সুগন্ধি ফুল পর্ব-২০

0
409

#সুগন্ধি_ফুল
#পর্ব_২০
#জান্নাত_সুলতানা

-“আমি যে বাসায় ছিলাম না। তখন তো শাড়ী পড়েছিলে।”

আবরাজ গম্ভীর স্বরে বললো। ফিজা আচমকাই এমন কথা শুনে চমকে উঠলো।
হাত থামে। কাপড় ভাজ করছিলো সে। আবরাজ এর কথা শুনে ফিজা যেমন চমকেছে তেমন অবাক হয়েছে। সাথে তৎক্ষনাৎ মনে প্রশ্ন এলো। সে শাড়ী পড়েছিল এটা কিভাবে জানলো আবরাজ?
ফিজা উলটো ঘুরে আবরাজ এর মুখোমুখি দাঁড়াল। আবরাজ সোফায় বসে আছে। দৃষ্টি তার ল্যাপটপ এর স্ক্রিনে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে না এমন একটা প্রশ্ন এই মাত্র এই পুরুষ করেছে। ফিজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো আদৌও পুরুষ টার মনোযোগ কোথায়? তবুও মনের প্রশ্ন টা ঠিকই ঠোঁট নেড়ে বলে উঠলো,

-“পড়েছিলাম প্রথম দিন। আপনি বাসায় আসেন নি। তাহলে আপনি কি করে জানলে আমি শাড়ী পড়েছিলাম?”

আবরাজ এবার চোখ তুলে ফিজার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়ে টা বড্ডো প্রশ্ন করে। সব প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন আর কথার বিপরীতে কথা রেডি থাকে। কোনো প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর দেয় না। আবরাজ বললো,

-“আমার জন্য পড়েছিলে?”

-“ইচ্ছে হয়েছিল।”

ফিজা এদিক-সেদিক তাকিয়ে জবাব দিলো। আবরাজ ফিজার দিকে তাকিয়ে হাসে। বললো,

-“আমার জন্যেই হয়েছিল।”

-“নিজে কে স্পেশাল কেউ ভাবার প্রয়োজন নেই।”

আবরাজ এর হাসি দেখে ফিজার অস্থির লাগছে। কোনো রকম জবাব দিলো। আবরাজ দৃষ্টি স্থির রেখে কনফিডেন্সর সঙ্গে বলে,

-“আমি স্পেশাল।”

-“সবার কাছে হতে পারেন। আমার কাছে না।”

-“তোমার কাছেও।”

-“কথা ঘোরাচ্ছেন আপনি।”

ফিজা শক্ত কণ্ঠে বলে। আবরাজ সাথে সাথে বললো,

-“ফাতিহা বলেছিলো।”

আবরাজ শান্ত স্বরে জানালো। ফিজা ভ্রু জোড়া টানটান করে বলে উঠলো,

-“মিথ্যা কথা। ফাতিহা সাব্বির সেদিন বাসায় ছিলো না।”

-“এদিকে এসো।”

আবরাজ ল্যাপটপ এর শাটার বন্ধ করে ফিজা কে ডাকলো। ফিজা ভ্রু কুঁচকে নেয়। দ্রুত কদম ফেলে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। আবরাজ ল্যাপটপ কোলের উপর থেকে সরিয়ে রাখলো। ফিজা কে টেনে বসালো কোলে। এরপর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো বউ কে। বললো,

-“বাহিরে যাবার কথা বলেছিলে সকালে!”

-“এখন যাব? আপনি বাহিরে যাবেন না?”

