বসরাই গোলাপের ঝাড় পর্ব-১৪+১৫

0
440

#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল

১৪.
রাত দুইটার মতো বাজে। আকাশে একফালি চাঁদ চকচক করছে। চাঁদের গা গলে জোছনা গড়িয়ে পড়ছে। হাবিব সদর দরজা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দরজা সরালো নিঃশব্দে এবং কোমল হাতে। ধীর পায়ে হেঁটে সোহেলের ক’ব’রের সামনে এসে দাঁড়ালো। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। শীতের ঠান্ডা বাতাস। গায়ে হীম ধরে যায়। তবে সে সেই শীতলতা অনুভব করল না। বুকের দ’হ’ন য’ন্ত্র’ণা নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা কোন হওয়ায় থাকে না, সে হোক মাঘের কনকনে ঠান্ডা বায়ু, হেমন্তের তরল হাওয়া অথবা গ্রীষ্মের মধুর বাতাস। হাবিব চোখ ভিজে গেছে। অশ্রুকণা কপল গড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। সে সোহেলের ক’ব’রে হাত রাখল। ভেজা গলায় বলল, “প্রিয় সন্তান, আমার প্রথম বংশধর! তোমায় কিভাবে ভুলে থাকতে পারি? তোমার আধো বুলিতে বাবা ডাকার সুর, নিষ্পাপ সরল হাসি, কোমল মসৃণ ছোট আঙুলগুলো। দীর্ঘ নয় মাসের অপেক্ষা, সবকিছুতেই তুমি জড়িয়ে ছিলে। তোমায় কি করে ভুলে থাকা যায়? কি সেই পরশপাথর যা আমার হৃদয় থেকে তোমার স্মৃতি মুছে দিতে পারে? এমন কি কিছু আছে? নেই! কোথাও কিচ্ছু নেই। তুমি কি আমার কাছে থেকে যেতে পারতে না? আল্লাহ আমার আয়ু থেকে কিছুটা আয়ু তোমার দিতে পারতেন না! হে শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী, দয়াময় আল্লাহ, আমার মালিক, আমায় ধৈর্য দিন। আপনার পরীক্ষা সহ্য করার শক্তি দিন।”

সে আর কথা বাড়াতে পারল না। গলা ধরে এসেছে। কণ্ঠনালীর কাছে কোথাও কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে গেছে, কেমন ব্যাথা অনুভব হয়। হাবিব দু-হাত দিয়ে দু-চোখের পানি মুছল। দীর্ঘ মোনাজাত শেষে ঘরে ফিরে এলো। কিছুই আর ভালো লাগছে না।

নববী মেঝেতে চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছে। চোখে ঘুম নেই। নাইমা বারবার করে বলেছিল – তার পাশে ঘুমিয়ে পড়তে। সে রাজি হয়নি। পাছে কোন অসুবিধা হলে। এমনিতেই পরিস্থিতি ভয়ংকর রকমের খারাপের দিকে যাচ্ছে। আনিসের শরীর ভালো না। ডাক্তার জানিয়েছে যে কোন মুহুর্তে খারাপ কিছু ঘটতে পারে। সকালের আগেই পুলিশ পাহারায় রাজধানী পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিভাগীয় শহর থেকে বড় ডাক্তার এসেছিল। তিনিই এই পরামর্শ দিয়েছেন। কনক সমানে কাঁদছিল। রোহানের মুখের দিকে তাকানো যায় না। নববী লম্বা শ্বাস নিলো। আনিস তাকে যা-ই বলুক, সে যা-ই করুক। রোহানের কোন দোষ নেই। সে কেন বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে? কি করুণ নিয়ম এই পৃথিবীর!

নাইমা বিছানায় উঠে বসল। নিচু গলায় বলল, “ভাবী ঘুমিয়ে গেলে নাকি?”

“না, জেগে আছি। কিছু বলবে?”

“পিপাসা লেগেছে। পানি কোথায়?”

নববী উঠে বসল। লাইট জ্বালিয়ে ভালোমতো খুঁজে দেখে বলল, “পানি শেষ হয়ে গেছে। অপেক্ষা করো নিয়ে আসছি।”

“এত রাতে কোথায় যাবে?”

“আশেপাশে কারোর থেকে চেয়ে নেব। সমস্যা নেই।”

“অপেক্ষা করো। আমিও আসছি। একা যাবার প্রয়োজন নেই।”

নাইমা গায়ে চাদর জড়িয়ে নিলো। নববীর হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “সবাই ঘুমচ্ছে। শুনেছি নিচতলায় নিরাপদ পানির ট্যাপ আছে। ওখানে থেকেই নিয়ে আসি।”

নববী অমত করল না। দু’জনে মিলে লিফটের সামনে এসে দাঁড়ালো। লিফট চলছে। এতরাতে কে যাতায়াত করছে? দু’জনেই সরে এলো। নাইমা বলল, “আমার শরীর ভালো আছে। সিঁড়ি দিয়ে যাই?”

