#বছর_দুয়েক_পর
#পর্ব_৪১
#সারিকা_হোসাইন
এরিকের নম্বরে একের পর এক কল করে হাঁপিয়ে উঠেছেন সাইফ আজমী।ছেলেটা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করছে বলে মনে হচ্ছে তার।নিজের জন্মদাতা পিতার চাইতেও আরো কয়েক কাঠি উপরে থাকবে এই ছেলে এটা যেনো সাইফ আজমীর কল্পনাতীত।এদিকে তাথৈ মেয়েটার সাথে ঠিক কি কি হলো সেসব ও অজানা।ব্লাডি রেইন মুহূর্তেই গিরগিটির ন্যয় রঙ পাল্টে ফেলেছে।কোনো ভাবেই তার সাথে সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না।অফিসিয়াল নম্বরে কল করেও তেমন সুফল পাওয়া যায়নি।বিদেশি সেক্রেটারি আর্থার সে আরেক গিরগিটি।যেমন তার বস তেমন তার ন্যাওটা।
রাগে গজগজ করতে করতে চোখ মুখ উল্টিয়ে ফোনটা ছুড়ে মারলেন সাইফ আজমী।ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে ট্যাক্স পরিশোধ করার জন্য চিঠি পাঠিয়ে যাচ্ছে সমানে।সাইফ আজমী যখন তখন ট্যাক্স সাবমিট করতে পারেন।কিন্তু সেখানে তাথৈ এর সিগনেচার লাগবে।কারন পুরো প্রপার্টি সাঈদ আজমী আর তাথৈ এর নামে।এখানে সাইফ আজমীর কোনো হাত নেই।এরিক কিভাবে এমন বড় একটা বোকামি করলো এটা ভাবলেই সাইফ আজমী রাগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারান।এরিকের এই নির্বোধ আচরণের জন্য আজ এতো এতো বিশৃঙ্খলা।তাথৈ আর মেহেরিন কে হাতে রেখে সবটাই সুন্দর সামাল দিচ্ছিলেন তিনি।নিমিষেই যেনো ভয়ঙ্কর ভাবে এলোমেলো হলো সবকিছু।এর মাঝখানে আবার ভিয়ান নাওয়াফ শকুন টা এসে জুড়েছে।পাতাল থেকে হলেও তাথৈকে খুঁজে বের করবে সে।পরবর্তী খেলা কতোটা নিষ্ঠুর হবে তা সাইফ আজমী ইতোমধ্যে ভেবে রেখেছেন।কিন্তু সেই খেলা খেলবার আগে এরিক আর সেলিনার খেল খতম করা চাই।এদের মা ছেলের হুমকি আর নেওয়া যাচ্ছে না।ছেলেটা যে মায়ের মতোই অর্থলোভী আর ক্রিমিনাল হয়েছে তা সাইফ আজমী এতোদিনে বেশ ঠাহর করতে পেরেছেন।দুটোই তার কাছে বিষ ফোঁড়ার মতো।জতো তাড়াতাড়ি এই দুটোকে উপড়ে ফেলা যায় ততই নিজের মঙ্গল।কিন্তু এই হতচ্ছাড়া গেলো কোথায়?
হঠাৎই সাইফ আজমীর ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠলো।নিস্তব্ধ অফিস কেবিনে সেই সুর শব্দ দূষণের সৃষ্টি করলো সেই সাথে কিঞ্চিত নড়ে উঠলেন তিনি।আজকাল অযথা ভয় এসে বুকে ভর করে তার।সামান্য শব্দও বুক এর ভেতরের হৃদযন্ত্র কাঁপিয়ে দেয়।হয়তো একাকিত্ত্ব একটু বেশিই গ্রাস করে ফেলেছে তাকে।নিজের ভাবনা ফেলে ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে দৃষ্টি পাততেই বাঁকা ভ্রু যোগল সরু হলো।সেই সাথে বিষন্ন মুখে ফুটলো হাসির রেখা।ফ্যাকাশে কুচকানো ঠোঁটে বাঁকা হেসে কানে ফোনখানা তুললেন সাইফ আজমী।এরপর তাচ্ছিল্য মিশ্রিত হাসির সমন্বয়ে নাটকীয় ভঙ্গিমায় শুধালেন
“এ যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
ওপাশের ব্যক্তি নিজের ক্রোধ আর গাম্ভীর্য বজায় রেখে ভরাট কন্ঠে শুধালো
“মেয়ের আগের প্রেমিকের নাম কি ছিলো মশাই?