-“না। খুব বেশি ইম্পরট্যান্ট না হলে আর যাচ্ছি না।”

ফিজা কথা বাড়ায় না। আবরাজ ছাড়ে না বউ কে। কোলে নিয়ে বসে কিছু একটা করতে লাগলো। ফিজা কিছু সময় তাকিয়ে দেখলো। বুঝতে পারলো না কিসের যেন একটা হিসাব করছে আবরাজ। ফিজা ভাবলো হয়তো বাংলাদেশের কোম্পানির কোনো হিসাব হবে। কেনো না আবরাজ এর এই দেশে কোনো বিজনেস নেই। যেটা আছে সেটা মিস্টার জি এর। আবরাজ সেখানে শেয়ার শুধু। ফিজা তেমন পাত্তা দিলো না বিষয় টা। আবরাজ এর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো। কিছু সময় এভাবে থেকে ঘুমিয়ে পড়লো সে। আবরাজ কাজ এর ফাঁকে বউয়ের দিকে বারকয়েক আঁড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। বেশ আদুরে দেখাচ্ছে মেয়ে টাকে। শান্তশিষ্ট ভোলা ভালা এক রমণী। কিন্তু জেগে থাকলে কেমন কঠিন মুখশ্রী কথাবার্তা ধরন বেশ ধারালো।
মুচকি হাসে আবরাজ। হৃদয়ে ভালো লাগার দোল দেয়। কেমন শান্তি শান্তি লাগে মনে। সেভাবে বসে থেকে কাজ করে আবরাজ।

——–

আবরাজ ফিজা কে নিয়ে বেরিয়েছে। প্রথমে শপে যাবে তারা। মার্কেট করবে। যেহেতু পরশু ফিরে যাবে সেইজন্য সবার জন্য টুকটাক কেনাকাটা করতে চাচ্ছে ফিজা৷ আবরাজ সাথে কোনো সিকিউরিটি নেয় নি। সাব্বির কেও না। বলেছে ফাতিহা কে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য।
আবরাজ নিজে ড্রাইভ করছে। ফিজা পাশে বসে চারপাশ অবলোকন করেছে। আবরাজ বারবার বউয়ের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। আবার গাড়িও চালাচ্ছে মনোযোগ দিয়ে। ফিজা বুঝতে পারছে আবরাজ গাড়ি চালানোর ফাঁকেও তাকেই দেখছে। এতে তার সমস্যা নেই। এই ক’দিনে ভালোই অভ্যস্ত হয়েছে সে আবরাজ এর আচার-আচরণে। বুকে হাত গুঁজে ফিজা বাহিরে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো,

-“আপনার তো গার্লফ্রেন্ড এর অভাব নেই। এইজন্যই জার্মানি এতো ভালো লাগে। যে বিয়ের রাতে বউ ফেলে চলে এসছেন।”

সাথে সাথে গাড়ি ব্রেক কষলো আবরাজ। ভ্রু জোড়া টানটান করে ফিজার দিকে তাকালো। অধর জোড়া অল্পস্বল্প অটোমেটিক প্রসারিত হয়েছে। মেয়ে টা বেশি বুঝে। উলটো পালটা বকে। আবরাজ পরপর বলে উঠলো,

-“তুমি দুই লাইন বেশি বোঝো। এরজন্য কি করতে পারি আমি!”

ফিজা তাকালো আবরাজ এর দিকে। দৃঢ়কণ্ঠে বলে,

-“কিছু করতে হবে না। বিশ্বাস টা সব সময় করে যাওয়ার মতো অবস্থা রাখেন শুধু।”

আবরাজ কিছু বলে না। নিজের সিট বেল্ট খুলে ফিজার দিকে সামন্য ঝুঁকে গেলো। দুই দিকে হাত বাড়িয়ে গলায় পেঁচিয়ে রাখা শাল টা তুলে মাথায় দিয়ে দিলো। ফিজা ভেবে ছিলো আবরাজ হয়তো অন্য কোনো মতলব নিয়ে এগিয়ে এসছে। সেইজন্য চোখ বন্ধ করে মুখ গুড়িয়ে নিতে চাচ্ছিলো। আবরাজ তা হতে দিলো না। থুঁতনিতে হাত রেখে মুখ টা নিজের দিকে করে কপালে চুমু খেলো। ফিজা চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো সেই আদুরে মাখা ভালোবাসার স্পর্শ। এই প্রথম ফিজার আবরাজ এর ছোঁয়ায় অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি হলো মনে। ভালো লাগলো স্বামীর এই কাজ। চোখ বন্ধ করে ফিজা যখন অন্য জগতে অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করতে ব্যাস্ত তখন কানে এলো আবরাজ এর রসাত্মক স্বর,

