বসরাই গোলাপের ঝাড় পর্ব-০২

0
710

#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল

২.
হাবিব বাড়ি ফিরল দু’দিন পর। তার চোখের নিচ বসে গেছে। মুখ শুকনো। শরিফা বেগম তখন চুলায় চায়ের পানি চাপাচ্ছিলেন। ছেলেকে দেখে করুণ গলায় বললেন, “এ কি চেহারা করেছিস তোর? খাওয়া-দাওয়া করিসনি তাই না?”

হাবিব জবাব দিলো না। সহজ ভঙ্গিতে চেয়ারে বসল। শরিফা বেগম আবারও বললেন, “কথা বলছিস না কেন? শরীর খারাপ?” বলেই তিনি ছেলের কপালে হাত ছোঁয়ালেন। গা গরম হয়ে আছে। মনে হচ্ছে হাত পু’ড়ে যাবে। তিনি আৎকে উঠে বললেন, “তোর গা তো জ্বরে পু’ড়ে যাচ্ছে।”

“তেমন কিছু হয়নি। বাসে আসতে ঠান্ডা লেগে গেছে। নববী কোথায়?”

নববীর নাম শুনতেই শরিফা বেগমের গা জ্বলে গেল। দাঁত চিবিয়ে বললেন, “জানি না। সারাদিন তোর বউয়ের খোঁজ রাখার সময় নেই।”

“আপা, দুলাভাই চলে গেছে? বাবা কোথায়?”

“তোর বাবা সকালের নাস্তা সেরে একটু বেরিয়েছেন। কনকের কথা আর কি বলল! দু’দিন আগে মাঝরাতে জামাইকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। বাড়ি থেকে সুখ-শান্তি উঠে গেছে।”

হাবিব জবাব দিলো না। কথা বললেই কথার পিঠে কথা বলতে হবে। ইচ্ছে করছে না। একধরনের ক্লান্তিও বোধ করছে। বিছানায় শুয়ে পড়লে হয়। সারারাত বাসের ভেতর ঘুমাতে পারিনি। দু-চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছে। সে উঠে দাঁড়ালো। নরম পায়ে হেঁটে ঘরে চলে গেল।

নববী বিছানায় বসে আছে। তার হাতে সোহেলের জামা-কাপড়। খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখছে। হাবিব নববীর পাশে গিয়ে বসল। একটা হাত রাখল তার পিঠে। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “কি করছ তুমি?”

“বাবুর কাপড় গুছিয়ে রাখছি। দেখ না, খেলতে গিয়ে কিসব লাগিয়ে এনেছে। সাবান পানি দিয়ে কত ধুলাম। তা-ও দাগ যায়নি।”

“এসব রেখে এদিকে এসে বসো। আম্মা আব্বা চলে গেছেন?”

নববী কয়েক মিনিট চুপ করে রইল। পরে কথার মানে বুঝতে পেরে বলল, “হ্যাঁ। কাল চলে গেছে। আমাকেও সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আব্বু যেতে দেয়নি। তাছাড়া আমারও যেতে ইচ্ছে করেনি।”

“নববী!”

“হু।”

“এক কাপ চা বানিয়ে দেবে। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।”

“তুমি একটু অপেক্ষা করো, নিয়ে আসছি।”

নববী উঠে রান্নাঘরে চলে গেল। শরিফা বেগম কাপে চা ঢালছেন। গরম চা থেকে ধোঁয়া উঠছে। নববী বলল, “মা, চা কি বেশি আছে? সোহেলের আব্বু এক কাপ চা চাইল।”

“সোহেলের আব্বু চাইল নাকি তুমি গায়ে পড়ে দিতে এসেছ? সবই বুঝি। এভাবেই তো আমার ছেলের মাথাটা চি’বি’য়ে খেয়েছ।”

নাইমা পাশে বসে নুডলস খাচ্ছিল। সে বেশ বিরক্তির সুরে বলল, “মা, কি শুরু করলে? ভাইয়া না চাইলে ভাবী মিথ্যে বলবে কেন?”

“ভালোই তো ভাবীর দালালী করা শিখেছ।”

“দালালীর কি করলাম? সত্যটা বলেছি।”

শরিফা বেগম একটা কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করলেন। তারপর চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে গেলেন। নাইমা উঠে এসে নববীর গায়ে হাত রাখল। কোমল গলায় বলল, “কিছু মনে করো না ভাবী। সবটাই তো জানো। বড় আপার চলে যাবার ব্যাপারটা মা মেনে নিতে পারছে না। আপা দুলাভাই সেদিনের পর কলও রিসিভ করেনি। মা খুব দুশ্চিন্তায় আছে।”

নববী ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। নিঃশ্বাসে শব্দ শোনা গেল স্পষ্ট। কি অদ্ভুত এই দুনিয়া! সাত দিনও হয়নি তার ছেলে মা’রা গেছে। অথচ মানুষের ব্যবহার দেখলে মনে হবে সবকিছুর জন্য সে-ই দায়ী। গতকাল নববী মা অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিল। মেয়েকে সাথে নিয়ে যাবে। নববী যেতে চায়নি। সোহেল একা ঘুমাতে ভয় পায়। তাকে ফেলে কিভাবে যাবে? মায়েদের কাছে সন্তান কখনও মা’রা যায় না। তারা সবসময়ই জীবিত থাকে।

শরিফা বেগম হাবিবের সামনে চায়ের কাপ রাখল। ভেজা গলায় বলল, “বাবা রে! তোকে স্বান্তনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। তবে তুই যে কষ্ট পাচ্ছিস সে-ই কষ্টটা আমাকে দিস না। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”

হাবিব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চাপা গলায় বলল, “আমি ঠিক আছি মা। চিন্তা করো না। ঠিক না থাকলে কি অফিসের কাজে যেতে পারতাম?”

