#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল
১৬.
ফুচকার দোকানে অসম্ভব ভীড়। কলেজের সময় শেষ বলেই শিক্ষার্থীর অভাব নেই। গিজগিজ করছে চারদিকে। মেয়েটা নাইমার দিকে হাত বাড়ালো। সরল গলায় বলল, “আমি মেহরিমা। তোমাদের পরিচয়?”
“জ্বি আমরা,”
“সত্য পরিচয় বলো মেয়ে, তোমরা কারা? আমার নম্বর কোথায় পেলে?”
নাইমা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে নববী সব সত্যি বলল। বলল, “নম্বর এই কাগজ থেকে পেয়েছি। সবই শুনলে, চাইলে সাহায্য করতে পারো আর না চাইলে তোমার ইচ্ছে।”
মেহরিমা খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে রইল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। চোখের পানি মুছে বলল, “অন্য কোথাও বলি?”
“কোথায় বলবে?”
মেহরিমা উঠে হাঁটতে শুরু করল। নাইমা বলল, “ভাবী, উনি কি করতে চাইছেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
“জানি না নাইমা। একদম নিরিবিলি জায়গায় যাব না। নিশ্চিন্ত থাকো।”
“সব কথা বলে দেওয়া কি ঠিক হয়েছে?”
“কি করতে? লুকিয়ে কি লাভ হতো?”
নাইমা আর কিছু বলল না। মেহরিমা কলেজের ভেতর ঢুকে পুকুর ঘাটে বসল। নববীর দিকে ইশারা করে নিচু গলায় বলল, “তুমি আমার বয়সী হবে। তাই তুমি করেই বলছি। যা জানিয়েছ তা সত্যি মনে হচ্ছে। সেজন্যই কথাগুলো বলছি।”
“কি কথা?”
“আনিস আমার স্বামী। বছর খানেক আগে আমরা দু’জন বিয়ে করেছি। কাজী অফিসে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিয়ে হয়েছে।”
নাইমা চমকে উঠলো। বিস্মিত গলায় বলল, “কি বলছেন এসব? দুলাভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী আছে!”
“সত্যি বলছি। বিশ্বাস না হলে প্রমাণ দেখাতে পারি।”
“আপনাকে কেন বিয়ে করবে? দুলাভাই বউ ছেলে নিয়ে সুখে ঘরসংসার করে। আপনিই বা কেন তাকে বিয়ে করলেন?”
“সে বিবাহিত কথাটা আমার জানা ছিল না। ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়ে চাচির সংসারে বড় হয়েছি। বুঝতে শেখার পর থেকেই জীবনটা দূর্বিষহ লাগে। পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। চাচা পছন্দ করে এক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছিল। সংসার টিকল না। একা থাকতাম। একটা হাসপাতালে আয়ার কাজ করতাম। সেখান থেকেই আনিসের সাথে পরিচয় হয়। তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে জড়িয়ে পড়ি। আমায় বলেছিল সে অবিবাহিত। সংসার আছে জানতাম না। জানলে কখনোই এমন করতাম না।”
“কবে জানতে পারলে?”
“আজ তোমাদের কাছ থেকে শুনলাম। আগে সন্দেহ করেছি। প্রমাণ পাইনি। বিবাহিত এ কথা কখনও স্বীকার করেনি। সে আমায় বলেছিল -তার মা বাবা আমায় মেনে নিবে না। তাদের বাড়িতে উঠতে দেবে না। অবাক হয়নি। অশিক্ষিত এক স্বামীর ঘর করা মেয়েকে কে তার ছেলের বউ করতে চাইবে? কেউই চায় না। আনিস বলেছিল – সে আমায় ভালোবাসে। আমাকেই বিয়ে করতে চায়। বাবা মায়ের অমতে কাজী অফিসে বিয়ে করে নেবে। কয়েকজন বন্ধু সাক্ষী থাকবে।”
“তুমি রাজি হয়ে গেলে?”
“আশ্রয়ের আশায়। সংসার, স্বামীর ভালোবাসার লোভে। যা বলেছে মেনে নিয়েছি। বিয়ের পরে আমায় বাসা ভাড়া করে দিয়েছিল। সেখানেই থাকি। মাঝেমধ্যে সে আমার কাছে আসে।”
“শেষ কবে এসেছিল?”
“কয়েকদিন আগে একবার এসেছিল। বলল জরুরি কাজে বাইরে যাবে। কয়েকদিন আসতে পারবে না। বিশেষ যোগাযোগও হবে না।”
“ওহ আচ্ছা।” নববী আর কিছু বলতে যাবে তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল। হাবিব কল দিয়েছে। নববী কল রিসিভ করে বলল, “বলো, কি হয়েছে?”