নববী মাথা দোলালো। তারা দু’জন খুব সাবধানে হাঁটছে। বোতলে পানি ভরার পরপরই নাইমা বাইরের দিকে তাকালো। বেশ কয়েকজন লোক একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা না গেলেও পরনের পোশাক স্পষ্ট বোঝা যায়। একজনের পোশাক তার খুব পরিচিত মনে হলো, ভাবল- নববীকে বলবে। কিন্তু কিছু বলল না। পানি নিয়ে নিজের বিছানায় ফিরে এলো। মনে মনে ভাবল -যেভাবেই হোক দুলাভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে ওই ডাইরির খোঁজ করতে হবে। এই রহস্য লুকিয়ে রাখতে দেওয়া যাবে না। কিছুতেই না।

শরিফা বেগমের চোখ লেগে এসেছিল। তিনি চোখ কচলে উঠে বসলেন। পানির বোতল থেকে দু’ঢোক পানি পান করে কনকের দিকে তাকালেন। তার ছেলে-মেয়ের জীবনে এ কেমন দুর্ভোগ নেমে এসেছে। প্রথমে হাবিব, কনক, এখনও নাইমাও অসুস্থ। কোন পূন্যের জোরে এ বিপদ কা’টা’বে?

শরাফত সারারাত ধরে নানান খোঁজ খবর করছে। কে’সের সাথে জড়িত প্রত্যেকের ব্যাপারে জানার চেষ্টা করছে। বিশেষ কিছু হাতে আসেনি। সাধারণ পরিবার মনে হচ্ছে। এদের এমন কোন শত্রু থাকতে পারে! সে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। পকেট থেকে ফোন বের করে কানে চেপে ধরে বলল, “কাল সকালের মধ্যে সবার ফোনকল লিস্ট আমার টেবিলে চাই। কে কার সাথে কখন দেখা করেছে সব তথ্য আমায় দেবে।”

ওপাশ থেকে বোধহয় স্বস্তির কথা শোনা গেল। শরাফতের কুঁচকে থাকা ভ্রু মসৃণ হয়ে গেছে।

বেলা দশটা নাগাদ, ডাক্তার সাহেবা নাইমাকে দেখতে আসলেন। ভদ্রমহিলা বেশ বয়স্ক, জুলফির কাছে কয়েকটা চুল সাদা হয়ে গেছে। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে নাইমার কব্জিতে হাত রাখলেন। কোমল গলায় বললেন, “তুমি বেশ সাহসী মেয়ে। আমি হলে তখনই অজ্ঞান হয়ে যেতাম।”

নাইমা হাসলো। ডাক্তার সাহেবা বললেন, “শরীর সুস্থ। মন ঠিক থাকলে একটু পরই ছুটির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করবে। যে কোন অবস্থাতেই শরীরের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।”

সে মাথা দোলালো। ডাক্তার সাহেবা অন্য রোগীর কাছে চলে গেলেন। নববী বলল, “উনি কিছু ভুল বলেননি। সত্যিই তুমি যথেষ্ট সাহসী এবং বুদ্ধিমতী।”

“তেমন কিছু নয় ভাবী। পরিস্থিতি সবাইকে সাহসী করে তোলে।”

“এখন কি করবে ভাবছ?”

“আপাতত আর কিছু করব না। ক্লান্ত লাগছে। এবার যা করার পুলিশ করুক।”

নববী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,“তোমার ভাইকে যদি বোঝানো যেত!”

“ভাইয়াও বুঝবে। আমাদের সমস্ত স’ন্দে’হ ছিল দুলাভাইকে ঘিরে। এখন সে-ই মৃ’ত্যুর সাথে ল’ড়া’ই করছে। কার কাছে যাব? কিভাবে কি করব?”

“সেটাই। কিন্তু তোমার ভাই বুঝতে চাইবে না।”

“অন্ধকারে পথ খুঁজে পাওয়া যায়, আলো নয়। আলোর খোঁজ করলে ভুল হবে। আমাদের এখন নতুন পথ খুঁজতে হবে।”

নববী কিছু বলল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল। এদিকের কাজ শেষ হবার পর তারা দু’জনে রোহানের কাছে গেল। রোহান ঘুমচ্ছে। ছেলেটার চোখ-মুখ শুকনো দেখাচ্ছে। শরিফা বেগম বললেন, “ডাক্তার কি বলল?”

