#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২১
সারারাত মেঝেতে শোয়ার কারণে অপলার সারা শরীর যেন ম্যাজ ম্যাজ করছে। সারারাত এক ফোঁটাও ঘুম চোখে আসেনি। অপলা উদাসীন ভাবে উঠে বসলো। বিছানায় উসামা হাত, পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেঘোরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। অপলা উসামার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকালো। দিন দুনিয়ার কোনো খেয়াল নেই। নিজের মতো ঘুমের জগতে তলিয়ে গেছে।
অপলা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। চোখ বন্ধ করে উসামার বলা কালকে রাতের কথাগুলো মনে করতে লাগলো। কতটা নির্লিপ্ত ভাবে সে নিজের প্রেমিকার বিষয়টা অপলাকে বলেছিল। অপলার মন ভারাক্রান্ত হয়ে এলো। কেমন একটা বিতৃষ্ণা কাজ করছে। তাঁদের মধ্যে সেভাবে কোনো সম্পর্ক নেই। যা একজন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে থাকা উচিত। তবুও কেন রূপার বিষয়টা তাঁর মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে? অপলার কাছে রূপাকে গলার কাটা বলে মনে হলো। যা সে ফেলতেও পারছে না। আবার গিলতেও পারছে না।
” সকাল সকাল চা পেলাম না যে আজ?”
উসামার প্রশ্নে অপলা বিরূপ গলায় জবাব দিলো,
” আপনাকে সময়মতো চা বানিয়ে দেওয়াটা আমার কর্তব্য নয়। বাইরের মানুষের কাছে আমরা স্বামী স্ত্রী। কিন্তু, আমাদের মধ্যে সেরকম কোনো সম্পর্ক নেই। তাই, আমার পক্ষেও এত ফর্মালিটি মেইনটেইন করা সম্ভব নয়।”
অপলা উসামা কড়া গলায় কথাগুলো বললেও। ভেতরে ভেতরে তাঁর নিজেরই বুক ফেটে যাচ্ছে। অপলাকে অবাক করে দিয়ে উসামা বললো,
” হ্যাঁ, তা যদিও ঠিক বলেছো। তুমি নিশ্চিতে নিজের মতো থাকতে পারো অপলা। আর আমারই আসলে তোমাকে চা বানাতে বলা উচিত হয়নি। মিথ্যা সম্পর্কে এত ফর্মালিটির প্রয়োজন নেই।”
অপলা হতবাক হলো। উসামা এত শান্ত ভাবে তাঁদের সম্পর্কটাকে মিথ্যা বলে ফেললো। তাঁর কী একবারও বুক কাঁপলো না?
নাশতার টেবিলে বসেও অপলা তেমন একটা কথা বললো না। তাঁর মনে কোনো আনন্দ নেই। উসামা সম্পর্কটাকে বোঝা মনে করছে। তাঁর মানে সে নিজেও কী উসামার কাছে বোঝাসম?
নাশতা শেষে উসামা তাঁর কাঙ্ক্ষিত নীল শার্টটা পড়ে অফিসের জন্য বের হয়ে গেল। উসামার গায়ে নীল রঙের শার্টটা দেখামাত্রই অপলার মনে হলো কেউ যেন তাঁর বুকে ছুঁচ ফোটালো। তাঁরই সামনে তাঁর স্বামী অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে;দেখা করার জন্য সেজেগুঁজে বাইরে বের হচ্ছে। এটা অপলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। নিজেকে সে নানাভাবে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু, মন কোনোভাবেই মানলো না।
দুপুর বেলা মমোকে নিয়ে শায়েলা এলো। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। অপলাকে হাতের শপিং ব্যাগটা দিয়ে বললো,
” এই নে, টেইলর তোর ব্লাউজগুলো বানিয়ে দিয়েছে। পড়ে দেখিস মাপ মতো হয়েছে কিনা।”
অপলা শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো,
” এত তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলো?”