“তোমরা কোথায়?”
“কলেজের কাছে। কেন?”
“বাড়ি ফেরো এক্ষুনি। কাজ আছে।”
“কি কাজ? সিরিয়াস কিছু?”
“দেখা করে বলছি।”
সে কল কেটে দিলো। নাইমা বলল, “ভাবী, কি হয়েছে?”
“তোমার ভাই বাড়ি ফিরতে বলেছে।”
মেহরিমা বলল, “কাজ আছে তোমাদের?”
“হ্যাঁ, একটু কাজ আছে। কিছু মনে করো না। আমাদের ফিরতে হবে। পরে এক সময় কথা বলে নেব।”
মেহরিমা কিছু বলল না। ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তার কথা বলতে ভালো লাগছে। নিজেকে অসম্ভব ক্লান্ত এবং অসহায় মনে হচ্ছে। রিকশার ওঠার পরপর নাইমা বলল, “ভাবী, তুমি ওই মহিলার কথা বিশ্বাস করলে?”
“সত্যিই মনে হয়েছে।”
“তবুও আমার কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। কখনও মনে হয়নি দুলাভাই দ্বিতীয় সংসার করতে পারে।”
“চিন্তা করো না। পরে আবার খোঁজ খবর করা যাবে। এখন বাড়ি ফিরতে হবে।”
তাদের বাড়ি ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। হাবিব উঠানে পায়চারি করছে। তার চোখ-মুখ শুকনো। নববী বলল, “কি হয়েছে? এভাবে হাঁটাহাঁটি করছ কেন?”
“দুলাভাই মা’রা গেছে। একটু আগে কল দিয়েছিলাম। পো’স্ট’ম’র্টে’ম করে রিপোর্ট নিয়ে ফিরবে। লা’শ নিয়ে ফিরতে কাল সকাল।”
“আর কেউ জানে?”
“না আর কাউকে বলিনি। আপাকে বলতে নিষেধ করেছে। শুনলে কান্নাকাটি শুরু করবে।”
“কতক্ষণ লুকিয়ে রাখবে?”
“লা’শ আসা পর্যন্ত। মা’কেও বলার দরকার নেই। আব্বাকে জানিয়েছি। উনি বলবেন না। তোমাদেরও বলার দরকার নেই।”
নাইমার মাথা ঘুরতে লাগল। ক্লান্ত গলায় বলল, “ঘরে যেতে চাই।” বলেই ঘরে চলে গেল। নববী বলল, “দুলাভাই বেঁচে থাকলে সমস্যার সমাধান হতো। উনি সব জানতেন। এখন কি হবে?”
হাবিব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হতাশ গলায় বলল, “জানি না কি হবে! পুলিশ তদন্ত করবে। তাতে যদি কিছু বের হয়।”
“সবকিছু কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে। অন্ধকার এক জায়গায় দলা পাকিয়ে আছে। সামনে পিছনে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
“কিছু একটা উপায় বের করতে হবে। দেখি কি করি। এসব নিয়ে ভাবতে ভালো লাগছে না।”
“আপা খুব কষ্ট পাবেন। স্বামী হারানোর যন্ত্রণা মেয়েরা সহ্য করতে পারে না। আমার যেন কখনও এই দিন দেখতে না হয়।”
হাবিব নববীর কপলে হাত ছোঁয়াল। কোমল চোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কি বলবে! কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সুন্দরভাবে চলমান গল্প হঠাৎ করে এসে অন্ধকারে আটকে গেছে। বিরক্তিকর!
নববী বলল, “দুলাভাইয়ের মোবাইল চেক করলে কিছু পেতে পারি। মোবাইলটা কোথায়?”
“পুলিশের কাছে। দূর্ঘটনার দিন দুলাভাইয়ের পকেটে ছিল। হাসপাতালের লোকেরা সংগ্রহ করে থানায় হস্তান্তর করেছে।”
“আমরা এখন কি করব?”