“আমি ঠিক আছি মা। চিন্তা করো না।”

শরিফা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, “আনিসের অবস্থা ভালো না। ঢাকায় নিয়ে গেছে। মনে হয় এতক্ষণে পৌঁছেও গেছে।”

“সাথে কে গেছে?”

“বেয়াই সাহেব আর আনিসের এক মামা। তোর বাবা যেতে চেয়েছিল। ওরা বলল – বেশি মানুষ যাবার দরকার নেই।”

নাইমা কিছু বলল না। ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। ওই বাড়ি যাওয়ার দরকার। কিন্তু কিভাবে? সরাসরি বলার উপায় নেই, সবাই নানান প্রশ্ন করবে। হাবিব অথবা নববীকেও কিছু বলতে চাচ্ছে না। কনক বলল, “সবই আমার কপালের দোষ।”

“দুশ্চিন্তা করো না আপা। আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কনক কিছু বলল না। রোহান জেগে উঠেছে। নববী বলল, “রোহানকে কিছু খেতে দেন। মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। এত ঝামেলার মাঝে বাচ্চাটার খেয়াল রাখা হচ্ছে না।”

নববী কথা শেষ হবার পরপরই মিলি আসলো। নরম গলায় বলল, “ভাবী দুধ নিয়ে এসেছি। গরম গরম খাইয়ে দাও। ডাক্তার কি বলল? আর কতদিন থাকতে হবে?”

“জানি না। বলল আর কয়েকটা দিন দেখে যান।”

“আচ্ছা বেশ, থাকো। সুস্থ হবার পর গেলেও সমস্যা হবে না। ভাইয়াকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। পৌঁছে গেছে। এখন অপারেশন চলছে।”

“আল্লাহ ভরসা।”

কনক মগে গরম দুধ ঢাললো। রোহানের মুখের সামনে ধরে কোমল গলায় বলল, “নাও বাবা। শরীরে শক্তি পাবে।”

রোহান মুখ ঘুরিয়ে নিলো। নাইমা বলল, “আমাকে দাও আপা। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

কনক অমত করল না। দুধের মগ নাইমার হাতে দিয়ে সরে বসল। বোনের এই ব্যাপারে সে খুব বিশ্বাস করে। ছোট থেকে নাইমা রোহানকে প্রচন্ড ভালোবাসে। টিফিনের টাকা জমিয়ে নানান রকমের খেলনা, জামা-কাপড় কিনি দিয়েছে। রোহানও তার খালার খুব বড় ভক্ত।

নাইমা বলল, “খেয়ে নাও বাবা। দুধ না খেলে শক্তি পাবে না।”

রোহান ভদ্র ছেলের মতো অনেকখানি দুধ পান করল। শেষের কিছু ইচ্ছে করেই নাইমা তার গায়ে ঢেলে দিলো। কনক বলল, “কি করলি? হাসপাতালে ওর এই একটা সোয়েটার আছে। এটাকে নষ্ট করে ফেললি।”

“সমস্যা নেই আপা। নতুন কিনে দেওয়া যাবে বা বাড়ি থেকে নিয়ে আসব।”

“কিনতে হবে না। ওর আব্বার বাড়িতে অনেক সোয়েটার আছে। ওখান থেকে নিয়ে আসলেই হবে।”

শরিফা বেগম বললেন, “এত ঝামেলার দরকার নেই। তোর আব্বাকে বললে নতুন কিনে দিবে।”

নাইমা বলল, “তাহলে আব্বাকেই বলে দেখো।”

শরিফা বেগম বিরক্ত চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। এসব ঝামেলা আর সহ্য করতে পারছেন না। মহিউদ্দিন সাহেব দুপুরে খাবার পরপরই আসলেন। শরিফা বেগম বললেন, “রোহানের সোয়েটারে দুধ পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। একটা সোয়েটার কিনে দিতে পারো?”

মহিউদ্দিন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, “আগের নেই? এমনিতেই অনেক খরচ হয়ে যাচ্ছে। টাকায় হাত টান।”

মিলি বলল, “সমস্যা নেই। রোহানের অনেক শীত কাপড় আছে। এ বছর বাবা দু’টো নতুন কিনে দিয়েছে। সমস্যা হলো আমি এখন গিয়ে আবার ফিরতে পারব না।”

নাইমা যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ব্যস্ত গলায় বলল, “তাহলে আমি যাই। সোয়েটার নিয়ে চলে আসব। বেশি সময় লাগবে না।”

কনক অমত করলেও মহিউদ্দিন সাহেব এবং শরিফা বেগম রাজি হলেন। নাইমা মিলির সাথে বেরিয়ে পড়ল। মিলি বাইক চালায়। সে নাইমার হাতে একটা হেলমেট ধরিয়ে দিয়ে বলল, “ভয় পাবে না। আমি দারুণ ভালো চালাই।”

নাইমা মেকি হাসি হাসল। বলল, “আপনাকে দেখে বোঝাই যায় না। আপনার এত গুণ আছে।”

মিলি কিছু বলল না। বাইক স্টার্ট দিলো। আনিসের বাড়িটা বেশ সুন্দর। দোতলা বিল্ডিং, সামনে অনেকটা জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। নাইমা এ বাড়িতে বেশ কয়েকবার এসেছে। তাই সবকিছুই তার চেনা-জানা। সে আনিসের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তালা লাগানো দেখছি। চাবি কোথায়?”

