শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫৫
ফাহিমা ঢাকা পৌঁছে গেছে। পৌঁছে মেসেজ করে দেয় রিফাতকে। মেসেজ দিয়ে লম্বা একটা গোসল সেরে নেয়। সন্ধ্যার পর গুনগুনিয়ে সব মেয়েরা পড়তে বসে গেছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া পড়ছে, তো কেউ চাকরির জন্য, কারো বিসিএস এর স্বপ্ন। ফাহিমা কৃতজ্ঞবোধ করে, এই মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে সে স্বপ্ন দেখতে পারে! রিফাত তো মাঝ পথেই হাত ছেড়ে দিলো, অবশ্য ও হাত ধরেছিলো কবে? বোকার মতো নিজের সবটুকু দিয়ে বিধাতার কাছে চেয়েছিলো তাকে! ফাহিমা এখন শুধু নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। গোসল করতে করতে সে ভাবে, এই পুরনো ধাচের বাথরুম, আয়রন জমে মেঝের রঙ বদলে গেছে, দেয়ালে শ্যাওলা, ঝরনা এই বড়, পাইপ গুলো বেরিয়ে আছে….. আধুনিক সুন্দর বাড়িগুলোর মতো তার কি একটা ঘর হবে? সে খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবে। মাল্টা দেশটা কেমন? সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে একদিন দেখে আসবে।
সবুজ বেশ রাত করে ঘরে ঢোকে। আলো নিভানো ছিলো। সে সন্তর্পণে ওঠে বিছানায়। মিলি জেগেই ছিলো। কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে, এখনো নাক টানার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মিলি পিঠে হাত রাখে সবুজ। মিলি ঘুরে শোয়, কান্নাভেজা গলায় বলে,
• ও ঘরে থাকলেই হতো, এটুকু ভদ্রতার কি প্রয়োজন?
• ভদ্রতার সম্পর্ক তো নিম্মির সাথে
• তাই?
• হুম
• তাহলে এখানে কেন সে? তুমি না বলেছিলে, নিম্মিকে তালাক দেবে? এখনো সময় হয়নি? নিম্মির বদনামের ভয়ে সম্পর্ক টেনে যাচ্ছ? নাকি নিজেরও খায়েশ আছে?
স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সবুজ। হ্যাঁ তার মনের গোপন ইচ্ছার কথা সে মিলিকে বলতে পারেনা। যে স্বস্তির আশায়, যে শান্তির আশায় সে মিলির দুয়ারে দাঁড়িয়ে হাত পেতেছে, সেই স্বস্তি, সেই শান্তি নিম্মি তাকে দিতে পারতো, হয়তো সময়টা ভুল ছিলো! নাকি সে ভুল ছিলো? মিলির রূপ, চপলতার কাছে চাপা পড়েছিলো নিম্মির মায়া! কিন্তু সুখী হতে কি লাগে? এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।
• তুমি না কোথাও ঘুরতে যেতে চেয়েছিলে?
• তোমার এখন পালিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করছে?
• কিসের পালানো?
• নিজের বাড়ি থেকে নিজেই পলাতক?
• আহ! পালাবো কেন? মিষ্টিকে সাথে নিয়ে আমরা কক্সবাজার ঘুরে আসি?
• আর তোমার নিম্মি?
• কেন তাকেও সাথে নিতে চাও?
• তোমার মন তো তাই বলে
• কিন্তু নিম্মি তো আমার সাথে যেতে চাইবে না, ওর মন তো অন্য কারো কাছে বাঁধা পড়া
• কি?
• না মানে…. ওর তো প্রেমিক ছিলোই
• তার মানে ওর ইচ্ছে তোমাকে তালাক দিয়ে প্রেমিককে বিয়ে করা, আর সেটা হতে দেবেনা বলেই ও কে এখানে এনেছো?
• মোটেই না, ও নিজেই আসতে চেয়েছে
• হয়তো প্রেমিককে টাইট দিতে…. এসব মেয়েরা সব পারে
• কিসব মেয়ে?
• গায়ে লাগলো বুঝি?