“অপেক্ষা। দেখি দারোগা সাহেব কি বলেন।”
নববী কথা বাড়ালো না। হাবিবের হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকলো।
নাইমা ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিলো। জানালার পর্দা টেনে দিয়ে এসে বিছানায় বসল। তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আনিস! একটা খারাপ মানুষ। সারাজীবন নানান অপকর্মে সময় কাটিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ম’র’ছেও অ’প’ঘা’তে। এমন একজনের জন্য কি কষ্ট পেতে আছে? নাইমা নিজের চোখ মুছে ফেলল। দু’হাতে চোখ-মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। এই খারাপ মানুষটাই তাকে বাঁচিয়েছে। আজকের মৃ’ত্যু তো নাইমার জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ বা কারা সফল হতে পারেনি। এজন্যই বোধহয় বলা হয় আল্লাহ না চাইলে কেউ কিছু করতে পারে না। আল্লাহ বলেন, সক্ষম হবে না যদি না আল্লাহ ইচ্ছে করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা দাহার আয়াত -৩০)
নাইমা অনেক সময় কাঁদল। অতিরিক্ত কান্নার কারণে তার চোখ লাল হয়ে গেছে। গলায় ব্যাথা করছে। সে খানিকক্ষণ চুপ করে বস রইল। তারপর বাথরুমে ঢুকে গেল। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল নাইমা। ঠান্ডা পানি। গা সামান্য গরম থাকার জন্য পানি বরফ শীতল মনে হচ্ছে। তবু ভালো লাগছে। ঝকঝকে বাথরুম। লাল রঙের বালতিতে পরিষ্কার পানি। সাবান থেকে বেলি ফুলের ঘ্রাণ আসছে।
নাইমা যখন বেরিয়ে এলো তখন সত্যি সত্যি অন্ধকার নেমে গেছে। সে একটা ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিলো। রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় চায়ের পানি চাপালো। নববী বলল, “চা বানাবে?”
“হ্যাঁ ভাবী। মাথায় যন্ত্রণা করছে। মায়ের কাছে কল দিয়েছিলে?”
“দিয়েছিলাম। উনারা এখনও কিছু জানেন না। বড় আপা অনেক দুশ্চিন্তা করছেন।”
“আপা বলে দিলেই বোধহয় ভালো করত। দুশ্চিন্তার থেকে শোক পালন করা সহজ।”
“হয়তো। উনারা যা ভালো মনে করেছেন।”
“একটা মৃ’ত্যু সব প্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে না। তাই না ভাবী?”
“কিসের কথা বলছ বুঝতে পারছি। কিন্তু আমাদের কি করার আছে? কে’সটা পুলিশের হাতে চলে গেছে। দুলাভাই জীবিত নেই। এই মুহুর্তে সোনা-দানাগুলো পুলিশের হাতে দিলে তারা আমাদেরকেই সন্দেহ করবে।”
“তা ঠিক। শরাফত সাহেব কল দিয়েছিল? কিছু বলেছে?”
“না, এ ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। তোমার ভাইও কিছু বলেনি।”
রাত নয়টার দিকে শরাফত কল দিলো। ভরাট গলায় বলল, “আগামীকাল সকাল নয়টায় আপনি এবং আপনার ছোট বোন থানায় আসবেন। লা’শ পৌঁছাতে বেলা দশটার মতো বাজবে। তার আগে চলে যেতে পারবেন।”
হাবিব সম্মতি জানিয়ে কল কে’টে দিলো। নববী খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। শীতের সময়, সে সকালেই উঠেই চা বানালো। বেশি করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে নুডলস রান্না করল। খাবার টেবিলে হাবিব বলল, “আব্বা বাড়ি নেই। নববীর একা থাকার প্রয়োজন নেই। আমাদের সাথে চলো।”
নববী অমত করল না। তখন সবেমাত্র সকালের রোদ গরম হয়ে উঠেছে। রোদ গায়ে লাগিয়ে হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে। শরাফত বলল, “তিনজনই চলে এসেছেন। যাক ভালো। বসুন চায়ের কথা বলছি।”
হাবিব কঠিন মুখে বলল, “তার দরকার হবে না। কি কথা বলার জন্য ডেকেছেন?”
“কে’সের ব্যাপারেই। বেশ অনেক তদন্ত করেছি।”
“কি জানতে পারলেন?”
শরাফত হাতের ইশারায় জে’লের ভেতরে দেখালো। সরু গলায় বলল, “চিনতে পারছেন? অবশ্য আপনাদের চেনা সুযোগ নেই।”
“কি বোঝাতে চাইছেন?”
“এই সে-ই ছেলে, যার চালানো গু’লিতে আনিস সাহেবের মৃ’ত্যু হয়েছে।”
নাইমা বিস্মিত গলায় বলল, “আপনি জানলেন কীভাবে?”
“এটাই আমার কাজ। আমি না জানলে কি আপনি জানবেন? আপনার জানার কথা ছিল?”
নাইমা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “জানি, এটা আপনারই কাজ। কিভাবে জানতে পারলেন সেই বর্ণনা শুনতে চেয়েছি। প্রশ্ন করিনি।”
“আচ্ছা বেশ। চা আনতে বলি? একসাথে চা পান করতে করতে বাকি কথা সারা যাবে।”
হাবিব শক্ত গলায় বলল, “যা বলতে চাচ্ছেন বলুন। চা লাগবে না।”
শরাফত বলল, “ওই সময়ে দু’জন ধনী ব্যবসায়ীর ওই জায়গায় থাকার কথা ছিল। একজন অন্যজনকে খু’ন করবে। সেভাবেই লোক ঠিক করা হয়। দূর্ভাগ্যবশত আনিস সাহেব চলে এসেছিলেন।”
নাইমা ভ্রু কুঁচকে ফেললো। বলল, “এটা কিভাবে সম্ভব?”
