বসরাই গোলাপের ঝাড় পর্ব-০৮

0
445

#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল

৮.
মহিউদ্দিন সাহেবের ঘুম খুব পাতলা। সামান্য শব্দে জেগে ওঠেন। তবে আজ তার ঘুম ভাঙলো দুঃস্বপ্নে। গায়ের কম্বল সরিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। খাটের পাশে রাখা টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে পানি পান করলেন। তার মন অস্থির হয়ে আছে। নামাজ আদায় করলে হয়তো খানিকটা স্বস্তি মিলবে। সেই আশায় তিনি বিছানা ছেড়ে নামলেন। সদর দরজা থেকে বাইরে আসতেই খেয়াল করলেন – নাইমা হেঁটে যাচ্ছে। হাঁটছে খুব সাবধানী ভঙ্গিতে। তিনি জোরালো কন্ঠে বললেন, “নাইমা, ওখানে কি করিস?”

নাইমা হকচকিয়ে গেল। পিছনে ফিরে জড়ানো গলায় বলল, “পুকুর ঘাটে যাব। হাত-মুখ ধুয়ে এসেছিলাম।”

“তোকে কতবার বলেছি! রাত-বিরেতে এভাবে বাইরে বের হবি না। আমার কথা কানে তুলতে ইচ্ছে করে না?”

“ভুল হয়ে গেছে। এরপর থেকে মনে রাখব।”

নাইমা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। গোলাপ ঝাড়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তার মন বলছে- এখানে কোন ঝামেলা আছে। একদম বিনা কারণে একটা মানুষ পরপর দু-দিন রাতেরবেলা একই সময়ে বের হতে পারে না। মহিউদ্দিন সাহেব কোনদিকে খেয়াল দিলেন না। পুকুর ঘাটে চলে গেলেন। আনিস বসরাই গোলাপের ঝাড়ের পিছনে লুকিয়ে আছে। রাগে তার কপালের রগ ফুলে উঠেছে। নাইমা মেয়েটা আজ একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। পিছু নিয়েছিল পর্যন্ত। আর একটু হলে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। আনিসের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে। সে এসব সহ্য করবে না। কখনোই না!

মহিউদ্দিন সাহেব ওজু করে ঘরে চলে গেলেন। যাবার সময় সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিলেন। তিনি ঘরে ঢোকার পরপরই আনিস বেরিয়ে এলো। দরজায় তালা দেখে বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এই বাড়িটা তেমন সুবিধার মনে হচ্ছে না। হাতে মাত্র কয়েকদিনের কাজ। তারপর এই বাড়ি ছাড়তে হবে।

শরিফা বেগম ঘুম থেকে জেগে উঠে স্বামীকে পাশে না দেখে অস্থির হয়ে পড়লেন। ব্যস্ত চোখে চারপাশে তাকাতেই দেখলেন – মহিউদ্দিন সাহেব জায়নামাজ বিছিয়ে বসে আছেন। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বিমর্ষ গলায় বললেন, “চা পান করবেন? বানিয়ে আনব?”

মহিউদ্দিন সাহেব জবাব দিলেন না। উঠে চলে গেলেন। ততক্ষণে চারপাশ ফর্সা হয়ে গেছে। দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। শরিফা বেগম ডান হাত দিয়ে চোখের পানি মুছলেন। মহিউদ্দিন সাহেব কঠিন মনের মানুষ। কবে তার মান ভাঙবে বোঝা বড় দায়। তবে কি তিনি ভুল করলেন? বোধহয় হাবিবের বিয়ে নিয়ে কিছু বলা উচিত হয়নি। যেখানে ছেলে-বউ সুখে আছে, সেখানে এসব কথার কোন প্রয়োজন ছিল না। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে কারোর সুখে হাত দিতে নেই। শরিফা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

কনক চুলায় চায়ের পানি চাপালো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চা পাতা খুঁজতে লাগল। নাইমা বলল, “আপা, তোমার সাথে কিছু কথা বলার ছিল।”

কনক বাঁকা চোখে তাকালো। গলার স্বর অন্যরকম করে বলল, “আমার সাথে তোর কিসের কথা থাকতে পারে? তোর সব কথা তো নববী আর ভাইকে নিয়ে। তাদের কেউ বাড়িতে নেই। কাজেই তোর কি কথা থাকতে পারে বুঝতে পারছি না।”

“মিলি আপার ব্যাপারে, উনি সকালবেলা ঘরের ভেতর হাঁটছিলেন আর সিগারেট খাচ্ছিলেন। আমি দেখে ফেলায় চমকে গিয়েছেন।”

“বিনা অনুমতিতে কেন গিয়েছিস?”

