অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব-৮৩

0
25

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

৮৩.

হামজা ছেলে দুটোকে হুকুম দেয় ফটক খুলে দিতে। বিশাল শরীরটা ভর ছেড়ে দেয়ায় তুলির পক্ষে সম্ভব হলো না হামজাকে বহন করা। হামজা মেঝেতে পড়ে আধবোজা চোখে রিমিকে দেখে হাসে। রিমির কোনো খেয়াল নেই, সে আরমিণের সন্তানকে বুকের সাথে মিশিয়ে আদর করছে একমনে, এ মুহুর্তে এ জগতে তার আর কিছু করার নেই এছাড়া।

এই মহাক্ষণে হামজার মনে হলো সে ছাড়া আর কেউ আরমিণকে ঘেন্না করেনি। সে সবদিকেই একা আজ, তার দল লোকশূণ্য, কোথাও কেউ নেই তার সামান্য সমর্থনেও। এত অক্লান্ত ছুটে চলা কি ব্যর্থ গেল? এসবের কদর কেউ যে করল না, তা বলে আজ সেও কেন ভেতরে কদর খুঁজে পাচ্ছে না! হাতের মুষ্ঠি থেকে আমিরের ব্যাটার হাত ছুটে গেছে বলে?
সেই হাতে হামজা আমিরের ব্যাটার ফেলে যাওয়া কুড়ালটা তুলে নিলো। চাপ ধরা রক্তের স্তর সরিয়ে তরল রক্ত এলোপাথারি গায়ে মাখল। কুড়ালটার হাতল ফতোয়ার পেছনে মুছে জয়ের হাতে ছাপ দূর করল।

পাঁচটা মরদেহ ও তিনটা ছিন্নভিন্ন আহতকে উদ্ধার করা হলো। একজন নার্স মাংসাশী কুকুরের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে, দুজনের শ্বাস চলছে, দেহে মাংস নেই অধিকাংশ স্থানের। একজনের একটি স্তন ছিড়ে নিয়েছে পিটবুল। কতক্ষণ বাঁচানো যাবে জানা নেই। একটি নারী ডাক্তার দুটো হাত হারিয়ে অচেতন, তার মাথার করোটি ভেঙে গেছে। তবে এখনও বেঁচে আছে হয়ত। একজন ডাক্তারকে কম্পিত অবস্থায় ঘরের কোণে পাওয়া গেল। এত নৃশংসতা যে খবরে প্রকাশ করাও মুশকিল হবে, সেটা কালপ্রিট ভাবেনি! কালপ্রিটটা কে? হামজা?

রউফ কায়সার না এলে থানা পুলিশ হয়ত তা মানতো। কিন্তু রউফ কায়সার হামজার সামনে উবু হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল, “জয় আমির কোথায়, হামজা সাহেব?ʼʼ

মেয়রের পদ হারিয়েছে হামজা? হারানোরই কথা, সে এখন নিশ্চিত ফাঁসির আসামী, তার আর পৌরসভা দপ্তরে কাজ নেই। সে ফুরিয়ে গেছে।

-“জয়ের এখানে থাকার কথা? সে হাসপাতাল থেকে ফেরারি হয়েছে। এখন আমি আছি, আমায় অ্যারেস্ট করুন। ওকে যখন পাবেন, তখন ধরবেন নাহয়। আপাতত ও নেই হাতের নাগালে।ʼʼ

-“এই অবস্থায়ও এত ধূর্ততা? এত চতুরতা কী দিলো আপনাকে?

হামজা কেমন কোরে যেন হাসে সামান্য, “যা আপনারা কোনোদিন পাবেন না, আজ তা পেয়েছি আমি।ʼʼ

রউফ কায়সার জিজ্ঞেস করল না, কী পেয়েছেন? করলে হয়ত হামজা বলতো, ‘সন্তান হারানোর সুখ পেয়েছি আমি আজ। দেখুন আজ হাত দুটো খালি আমার। যে হাতের মুঠোয় জয়ের হাতখানা চেপে ধরে দেড় যুগ আগে হাকিমপুর থেকে দৌড় শুরু করেছিলাম, আজ আঠারো বছর পর সেই দৌড় ফুরিয়েছে। আজকের পর আমি আর ক্লান্ত হবো না, কারণ জয় এসে হাসতে হাসতে পাশে বসে বলবে না–’আর কতদূর, বড়সাহেব? খুব ভারী লাগে তো। চলো, দুই প্যাগ মাল খাই।ʼ

আরমিণ থাকলে নিশ্চয়ই জলন্ত চোখে তাকিয়ে ধিক্কার দিয়ে উঠতো, ‘কেমন অনুভব করছেন সন্তান হারিয়ে? শত্রু হিসেবে যে পরামর্শ আমি দিয়েছিলাম, তা মানলেই পারতেন। আমি সেদিন অন্তত আপনার খারাপ চাইনি, হামজা সাহেব।ʼ

রউফ উঠে চুপচাপ বেরিয়ে গেল, যাবার সময় কী এক ইশারা করে গেল। হামজা খুব আগ্রহে হাতদুটো এগিয়ে দেয় হ্যান্ডকাফের দিকে। থরথর করে কাঁপছে হাত, খুব বেশি দেরি বোধহয় নেই সম্পূর্ণ অচল হতে। হামজাকে নিয়ে যাবার সময় রিমি এসে দাঁড়ায় রউফের সামনে, “আমায় সঙ্গে নিন, অফিসার। নিজের দেখভাল করবার সাধ্যি উনার নেই। আমি উনার খাস দাসী। আমাকে প্রয়োজন হবে।ʼʼ

হামজা চোখদুটো বুজে নেয়, কিন্তু শ্বাস পড়ে না। সে এইদিনের আশায় এত দৌড়ায়নি একজীবন। এত অপদস্থ, এত অসহায়, এত একাকী তার হবার ছিল কি? রিমিকে নেয়া হলো না, রিমি তাতে অখুশি হলো না খুব একটা। আরমিণের বাচ্চার তাকে খুব প্রয়োজন যে! সে আরেকটু মিশিয়ে নিলো ভ্রুণটাকে বুকের সাথে। ওটা কি একটু দুধ পান করতে চায়? চাইলে রিমি দেবে। মা রিমি হলো না এ জনমে, দুজন হতভাগা-হতভাগীর সন্তানের দুধমা হতে তা বলে রিমির একটুও আপত্তি নেই।

তুলির কান্না থেমে গেল একসময়। সে সোফার সাথে হেলান দিয়ে মেঝের ওপর ঠাঁই বসে রইল। আরমিণটা কি জ্যোতিষবিদ্যা জানে? এই তো ক’দিন আগে মেয়েটা বলল, এ বাড়িতে কেউ থাকবে না। তুলির ঠাই হবে কী করে? ওই তো একদল বড়ঘরের তালা ভাঙছে। ধাতব শব্দ আসছে। দু-ভাইয়ের অপরাধ অশেষ, সেই অশেষে রউফ কায়সার আরেকটা যোগ করতে বড়ঘর তল্লাশির হুকুম না দিলেও হামজা ও জয়ের রক্ষার উপায় তো ছিল না। তবু আর এত আয়োজন কেন? সেটার প্রতিনিধিত্ব করলেন দোলন সাহেব। রিমি আর কিছুতে অবাক হবে না বলে হলো না, কিন্তু তুলি হলো। তুলি জানে না মুরসালীনের মৃত্যু দায়সারা আইনজীবীটার বুকে কী যে এক জ্বালা ধরিয়েছে! তিনি শেষ দেখতে চান, শেষ।


