়ে দিচ্ছে তার হেতুই বুঝতে পারলো না।ডেভিডের অপ্রস্তুত মুখের পানে তাকিয়ে বিগলিত হাসলো ভিয়ান।এরপর ভরাট গলায় বলে উঠলো
“এন্টার দ্যা এমাউন্ট অফ মানি এজ ইউ লাইক”
চেক উল্টে পাল্টে ডেভিড পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লো
“বাট হুয়াই?
“কজ আই নিড ইউর হেল্প।
কথাটি বলেই তাথৈ এর একটা ছবি আর কিছু ইনফরমেশন ডেভিডের পানে এগিয়ে দিয়ে ভিয়ান বলে উঠলো
“ইউ আর গিভেন থ্রি ডেইজ ফর ডিজ জব।
আসল ঘটনা খোলাসা হতেই ডেভিড বলে উঠলো
“দো ইটজ এ ভেরি হার্ড জব বাট আ উইল ট্রাই।
টেবিলে চাপড় মেরে ভিয়ান দাঁড়িয়ে ডেভিডের সামনে গিয়ে বলে উঠলো
“নট ট্রাই।ইউ হ্যা টু ডু ইট।
ভিয়ানের মুখের কাঠিন্যতা দেখে ডেভিড উপলব্ধি করলো বিষয়টা সিরিয়াস।সে তাথৈ এর ছবি আর ইনফরমেশন গুলো হাতে নিয়ে বলে উঠলো
“ওকে, ডোন্ট ওয়ারী।
*********
ভিয়ানের এই ছোট বাড়িটাতে বেশ সুখেই দিন কাটছে তাথৈ এর।নুরজাহান আর আলবার্ট খুবই মিশুক প্রকৃতির ভালো মানুষ।নুরজাহান বেশ করে আগলে নিয়েছে তাথৈকে।ভিয়ানের থেকে যবে থেকে নুরজাহান শুনেছে তাথৈ এর বাবা মা নেই।তবে থেকেই মাতৃ ছায়ায় তাথৈকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে এই বৃদ্ধা।রাতের খাবার তৈরির জন্য নুরজাহান এর সাথে সাথে কাজে হেল্প করছে তাথৈ।ভিয়ানের বাবা মার বিষয়েই আলাপ হচ্ছিলো তাদের মধ্যে।কথায় কথায় নুরজাহান জানালো ভিয়ানের বাবা শাহরিয়ার নাওয়াফ খুবই সুদর্শন এক পুরুষ ছিলেন।কোটি পতি বাবার একমাত্র ছেলে হবার সুবাদে এখানে এসে পড়াশুনা করতেন ভদ্রলোক ।ভার্সিটির নিজের ক্লাসমেট অস্ট্রেলিয়ান কন্যা মেলিনার সাথে হঠাৎই তার পরিনয় ঘটে।মেয়েটি শাহরিয়ার নাওয়াফ এর জন্য এতটাই পাগল হয়ে যান যে নিজের কাস্ট ত্যাগ করে মুসলিম হয়ে শাহরিয়ার নাওয়াফ কে লুকিয়ে বিয়ে পর্যন্ত করে ফেলেন।ভিয়ানের দাদা বিষয়টা মেনে নিলেও মেলিনার বাবা আর ভাইয়েরা বিষয়টা কখনোই মানতে পারেননি।মেলিনার বাবা ছিলেন সিডনির খুবই প্রভাবশালী একজন মানুষ।সুযোগ পেলেই তিনি শাহরিয়ার নাওয়াফ এর ক্ষতি করার চেস্টা করতেন এবং বহু বার মেলিনাকে ফুসলিয়ে নিজেদের কাছে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন।বিদেশি মেলিনা নিজের বাবা আর ভাইয়ের এহেন কৃতকর্ম দেখে অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পতিত হন।শুধু তাই নয় ধীরে ধীরে মেন্টালি সিক হতে শুরু করেন মেলিনা।বেশ কয়েকবার শাহরিয়ার নাওয়াফ কে হত্যা করার জন্য পর্যন্ত কিলার হায়ার করেছিলেন মেলিনার বাবা।পরে অবশ্য জানা গিয়েছিলো মেলিনাকে বিয়ের জন্য মেলিনার বাবা এমন করছেন না।মেলিনার ভাইয়ের সাথে শাহরিয়ার নাওয়াফ এর পূর্ব দ্বন্দ ছিলো।সেই জেদের বহিঃপ্রকাশ এই এমন ঘৃণিত কাজ করেছেন ওই পরিবার।সময়ের সাথে পাল্টা পাল্টি আক্রমণ এর খেলা শুরু হলো।ভিয়ানের চাইতেও জেদি ছিলো তার বাবা।এগুলো দেখতে দেখতে মেলিনা ডিপ্রেশনে চলে যান।
