বছর দুয়েক পর পর্ব-৩৯+৪০

0
179

#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_৩৯
#সারিকা_হোসাইন

ফরেস্ট পাথ ঘন বন এলাকায় রাতটা যেনো একটু আগেই নামে সেই সাথে হিমবাহের তীব্রতা অন্যান্য এলাকার তুলনায় একটু বেশিই।চারপাশে আধার নামার সাথে সাথেই সমস্ত প্রকৃতি নিস্তব্ধতার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নেয়।এখানে সন্ধ্যা ঘনাবার সাথে সাথেই বন্য নেকড়ের হাউলিং শুরু হয়ে যায়।করুন ভয়ানক সেই হাউলিং এ কলিজা পর্যন্ত কেঁপে উঠে থেকে থেকে।

রাতের খাবার প্রস্তুত করে ঘরের সমস্ত কাজ গুছিয়ে নুরজাহান আর আলবার্ট বিদেয় নিয়েছে কিছুক্ষন আগেই।বাংলোর বাইরেই তাদের ঘর সেজন্য তাথৈ আর অমত করেনি।তাছাড়া এই শীতের মধ্যে বুড়ো মানুষ দুটো কতোই বা রাত জাগবে?
ঘড়ির কাঁটায় রাত ন’টা বেজে পঞ্চাশ মিনিট।হিসেব মতো গভীর রাত নয়।কিন্তু গহীন নিস্তব্ধতায় মনে হচ্ছে গভীর শুনশান রাত।নিজ কামরায় বসে বসে ভিয়ানের আগমনের অপেক্ষা করছে তাথৈ।তার কাছে কোনো ফোন নেই জন্য একটা খুজ পর্যন্ত নিতে পারছে না সে।আজকাল অযথাই হৃদয়ে কামড় দেয়।অজানা ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়।যতোক্ষণ ভিয়ান পাশে থাকে ততোক্ষণ কোনো দুশ্চিন্তা ছুঁতে পারেনা তাথৈকে।কিন্তু ভিয়ান চোখের আড়াল হলেই হৃদপিণ্ড কচলায়।
বিছানা ছেড়ে কক্ষের মেঝেতে পায়চারী শুরু করলো তাথৈ।নুরজাহান এর কাছ থেকে ভিয়ানের অতীত জানবার পর থেকেই দুদণ্ড শান্তিতে বসতে পারছে না সে।ভিয়ান বলেছিলো তার বাবা মা কার এক্সিডেন্ট এ মারা গিয়েছে।কিন্তু নুরজাহান বলছে অন্য ঘটনা।ভিয়ানের বাবা মারা গেলেও মায়ের কোনো তথ্য জানা যায়নি।আদৌ কি তিনি বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন?ভিয়ান কি কখনো তার মাকে খুঁজেনি?

মেলিনাকে জড়িয়ে হাজারো প্রশ্নের ঘুরপাক খাচ্ছে তাথৈ এর মাথা জুড়ে।সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ভিয়ানের কাছে আছে।উত্তর গুলো তাথৈ এর জানা খুব জরুরি।অর্ধ সত্য কথা বড়োই ভয়ংকর।পুরোটা না শোনা পর্যন্ত শান্তি নেই।সারাক্ষন কথা গুলো পেটে মুড়িয়ে মুড়িয়ে যন্ত্রনা দেয়।বমির উদ্রেক করে।বুকে খিল দেয়।পুরোটা জানলে তবেই মিলে শান্তি।
বিবিধ ভাবনার মাঝে হঠাৎই কলিংবেল বেজে উঠলো।চিন্তায় ডুবে থাকার দরুন কলিং বেল এর শব্দে হকচকিয়ে উঠলো তাথৈ।ছোট হৃদপিণ্ড থরথর করে কেঁপে ধকধক শব্দের আওয়াজ তুললো।নিজেকে কোনো মতে ধাতস্থ করে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ড্রয়িং রুমে নেমে এলো তাথৈ।এরপর ডোর ভিউয়ার এ কাংখিত মানুষটির ক্লান্ত চেহারায় নজর বুলিয়ে ঝটপট দরজা খুলে দিলো।
সারাদিন বাদে ভিয়ানের দেখা পেয়ে তাথৈ এর হৃদয় জুড়ে শীতল বাতাস বইলো।দুকদম এগিয়ে গিয়ে ভিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে চোখ বুজে ভিয়ানের প্রশস্ত বুকে পরে রইলো কিছুক্ষন।প্রাণ বধূর এহেন ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ভিয়ান তার বলিষ্ঠ দুই হাতে তাথৈকে আগলে নিয়ে কোলে তুলে ফেললো।এরপর দরজা আটকে নিজেদের কক্ষের দিকে পা বাড়ালো।