মিলি চাবি এনে দিলো। বলল, “আমাকে শাওয়ার নিতে হবে। গা কুটকুট করছে। তুমি দেখে নাও কি কি নেবে।”

নাইমা দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকল। বড়সড় কামরা। সবকিছু ছিমছাম করে গোছানো। একপাশে পড়ার টেবিল এবং বুকশেলফ রাখা। সে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। প্রায় বিশ মিনিট খোঁজার পরও ডাইরির সন্ধান পেলো না। আনিসের মা দরজা ঠেলে বললেন, “কে এখানে?”

নাইমা ঘাবড়ে গিয়ে তাকে সালাম দিলো। হড়বড় করে বলল, “আন্টি আমি। রোহানের সোয়েটার নিতে এসেছি।”

“ওহ আচ্ছা। নাও। ভালো আছো মা?”

“আল্লাহ যেমন রেখেছেন। আপনার শরীর ভালো?”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ম’রা গলায় বললেন, “আর শরীর! তুমি খোঁজাখুঁজি করো। কনক মনে হয় ওয়ারড্রবের ভেতরে শীতের কাপড় রাখে। ওখানে খুঁজে দেখতে পারো। আমি যাই, দুপুরের ওষুধ খাওয়া হয়নি।”

নাইমা মাথা দোলালো। ভদ্রমহিলা চলে গেলেন। যাবার সময় দরজা ভেজিয়ে দিয়ে গেলেন। নাইমা বইয়ের ভেতরে খুঁজে দেখতে লাগল। একদম নিচে রাখা একটা খাতার মাঝে ডাইরির ছেঁড়া দু’টো পৃষ্ঠা পেল।
আনিসের হাতের লেখা। লেখার প্রথম লাইনটা – নিজেকে ভীষণ অভাগা এবং অমানুষ মনে হচ্ছে। নিষ্পাপ বাচ্চার খু’নি আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমায় তা মেনে নিতে হচ্ছে।

কারোর পায়ের শব্দে কাগজগুলো কোমরে গুঁজে ওয়ারড্রবের কাছে যেতেই মিলি দরজা খুলল। সরল গলায় বলল, “তোমার কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেলে?”

“না এখনও পাইনি।”

“কি এমন খুঁজতে এসেছ যে এখনও পেলে না?”

“কি খুঁজতে আসব?”

“কি খুঁজতে এসেছ তা তো তুমিই ভালো জানো। আমায় প্রশ্ন করার প্রয়োজন কি?”

“আপা কোথায় রেখেছে বুঝতে পারছি না।”

মিলি এগিয়ে এসে ওয়ারড্রব খুলল। চোখের ইশারায় সোয়েটার দেখিয়ে বলল, “সবকিছু এখানেই। কি করছিলে তুমি?”

নাইমা ঘাবড়ে গেল। মিলির কথাবার্তা ধরন সুবিধার মনে হচ্ছে না। সে কি তাকে চোর ভাবছে নাকি সে ডাইরির রহস্য জানে। তার কপাল ঘামতে লাগল। মিলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাবিব দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বিরক্ত গলায় বলল, “শরীর খারাপ নিয়ে এখানে এসেছিস কেন?”

“সোয়েটার নিতে এসেছিলাম।”

“নেওয়া হয়েছে।”

নাইমা দু’টো সোয়েটার উঠিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে মাথা দোলালো। হাবিব বলল, “জলদি কর। সন্ধ্যা হয়ে যাবে।”

হাবিবের পরনে জিন্সের প্যান্ট এবং সাদা শার্ট। কালো রঙের হুডি কাঁধের ওপর ফেলে রেখেছে। তাকে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মিলি সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নাইমাকে আর কিছুই বলল না।

মহিউদ্দিন সাহেব গম্ভীর ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। হাবিব বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, “কিছু বলবে? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

“আব্বা, আপনি খুব বুদ্ধিমান এবং সর্তক একজন মানুষ।”

“তাতে কি হলো?”