-“মাইন্ড চেঞ্জ করো সুগন্ধি ফুল।”

-“সারাক্ষণ তো এগিয়ে এলে বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন।”

ফিজা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো। আবরাজ চুল হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। লুকিং গ্লাসে ফিজার দিকে তাকিয়ে নিজের চুল ঠিক করে। বললো,

-“এভাবে লজ্জা দিতে নেই বউ।”

ফিজা আশেপাশে তাকায়। একটা শপ দেখা যাচ্ছে। ফিজা বুঝতে পারে আবরাজ গাড়ি তাহলে এখানে পার্কিং করবে। তাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। আবরাজ চাবি নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি লক করে ফিজা কে নিয়ে শপের দিকে এগিয়ে গেলো।

——-

-“তুমি ফিরবে না আবরাজ?”

মিস্টার জি প্রশ্ন করলো। ওনার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন গার্ড। আবরাজ ফোনে স্ক্রোল করছে। আর সেভাবে থেকে জবাব দিলো,

-“বউ ফেলে আসা সম্ভব নয়।”

-“বিয়ে করো তৃণা কে। সব দিয়ে দেবো। আজীবন পায়ের ওপর পা তুলে বসে খেতে পারবে।”

আকুল গলায় বলেন মিস্টার জি। সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মানুষ কতোটা শয়তান হয়েও ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে থাকে সেটা মিস্টার জি কে না দেখলে সাব্বির জানতেই পারতো না। আবরাজ মিস্টার জি এর কথার বিপরীতে বলে উঠলো,

-“এখন কি আমি শুয়ে খাচ্ছি মিস্টার জি?”

-“জার্মানিতে রাজত্ব করা মুখের কথা নয়।”

-“আপনার মেয়ে কে আবার ডক্টর দেখান। রাত-বিরেতে আমাকে ডিসটার্ব করছে। আমার বউ বিরক্ত এতে।”

আবরাজ গম্ভীর স্বরে বললো। মিস্টার জি তৎক্ষনাৎ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-“বলে দেবো ফিজা কে সব?”

-“ট্রাই করতে পারেন। আমায় বিশ্বাস করে আমার বউ।”

রাত বাজে তিন টা। মিস্টার জি খবর পেয়েছে। আবরাজ আর উনার সাথে কাজ করবে না। গতকাল আবরাজ এটা উনাকে ই-মেইল করে জানিয়েছে। জরুরি কাজে তিনি শহরের বাহিরে ছিলো। আবরাজ দেশে ফিরে যাচ্ছে শুনে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসছে। কিন্তু মনে হচ্ছে এতো কিছু করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। আবরাজ তার হাত থেকে ঠিকই বেরিয়ে গেলো। তবুও তিনি অনুরোধ করলো,

-“তুমি ছাড়তে পারবে না এই কাজ। তোমার রক্তে মিশে আছে এটা।”

-“খুন তো ছাড়তে হবেই! প্রয়োজনে সারাক্ষণ বউয়ের আঁচল ধরে থাকবো।”

আবরাজ অ্যাশ ট্রেতে সিগারেটের শেষ অংশ গুঁজে দিয়ে বলে। মিস্টার জি আর কি করবে। বাধ্য হয়ে নিজের গার্ডদের নিয়ে বেরিয়ে গেলো গ্যারেজ থেকে। সাব্বির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আবরাজ গাড়ির ডিঁকির ওপর বসে আছে। উদাস কণ্ঠে আবরাজ বলে উঠলো,

-“নারী জিনিস টা অদ্ভুত। তোমার অগোছালো জীবন যেমন গুছিয়ে দিতে পারে তেমন গোছালো জীবন এলোমেলো করতেও সক্ষম এরা।”

-“আপনার কোন টা স্যার?”

