পাপমোচন পর্ব-০২

0
494

#পাপমোচন (২য় পর্ব)

জানালার কাছ থেকে ছুটে গিয়ে বাবা আর আমি দুজন মিলে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে গেলাম। চোখের সামনে আপুর দেহটা লম্বা সুতোর মত ঝুলে আছে!
গতকাল রাতে আপু যেই সালোয়ারটা কামিজ টা পড়ে আমার রুমে এসেছিলো সেই সালোয়ারের ওড়নাটায় গলার সাথে পেচিয়ে ঝুলছে এখন!

রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ,ঠিকরে বেরিয়ে আসা একজোড়া চোখ আর চিবুক পর্যন্ত ঝুলে পড়া জিহ্বা সবমিলিয়ে আপুর মায়াবী মুখটা দেখতে ভয়ংকর লাগছে এ-ই মূহুর্তে!
আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মা, আপুর এমন বিভৎস চেহারা দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে সেখানেই মূর্ছা গেলো।

বাবা ছুটে গিয়ে আপুর ঝুলন্ত পা জোড়া জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। তারপর কান্না জড়ানো কণ্ঠে আমাকে উদ্দেশ্যে করে বললো,’ খোকা তোর আপুকে নামানোর ব্যবস্থা কর।’

বিছানার উপর পড়ে থাকা কাঠের টুল টা সোজা করে টুলের উপরে উঠে ফ্যানের সাথে পেচিয়ে রাখা আপুর ওড়নাটা খুলতেই আপুর প্রাণহীন বরফের মত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শরীরটা ঢুলে পড়লো আমার কাঁধের উপরে।
আপুর অসাড় হয়ে যাওয়া শরীরটাকে খুব সাবধানে ফাঁস থেকে নামিয়ে বিছানার উপর শুইয়ে দিতেই বাবা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। তারপর জগ ভরতি পানি এনে মায়ের চোখ মুখে পানির ছাঁটা দিয়ে মায়ের হুশ ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগলো।

আমি হতবিহ্বলের মত আপুর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আপুকে দেখছি। আপুর ফর্সা মুখটা এখন কেমন জানি ভয়ংকর দেখাচ্ছে। গলার কাছে হেচকা টান পড়ায় খানিকটা কালচে দাগ হয়ে গেছে কণ্ঠ বরাবর।

বাবা,মায়ের চোখ মুখে পানির ছাঁটা মেরে হুশ ফিরাতেই মা আবার আগের মত বিলাপ করতে লাগলো। আমি এতক্ষণ ধরে যেন একটা ঘোরের ভিতর ছিলাম,ঘোর কাটতেই এবার ডুকরে কেঁদে ফেললাম।

সকাল সকাল আমাদের মা-ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনে আশপাশের লোকজন এসে ভিড় জমিয়েছে ততোক্ষণে। কয়েকজন মহিলা মা’কে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাবা খুব ধৈর্যশীল মানুষ। নিজের মেয়ের এমন অকাল মৃত্যুতেও তিনি ভেঙে পড়েন নি। বরং নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখার সাথে সাথে আমাদেরকেও একা হাতে সামলাচ্ছেন তিনি। বাবা আমাকে শান্ত করিয়ে বললেন,’ খোকা, রিয়াদকে একটা কল দে।’

আমি নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে ঝাপ্সা চোখে কন্ট্রাক্ট লিস্ট খুঁজে রিয়াদ ভাইয়ার নাম্বার কল করলাম।
কয়েকবার রিং হতেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ওপাশ হতে পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,’ হ্যা শ্রাবণ বলো।’

আমি কান্না জড়ানো কণ্ঠে বললাম, ‘ভাইয়া আপু আর নেই।’

ছোট্ট একটা বাক্য রিয়াদ ভাইয়ার কানে যেন বজ্রপাতের মত আচড়ে পড়লো। কথাটা বলা মাত্রই রিয়াদ ভাইয়ার ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর মূহুর্তে বদলে গেলো। বিচলিত হয়ে জানতে চেয়ে বললেন,’ মানে! কি হয়েছে সুমনার? কোথায় সুমনা?’

‘ভাইয়া,আপু আর বেঁচে নেই। ভোর রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে!’