“এটাই। যথেষ্ট তদন্ত করা হয়েছে। কেস কোর্টে উঠবে। বাকিটা সেখানে সমাধান হবে।”
“নাটক সিনেমার মতো গল্প বানাচ্ছেন কেন?”
“দেখুন মিস নাইমা, বাস্তবের ঘটনা দিয়েই নাটক সিনেমা তৈরি হয়। ব্যাপারটা কাকতালীয়।”
“কিসের ভিত্তিতে বলছেন?”
“প্রমাণগুলো আদালত পেশ করা হবে। কৌতুহল থাকলে সেখানে আসবেন। সবটা জানতে পারবেন।”
হাবিব বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কথা শেষ?”
“না কথা শেষ হয়নি। মিস নাইমাকে কিছু প্রশ্ন করা বাকি।”
নাইমা বলল, “আমি যা জানি সব বলেছি। আর কি শুনতে চান?”
“আপনি কিছু দেখেননি। হঠাৎই গু’লি লাগে। এইতো? দেখুন এর বাইরে কিছু জানলে বলুন। পরে সমস্যা হতে পারে।”
নাইমা বরফ শীতল গলায় বলল, “আমি এর বেশি আর কিছুই জানি না।”
শরাফত বাঁকা চোখে তাকিয়ে হাসল। সেই হাসি দেখতে ভালো লাগলো না। থানা থেকে বের হবার পর নববী বলল, “শুধু শুধু ডাকলো।”
হাবিব বলল, “পুলিশের লোক এমনি এমনি ডাকে না। কিছু কারণ নিশ্চয়ই আছে।”
“কি কারণ হতে পারে ভাইয়া?”
“আমাদেরকে সন্দেহ করছে বোধহয়।”
“আমরা কি করেছি?”
“জানি না। তোকে একটা বলি, হুটহাট একা একা কোথাও চলে যাস না।”
“কোথায় গেলাম?”
“গতকাল ফুচকা খেতে গিয়েছিলি। আগেরদিন মিলির সাথে দুলাভাইয়ের বাড়িতে গেলি। এসব করবি না। আমি ঠিক সময়ে না পৌঁছালে যদি কোন বিপদ হতো?”
“আচ্ছা ভালো কথা। তুমি কিভাবে জানলে আমি মিলি আপুর সাথে গিয়েছি?”
“মা বলেছিল। দেখ নাইমা, দুলাভাইয়ের সাথে তার বাড়ির লোকও জড়িত থাকতে পারে। যা করার সাবধানে।”
নববী বলল, “ঠিক কথা। মিলিকে আমার খুব একটা সুবিধার মনে হয়।”
নাইমা ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সবকিছুর এখন একটাই সমাধান আছে। ওই ডাইরির খোঁজ করা। ওটা পড়তে পারলেই সব রহস্য পরিষ্কার হবে।
চলবে
#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল
১৭.
রোদ চড়া হয়ে উঠেছে। পিচঢালা রাস্তার চারপাশে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে আছে। একটু দূরে এক লোক শব্দ করে নাক ঝাড়ছে। নববী বিরক্তি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ক্ষুধা লেগেছে। কিছু খেয়ে নিলে হতো না?”
তারা তিনজন একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে বসল। হাবিব বলল, “খিচুড়ি খাবে নাকি পরোটা? সকালের নাস্তায় এসবই হয় এখানে।”
নাইমা বলল, “কিছু একটা নিলেই হয়।”
হাবিব হাতের ইশারায় ওয়েটার ছেলেটাকে ডাকল। ছেলেটা ময়লা ছেঁড়া কাপড় পরে আছে। গলার স্বর রুক্ষ। সে তার রুক্ষ গলায় বলল, “কি খাবেন স্যার? ডাল ভাজি ডিম পরোটা নাকি খিচুড়ি ভর্তা?”
“ভর্তায় কি আছে?”
“টমেটো ভর্তা, মরিচ ভর্তা, বেগুন রসূন ভর্তা।”
“নিয়ে এসো। তুমি খেয়েছ?”
ছেলেটা মাথা নাড়ালো। সে খায়নি। হাবিব বলল, “তোমার জন্যও এক প্লেট নিও। বিল আমি দেব।”
ছেলেটা উজ্জ্বল মুখে বেরিয়ে গেল। নাইমা বলল, “এখন কোথায় যাব? দুলাভাইয়ের লা’শ নিয়ে আসবে কখন?”