সাব্বির বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো। সে বুঝে নি এমন নয়। তবুও স্যার এর মুখ থেকে শুনতে চাইছে। কিংবা তার ভালো লাগবে। আবরাজ মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,

-“এলোমেলো ই তো করে দিলো সব। এখন আমি নিজেও ওর জন্য এলোমেলো হয়ে গিয়েছি।”

লাস্ট কথা টা মিনমিন করে বলে লাফিয়ে নামে ডিঁকি থেকে। এরপর লম্বা লম্বা কদম ফেলে বেরিয়ে এলো। পেছনে সাব্বির এলো।
বাড়িতে প্রবেশ করে যে যার রুমে চলে গেলো। আবরাজ রুমে এসে দেখলো ফিজা তখনও ঘুমিয়ে আছে। আবরাজ ডাকলো না। পাশে গিয়ে চুপচাপ নিজেও শুয়ে পড়লো। এরপর আলগোছে জড়িয়ে ধরে বউ কে।
সিগারেট এর গন্ধ খুবই বাজে। ঘুমের মধ্যেও ফিজা কাশতে লাগলো। আবরাজ তাজ্জব বনে গেলো। দ্রুত শোয়া থেকে ওঠে বসলো সে৷ লাইট অন করলো। ততক্ষণে ফিজা ও ঘুম থেকে ওঠে পড়েছে৷ আবরাজ সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ফিজা কে খাইয়ে দিলো।

-“যান শাওয়ার নিন।”

ফিজা নাক চেপে ধরে বললো। আবরাজ অবাক হলো। দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে মিনমিন করে বললো,

-“অনেক রাত তো বউ।”

-“তাহলে ব্যালকনিতে যান, নয়তো অন্য রুমে যান।”

-“এভাবে বলে না সুগন্ধি ফুল। তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না।”

আবরাজ বউ কে জড়িয়ে ধরার জন্য দুই হাত প্রসারিত করে এগিয়ে এলো। কিন্তু ফিজা দূরে সরে বসলো। আঙুল উঁচিয়ে শাসানোর স্বরে বললো,

-“একদম ঢং করবেন না।”

আবরাজ গম্ভীর করে নিলো মুখ। গম্ভীর স্বরে বলে,

-“মিসেস আবরাজ খান, সব সময় চুমু খাওয়ার একটা পারমিশন দিয়ে দাও। তাহলে সিগারেট ছেড়ে দেব।”

-“আপনার ঠোঁটে চুমু খাওয়া আর সিগারেট কে চুমু খাওয়া এক।”

-“সিগারেট কে খেতে হবে না। আমার ঠোঁটে খাও।”

আবরাজ নিজের মুখ এগিয়ে দিয়ে বললো। ফিজা মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো। আবরাজ বউয়ের দিকে আরো একটু এগিয়ে গেলো। আপাতত কিছু টা কমেছে গন্ধ। আবরাজ বউয়ের থুতনিতে ডান হাতের তর্জনী আঙুল ঠেকালো। নিজের দিকে ঘুরিয়ে ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট নেড়ে আওড়াল,

-“আই ওয়ান্ট এ কিস রাইট নাউ।”

-“গন্ধ,,,

ফিজা আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না। আবরাজ বউয়ের ঠোঁট তার আগেই বন্ধ করে দিলো। পাগল করা সেই ছোঁয়ায় আবার ছুঁয়ে দিলো মেয়ে টাকে। ফিজা চোখ পিটপিট করে শুধু আবরাজ এর মাতাল করা সেই চাহনিতে নিজের জন্য ভালোবাসা খুঁজতে ব্যাস্ত হলো।
ভালোবাসে তাকে এই পুরুষ! না-কি শুধু মোহ! ভালো লাগা কিংবা জেদ এমন কিছু কি!
ফিজা জানে না। জানতে ইচ্ছে করে খুব করে। স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার লোভ তার দিনদিন বেড়েই চলেছে যেন।

#চলবে….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]