#আমার_মাঝে_তুমি
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
#পর্ব_৩
বসার ঘরে বড়ো ঘোমটা দিয়ে সবার মাঝে বসে আছে সুনাইফা। সুনাইফার পাশেই ভদ্র ছেলের মতো বসে আছে ইজহান শেখ। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে ইজহানের দিকে তাকিয়ে দেখে ইজহানের ঠোঁটের কোণে হাসি। যা দেখে গা জ্বলে ওঠে তার। রাগে মাথা টগবগ করছে। তার মনে পড়ে যায় একটু আগের ঘটনা। যখন সুনাইফা রুমে চলে গিছিল। তার কিছুক্ষণ পরই রুমে আসে ইজহান। এসে আয়েশ করে খাটের উপর বসে । যা মুখ বুজে কিছুক্ষণ সহ্য করলেও শেষ মেষ পারে না । তীব্র রাগ নিয়ে একদম কাছে এসে বলে,
” আপনার সমস্যা কোথায় উহু? আমার রুমে কেন আসছেন,বের হন বলছি।
সুনাইফার কথা চুপ করে শুনে কিছু না বলে হাত ধরে তার পাশে বসিয়ে দেয়। ইজহানের কান্ডে হতবাক হয়ে যায় সুনাইফা। কিছু বলতে গেলে ইশারায় থামিয়ে দেয়। সুনাইফা ভয়ে চুপ হয়ে যায়। তারপর ইজহান বলে,
” শোনো মেয়ে, যে ভূল টা তুমি একবার করছো? ভূলেও সেই ভূলটা দ্বিতীয় বার করার চেষ্টা করো না? যদি করো তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে। কোনো সিনক্রিয়েট না চুপচাপ বিয়েটা ভালোই ভালো করে নাও। পরে তোমার কি সমস্যা সেটা আমি দেখে নেব৷ মাইন্ড ইট। আর হ্যাঁ, সাজটা আরেকটু কম্পিলিট করে নাও। এই দিনটা জীবনে একবারই আসে বলে বাঁকা হাসে। যা দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে সুনাইফা। ইজহান গটগট পায়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে সুনাইফা। সে কি তাহলে কিছুই করতে পারবে না। তার জীবনটা এভাবে শেষ হয়ে যাবে। এটা কি করে হতে পারে?কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পরে হাতের উপর। ইজহান চলে যেতেই রুমে ঢোকে সামিয়া। সুনাইফা কে কাঁদতে দেখে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
” ইফু বেবি প্লিজ কান্না করিস না! যা হচ্ছে হতে দে। আমরা চাইলেও আর কিছু করতে পারব না। সবটা আমাদের ধরা ছোয়ার বাইরে চলে গেছে। তুই মেনে নে এটাই তো ভাগ্যে ছিল। ভাগ্যের লিখন কি আর বদলানো যায় বল? কেঁদে কেটে কোনো লাভ হবে না। আমরা যদি ফের কিছু করার চেষ্টা করি তাহলে চাচা’র মানসম্মান সব যাবে। আর তোর এমপি বর কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না।
সুনাইফা সামিয়ার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে তার দিকে অশ্রু সিক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
” সামু আমার জীবনটা এভাবে শেষ হয়ে যাবে আমি কোনো দিনও ভাবি নি রে। আমার সব শেষ রে।
সুনাইফা র কথার পরিপ্রেক্ষিতে সামিয়া জবাব দেয়,
” কিছুই শেষ হয়নি ইফু। তুই কোনো এত প্যানিক করছিস বল তো। আর তুই যে ভাইয়া কে বুইড়া বলছিস। ভাইয়া কি সত্যি সত্যি বুইড়া হ্যাঁ। তোর সোনার কপাল বুঝছিস যে ভাইয়ার মতো হ্যান্ডসাম বর পাচ্ছিস।
সুনাইফা ভ্রু কুচকে বলল,
” আমার আর তার বয়সের পার্থক্য জানিস তুই?
” কত বল।
” ১১ বছর। আমি তার থেকে ১১ বছরের ছোটো।
” বয়সে কিছু মেটার করে না গাধী। ভালোবাসা টায় আসল। ভাইয়া যদি তোকে ভালোবেসে বিয়ে করে তাহলে তো কোনো কথায় নেই। তুই নিশ্চিন্তে বিয়েটা করে ফেল ইফু।
“……..