• বাজে কথা বলবে না একদম, জোরে ধমক দেয় সবুজ
মিলি উঠে চলে গেল। সবুজ শুয়ে পড়লো সটান। এখনো গরম পড়েনি। সিলিং এর নতুন কারুকাজ দেখতে বেশ লাগছে। মিলি কোথা থেকে ছবি জোগাড় করে, রাজমিস্ত্রীকে বুঝিয়ে করিয়েছে কাজটা।
মিলি এক ছুটে নিম্মির ঘরে গিয়ে হাজির। ঘরে আলো জ্বলছে। নিম্মি উপুড় হয়ে বই সামনে শুয়ে আছে।
দরজার শব্দ শুনে উঠে বসে ওড়না ঠিক করে।
• যত সতীপনা দেখাও তার সামান্যতম যদি তুমি হতে তাহলে তো হয়েছিল
মিলির ভীষণ রাগান্বিত রূপ দেখে অবাক হয়না নিম্মি। এত সুন্দর মেয়েটা। প্রথম ঘর করা হলো না। দ্বিতীয় ঘরেও অশান্তি। বাচ্চাটাকেও ভাইয়ের কাছে রাখতে হয়েছে।
• বসুন, আলাপ করি
• তোর সাথে আমার কিসের আলাপ? একগাদা অশ্রাব্য গালি দেয় মিলি
• আপনি শিক্ষিকা, আমার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু সম্পর্কে আমি বড়, তাই দুজনেই দুজনের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকি?
মিলি কেমন যেন পিছিয়ে গেল। এই মেয়েটা কি মানুষ? এত গালাগালির পর এই কথা কোন সাধারণ মেয়ের মুখ দিয়ে বের হওয়ার কথা না।
• বসুন প্লিজ, ইঙ্গিতে পড়ার টেবিলের চেয়ার দেখায় নিম্মি
বসেনা মিলি, রাগান্বিত দৃষ্টিতে তখনও তাকিয়ে। পারলে হাতাহাতি পর্যায়ে নিয়ে যেত আজ সে! কিন্তু নিম্মি তার রাগের আগুনে শুধু পানি ঢেলে যাচ্ছে। মিলি বসলো। বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫৬
সাধনার বাচ্চা হয়েছে ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়ে। হেলাল ছোট একটা আয়োজন করেছে। নাজিমুদ্দিন এসেছেন। শাড়ি আর মিষ্টি এনেছেন। আসলে তিনি বুঝতে পারেননি কি আনা উচিত। হেলাল বেশ উৎসাহের সাথে খাসি জবাই দিলো। আকিকা করে মেয়ের নাম রাখলো সানজিদা হেলাল। সালেহা খুবই বিরক্ত। সবকিছু নিয়েই তিনি অভিযোগ করে চলেছেন।
• হেলাল মিয়া আমার মাইয়া তো পলাইয়া যায় নাই তোমার সাথে, পরিবার লইয়া বিয়া বসলা, এহন নাতিন দেখতে আসে নাই কেন?
হেলাল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। নাজিমুদ্দিন সহ, সবুজের চাচারা উপস্থিত। জমিজমা আর পাঠানো টাকা নিয়ে বিরোধের কোন নিষ্পত্তি হয়নি, বরং পৈত্রিক সম্পত্তি থেকেও হেলাল বঞ্চিত। উপশহরে একটা দোকান দিয়ে কোনমতে সংসার চালাচ্ছে। এমন বয়স্ক লোকের সাথে কেউ বিপদে পড়ার জন্য মেয়ের বিয়ে দেয়না। তাছাড়া সাধনা সুন্দরী। চাইলে আরো পড়তে পারতো কিন্তু ঐ একটা দুর্নাম…. কিন্তু হেলাল ভুল করেও ঐ ঘটনা নিয়ে সাধনাকে খোটা দেয়নি। মাসুদ সাধনাকে মাস খানেক আগে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করলে সেটা প্রতিহত করেছিলো সে।
সাধনা মূলত ঐ ঘটনার পর থেকেই হেলালকে মনে প্রাণে ভালোবাসে। মায়ের কটুকথার উচিত জবাব দিতে চাইছিলো সে কিন্তু হেলালের ইশারায় থেমে যায়। সবুজ দেখে সাধনার মুখ লাল হয়ে আছে, কিন্তু কোন কথা বলছে না। নাজিমুদ্দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেষ্টায় উঠে রান্নার ব্যবস্থা দেখতে চাইলেন। হেলাল খুব আগ্রহের সাথে রান্নার আয়োজন দেখাতে নিয়ে গেল। বাড়ির কাছেই একটা বিশাল আম বাগান আছে। সেখানেই গ্রামের