প্রশ্নটি শুনে মুহুর্তেই সাইফ আজমীর ঠোঁটের হাসি উবে গেল।চোখে মুখে সুগভীর অমানিষা ভর করলো।সেই সাথে অসহনীয় রাগে ফুলে উঠলো কপালের শিরা।নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে রেইনের উদ্দেশ্যে সাইফ আজমী শুধালেন
“কবে থেকে তাথৈ নিখোঁজ?
হিংস্র চিতার ন্যয় ফসফস শব্দ তুলে রেইন জবাব দিলো
“আজ ন’দিন।
সাইফ আজমী হাতের করপুটে নিজের নাক মুখ মুছে শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো
“শুয়োর টাকে হাজার বার দুনিয়া ছাড়া করতে চেয়েও আমি ব্যর্থ।আমার মনে হয় তুমি ব্যর্থ হবে না।এবার বোধ হয় ভিয়ান নাওয়াফ এর শোক সভার সামিল হতে পারবো কি বলো?এম আই রাইট?
ওপাশ থেকে হাহা শব্দ তুলে হেসে উঠলো রেইন।এরপর কটূক্তি করে শুধালো
“অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে কতোদিন এমন মজা দেখবেন?এক পা তো কবরে গেলো।এবার তো একটু নিজেকে শোধরান।
কথা গুলো বলেই সাইফ আজমিকে কিছু না বলতে দিয়ে খট করে লাইন কেটে দিলো রেইন।তার যেই তথ্য জানার তা সে জেনে গিয়েছে।ভিয়ান ই তাথৈ এর প্রেমিক।তাথৈ ভিয়ান নাওয়াফ এর কাছে সেভ জোনে আছে।আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে চাইলো না রেইন।দরকার পড়লে নিজের বিজনেস এর ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার ভিয়ান নাওয়াফ কে দিয়ে দেবে সে তবুও তাথৈকে তার চাই।মনের গহীনে তাথৈ হীন অজানা চিনচিনে ব্যথা সারাক্ষন যন্ত্রনা দেয়।এই যন্ত্রনা সারাতে হলে তাথৈকে বুকে জড়ানো চাই।সোজা কথায় ভিয়ান নাওয়াফ রাজি না হলে বাঁকা পথ বেছে নিতে দুবার ভাববে না রেইন।
________
দীর্ঘ এক বরফ ঝরা রাতের অবসান ঘটিয়ে নতুন ভোরের আগমন হয়েছে।ভোর হতেই চারপাশ ঝকঝকে আলোয় ভরে উঠলো।আজ ঘন কুয়াশার বিস্তার নেই।হয়তো উইন্টার বিদায় নেবার সময় এসেছে।সময়ের সাথে সাথে তেজী রোদের উত্তাপে ফরেস্ট পাথ এর উঁচু পাহাড় থেকে ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করেছে।হলদেটে সবুজ অরণ্যের চারপাশ নাম না জানা পাখির কলতানে বিভোর।সুর্য টা যখন পুব আকাশ ছাড়িয়ে রেড গাম গাছের উপরে অবস্থান নিলো ঠিক সেই সময়ে ভিয়ানের কক্ষের জানালার মোটা পর্দা ভেদ করে অল্প আলো প্রবেশ করলো সেই বদ্ধ কক্ষে।চোখে আলোর রোশনাই অনুভূত হতেই পিটপিট করে চোখ মেলে চাইলো ভিয়ান।গত রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারনে চোখে এখনো প্রচুর ঘুম রয়েছে।