রূপকথার জামিন ধরার কেউ নেই। পরাগের বোধহয় জামিন হবে না। তার হাতে কিছু খুনের রক্ত লেগে আছে। সালমাকে পলাশ মেরে ফেলেছে। কেন মেরেছে জানা নেই, মানুষ মারার জন্য পলাশের কোনো কারণ প্রয়োজন হতো না। তবে সালমাকে মারার একটা কারণ আছে। সালমা রাজনের স্থায়ি রক্ষিতা ছিল। রাজনের একটি সন্তান পরাগকে গর্ভে ধারণ করেছে। সুতরাং তার কিছু পাওনা রাজনের সম্পত্তিতে থাকবেই তো! সালমা খুব কৌশলি মহিলা ছিল, আবার রাজন আজগরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও গভীর ছিল, সুতরাং সে পলাশের সাথে চোটপাট করার সাহস রাখতো।

পলাশের মুডের নেই ঠিক। কখন কেমন মাথা কাজ করে! কখন বা সালমা কেমন কথা কাটাকাটির পর্যায়ে চলে গেছে—পলাশ নারীর গলার উঁচু আওয়াজ পছন্দ করে না। সে নারীর কান্না ও আর্তনাদ পছন্দ করে। সালমার প্রাণটা এ কারণেই গেছিল। পলাশের সহকারী লাশটাকে গুম করে দিয়েছিল। এটা জানার পর পরাগ সহকারীকে মেরে ফেলেছে। পলাশকে কিছু করা যায় না। পলাশও কিচ্ছু বলেনি তাকে। মায়ের লাশ যে গুম করেছে, তাকে খুন করা কোনো অপরাধ না। পরাগের কোনো অপরাধ নেই।

পরাগের চারটা খুন প্রমাণিত। তার ফাঁসি আটকানোর মতো কেউ নেই। দলছুট, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, দলের সদস্য বেশ কিছু বন্দি। পরাগের রায় কার্যকর হবার পথে। তাহলে রূপকথার কী হবে?

রূপকথা অনেকদিন আকাশ দেখে না। দেখলেও তার উড়ার উপায় কেড়ে নেয়া হয়েছিল খুব জঘন্যভাবে। সে শেষবার যখন অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে এলো, ওটাকে সে শেষ আকাশে উড়া হিসেবে ধরে নিয়েছে। সে কারাগারে থাকা অবস্থায় আজ পর্যন্ত চার-পাঁচবার অর্ধেক ধর্ষণের শিকার। এটার জন্য দায়ী তার সৌন্দর্য। রূপকথার হাসি আসে খুব। যে সৌন্দর্য পলাশকে মুগ্ধ করে তাকে কখনও সুখের দাম্পত্য দিতে পারেনি, সেই সৌন্দর্য প্রশাসন কর্মকর্তাদের ঠিক মুগ্ধ ও মনোরঞ্জিত করছে। এটা ভেবে রূপকথার খুশি হওয়াই উচিত–তার সৌন্দর্য কোনো কাজে তো দিয়েছে!

রূপকথা আজকাল পলাশের কথা খুব ভাবে। অবসর সময়, চোখদুটো বুঝলে নারকীয় দিনগুলোই সবার প্রথমে ভেসে ওঠে। পলাশ ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, ‘রূপ, ও রূপ!ʼ

সারাজীবন রূপ বলে ডেকেও পলাশ কেন তার রূপে মজল না এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। রূপকথা সেই ডাকে থরথর করে কেঁপে উঠতো। পলাশ আসলেই বাড়ির সকল চাকর-বাকর বাড়ির অন্দর ছেড়ে বেরিয়ে যেত। রূপকথা একখানা পাতলা কালো শাড়ি পরে আয়নায় নিজেকে দেখলে নিজেরই হিংসায় বুক জ্বলতো, এই সৌন্দর্যে কেন একজন সুস্থ পুরুষের হক নেই? পলাশ এসে প্রথমেই গলাটা চেপে ধরে বিছানার হেডবোর্ডের সাথে হাতদুটো বেঁধে ফেলতো। কিন্তু মুখে কিচ্ছু লাগাতো না। রূপকথার আর্তনাদ বড় প্রিয় তার।

রূপকথা বুক ভরে শ্বাস টানে। আজ পলাশ নেই। সে কেন আছে? পরাগের ফাঁসিটা তাকে দিলে কী সমস্যা? আছে একটা সমস্যা। সে মুক্তি পেয়ে যেত, এটাই দুনিয়ার সমস্যা। রূপকথার খুব অন্তূর কথা মনে পড়ে। মেয়েটার কাছে বসে কথা বলতে খুব মন চায়। রূপকথার অভিমানও আছে এ নিয়ে—রূপকথা ঘৃণ্যই হলো বা, ঘৃণা করেও কি একবার দেখতে আসা যায় না? আসে না অন্তূ।


রাত্রির চতুর্থ প্রহর। আকাশে মেঘ। বৃষ্টি হবে বোধহয়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ যেন গম্ভীর রূপ ধারণ করেছে। সাথে অন্তূর ভেতরে কীসের এক ভয় পেয়ে বসেছে। জয় আমির গেছে কমবেশি নয় ঘণ্টা হবে। ওদিকে কী হচ্ছে! জয় যদি হামজাকে মেরে ফেলে? অন্তূ জানে মারবে না। ব্যথা রুহ্কে ছুঁয়ে দিলে মানুষ প্রতিশোধের স্পৃহা হারায়। জয়েরা কখনোই হামজাদেরকে মারে না। এটুকু স্বস্তি। হামজা এভাবে মরতে পারে না। অন্তূর যে হিসেবের গড়মিল মিলানোর আছে।

কোথাও একটা লার্ক ডাকছে। অন্তূ ক্লাস নাইনে থাকতে শেক্সপিয়রের রোমিও-জুলিয়েট পড়েছিল। টাইবল্টকে মারার পর রাতে নির্বাসিত রোমিওর সঙ্গে জুলিয়েটের শেষ দেখার প্রহরে একটা লার্ক খুব করুণ স্বরে গান গাইছিল বলে উল্লিখ করেছিলেন শেক্সপিয়র। অন্তূর মনে হলো জয় আমির ধরা পড়েছে। তাদের শেষ দেখা হয়ে গেছে। তারা তো রোমিও-জুলিয়েট নয়, তাহলে ভোরের পাখিটা গাইছে কী সাধে?

মুরসালীন মহান গাইতো, এমন কয়েকটা লাইন অন্তূও গেয়ে উঠল–

মনটা যদি হইতো প্রবাল হাওয়া
হইতো যদি শুভ্র কবুতর….
মেঘের ডানায় পাঠিয়ে দিতাম, মদিনারই পথে…
যেখায় আমার প্রিয় নবী—

অন্তূ কখনোই যাবে না কারাগারে জয় আমিরের সঙ্গে দেখা করতে। যেদিন জয় আমিরের শাস্তি ফুরোবে, তা কত বছর পরে? তখন দুজন কেমন হবে? বুড়ো হয়ে যাবে তারা। তখন দেখা হলে হবে একবার, অন্তূ একবার কারাগারের বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে শীর্ণ-জীর্ণ বৃদ্ধ, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভুগে বের হওয়া আসামী জয় আমিরকে দেখতে।

অন্তূ সেই নোংরা সালোয়ার ও কামিজটাই পড়েছে। কক্ষে থাকা সম্ভব নয়, দম ফুরিয়ে আসছে, বুকের অস্থিরতা মাত্রা ছাড়াচ্ছে। সে কোনোরকম দেহটাকে তুলে বিছানায় বসে বেলকনি দিয়ে বাইরে দেখে। আশপাশে বহুদূর অবধি প্রাণ নেই। একটি পরিত্যক্ত নিবাসের অবরুদ্ধ কক্ষে, এই শেষ নিশীথ প্রহরে লার্কের করুণ স্বর অন্তূর শরীর কাঁপিয়ে তুলল। মনে হলো পৃথিবীর সব আলো গ্রাস করেছে কোনো এক হিংসুটে কালগর্ভ, সূর্য সেই হুমকিতে নিজেকে লুকিয়েছে সমুদ্রের অতলে। আজ ভোর হবে না। ভোর হবার সময় পেরিয়ে যাবার পরেও এই নিশীথ ঘুঁচবে না। খুব বর্ষণ হবে, তবু ভোর হবে না।