সুনাইফা চুপটি করে সামিয়ার কথা গুলো শোনে। কিচ্ছু টি বলে না। কারণ সামিয়া লিগাল কথা বলছে। কিছু সময় পর সুনাইফার মা এসে তাকে নিয়ে যায়। সুনাইফার ভাবনার ছেদ পড়ে ইজহানের কথায়। ইজহান বলে,
” একটু পরে তো আমি তোমারই হবো বউ। তখন মন ভরে আমাকে দেইখো আর গালি দিও। এখন সবার সামনে এভাবে তাকিয়ে থাকলে মুই লজ্জা পাচ্ছি তো ফিসফিস করে বলে মুচকি হাসে ইজহান। ইজহানের কথায় আশ্চর্য হয়ে যায় সুনাইফা। দ্রুত চোখ নামিয়ে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
” আচ্ছা বজ্জাত তো ইনি। উনি বুজলো কি করে আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকে ধুয়ে দিচ্ছলাম। জাূাুটাদু জানে নাকি। কি জানে বাবা।
__
একটু পর ইজহান আর সুনাইফার বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়। দুজনে বাধা পরে বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কে।
****
ইজহান দের বাসা থেকে যে পাঁচ ছ’জন লোক আসছে তাদেরকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে খেতে দেওয়া হয়। বিয়ে শেষ হতেই সুনাইফা নিজের রুমে ছুটে আসে। খাওয়া দাওয়ার পাঠ শেষ হলে বর পক্ষ বিদায় নেয়। সিরাজ মোল্লা সবাইকে থাকতে বললেও কেউ থাকতে রাজি হয়। শুধু মাত্র ইজহান থেকে যায়। ইজহানের বাবা ইজহানের সাথে ইয়াদ কে থাকতে বলে। ইয়াদ প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তী তে ইজহানের বাবা-র কথায় থেকে যায়।
__________
সুনাইফা রুমের বাতি নিভিয়ে খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পুরো রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। ইজহান রুমে ঢুকে রুম অন্ধকার দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যায়। সুনাইফা কিছু ভূল করে টরে ফেললো নাকি। অজানা ভয়ে শুকনো ঢোক গেলে ইজহান। তারপর ফোনের ফ্লাশ জালিয়ে সুইচ বোর্ড খুজে বের করে। বেশি খুজতেও হয় না তার সামনেই ছিল। দ্রুত সুইচ অন করে খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ইজহানের মনে হলো তার বুকের উপর থেকে বড়ো পাথর সরে গেছে। ফোনের ফ্লাশ অফ করে সুনাইফার কাছে আসে। প্রথমে দু’বার ডাক দিলে কোনো রেসপন্স পায় না। পরে খেয়াল করে দেখে ফুপানোর আওয়াজ। ইজহান বুঝতে পারে সুনাইফা কাঁদছে। ইজহান এবার খাটের উপর বসে সুনাইফা র হাত ধরে টান মেরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আচমকা এমন হওয়ায় চমকে ওঠে সুনাইফা। সুনাইফা র চমকানো মুখ দেখে মৃদু হেসে ওঠে ইজহান। সুনাইফা ভয়ে পিছনে সরে যায়। তবে যেতে পারে না। কারণ ইজহান তার দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে। সুনাইফা তুতলিয়ে বলে ওঠে,
” আ- মাকে ছা-ড়ু-ন৷
ইজহান ভদ্র ছেলের মতো হাত ছেড়ে দেয়। তবে বলে, ছেড়ে দিচ্ছি বলে দুরে যেও না। ইজহানের কথায় সুনাইফা আরও বেশি ভয় পায়। চোখ দুটো বিছানার দিকে আবদ্ধ। ইজহান সুনাইফার থুতনি ধরে মুখ উচু করে দুচোখের পানি পরম যত্নে মুছে দেয়। ইজহানের কান্ডে অবাক হয় সুনাইফা। তবে কিছু বলে না। ইজহান এবার নরম সুরে বলে,
” একটা প্রশ্ন করব তোমাকে?
সুনাইফা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
” আমি কি দেখতে খুব খারাপ?
সুনাইফা অবাক হয়ে ইজহানের দিকে তাকায়। এটা আবার কেমন প্রশ্ন? সুনাইফা বলে,
” মানে! কি বলছেন আপনি?
” আমি কি দেখতে খুব খারাপ সুনাইফা।
ইজহানের প্রশ্নে অস্বস্তি হয়। কি বলবে সে? হ্যাঁ নাকি না? ইতস্তত বোধ করে বলে,
” এটা আবার কেমন প্রশ্ন। আপনি নিজেকে আয়নায় দেখেন নি? আপনি দেখতে কেমন?
সুনাইফা র জবাবে হালকা হেঁসে বলে, আমি তোমাকে প্রশ্ন করছি। আর উত্তর টা তুমিই দেবে?