“জানি না কখন আসবে। কল দিয়েছিলাম। কাজ শেষ হলে রওনা দিবে।”
“আমরা কি বাড়ি ফিরে যাব?”
“না, এখান থেকে হাসপাতালে যাব। রোহানের ছুটি করিয়ে ওদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে।”
খাবার আসার পর কেউ কোন কথা বলল না। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল। রেস্তোরাঁর বিল মেটানোর পর হাবিব বলল, “কয়েকটা পরোটা নিয়ে যাই। ওদের খাইয়ে নিয়ে যাব।”
শরিফা বেগম বেশ অনেকটা খাবার খেলেও কনক কিছু খেতে পারল না। নরম গলায় বলল, “রোহানকে ছেড়ে দিয়েছে কেন? ডাক্তার তো বলল আর কিছুদিন থাকবে।”
“থাকবে না আপা, আমায় ডেকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। চিন্তা করো না। রোহানের শরীর ভালো।”
“তোর দুলাভাইয়ের কোন খোঁজ পেয়েছিস? আব্বা কল ধরছে না। মামাও না। কি হলো বুঝতে পারছি না।”
“হাসপাতালে ব্যস্ত আছে মনে হয়। পরে ধরবে। তোমরা সব গুছিয়ে নাও। গাড়ি ঠিক করছি।”
শশুর বাড়ির পথে গাড়ি চলতে দেখে কনকের বুক ধক করে উঠল। তবে সে কিছু বলল না। শরিফা বেগম বললেন, “আমাদের বাড়ি গেলে ভালো হত না?”
নববী বলল, “হ্যাঁ মা, আমাদের বাড়িতেই যাব। রোহানের দাদি ওকে দেখতে চেয়েছে তাই যাচ্ছি।”
তিনি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গায়ে ঠান্ডা বাতাসের শীতল ঝাপটা লাগছে। নাইমা গায়ের চাদরটা আর একটু টেনে দিলো। কনকের ঘর এলোমেলো হয়ে আছে। বেশ কিছুদিন অব্যবহৃত পড়ে ছিল বিধায় জায়গায় জায়গায় ধুলো জমেছে। শরিফা বেগম বললেন, “এখানে নানা ভাইকে রাখা ঠিক হবে না। ঘরটা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।”
আনিসের মা বললেন, “দাদা ভাইকে আমাদের ঘরে শুইয়ে দেন। আপনারা এখানে বসুন, আমি ঘর পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
নাইমা বলল, “আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কষ্ট করতে হবে না। একটা ঝাড়ু দিলে আমরাই পরিষ্কার করে নেব।”
তিনি একটা ঝাড়ু এনে দিলেন। বললেন, “মিলি বাড়িতে নেই। জরুরি কাজে বাইরে গেছে। কল দিলেই চলে আসবে।”
নাইমা হাতের ইশারায় নববীকে ডাকলো। দু’জনে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর কনক বলল, “বেশিকিছু করতে না। দাঁড়াতে পারছি না।” সত্যিই তাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ঢলে পড়ে যাবে। নাইমা হতাশ চোখে নববীর দিকে তাকালো। নববী বলল, “তুমি কি কিছু খুঁজছ?”
নাইমা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “না ভাবী। এখানে আর কি-ই বা থাকবে! তুমি গিয়ে আপাকে ডেকে নিয়ে এসো।”
নববী বেরিয়ে গেল। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল বইয়ের ভেতরে রাখা একটা ডাইরির দিকে। আগেরদিন এত খেয়াল করতে পারেনি। বেশ অনেকগুলি বইয়ের নিচে, লুকিয়ে রাখতে এমন করা হতে পারে ভেবে সে ডাইরিটা টেনে বের করল। বেশ ভারী এবং মোটাসোটা। সাদা কাগজের কভারে মোড়ানো। নাইমা কাগজ টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলল। সবুজ কাপড় দেখা যাচ্ছে। আনিস বলেছিল- “সবুজ রঙের একটা ডাইরি আছে। আমার বাড়িতেই রাখা”
সে তড়িঘড়ি করে ডাইরিটা ওড়ানার নিচে লুকিয়ে ফেলল। কনক ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“ক্লান্ত লাগছে আপা। হাত-মুখ ধোব।”
“বাথরুমে যা। ট্যাপে পানি থাকবে। মিলি ট্যাংকি ভরে রাখে।”
নাইমা ব্যস্ত পায়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। ডাইরিটা বের করে দেখতে শুরু করল। নামের পাশে হিসাব লেখা। তার হাত পা কাঁপছে। মনোযোগ লাগাতে পারছে না। নববী বলল, “নাইমা, সময় লাগবে তোমার?”