“কি বুঝে নাইমাকে মিলির সাথে ওই বাড়ি যাবার অনুমতি দিলেন? যদি ওর কোন ক্ষ’তি হয়ে যেত।”

“নাইমা নিজেই আমাকে বলেছে সে ওই বাড়ি যেতে চায়। সোয়েটার শুধুমাত্র একটা বাহানা। ইন্সপেক্টর শরাফত ওকে কিছু খুঁজতে বলেছে বলল।”

“আপনি এই কথা বিশ্বাস করেছেন? শরাফত উল্লাহ পুলিশ অফিসার। চাইলে সে নিজেই তদন্ত করতে পারে। নাইমাকে কেন বলবে?”

মহিউদ্দিন সাহেব চমকে উঠলেন। তিনি এই ব্যাপারটা ভাবতে ভুলে গেছিলেন। নাইমা কখনও মিথ্যে কথা বলে না। তাই ওভাবে কিছু ভেবে দেখার দরকার হয় না। কিন্তু আজ কেন বলল? কি এমন জরুরি কারণ থাকতে পারে এর!

চলবে

#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল

১৫.
ডাক্তার শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করলেন। আনিসকে বাঁচানো সম্ভব হলো না। একটা বু’লে’ট তার হার্ট ছিদ্র করে বেরিয়ে গেছে। র’ক্তক্ষ’রণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আনিসের বাবা মানিক মিয়া ইনসেন্টিভ কেয়ার ইউনিটের দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। কম বয়সী একজন নার্স এসে তার সামনে দাঁড়ালো। মিষ্টি রিনরিনে গলায় বলল, “এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এদিকে এসে বসুন।”

মানিক মিয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন। চোখের কোটরে অশ্রু টলটল করছে। নার্স আবারও বলল, “আসুন। দাঁড়িয়ে থাকবেন না। আমার সাথে আসুন।”

মেয়েটা তার হাত ধরে চেয়ারে বসালো। একটা আপেল এনে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “খেয়ে নিন। মেয়ে হিসাবে বলছি।”

তিনি অমত করলেন না। আপেলে কামড় বসালেন। আনিসের মামা বললেন, “দুলাভাই, লা’শ দিতে সময় লাগবে। পুলিশের লোক বলল এখান থেকে পো’স্ট’ম’র্টে’ম করিয়ে রিপোর্টে নিয়ে যাবে।”

“জীবনের কি মূল্য! শেষ পর্যন্ত লা’শটাও অক্ষত রইল না।”

তারা দু’জনেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
কনক রোহানের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। চুল আঁচড়াতে গিয়ে নানান কথা বলছে। রোহান সেসব কথা কানে তুলছে না। নিজের মতো করে উদাসীন চোখে তাকিয়ে আছে। শরিফা বেগম বললেন, “রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেছে। আনিসের কোন খবর পাওয়া গেল না। কল দিয়েছিলি?”

“দিয়েছিলাম। একবার রিসিভ করে বলেছে- অপারেশন শেষ হয়নি। হলে জানাবে।”

“তারপর আর কিছু বলেনি?”

“না মা, আর কিছুই বলে না। আমার মনে হয় না তোমাদের জামাই আর কখনও ফিরে আসবে।”

“এ কথা বলছিস কেন?”

“আমি বলছি না। মনটা ভীষণ কু ডাকছে। রাতে ঘুম হয়নি। শেষ রাতের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল। দেখলাম- আমার গায়ে সাদা শাড়ি, খোলা চুলে পুকুর ঘাটের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। একটা দাঁত পড়ে গেছে। ওটা পানিতে ফেলতে যাচ্ছি। রোহানের বাবা আমায় নাম ধরে ডাকছে। যেতে বারণ করছে।”

“এমন স্বপ্নের কোন মানে নেই। অযথা চিন্তা করিস না।”

“ভোর রাতের স্বপ্ন।”

“এসব কিছু না। উল্টো পাল্টা চিন্তা করেছিস তা-ই এমন স্বপ্ন দেখেছিস।”

কনক কিছু বলল না। চুপ করে রইল। কথার পিঠে কথা বলতে ভালো লাগছে না তার। হঠাৎই দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে।

নববীর ঘুম ভাঙলো অনেক বেলায়। রোদে ঝলমল করছে চারদিক। ঘড়িতে বাজছে ন’টা। চমৎকার সকাল। মন ভালো করে দেবার মতো চমৎকার। তবুও তার মন খারাপ হলো। হাবিব বিছানায় নেই। কোথায় গেছে বলে যায়নি। রান্না বাকি, হাসপাতালে খাবার পাঠাতে হবে। শরিফা বেগম বেশ কয়েকবার করে বলে দিয়েছেন – কবুতরের মাংস রাঁধবে। তোমার শশুর চিংড়ি মাছ এনে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। সেগুলো কে’টে ধুয়ে নারকেল দুধ দিয়ে বিরিয়ানি করবে। দুধ গরম করে পাঠবে। শোনার পর তার কিঞ্চিৎ রাগ হয়েছে। হাসপাতালে কে এত ফর্দ করে খাবার পাঠায়! তবে রাগ হলেই বা আর উপায় কি। করতেই হবে। নববী বিছানা ছেড়ে নামল। ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগাতে লাগতে বাথরুমের দরজা আটকে দিলো। ট্যাপের পানি ঠান্ডা। শরীরে ছোঁয়ালে গা হীম হয়ে আসে। সে বেশ অনেক সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো। রান্নাঘরে গিয়ে চোখ কপালে তুলে বলল, “একি তুমি! এসব কি করছ?”