শায়েলা হেসে বললেন,
” আরে টেইলর তোর ফুপার পরিচিত তো। তোর ফুপার বন্ধুর দেওয়া দোকান এটা।”
অপলা আর কোনো কথা বাড়ালো না। শপিং ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইলো। যাঁকে এগুলো পড়ে দেখানোর জন্য বানিয়ে ছিল সে সেই তো অন্য মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এসবের এখন আর কোনো মূল্য আছে?
অপলা শায়েলাকে এই বিষয়ে অবগত করলো না। একান্তই নিজের কাছে গোপন রাখলো। মমো আজ অপলাকে বাটে পেয়ে একা একা নিজের মতো বকবক করেই যাচ্ছে। অপলার সেই সবে কোনো মন নেই। তাঁর মন শুধু উসামাকে নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত।
দুপুরে খেতে বসেও অপলার গলা দিয়ে খাওয়া নামলো না। তাঁর মন যে অন্য দিকে! খাওয়ার টেবিলে বসে জেসমিন অপলাকে বললো,
” মা তোমার খাওয়া শেষ হলে; উসামাকে একটু ফোন করো। সকাল বেলা ছেলেটা তেমন একটা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়নি। জিজ্ঞেস করে দেখো দুপুরে ঠিকমতো খেয়েছে। অফিস করে শরীরে এমনিতেই কিছু থাকে না। এরমধ্যে যদি ঠিকঠাক মতো খাওয়া দাওয়া না করে তাহলে বল পাবে না।”
অপলা জেসমিনের কথামতোই খাওয়া শেষ করে উসামাকে কল দিলো। প্রথমবারে সে ধরলো না। অপলা আবার কল করলো। দ্বিতীয় বারে অনেকক্ষন রিং হওয়ার পর উসামা ধরলো। অপলা বললো,
” উসামা আপনি দুপুরে খেয়েছেন?”
উসামা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
” এই প্রশ্ন তুমি আমাকে করছো?”
অপলা অনুরাগশুন্য গলায় বললো,
” না মানে মা জিজ্ঞেস করছিল আপনি ঠিকঠাক ভাবে খেয়েছেন কিনা। সকালে তো সেভাবে কিছু খাননি।”
উসামা প্রতুত্তরে বললো,
” হ্যাঁ খেয়েছি। রূপা আজকে আমার জন্য বাড়ি থেকে ওর হাতের স্পেশাল দম বিরিয়ানি রান্না করে এনেছিল। এত মজা! ঘ্রানেই পেট ভরে যাবার জোগাড়। নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিয়েছে। আমি রূপার থেকে দম বিরিয়ানির রেসিপিটা টুকে নেবো। বাড়ি এসে তোমাকে বলবো। তুমি বরং শিখে নিও। আচ্ছা এখন রাখছি। রূপা ওকে একটা প্রজেক্টে হেল্প করার জন্য ডাকছে।”
উসামা কলটা কেটে দিতেই; অপলা বুকের ভেতর যন্ত্রনা অনুভব করলো। কেমন একটা চিনচিন ব্যাথা! সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পরলো সে…
অপলা আজও ঘুমের মধ্যে শরীরে একপাশে কিছুটা ভারী অনুভব করলো। উঠে বসতেই অপলার ডান পাশ ঘেঁষে উসামাকে শুয়ে থাকতে দেখলো। উসামাও গভীর ঘুমে। অপলা প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ হলো। উসামার এরূপ আচরনের হেতু কী? কালকের ঘটনার পর থেকে অন্তত উসামার কাছে এরূপ আচরন কাম্য নয়। কালকে সে পরিস্কার ভাবে বলে দিয়েছে সে রূপাকে ভালোবাসে এবং তাঁকেই চায়। তবে, আজ এভাবে এতটা কাছাকাছি চলে এসেছে কেন?
ঘুমন্ত উসামাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষনের সময় অপলা; উসামার গলায় একটা লাল দাগ দেখতে পেলো। অপলার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। সে মূর্তির ন্যায় কিছু সময় থম মেরে পড়ে রইলো। উসামা ওই মেয়েটাকে ছুঁয়েছে! অপলার হক সে অন্য কাউকে বিলিয়ে দিয়েছে!
