বসরাই গোলাপের ঝাড় পর্ব-১৯

0
419

#বসরাই_গোলাপের_ঝাড়
#ফারহানা_কবীর_মানাল

১৯.
ডিউটি ডাক্তারের বয়স অল্প। ছিপছিপে লম্বা শরীর। হাতে কালো বেল্টের ঘড়ি পরে আছে। তিনি বেশ অনেক সময় নিয়ে কনকের ক্ষত জায়গা পরীক্ষা করলেন। নরম গলায় বললেন, “গলায় এমন আ’ঘা’ত পেল কিভাবে?”

শরাফত উল্লাহ বলল, “আ’ত্ম’হ’ত্যা করতে গিয়েছিল। ব্রুজ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন কি অবস্থায় আছে?”

“অবস্থা খারাপ বললে ভুল বলা হবে। স্বরযন্ত্র ছিদ্র না হলে খুব বিশেষ কোন সমস্যা হবে না৷ তবে ধনুষ্টংকার বা গ্যাস গ্যাংগ্রিনের মতো প্রা’ণ’ঘা’তী রোগের আশংকা এড়ানো যাচ্ছে না।”

“এখন কি করবেন?”

“প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেব। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে স্বরযন্ত্র বা শ্বাসনালি কেমন আছে।”

“কত সময় লাগবে?”

“সময় তো একটু লাগবেই। এসব তো বললেই হয়ে যায় না।”

“লাগুক সময়, সময় নিয়ে সব কাজ করেন। বাঁচানো সম্ভব হবে?”

“দেখুন স্যার, বাঁচা ম’রা আল্লাহ হাতে। আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি।”

“তা-ই করুন। চেষ্টাই করুন। তবে রোগীর কন্ডিশন তো বলতে পারেন নাকি?”

ডাক্তার জবাব দিলেন না। সিরিঞ্জে ওষুধ ভরতে লাগলেন। হাবিব দূরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে চেয়ার রাখা, বসতে ইচ্ছে করছে না। দাঁড়িয়ে থাকতেও ভালো লাগছে না। মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, “কি অবস্থা?”

হাবিব চমকে পেছনে ফিরে তাকালো। হড়বড় করে বলল, “এখনও জানি না কিছু। ডাক্তার দেখছে৷”

মহিউদ্দিন সাহেব হাবিবের কাঁধে হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, “আমি কি কখনও তোদের অভাব বুঝতে দিয়েছি? না খাইয়ে রেখেছি? যে যা করতে চেয়েছিস বাঁধা দিয়েছি?”

হাবিব কিছু না বলে কপালের একটু নিচে হাত চেপে ধরে চোখ ঢেকে ফেলল। চোখ জ্বালা করছে। চোখে পানি আসার আগে এমন করে চোখ জ্বালা করে। হাসপাতালে লোকের অভাব নেই। কে কখন দেখে ফেলবে!

কনকের ক্ষ’ত খুব বেশি মা’রা’ত্ম’ক হতে পারেনি। র’ক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ধনুষ্টংকারের প্রতিরোধক হিসেবে কি একটা ইনজেকশন দিয়েছে। তবে তার জ্ঞান ফেরেনি। নার্স অবাক হয়ে বলল, “স্যার, উনার অবস্থা ঠিক লাগছে। তাহলে জ্ঞান ফিরেছে না কেন?”

“জ্ঞান ফেরার জন্য সবসময় শরীরের কন্ডিশন জরুরি নয়। মানসিক কারণেও অনেক সময় জ্ঞান ফিরতে দেরি হয়। হতে পারে উনি নিজেই চাইছেন না উনার জ্ঞান ফিরে আসুক।”

“এ ক্ষেত্রে কি করব?”