‘দেখো শ্রাবণ এইসব নিয়ে ফাজলামি করবা না। বাবা কোথায় বাবাকে দাও।’

‘আমি সত্যি বলছি! আপনি যত দ্রুত পারেন এখানে চলে আসুন।’

কথাগুলো বলে কল কেটে দিলাম। ততোক্ষণে আমাদের বাড়িতে উপচে পড়া মানুষের ভিড় জমেছে। উপস্থিত জনতার অনেকেই একেঅপরের সাথে চাপা স্বরে কানাঘুষো করছে আপুর হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে। আবার কেউ কেউ আপসোস করে সামান্য সহানুভূতি প্রকাশ করছে। আপুর লাশটাকে কয়েকজন ধরাধরি করে রুম থেকে বাইরে নিয়ে আসার পর একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে বারান্দায় চাদরের উপরে শুইয়ে রেখেছে।

আমি মায়ের পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি কাঠের পুতুলের মত আর একটু পর পর আপুর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটাকে দেখছি। আমি এখনো কেন জানি আপুর মৃত্যুটাকে মেনে নিতে পারিনি। আমার বার বার মনে হচ্ছে আমি ঘুমের ভিতরে কোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছি। একটু পরেই মা এসে কান চেপে ধরে জাগিয়ে দিয়ে তারপর রোজকার সেই হিটলার মার্কা চিরাচরিত ডায়লগ দিতে শুরু করবে। কিন্তু স্বপ্ন কি এতটাও বাস্তব হয়! এত এত মানুষ, এতগুলো কৌতুহলী চোখ সবই কি মিথ্যা?

কিছুক্ষণ পর সাইরেন বাজিয়ে বাড়ির বাইরে দুটো গাড়ি এসে থামলো। বাবা স্তম্ভিত হয়ে একটাবার বাইরে তাকালেন। পুলিশের গাড়ি! কিন্তু পুলিশকে কে খবর দিলো? বাবা সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে তাকালেন এবার।

আমি ভয়ে ভয়ে কাঁধ নাড়িয়ে বোঝালাম,না আমি কোনো খবর দিই নি।’
তাহলে পুলিশকে কে খবর দিলো?
একটু পর সেই উত্তরটাও মিললো। গাড়ি থেকে কয়েকজন পুলিশ নেমে সোজা আমাদের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। ভিতরে প্রবেশ করতেই আমাদের প্রতিবেশি জামাল চাচা এগিয়ে গিয়ে জানালেন,’স্যার আমিই কল করেছিলাম থানায়।’

তাদের ভিতরে সব চাইতে লম্বাটে দেহের নরমাল পোষাকে থাকা ভদ্রলোক জামাল চাচার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর তারপর সোজা আপুর লাশটা যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ আপুর লাশটাকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কনস্টেবলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,’ ঘরটা ভালোমত দেখে নিয়ে তারপর লাশটাকে পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দাও।’

লোকটার কথা শুনে বাবা এবার সেদিকে এগিয়ে গিয়ে অনুনয়ের স্বরে বললেন, ‘ স্যার আমি জানি গলায় ফাঁস দিয়ে কেউ আত্মহত্যা করলে তখন সেই মৃত্যু আপনাদের চোখে আর স্বাভাবিক মৃত্যু থাকেনা। কিন্তু আমার মেয়েটা মৃত্যুর আগেও মনে হয় অনেক কষ্ট পেয়েছে, গতকাল মাঝরাতে যখন এখানে এসে উপস্থিত হলো তখনি মেয়েটা আমার ভিতর থেকে একবারে ভেঙে পড়েছিলো। কিন্তু আমরা সেসবে গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম হয়তো আর দশটা সংসারের মত ছোটখাট ঝগড়ার কারণে অভিমান করে চলে এসেছে। কিন্তু কে জানতো মেয়েটার এই আসাটাই শেষ আসা হবে। আমার মেয়েটা সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে।
না জানি কোন অজানা কষ্ট বুকে চেপে ধরে মেয়েটা এতবড় সিদ্ধান্ত নিলো। মৃত্যুর সময়ও হয়তো বাঁচার জন্য কত ছটফট করেছে। কিন্তু আমরা এতটাই অভাগা,মেয়ের শেষ সময়ে তার পাশে থাকতে পারিনি। স্যার আপনার কাছে একটা অনুরোধ,আমার মেয়ের মৃত শরীরটা নিয়ে আর কাঁটাছেড়া কইরেন না।’

‘স্যরি হায়দার সাহেব। আমাদের না জানালে হয়তো মৃতাকে কবরস্থ করে ফেলতে পারতেন। তবে আমাদেরকে যেহেতু খবর দিয়ে ডেকে আনা হয়েছে,সেহেতু আমরা আমাদের মত তদন্ত করবো। হতেও তো পারে এসবের মাধ্যমেও আপনাদের মেয়ে ন্যায় বিচারটা পেয়ে গেলো।’

‘স্যার ন্যায় বিচারের কথা যদি বলেনই,তাহলে সুমনার শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। ওদের কারণেই আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি।’

‘তদন্তের স্বার্থে সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আচ্ছা আপনার মেয়ে জামাই কোথায়? তাকে খবর দেননি? ‘

ইন্সপেক্টর রুদ্রর মুখে প্রশ্নটা শুনে বাবা এবার আমার দিকে তাকালেন। আমি থতমত খেয়ে জবাব দিলাম,’বাবা আমি তখনি ফোন দিয়েছিলাম। আসেনি এখনো।’

আমাদের কথার মাঝে এবার আপুর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু রিয়াদ ভাইয়া তখনো অনুপস্থিত।
রুদ্র সাহেব এক এক করে সবার পরিচয় জেনে নেওয়ার পর আপুর শ্বশুরকে প্রশ্ন করলেন,’ আপনাদের ছেলে কোথায়? তাকে দেখছি না যে। আসেনি কেন এখনো? তার তো সবার আগে আসবার কথা।’

আপুর শ্বশুর এককথায় উত্তর দিলো,’ স্যার, রিয়াদ তো বাসায় নেই।’

‘কোথায় গিয়েছে?’