এরকম এক প্রহরে আমজাদ সাহেবের শরীরটা শিথিল হয়ে এলো। অন্তূর যে কী কান্না পাচ্ছিল, আব্বুর সামনে কাঁদার অনুমতি নেই বলে সে কাঁদতে পারেনি। কোথাও গাড়ি নেই আমজাদ সাহেবকে হাসপাতালে নেবার জন্য। অন্তূ ভাবলই না যে আমজাদ সাহেব অন্তূকে বিয়ে দিয়ে স্ট্রোক করেছেন। সেই রাতটাও এমন ছিল। তারপর আর ভোর হয়নি অন্তূর জীবনে। আব্বু রাতের খাবারে টেবিল বসে ধমকে ডাকেনি বলে অন্তূ কতকাল রাতে খাবার খায় না। আব্বু এসে পাশে বসে অন্তূর লেখা দেখে বলে না, লেখা এত ছোট করবি না। দ্রুত লিখতে শিখবে হবে। লাইন বাঁকা কেন? অন্তূ পড়তে বসে না কতদিন সন্ধ্যার পর! খুব কি দরকার ছিল আব্বুটার চলে যাবার? তাদের ছোট্ট পরিবারটা কীভাবে যেন বিদ্ধস্ত হলো! অন্তূর মনে হয় এই তো সেদিন অন্তূর জন্য পৃষ্ঠা কিনে এনে বারান্দার রোদে বসে খাতা সেলাই করছেন আমজাদ সাহেব! ক্যালেন্ডার হিসেব করলে সাতমাস হয় আমজাদ সাহেব পালিয়েছেন! অন্তূর হাত শিরশির করে উঠল। তার ভেতরে রক্তের নেশা জাগল। তার সন্তানের খুনী, তার আব্বুর খুনীদের রক্তের নেশা।

-“আরমেইণ!ʼʼ

অন্তূ থরথর করে কেঁপে উঠল। এই পৌরুষ কণ্ঠস্বর অন্তূকে ভার্সিটির সেসব অভিশপ্ত দিন মনে করায়। সে পেছন ফিরল না। রক্তের নেশা সত্যিই যদি পেয়ে বসে লোকটার মুখ দেখলে? অন্তূ কখনও জয় আমির হতে পারে না। জয় আমিরের হাতে ঝুলছে হ্যান্ডকাফ, শরীর রক্তে ঢাকা। দাড়ি বেড়েছে লোকটার, চুলগুলোও। শেষবার শরীরের যত্ন নেবার মাস পেরিয়েছে যে! মদ কোথায় পেয়েছে কে জানে! কয়েক চুমুক ঢকঢক করে গিলে বোতলটা ছুঁড়ে মারল মেঝের ওপর। কাচ ভেঙে তরল ছড়িয়ে পড়ল দরজার সামনে।

অন্তূকে কি জয় আমিরের ক্ষত-বিক্ষত, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহাবয়ব একটুও প্রভাবিত করল না? না। সে বরং জিজ্ঞেস করল, “আবার কেন এসেছেন এখানে? মরতে?

জয় আমির হেসে ফেলল, “বাইরেও মরণ।ʼʼ

-“বেশ! আমার পাপের বোঝা না বাড়ুক। বাইরে গিয়েই মরুন।ʼʼ

-“তোর হাতে মরব বলে এতদূর এলাম, এই দেখ রক্ত ঝরতেছে পায়ে। ফিরায়ে দিস না, আরমিণ। চলার শক্তি নাই আর।ʼʼ

-“এসেছেন কেন? কোনো প্রয়োজন ছিল না। কী কোরে এলেন? কোথায় গেছিলেন?ʼʼ

জয় একটা শেষ সিগারেট ধরালো, “চ্যাহ্! এত প্রশ্ন কেন? অস্ত্র নাই তোমার কাছে। অস্ত্র দিতে এলাম।ʼʼ

অন্তূর সুখ লাগে। তার ক্ষমা জয় আমির আজও মানতে পারেনি, সে মরতে মরিয়া।

-“আমি আপনাকে শাস্তি দেবার কেউ নই। আইনের হাতে মরুন। ওটা বরাদ্দ আপনার জন্য।ʼʼ

জয় মাথা নাড়ে, “উহু। পাপ তো আইনের কাছে করি নাই। পাপ করব একজনের কাছে, আর শাস্তি দেবে আইন, এ নীতি মানলে তো আজ খুনী হতাম না, উকিল ম্যাডাম। যার কাছে পাপ, পাপীর সাজা হবে শুধু তারই অভিশাপ। কলজেটা বাইর করে নেন। কবুল।ʼʼ

-“সত্যি মেরে ফেলব আজ। বেরিয়ে যান, সারেন্ডার করুন।ʼʼ

জয় হো হো করে হাসে, “সেই তো ভয় পাচ্ছ আমায় মেরে ফেলার। জয় আমিরের ময়লা জনম ধন্য!ʼʼ

প্যান্টের নিচ বেয়ে সরু রক্তের ধারা তালু অবধি পৌঁছেছে, এতদূর কীভাবে এসেছে এ অবস্থায়? জয় মেঝের ওপর ঠেসে বসে বেলকনির দরজার পাশে দেয়াল ঘেষে। আর্তনাদের মতো শব্দ করল বসার সময়। শরীরে বিষব্যথা। বুকে বোধহয় ব্যথা নেই। ফুরফুরে লাগছে। এই তো সামনেই পথের শেষ। ক্লান্ত জয় আমির পিঠ হেলান দিয়ে বসে পরিশ্রান্ত কণ্ঠে আরমিণকে ডাকে, “পাশে এসে বসো তো একটু, ঘরওয়ালি!ʼʼ

অসুস্থ অন্তূ বসে। জয়ের কাধে মাথা রাখে। জয় চোখদুটো আবেশে বুজে নেয়, তার হৃদকপাটিকাগুলো অস্থিরচিত্তে লাফায়। অন্তূ কি একটাবার জড়িয়ে ধরতে পারে না জয়কে? না। অন্তূ তো টের পাবার ইচ্ছাই রাখে না জয়ের বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণের! বরং অন্তূ খোঁজ করে জয়ের কারাবন্দি হবার।

-“পুলিশ এসেছে পেছনে?ʼʼ

-“আসতে অল্প দেরি হবে। ততটুকুই সময় পাবে তুমি। আর কিন্তু ধরতে পারবে না, উড়ে যাব আমি। সত্যি বলতেছি। তোমার কসম।ʼʼ

-“কসম কাটবেন না।ʼʼ

জয় তাকায় অন্তূর দিকে, “কাটলে কী?ʼʼ

-“মিথ্যাকে সত্য করার হাতিয়ার হিসেবে মানুষ কসম কাটে।ʼʼ

বেশ কয়েকটা টান একসাথে দিয়ে সিগারেটটা কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে, “তাইলে আরেকটা কাটি!ʼʼ

জয় আমির বোধহয় একটা আবদার করল সেদিন, “বদনাম তো হলেই, বদনামের দাগ ওঠে না। সঙ্গে চলো, এই জীবনটা বদনামের নামে যাক…কসম পরের জন্মে আর বদনাম করব না।ʼʼ

অন্তূ এই জয়কে কিছুক্ষণ দেখে। অন্তূর দৃষ্টিতে জয় কেমন ছটফট করে ওঠে, “নাহ্! এভাবে না। মরার ভয় পেয়ে বসলে ইজ্জত থাকবে না জয় আমিরের। চোখে ঘেন্নাটুকু বহাল রাখো। ওটুকু আমার।ʼʼ

-“অস্ত্র দেবেন বললেন।ʼʼ

জয় হাসে, নির্দিধায় পিস্তলটা বের করে অন্তূর কোলের ওপর রাখে, “সত্যিই মেরে ফেলবে?ʼʼ