“মাহতাব স্যারকে ডেকে নিয়ে এসো। উনি খুব ভালো বলতে পারবেন।”

নার্স খুব দ্রুত বেরিয়ে গেল। ইমার্জেন্সি রুমে রোগী বাড়ছে। একজনের জন্য অনেক সময় বরাদ্দ করার সুযোগ নেই।

ডিআইজি সাহেব গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ইতিমধ্যে ডাইরি মেলে তার বেশ কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেছেন। নামের পাশে হিসাব এবং ঠিকানা লেখা। কাকে কি ধরনের জিনিস বিক্রি করেছে। সবকিছু। এসব ঠিকানায় খোঁজ করতে হবে। শরাফত একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি হাতের ইশারায় তাকে ডাকলেন। ভরাট গলায় বললেন, “হাবিব সাহেব বলল- আপনি তার কথায় গুরুত্ব দেননি। এটা কি সত্যি?”

শরাফত ইতস্তত করে বলল, “কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাছাড়া আমার মনে হয়নি, উনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবেন।”

“অথচ উনি তা বলতে চাইছিলেন। আপনি সুযোগই দিলেন না। দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার হয়ে কিভাবে এমন করতে পারলেন?”

“সরি স্যার। আর কখনও এমন হবে না।”

“দেখুন শরাফত সাহেব, আমি আপনার সিনিয়র অফিসার। বয়স বা অভিজ্ঞতা সবই বেশি। আপনার দায়িত্ব ছিল এই কেসের, আর আপনি হাবিব সাহেবকে এড়িয়ে গেলেন? আশা করি এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকবে।”

শরাফত চুপ করে গেল। এই মুহুর্তে ঠিক কি বলা উচিত তা তার মাথায় আসছে না। ডিআইজি সাহেব ডাইরির পাতায় মনযোগী হয়ে পড়লেন।
আনিসের হাতের লেখা ভালো। বেশ গোটাগোটা, খুব গুছিয়ে লেখা। তিনি পড়তে আরম্ভ করলেন।

সতেরো পৃষ্ঠার শেষ দিকে,

‘বেশ ক’দিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। তবে তা সম্ভব নয়, কনক নামক বন্দীজাল থেকে আমার মুক্তি নেই। কেউ কি তার নিজের কর্মফল থেকে পালাতে পারে? কনকও তেমনই। আমার কাজের ফল। সাদাসিধে সাধারণ একটা মেয়েকে আ’গু’নে পো’ড়া’তে পো’ড়া’তে ধা’রা’লো অ’স্ত্র বানিয়ে ফেলেছি। আ’ঘা’ত সহ্য করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।’

ডিআইজি সাহেব পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন। ঠিক তখনই মহিউদ্দিন সাহেব এসে বললেন, “কি করবেন এখন?”

তিনি ডাইরি বন্ধ করতে করতে বললেন, “আপাতত পুলিশের পাহারায় চিকিৎসা চলবে। পুরোপুরি সুস্থ হবার পর জিজ্ঞেসাবাদ করা হবে। দেখুন সে নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। বাঁচানোর উপায় নেই।”

“বাঁচাতে চাইছি না। জিজ্ঞেস করলাম।”

“ওহ আচ্ছা। আমার একটু কাজ আছে। চাইলে মেয়ের সাথে একবার দেখা করতে পারবেন।”

“একটা বিষয়ে জানাতে চেয়েছিলাম।”

“কোন বিষয়ে?”

“ছোট স্যার, মানে শরাফত উল্লাহ বলেছিল- আনিসের খু’নটা দূ’র্ঘ’ট’না। ভুল করে ঘটেছে। অন্য কাউকে হ’ত্যা করার কথা ছিল। হাবিবকে ডেকে নিয়ে নিশ্চিত করে বলেছে।”

“খোঁজ নিয়ে জানাব।”

ডিআইজি সাহেব গাড়ি উঠে বসলেন। মহিউদ্দিন সাহেব ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। শব্দ শোনা গেল স্পষ্ট।

কনকের জ্ঞান ফিরল সন্ধ্যার পর। একজন নার্স এসে হাবিবকে বলল, “আপনাদের রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। চাইলে দেখা করতে পারেন।”

হাবিব পা বাড়াতেই এক মহিলা পুলিশ তাকে আটকালো। কঠিন মুখে বলল, “আমার সাথে আসুন। একা কথা বলতে পারবেন না।”

হাবিব বিরক্তি নিঃশ্বাস ফেলল। কনক বালিশে মাথা দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছে। হাবিব চেয়ার টেনে তার পাশে বসল। বলল, “এখন ঠিক লাগছে?”