পুতুলের ন্যায় ছোট শরীরের তাথৈকে অবলীলায় নিজেদের বেড রুমে এনে বিছানায় বসালো ভিয়ান।এরপর হাটু মুড়ে বসে তাথৈ এর কোমড় জড়িয়ে আদুরে স্বরে বলে উঠলো

“প্রচন্ড বিজি ছিলাম জান।তোমার ফলস পাসপোর্ট ভিসা এগুলো নিয়ে কাজ করতে করতে সারাদিন কেটে গেলো।হাজার বার মিস করেছি তোমায়।কিন্তু আমাদের তো দ্রুত ফিরতে হবে বলো?

ভিয়ানের শীতল ক্লান্ত মুখশ্রী তে উষ্ণ চুমু আকলো তাথৈ।এরপর মাথার এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলে উঠলো

“সারাদিন কিছু খাওয়া হয়েছে?নাকি খালি পেটেই কাজ করে বেড়িয়েছো?

ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষন তাথৈ এর পানে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিয়ে ভিয়ান বলে উঠলো

“যা খেয়েছি তাতে পেট ভরেনি।লোভনীয় খাবার বাড়িতে রেখে বাইরের ওসব খাবারে পেট ভরে বলো?

ভিয়ানের এসব দুস্টু কথায় মোটেও হাসলো না তাথৈ।বিষয়টা ভিয়ানের চোখ এড়ালো না।নিজের হাতের আজলায় তাথৈএর শুকনো মুখ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো

“কি হয়েছে বউ?তোমার শরীর খারাপ?তুমি ঠিক আছো তো?

ভিয়ানের দরদে আইসক্রিম এর মতো গলে গেলো তাথৈ।নিজের কান্নাকে বহু কষ্টে রোধ করে ছলছল চোখে ভিয়ানের পানে তাকালো তাথৈ।এরপর ভিয়ানের দুই হাতে চেপে ধরে ভাঙা স্বরে বলে উঠলো

“নুরজাহান আন্টির থেকে তোমার অতীত শুনেছি।ওগুলো শোনার পর থেকে শুধু কান্না পাচ্ছে।খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার জন্য।কত কষ্টই না পেয়েছো তুমি ছোট বেলায়!

বলতে বলতে কেঁদেই ফেললো তাথৈ।তাথৈ এর কান্নায় ভিয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো তাথৈকে।এরপর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠলো

“আরে পাগল আমি তো ঠিক আছি এখন তাই না?এই দ্যাখো আমি তোমার সামনে দিব্যি ভালো মানুষের মতো বসে আছি।অতীত কে অতীত হিসেবেই ধরে নাও না।ওগুলো ভেবে কষ্ট পেলে চলবে বলো?

নিজের চোখের পানি নাকের পানি ভিয়ানের ভারী জ্যাকেটে মুছে তাথৈ ফট করে বলে উঠলো

“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো তার সঠিক উত্তর দিবে?

ভিয়ান তাথৈকে শান্ত করতে বলে উঠলো
“আলবাত দেবো।জাস্ট আস্ক মি।কিন্তু ফ্রেস হওয়া প্রয়োজন আমার একটু ।সারাদিন ধুলাবালি তে দৌড়েছি।খুব অস্বস্তি হচ্ছে।

“কতো সময় লাগবে ফ্রেশ হতে?
তাথৈ এর কপালে কপাল ঠেকিয়ে ভিয়ান জানালো
“ত্রিশ মিনিটের মতো।

“আচ্ছা আমি ঘড়ি ধরে সময় মেলাবো কিন্তু।

তাথৈ এর ঠোঁট টিপে ধরে ভিয়ান বললো
“রানী সাহেবার হুকুম শিরোধার্য।

ভিয়ানকে ফ্রেস হবার সুযোগ দিয়ে ডাইনিং রুমে পা বাড়ালো তাথৈ।ভিয়ানের চিন্তায় সারাদিন তার নিজের ও খাওয়া হয়নি। টেবিলে মুখোমুখি বসে কথা গুলো বললেই বেশি ভালো হবে।কোনো লুকোচুরি থাকবে না।আর ভিয়ান কথাও ঘুরাতে পারবে না।