উসামা ঘুম থেকে উঠতেই অপলা রাগে চেঁচিয়ে বললো,
” আপনার প্রবলেমটা কী? রাতে আপনি হাত, পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমান। সেই অবধি আমি মেনে নিয়েছি। এখন কী বিকেলের ঘুমটাও আপনার জন্য বরবাদ করবো? ঘুমের ঘোরে নাকি একান্তই ইচ্ছে করে করেন সেটা আমি জানি না।”
উসামা অবাক হয়ে বললো,
” আমি কী করলাম? আমি তো আমার মতোই ছিলাম।”
অপলা রাগ্বানিত স্বরে উত্তর দিলো,
” ঘুমের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন কেন?”
উসামা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,
” ঠেলে সরিয়ে দিলেই পারতে। জানোই তো ঘুমের মধ্যে আমার কোনো হুশ জ্ঞান থাকে না।”
অপলা প্রতিত্তরে বললো,
” ঘুমের মানুষকে ঘুম থেকে আস্তে আস্তে জাগাতে হয়। হুট করে ঠেলে সরিয়ে দিলে মানুষ ভয় পেয়ে স্ট্রোক অবধি করতে পারে। মানবতার খাতিরে আপনাকে সরাইনি। পরে ম’রে টরে গেলে আমাকে জেল খাটতে হবে।”
উসামা বিরক্তিমাখা কন্ঠে বললো,
” ওহ তাই বলো! আচ্ছা ওয়েট তুমি ঘুমের মধ্যে আবার আমার কাছে চলে আসোনি তো? মানে তোমরা মেয়ে মানুষরা তো আবার আমার মতো হ’ট পুরুষদের দেখলে নিজেদের সামাল দিতে পারো না।”
উসামার গলার দাগটার কথা স্বরনে আসতেই অপলার মন ঘৃণায় বিষিয়ে এলো। উসামাকে সে ত্বরিত বললো,
” সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস আমার কোনো কালেই পছন্দ ছিল না; এখনও নয়। অন্যের উচ্ছিষ্ট অপলা খায় না।”
অপলা আজও মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পরলো। উসামা তাঁকে একবার বিছানায় আসতেও বললো না। উল্টো বললো,
” কালকে বাড়িতে ফিরতে আমার একটু দেরি হতে পারে। মাকে বলো টেনশন করতে না। রূপা জন্মদিনের উপহার হিসেবে আমার সঙ্গে ডিনারে যেতে চেয়েছে। ওর কথা ফেলতে পারবো না। ডিনার করে রূপাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরতে ফিরতে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে।”
অপলার গায়ে কাটার মতো বিধঁলো উসামার বলা কথাগুলো। কোথাকার কোন মেয়ে তাঁর জন্য এত টান। কই নিজের বউয়ের কথা তো একবারও মনে পড়েনি। এই অবধি অপলাকে তো সে ডিনারে নিয়ে যায়নি। অপলা এসব ভাবতে ভাবতেই সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারলো না।
চলবে….