ভিয়ানকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বেঘোর ঘুমে তলিয়েছে তাথৈ।মেয়েটির উষ্ণতায় সহসাই শিহরিত হলো ভিয়ান।গত রাতের কাটানো মুহূর্ত চোখে ভাসতেই আরেকটু রোমাঞ্চিত হলো এই প্রেমিক পুরুষ।এরপর তাথৈকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে উষ্ণ চুমু আকলো ভিয়ান।চোখে খচখচে জ্বালা অনুভব হতেই পুনরায় চোখ বুজে ঘুমাতে চাইলো।কিন্তু সেভাবে আর ঘুম ধরা দিলো না চোখে।এক হাতে তাথৈকে জড়িয়ে আরেক হাত মাথার পেছনে দিয়ে জীবনের নানান ভাবনায় ডুব দিলো ভিয়ান।
তাথৈকে নিয়ে তার ভালোবাসাময় ছোট সংসার খুব ভালোভাবেই গুজরান হচ্ছে।এখানে হাসি আনন্দ খুনসুটি আর অগাধ ভালোবাসা কোনোটার ই খামতি নেই।কিন্তু এই সুখে ভীত হয়ে পরেছে ভিয়ান।বেশি সুখ তার কপালে সয়না।বহুবার তার প্রমাণ সে নিজে হাতে হাতে পেয়েছে।
রেইন মানুষ হিসেবে মোটেও সুবিধার নয়।সে তাথৈকে পাবার জন্য যা খুশি করতে পারে।তাথৈকে ভোগ করাই যদি তার মুখ্য উদ্দেশ্য হতো তবে এতোগুলো দিন তাথৈ রেইনের কাছে সেফ থাকতো না।রেইন তাথৈকে স্পেশাল ট্রিট করেছে এটা তাথৈ নিজেই স্বীকার করেছে।কোথাও না কোথাও রেইন তাথৈকে ভালোবেসে ফেলেনি তো?যদি সেরকম কিছুই হয় তবে রেইন কখনোই স্থির হয়ে বসে থাকবে না।ঝামেলা বেঁধে একবার পুলিশের কান পর্যন্ত ঘটনা চলে গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে চূড়ান্ত হিমশিম খেতে হবে ভিয়ান কে।ওদিকে মেলিনার অবস্থা প্রচন্ড অবনতির দিকে।নার্স ডক্টর যাকে পাচ্ছে তাকেই আঘাত করছে।ঘুমের ইনজেকশন পর্যন্ত তার মস্তিষ্কে আর কাজ করছে না।এরিকের জ্ঞান এখনো ফিরেনি।হসপিটালে এভাবে কতোদিন ফেলে রাখা যাবে আর?সাইফ আজমী নিশ্চয়ই তার ছেলেকে খুঁজবে।না পেলে থানায় কেস ফাইল করবে।তখন মাহির আর ইকবাল ফেঁসে যাবে।এতো এতো চাপ যেনো এই ছোট মাথায় আর কুলাচ্ছেই না।মনে হচ্ছে এক্ষুনি মাথা টা ফেটে যাবে।তাথৈকে কিচ্ছুটি বুঝতে না দিয়ে নরমাল ভাবে থাকার চেষ্টা করছে ভিয়ান।কিন্তু এভাবে আর কতো দিন?মেয়েটি এমনিতেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অভারকাম করেছে।নতুন করে ভিয়ান তাকে কোনো দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলতে চায়না।দরকার পড়লে তাথৈকে নিয়ে সে অন্য কোনো স্টেটে পাড়ি জমাবে।তবুও সকল বিপদ থেকে তাথৈকে আগলে রাখবে ভিয়ান।