মিনিট বিশেক পর লম্বা হট শাওয়ার নিয়ে পোশাক পাল্টে টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো ভিয়ান।তার জিম করা ফর্সা শরীরে মুক্তার ন্যায় ছোট ছোট জল কণা লোভনীয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে।তাথৈ এক পলক সেদিকে নজর দিয়ে একটা টি শার্ট ছুড়ে মেরে বলে উঠলো

“টেবিলে খাবার দিয়েছি,তাড়াতাড়ি এসো।খুব খিদে পেয়েছে আমার।

গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে তাথৈকে অনুসরণ করে চলতে লাগলো ভিয়ান।
ডাইনিং টেবিলে হরেক রকমের খাবারের সমাহার।সেখানে গরুর ঝাল ঝাল ভুনা মাংসও স্থান পেয়েছে।খাবারের রঙ আর গন্ধ দুইই ভিয়ানের অপরিচিত ঠেকলো।নুরজাহান এর রান্না এমন নয়।তবে কে রেঁধেছে.?তাথৈ!

টেবিলে বসতেই গরম ভাত এগিয়ে মাংসের বাটি ভিয়ানের দিকে ঠেলে দিলো তাথৈ।এরপর বললো
“তোমার পছন্দের ঝাল ঝাল মাংস ভুনা।খেয়ে দেখো কেমন হয়েছে।

মুখে তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে ভিয়ান শুধালো
“তুমি রেঁধেছ?

মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে তাথৈ মাথা দুলিয়ে সায় জানালো।স্বীকারোক্তি পেয়ে আর দেরি করলো না ভিয়ান।প্লেটে মাংস তুলে নিয়ে মুখে পুরে আবেশে চোখ বুজে খাবার চিবুতে লাগলো।ভিয়ানের মুখের আদলে বোঝা যাচ্ছে সে খোশ মেজাজে আছে।এটাকেই উপযুক্ত সময় ভেবে নিয়ে তাথৈ ফট করে জিজ্ঞেস করলো

“আন্টি বেঁচে আছে ভিয়ান?

তাথৈ এর প্রশ্নে হঠাৎ খাওয়া থেমে গেলো ভিয়ানের।প্লেট থেকে হাত গুটিয়ে তাথৈ এর পানে নজর বুলালো ভিয়ান।চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠলো মুহূর্তেই।শ্বাসের গতি হলো ভার।চোখ মুখে বিষাদের ছাপ স্পষ্ট।যতোটা সহজে তাথৈ প্রশ্নটা করে ফেলেছে বিষয়টা ভিয়ানের জন্য অতোটা সহজ নয় ভেবে নিজেই লজ্জিত হলো তাথৈ।এরপর নিচু গলায় বলে উঠলো

“সরি ভিয়ান তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।নুরজাহান আন্টির থেকে কিছু ঘটনা জেনেছি তাই কৌতূহল বসত প্রশ্নটি করে ফেলেছি।বিশ্বাস করো যদি জানতাম তুমি এতোটা হার্ট হবে তাহলে কখনোই এমন প্রশ্ন মুখে অনতাম না।প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না।

তাথৈ এর কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো ভিয়ান।এরপর তাথৈ এর পানে ছলছল দৃষ্টি মেলে বলে উঠলো

“আমার মা বেঁচে আছে তাথৈ।কিন্তু বদ্ধ উন্মাদ হয়ে।উনি এতোটাই উন্মাদ যে গায়ে কাপড় রাখেনা।উনার ট্রিটমেন্ট চলছে।পাপার চলে যাওয়া উনি মানতে পারেনি।পাপা তো মরে গিয়ে বেঁচেই গেছেন কিন্তু মম জিন্দা লাশ হয়ে পৃথিবীতে পরে রয়েছে।আর কোনো প্রশ্ন করো না।খুব ক্লান্ত লাগছে।

কথা গুলো বলে খাবার ছেড়ে উঠে চলে যেতে চাইলো ভিয়ান।কিন্তু তাথৈ তার হাত চেপে ধরে বলে উঠলো