শেষমেশ ভিয়ান পেটে আসায় সমস্ত ঝামেলা থেকে মেলিনাকে চিন্তামুক্ত রাখার জন্য এই ছোট বাড়িটি মেলিনাকে কিনে দিয়েছিলেন শাহরিয়ার নাওয়াফ।আর নুরজাহান কে রাখা হয়েছিলো মেলিনার দেখ ভালের জন্য।খুবই সুশ্রী আর কোমলমতি ছিলেন মেলিনা।এই বাড়িতে শাহরিয়ার নাওয়াফ সপ্তাহে দু’বার আসতেন।কিন্তু যতবার আসতেন তাকে খুব বিমর্ষ আর ক্লান্ত লাগতো।যিনি তোমাদের বিয়ে পড়িয়েছেন সুলতান সাহেব একমাত্র তিনিই ছিলেন ভিয়ানের বাবার খাস বন্ধু।সকল গোপনীয়তা শাহরিয়ার নাওয়াফ তাকেই জানাতেন।মেলিনাকে কিছু বুঝতে না দিলেও চতুর মেলিনা বুঝতে পেরেছিলো সামনে খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে।হলো ও তাই।
ভিয়ানের বয়স যখন তিন তখনই কেউ শুট করে দেন শাহরিয়ার নাওয়াফ কে।অফিসে যাবার পথে রাস্তাতেই মৃত্যু হয় তার।এই খবরে মেলিনা উন্মাদ হয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বেরিয়ে যান বাসা থেকে আর ভিয়ান ছিলো আমার কাছে।সেই যে মেলিনা গেলো আর কখনো তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।এদিকে পুত্র শোকে ঢাকাতেই স্ট্রোক করে মারা যান ভিয়ানের দাদা।
ছোট ভিয়ানকে সেই সময় দেখার জন্য কেউ ছিলো না।সুলতান শরাফত এর কাছে ভিয়ানের বাবা কি বলে গিয়েছিলো এসব আমরা জানিনা।কিন্তু বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় ভিয়ান বড় হলে সমস্ত সম্পত্তি ভিয়ানকে পাবার ব্যাবস্থা করেছিলেন ওই ভদ্রলোক ।পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত ভিয়ান আমার কাছে ছিলো।এরপর হোস্টেলে থেকে সে পড়াশোনা করে বড় হয়েছে।ভিয়ানের জীবনে সুলতান সাহেবের অবদানের কোন শেষ নেই।
কথা গুলো বলতে বলতে হুহু করে কেঁদে ফেললেন নুরজাহান।আরো অনেক কথাই বলতে চাইলেন।কিন্তু আর কিচ্ছু বলতে পারলেন না কান্নার দমকে।ভিয়ানের জীবনের এতো এতো কঠিন সত্য জানতে পেরে তাথৈ এর দুই চোখের কোল ঘেঁষে মোটা মোটা অশ্রু দানা খসে পড়তে লাগলো।এই জীবনে তাথৈ নিজেকেই সবচেয়ে দুঃখী মানুষ বলে মনে করতো ।কিন্তু তার থেকেও দুঃখী ভিয়ান এটা সে মানতেই পারছে না।যেই মানুষটা সারাক্ষন অন্যকে ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় অথচ সেই মানুষটা আদেও ভালো আছে কি না এই খুজ কখনোই নেওয়া হয়নি।তবে কি স্ত্রী হিসেবে তাথৈ ব্যার্থ?