নাইমা কাঁপা গলায় বলল, “না ভাবী। পানি ভীষণ ঠান্ডা। বরফ শীতল মনে হচ্ছে। বের হচ্ছি।”
সে খুব যত্নের সাথে ডাইরিটা কোমরের গুঁজে নিলো। ওপর দিয়ে ওড়না পরে বেরিয়ে এলো যেন কিছু বোঝা না যায়।
আনিসের লা’শ যখন বাড়ি ঢুকলো তখন ঠিক দুপুর দুইটা বাজে। লা’শবাহী গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মানিক মিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নামলেন। শূন্য দৃষ্টিতে বাড়ির ভেতরে তাকালেন। কনক এক প্রকার ছুটেই বের হলো। ভেজা গলায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, “লা’শের গাড়ি কেন এনেছেন আব্বা? আপনার ছেলে কই? তাকে দেখছি না কেন?”
মানিক মিয়া কথা বলতে পারলেন না। কনকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন। তার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। মাথা ঘুরছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। কনক গিয়ে হাবিবের হাত ধরল। বলল, “হাবিব, তোরা কথা বলছিস না কেন? মিলি তখন থেকে কাঁদছে। আমাদেরকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসলি। বল না কার কি হয়েছে?”
হাবিব কনকের দুই হাত চেপে ধরল। শক্ত গলায় বলল, “তুমি এমন করলে রোহান কি করবে আপা?”
কনক ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। মিলি বলল, “ভাবী ভেতরে চলো। এখানে লোক বাড়বে।”
কনক নড়ল না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে। সবাই সুর করে কাঁদছে। আশে-পাশের লোকজন এসে ভীড় জমিয়েছে।
মানিক মিয়া মহিউদ্দিন সাহেবের হাত ধরে বাগানের ভেতর ঢুকলেন। সরল গলায় বললেন, “আমাদের পারিবারিক ক’ব’র’স্থান। বাড়ির সামনে জায়গা থাকলে ছেলেটাকে এখানে ক’ব’র দিতাম না। কি আর করার!”
“হাবিবকে বলছি। লোকজন নিয়ে ব্যবস্থা করবে। আপনি আসুন। ঘরে গিয়ে বসবেন। এভাবে ঘুরলে শরীর খারাপ করবে।”
“কি আর বসবো বেয়াই! আমি ম’রে গিয়েও যদি আমার ছেলেটা বেঁচে থাকত। আল্লাহ কোন বাপকে এমন ভাগ্য না দিক। শত্রুও যেন সন্তান হারানোর কষ্ট সহ্য না করে।”
মহিউদ্দিন সাহেব কথা বলতে পারলেন না। তার গলা জড়িয়ে আসছে। ম’রা বাড়িতে কাজের অভাব নেই। লা’শ গোসল করাতে হবে, ক’ব’র খোঁড়া, জানাজায় ব্যবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার হয়। কান্নার শব্দ সেই সময় আবার কখনও কখনও ঝিমিয়ে পড়ে। কনক একনাগাড়ে খানিকক্ষণ কাঁদার পর এখন চুপ করেছে। আনিসের মা এর মধ্যে দু’বার ফিট হয়েছেন। নববী আর মিলি তার মাথায় পানি ঢালছেন। নাইমা রোহানের পাশে বসে রইল। রোহান খুব কাঁদছে। তাকে থামানো যাচ্ছে না।
জানাজা শেষ হবার পর লা’শ খুব দ্রুত দাফন করা হয়। কেউ কেউ স্বজনদের জন্যও অপেক্ষা করতে চায় না। মানিক মিয়াও করলেন না। অ’প’ঘা’তে ম’রা লা’শ জনে-জনে দেখানোর কিছু নেই। সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ির পরিবেশ মোটামুটি শান্ত। আনিসের মা কান্না থামিয়ে মহিলাদের সাথে কথা বলছেন। কিভাবে কি হয়েছে বর্ননা করছেন। মিলি, নববী কনক সবাই এক জায়গায় গোল হয়ে বসে আছে। শরিফা বেগম রোহানের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এক মহিলা তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “হাসপাতালে ছিল তো, শরীর দূর্বল হয়ে গেছে। বউ মা-ও গিয়ে মায়ের পাশে একটু ঘুমিয়ে নাও। আল্লাহর ওপরে তো মানুষের হাত নেই।