-“বহুদিনের সাধ।ʼʼ

জয় চোখ বুজল এবার, “মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাধে মাথা রেখে কত সুখ পাচ্ছ। আসলে তা ছলনা, এই মিথ্যা ভঙ্গি কেন? ভালোবাসো?ʼʼ

-“মানুষ হয়ে পশুকে কী করে?ʼʼ

-“বাসা যায় তো। কুকুর, বিড়াল এমনকি জঙলি হিংস্রদেরকেও ভালোবাসে মানুষ।ʼʼ

-“ওটা স্নেহ। সেটাও সেই সকল পশুকে, যেগুলো হিংস্রতা ভুলে মালিকের স্নেহের যোগ্য হয়ে ওঠে। মানুষখেঁকোকে ভালোবাসতে দেখেছেন?ʼʼ

জয় এবার গা দুলিয়ে হেসে ফেলল। কিন্তু তা অদ্ভুত ঠেকল। এটা হাসি নয়।

-“আমি পলাতক হলে কিন্তু আর বাংলায় ফেরা হবে না। সঙ্গে চলো, যাই।ʼʼ

-“আমার-আপনার পথ আলাদা।ʼʼ

জয় জিজ্ঞেস করে, “হু? তাই? তো আমার পথ কোনটা এখন? কারাবাস?ʼʼ সে দু’পাশে মাথা নাড়ে, ”কারাগারে আমি যাব না। বহুত খাটছি জেল।ʼʼ

জয় টেনে-টুনে গায়ের রক্তমাখা শার্টটা খুলে ফেলল, “দেখ তো, দাগগুলো কী বলে? কম হয়ে গেছে জেলের মার? আর তো জায়গাও নাই! কোথায় মারবে, কীভাবে আঘাত করলে আঘাত লাগবে আর জয় আমিরের?ʼʼ

-“আমি যেভাবে করছি, সেভাবে আঘাত পাচ্ছেন আপনি, জয় আমির। তাই আপনি মুক্তি হিসেবে মৃত্যু চাইছেন বারবার।ʼʼ

ব্যাকুল হাতে অন্তূর ঠোঁটে আঙুল রাখে জয়, “তার চেয়ে বিষ খাইয়ে দে, আরমিণ! শর্ত হলো–এরপর ঠোঁটে একটা চুমু খাবি। চল একসঙ্গে মরে যাই। দ্বিতীয় রোমিও-জুলিয়েট রচিত হোক। বিশ্বাস কর, কারাগারে মানাবে না আমাকে।ʼʼ

-“গোটা কাহিনি যখন ভিন্ন, পরিণতি এক করতে চাওয়া বোকামি, জয় আমির। আর আমি বিশ্বাস করি কারাগারে আপনাকে ভীষণ মানাবে‌—ʼʼ

জয়ই চুমু খেলো। সঙ্গে সঙ্গে অন্তূকে চেপে ধরে ঠোঁটের গভীরে খুব প্রগাঢ় এক চুমু খেলো। ঘাম ও জমাট রক্তের গন্ধে মাখা জয়ের শরীর। সেদিন আবারও রক্তাক্ত জয় আমির অন্তূকে শোষন করল একদফা নিজের ভেতরে। আরও একবার, আরও একবার, আরও কয়েকবার। অন্তূ কেঁদে ফেলল, ছাড়াতে পারল না জয়কে। জয় তবু আরও একটাবার খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরে চুমু খেল অন্তূর ঠোঁটের কিনারায়। সে চুমু খেলে ঠোঁটের এক কিনারা বেছে নেয়। অদ্ভুত হয় তার আগ্রাসন, সেখানে পৌরুষ কম, দহন বেশি মেলে।

জয় খানিক বাদে আস্তে কোরে নিজেকে শিথিল করে সরিয়ে আনল, সামান্য ঠোঁট আলগা করে বলল, “কাঁদছো কেন? আমি ছুঁলে খুব খারাপ লাগে?ʼʼ

-“আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারলাম না।ʼʼ

জয় নিশব্দে মুচকি হাসে, তারপর একটু গা দুলে ওঠে, “কোন শালীর ছাওয়াল কয় রে জয় আমির দূর্ভাগা? সেই শালার মাকে সালাম। দুনিয়ার সবচাইতে সৌভাগ্যবান আসামী জয় আমির। যার বেলায় বাদীপক্ষ কাঁদছে তারে ক্ষমা না করতে পারার আফসোসে।ʼʼ

অন্তূ কিচ্ছু বলল না। হাসতে হাসতে জয় অন্তূর আগের সেই কথার জবাব দেয়, পতনের কালে দু-চারটে বোকামি করা খারাপ না।ʼʼ

-“এই পতন আপনার হাতে কামানো।ʼʼ

জয় হাত এগিয়ে দেয় অন্তূর কাছে, “তাইলে হাতদুইটা ধ্বংস করে ফেলো।ʼʼ

-“পাপগুলো হাতে লেগে নেই। মানুষের হাহকারের সাথে মিশে গেছে বাতাসে।ʼʼ

-“সেই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি বলেই কি বুকে এত শান্তি লাগতেছে? তাইলে তো উচিত এই শান্তি শান্তি বুকে ঠাস করে এক বুলেট গেঁথে দেয়া। কিন্তু তুমি তো শালী আমার দুশমন, উপকার তো করবে না।ʼʼ

-“পতন দৃশ্যমান হবার পরের অনুশোচনা ট্রেন চলে যাবার পর স্টেশনে পৌছানোর মতো।ʼʼ

জয় আগ্রহ পাবার ভান করে, “পরের স্টেশনের জন্য অপেক্ষা করা যায়। কখন আসবে সেটা?ʼʼ

অন্তূ তাড়া দেয়, “আপনি মৃত্যুর যোগ্য নন। মানুষের বন্দিত্বের হাহাকার যাদের কানে শ্রুতিমধুর লাগে, সেই উন্মাদদেরও উচিত একটু বন্দিত্বের সাধ গ্রহণ করা। বেরিয়ে যান, জয় আমির।ʼʼ

-“সাথে যেতেই তো রাজী হচ্ছ না!ʼʼ

-“রাজী হবো সেই সেই মিছে অপেক্ষা না করার পরামর্শ থাকবে আমার।ʼʼ

-“আমি ছাড়া কী গতি হবে তোমার?ʼʼ

-“চমৎকার একটা জীবন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি জানেন না, জয় আমির। সামনে আমার সুখের দিন। আমার কাঁধে কতকগুলো গুরুভার আমার বেইমান বাপ আর ভাই সঁপে রেখে পালিয়ে গেছে। তার পেছনে এই
এক জীবন যাবে। আপনার জায়গা কোথায় সেই ব্যস্ত পথে?আপনার জন্য জন্ম হয়নি আমার।ʼʼ

জয় অন্তূকে কিছুক্ষণ চোখ ভরে দেখে, খুব তো দেখা যাচ্ছে না টিমটিমে মোমবাতির আলোয়, তবু দেখে। এই মেয়েটার সাথে সে কি সত্যিই খারাপ করেছে? বুকের ব্যথায় রুহ্টা ঝিমিয়ে আসে। হেলান দিয়ে বসে।

-“কাকে মেরে এলেন?ʼʼ

-“মারিনি। তুমি কি চাইছিলে মেরে আসি?ʼʼ

-“এত রক্ত কীসের?ʼʼ

জয় সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বড় উচ্ছ্বাসের সাথে জানায়, “আমি বাপ হচ্ছিলাম, জানো? হিংসা হয়?ʼʼ

-“আল্লাহ্ পাকের বিচার সম্বন্ধে ধারণা রাখেন না। শত শত বাচ্চা বলি দিয়ে বাচ্চার বাপ হতে আসা নরপশু জন্য হিংসা? ওর ভাগ আপনাকে দেয়া হতো না।ʼʼ