*********
রাতের ঘন আধার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই ব্ল্যাক টাউন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো।দিনে যেই শহর ধুধু মরুভূমি তুল্য রাতের আধারে তা জন মানবে পরিপূর্ণ।নিজের কালো কাজকে সাদা করতেই এখানে আগমন ঘটে মানুষের।সাধারণ মানুষের চাইতে বিত্তশালীদের ভিড় ই যেনো বেশি।
অভীক কে নিয়ে যখন ভিয়ান ডেভিড এর বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো ঠিক সেই মুহূর্তে কালো পোশাকধারী এক লোক কে দৌড়ে পালাতে দেখলো ভিয়ান।লোকটিকে ধরার জন্য অভীক নিজেও দৌড় দিতে চাইলো কিন্তু ভিয়ান তাকে থামিয়ে বলে উঠলো
“যেও না অভীক ওকে আমি চিনি।
ভিয়ানের মুখের উত্তরে বাঁকা ভ্রু সরু হলো অভীকের।চোখে মুখে বিষ্ময় ভাব ফুটিয়ে অভীক শুধালো
“লোকটির মুখে মাস্ক আর মাথায় ক্যাপ আছে স্যার।আপনি যাকে ভাবছেন সে নাও হতে পারে।
স্মিত বাঁকা হেসে ভিয়ান বললো
“ভিয়ান নাওয়াফ একবার যাকে নজর বুলায় তাকে আজীবন মনে রাখে।ওর নাম ড্যান।আয়াজ আমিরের বিশ্বস্ত জাসুস।আমি ওকে সাধারণ জাসুস ভেবে আগের বার ছেড়ে দিয়েছিলাম।কিন্তু বার বার একই অন্যায় সহ্য করতে একটু কষ্ট হয় অভীক।
“তাহলে এখন কি করবো স্যার?
অধিক শীতল আবহাওয়ায় শরীরের উত্তাপ বাড়াতে লাইটার দিয়ে একটা সিগারেট ধরালো ভিয়ান।সেটাতে লম্বা এক টান দিয়ে কুয়াশার মাঝে ধুয়া বিলীন করে ফিচেল হেসে বলে উঠলো
“নিজের প্রিয়জনদের মাঝে তৃতীয় ব্যাক্তির বা হাত ঢুকানো খুবই অপছন্দ আমার অভীক।একবার এই ভুল আমার মামারা করেছিলো।মাকে আমার থেকে আলাদা করে।সহ্য করতে করতে এক প্রকার বাধ্য হয়েই দুই মামাকে খুব নৃশংস ভাবে দুনিয়া ছাড়া করলাম।মৃত্যুর আগে মামা বাঁচার খুব চেষ্টা করেছিলো।কিন্তু আমার মতো জানোয়ারের হাত থেকে মুক্তি কি ওতো সহজ?এখন আবার জীবনে আমার স্ত্রী জুড়েছে।রেইন কে তো আমি দেখে নেবোই তার আগে এই জাসুস এর খেল খতম করা জরুরি।
অভীক ভীত কন্ঠে বললো
“ও তো পালালো স্যার।
অভীকের কথায় সিগারেট খানা পায়ে ডলে দাঁতে দাঁত পিষে ভিয়ান বলে উঠলো
“পালাতে দিলে তবেই না পালাবে অভীক।চলো একটা কার রেস খেলি।
ফাঁকা ঢোক গিলে অভীক বলে উঠলো
“আমি সহ্য করতে পারবো না স্যার।
তাচ্ছিল্য হেসে গাড়িতে উঠে বসলো ভিয়ান।গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলে উঠলো
“লাস্ট বার কখন গান লোড করেছো?