“প্লিজ খাওয়া ছেড়ে উঠো না।একসাথে খাবো বলে আমি সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি।আর না জেনে তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য অন্তিরক ভাবে দুঃখিত।প্লিজ খাবার ফেলে যেও না।খুব কষ্ট পাবো আমি।

তাথৈএর না খেয়ে থাকার বিষয়টা বেশ করে পীড়া দিলো ভিয়ানকে।লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিচ্ছাকৃত ভাবে খাবার মুখে তুললো।এরপর তাথৈ এর সাথে মিলিয়ে খাবার খেতে খেতে বলে উঠলো

“মাংস খুব মজা হয়েছে,এটার জন্য স্পেশাল গিফট তোলা থাকলো।নিউইয়র্ক গিয়েই গিফট টা তোমাকে দিয়ে দেবো।

কোনোমতে ইচ্ছের বিরুদ্ধে খাবার খেয়ে তাথৈকে রেখেই নিজের কক্ষে এসে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়লো ভিয়ান।বুকের চিনচিনে ব্যাথাটা ক্রমশ বেড়ে উঠলো।ঝাপসা চোখ দুটো বুজতেই মেলিনার ফ্যাকাশে চেহারা ভেসে উঠলো ভিয়ানের অক্ষিপটে।সমস্ত মলিনতা আর রোগের ভিড়ে ঢাকা পড়েছে পূর্বের সকল জৌলুস।দেখে বোঝার উপায় নেই এটাই সেই মেলিনা।ভাসা ভাসা বড় বড় নীলচে চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গিয়েছে।কোঁকড়ানো বাদামি চুল গুলো অর্ধেকের বেশি উঠে গিয়েছে।সারা শরীরে মাংসের বদলে ঠনঠনে হাড্ডির বিস্তার।আর বোধ বুদ্ধি?সেসব কবেই হারিয়ে ফেলেছেন।

উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে উঠলো ভিয়ান।

“তুমি আমাকে ঊনত্রিশটি বছর ধরে আদর করো না মম।তোমাকে জড়িয়ে ধরে খুব করে ঘুমুতে ইচ্ছে করে।কিন্তু আফসোস!তুমি আমাকে চেনোই না।

সব কিছু গুছিয়ে বেড রুমে এসে ভিয়ানকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে অপরাধ বোধে দগ্ধ হলো তাথৈ।বাড়তি কোনো কথা উচ্চারণ না করে রুমের লাইট নিভিয়ে ভিয়ানের পাশ ঘেষে শুয়ে শক্ত করে জড়িয়ে আগলে নিলো ভিয়ানকে তাথৈ।শান্তির একটু স্থান পেয়ে তাথৈ এর ছোট বক্ষে মুখ লুকিয়ে কান্না লুকানোর চেষ্টা করলো ভিয়ান।ভিয়ানকে শান্ত করতে তাথৈ বলে উঠলো

“নিউইয়র্ক গিয়েই আন্টিকে তোমার বাসায় আনবে।আমরা এক সাথে থাকবো।

কান্না ভেজা কন্ঠে ভিয়ান বললো
“মম কে তুমি সামলাতে পারবে না তাথৈ।সে প্রচন্ড হাইপার।সব সময় অন্যকে আঘাত করার টেন্ডেন্সি থাকে উনার মধ্যে।

তাথৈ শক্ত গলায় বলে উঠলো

“মা দের অধিকার আছে সন্তানকে মারার।আমি নাহয় মার খেলাম তবুও উনাকে নিজেদের কাছে রাখতে তো পারবো।মানুষের জীবনে ভালোবাসার মূল্য অনেক।বাবা কে হারানোর শোক উনি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।উনার কষ্ট আমি বুঝেছি।কারন এমন অবস্থা আমার নিজের সাথেও হয়ে ছিলো।তুমি তো আমার প্রেমিক ছিলে।আর সে তার স্বামী, তার সন্তানের বাবা কে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।দ্রুত আমাদের ফিরে যাবার ব্যবস্থা করো ভিয়ান।এখানে আমার দম বন্ধ লাগছে।

নিজের দুঃখ উজাড় করার মানুষ পেয়ে ভিয়ান আজ বাধন ছাড়া হলো।ছোট শিশুর ন্যয় কেঁদে বলে উঠলো