নাইমা বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। এত মানুষের ভীড়ে ডাইরি রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কেউ নিয়ে গেলে ঝামেলা হতে পারে। অনেক ভেবে সে ডাইরিটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলো। ভাবল পরে নিয়ে নেবে। দুশ্চিন্তা হলেও অন্য উপায় নেই। আর কোথায়ই কি রাখবে! হাবিবকে বলা যেত কিন্তু সে বলবে না। বিড়বিড়িয়ে বলল- কোন একদিন প্রজাপতির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়ব। আমিই হব আমার প্রেরণা।
আনিসদের বাড়ি মুটামুটি বড়সড় ধরনের। লোকজন যা আছে শোবার অসুবিধা হয়নি। ভোরের দিকে নাইমার ঘুম ভেঙে গেল। তখনও অন্ধকার কে’টে আলো ফোটেনি। সে শরিফা বেগমের সাথে ঘুমিয়ে ছিল। অন্ধকারে বিছানায় উঠে বসল। ঠিক তখন কনক তার হাত চেপে ধরে বলল, “তোর দুলাভাইয়ের ক’ব’রের কাছে একটু যাব। চল না আমার সাথে। সবাই ঘুম। একা যেতে সাহস পাচ্ছি না।”
নাইমা অমত করল না। তার বোন এমনিতেই শোকে পাথর হয়ে আছে। একটু স্বান্তনা পেলে বিশেষ কোন ক্ষ’তি হয়ে যাবে না। তারা দু’জনেই গায়ে চাদর জড়িয়ে নিলো। শান্ত পায়ে হেঁটে ক’ব’রের কাছে এসে দাঁড়ালো। নতুন মাটির গন্ধ নাকে লাগছে। নাইমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কনক বলল, “কাঁদছিস?”
“না, আপা। তেমন কিছু না।”
“আজীবন তোর দুলাভাইকে অপছন্দ করতি। কখনও ভালো করে একটু কথাও বলিসনি। তার মৃ’ত্যুতে তোর এত কষ্ট হচ্ছে বোন?”
“সে যাইহোক। রোহান এতিম হয়ে গেল। বাবা হারানো কষ্ট কিভাবে সহ্য করবে! তুমিই বা কি করবে আপা?”
কনক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ভেজা গলায় বলল, “জানি না। বাগানের ভেতর একটা কূপ আছে। আগেও তো দেখেছিস। চল ওদিকে।”
“ওদিকে কি করতে যাবে আপা?”
“ওজু করব। একটু দোয়া কালাম পড়ে ঘরে যাব। মা উঠলে আমায় এদিকে আসতে দিবে না।”
নাইমা ব্যাপারটা বুঝলো। বাগানের মাঝখানে বিশাল বড় কূপ। কূপের পানি কাকের চোখের মতো কালো। দেখলেই শরীর হীম হয়ে যায়। ভোরের আবছা আলোয় চারপাশ অতটাও পরিষ্কার নয়। কনক কূপের কাছে গিয়ে পানি তুলল। পানিতে হাত ডুবিয়ে বলল, “শুনেছি অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে ম’র’লে মানুষ আবার আত্মা হয়ে ফেরত আসে। তোর দুলাভাইয়ের অনেকগুলো ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে গেছে। সে কি ফেরত আসবে নাইমা?”
“এসব কি বলছ? মানুষের আত্মা কখনও ফিরে আসতে পারে না।”
“তাহলে তোর আত্মাও ফিরতে পারবে না, তাই না বল?”
নাইমা চমকে উঠলো। ভীতু গলায় বলল, “এসব কি বলছ আপা?”
কনক নাইমার গা ঘেঁসে দাঁড়ালো। ফিসফিসিয়ে বলল, “তোর তো খুব শখ বসরাই গোপালের ঝাড়ের রহস্য ভেদ করবি। এই ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেলে ফেরত আসবি না?”
নাইমার গলা শুকিয়ে গেছে। সে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “এসব তুমি কি বলছ আপা? কি রহস্য? কোন গোলাপের ঝাড়?”
কনক হেসে নাইমার চোখের পানি আঙুলে তুললো। বলল, “রোহান এতিম হয়ে গেছে এই শোকে কাঁদছিস নাকি শেষ মুহুর্তে তোকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে সেই কৃতজ্ঞতা থেকে কাঁদছিস?”
“আপা, তুমি এসব?”
“যা তোকে বলেই দিই। অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে ম’র’বি কেন! আনিস তোকে যে বসের কথা বলেছে সে আমি। আমিই সবকিছুর মালিক। আনিস আমার হুকুমের গোলাম।”
নাইমা নিজের হাতে চিমটি কাটল। কোন অনুভূতি নেই। তবে কি সে স্বপ্ন দেখছে। কনক কিছুটা পানি হাতে নিয়ে নাইমার চোখে-মুখে ছুঁড়ে মা’র’ল। বলল, “স্বপ্ন দেখছিস না। এটাই বাস্তব। মেনে নিতে শেখ বোন। বাস্তবতা অনেক কঠিন।”
“তুমি কেন এসবে জড়ালে আপা? কিসের অভাব ছিল তোমার?”