দুই হাতের আজলায় মুখ মুছে অভীক বলে উঠলো
“আজ সকালেই স্যার।টুল বক্স খুললেই পাবেন।
নিজের থাম্ব দেখিয়ে অভীক কে গুড বলে সাই সাই করে ছুটে চললো ভিয়ান।ড্যানের সাথে কি হতে যাচ্চে অভীক তা নিশ্চিত ভাবে জানে।ভয়ে অভীকের বেশ পিপাসা পেয়ে গেলো।এই গোলকধাঁধার শহরে আজই নতুন এসেছে সে।বের হবার রাস্তা পর্যন্ত তার অজানা।চারপাশ থেকে মেয়ে গুলো বাজে ইঙ্গিতে সমানে তাকে ডেকে চলেছে।মাতাল ড্রাগ এডিক্টেড মানুষ গুলো ভয়ংকর ভাবে তাকে ঘুরে ঘুরে দেখছে।যখন তখন ঘটে যেতে পারে যে কোনো কিছু।এমন একটি জায়গায় ভিয়ান তাকে ফেলে চলে গেলো!ভয়ে কান্না আসার উপক্রম হলো অভীকের।চাকরি নেবার আগেই কেউ একজন তাকে বলে ছিলো
“যার আন্ডারে যাচ্ছ সে কিন্তু হার্টলেস।
অভীক সেসব কথা তখন পাত্তা দেয়নি।ওতো বড় কোম্পানির মালিকের সেক্রেটারী হওয়া সৌভাগ্য মনে করেছিলো সে।চাকরির প্রথম প্রথম খুব ভালো কাটলেও ধীরে ধীরে ভিয়ানের যেসব রূপ অভীক দেখেছে তাতে তার রূহ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে।দেখতে যতোটা ইনোসেন্ট ভেতরে ততোটাই হিংস্র।তবুও ভিয়ানের প্রতি অভীকের সম্মান এক বিন্দু খসেনি।কারন এই মানুষটির কারনে অভীক কখনো কোনো বিপদের সম্মুখীন ই হয়নি।কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আর রক্ষে নেই।মেয়ে গুলি বুঝি তাকে খুবলে খেয়েই ছেড়ে দেবে।
নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতে একটা ভাঙা পাথুরে দেয়ালে বসে পড়লো অভীক।প্রতিটা সেকেন্ড যেনো তার কাছে হাজার বছরের সমান মনে হচ্ছে আজ।মেয়ে গুলোর বিশ্ৰী স্বরের ডাকাডাকি তে কানে আঙ্গুল গুঁজে চোখ বন্ধ করে বসে রইল অভীক ।কারন সে জানে ভিয়ান তাকে ঠিক নিতে আসবে।
কতো সময় গড়ালো অভীক তার খেয়াল রাখলো না।হঠাৎ পরিচিত গাড়ির হর্ণে ধ্যান ভাঙলো অভীকের।চারপাশে ভীত নজর বুলিয়ে দৌড়ে ভিয়ানের পাশের সিটে বসতেই একটা পানির বোতল এগিয়ে ভিয়ান বলে উঠলো
“খুব ভয় পেয়েছো?
শুকনো খটখটে গলায় পানি চালান করে অভীক বলে উঠলো
“আরেকটু হলেই মেয়ে গুলো আমায় পিষে দিতে স্যার।
অভীকের কথায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো ভিয়ান।
“ড্যান কে খুঁজে পেয়েছিলেন স্যার?এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন যে?
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে ভিয়ান বলে উঠলো
“গাড়িটা বড্ড জোরে চলছিলো অভীক।হঠাতই বিড়াল কুকুরের মতো পিষে গেলো।আর্তনাদ টুকু করতে পারলো না।কোনো আনন্দই হলো না আজ।
বিস্ফারিত চোখে অভীক জিজ্ঞেস করলো
“স্যার আপনি আদৌ কোনো সাধারণ মানুষ তো!
“শরীরটাই মানুষের, ভেতরের সবকিছু পশুর।হৃদয় টা আর নরম নেই অভীক।জীবনের চড়াই উৎরাই এ পাথরের থেকেও কঠিন হয়ে গেছে।বাকি কথা আরেকদিন হবে।বাসায় চলো।তোমার ম্যাডাম একা থাকতে পছন্দ করে না।
“যদি তাথৈ ম্যাম কোনো দিন এসব জেনে যায় তখন কি হবে স্যার?
“জানতে দিলে তবেই না জানবে অভীক।
আর কথা বাড়লো না অভীক।চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিলো।
অভীকের পানে তাকিয়ে ভরাট শক্ত কন্ঠে ভিয়ান বলে উঠলো
“গাড়িটা রক্তে রঞ্জিত।গাড়িটা নিয়ে ওই বাসায় যাবো না।গাড়িটা ভালো ভাবে ওয়াশের ব্যবস্থা করবে।
তড়িৎ গতিতে চোখ মেলে অভীক অসহায়ের ন্যয় বলে উঠলো
“স্যার”!
#চলবে……