কিছু মানুষের সাহায্যে কাটা বাছা, রান্নার আয়োজন চলছে। ডেকোরেটর ডাকতে চেয়েছিলো হেলাল, কিন্তু নিম্মির বেশ কিছু চাদর দিয়ে খাওয়ার জায়গাটা ঘিরে দিয়েছে, আর মসজিদ থেকে কিছু সাদা চাদর এনে পেতে দেওয়া হয়েছে। প্লেট নিজ নিজ ঘর থেকে আনতে বলেছে নিম্মি। একেবারে বাড়ির বড় বৌয়ের ভূমিকা পালন করছে সে। নাজিমুদ্দিন নিম্মির কাজ দেখছেন। এ বাড়িতে আর পাঠানোর ইচ্ছে তার ছিলো না। কেন ঐদিন এভাবে বললেন নিজেও জানেন না। মিলি নিজের পাকা ঘরের বারান্দায় পটের বিবি হয়ে বসে আছে। কোন কিছুতেই হাত দিচ্ছেনা। যারা কাজ করছে সবাই নিম্মির কাছেই এটা সেটা চাইছে, নতুন মা সাধনা সে খুব বেশি কাজ করতে পারছেনা, সুমনা তো বরাবরই অসুস্থ। মেয়ের পণ্ডশ্রম দেখে মন খারাপ হয় নাজিমুদ্দিন সাহেবের। বিকেলে বাড়ির পথ ধরেন। মেয়ের অভিমান জায়েজ বারবার আঘাত করে কথা বলেন তিনি, তাঁর ওষুধ, পথ্যের জন্য মেয়েটা দিন রাত পরিশ্রম করে। আর যদি রিয়াজের ছেলের সাথে তার ভাব বিনিময় হয়, তাহলে সেটাও অন্যায় কিছু না। রিয়াজের সায় আছে বোঝাই যায় , তবে তার মেয়েরা বা স্ত্রী বিষয়টা কিভাবে দেখছেন তা জানতে হবে। আর একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে হুট করে আরেকটা সম্পর্কে নিম্মি নিজেও কি যেতে চাইবে?
সবুজ শহরে এসেছে। আড়তদারদের কাছে কিছু টাকা পাওনা আছে, গরুর খাবার পাইকারি কিনে কিছু বিক্রি করবে ঠিক করেছে, একটা পুরাতন ভ্যান কিনেছে, তাতে করেই নেবে। খুব শারীরিক পরিশ্রম যাচ্ছে। কদিন আগেই বাড়িতে প্রচুর খরচ করে সাধনার মেয়ের আকিকা হলো। মিলি এবার নিজেদের পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে! নিম্মি আছে, ও গ্রাম থেকে ক্লাস করছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, সে হাত খরচ নিতে না চাইলেও সবুজ দেয়। টিউশন ক্লাস করাতে পারছেনা, জমানো টাকা দিয়ে কয়দিন চলবে মেয়েটা। কাজ সেরে ফেরার পথে কি মনে করে নিম্মিদের বাড়ির দিকে এগোয়, রাস্তায় মসজিদ পড়ে, ভাবে জোহরের নামাজ পড়ে নেওয়া যাক। নামাজ পড়ে বের হয়ে ছেলেটার সামনে পড়ে সবুজ! ছেলেটা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলো, সবুজ থামায়,
• আপনি রিফাত?
• জি?
• আমি সবুজ
• হ্যাঁ চিনি আপনাকে
• কিছু কথা ছিলো
• আসেন, কাছেই আমার বাসা
• না বাসায় বলা যায় না, চায়ের দোকানে বসি?
• আসেন
কিছুদূর হেটে একটা দোকানে বসে দুইজন। বেশিরভাগ দোকানের ঝাপি টানা, দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছে সবাই। রিফাতের পরনে অফিসের পোশাক। বেশ সুদর্শন লাগছে, যদিও খোচাখোচা দাড়ি আর চোখের নিচের কালি বলে দিচ্ছে সে ভালো নেই!
• কি বলবেন বলুন?
• আমি মানে…. নিম্মি আর আপনার পরিকল্পনা কি?
• মানে?
• আপনারা তো একে অপরকে….
• কি যা তা বলছেন?
• আমি সব জানি
• কি জানেন?
• আপনারা…. যাই হোক, আপনি কি নিম্মিকে বিয়ে করতে চান?
• আমি উঠলাম
• দেখুন আমি এত বড় মনের মানুষ না, নিজে তালাক দিয়ে নিম্মির হাত, আপনার হাতে তুলে দিব কিন্তু নিম্মি একটা জীবন্ত লাশ হয়ে গেছে, আমি সেটাও এই পোড়া চোখে আর দেখতে চাইনা
• কি চান তাহলে?