নাইমা স্বাভাবিক গলায় বলল, “রান্না করছি। উঠতে দেরি দেখে ভাবলাম শরীর খারাপ।”

“কি রান্না করেছ তুমি?”

“ফ্রিজে চিংড়ি মাছ দেখলাম সেগুলো কে’টে ধুয়ে মশলা বেটে রেখেছি। রাইস কুকারে ভাত বসিয়েছি অনেকক্ষণ। হয়ে এসেছে বোধহয়।”

“চুলার ওপর কি?”

“পেঁয়াজ কলি, আলু, গাজর, ফুলকপি মিলিয়ে একটা সবজি করেছে। আর মুগ ডাল।”

“এতসব রান্না শিখলে কিভাবে?”

“তোমাদের দেখতে দেখতে হয়ে গেছে।”

নববী হাসল। তার মন ভালো হয়ে গেছে। মন ভালো হয়েছে বললে ভুল বলা হবে, সে ভীষণ খুশি হয়েছে। এতসব কাজ এগিয়ে রাখলে যে কারোরই ভালো লাগবে। নববী নাইমাকে সরিয়ে চুলার পাশে দাঁড়ালো। নাইমা গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বলল, “ভাবী তোমায় একটা কথা বলব?”

“কি কথা বলবে? অনুমতি নিচ্ছ কেন?”

“কথাটা খুব গোপন রাখতে হবে। এমনকি ভাইয়াকেও বলা যাবে না।”

নববী বিস্মিত চোখে তাকালো। শুকনো মুখে বলল, “কি এমন কথা যা তোমার ভাইকেও বলা যাবে না?”

নাইমা নববী হাত চেপে ধরল। বলল, “কথা দাও বলবে না। তারপর বলব।”

নববী চোখের ইশারায় তাকে আস্বস্ত করল। নাইমা কোমরে গোঁজা কাগজ বের করে নববীর হাতে দিয়ে বলল, “পড়ে দেখো। কিসব লেখা আছে।”

নববী ভাবলো – কেউ নাইমাকে প্রেমপত্র দিয়েছে। তাই সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাগজটা পড়তে শুরু করল। হাতের লেখা পরিষ্কার এবং চেনা চেনা।

‘নিজেকে ভীষণ অভাগা এবং অমানুষ মনে হচ্ছে। নিষ্পাপ বাচ্চার খু’নি আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমায় তা মেনে নিতে হচ্ছে। কি-ই বা করতে পারি আমি? হাত পা বাঁধা। মুখ খুললে মুখটাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এই অবস্থায় আমার সত্যিই আর কিছু করার নেই। তবে আমি এ অন্যায় মেনে নিতে পারেনি। কিছুতেই না। অর্থলোভী দুশ্চরিত্র হলেও আমি খু’নি হতে চাই না। সূর্যের কিরণ, চাঁদের জোছনা দেখার আগেই তার চোখের আলো মুছে গেল। এ কি মেনে নেওয়া যায়!’

এতটুকু পড়ে নববী তার ভ্রু কুঁচকে ফেললো। বিস্মিত গলায় বলল, “কার কি?”

“রোহানের সোয়েটার আনতে গেছিলাম। সেখানেই একটা খাতার মধ্যে পেয়েছি। দুলাভাইয়ের হাতের লেখা চিনতে পারছ?”

“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এটা উনার হাতের লেখা। এজন্যই চেনা চেনা লাগছিল।”

“কোন বাচ্চার খু’নের কথা বলেছে ভাবী? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের সোহেলের কথা বলেনি তো?”

