#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_নয়
“একটা মেয়ে থাকার পরেও দ্বিতীয় বার বিয়ের করার এত শখ তোমার? জানো, তুমি একটা অভিশপ্ত মেয়ে। আমার ভাইকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছো তুমি। আমার মায়ের থেকে তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছো৷ তোমাকে আমার মা একটুও পছন্দ করে না। আমার মায়ের অমতে গিয়েও ভাইয়া তোমার সাথে সম্পর্ক গড়ার স্বপ্ন দেখছে। তোমার জন্য আমাদের পরিবারটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
মেহরিশের কানে সানায়ার ঘৃনিত স্বরে উচ্চারণ করা বাক্যগুলো যেতেই মেহরিশ কেঁপে উঠল। অবাক বাক্যে বলে উঠল,
“কি বলছো তুমি, সানায়া?”
সানায়া পুনরায় দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“যা বলছি একদম ঠিক বলছি। তুমি ডিভোর্সি। একটা মেয়েও আছে। তারপরেও কেন তোমাকে দ্বিতীয় বার বিয়ে করা লাগবে? কেন অন্যের গলায় ঝুলে পড়তে হবে? তুমি তো শিক্ষিত একটা মেয়ে। এখানে ভালো একটা জব খুঁজলেই পেয়ে যাবে। নিজের মেয়ের দায়িত্ব নিতে তুমি একাই যথেষ্ট। তাহলে কেন অন্য একজনকে দরকার তোমার?”
মেহরিশ হা হয়ে আছে। এসব সানায়া বলছে? তাও আহিলের মতো একটা ছেলের জন্য? মেহনুর এতক্ষন সব মুখ বুঝে শুনলেও এখন আর শুনতে পারল না। রেগে আগুন হয়ে বলে উঠল,
“সানায়া! তুই নিজের লিমিট ক্রস করে ফেলছিস। আমাদের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার বোনকে অপমান করছিস? ছিহ! যে কিনা তোর ভালোর জন্য এত দূর অব্দি করল আর তাকেই তুই এভাবে বলছিস?”
সানায়া মেহনূরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কে বলেছিল তোর বোনকে আমার ভালো করতে? আমি বলেছিলাম? আসল কথা হলো তোর বোন দুই নৌকার পা দিয়ে চলতে চাচ্ছে। আহিলকেও ছাড়তে পারছে না আবার আমার ভাইকেও ছাড়ছে না।”
মেহনূর চিৎকার করে উঠল। বলল,
“সানায়া! মুখ সামলে কথা বল। আহিলকে ছাড়তে পারছেনা মানে? আহিলের সাথে আপুর ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপু নিজে আহিলকে ডিভোর্স দিয়েছে। আর হ্যাঁ, তোর ভাই আমার বোনের পেছনে আঠার মতো লেগে আছে। আমার বোন তোর ভাইয়ের পেছনে পড়ে নাই।”
সানায়া তাচ্ছিল্য সূচক হাসল৷ হাসতে হাসতে বলে উঠল,
“তা মেহরিশ আপু, তুমি কি শুধু আনায়ার জন্য দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে চাচ্ছো? নাকি তুমি নিজেই সঙ্গী অভাব ফিল করছো?”
মেহরিশ এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনলেও এবার আর শুনতে পারল না। সপাটে সানায়ার গালে থা°প্পড় মে°রে বসল। চেঁচিয়ে বলল,
“আর একবার আমার নামে বাজে কথা বললে তোমার গালে আরো কয়েকটা থা°প্পড় পড়বে। সত্যিই, তোমার মতো মেয়ের ভালো করতে চাওয়া আমার ভুল হয়েছে। তুমি আহিলের সাথে সম্পর্কে যাও, বা ওর সাথে শুয়ে পড়ো। আমার দেখার বিষয় না। নিছকই তোমাকে নিজের বোন ভাবতাম বলে তোমার ভালোটাই চাইছিলাম। কিন্তু তুমি ভালোর যোগ্য না। এক্ষুনি আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। আউট।”
সানায়া গালে হাত দিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে গেল। মেহরিশ ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। মেহনূর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। সানায়ার মতো মেয়েকে হঠাৎ এভাবে বদলে যেতে দেখে মেহনূরের বড্ড কষ্ট হচ্ছে। যতোই হোক সানায়া তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। একটা ছেলের জন্য এত বছরের ফ্রেন্ডশিপটা আজ নষ্ট হয়ে গেলো মানতে পারছে না। কান্না পাচ্ছে বড্ড। মেহনূর নিজেকে সামলে মেহরিশের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপু, তুই সানায়ার জন্য সায়র ভাইয়ার সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে নিস না প্লিজ। সায়র ভাইয়া তোকে খুব বেশি ভালোবাসে।”
মেহরিশ উত্তরে শুধু শান্ত বাক্যে বলল,
“আমাকে একটু একা থাকতে দে, প্লিজ।”
মেহনূর আর কথা বাড়ালো না। চলে গেল রুম থেকে। মেহরিশের রুম থেকে বের হতেই নিলুফা বেগমের মুখোমুখি হলো মেহনূর। নিলুফা বেগমের শুকনো মুখ দেখে মেহনূরের বুঝতে বাকি রইলো না যে, নিলুফা বেগম সব শুনেছে। নিলুফা বেগম শুকনো স্বরে বলে উঠল,
“আমার মেয়েটা কী কোনোদিন সুখের মুখ দেখবে না রে?”