“নববীর মা বলছিল মেয়েকে কিছুদিন উনার কাছে রাখতে চান। বুঝতেই তো পারছিস। বউ মা যেতে চাইনি। দেখ তুই যদি বুঝিয়ে দিয়ে আসতে পারিস।”

“এখানে থাকলে তো কোন সমস্যা নেই। আমার কাছেই থাকুক।”

“ওর মা বলছিল- মেয়ের মাথা এখন ঠিক নেই। সংসারের কাজকর্ম করতে পারবে না। কিছুদিন ঘুরে আসলে খানিকটা স্বাভাবিক হতো।”

“এখানে থাকলেই যদি সংসারের কাজ করতে হয়। তবে কি নববী চলে যাবার পর এই সংসারের কাজ বন্ধ হয়ে যাবে?”

শরিফা বেগম এই প্রসঙ্গে কথা বাড়ালেন না। কথা ঘুরিয়ে বললেন, “চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি যাই, দেখি দুপুরের জন্য রান্না করতে হবে।”

“নববীকে পাঠিয়ে দাও তো। কথা আছে।”

শরিফা বেগম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় দরজা ভেজিয়ে দিয়ে গেলেন। নববী ঘরে নেই। সোহেলের ক’ব’রের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাইমা তার কাছে গিয়ে বলল, “ভাবী, ভাইয়া ডাকছে।”

“যাচ্ছি। দেখলাম তোমার ভাইয়ের জ্বর। ঘরে নাপা বা প্যারাসিটামল আছে?”

“থাকার কথা, আমি খুঁজে দেখছি। তুমি এসো।”

নাইমা নববীর হাত ধরে ঘর পর্যন্ত নিয়ে গেল। তাদের মধ্যে ননদ ভাবীর কুৎসিত সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বিয়ের পর থেকে দু’জনে বন্ধুর মতো সময় কাটিয়েছে। নাইমা সবে মাত্র ক্লাস টেনে পড়ে। পড়াশোনায় বেশ ভালো। দেখতেও চমৎকার। লম্বা চুল।

রাত নেমে গেছে। চারদিকে ঘন অন্ধকার। হাবিব বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকল। দুপুরের জ্বরে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিল। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। গা কুটকুট করছে। গোসল করার দরকার। সে ট্যাপ ছেড়ে বালতিতে পানি ভরল। বাথরুমে একটা ছোট জালানা আছে। সেখান দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। বাতাস গায়ে লাগলে কেমন শীত শীত করে। সে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল। ঠান্ডা পানি। গায়ে জ্বর থাকার জন্যে পানি বরফ শীতল মনে হচ্ছে। তবু ভালো লাগছে। সে বেশ অনেক সময় নিয়ে গোসল করল। মাথা মুছে ফুল হাতার শার্ট পরল। আলমারি থেকে চাদর বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলো। গোসলের পর একটু ফ্রেশ লাগছে।

নববী চুলার ওপর থেকে কড়াই নামিয়ে রাখলো। হাবিব দুপুরে ঠিকমতো খেতে পারেনি। শরিফা বেগমের রান্না হাত ভালো, তবে অনেক ঝাল দিয়ে ফেলেছেন। রাতের জন্য সে-ই একই তরকারি। নাইমা বলল, “ভাবী তুমি আবার রান্নাঘরে আসতে গেলে কেন? আমাকে বললেই তো করে দিতাম।”

“সমস্যা নেই। সামান্য সবজি রান্না করেছি। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো। সামনে পরীক্ষা। মা দেখলে রাগারাগি করবে।”

“করলে করবে। রাগারাগি ভয়ে উচিত কাজ করতে পিছিয়ে যেতে নেই।”

নববী হাসল। সে-ই হাসি দেখতে ভালো লাগল। নাইমার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেছে। যেন সে দারুণ একটা কাজ করতে পেরেছে।
রাতের খাবার সময় মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, “যা হবার তা হয়ে গেছে। আল্লাহ কাছে দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করবার নেই। মসজিদে দাদু ভাইয়ের নামে মিলাদ দিতে চাচ্ছি। এর বাইরে একটা এতিমখানায় বলে এসেছে। শুক্রবার সত্তর জন এতিম বাচ্চা আসবে। খরচাপাতি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। তোমাদের জানিয়ে রাখলাম।”

সকলে মনযোগ দিয়ে শুনলেও কেউ কোন মন্তব্য করল না। তিনি আবার বললেন, “নববী, বেয়াই সাহেবকে জানিয়েছি। তুমি একটু কথা বলে নেবে। উনাকে আসতে বলবে।”

নববী মাথা হ্যাঁ সূচক মাথা দোলালো। হাবিব বলল, “সোহেল কিভাবে পানিতে পড়েছিল জানা হয়নি। কেউ আমায় কিছু বলেনি। কি হয়েছিল মা?”