#প্রণয়_সমাচার
#নুজহাত_আদিবা
পর্ব ২২
“অপলা, গেটটা লাগিয়ে দিও;আমি বের হচ্ছি। মাকে টেনশন করতে নিষেধ করো। আমার ফিরতে বেশ লেট হবে।”
উসামার কথায় অপলা তাঁর দিকে এক পলক তাকালো। একেবারে ফর্মাল গেটআপে সেজেগুজে রেডি হয়েছে সে। অপলা পরমুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো। তাঁর স্বামী পরনারীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে এটা ভাবতেই অপলার সর্বাঙ্গের র’ক্ত কনিকা সমূহ টগবগিয়ে ফুটতে লাগলো। উসামা এসব সম্পর্কে অবগত নয়। সে তাঁর মতো রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল।
অপলা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। গত দুই রাত না ঘুমিয়ে চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। মৃদু মৃদু কালিও পড়েছে।হৃদয়ের মাঝে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা অপলা কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছে না। উসামার অবহেলা তাঁর দ্বারা মেনে নেওয়া অসম্ভব। অপলার চক্ষু ঝাপসা হয়ে গেল। কেমন অদৃশ্য একটা বেদনা! কাউকে বোঝানো যাচ্ছে না। মুখে বলেও প্রকাশ করা যাচ্ছে না! অপলা চোখ বন্ধ করে একবার অদেখা রূপার মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করলো। কেমন দেখতে মেয়েটা? অনেক সুন্দর? গায়ের রং কী দুধে আলতা? চোখগুলো কী হরিণের মতো টানা টানা? ঠোঁট গুলো কী হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো গোলাপী? অপলা কল্পনায় দেখলো এক অতি রূপসী নারী হাসতে হাসতে উসামার কাঁধে মাথা রাখছে। উসামা তাঁর হাত দ্বারা সেই নারীটির গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে। অপলা চমকে উঠলো। তাঁর শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায় কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে। না সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। তাঁর শরীর কাঁপছে!
অপলা খেতে বসে বারবার জেসমিনের নিকট হতে চোখের পানি আড়াল করতে চাইলো। খাবার গলা দিয়ে নামলো না। আধপেটা খেয়েই টেবিল হতে উঠে গেল সে। দৌড়ে গিয়ে উসামাকে কল দিলো। উসামার যে-ই কথাগুলো অপলার কাছে বিষের সমতুল্য মনে হতো। আজ সে-ই কথাগুলো মন দিয়ে প্রান দিয়ে শুনতে ইচ্ছে হলো। উসামা ফোন ধরলো না। অপলা কলের পর কল দিয়েই গেল। উসামার কোনো উত্তর-ই নেই। অপলার মনে হলো পৃথিবীতে সে বড্ড একা। তাঁর কথা শোনার মতো আজ কেউ নেই।
অপলা ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করলো। কেমন একটা কল্পনার জগতে ডুবে গেল সে। বাস্তবতার ঠিক অনেকটা বাইরে সেই জগত। কল্পনার আবছা দৃষ্টিতে দেখলো অতি সুন্দরী এক রমনী; ফাইল দেওয়ার বাহানায় উসামার হাতে হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে। উসামা হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। অপলা বিছানা থেকে উঠে বসলো। একি! ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলো সে? না এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এমনটা কেন হবে? উসামা তাঁর সঙ্গে এমনটা করতে পারে না। এক মিনিটের জন্য হলেও তো সে অপলার কাছাকাছি এসেছিল। আচ্ছা, ঘুমের ঘোরে উসামা তাঁকে রূপা ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল কী? কাছেও এসেছিল রূপাকে ভেবেই?
অপলা আয়নার কাছে আবার এগিয়ে গেল। গিয়ে নিজেকে ভালো করে দেখলো। ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার মতো সে নয়। সমাজে একটি নারীর মধ্যে যেসব শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা সৌন্দর্য থাকা বাঞ্ছনীয়; সে সব কিছুই তাঁর মধ্যে আছে। তবুও উসামার তাঁর প্রতি এতটা অনীহা কেন?