মেহনূরের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। মাকে হালকা করে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
“দেখবে, মা। অবশ্যই দেখবে। সায়র ভাইয়া তোম্র মেয়ে বড্ড সুখে রাখবে দেখে নিও। ওই একটা মানুষ আছে যে আপুকে পাওয়ার জন্য শুধু মা, বোনের সাথে না৷ পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারবে। লড়াই করে আপুর মন ঠিক জিতে নিবে দেখো।”
বলেই মেহনূর নিজের রুমে চলে গেল। নিলুফা বেগমের বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো।
–
–
রাত ৯টা বেজে ৫মিনিট। আহিলের গাড়িতে পাশাপাশি বসে আছে আহিল আর সানায়া। আহিল স্ট্যায়িং এ মাথা রেখে নিশ্চুপ হয়ে আছে। সানায়া এতক্ষণ যাবৎ চুপ থাকলেও এবার গর্জে উঠল। বলল,
“তুমি কি সত্যি আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখতে চাও না, আহিল?”
আহিল শান্ত বাক্যে জবাব দিল,
“না।”
সানায়া এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো৷ বিরক্তি মাখা স্বরে বলল,
“বাট হোয়াই, আহিল? হোয়াই আর ইউ ডুয়িং দ্যাট?”
আহিল মাথা উঠিয়ে সানায়ার দিকে অসহায় চাহনী দিয়ে বলল,
“কারন, তোমার ভাই, মেহরিশ চায়না।”
সানায়া আগের ন্যায় বলল,
“কিন্তু আমি তো চাই। আমার চাওয়াটা কী তোমার কাছে যথেষ্ট না?”
আহিল হঠাৎ করে সানায়াকে জড়িয়ে ধরল। কান্নার ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“বিলিভ মি, আই রিয়্যালি লাভ ইউ, সানায়া। প্লিজ, ডোন্ট লিভ মি।”
সানায়াও কান্না করে দিল। অল্পদিনেই আহিল সানায়াকে মারাত্নক দূর্বল করে ফেলেছে। আহিল পুনরায় বলে উঠল,
“আমি খারাপ, আমি মানছি। কিন্ত আমি এখন সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি, সানায়া। তোমাকে ভালোবেসে আমি অতীত ভুলে যেতে চাই৷ তোমার হাত ধরে আমি আমার বর্তমানকে সুন্দর করে সাজাতে চাই। নিজের ভুলটা আমি শুধরে নিতে চাই। কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি আবার এলোমেলো হয়ে যাবো। আবার অতীতে ফিরে যাব। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না।”
সানায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না, আহিল। আই লাভ ইউ, আহিল। আই লাভ ইউ।”
আহিলকে শান্ত করে সানায়া চলে গেল। সানায়া চলে যেতেই আহিলের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল। এক হাতে চোখের পানিটুকু মুছে নিয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠল,
“উফফ! আহিল! ইউ আর সো ড্রামাটিক বয়।”
এবার উচ্চবাক্যে হেসে উঠল। পুনরায় বলে উঠল,
“সানায়া! তুমি মেয়েটা খুব নরম মনের মানুষ। তাইতো তোমাকে বোকা বানানো আমার জন্য সহজ হয়ে গেছে।”
কথাটা শেষ করে আহিল গান ধরল। সুরে সুরে গেয়ে উঠল,
“love me like you do
l-l-love me like you do
touch me like you do
t-t-touch me like you do”
–
–
“বাবা, আমি কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশ যেতে চাই।”
হঠাৎ করে মেহরিশের মুখে এমন বাক্য শুনে আবির সাহেব সহ উপস্থিত ৩জনেই অবাক হলো বেশ।মেহনূর অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ বাংলাদেশ যাবে মানে? কেন?”
মেহরিশ শান্ত বাক্যে বলল,
“আমার একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার।”
আবির সাহেব মেহরিশের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল,
“আমি সব কিছু ম্যানেজ করে দিব৷ তুই যা। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“আমরা সবাই যাবো তোর সাথে।”
মেহরিশের মুখে হাসি ফুটল। মেহনূরও লাফিয়ে উঠল। সবাই মিলে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠল।মেহরিশের মন ভালো করার জন্য।
–
–
“সায়র নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে?”
সানায়া এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,
“শুধু সম্পর্ক না৷ বিয়ে অব্দি গড়িয়ে যাচ্ছে।“
সামনে কফি মগ হাতে, ওয়েস্টার্ন পরিহিতা মেয়েটা এবার একটু নড়েচড়ে বসল। জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু এসব কেন আমাকে বলছো? আর হঠাৎ এতদিন আমার সাথে দেখা করতে চাইলে কেন?”
সানায়া বলে উঠল,
“তুমিই একমাত্র ভাইয়াকে ওই মেয়ের থেকে দূরে সরাতে পারো। মা তোমাকে খুব পছন্দ করতো। কিন্তু তুমিই ভাইয়ার থেকে দূরে সরে আসলে। তোমাদের বিচ্ছেদের কারন আমরা কেউ জানেনা। এমনি ভাইয়া নিজেও জানেনা।”
মেয়েটা শান্ত বাক্যে বলল,
“এসব পুরনো কথা বাদ দাও। কি বলতে চাও সরাসরি বলো।”
সানায়া এবার কাঠকাঠ গলায় বলল,
“আমি চাই তুমি ভাইয়ার লাইফে আবার ব্যাক করো।”
#চলবে