প্রণয় সমাচার পর্ব-০৪

0
30

#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ৪

” হ্যালো ‘সু থিফ’ ”

অপলা চমকে উঠে ড্রয়িং রুমের সোফার দিকে তাকালো। বিশ্বাস না হতেই চোখ দুটো আলতো হাতে ডলা দিলো। সে কী সত্যি-ই দেখছে? এই বাঁদর এখানে কী করছে? অপলা ঢোক গিললো। উসামা কী এখন ফুপির কাছে বিচার দেবে? ফুপি অপলাকে কী ভাববে? ছিহ! লজ্জা লজ্জা! অপলার দুশ্চিন্তায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিলো। পরমুহূর্তেই শাহেলা অপলা বলে ডাক দিতেই অপলা ছুটে গেল। ফুপি চায়ের ট্রে-টা অপলার হাতে দিয়ে বললেন,

” এটা ড্রয়িং রুমে বসা ছেলেটার সামনে গিয়ে রাখ। তরকারিতে চড়িয়ে-ই আমি আসছি।”

অপলা চুপচাপ ট্রে নিয়ে উসামার সামনে রাখলো। উসামা কেমন অবাক চোখে অপলার দিকে তাকিয়ে বললো,

” বাহ! তুমি বানিয়েছো? চুরি বিদ্যা ছাড়াও রন্ধন বিদ্যাও তোমার ভালোই জানা আছে দেখছি।”

অপলা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,

” আমি খু’ন বিদ্যাও বেশ ভালোই জানি। এই চায়ের সঙ্গে দু ফোঁটা ইঁদুরের বি’ষ মেশাতে পারলে মনটা শান্তি লাগতো। কিন্তু আফসোস!”

উসামা চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,

” আহা! কী দুঃখের কথা! তোমার আফসোসের কথা শুনে আমারও শরীরটা জ্বলে যাচ্ছে। ”

অপলা জবাবে কিছু বলতে নিয়েও বললো না। শায়েলা বেগম রান্না চাপিয়ে উসামার সঙ্গে কী সব আলাপ আলোচনা করলেন। এরপর উসামা উঠে চলে যেতেই অপলা শায়েলার কাছে এলো। ভয়ে তাঁর প্রান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম উসামা ভিডিওটা ফুপিকে দেখায়নি তো? কিন্তু, অপলাকে অবাক করে দিয়ে শায়েলা বললেন,

” এই মাত্র যে-ই ছেলেটাকে দেখলি এটা উসামা। কাল যে-ই ভাবী এসেছিল তাঁর ছেলে। দুটো ছেলের মধ্যে দুটোই যেন সোনার টুকরো। যেমন নম্র তেমন তাদের ব্যবহার। মমোর জন্য স্যার খুঁজছি জানিস। কোচিংয়ে কী ছাতার মাথা পড়ছে রেজাল্ট দিনকে দিন গোল্লায় যাচ্ছে। উসামা-ই হয়তো মমোকে পড়াতো কিন্তু সারাদিন এত খাটুনি খেটে এসে ছেলেটার জন্য খুব কষ্টের হয়ে যেতো। তাই উসামাকে বলে রাখলাম ওর পরিচিত কোনো ভালো স্যার থাকলে মমোর জন্য দেখতে। মহারানীর তো পড়াশোনার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। সারাদিন শুধু ধেই ধেই!”

অপলা এবার শান্তির প্রশ্বাস ফেললো। যা ভেবেছিল তা যে হয়নি সেটাই শান্তি। উসামা যেন ফুপির মাথায় পুরো চড়ে বসেছে। এই বাড়ির সকলেই উসামার মোহে অন্ধ।

” আজ উঠতে এত দেরি যে?”

শায়েলার প্রশ্নে অপলা আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো,

” আজকের আবহাওয়ার দিকে তাকালে আর ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু মন্দ কপালে কী আর সুখ সয় বলো ফুপি? এত সুন্দর বৃষ্টিমাখা আবহাওয়ায়ও আমার ক্লাসে যেতে হবে।”

শায়েলা মুচকি হেসে বললেন,

” তাহলে ভাইজানকে বলি ছেলে দেখতে। তখন জামাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে বৃষ্টি বিলাস করিস। তুই বৃষ্টি দেখবি আর তোর জামাই ঘর মুছবে।”