আচমকা জয় অন্তূকে চেপে ধরে, গালের দুপাশে হাত রেখে একটু অপ্রকৃতস্থের মতো বলে, “ভাগ চাইছে কে? তুই তো পরের মেয়ে, আরমিণ। ও আমার রক্ত, আমার আমার, এইযে এই জয় আমিরের। নয়ত তুই বাঁচিয়ে নিতি সেদিন। আমার কেউ নেই বলে আমার শেষটুকু কেউ ছিনিয়ে নিলো, কেউ দিলো। চেষ্টা করিসনি পালানোর! শাস্তি শাস্তি! শাস্তি দেবার জন্য বাঁচাসনি না? কীসের শাস্তি?ʼʼ

অন্তূ সজোরে এক ধাক্কা মারল জয়ের বুকে, “চুপ! অসুস্থ লোক! রক্তের বড়াই করছেন! ওরকম কামের বশে পতিতালয়ের খরিদ্দাররাও রক্ত ঢেলে আসে বেগানা নারীর জরায়ুতে। বাপ শব্দটার মর্যাদা রক্ষার জন্য হলেও খবরদার আপনার নাপাক জবানে বুক ফুলিয়ে বাপ হবার ঘোষনা করবেন না। সেই যোগ্যতা সবার থাকে না। বাপ হতে সন্তান জন্ম দেবার চেয়েও বাপের কর্তব্য পালন করতে জানা জরুরী। আর সেই কর্তব্য শুধু নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে নয়। আগে মনে মনে বাপ হতে হয়। একজন বাপ কখনও অন্যের সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হয় না। আমার বাপকে দেখেছেন না?

বাপ তো আমার বাপও ছিল, তাকে কী দিয়ে দুনিয়াছাড়া করেছেন? বাপ তো মুরসালীনের বাপও, বাপ তো বন্দি বাচ্চাগুলোর বাপও…দুনিয়া সহজ নয়। দুনিয়া ঋণ রাখে না, জয় আমির। মিটিয়ে দেয়। আপনাকেও দিয়েছে। এত হয়রান হচ্ছেন কেন?ʼʼ

জয় টলে না। বরং অন্তূকে আরও চেপে ধরে, “তোর বাপ মরেছে, আমার মরে নাই? তুই এতিম, আমি কী?ʼʼ

অন্তূ ভঙ্গূর হয়ে আসে, “তার জন্য তো আব্বু দায়ী ছিল না, অন্তিক দায়ী ছিল না, আর না ছিল অন্তূ। তাদেরকে কেন খুন করা হয়েছে? এই অসহায়ত্ব কোথায় ছিল সেদিন আপনার? সেদিন আপনাকে কেন আমির বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ, এতিম বংশধর হিসেবে পাইনি? আপনি অভিশাপ রূপে এসেছেন আমার কাছে। আমি চিনি না আপনাকে, চিনি না আপনার এই স্বার্থপরতায় জড়ানো উন্মাদ কাপুরুষটাকে।ʼʼ শেষে অন্তূ চেঁচিয়ে ওঠে।

জয় আস্তে করে নিজেকে ছেড়ে দিলো অন্তূর ওপর, “তাই পালাসনি সেদিন? জয় আমিরের সন্তান বলে অবহেলা করেছিস, আরমিণ!ʼʼ

অন্তূ ডুকরে উঠল। উন্মাদ এক বাপের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছিল সে। যে লোক নিজের ভাবনাছাড়া কিছুই বোঝে না। অকপটে মিথ্যা দোষারোপ করে যাচ্ছে! থেমে যাওয়া কান্না আর ঠেলে ওঠা প্রতিবাদে এবার মাতৃত্বের ধাক্কা পড়ল। সে নিজের সন্তানকে সেচ্ছায় মারতে দিয়েছে? অপ্রকৃতস্থ লোক! হু হু করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। কোথাও হারিয়ে গেল অন্তূ, কেঁদে উঠল আরমিণটা–যে জয় আমিরের অকালমৃত সন্তানের মা।

-“আপনি যান। আমি সহ্য করতে পারছি না আপনাকে। খুব কঠিন ধাক্কা খেয়েছেন দেবতার কাছে, মাথা নষ্ট হয়ে গেছে আপনার। আপনার উন্মাদনা সামলানোর দায় আমার নেই। আমাকে যেতে হবে।ʼʼ

জয় সঙ্গে সঙ্গে হাতরে বুকে টেনে নেয় অন্তূকে। সন্তানের প্রতিশোধের রক্তের ওপর সন্তানের মায়ের কান্নার পানি জয়ের বুক ভেজায়। সে দুইহাতে কঠিন করে জড়িয়ে নিতে বারবার হাত দিয়ে আঁকড়ে নেয় অন্তূকে। অন্তূর মাথার ওপর চোয়াল ঠেকিয়ে চোখ বোজে। চুলের ওপর চুমু খায় কয়েকটা। বুকটা যে কী জ্বলছে তার! ইশ! এই আমির নিবাস তাকে আধারে ফেলে দিয়েছিল একুশ বছর আগে। সেদিন নিষ্পাপ এক কিশোর বেরিয়ে গিয়ে এক পাপীষ্ঠ, খুনী হয়ে ঢুকেছে।

অন্তূ ছটফট করে, “ছেড়ে দিন আমায়–

জয় বিরবির করে, ‘সেই পদ্ধতিটাই তো ভুলে গেছি!ʼ অন্তূর মাথায় হাত দিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে বলল, “আমার হাতে সময় নাই, ঘরওয়ালি। সঙ্গে চলো। এভাবে ধরে কাঁদার জন্য আসামীর বুকটা লাগবে তোমার। নাকি বুকটা কেটে রেখে বাকিটা কারাগারে দেবে?ʼʼ

-“আজকের পর আর কাঁদব না।ʼʼ

অন্তূ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওড়নাটা ঠিক করে গায়ে পেচালো যেন কোনো বেগানা এসে উপস্থিত হয়েছে হঠাৎ-ই!
জয় শার্ট পরে, খুব জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বাচ্চাদের মতো খাবারের আবদার করে উঠল, “খিদে লাগছে খুব। কিছু নাই খাওয়ার মতোন?ʼʼ

অন্তূ মাথা নাড়ে, “নাহ্।ʼʼ

-“পানিও নাই? গলা শুকায়ে আসতেছে খুব। একটু পানি খাব আমি। নাই পানি?ʼʼ

-“খুব খিদে পেয়েছে?ʼʼ

-“কিছুই খাই নাই। পেট খালি, ভীষণ খিদে পাচ্ছে। শরীর খারাপ লাগতেছে খুব। একটু পানি থাকলে দাও, পানি খাব। আছে পানি? বুক ফেটে মরব মরে হচ্ছে।ʼʼ হেসে ফেলল জয়।

দুজনের এই কয়েকটি বাক্য বিনিময়ে কয়েকটা সেকেন্ড কাটল, তার পরক্ষণে অন্তূ ওঠে কোনোরকম। সামান্য কিছুটা পানি বোধহয় আছে বোতলে। অন্তূ মোমবাতিটা আনতে এগিয়ে যায় একটু, কিন্তু পথিমধ্যে তাকে থামতে হলো। জয়ও টের পায় সিঁড়িতে পদচারণার আওয়াজ।
একলাফে উঠে দাঁড়ায় সে, অন্তূর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “এজন্য কেঁদে আমার সময় নিচ্ছিলে এতক্ষণ?ʼʼ

-“আপনার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবার জন্য জরুরী ছিল। আমি দুঃখিত, জয় আমির।ʼʼ

-“আবার ছলনা! বলেছিলাম, চাইলে তোর হাতে ধ্বংসের একমুঠো ছাই হবো—ʼʼ

-“যা মানুষ সদিচ্ছায় দেয় তা তার শাস্তি হতে পারে না। আমি আপনার তথাকথিত উদারতা বা নাটকীয় আত্মত্যাগ নয় শাস্তি দেখতে চাই। বৈধ শাস্তি। যা প্রাপ্য আপনার। কথা বাড়াবেন না, সারেন্ডার করুন।ʼʼ