শরিফা বেগম বললেন, “আমি, নাইমা আর কনক তোর চাচির বাড়িতে গিয়েছিলাম। এসে এই অবস্থা দেখেছি। কি হয়েছে জানি না। তোর বউ কিছু বলেনি।”

“নববী কি হয়েছিল বলতে পারবে?”

“আমি দুপুরের রান্না করছিলাম। সোহেল তো আব্বু সাথে ছিল। তারপর আর কিছু জানি না।”

শরিফা বেগম তেঁ তেঁ উঠে বললেন, “এখন তোমার শশুরের ঘাড়ে দোষ দিতে চাইছ? আমরা তো আর ছেলে-মেয়ে মানুষ করিনি।”

মহিউদ্দিন সাহেব খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। নরম গলায় বললেন, “নববী ঠিক কথা বলেছে। দাদু ভাই আমার কাছে ছিল। উঠানে খেলছিল।”

“ওহ আচ্ছা।”

হাবিব কথা বাড়ালো না। তার মন ভালো নেই। সোহেলের কথা মনে পড়লে নিষ্পাপ মুখশ্রী চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দুধ সাদা চারটে দাঁত বের করে ক্রমাগত হাসছে। আধফোটা বুলিতে বাবা বাবা ডাকছে। খাবার ঘরের বাকি সময়টা কেউ কোন কথা বলল না। শরিফা বেগম বড় মেয়ের প্রসঙ্গ তুললে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তুললেন না।
রাতের ঘুমানোর সময় নববী হাবিবের পাশে বসল। ভেজা গলায় বলল, “ কাল কি তোমার সময় হবে?”

“কেন? কোন কাজ আছে?”

“আমাকে বাবার বাড়িতে রেখে এসো। এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।”

“কেন ভালো লাগছে না?”

“জানি না। কেমন যেন দম আটকে আসে। বড় আপাও আমার জন্য রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেছেন।”

“বড় আপা তোমার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেছে মানে?”

নববী বলতে চাইল না। হাবিবের জোরাজুরিতে গোটা ঘটনা খুলে বলল। সবকিছু শোনার পর সে শান্ত গলায় বলল, “রাত হয়েছে। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ো। শুক্রবার বাচ্চারা আসবে। তারপর বাপের বাড়ি রেখে আসব।”

নববী শুয়ে পড়লেও ঘুমাতে পারল না। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল। সে অনুভব করতে পারছে কেউ একজন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই স্পর্শ খুবই পরিচিত এবং শান্তিদায়ক।

হাবিব খুব সকাল সকাল বেরিয়ে গেল। বলল কাজ আছে। তবে সে নিজের অফিসে গেল না। আনিসের অফিসের সামনে গিয়ে বসে রইল। দশটা নাগাদ আনিস অফিসের গেট দিয়ে ঢুকল। সে বেশ হেলে-দুলে হাঁটছে। হাবিবকে দেখে চওড়া হাসি দিলো। প্রতিত্তোরে হাবিবও হাসল। কাছে গিয়ে খুব জোরে আনিসের গালে একটা থা’প্প’ড় মা’র’ল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটলে যে সে কিছুই বুঝতে পারল না। গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। হাবিব বলল, “আমার সন্তান মা’রা গেছে। বড় ভাই হিসাবে আপনি স্বান্তনা দিবেন কি উল্টে বাজে কথা বলেছেন। রাতদুপুরে রাগ দেখিয়ে বোনকে নিয়ে চলে এসেছেন। ইচ্ছে করছে আপনাকে খু’ন করে ফেলি।”

আনিস হেসে ফেলল। পান খাওয়া দাঁত বের করে বলল, “উচিত কথা খুব গায়ে লাগল, তাই না শালা? নিশ্চয়ই তোমার বউ এসব নালিশ করেছে। যে মেয়ে মানুষ সাত দিনের আগে সন্তান হারানোর শোক ভুলে স্বামীর কান ভাঙাতে পারে। সে যে আর কতকিছু পারে তা আল্লাহই ভালো জানেন।”

“আল্লাহ সবকিছুই জানেন। সবকিছু!”

আনিস একটু ঘাবড়ে গেল। হাবিবের চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে ভীষণ রেগে গেছে। সত্যিই সে রাগল। অফিসের সামনে লোক জড় হয়ে তাদের তামাশা দেখতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সবাই এগিয়ে এসে ঝামেলা মিটিয়ে দিয়ে গেল। হাবিব বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার পর। ফিরে দেখে কনক বসে আছে। তার চোখ-মুখ ফোলা। শরিফা বেগম তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “জামাইকে কি বলেছিস?”

হাবিব শান্ত গলায় বলল, “যা বলেছি তা একটু কম হয়ে গেছে।”

চলবে