নববী বুক কেঁপে উঠলো। নিজেকে সামনে নিয়ে বলল, “না নাইমা। এখানে অন্যকারো কথা বলা হয়েছে। এমন কোন বাচ্চার কথা যাকে জন্মানোর আগেই মে’রে ফেলা হয়েছে।”

“কে হতে পারে? কার বাচ্চা? কিছুই বুঝতে পারছি না।”

নববী কাগজটা ভালো মতো দেখল। আর কিছু লেখা নেই। পৃষ্ঠার নিচের দিকে লেখার হালকা ছাপ পড়ে আছে। সে নাইমাকে লেখাটা দেখালো। নাইমা দৌড়ে গিয়ে পেন্সিল নিয়ে এলো। বলল, “পেন্সিল দিয়ে দাগালে হয়তো বুঝতে পারব।”

“নাও। আমার পর্দা টেনে দিয়ে আসছি।”

নাইমা অনেক সময় নিয়ে কাজটা শেষ করল। লেখাটা কারোর ফোন নম্বর মনে হচ্ছে। নববী নিজের মোবাইল নিয়ে এলো। বলল, “কল দিয়ে দেখবে?”

“না ভাবী। এই নম্বর দিয়ে কল দিলে ভুল হবে। আমাদের এমন একটা নম্বর দিয়ে কল দিতে হবে যেটা আমরা কেউ ব্যবহার করি না।”

“আমার কাছে এমন একটা সীমকার্ড আছে। আমার মায়ের, ভুলে রেখে গেছিল।”

“ওই নম্বর দিয়ে একবার চেষ্টা করা যায়।”

“তুমি রান্নাটা দেখো। আমি নিয়ে আসছি।”

নাইমা কড়াইয়ে পানি গরম দিয়ে তাতে চিংড়ি মাছগুলো ছেড়ে দিলো। পরিমানমতো লবন হলুদ মিশিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলো। নববী বেশ দ্রুতই ফিরল। নববী বলল, “নাইমা, তুমি কথা বলো।”

“কি কথা বলবে?”

“প্রথম দেখি কে রিসিভ করে। তারপর ভাবা যাবে।”

দু’বার রিং হবার পর কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে অল্প বয়সী এক মেয়ের গলা ভেসে আসছে। মেয়েটা মিষ্টি রিনরিনে গলায় বলল, “কাকে চাইছেন?”

নাইমা গলা কেশে সালাম দিয়ে বলল, “আমি কি জানতে পারি আমি কার সাথে কথা বলছি?”

“আপনি কল দিয়েছেন। আপনিই বলবেন আপনি কাকে চাইছেন।”

“বিব্রত করার জন্য দুঃখিত মেডাম। আসলে আপনার নম্বরটা একজন ছাত্রের প্রোফাইল থেকে নেওয়া হয়েছে। আমরা সদ্যই একটা কোচিং সেন্টার খুলেছি। আপনি চাইলে আপনার পরিচিত বাচ্চাদের এখানে ভর্তি করাতে পারেন।”

“আপনি কোন জায়গা থেকে কথা বলছেন?”

“বাগেরহাট জেলা থেকে কথা বলছি মেডাম। আপনি কি আশেপাশেই থাকেন?”

“হ্যাঁ, বাগেরহাটেই থাকি। তবে আমার কোন বাচ্চা নেই।”

“দুঃখিত মেডাম। আপনার পরিচিত কি কেউ আছে যাকে ভর্তি করানো যাবে?”

“হ্যাঁ আছে। চার্জ কত আপনাদের?”

“আলোচনা সাপেক্ষ। কোন শ্রেণির শিক্ষার্থী ভর্তি হবে সে বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।”

“পরে জানাবো।”

“আমি কি জানতে পারি আপনি কোন জায়গা থেকে কথা বলছেন?”

“সদরের ভেতরেই আমাদের বাসা।”

“সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ মেডাম।”

মেয়েটি কল কে’টে দিলো। নববী বলল, “নাইমা, তুমি এমন কথা বলা শিখলে কোথা থেকে?”

“কোচিংয়ের এক ভাইয়া শিখেছিল। সে যাইহোক। কাজের কিছুই পেলাম না।”

“আবার চেষ্টা করতে হবে। আমার মন বলছে উনি আবার কল দিবেন। তোমার ভাই কোথায়?”

“সকালে বেরিয়ে গেছে। আমার সাথে কথা বলেনি। আব্বাও দেখলাম ভাইয়ার সাথে গেল।”

“কোথায় যেতে পারে?”

“জানি না। কাজ থাকবে হয়তো। তুমি বাকি রান্না শেষ করো। হাসপাতালে যেতে হবে।”

“দুলাভাইয়ের কোন খবর পাওয়া গেল?”

“এখনও পর্যন্ত না। মা বলল কিছুই জানে না।”

“ওহ আচ্ছা।” নববী নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। নাইমা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসল। তার মাথা ধরে আছে। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলেও সে আনিসের কথা ভুলতে পারছে না। শেষ মুহুর্তে কি মনে করে দুলাভাই তাকে বাঁচাতে পারে? কি?