-“কাঁদলে কেন, সত্যি করে বলো। জানে মেরে ফেলব কিন্তু একদম।ʼʼ

-“দোষ তো আপনার, জয় আমির। আসামী আপনি, গর্ভের সন্তানের বাপ কেন? তা হলেন, তার আগে আসামী কেন? সন্তানের জন্য তার বাপের কাছে কেঁদেছি, একজন পাপীষ্ঠকে তার প্রতিদান দিতে সময় পার করিয়েছি।ʼʼ

পিস্তলটা অন্তূ হাতে নিয়ে উঠেছে। জয় আর কথা বলতে পারে না। এই মুহুর্তে অন্তূকে দেখে মনে হলো এতগুলো দিন সংসার করেছে, জয় আমিরের সন্তানের মা হয়েছে অথচ আজও সে সে-ই আমজাদ আলী প্রামাণিকের মেয়ে! সেই তেজ, নির্মম নিষ্ঠুরতা, পণ! ‘অন্তূ এক বাপের মেয়ে।ʼ শর্তে হারেনি একরত্তিও!

সেই মুহুর্তে হুড়মুড় করে দরজা লাত্থি মেরে ঢোকে দুজন। সিভিল ড্রেস, অথচ ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে স্পেশাল ফোর্সের অফিসার দুজন।

-“হ্যান্ডস-আপ, জয় আমির। ইউ’আর ডান। ডোন্ট ট্রাই টু মুভ, অর ইউ উইল বি শ্যুট।ʼʼ

জয় অন্তূকে দেখছিল, হঠাৎ খেয়াল করে হো হো করে হেসে উঠল, “হু? আরেহ্ আরে! রিল্যাক্স, স্যার। জানটা বউয়ের হাতে দেব বলে পণ না করলে গুলি খেয়ে নিতাম, কসম। পেটটা খালি, গুলি খাওয়া খুবই দরকার ছিল। তাছাড়া আপনাদের হাতে গুলি খেয়ে মরা বংশ পরম্পরায় পাওয়া জেনেটিক ডেসটিনি আমার। প্লিজ কুল। আই’ল নট মুভ, আই একনোলেজ। পুট দ্যা গান ডাউন।ʼʼ

সে অন্তূর কাছে আবার পানি চায়, “পানি খাব। পানি…ʼʼ

অন্তূ পানির বোতল এগিয়ে ধরল। জয় পানি নিতে হাত বাড়াতেই বিদ্যুতের বেগে ছুটে এসে একটা গুলি লাগল জয়ের হাতের কব্জির নিচে। ছিটকে পড়ে গেল পানির বোতল।

জয় বলে ওঠে, “যাহ্সসালা!ʼʼ

অন্তূ চেঁচিয়ে উঠল, “খরবদার। ডোন্ট শ্যুট এট-অল! পুট দ্য গান ডাউন, অফিসার। অর আইল শ্যুট ইউ!ʼʼ

ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে গিয়ে অন্তূর হাতে লাগে। বুলেট জয় আমিরের হাতের এপাশ-ওপাশ পেরিয়ে বেরিয়ে গেছে। জয় আমিরের গরম-ছুটন্ত গাঢ় খয়েরী-লাল রক্তের ছোঁয়ায় অন্তূ কেঁপে উঠল। ছুটে এসে ওড়না দিয়ে চেপে ধরল হাতটা। জয় অন্তূকে বুকের সাথে বাহুডোরে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়ায়। সুতোর ওড়না জয়ের রক্তে ভিজে জুবজুবে হয়ে ওঠে।

-“সারেন্ডার করুন। ওরা আবার গুলি চালাবে। প্লিজ, জয়।ʼʼ

-“তুমি তো চালালে না, ওদেরকে অন্তত আমার শেষ উপকারটা করতে দাও। এত হিংসুটে মেয়েলোক বিয়ে করেছিলাম!ʼʼ

-“খবরদার, বাজে ভাবনা না। আত্মসমর্পণ করুন। ওরা কিচ্ছু করবে না।ʼʼ

জয় পুলিশ দুটোকে বলে, “স্যার এক মিনিট, প্লিজ।ʼʼ

জয় অন্তূর হাতের পিস্তল তুলে ঠিক হৃদপিণ্ড বরাবর মুজেল চেপে ধরে বলে, “করলাম আত্মসমর্পণ। মারো। এবার তো মারো!ʼʼ

-“পাগলামি করবেন না। আপনি আমার হাতে নিজেকে খুন করাতে চাইছেন!ʼʼ

-“না। খুন হবে না এটা। ভেতরে কিছু একটা খুব ছটফট করতেছে, তুমি গুলি চালাইলে তবেই, আমি নিশ্চিত ওই শালা থামবে। থামাও ওরে।ʼʼ

অন্তূর ক্ষমতা নেই দু-পা হাঁটে। তার শরীরের নিচের অংশ অচল প্রায়। রক্তে সালোয়ার অনেক আগেই ভিজে উঠেছ, আর জয়ের রক্তে হাত।

-“রক্তপাত থামবে না এভাবে। এমনিই অসুস্থ আপনি। এখন আর অহংকার করবেন না প্লিজ।ʼʼ

-“তুমি তো করতেছো!ʼʼ

-“আমি?ʼʼ

“সাফ সাফ দেখা যাচ্ছে চেহারায়। অত্মগরিমা, না?ʼʼ জয় হাসে। তারপর অসহ্য ব্যথায় মুখটা কুঁচকে ধরে, হা করে শ্বাস নেয়। গলগল করে রক্ত পড়ছে। অন্তূ ওড়না ভিজে গেছে, আর রক্ত শুষবে না ওটা।

অস্ত্র ফেলে দাও, “জয়। নয়ত এবার আর গুলি অজায়গায় তাক করা হবে না।ʼʼ

-“ধ্যাৎ মিয়া! আলগা ভাব চুদায়েন না তো! মেরে দিলে নাহয় মেনে নিতাম যে ঘরওয়ালি তো মারল না, সে যখন চায় তো আইনের হাতেই গেল এই জনম! না মেরে প্যানপ্যান ঠাপাইলে তো সমস্যা। এইবার আমিই কিছু করি!ʼʼ

আচমকা কোথা থেকে যেন লাইটার জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারল মেঝের ওপর। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল অ্যালকোহলে। সেই মুহুর্তে বেশ কয়েকটা গুলি ঠাসঠাসা চলল। কিন্তু তার মধ্যে জয়ের পিস্তল থেকে বেরোনো তিনটা গুলিতৈ একজন নিহত ও একজন গুলিবিদ্ধ আগুনের ওপর পড়ল। তখন শোনা যায় ধুপধাপ বুটের আওয়াজ। বাইরে থেকে এবার সব ভেতরে ঢুকে পড়ছে। জয়ের ম্যাগাজিন খালি। একটা ছুরি অবধি নেই কাছে।

সিড়ির কাছে আসতে আসতে দুজনই বসে পড়ল। জয়ের মাথা ঘুরছে, পা অবশ হয়ে এলো, বাহুতেও ক্ষত। সেই হাতেরই কব্জিতে আবার গুলি লেগেছে। অন্তূর পক্ষে হাঁটা সম্ভব নয়। তিরতির করে বদরক্ত যাচ্ছে গর্ভ ধুয়ে।

জয় অন্তূর হাত সরাতে চায়। অন্তূ ছাড়ল না।

-“বসে থাকুন। ওরা আসলেই দুই হাত তুলে সমর্পণ করবেন নিজেকে।ʼʼ

জয় অন্তূর নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। একটাবার তাকায় পেছন দিকে। একুশ বছর আগে যেদিন এই সিঁড়িটা দিয়ে নেমে গেছিল, সেদিন সে বড়বাবার কোলে। সেদিন বড়বাবা ছিল রক্তক্তা। এই নিবাসটা তার জন্য নয় কখনোই।