“পাপার মৃত্যুর খবর শুনে মম নানা বাড়িতে গিয়েছিলো তার বাপ ভাইদের কাছে জবাব চাইতে।তারা মমের এমন কঠিন পরিস্থিতি তে তাকে শান্তনা না দিয়ে আরো আটকে রেখে টর্চার করেছে জানো?পাপাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পারেনি মম।সারাক্ষন শুধু পাপার নাম ধরে চিৎকার করে আর ছোট ভিয়ান কে খুঁজে।আমি কতবার সামনে গিয়ে বলি মা ওমা আমি ভিয়ান।কিন্তু মা বুঝে না।আমাকে আঘাত করে।আমি মার খেতে খেতে রক্তাক্ত হই।মম ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরে।তবুও আমাকে বুকে জড়ায় না।এভাবেই চলছে দশটি বছর।

“তুমি তার খুজ পেলে কিভাবে?

“আমি প্রতিদিন লুকিয়ে নানা বাড়ির বড় গার্ডেন এর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতাম।ওখানে দাঁড়ালে পাপার নাম আর আমার নাম ধরে কেউ চিৎকার করছে শুনতে পেতাম।ছোট ছিলাম তাকত ছিলো না কিছুই করতে পারিনি।উনিশ টি বছর প্রতিনিয়ত একই জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার মায়ের চিৎকার শুনেছি আমি।যেদিন বুড়োটা মরলো সেদিন আমার মায়ের হাসির শব্দ আসছিলো শুধু দূতলার ওই ঘর থেকে।সেদিনই আমি প্রতিজ্ঞা করে ছিলাম যেভাবেই হোক মাকে আমি এখান থেকে মুক্ত করবোই।এন্ড ফাইনালি আই সাকসেড।

#চলবে…..

#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_৪০
#সারিকা_হোসাইন

_______
দুদিন ধরে ক্রমাগত ড্যানের নম্বরে কল করে যাচ্ছে রেইন।না কেউ কল রিসিভ করছে না কোনো ফিরতি মেসেজ বা কল আসছে।বার বার ফোন দিয়ে কোনো উত্তর না পেয়ে রাগে নিজের মাত্রা হারালো রেইন।মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিলো চোখের সামনে ড্যান কে পেলে কুমির দিয়ে খাওয়াবে।চোখে মুখে হিংস্র রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আরো বার দুয়েক ড্যানের নম্বরে ডায়াল করলো রেইন।এবারও হতাশ হলো সে। রিং কেটে যেতেই নিয়ন্ত্রণ হারা ক্রোধে বিছানায় ছুড়ে ফেললো দামি ফোন খানা।এরপর গজগজ করতে করতে ওয়াশরুমে পা বাড়ালো।শাওয়ার অন করতেই ইষৎ উষ্ণ জলের ধারা শরীরে বৃষ্টির ন্যয় ঝরতে লাগলো।সেই জলের ধারায় শীতল না হয়ে আরো দ্বিগুন উত্তপ্ত হলো রেইন।শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে দেয়ালে দুই হাত ঠেস দিয়ে রক্তবর্ণ চোখ নিয়ে রেইন গর্জে উঠলো

“তোকে আমি চূড়ান্ত যন্ত্রনা ভোগ করিয়ে মাটির গহীনে দাফন করবো ভিয়ান নাওয়াফ।আমার মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো দুঃসাহস তুই দেখিয়েছিস।এটার জন্য উত্তম ফিডব্যাক অবশ্যই তুই পাবি।আর বাকি রইলো তাথৈ শেহতাজ।কি এমন পেলে ওই ভিয়ান নাওয়াফ এর কাছে যা আমার কাছে নেই?

কথা গুলো বলে চোখ বুজে শাওয়ার এর নিচে মাথা রেখে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো রেইন।এরপর দেয়ালে সজোড়ে এক ঘুষি বসিয়ে হিসহিস করে বলে উঠলো

“গাছ থেকে কষ্ট করে ফল আহরণ করলাম আমি আর তা অন্য কেউ খেয়ে চলে যাবে এ আমি কিছুতেই মেনে নেবো না।লুকিয়ে কতোদিন থাকবি তুই?এক সময় না এক সময় গর্ত থেকে তো বের হতেই হবে।

মিনিট দশেক পর লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো রেইন।
ঘড়ির কাঁটায় যখন সকাল ন’টা বেজে পনেরো মিনিট সেই সময়ে উশখখুশখো অবস্থায় রেইনের বাড়িতে দৌড়ে এলো আর্থার।এই ভরা শীতের মধ্যেও সে দরদর করে ঘামছে।গায়ে তার কালো রঙা হাত বিহীন স্যান্ডো গেঞ্জি।পরনে হাফ প্যান্ট।আর্থার খুবই গোছানো টাইপের ছেলে।টাইম মতো অফিসে উপস্থিত হয়ে সকল কাজ গুছিয়ে রাখে সে রেইনের জন্য।কিন্তু আজ হঠাৎ অফিসে না গিয়ে এরকম ধড়মড় অবস্থায় রেইনের বাড়িতে উপস্থিত হবার কারন কি?