“তোমার সমস্যা কি জানো আপা? তুমি শশুর বাড়ির লোকের দোষ দেখতে চাও না।”

“এটা যদি তোর জরুরি কথা হয়, তবে আমি তা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছি না। অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নাক গলানো পছন্দ করি না।”

“ভাবি আর ভাইয়ের ব্যাপারে তো খুব নাক গলাও। তখন সমস্যা হয় না?”

কনক রেগে বেরিয়ে গেল। নাইমা ধোঁয়া ওঠা চায়ের পানির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মিলির ব্যাপারে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। আপা নিশ্চয়ই মা’কে বলে দেবে। তবে সে এখানে আনিসের ব্যাপারে বলতে এসেছিল। হঠাৎই মনে হলো তার আপাকে বলে কোন লাভ হবে না। বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। নাইমা অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করল। ঘরে গিয়ে নিজের জমানো টাকার সবগুলো নোট বের করল। বসরাই গোলাপের ঝাড়টা খুঁজে দেখতে হবে। কাজটা নিরাপদে করতে গেলে আনিসকে বাড়ির বাইরে পাঠানো জরুরি। সে টাকাগুলো নিয়ে কনককের ঘরে গেল। গলার স্বরে লজ্জা মিশিয়ে বলল, “তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য দুঃখিত আপা। তখন আমি মিলি আপার ব্যাপারে বলতে যাইনি। হঠাৎই চোখে পড়ায় বলেছিলাম।”

“তাহলে কি বলতে চাইছিস? তোর দুলাভাইয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে এসেছিস? সে ভালো না এ কথা বলতে এসেছিস? আবারও হাবিবের ব্যাপারে কিছু বলেছে?”

“না আপা, রোহানের ব্যাপারে।”

“আমার ছেলে কি করেছে? তোর বইখাতা নষ্ট করেছে?”

নাইমা কনকের কাঁধ স্পর্শ করল। তাকে খাটের ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, “তুমি অযথাই রাগারাগি করছ। আমি বলতে চাচ্ছিলাম- রোহানের শীতের পোশাকটা নষ্ট হয়ে গেছে। কাল রাতে আমার সাথে খেলছিল। তখনই খেয়াল করলাম -সোয়েটারের রঙটা কেমন যেন হয়ে গেছে। ভালো লাগছে না দেখতে।”

কনক কিছু বলল না। জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে নাইমার দিকে তাকিয়ে রইল। নাইমা ওড়নার নিচ থেকে টাকাগুলো বের করল। সেগুলো কনকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এগুলো আমার জমানো টাকা। এটা দিয়ে রোহানকে একটা সোয়েটার কিনে দিলে খুশি হব। এর থেকে বেশি আমার কাছে আর নেই। থাকলে সেটাও দিতাম।”

কনক হাসল। উজ্জ্বল চোখে টাকা গুনতে গুনতে বলল, “শুধু শুধু কথা শুনিয়েছি, কিছু মনে করিস না বোন।”

“কি মনে করব আপা? রোহান আমার খুব আদরের। ওকে কিছু দিতে পারলে আমারই ভালো লাগবে।”

“ঠিকই তো!”

“আপা একটা কথা বলি?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বল কি বলবি?”

“বলেছিলাম – আজই গিয়ে সোয়েটারটা কিনে নিয়ে এসো। শীত পড়ে গেছে। আর হ্যাঁ! দুলাভাইকে সাথে নিয়ে যেও। সে খুব ভালো দরদাম করতে পারবে।”

“এই কথাটা তুই ঠিকই বলেছিস। তোর দুলাভাইকে কেউ ঠকাতে পারে না। সেবার কি হলো জানিস? তোর দুলাভাই মাছ কিনতে গিয়েছে- লোকটা চাষের পাঙ্গাশ মাছকে নদীর পাঙ্গাশ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। মানুষটা এক মুহুর্তে ধরে ফেলল। বাকিরা তো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।”

নাইমা বিড়বিড় করে বলল, “মানুষ খুব সহজে তার জাতের লোক চিনতে পারে।”

কনক বলল, “কিছু বললি?”

“না আপা, আমার পরীক্ষা আছে। পড়তে হবে। তুমি আজই যেও কেমন?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, আজই যাব। সকালে খাবার পরপরই বের হব। তোর দুলাভাইটা যে কোথায় গেল!”

নাইমা জবাব দিলো না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার আগে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে গেল। কনক হাসি-হাসি মুখ করে টাকার দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আছে। মেয়েটা ভীষণ ভালো টাকা জমাতে পারে। রোহানের সোয়েটার কেনার পরও বেশ কিছু টাকা রয়ে যাবে। কনক ঠিক করল তাই দিয়ে একটা চাদর কিনবে। তবহুদিনের শখ একটা মখমলের চাদরের। আনিসকে বললে কিনে দিতে চায় না। বলে তার এখন হাতটান চলছে। হাতে টাকা আসলে কিনে দেবে।

সকালের নাস্তার সময় সে আনিসকে কথাটা বলল। বলল, “রোহানের সোয়েটারটা পুরনো হয়ে গেছে। নতুন কেনা প্রয়োজন। খাবার-দাবার পর একটু মার্কেটে যাবে?”