কনক ভাইয়ের দিকে ফিরল। ভেজা গলায় বলল, “একটা অনুরোধ করব ভাই?”

হাবিব শুকনো মুখে বলল, “একজন পিতা কি তার সন্তানের খু’নিকে ক্ষমা করতে পারে?”

“কখনোই পারে না৷ আমি আমায় ক্ষমা করতে বলছি না। প্রয়োজন হলে আমায় হাজারবার ফাঁ’সি দে। তবু্ও আমার অনুরোধটা শোন।”

“বলেন।”

কনক চমকে উঠলো। পরক্ষণেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আমার রোহানকে একটু দেখে রাখবি। যে তোর ছেলেকে হ’ত্যা করেছে তাকে নিজের ছেলের মতো করে মানুষ করতে পারবি?”

“কখনও সম্ভব না। এতটা উদার আমি হতে পারব না।”

“বিশ্বাস কর। রোহানের কোন দোষ নেই। আমি ওকে বলেছিলাম সুযোগ বুঝে সোহেলকে পানিতে ফেলে দিতে।”

হাবিব চিৎকার করে উঠল। কর্কশ গলায় বলল, “কেন বলেছিলেন? আমার দু’বছরের বাচ্চাটা আপনার কি ক্ষ’তি করেছিল? পেছন পেছন আধফোটা বুলিতে ফুফু ফুফু ডেকে বেড়াত সেজন্য? কেন করলেন? আপনার কেমন লাগবে যদি এখন আমি আপনার রোহানকে মে’রে ফেলি? বলুন কেমন লাগবে?”

কনক জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। হাবিবের চোখ ভীষণ ভ’য়ং’ক’র রকমের ক্ষিপ্র দেখাছে। রাগে হাত কাঁপছে। একজন নার্স দৌড়ে এসে বলল, “কি করছেন? হাসপাতালে এভাবে চিল্লাপাল্লা করছেন কেন?”

হাবিব দেয়াল ধরে বসে পড়ল। সে লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। মহিলা পুলিশ একটু ঝুঁকে এসে বলল, “আপনি ঠিক আছেন?”

হাবিব জবাব দিলো না। সে দেয়াল খামচে ধরে আছে। নার্স বলল, “আর চিৎকার করবেন না। করলে দারোয়ান ডেকে বের করে দেব।”

মহিলা পুলিশ তাকে ইশারায় আস্বস্ত করল। নার্স মেয়েটা বেরিয়ে গেল। মেয়েটার কোমর সমান লম্বা বেণী এদিক ওদিক হেলে পড়ছে। দেখতে ভীষণ সুন্দর লাগে।

খানিকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলে হাবিব বলল, “কেন করেছেন?”

কনক ভেজা গলায় বলল, “আব্বার জন্য। আব্বার জন্য করেছি।”

হাবিব বিদ্যুৎচমকের মতো বলে উঠল, “আব্বার জন্য করেছেন মানে?”

“আব্বা ঢাকায় দু-কাঠা জমি কিনেছে।”

“তাতে কি এমন হয়েছে?”