দুজন নামতে নামতে আবার থামে, ফোর্স সদরঘরে ঢুকে পড়ার আগেই দুজন কোনোরকম বেরিয়ে গেল নিচতলার পেছনের বড়বারান্দা দিয়ে। অন্তূকে জোর করে টেনে নিয়ে যায় সে। অন্তূ অবাক হয় জয়ের এই শরীরেও সে জয়ের সাথে পারছে না।

অন্তূ নিজেকে ছড়াতে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল এবার, “আমি যাব না আপনার সাথে।ʼʼ

-“সঙ্গে যেতে হবে না। আমি যেখানে যাব তোমার সময় হয় নাই এখনও যাবার। এইখান থেকে অন্তত বের করি। আমার বাপের বাড়িটা ভালো না।ʼʼ

-“আপনি দাঁড়ান এখানে। রক্ত থামছে না। কী করতে চাচ্ছেন আপনি?ʼʼ

সেই পেছনের লোহার ফটকের কাছে পৌঁছায় দুজন। এই পথ দিয়ে জয়নাল আমির হুমায়িরা ও জয়কে বের করে দিতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। জয় হেসে ফেলল। সে অন্তূকে বের করে দিতে গিয়ে ধরা পড়বে? কিন্তু একটা ব্যাপার মিসিং। হুমায়িরার গর্ভে সন্তানটা ছিল, আরমিণের নেই কেন? পরক্ষণেই তার মনে হয় না। তারপর হুমায়িরার সঙ্গে যা হয়েছে তা আরমিণের সাথে হবার নয়।

মরচে ধরে ক্ষয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা তালা। কারা মেরেছে জানা নেই। জয় ডান পা দিয়ে দুটো কষে লাত্থি মারল। আর তখন সামনে দিয়ে গোটা নিবাসের ভেতরটা খুঁজে ফোর্স তাদের পিছনে এসে পৌঁছেছে। ঝুপ ঝুপ করে জড়ো হলো জয়ের পেছনে। জয় হাসে। হাসতে হাসতে মাথা উচু করে সটান দাঁড়িয়ে থাকা আমির নিবাসকে একটাবার দেখে, মনে মনে হেসে বলে—

‘তোর সাথে আমার এই জনমের শত্রুতা রহস্য রইল। পরের জনমে শালা তোর রহস্যও জানবো, আর প্রতিশোধও তুলব। রেডি থাকিস, শালা নিমোকহারাম।ʼ

অন্তূ বসে পড়ল। রক্তপাত বাড়ছে।

ফোর্সের ভেতরে রউফ কায়সারকে দেখে হেসে উঠল জয় আমির। কোন ব্রাঞ্চের লোক কোন ব্রাঞ্চে যুক্ত হয়েছে এক জয় আমিররের তুচ্ছ জীবন কাড়তে! জয় উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে অভিনন্দন জানায় তাকে, “শান্তি বর্ষিত হোক, স্যার। দেখুন না আপনার লোকেরা কী করেছে হাতটার? একটু পানি খাব, স্যার। খুব পিপাসা পাচ্ছে, পানি আছে?ʼʼ

-“সেটা কাস্টডিতে বেহিসেব পাবেন। তার আগে মিসেস আরমিণকে পাস করুন, জয় আমির। নিজেকে সারেন্ডার করুন। আমি বারবার বলব না। পালানোর চেষ্টা করলে কোনোরকম কনসিডার করা হবে না। এটা হুমকি নয় সতর্কতা। উনাকে ছেড়ে দিন। যদি ভেবে থাকেন উনাকে জিম্মি করে কিছু করতে চান, তো সামনের ফোর্স মেম্বার আছে। ব্যাকাপ ছাড়া আসেনি ফোর্স। আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী আমি। তাই সতর্ক করছি।ʼʼ

-“না স্যার। মিসেস আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত আজ। আমি আজ দৌড়াব পরাণ খুলে। থামাতে পারবেন না। ওঠো ঘরওয়ালি!ʼʼ

-“আপনার দোহাই জয়, মিছে পালানোর চেষ্টা করে বিপদ ডাকবেন না। আপনি দৌড়ালে ওরা গুলি চালাতে বাধ্য হবে।ʼʼ
-“তাই নাকি? তাহলে তো একটা রিস্ক নেয়াই যায়! কাম অন, উকিল ম্যাডাম। হুহ্ হুউউউ!ʼʼ

জয় আমিরের সেকি উল্লাস! অন্তূকে নিজের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে সে চপল পায়ে সামনে এগিয়ে যায়। এই সেই জঙলি এলাকা। আজও জঙ্গলে পরিণত বাগানটায় জলিল আমিরের লাগানো বিশাল বিশাল আম, মেহগনি, কড়ইগাছগুলো দাঁড়িয়ে, নেই শুধু আমির নিবাসের সদস্যরা। এই পথেই একদিন গর্ভবতী হুমায়িরা খোঁড়াতে খোঁড়াতে জয়টাকে নিয়ে পালিয়েছিল আমির নিবাস ছেড়ে। আজ হুমায়িরার ছেলের পালা। কে জানে তার ছেলের পালানোর ইচ্ছে কতটুকু?

ক্রস ফায়ারের হুকুম জারি হবার পর বাহিনী খেলাটাই এমন খেলে। তারা আসামীকে আদলতে নেবার চেষ্টাটাই করে না। সরাসরি গুলি চালিয়ে খাটুনি কমিয়ে আনে। সেই সুবাদে
নিশীথের শেষ প্রহরের নির্মম নিরবতাকে কাঁপিয়ে তুলে একে-47 রাইফেল থেকে একটি বুলেট ছুটল। সাঁ করে গিয়ে লাগল হুমায়িরার ছেলের পিঠ বরাবর। বক্ষপিঞ্জরের পর্শুকার কোনো এক ফাঁকে ওটা আঁটকে রইল।

জয় কুজো হয়ে পড়ে, জোরে করে হেসে ওঠে। অন্তূ থমকে দাঁড়ায়। হাতটা তার জয় আমির আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে এই মুহুর্তে। হাসছে লোকটা। পৌরুষ হাসির ঝংকারে অন্তূর শরীরের লোমকূপ শিরশির করে উঠল। জয় আমিরের হাসি থামছে না। তবু পা ঝেরে টান করে অন্তূর হাত ধরে টেনে নিয়ে সামনে এগোতে চায়। আজ সে ঠিক বুঝতে পারে না মৃত্যুকে সে বেশি ভালোবেসেছে নাকি সেই অসীম ভালোবাসার ঊর্ধ্বে জয় আমির মৃত্যুর সাথে বেইমানি করে আরও কিছু চেয়ে বসেছে। তা কি তার হাতের মুঠোয়? ওটা কি কিছুকাল বাঁচার আকাঙ্ক্ষা জয়ের হাতের মুঠোয়? মৃত্যু কি অভিমান করল না? করাই তো উচিত। এতগুলো বছর মৃত্যু বারবার হাতছানি দিয়েছে, জয়কে গ্রহণ করেনি। আজ করছে, আর আজ কিনা জয় আমিরের চোখে মৃদু অনীহা? ওটুকুও মৃত্যুর বরদাস্ত নয়।

জয় মৃত্যুকে দেখে প্রাণখুলে হাসতে লাগল, আর সামনে এগোনোর চেষ্টা করতে লাগল। সেই মুহুর্তে পর পর আরও দুটো, তারপর আরও একটা বুলেট এসে লাগল জয় আমিরের পিঠের শিরদাড়ার মাঝ বরাবর। এটা কেন যে ফুঁড়ে জয় আমিরের প্রসস্থ বুকটা চিড়ে ছুটে গিয়ে বিঁধল জলিল আমিরের রোপনকৃত একটি গাছের গায়ে। জলিল আমির নিশ্চয়ই গাছটা লাগানোর সময় ভাবেননি এই গাছে একটা বুলেট বিঁধবে, তার নাতির বুক ফুঁড়ে রক্তে ধুয়ে এসে। বাকি দুটো বুলেট একটা পেটে আরেকটা ঠিক জয় আমিরের এক জনমের সাধ মিটিয়ে বুলেটটা হৃদপিণ্ড বরাবর বিঁধে গেল।