অপলা অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। আজকাল এমন ছেলে পাওয়া দুষ্কর। বৃষ্টি বিলাস তো দূরে থাক। বিয়ের পর দেখা যাবে ভোরে উঠে বরের জন্য নাস্তা বানাতে হচ্ছে। অপলা মাঝেমধ্যে ভেবে পায় না এই জীবনের মর্ম কী? অর্ধ জীবন যায় পড়াশোনায় আর বাকি অর্ধ জীবন যায় সংসার, স্বামী ও সন্তানের ঘানি টানতে টানতে।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এই অলস শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ধরে অপলা ক্লাসের উদ্দেশ্যে বের হলো। বৃষ্টি এখন কিছুটা থেমেছে। তাই, এখন বের হওয়াটাই সবচেয়ে উত্তম। নাহলে দেখা যাবে ভেজা শরীর ঠান্ডায় নাক টানতে টানতে ক্লাস করতে হচ্ছে। নীচের গেট দিয়ে বের হয়ে অপলা বাস ধরতে বাস স্টপেজের দিকে এগিয়ে গেল। বাসা থেকে কয়েক কদম হাঁটলেই বাস স্টপেজ। কিন্তু, দুঃখের বিষয় আজ কোনো বাসের দেখা নেই। যতগুলো বাস আসছে তাতে এতটাই ভীড় যে এই ভীড়ের মধ্যে মিশলে অপলাকে হয়তো আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না। তবুও অপলা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলো। তবে, বাইকের হর্নের আওয়াজে অপলা চমকে উঠলো। মাথায় হেলমেট পরিহিত এক যুবক অপলার দিকে তাকিয়ে আছে। অপলা এক অভ্যন্তরীন অস্বস্তি বোধ করলো। তবুও সে একবার পরখ করে দেখলো। তবে, কিছু ভেবে দেখার পূর্বেই হেলমেট খুলে উসামার আগমন ঘটলো। অপলার মনে হলো ফিল্মে যেমন হিরোর এন্ট্রি ঘটে ঠিক সেরকমই ছিল উসামার এন্ট্রিটা। কিন্তু হিরোর বেশে নয় বরং ভিলেনের বেশে। উসামাকে দেখলেই কেমন একটা ভিলেন ভিলেন ভাব আসে। আপাতত দৃষ্টিতে অপলার জীবনের ওয়ান এন্ড অনলি ভিলেন উসামা দ্যা ব’দ। অপলাকে অবাক করে দিয়ে উসামা বললো,

” বাইকের পেছনের সিটটা এখনও খালি আছে; চাইলে বসতে পারো। আমি আবার খুব দয়াবান। বিপদগ্রস্ত নারীদের সাহায্য করি।”

অপলা ভ্রু কুঁচকে ফেললো। কে চেয়েছে এই উসামা বিন লাদেনের দয়ার দান? অপলা এক বাক্যে উত্তর দিলো,

” ওহে আমার দয়ার রাজা! আপনার দয়া আপনার কাছেই রাখুন। এসব এখানে চলবে না। আপনাদের মতো সুবিধাবাদী পুরুষদের চেনা আছে। মেয়ে মানুষ দেখলেই আপনাদের দয়া উপচে পড়ে।”

উসামার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে সে প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ! এক শব্দে সে অপলার কথার জবাব দিয়ে বললো,

” ওকে!”

বাইকটাকে এত দ্রুত আর সটাৎ গতিতে টান দিলো যে, বাইকের চাকার নিচে পৃষ্ঠ কাঁদার অধিকাংশই অপলার গায়ে এসে পরলো। পুরো জামার নিচের অংশ জুড়ে কাঁদার ছড়াছড়ি। আশেপাশের মানুষজনের বিব্রতকর চাহনিতে অপলা কেমন একটা অস্বস্তির স্বীকার হলো। উসামার প্রতি তাঁর তীব্র ক্রোধের সৃষ্টি হলো। এমন একটা পরিস্থিতিতে এটা না করলেও কী হতো না? অপলার পরিস্থিতিকে আরো তাল মাতাল করতে আকাশ যেন আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো। অপলা ঝিরঝির আওয়াজের সঙ্গে প্রবল বর্ষনের উপস্থিতি টের পেলো। সে আর দাঁড়ালো না এক ছুটে চলে এলো। যেতে হবে না আজ তাঁকে ক্লাসে। একে তো জামা কাপড়ের বেহাল দশা তাঁর মধ্যে আবার বৃষ্টির পানি। সকাল সকাল উসামা নামক রাহুর মুখ দেখেছিল বলেই আজ হয়তো তাঁর এই দশা।

ছুটতে ছুটতে অপলা বাড়ির নিচের মেইন ডোরে এসে স্তব্ধ হলো। এখানেও সেই উসামা? অপলার ইচ্ছে করলো উসামাকে ধরে দু’ঘা দিতে৷ কিন্তু পরোক্ষনে উসামা তাঁর দিকে ঘুরে তাকাতেই অপলা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। উসামার বৃষ্টিতে ভেজা চুল থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরছে। চোখের পাপড়িগুলোতে বিন্দু বিন্দু পানির কনা দেখা যাচ্ছে। কপোল জুড়েও মৃদু মৃদু পানির ছাপ। যাঁর কথা চিন্তা করে কিছুক্ষন আগেও অপলার মনে ক্রোধের সঞ্চার ঘটেছিল। যাকে দেখে অপলার ভ্রু জোড়া বিরক্তিতে কুঁচকে এসেছিল। তাঁকে দেখে হঠাৎ অপলা এতটা শান্ত হয়ে গেল কেন? অপলা নিজেকেও একবার প্রশ্ন করলো। কিন্তু তাঁর নিজের কাছেও এর উত্তর নেই।

চলবে…