“আমি প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছি। ভেবেছিলাম আব্বা উনার নিজের নামে দলিল করবেন। কিন্তু না। আব্বা তা করলেন না। দলিল করলেন সোহেলের নামে। ওয়ারিশ পত্রে লিখলেন – সোহেলের যদি কোন সন্তান-সন্তাদি অথবা বিবাহিত স্ত্রী না থাকে এবং সে মা’রা যায় তাহলে জমির মালিক হবে রোহান। এই নিয়ে আব্বা সাথে অনেকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরলেন না। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম- ভালো কথায় না হলে ওয়ারিশনামাই কাজে লাগুক।”

“রোহানকে কিভাবে রাজি করালে?”

“দিনের পর দিন, চোখের সামনে মা’কে অ’ত্যা’চা’রি’ত হতে দেখা ছেলে মা’য়ের জন্য সবকিছু করতে পারে। সবকিছু।”

কনক আর কথা বলতে পারল না। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। হাবিব শান্ত পায়ে হেঁটে ইমার্জেন্সি রুমে গেল। ডাক্তারকে কনকের অবস্থা জানিয়ে হাসপাতাল থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।

শরিফা বেগম নববী আর নাইমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। ও বাড়ির লোকের কথাবার্তা কানে তুলতে পারছেন না। আনিসের মা তো একবার বিলাপের সুরে বলেই ফেললেন, “খোল ভালো না হলে কি তার জিনিস ভালো হয়! যার মা’ই খারাপ, তার মেয়ের আর কত ভালো হবে। ওয়াক থু!”

তিনিও চুপ থাকেননি। তীক্ষ্ণ গলায় বলেছেন, “আপনার আনিস বোধহয় মহাপুরুষ ছিল। তার পূন্যের ফিরিস্তি শোনেননি? অবশ্য শুনবেন কিভাবে! নিজেই তো ছেলের কান ভাঙিয়ে অমন করে ফেলেছেন। তাই এখন আর কানে শুনবেন না।”

এক দুই কথায় ব্যাপারটা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে। তারপরই তিনি ও বাড়ি ছেড়েছেন। নাইমা নববীর হাত ধরে ঘরে উঠল। নববী বলল, “তোমাকেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ভালো হত। পরে যদি কোন সমস্যা হয়।”

“লাগবে না৷ আমি সুস্থ হয়ে যাব।” সে নববীকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল৷ কাঁদতে কাঁদতে বলল, “যদি আমি ওইসবের খোঁজ না করতাম! যদি কৌতুহল না দেখাতাম, তাহলে আজ কিছু হত না বলো? কিছু হতো না। সবকিছু আমার জন্য হয়েছে। সব দোষ আমার।”

নববী নাইমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “কাঁদে না বোন। কাঁদে না। কিছুতেই না আমাদের হাত থাকে না। দেখলে না সোহেলও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। তাতে কি কারো দোষ ছিল, বলো?”

নাইমা শব্দ করে কাঁদতে লাগল। শরিফা বেগম শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। বারবার মনে হচ্ছে এসবের জন্য উনি নিজেও দায়ী। সামান্য নয়, বেশ অনেকখানি দায়ী।

হাবিব থানা থেকে বের হলো রাত নয়টার পর। ডিআইজি সাহেব ডেকেছিলেন। জিনিসগুলো ফেরত চেয়েছেন। হাবিব জানিয়েছে খুব তাড়াতাড়ি সে এসে দিয়ে যাবে। শরাফত কেমন সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তবে ডিআইজি সাহেব মত দিয়েছেন।

বরফ শীতল বাতাস বইছে। হাবিবের গায়ে পাতলা টি-শার্ট। সকালে তাড়াহুড়োর মধ্যে শীত কাপড়ের কথা মনে করতে পারেনি। সে তার কপালে হাত ছোঁয়াল। কপাল থেকে হাত সরিয়ে গলায় হাত রাখল। গা গরম। বেশ অনেক গরম। পা আর সামনে চলছে না। চারপাশের সবকিছুর কেমন আবছা হয়ে গেছে। সে কানের খুব কাছে গাড়ির হর্ণ শুনল।

চলবে।