নববীর রান্না শেষ হতে সাড়ে দশটার মতো বাজাল। হাবিব বাড়ি ফেরেনি। কল দিয়ে বলেছে -অফিসে চলে এসেছি। নাইমাকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে চলে যেও। পারবে না?
সে বলেছে তারা পারবে। হাসপাতাল খুব বেশি দূরে নয়। অটোরিকশায় ত্রিশ টাকার পথ। নববী খাবার গুছিয়ে ফেলল। নাইমাকে সাথে নিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করে দু’জনে বের হলো। নাইমা বলল, “ভাইয়ার খোঁজ পেলে?”

“অফিসে, কি একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে।”

বাকি পথ তাদের মধ্যে কোন কথা হলো না। হাসপাতালে ঢোকার পরপরই ওই নম্বর থেকে কল আসতে লাগল। নববী ফিসফিসিয়ে বলল, “নাইমা, সেই মহিলা কল দিচ্ছে।”

নাইমা বলল, “একটু ওয়াশরুমে যাব।”

কনক বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। সপ চোখ না খুলেই বলল, “ওপাশের বাথরুম ভালো। পরিষ্কার।”

“ভাবী এসো না। একা যেতে ইচ্ছে করছে না।”

নববী ব্যস্ত পায়ে হাঁটল। তাদের চোখের আড়াল হতেই বলল, “দু’বার কল দিয়েছে।”

নাইমা কল ব্যাক করল। মেয়েটি বলল, “আমার ভাইপো ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। তাকে পড়াতে পারবেন?”

“নিশ্চয়ই পারব মেডাম।”

“সরাসরি কথা বলতে চাচ্ছি। কোথায় আসতে হবে?”

নাইমা কিছুক্ষণ ভাবলো। বলল, “কলেজের পাশেই আসুন মেডাম। ওখানে কোথাও বসে কথা বলে নেব। সব ঠিকঠাক না করে ঘর ভাড়া করা সম্ভব হয়নি।”

“সমস্যা নেই। কলেজের সামনেই আসব। প্রায় একটা বেজে গেছে। কখন আসব?”

“এক্ষুনি আসতে পারলে আসুন। কলেজ টাইম শেষ হলে আমরা বাড়ি ফিরে যাই।”

“আমার মিনিট চল্লিশ সময় লাগবে।”

“আসুন। আপনি আপনার সময় নিয়েই আসুন।”

নাইমা কল কেটে দিলো। নববী বলল, “সত্যিই যাবে?”

“তাছাড়া আর কি করব? উনার সাথে কথা বলা জরুরি। কাগজটা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। ওইটাই দেখাব।”

“যদি কোন বিপদ হয়?”

“এমনিতেই বিপদে আছি। আর কি বিপদ হবে?”

“তোমার ভাইকে বলে গেলে হয় না?”

“ভালো কথা বলেছ।”

নাইমা হাবিবকে কল দিলো। বলল, “ভাইয়া, আমি আর ভাবী কলেজের মোড়ে ফুচকা খেতে যাচ্ছি। তোমায় জানিয়ে গেলাম।”

“এমন সময়ে তোদের ফুচকা খেতে হবে না। ফেরার পথে আমি নিয়ে আসব।”

“উফ! ভাইয়া, আমরা তো হাসপাতালে এসেছি। ফেরার পথে যাব। বেশি দূর না। চিন্তা করো না। তাছাড়া তোমায় তো জানিয়ে গেলাম।”

হাবিব কিছু বলবে তার আগেই তার অফিসের বস তাকে ডাকলো। সে কল কে’টে দিয়ে বসের সাথে কথা বলতে লাগলো। শরিফা বেগম বললেন, “তোরা এখনি ফিরে যাবি?”

“হ্যাঁ মা। বাড়িতে কেউ নেই। এখানে থেকে কি করব বলেন?”

“ঠিকই। আচ্ছা যাও। সাবধানে যাবে।”

ওরা দু’জন বেরিয়ে গেল। রিকশা ঠিক করে তাতে চড়ে বসলো। বাচ্ছা ছেলে রিকশা চালাচ্ছে। পান খেয়ে দাঁত লাল করে ফেলেছে। পিচ পিচ করে পানের পিক ফেলছে। র’ক্তের মতো টকটকে লাল পিক। দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে।

কলেজের সামনে লোকজনের অভাব নেই। সকলেই নিজেদের মতো করে চলাচল করছে। কাঁটায় কাঁটায় চল্লিশ মিনিট পর মেয়েটি কল দিলো। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। নববী হাত উঁচু করে এগিয়ে গেল। মেয়েটির বয়স খুব অল্প নয়। স্বাস্থ্যবান চেহারা, কমলা রঙের শাড়ি পরে আছে। ঠোঁটে কড়া লাল রঙের লিপস্টিক। মেয়েটি তাদের নিয়ে একটা ফুচকা দোকানে বসল।

চলবে