• আপনি ও কে বিয়ে করলে আমি তালাক দিয়ে দেব
• বিয়ে কোন ছেলেখেলা না
• সে আমিও জানি
• জানতে বড় দেরি করে ফেলেছেন, সে আপনার সাথেই থাকবে, লাশ হয়ে হলেও, আমার সাথে তার কিছু নেই, আর এভাবে আলোচনা করবেন না, নিম্মি খুব স্পর্শকাতর মেয়ে, সে এসব বিষয় জানলে কষ্ট পাবে
• সে এখনো কষ্ট পাচ্ছে
• আপনি আবার বিয়ে না করলে ও মানিয়ে নিত
• তা হয়তো নিত, কিন্তু নিয়তির লিখন হয়তো ভিন্ন কিছু ছিলো
• আমি উঠি, ভীষণ ক্লান্ত
• অফিস করে বাড়ি এসেছেন?
• হ্যাঁ আজ ছুটি নিয়েছি
• কোন সমস্যা?
• মাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম
• আচ্ছা, কি হয়েছে?
• পরীক্ষা দিয়েছে, রিপোর্ট পাইনি
• আল্লাহ দ্রুত সুস্থ করে দিন
• ধন্যবাদ
রিফাত উঠে চলে যায়। নিম্মির মতোই সেও যেন পৃথিবীতে থেকেও নেই!
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫৭
মিলি বুচির মাকে দিয়ে ঝুল ঝাড়ায়। বুচির মা কথা লাগাতে ওস্তাদ!
• ভাবী একখান কতা কই?
• তুমি তোমার কাজ করো
• আপনার ভালোর জন্যই কইতাম
• কী?
• সাধনা আপা আর দুলাভাই তো ভাড়া বাসা ছাইড়া দিলেন, কিছু কইলেন না?
• আমি কি বলবো?
• আপনার সতীনরে আনলো ভাইজান! এখন নিজের বোন আর ভাদাইম্যা জামাইরে উঠায় আনছে! এমন করলে সংসার চলত?
মিলির মাথায় যে চিন্তা নেই এমন না। কিন্তু কি করবে সে? বাচ্চা হওয়ার নাম করে এসে যদি জুড়ে বসে তাহলে মুশকিল। সবুজ সারাদিন পর বাড়ি এসে, নাকে মুখে ভাত গুজে ঘুম! কদিন শরীর ভালো যাচ্ছিলো না। খুব আশা করে পরীক্ষা করিয়ে দেখে কিছুনা! সেই থেকে মন দমে আছে। মিষ্টিকে বহুবার আনতে বলেছে সবুজ। কিন্তু মিলি অজানা কারনে মেয়েকে এখানে আনতে চায়না। নিম্মি পড়াশোনা করছে, পরীক্ষা দিতে শহরে যাচ্ছে, সাধনার বাচ্চার জন্য রাত জেগে শরীরটা পাটকাঠি বানিয়ে ফেলেছে! পাখির মতো খুটে খুটে ভাত খায়। কোন কোন বেলা মোটেই ভাত ছুয়ে দেখেনা। কেউ তাকে খেতে বলেনা, আদর করে জিজ্ঞেস করেনা কোনকিছু। সাধনা বাচ্চা নিয়ে কঠিন সময় পার করছে, এতদিন স্বামীর জমানো টাকায় ভালোই চলেছে, কিন্তু নিজেদের একটা ভিটা দরকার, হোক টিনের বাড়ি, কিন্তু সেখান থেকেও হেলাল বঞ্চিত, টাকা পাঠাতো হুন্ডির মাধ্যমে, আইনি সাহায্য পাবেনা। তবে বাবার নামের জমিগুলো ছেলে হিসেবে আইনগতভাবে পাবে, কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর। এসব নিয়ে কোর্ট, কাচারি, মেম্বার, এলাকার পাতি নেতা কারো দুয়ারে যেতে বাকি নেই হেলালের, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা, এদিকে মা অস্থির হয়ে গেছে। কবে যে রাগারাগি করে বের করে দেয় সাধনা আছে সেই ভয়ে! নিম্মির কষ্ট ভাগ করার মতো অবস্থা তার নেই।