“টাকার অভাব ছিল। দামী দামী গহনা, বিলাসবহুল জীবন। সবকিছুর অভাব ছিল। একদিন হঠাৎই রোহানের স্কুলে এক আপার সাথে পরিচয়। উনি আমাকে বুঝতে পারলেন। একসাথে কাজের প্রস্তাব দিলেন। আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে টুকটাক বিক্রি-বাট্টা শুরু করলাম। ভালোই লাভ হচ্ছিল জানিস? একদিন তোর দুলাভাইয়ের কাছে ধরা পড়ে গেলাম। সে আমায় খুব মা’র’ল। পি’টি’য়ে সারা শরীরে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল। ব্যাথার ওষুধও খেয়েছি জানিস?”
নাইমা কথা বলতে পারছে না। ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যেতে, পারছে না। তার পা সীসার মতো জমে গেছে। কনক বলল, “ওইদিন মা’র খাওয়ার পর আমি হঠাৎই পাল্টে গেলাম। গলার জোর বাড়ালাম। ব্যাস! ছাগলের দড়ি আমার হাতে।”
“দুলাভাই তোমার কথা মেনে নিলো? তোমার গলার জোর মেনে নিলো? কেন করল?”
“সব মানুষের কিছু দূর্বলতা থাকে। সেই জায়গায় আ’ঘা’ত করলে সে সব মেনে নেয়। মেনে নিতে বাধ্য হয়।”
“কেন করলে এমন? দুলাভাইকে কেন মা’র’লে?”
“উফফ! বোকার মতো কথা বলিস না। আনিসকে আমি কখনোই মা’র’তে চাইনি। কথা ছিল তোকে মা’র’বে। কিন্তু না, সে তোর ওপর দরদ দেখালো। শালা নিজেই ম’রে গেল।”
“এতক্ষণ ভাবছিলাম, তোমার মতো একটা ভালো বউ থাকতে কোন পুরুষ কিভাবে দ্বিতীয় নারীতে আসক্ত হয়! এখন বুঝতে পারছি।”
কনক চমকে উঠল। বিস্মিত গলায় বলল, “বাহ! পাতি গোয়েন্দা অনেক খোঁজ নিয়ে ফেলেছে দেখছি। দেখেছিস সেই মেয়েকে? কেমন দেখতে?”
“যেমনই হোক, তোমার মতো কুৎসিত মনের নয় আপা৷ আপা বলতেই ঘৃণা লাগছে।”
কনক হাসতে হাসতে বলল, “যে মেয়ে পরের বরের সাথে এক বিছানায় ঘুমিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায় সে ভালো? আর আমি কুৎসিত মনের?”
“কোথায় অন্তঃসত্ত্বা? তার কোন ছেলেমেয়ে নেই। তাছাড়া ওরা বিয়ে করেছে।”
“দুনিয়ায় আসতে দিলে তারপর তো বাচ্চা আসবে!”
“তুমি!”
“হ্যাঁ আমি। আমিই খাবারের সাথে ওষুধ মিশিয়ে ওই অধ্যায় বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকেই আনিস আমায় ঘৃণা করতে শুরু করে। অবশ্য আমি যে তাকে ভালোবাসি তা-ও না।”
“সবার সামনে কত সুন্দর অভিনয় করতে তোমরা! যেন সাদাসিধে সাধারণ দম্পত্তি। এমন এক বউ যে তার স্বামীকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এবং ভালোবাসে।”
“লোক জানাজানি করে ব্যবসা হয় না বোন। অনেক শুনে ফেলেছ। এবার”
নাইমা শুকনো ঢোক গিলে বলল, “এবার কি?”
“এবার তোমার এই সুন্দর কান দিয়ে শোনা কথাগুলো যেন সুন্দর মুখ থেকে বের করতে না পারো সেই ব্যবস্থা করব।”
“মে’রে ফেলবে আমাকে? আমি না তোমার আপন বোন?”
“পৃথিবীর কোন মানুষের ওপর আমায় দয়ামায়া নেই। কখনো জন্মাবেও না।”
কনক নাইমার বাহু চেপে ধরল। নাইমার গলা ছেড়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, অথচ আওয়াজ বের হচ্ছে না। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে অনেক আগে। চারপাশে আলোকিত হচ্ছে। বাগানের অন্ধকার অনেকখানি দূর হয়ে গেছে। কাছে কোথাও পেঁচা ডাকছে। এই পাখি তো রাতে ডাকে, এখন ডাকছে কেন! কি ভয়ংকর শোনাচ্ছে পাখির ডাক! কানে তালা লেগে যায়।
চলবে