আনিস বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেললো। সরু গলায় বলল, “মাসের শেষ, অফিসও কামাই করছি। হাতে টাকা পয়সা নেই।”

“তোমার টাকা দিতে হবে। বাড়ি থেকে দিয়েছে। যাবে?”

“টাকা থাকলে তো কোন অসুবিধা নেই। ঠিক আছে চলো। খাওয়া-দাওয়ার পরই না হয় বের হলাম। তুমিও খেয়ে নাও।”

কনক খুশি মনে খেতে বসল। সে মায়ের থেকে চেয়ে আরও দুই হাজার টাকা নিয়েছে। তেমন হলে রোহানের বাবাকেও একটা কিছু কিনে দেওয়া যাবে।

নাইমা নিজের ঘরে অপেক্ষা করছিল। কনক এবং আনিস বেরিয়ে যেতেই সে তার মা’য়ের কাছে গেল। মিলি সকালেই ফিরে গেছে। মহিউদ্দিন সাহেব কাজে বেরিয়েছেন। শরিফা বেগম তখন দুপুরের রান্না জোগাড় করছিলেন। নাইমা তার কাছে গিয়ে বলল, “মা, সবুজের মা কাকি তোমায় ডাকতে এসেছিল। বলেছে ভীষণ দরকার।”

“কখন এসেছিল? আমাকে বললি না কেন?”

“এইতো একটু আগেই এসেছিল। বলেই চলে গেছে। কি যেন কাজ আছে বলল। ভীষণ জরুরি। এক্ষুনি যেতে হবে।”

শরিফা বেগম হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সবুজের মা তার বান্ধবীর মতো। বাড়িতে ভালো মন্দ কিছু রান্না করলে তার জন্য পাঠিয়ে দেয়। তিনি আর দেরি করলেন না। মাথায় কাপড় টেনে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। নাইমা তার সাথে সদর দরজা পর্যন্ত এলো। দরজা আটকে দিয়ে বলল, “মা তাড়াতাড়ি এসো। আমি ভেতর থেকে দরজা আটকে রাখছি। তুমি না আসলে খুলব না।”

শরিফা বেগম মাথা দোলাতে দোলাতে হাঁটতে লাগলেন। তার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। এই অসময়ে তাকে ডাকার কারণ কি হতে পারে? কেউ আবার অসুস্থ হয়ে পড়েনি তো! তিনি জোরে জোরে পা চালাতে লাগলেন। নাইমা খানিকক্ষণ তাকিয়ে দেখল। শরিফা বেগম একটু দূরে সরে যেতেই সে দৌড়ে গোলাপের ঝাড়ের কাছে এলো। চারপাশ ভালো মতো খুঁজে দেখতে লাগল। নাহ! কোথাও কিছু নেই। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? এখানে কিছু না কিছু থাকার কথা। সে দৌড়ে পুকুর ঘাটে এলো। বালতি ভর্তি পানি এনে গোলাপ ঝাড়ের চারপাশে ঢালতে লাগল। মাটি আলগা হলে পানির কারণে তা প্রকাশ পাবে। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। নাইমা হতাশ হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। তবে কি তার সন্দেহ মিথ্যে? আনিস বিশেষ কোন কারণে এখানে আসেনি। হঠাৎই তার নজর গোলাপ ঝাড়ের ভেতরে পড়ল। মাঝের কিছুটা অংশ ফাঁকা মনে হচ্ছে। সে ডালপালা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। গোলাপ ঝাড়টা বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে, সহজেই ভেতরে ঢোকা যায়। সে দেখল – ঝাড়ের ভেতরের এক জায়গার মাটি আলগা হয়ে আছে। কয়েকটা ডালও শুকনো। যেন কেউ কে’টে দিয়েছে। নিচে মাটির সাথে কিছু ইটের টুকরো রাখা। দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় না। নাইমা তার দু-হাত দিয়ে মাটি সরাতে লাগলো। কাজটা সে খুব দ্রুত শেষ করতে চাইছে, কিন্তু মনে হচ্ছে- তার হাত পা সীসার মতো জমে গিয়েছে। বেশ কয়েক মিনিট খোঁড়াখুঁড়ির পর নাইমা একটা পুঁটলিটা পেল। পলিথিন আর কাপড়ে মোড়ানো কিছু। পুঁটলিটা বেশ ভারী। সে আর-ও কিছু মাটি সরিয়ে দেখলো। খালিহাতে কাজটা করার জন্য তার হাত ছিঁ’লে গেছে। অল্প র’ক্ত বের হচ্ছে এবং জ্ব’ল’ছে। সে মাটি সরিয়ে আগের মতো করে রাখল। যেন হঠাৎ দেখতে কেউ বুঝতে না পারে। তারপর পুঁটলিটা নিয়ে ঘরে চলে এলো। ভয়ে তার হাত পা কাঁপছে। গলায় শুকিয়ে গেছে। সে পরপর দুই গ্লাস পানি পান করল। ঠান্ডা ভেতরও তার কপালে ঘাম জমেছে।