জয় ক্ষণকাল কুঁজো হয়ে হাসে। সে দেখে সে উবু হবার ফলে তার বুকের রক্ত নোংরা ঘাস-মাটির ওপর টপটপ করে ঝরছে। জয়ের হাসি বাড়ল। গা দুলিয়ে হাসতে লাগল সে। নিয়মভঙ্গ হয়নি। জয় আমিরের রক্ত একুশটা বছর ধরে মাটি শোষন করে আসছে। যে পথে মানুষ বড় অবহেলায় পা মাড়িয়ে হাঁটে, সেসবখানে জয় আমিরের অদামি রক্ত গলগলিয়ে ঝরে গেছে।

জয় বসে পড়ল। তখন অন্তূর হাতটা হাতের মুঠোয় ছিল। কিন্তু বসে পড়ার পর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে কয়েক ফোঁটা পানি মাটিতে পড়ার পরপরই জয় আমির লুটিয়ে পড়ল ঘাসের ওপর। আকাশটা কেঁদে ফেলল। খুব অবাককর ব্যাপার। আকাশের কী হয়েছে? তার কি খুব দুঃখ? এই শেষরাতে তার কান্না পাবার কারণ কী?

অন্তূ টের পায় তার হাতটা কেউ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে ধুপ করে লুটিয়ে পড়ল ওই তো মাটির ওপর। অন্তূর শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল জয়ের দেহের পাশে। তার ওই হাতটা মৃগী রোগীর মতো কাঁপছে। সে হাতটা টান করে ধরে। তার ওপর ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ল, আর জয় আমিরের রক্তরা পানির সাথে মিশে ধুয়ে ধুয়ে জমিনে পড়তে লাগল। অন্তূ অস্ফূট ডেকে ওঠে, ‘জয়!ʼ

জয় তৃপ্ত হেসে উঠে মাটিটা খামচে ধরে দূর্বল হাতে। মাটি নাকি মা? জয় আমির হুমায়িরার আঁচলটা চেপে ধরল। লোকে বলবে জয় আমির ঘাস চেপে ধরেছে, রক্তে ভেজা ঘাস। লোকেরা জানে না কিছু। হুমায়িরা কি একটু পানি আনেননি জয় আমিরের জন্য? আনেননি। তিনি জানেন না বোধহয় জয় আমির ভীষণ তৃষ্ণার্ত। হুমায়িরা কাঁদছেন না। হুমায়িরা কিছু বুঝতে পারছেন না বোধহয়। তিনি কি ভাবছেন জয় আমির আজ একুশ বছর পর ঘুমালো? নিশ্চিন্ত ঘুম! হুমায়িরা সঠিক ভাবছেন। তার ছেলে আজ ঘুমালো যুগ পর। এই ঘুমে ব্যথা নেই, রক্ত অথবা হাহাকার নেই, বুকের দহন নেই। পিপাসাও নেই। এই যে কিছুক্ষণ আগে কী ছটফট করছিল একটু পানি পান করার জন্য, এখন অবশ্য আরও কেমনভাবে যেন বুকটা আঁটকে আসছে। জীবনের সবটা স্মৃতির পটে জড়ো হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার সংক্ষিপ্ত ঘটনাবহুল জীবনটার একেকটা নিশীথ! অবরুদ্ধ নিশীথ! খুব পিপাসা পাচ্ছে, বুকে শ্বাস নেই। একটু পানির জন্য রূহ্টা ছটফট করে উঠল। পাত্তাই দিলো না জয়। তবু মনে হলো এক চুমুক পানি পান করতে বুকে বড় তৃষ্ণা! বৃষ্টিটা এলো তার পিপাসা নিভে যাবার মুহুর্তে।
ততক্ষণে মৃত্যুকে জয় আমির জড়িয়ে ধরেছে আষ্টেপৃষ্টে। আর সে এবার ছাড়বে না, বহু প্রতারণা মৃত্যু করেছে তার সঙ্গে। এবার আর নয়। তার একুশ বছরের সাধনা! তার ছোট্ট বয়সের প্রেম। বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটা জয়ের ভেতরের সব আগুন নিভিয়ে জয়কে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। এই ঘুম ভাঙবে না।

ওই তো দূর মসজিদের মিনারে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। একটু পরই সকাল হবে। তবু জয় উঠবে না। অবশ্য জয়ের সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস কি আছে নাকি? সে ওঠে দুপুর অথবা বিকেলে। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। জয় আমির আজ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে, রাত হবে, সেই রাত শেষ হয়ে আরেকটা সকাল হলেও জয় আমির কিছুতেই উঠে গিয়ে গলা ফেঁড়ে ডাকবে না, তরুউও! আমার শার্টের বালডা কয়দিন পর পর ধুস? খাউজানি হয়ে গেল যে ময়লা শার্ট পরে! আজ কী রাঁধছে রে? মাছ হইলে হোটেলে যাইগা। ওই বালডা ছাড়া তো কিছু পাস না।

জয় আমিরের আরেকটা বিষয় জানা দরকার ছিল। কুষ্টিয়াতে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে। শেষরাতে মার্জিয়ার প্রসববেদনা উঠেছিল। ফজরের আজানের সাথে মার্জিয়ার গর্ভ ছিঁড়ে একটা হুমায়িরা এসেছে। হুমায়িরা অন্তিক। জয় জানলে কী করতো বলা যাচ্ছে না। তাকে জিজ্ঞেস করলে এখন আর বলবে না। কিন্তু বিজ্ঞান বলে মানুষ মরার পরে সাত মিনিট মস্তিষ্ক সচল থাকে, কানও। এখন খরবটা দিলে জয় আমির শুনবে কি? কিন্তু বলবে কে? অন্তূটাও জানে না।

অন্তূ বসে পড়ল আলগোছে জয়ের কাছে। তার কেন মনে হলো দুনিয়ায় আজ সে একা হলো। শেষ হাতটাও এই তো এইক্ষণে তার হাত ছেড়ে পালালো। অন্তূ জয় আমিরকে ঝাকাল, ‘জয়! এই? জয়!ʼ

জয় উঠলই না! অবাধ্য, বেয়াদবের মতো শুয়েই রইল চুপচাপ। চোখটা সামান্য খুলল না অবধি। অন্তূ রক্তে মাখা হাতটা মুঠোয় পুড়ে ঝাঁকায়, মৃদু স্বরে ডাকে। জয় চুপ করে শুয়ে আছে। অন্তূর বিশ্বাস হচ্ছে না। সে বোকা না। এটা হয় নাকি? জয় আমির আর নেই, এটা বিশ্বাস করা যায়? সে আর ডাকবে না? হাসবে না বেহায়ার মতোন? অন্যদিন হলে এক্ষুনি উঠে দু চারটে গালিয়ে দিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে উঠতো। হাসবে না নাকি আর? চেইনের লকেটটা বুকের ওপর পড়ে আছে। জোরে বৃষ্টি আসছে। জয়ের রক্ত ধুয়ে চুইয়ে যাচ্ছে। সে উঠে হাসছে না, বুলেট গেথে থাকায় যে ব্যথা সেই ব্যথাকে দুটো গালিও দিচ্ছে না। লোকটার ধৈর্য বেড়েছে। ভেতরের আগুন যে নিভে গেছে, তাই!

সেই তারিখটা ১৭-ই জুলাই, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ। তারিখটা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস। সেদিন জয় আমির ন্যায়বিচার পেল, নাকি দুনিয়াকে দিয়ে গেল বলা মুশকিল।

চলবে…