” আজব। আপনি তো দেখতে সুন্দর। তাহলে এমন প্রশ্ন করছেন কেন?
ইজহান গম্ভীর কণ্ঠে সুধালো,
” আমি যদি দেখতে সুন্দরই হই তাহলে আমাকে বিয়ে করতে এতো আপত্তি কেন তোমার?
সুনাইফা মাথা নিচু করে নেয়। এবার সে কি বলবে? কিভাবে বয়সের কথা বলবে? এভাবে বললে যদি উনি কষ্ট পায়। তাহলে, না না এটা কিছুতেই বলা যাবে না। সুনাইফার ভাবনার মাঝেই বলে,
” কি হলো বলছো না কেন?
” আব আ- সলে।
” কি আসলে নকলে করছো? সোজাসাপটা বলে ফেলো। কিসের এতো আপত্তি তোমার? আমার আর তোমার বয়সের?
সুনাইফা অবাক হয়ে তাকায় ইজহানের দিকে। ইজহান ফের বলে,
” ঠিক বলছি তো। কতই বা বেশি ১০/ ১১ এর বেশি তো নয়। এতে কি সমস্যা তুমিই বলো? আচ্ছা তোমাকে বলতে হচ্ছে না। তুমি বলো তোমার ভাইয়ের বয়স কত?
” এগারো।
” তোমার ভাইকে কি দেখতে বুইড়ার মতো লাগে।
” আমার ভাই কে কেন বুইড়ার মতো লাগবে। আমার ভাই দেখতে খুব সুন্দর।
” তাহলে আমাকে তোমার কোন দিক দিয়ে বুইড়া লাগে।
” আসলে আপনি ভূল ভাবছেন? আমি সেভাবে কিছু বলিনি।
” মেইন সমস্যা টা কি তাহলে আমাকে খুলে বলো?
” বলব, কিছুটা নার্ভাস হয়ে ।
ইজহান আসস্ত করে বলল,
” রিল্যাক্সে বলতে পারো। বলো?
” আসলে আমি বিয়ে খুব ভয় পায়। আমি কখনো ভাবিনি বিয়ে করবো। আর আমি বিয়ে করতেও চাই না।
” হোয়াট…? সামান্য বিষয় বিয়ে ভয় পাও তারজন্য বিয়ে করবে না। কিন্তু কিসের জন্য ভয় পাও শুনি।
” আসলে…….
” অস্বস্তি ফিল না করে বলো। আমি পর কেউ না। তোমারই স্বামী। তাই ভয় না পেয়ে ভয়কে জয় করে আমাকে বলো?
সুনাইফা মাথা ঝাকিয়ে বলল,
” আমার একটা বান্ধবীর ক্লাস নাইন থেকে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের দুদিন পর ই সে মারা যায়। কিভাবে কিসের জন্য সে মারা যায় কেউ কিছু জানে না। আর সেখান থেকেই আমার খুব ভয় করে। আমার ক্ষেত্রে ও যদি এমন হয়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নেয়। আমি কখনো বিয়ে করব না। আর করলেও অনেক দেড়ি আছে৷ আমি নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই। নিজে আত্মনির্ভরশীল হবো। কখনো কারোর দয়ায় থাকব না।
” তুমি অযথা ভয় কে মনে পুশে রেখেছো। যার যে পর্যন্ত হয়াত, সে সে পর্যন্তই বাঁচবে। ওর হয়ত ওই পর্যন্ত ই হয়াত ছিল। এসব আর কখনো ভাববে না।
তুমি কি ভাবছো? তোমাকে বিয়ের পর তোমার দিয়ে সংসার করাবো? সেটা তো হবে না ডিয়ার বউ। তোমাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এটাই আমার চাওয়া। কি পারবে না নিজেকে প্রমাণ করতে?
” অবশ্যই পারব। হাসি মুখে বলে।
ইজহান এবার দুষ্টু হেসে বলে,
” খুব তো বুইড়া বুইড়া করে অপমান করছিলে। এবার বুইড়া কি করতে পারে দেখবা। ইজহানের কথায় হাসি মুখে আঁধার নেমে আসে সুনাইফার। মনে ভয় এসে হানা দেয়।
সুনাইফা কে ভয় পেতে দেখে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠে বলে,
” আরে পাগলি তুমি ভয় পাচ্ছো কেন? আমি মজা করে বলছিলাম। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো?
সুনাইফা মাথা নেড়ে বিছানায় শুয়ে পরে। ইজহান ফ্রেশ হয়ে এসে সুনাইফার পাশে শুয়ে পরে। দু’জনে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।
চলবে ইন শা আল্লাহ