রাইসা বাবার বাড়ি এসেছে অনেক দিন পর। এসেই নিম্মির খোঁজ করেছিলো, মাস খানেক হলো সে শ্বশুরবাড়ি। ইশরাত সহ আরো খালাতো, ফুপাতো বোনেরা হাজির, কেমন দাম্পত্য জীবন, শ্বশুর বাড়ি কেমন সবকিছু জানার তীব্র আগ্রহ তাদের। সবার কৌতুহল কিছুটা নিবৃত করে রাইসা, রাফিয়া আর ইশরাত মিলে আড্ডা দেয়। বৃহস্পতিবার রাত, তাই রিফাত এসেছে। ইশরাত এইচএসসি পাশ করে ঢাকায় পড়তে চলে গিয়েছে, সবকিছু জেনে সে খালার ব্যবহারে কষ্ট পায়। কিন্তু নিম্মিকে এখন বোঝানো সম্ভব? মফস্বলে এসব বিষয় এত সহজ না। কিন্তু এই গুরুদায়িত্ব সে ছাড়া আর কেউ পালন করতে পারবেনা। রিফাতের জন্য জেসমিন বেগম মেয়ে দেখতে চান। দুই তিনজন ঘটক ঘুরে গেছে বাসায়, রিয়াজ সাহেব ব্যাপারটা পছন্দ না করলেও অসুস্থ স্ত্রীর মতের বিরুদ্ধে যাননি। রিফাতের শুকনো মুখ তাকেও বিচলিত করে।
• ভাইয়াকে ডাকি? রাফিয়া জিজ্ঞেস করে
• হুম ভাইয়ার সাথে পরামর্শ করা দরকার
রাফিয়া লাফ দিয়ে উঠে ভাইকে ডেকে আনে ছাদে। কেবল শীত বিদায় নিয়েছে, বসন্তের উৎসবে মুখর প্রকৃতি, শুধু রং নেই যেন রিফাতের জীবনে।
• কি দেবদাস হয়েছ ভাইয়া? রাইসার প্রশ্ন
• কি যাতা কথা? চা খাওয়াবি বলে আনলি…. বিব্রত রিফাত
• নাও তোমার চা, রাফিয়া চা দেয়
ইশরাত চুপ করে দেখছে।
• কেমন আছ ইশরাত?
• ভালো
• একটা উপকার করা যাবে?
• বুঝেছি, দিন আপনার ফোন
• আমার নম্বর কি ও জানে?
• সমস্যা নেই, কল দিন
অনেক বার বাজলো ফোন কেউ ধরেনি। আশাহত হয়ে উঠে যাওয়ার উপক্রম করতেই কল বাজে ফোনে, রিফাত হ্যালো বলার আগেই, ইশরাত কথা বলে ওঠে
• হ্যালো
• কে?
• আমি ইশরাত
• ইশরাত…. কতদিন পর… কেমন আছিস? এটা কার নম্বর
• আরে! এত প্রশ্ন!
• আচ্ছা বল কেমন আছিস?
• ভালো, তুই
• আমিও ভালো
• বাড়ি আছিস?
• না রে, আমি গ্রামে
• গ্রামে? গ্রামে কেন?
• বিয়ে হয়েছে, সংসার করবো না?
• কি ঘোড়ার ডিমের বিয়ে সে আমি জানি, কোচিং, ক্লাস সবকিছু যাতায়াত করে কষ্ট হয়না?
• হয়, কি করবো?
• বাসায় থেকে কর
• বাবার উপর বোঝা আর বাড়াতে চাইনা
• তোর সতীন তোকে টিকতে দিচ্ছে?
• সে তার মতো থাকে, আমি আমার মতো
• তাই নাকি? আর বাড়ির কাজ?
• এখন লোক আছে, তুই ঘুরে যা, নিজের চোখে দেখে যা
• না রে…. তুই শহরে কবে আসবি?
• রবিবার
• বেশ দেখা হবে তাহলে
• ইন শা আল্লাহ
• রাখছি ভালো থাকিস
• আল্লাহ হাফিজ
বিজয়ীর হাসি দেয় ইশরাত। তারপর বলে,
• এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফেলেন
• আর মা?
• আমি কথা বলবো
• বেশ
আমার বান্ধবী, ও আমার চেয়ে ভালো কেউ চিনবেনা। আর যে বিষয়টা নিয়ে ওর জীবনটা এলোমেলো হলো, সেই সময়ের সব মেসেজ আমি পড়েছি, আমি সব জানি। খালাকে বুঝাতে পারবো আমার বিশ্বাস।
চলবে।