অপলা আলমারি থেকে শায়েলার দেওয়া ব্লাউজগুলো বের করলো। সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা বের করে পড়লো। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে দু’চোখ ভরে কাজল দিলো। ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালো। তাঁকে দেখতে মন্দ লাগছে না। আচ্ছা, রূপা কী দেখতে তাঁর চেয়েও সুন্দর? চোখ ধাধানো পরীদের মতো সুন্দর? অপলা মিনিট খানেক আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকলো। অকস্মাৎ চিৎকার করে কান্নায় মেঝেতে লুটিয়ে পরলো। অপলার কান্নার স্বর এতটাই তীব্র থেকে তীব্রতর হলো যে জেসমিন দৌড়ে এলেন। মেঝেতে অপলাকে এত বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে হতভম্ব হলেন। দৌড়ে এসে অপলাকে জড়িয়ে ধরলেন। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন তাঁর কী হয়েছে? অপলা কোনো জবাব দিলো না। সে যেন বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। জেসমিন অপলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই;অপলা জেসমিনকে জড়িয়ে ধরে ফের কাঁদতে লাগলো। কান্নামাখা গলায় বললো,
“মা, আমাকে আপনার ছেলে চায় না। তাঁর আমাকে পছন্দ না। সে এই সম্পর্কটাকেও মিথ্যা বলে মনে করে। আমাদের সম্পর্কটা তাঁর কাছে বোঝা মনে হয়। আমাকে সে সম্পর্কটা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। মা আমি কী করবো বলুন! আমি জানি না আমার মাথায় কিছু আসছে না। দু’টো রাত যাবত ঘুমোতে পারছি না। আপনার ছেলের কথাগুলো মনে পরলেই বুকের ভেতরটা ছারখার হয়ে যায়। আমি কী দোষ করেছি মা? আপনার ছেলের রূপা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে পরকিয়া আছে। মেয়েটা ওনার অফিসের কলিগ। কমলার সঙ্গে উনি বিয়েও ভেঙেছিলেন ওই মেয়েটার জন্য। এসবের মাঝে আমি দোটানায় আছি। আমার কিছু ভালো লাগছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতে গেলেই নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমার সংসারটা মনে হয় ভেঙে যাচ্ছে মা। আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। কিছু করতে পারছি না।”
অপলা ফের কান্নায় ভেঙে পরলো। জেসমিন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। উসামা শেষ অবধি এতটা নিচে নেমে গেল? জেসমিন সবকিছুর জন্য মনে মনে নিজেকে দায়ী ভাবতে শুরু করলেন। ওভাবে জোর করে ছেলেকে বিয়ে দেওয়াটা তাঁর মোটেও উচিত হয়নি। জেসমিন অপলার পাশ থেকে উঠে গিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে বসলেন। এই মুহূর্তে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া তাঁর কোনো কিছু মাথায় আসছে না।
” উসামা আজ এখনও এলো না যে?”
জেসমিন প্রশ্নে অপলা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
” আজকে উনি ওই মেয়েটাকে নিয়ে ডিনারে যাবেন বলেছেন। তাই আসতে দেরি হবে বলেছেন। গতকাল মেয়েটার জন্মদিন ছিল….”
অপলা আর কিছু বলার পূর্বেই জেসমিন অপলাকে থামিয়ে দিলেন। এসব শুনতেও তাঁর গা গুলিতে আসছে। ছিহ! উসামা এই মেয়েটাকে নিয়ে এভাবে খেললো? আজ এর একটা বিহিত সে করবেই! দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার চেয়ে পানিতে ডুবে ম’রা ভালো।
রাত দশটার দিকে উসামা বাড়ি ফিরলো। গেট খুলে দিলেন জেসমিন। উসামা ঘরে ঢোকা মাত্রই গালে কষিয়ে চড় মে’রে বসলেন। ঘটনাটা এতই দ্রুত ঘটে গেল যে; উসামা কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। গালে হাত দিয়ে জেসমিনের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। জেসমিন চিৎকার করে উসামাকে বললেন,
” এই চ’ড়টা আমার আরো আগে দেওয়া উচিত ছিল। তোমার মতো ছেলে জন্ম দেওয়া আমার পাপ হয়েছে। আমার নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে যে তোমার মতো সন্তানকে আমি পেটে নিয়েছি। ছি ছি ছি! শেষ অবধি এতটা অধঃপতন ঘটলো তোমার? ”
চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ পেয়েই অপলা দৌড়ে এলো। কেঁদেকেটে তাঁর চোখমুখ ফুলে গেছে। চোখগুলো এখনো কেমন ছলছল করছে। উসামা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
” আমি কী করেছি? মাত্র তো অফিস থেকে এলাম। তোমার হয়েছে কী? আমার গায়ে হাত উঠালে কেন?”