হঠাৎই নড়েচড়ে উঠলো তাথৈ।ভাবনার সুতোয় টান পরলো ভিয়ানের।লম্বা ঘুমের পর বেশ ফ্রেশ ভাব নিয়ে চোখ মেলে তাকালো সে।ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে ভিয়ানের প্রশস্ত বুকে আবিস্কার করে ঘুম জড়ানো অল্প হাসলো।এরপর আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো
“শুভ সকাল ডিয়ার হাজব্যান্ড।
তাথৈ এর আদুরে সম্ভাষনে স্মিত হাসলো ভিয়ান।এরপর নাকে নাক ঘষে বলে উঠলো
“সকাল আর নেই সুন্দরীতমা।অলমোস্ট এগারোটা বাজে।
ঘড়ির কাটা এতো দ্রুত ঘুরে গেছে শুনে হকচকিয়ে লাফিয়ে উঠলো তাথৈ।বৃদ্ধা নুরজাহান বোধ হয় আজ একা একাই সমস্ত কাজ করেছে।মানুষ গুলোকে মোটেই খাটাতে ইচ্ছে করে না তাথৈ এর।মানুষ গুলোর এখন রেস্ট নেবার সময় হয়েছে।আর কতো কাজ করা যায় এমন বার্ধক্য যুক্ত শরীরে?
ভিয়ানকে ছেড়ে তাথৈ উঠতে নিলেই পুনরায় জাপ্টে ধরে তাথৈকে বিছানায় শুইয়ে দিলো ভিয়ান।এরপর তাথৈ এর উপরে হালকা ঝুকে শুধালো
“চোখের সামনে জলজ্যান্ত স্বামীকে পাত্তা না দিয়ে কোথায় পালাচ্ছ?দিনরাত প্রেম পিপাসায় ধুকছি নজরে লাগছে না?শ্রদ্ধেয় পতি পরমেশ্বর কে খুশি করে তবেই না অন্যকে খুশি করবে।
দুই হাতে ঠেলে ভিয়ানকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে তাথৈ বলে উঠলো
“কি খেয়ে এমন হাতির মতো মোটা তাজা আর বড় হয়েছো?সারা রাত জ্বালিয়েও মন ভরেনি?আর কতো খুশি হতে চাও তুমি?
তাথৈএর গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে আবেস জড়ানো স্বরে ভিয়ান বললো
“আজীবন জ্বালিয়েও মন ভরবে না।জীবনে অনেক অনেক খুশি হতে চাই তোমাকে নিয়ে হানি।
কথা গুলো বলতে বলতে হাতের বিচরণ অবাধ্য করার পায়তারা করলো ভিয়ান।চট করে সেই হাত চেপে ধরে তাথৈ অসহায় এর ন্যয় বলে উঠলো
“প্লিজ নো।এখন উঠতে হবে।ভুলে গেছো আজ বিকেলে তুলতুলকে আনতে যাবার কথা?কতদিন দেখিনা ওকে।
তাথৈএর গলায় জোরে বাইট করে ভিয়ান বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে বলে
“এমন সুন্দরী বউ আশেপাশে ঘুরে বেড়ালে সব ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক নয় কি?
ব্যথায় আউচ্ শব্দ করে গলায় মালিশ করতে করতে তাথৈ কপাল কুঁচকে শুধায়
“তুমি না বিয়ের আগে অনেক ভদ্র ছিলে?এখন এমন অভদ্র হয়েছো কেনো?
ঠোঁট কামড়ে হেসে ভিয়ান বলে উঠে
“সত্যিই ভুল হয়ে গিয়েছে ম্যাম।আপনাকে বিয়ে করবার পরও কুমারী হিসেবে রেখে শোপিস বানানো উচিত ছিলো।ভুল করে আনবক্সিং করে ফেলেছি।আমার গর্দান নিন।
#চলবে….