কনক স্বামী ছেলের হাত ধরে এ দোকান-ও দোকান ঘুরছে। কোন সোয়েটার তার পছন্দ হচ্ছে না। আনিস ভীষণ বিরক্ত। এই মহিলা নিয়ে কিছু কিনতে বের হলে ওই দিনটা মাটি হয়ে যায়। সারা বাজার ঘুরে ফেললেও কোন জিনিস তার পছন্দ হয় না। কনক রোহানের গায়ের ওপর একটা সোয়েটার চেপে ধরল। আনিসকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এটা ওর গায়ে ঠিক হবে?”

“দেখে তো ঠিক মনে হচ্ছে।”

“এটার রঙটা ভালো না। ফর্সা গায়ে মানাচ্ছে না। দাদা আপনি মেরুন কালারের কিছু দেখাতে পারবেন?”

দোকানি অনেক খুঁজে খুঁজে কয়েকটা কাপড় বের করল। সেগুলো একটা একটা করে কনককের হাতে দিয়ে বলল, “এগুলো দেখতে পারেন। বেশ ভালো কাপড়। খুব গরম হবে।”

কনক বলল, “কাপড়ের রঙ ভালো। তবে এটা ওর গায়ে ঠিকমতো হবে। সামনের বছর ছোট হয়ে যাবে। পরতে পারবে না। এই একই সোয়েটারের বড় সাইজ নেই?”

“না, এটার বড় সাইজ হবে না। আপনি অন্যকিছু দেখতে পারেন। এগুলোও বেশ ভালো।”

“না থাক। সোয়েটার লাগবে না। আপনি মখমলের চাদর দেখান। একটু দামী দেখাবেন।”

দোকানী চাদর খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আনিসের কনকের কাছে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, “সোয়েটার কিনবে, আবার চাদর দেখছ। এতো টাকা কোথায় পেলে?”

কনক হাসি-হাসি মুখ করে বলল, “নাইমা দিয়েছে। বলল- রোহানের সোয়েটার পুরনো হয়ে গেছে। নতুন কিনে দিতে। মা’য়ের থেকেও দুই হাজার চেয়ে নিয়ে এসেছি। মোট সাত হাজারের মতো আছে।”

আনিস ভ্রু কুঁচকে ফেললো। সে খুব দ্রুত চিন্তা করে বলল, “এসব টাকা নাইমা দিয়েছে?”

কনক মাথা দোলালো। উৎসাহী গলায় বলল, “হ্যাঁ। সকালে দিয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ঝগড়া করবে। পরে টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বলল- রোহানকে সোয়েটার কিনে দিতে। আজই কিনতে বলল। আবার তোমাকেও সাথে নিয়ে আসতে বলেছে। বলেছে – তুমি খুব ভালো দামাদামি করতে পারো।”

আনিস আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করল না। কনককে বলল, “আমার একটা জরুরি কাজ মনে পড়ে গেছে। তুমি ঘোরাঘুরি করে কেনাকাটা করো। এই নাও। আরও দুই হাজার রাখো। আমার জন্য একটা টি-শার্ট কিনবে। আমি গেলাম। রোহানকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেও।”

সে কনককে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। তড়িঘড়ি করে একটা রিকশায় উঠে বসল। রিকশাওয়ালা মামা বয়স্ক লোক। তিনি ময়লা ছেঁ’ড়া গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, “সাহেব কোথায় যাবেন?”

“আরে চালানো শুরু কর। মফস্বলের দিকে যাবি। তাড়াতাড়ি কর। তোর ভাড়া বাড়িয়ে দেব।”

“ওদিকে যাব না সাহেব। ওদিকে তেমন ভাড়া পাওয়া যায় না। তাছাড়া পথটা মেলা দূরের।”

“কথা না বলে চালাতে শুরু কর। এক হাজার দেব। এবার তো চল।”

লোকটা রিকশা চালাতে শুরু করলেন। যদিও তার ইচ্ছে করছিল- এই যাত্রীকে নামিয়ে দিতে। দেখতে শুনতে শিক্ষিত মনে হয়। কিন্তু ভদ্রতা জানে না। বাপের বয়সী লোককে তুইতোকারি করছে। তবে তিনি তা করতে পারলেন না। হাজার টাকা অনেক। অভাবের সংসারে এই টাকার মায়া ছাড়া যায় না।

চলবে