জেসমিন ক্রোধমাখা কন্ঠে বললেন,
” এতকিছুর পরেও তুমি আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছো? আর কী বললে? তুমি অফিস থেকে এসেছো? তোমার অফিস ছুটি হয় কখন সেটা কী আমি জানি না। কোথাকার কোন ন’ষ্ট মেয়ে মানুষের সঙ্গে ছিলে সেটা বলো।”
উসামা অপলার দিকে একবার তাকালো। বিষয়টা তাঁর কাছে অনেকটাই পরিস্কার হয়ে গেল। উসামা জেসমিনের নিকট এগিয়ে এসে বললো,
” মা ওয়েট আমাকে একবার সবকিছু বলতে দাও। তারপর… ”
জেসমিন উসামাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বললেন,
” তোমার কাছে আমি কোনো এক্সপ্লেইনেশন চাইনি। অপলার কাছে আমি সব শুনেছি। তুমি বিষয়টা আমাকে তোমার বিয়ের আগে জানাতে পারোনি এটা তোমার ব্যর্থতা। তুমি একবার বললে রূপাকেই আমি তোমার জন্য চেয়ে নিয়ে আসতাম। খামোখা একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন তো আর এভাবে নষ্ট হতো না। তোমার ব্যর্থতা তোমার ভুলগুলোকে তুমি অপলার জীবনেও টেনে এনেছো। অন্তত বিয়ের পর তোমার নিজেকে শুদ্ধ করা উচিত ছিল। অতীতের সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু, তুমি সেটা করোনি। বিয়ের পরও একটা অন্য মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রেখেছো। এটাকে কী বলে জানো? পরকিয়া! ছি ছি ছি! ”
জেসমিন থেমে গেলেন। উসামাও কিছু সময়ের জন্য চুপ করে রইলো। এরপর নিজেই বললো,
” আমার অফিসে রূপা বলতে আমার কোনো কলিগ নেই।”
উসামার মাথা নিচু। জেসমিন প্রত্যুত্তরে বললেন,
” তো অপলা কী আমাকে মিথ্যা বলেছে? নিজের দোষ স্বীকার করো উসামা।”
উসামা নিচু স্বরে বললো,
” হ্যাঁ সব মিথ্যা। রূপা একটা কাল্পনিক চরিত্র। বাস্তবে এই নামে আমার জীবনে কেউ নেই। আমি ওসব মজা করে বানিয়ে বলেছি। আমি শুধু অপলার রিয়েকশন দেখতে চেয়েছিলাম।”
অপলা আকাশ থেকে মাটিতে এসে পরলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
” মা উনি মিথ্যা কথা বলছেন। এসব এড়িয়ে যেতে চাইছেন।”
জেসমিন অপলার দিকে তাকালেন। উসামাকে প্রশ্ন করলেন,
” এত রাত হলো কেন? কোথায় ছিলে তুমি তাহলে সত্যি করে বলো।”
উসামা ফোনে নিজের নিউ প্রজেক্টের একটা ছবি তুলে ধরে বললো,
” আজকে নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে অফিস শেষে মিটিং হয়েছে। স্যার সবাইকে নতুন প্রজেক্টের কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন।”
জেসমিন উসামার দিকে তাকালেন। উসামার ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা। আসল ঘটনা তিনি সহজেই বুঝে গেলেন। ছেলেকে শান্ত গলায় বললেন,
” এসব নিয়ে কী মজা করার বিষয় উসামা? তোর মধ্যে কী কোনো কাণ্ডজ্ঞান আসেনি এখনো? বিয়ে অতি সেনসিটিভ একটা ইস্যু। ভবিষ্যতে এসব নিয়ে কখনো মজা করবে না।”
অপলা এত সহজ ভাবে সবকিছু মেনে নিতে পারলো না। ত্বরিত ছুটি গিয়ে উসামার আলমারি থেকে নীল রঙের; শার্টটা নিয়ে এসে জেসমিনের সামনে তুলে ধরে বললো,
” মা আপনি একদম ওনার কথা বিশ্বাস করবেন না। দেখুন ওই মেয়েটা এই শার্টটা আপনার ছেলেকে গিফট করেছে। আপনার ছেলে নিজে আমাকে বলেছে।”
জেসমিন অপলার হাতে নীল রঙের শার্টটা দেখে সহজেই চিনতে পারলেন। এবার সবকিছু তাঁর নিকট টলটলে পানির মতো পরিস্কার হয়ে গেল। অপলার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
” এই শার্টটা আমি গতবার ইদে নিজে গিয়ে উসামার জন্য কিনে এনেছিলাম।”
অপলা অভিমানী দৃষ্টিতে উসামার দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্রুত চোখ মুছতে মুছতে ঘরে চলে গেল। উসামা অপলার অবস্থা দেখে জেসমিনকে বললো,
” মা তুমি গিয়ে একটু বুঝিয়ে বলো না!”