হাতে একটা ঘড়ি পরতে পরতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো রেইন।চোখে মুখে তার কাঠিন্যতার ছাপ।চারিদিক থেকে বিতৃষ্ণা এসে ঘিরে ধরেছে তাকে।ভিয়ান নাওয়াফ এর মত পরদেশী মানুষ তাকে প্রতিনিয়ত টেক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে অথচ সে কিচ্ছুটি করতে পারছে না।নিজের ব্যার্থতা যেনো বার বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে উঠছে
“তুমি নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনছো।এখনো সময় আছে ফিরে যাও।নইলে পস্তাবে।

“স্যার…
আকস্মিক অর্থারের কন্ঠে সম্বিৎ ফিরে পায় রেইন।সেই সাথে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে উত্তেজিত ব্যাস্ত স্বরে শুধায়

“হুয়াট হ্যাপেন্ড আর্থার?হুয়াই ডু ইউ লুক লাইক দ্যাট?

নিজের কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে লম্বা শ্বাস টানলো আর্থার।এরপর ভয় মিশ্রিত স্বরে ইংরেজি ভাষায় বলে উঠে
“ড্যান কে কেউ মেরে দিয়েছে স্যার।ব্ল্যাক টাউনের অন্ধকার গলিতে তার ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া গিয়েছে।অনেকেই ধারণা করছে বড় কোনো মালবাহী কার্গোর নীচে চাপা পড়েছে সে।কিন্তু ওই রাস্তায় কোনো কার্গো ট্রাক তো দূর নরমাল প্রাইভেট কার ও চলে না।ড্যান খুবই নির্ভেজাল টাইপ মানুষ।তার কোনো শত্রু নেই।টাকার বিনিময়ে সে স্পাই এর কাজ করে।কেউ ইচ্ছে করে কি তবে তাকে গাড়ি চাপা দিয়েছে?

আর্থার এর কথায় নিজের খেই হারালো রেইন।তার যতদূর মনে পড়ে ড্যান এর সাথে তার নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।আর ব্ল্যাক টাউনেই বা তার কি কাজ?ড্যান কি রেইনের কোনো কাজে ওখানে গিয়েছিলো নাকি অন্য কারো কাজে?

মুহূর্তেই মাথা টা ভোঁতা যন্ত্রনায় ভোঁ ভো করে উঠলো।নিজের পকেট হাতড়ে মোবাইল খানা বের করে এরিকের নম্বর ডায়াল করার প্রস্তুতি নিলো রেইন।একমাত্র এরিক ই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে এই মুহূর্তে।

_______
নিজের বিশাল আলিশান বাড়িতে দম বন্ধের ন্যয় হাঁসফাঁস করছেন সাইফ আজমী।পুরো ঘর জুড়ে মেহেরিনের হাজারো স্মৃতি।মেহেরিন তাকে ছেড়ে চির দিনের জন্য চলে গিয়েছে এটা তার কাছে দুঃসপ্নের মতো।অবশ্য মানুষটিকে ধরে রাখার কোনো চেষ্টাও সে কখনো করেনি।মেহেরিন কি আদৌ কোনো দিন সাইফ আজমী কে মন থেকে ভালোবেসে ছিলো?আর সাইফ আজমী?সেকি মেহেরিনের রূপে পাগল হয়ে তাকে নিজের দখলে নিয়ে ছিলো নাকি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলো?যদি ভালোবাসাই হবে তবে দিনের পর দিন কেনো সে মেহেরিন কে ঠকিয়ে গিয়েছে?কেনো এতো এতো অবহেলা আর নরক যন্ত্রনা ভোগ করিয়েছে?মনের পাশাপাশি দৈহিক দূরত্বও তো ঘটেছে এক যুগ আগে।তখন তো এতোটা ব্যথিত হয়নি মন।তবে আজ কেনো এতো এতো কষ্ট এসে হানা দিচ্ছে হৃদয়ের গহীনে?কেনো প্রতিটি মুহূর্তে তরতাজা হচ্ছে দগদগে বিষাক্ত ক্ষত?কলিজায় কিসের এতো মরন কামড়?যার উপস্থিতিতে মনের কোণে কোনো কিছুর সঞ্চারই হয়নি তাহলে এতোগুলো বছর পর তার অনুপস্থিতিতে হৃদয় কেনো তোলপাড় হচ্ছে?