‘ এক সপ্তাহ হলো অফিসের কাজের জন্য রাঙামাটি গিয়েছে। সে নিজেই তো ফোন করে সুমনার মৃত্যুর খবরটা আমাদেরকে জানালো। সে-ও রওনা দিয়েছে পৌঁছে যাবে ঘন্টাখানেকের ভিতরে। ভাইসাব আপনি কিছু বলছেন না কেন? রিয়াদ বা সুমনা কেউ কিছু বলেনি আপনাকে? রিয়াদের তো নিজেই এসে সুমনাকে আপনাদের বাড়িতে রেখে গিয়েছে।’

শেষের কথাগুলো ভদ্রলোক বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে তাকিয়ে রইলেন বাবার দিকে। কিন্তু শেষের কথাগুলো শুনে আমি আর বাবা দুজনেই হতবাক হয়ে গেলাম।
বাবা উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন,’ মানে? সুমনাকে রিয়াদ রেখে যাবে কেন? সুমনা তো একা একাই গতকাল রাতে আমাদের বাসায় এসেছিলো।’

বাবার এহেন কথায় ভদ্রলোকও এবার বিস্মিত স্বরে বললো, ‘গতকাল মানে! কি বলেন এসব উল্টাপাল্টা! রিয়াদ তো আরও ছয়দিন আগে রাঙামাটি যাওয়ার সময় সুমনাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলো। বলেছিলো, যাওয়ার পথে সুমনাকে আপনাদের এখানে ছেড়ে যাবে আর আপনাদের সাথেও দেখা করে যাবে সেই সুযোগে।
আমি কয়েকবার বারণ করলে রিয়াদ জানিয়েছিলো,’ বাবা আমি যে ক’টাদিন অফিসের কাজে বাইরে থাকি সুমনাও না হয় সেক’টাদিন ওর বাবার বাড়ি থেকে কাটিয়ে আসুক। বিয়ের এতদিনে তো তেমনভাবে গিয়ে থাকা হয়নি ওর।’
তারপর তো রিয়াদ নিজেই সুমনাকে সাথে করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো।’

‘কিন্তু রিয়াদ তো আসেনি। গতকাল মাঝরাতে সুমনা একা একা আমাদের এখানে এসেছিলো। তাহলে মাঝের কয়দিন আমার মেয়েকে কোথায় রেখেছিলো আপনার ছেলে?’

রুদ্র সাহেব এতক্ষণ চুপচাপ দুজনার কথা শুনছিলেন। এবার দুজনকেই উত্তেজিত হয়ে যেতে দেখে তাদের থামিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’ আচ্ছা আপনারা শান্ত হন। এখনি এসব নিয়ে তর্ক করে কোনো লাভ হবেনা। আগে আপনার ছেলে রিয়াদ আসুক,তারপর তার মুখ থেকেই না হয় বাকিটা জানা যাবে। হতেও পারে দুজন বাসা থেকে বের হওয়ার পর মত বদলে ছিলো তাদের। আর তারপর স্ত্রীকে আপনাদের কাছে না রেখে তার সাথেই নিয়ে গিয়েছিলো। পরে হয়তো কোনকিছু নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় মেয়েটা রাগারাগি করে সেখান থেকে একা একাই চলে এসেছে। এখন সত্যি কোনটা সেটা তো মৃতার হাসব্যান্ডের সাথে কথা না বলা পর্যন্ত বলা যাচ্ছেনা।
আচ্ছা আমরা এখন যাচ্ছি। আর হ্যাঁ আপনার ছেলে পৌঁছানো মাত্রই আমার সাথে দেখা করার জন্য পাঠিয়ে দিবেন কেমন।’

কথাগুলো বলে ওসি রুদ্র সাহেব নিজেও একটাবার স্বচক্ষে আপুর ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। তারপর আপুর লাশটাকে পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

লম্বা সময়ের ভিতরে বাবাকে এই প্রথমবার ভেঙে পড়তে দেখলাম আমি। বাবা সোফার উপর ধপাস করে বসে পড়লেন মাথায় হাত দিয়ে। তারপর আপুর শ্বশুরের দিকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললেন,’ তারমানে আমার মেয়েটা আপনার ছেলের জন্য আত্মহত্যা করেছে। আমার মেয়ের খুনের জন্য আপনার ছেলেই দায়ি।’
চলবে…

#আশিক_মাহমুদ