জেসমিন না শোনার ভান করে বললেন,
” নিজের বউকে নিজে সামাল দাও। যখন এত কান্ড ঘটালে তখন মনে ছিল না?”
উসামা অসহায় দৃষ্টিতে জেসমিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
বিছানার এক কোনে বসে অপলা যখন নিজের অশ্রু ঝড়াতে ব্যস্ত; সেই মুহূর্তেই উসামার আগমন ঘটলো। উসামা সিনেমাটিক ভঙ্গিতে বললো,
” এভাবে কেঁদো না গো ময়নার মা। তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার বুকে কেমন চিনচিনে ব্যাথা হয়।”
অপলা দু’হাত দিয়ে নিজের চোখ মুছলো। এমন ভান করলো যেন সে উসামা নামক কোনো ব্যাক্তির উপস্থিতি টেরই পায়নি।উসামা পুনরায় বললো,
” স্বামীর প্রতি বিন্দু পরিমাণও ভরসা নেই। হাসবেন্ড বলে গন্যই করো না। আমার ভালো লাগা খারাপ লাগা চোখেই পড়ে না তোমার। আবার পরনারীর সঙ্গে দেখলে সহ্য করতে পারো না। আমি কোনদিকে যাই বলো তো?”
উসামার কোনো কথা অপলার কানে ঢুকলো না। সে এক পলক উসামার দিকে তাকালো। বিছানা তেড়ে উঠে এসে উসামার কলার চেপে ধরলো। উসামা অপলার এমন হঠাৎ আগমনে চমকিত হলো। অপলা সেই মুহূর্তে ভয়ংকর এক কান্ড ঘটিয়ে ফেললো। উসামার ওষ্ঠ যুগল ছুঁয়ে আকষ্মিক চুম্বনে লিপ্ত হলো। উসামার শার্টের কলার আরো শক্ত ভাবে টেনে ধরলো। অপলার এরূপ নেশালো ভঙ্গিতে উসামা সাড়া না দিয়ে পারলো না। আনমনেই তাঁর হাত দুটো অপলার কোমড় ছুঁয়ে ফেললো। অপলা উসামার বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে বিছানায় ফেলে দিলো। উসামা দ্রুত উঠে বসে অপলার হাত ধরে তাঁকে বুকে টেনে নিলো। থুতনিতে আলতো করে চুমু খেলো। অপলা বিড়ালের মতো উসামার বুকে চুপটি করে রইলো। একটু একটু করে তাদেঁর মান অভিমানের পাহাড় ধসলো। উসামা অপলার ঘাড়ে মুখ ডোবালো। অপলা নিজেকে আর বাঁধা দিলো না। সবটুকু উজাড় করে দিলো স্বামীর কাছে। উসামা নিজের দেনা পাওনার হিসাব চুকিয়ে নিলো। ভালোবাসার অদ্ভুত উন্মাদনায় মেতে উঠলো দুজনা। পুরো পৃথিবীর বাহ্যিক সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন দুটো মানুষ;একে অপরের মাঝে বিলিন হয়ে গেল।
চলবে….