নিজের জীবনের ছক যেনো কিছুতেই মেলাতে পারছেন না সাইফ আজমী।একটু চাইলেই বুঝি সেদিন খুব করে রেখে দেয়া যেতো মেহেরিন কে।স্বামী হিসেবে সেই জোড় সাইফ আজমী কখনোই করেনি মেহেরিন কে।তবে এখন হুতাশনে পুড়ে কি লাভ?

নিজের অন্ধকার কক্ষ থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে নেমে এলেন সাইফ আজমী।চারপাশে মাগরিব এর আজান হচ্ছে।কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে তার হিসেবেই রাখেননি তিনি।অবশ্য এসব সময়ের খেয়াল আগেও কখনো ছিলো না তার।ছিলো না বলেই তো আজ সব হারিয়ে সে নিঃশেষ।
অন্ধকার ড্রয়িং রুম খানা আকস্মিক ভয়ানক কবরের ন্যয় ঠেকলো তার কাছে।বেশ ভীত হয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলেন সাইফ আজমী।এক নিমিষের জন্য শ্বাস পর্যন্ত রোধ হয়ে এলো তার।পুরো জীবন পাপের সাম্রাজ্যে ঘেরা।সেখানে বিন্দু পরিমাণ ভালো কাজের তকমা নেই।মৃত্যু দেখে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক নয় কি?চূড়ান্ত ভয়ে সারা শরীরে ঘাম ছুটলো সাইফ আজমীর।পরনের সাদা পাঞ্জাবি মুহূর্তেই ভিজে জপজপে হলো নোনতা ঘামে।নিজের ভয় এড়াতে ধমকে ডেকে উঠলেন সাইফ আজমী

‘চারু!

মিনিট দুই গড়ালো কিন্তু চারুলতার কোনো শব্দ পাওয়া গেলো না।
মস্তিষ্ক সজাগ হতেই তাচ্ছিল্য হাসলেন সাইফ আজমী।ধীর পায়ে এগিয়ে সুইচ বোর্ড হাতড়ে কক্ষ আলোকিত করতে করতে ধীর স্বরে আওড়ালেন

“ভুলেই গিয়েছিলাম সবাই যে আমাকে পরিত্যগ করেছে।এই বিশাল সাম্রাজ্য আঁকড়ে আমি একমাত্র ব্যক্তি পরে রয়েছি।বাকি সবাই যার যার মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আকস্মিক কলিং বেলের শব্দে সাইফ আজমীর বুক পুনরায় ধরফড় করে উঠলো।কিছুক্ষন নিস্তব্ধ থেকে এগিয়ে গেলেন সদর দরজার পানে।দরজা খোলার পূর্ব মুহুর্তে পুনরায় বেল বেজে উঠলো।কপালে চিন্তার সূক্ষ্ণ ভাঁজ প্রকাশ করে দরজা খুলতেই সেলিনার ক্রোধিত চেহারা নজরে এলো।কোনো কিছু বিবেচনা না করেই হিংস্র তেজী কন্ঠে সেলিনা প্রশ্ন করলো

“আমার ছেলে কোথায় সাইফ?আজ পনেরো দিন ধরে আমার ছেলে বাড়ি ফিরছে না।তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না।কি করেছো তুমি ওর সাথে?

এরিকের নিখোঁজ হবার কথা যেনো সাইফ আজমিকে বেশ করে তাতিয়ে দিলো।নিজের ঘৃণা সংবলিত ক্রোধ ঝাড়বার আগেই সেলিনা আবারো হুংকার ছাড়লো

“কান খুলে ভালো করে শুনে রাখো ‘চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আমার ছেলেকে আমার কাছে ফিরিয়ে না দিলে মিডিয়া ডেকে তোমার অপকর্ম গুলো প্রমান সমেত তুলে ধরতে এক মুহূর্ত বিলম্ব করবো না।আসছি….

*********
তাথৈ এর পাসপোর্ট খুব নিখুঁত ভাবে তৈরি করে দিয়েছে ডেভিড।নিজের ধূর্ত লোক মারফত সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েছে ভিয়ান।তাথৈকে নিজের বউ দেখিয়ে খুব সহজেই নিউইয়র্ক ফিরে যাবার ভিসা প্রসেস করবে সে।এজন্য অবশ্য অন্য ট্রিক্স ভেবে রেখেছে ভিয়ান।মেডিকেল ট্রিটমেন্ট পারপাস দেখিয়ে খুব ইজিলি ভিসা বাগিয়ে নেবে সে।ভিসা অফিসের উপর মহলের লোকের সাথে ভিয়ানের ভালো সুসম্পর্ক রয়েছে।সেই লোকের মাধ্যমেই ভিয়ান কোনো ঝামেলা ছাড়া নিউইয়র্ক পৌঁছাতে পেরে ছিলো।শুধু তাই নয় ওখানে শক্ত অবস্থান গাড়ার ক্ষেত্রেও সেই লোক বেশ সাহায্য করেছে।তার বৌদলতে ভিয়ান তাকে দুহাত ভরে টাকা দিয়েছে।কিন্তু টাকাই মানুষের জীবনে সব নয়।পরিস্থিতি এমনও হয় টাকা আছে কিন্তু তার সুফল ভোগ করা যাচ্ছে না।

আর চিন্তা ভাবনা না করে তাথৈকে নিয়েই সেই ভিসা অফিসে ছুটলো ভিয়ান।যে করেই হোক রেইনের দৃষ্টি সীমানা থেকে তাথৈকে সরাতেই হবে।এরপর শক্ত জালে বন্দি করবে রেইন কে।
গাড়িতে মোটা মাফলার পেঁচিয়ে বসে আছে তাথৈ।যবে থেকে ভিয়ানের মায়ের কথা শুনেছে সে সেদিন থেকেই তার মন বিমর্ষ।এখানে প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে বিষাক্ত ঠেকছে।নিজের বাবা মা কে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার।ভিয়ানের মাকে বুকে জড়িয়ে বাকি দিন গুলো কাটাতে চায় সে।তাথৈ তবুও মেহেরিনের মাতৃ ছায়া পেয়েছে।কিন্তু ভিয়ান?সে এই দূর দেশে অনাথের ন্যয় বড় হয়েছে।মেলিনা যদি এমন স্মৃতি শূন্য হয়েই ওপাড়ে পাড়ি জমায় তবে ভিয়ানের অন্তর আজীবন পর্যন্ত খা খা হয়ে রইবে।তাথৈ তা কিছুতেই হতে দিতে পারেনা।নিজ হাতে মেলিনার শশ্রুষা করে দেখতে চায় সে মেলিনা আদেও সুস্থ হয় কি না।তাথৈ খুব করে চায় মেলিনা একবার ভিয়ানকে বুকে জড়াক।

“কি ভাবছো এতো সময় ধরে?

আকস্মিক ভিয়ানের মৃদু স্বরে নড়েচড়ে উঠলো তাথৈ।নিজের মনের ভাবনা গুলো ভিয়ানকে জানতে না দিয়ে কথা ঘুরানোর চেষ্টায় বলে উঠলো

“আয়াজ আমিরের জন্য কি ভেবে রাখলে?

তাথৈ এর কথায় বিগলিত হাসলো ভিয়ান।এরপর স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠলো
“আগে তোমাকে কোনোভাবে নিউইয়র্ক নিয়ে যাই।ওখানে গিয়ে ওর সাথে সামনা সামনি কাবাডি খেলবো আমি।

“যদি ও তোমার কোনো ক্ষতি করে দেয়?

তাথৈ এর ঠোঁট টিপে ধরে ঘোর লাগা কন্ঠে ভিয়ান বলে উঠলো

‘আমার ক্ষতি করার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই এই পৃথিবীতে তাথৈ।একমাত্র তুমি আমার উইক পয়েন্ট।তোমাকে অনিষ্ট করার আগে আমার ব্যারিয়ার অতিক্রম করতে হবে রেইনের।আর আমাকে অতিক্রম করা এতোই সহজ?

#চলবে