#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৮৪.
○
মাহেজাবিণ উঠে শাড়ির ওপর একটি সাদা সুতির ওড়না জড়িয়ে নিয়ে অযু করে এসে নামাজে দাঁড়াল। ততটুকু সময় ক্যাথারিন পেলেন নিজেকে সামলানোর। আটচল্লিশ বছর বর্ষীয়া নারী তিনি। ঘর-সংসার ত্যাগ করেছেন যুগ কয়েক আগে। মানবসেবায় নিয়জিত করেছেন তুচ্ছ জীবনখানা। বিলাসিতা, রং তার জীবনে নেই। রোজ তিনি বাইবেল পাঠ করবার সময় অহিংসাকে পালন করেন ভেতরে। অথচ আজ এক হিংস্র পাপীষ্ঠের জন্য তাঁর চোখে পানি, এ কি ইশ্বরের কাছে পাপ বলে বিবেচিত হবে? তিনি মাহেজাবিণকে দেখলেন। মেয়েটি তাকে ‘মাদামʼ সম্বোধন করে। উচিত নয়। তাকে ডাকতে হবে ‘সিস্টারʼ বলে। কিন্তু তিনি কিছু বলেননি। এক অদৃশ্য টান তার তৈরি হয়েছে মেয়েটির ওপর। তার ইচ্ছে তৈরি হয়েছে বাকিটা জীবন মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় রাখার। ভেতরে অসংখ্য প্রশ্ন জমেছে।
মাহেজাবিণ কেন মরে গেল না? তার তো জীবনের প্রতি তৃষ্ণা নেই। কিন্তু প্রতিশ্রুতির ওপর ভক্তি আছে অসীম। নয়ত একটি অসহায় নারীর মিছিল কাধে বয়ে নিতে নিজের নষ্ট জীবন কেউ বহাল রাখে না।
মাহেজাবিণ মার্জিয়াকে কথা দিয়েছিল–মার্জিয়া ও তার বাচ্চার এই জীবনের দায় সে বয়ে দেবে। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে মাহেজাবিণ এক জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু শুধু তা হলে মানা যেত, নিজের ভাবী, ভাইয়ের সন্তানকে পালন করলোই বা! সে যে তার জীবনকে নরক করা তিন প্রধান পাপীষ্ঠদের ঘরের নারীদেরকে অবধি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে! এটা কি মহত্ব নাকি পাগলামি? যেখানে তার নিজের বেঁচে থাকার হেতু নেই, সংসার নেই, স্বামী-সন্তান, শারীরিক সুস্থতা, মা-বাবা কেউ তো নেই। শুধুই এই বেঁচে থাকা পরের জীবন টেনে দেবার দায়ে। ক্যাথারিন অবাক হলেন। মাহেজাবিণ কি তারই মতো এক ব্রতী নয়? যে কেবল মানুষের সেবায় এক জীবন উৎসর্গ করেছে! যার নিজের জীবনে কিছু নেই, নিজের বলতে কিছু নেই। আছে কেবল এক কাধ ভর্তি দায়বদ্ধতা, স্বার্থহীনতা! সেই দায় টানতে মাহেজাবিণ নিজের এই অসহনীয় জীবনটা বয়ে চলেছে! জেনেবুঝে হেরে গেছে শুধু একটি ওয়াদার কাছে, একটি পাপের কাছে।
জয় আমির যেমন আত্মহত্যা করল বন্দিত্ব ও জীবন থেকে, মাহেজাবিণ পারেনি। আত্মহত্যা মহাপাপ, মাহেজাবিণ এখানে কাবু। কিন্তু জয় আমির পাপের ঊর্ধ্বে। যে কেউ বলবে জয় আমিরকে ক্রস ফায়ারে মারা হয়েছে। ক্যাথারিন তাদের কাউকে কখনও বোঝাতে যাবেন না অবশ্য–জয় আমিরের সেই রাতের গোটা আয়োজনটাই ছিল এমন এক আত্মহত্যার, যা আপাত দৃষ্টিতে আত্মহত্যা বলে বিবেচিত হবে না। কারণ কেউ মাহেজাবিণের মুখে সেই বর্ণনা শুনবে না– জয় আমির কী প্রচেষ্টা ও উন্মাদনার সাথে বাধ্য করেছিল তার ওপর গুলি চালাতে, পালিয়ে গেছিল সে জীবনের থেকে।
ক্যাথারিন একবার মাহেজাবিণের মতোই কৃতজ্ঞ হয়েছিলেন জয় আমিরের ওপর। যখন তিনি শুনছিলেন পলাশের ছাদ থেকে মাহেজাবিণের সম্মান রক্ষার গল্প। তখন তাঁর মনে হয়েছিল জয় আমিরকে থুতু দিয়ে ঠিক করেনি মাহেজাবিণ। কিন্তু এখন তা মনে হচ্ছে না। মাহেজাবিণ সেদিন অজান্তেই একটা সঠিক কাজ করেছিল, থুতুটুকু প্রাপ্য ছিল জয়ের। কিন্তু তার বদলে জয় যা করেছে সেটা ‘আগুন থেকে বাঁচিয়ে পানিতে ডুবিয়ে শ্বাস আটকে মারার মতোʼ। আর তা কতটুকু কৃতজ্ঞতার দাবীদার জানা নেই ক্যাথারিনের।
পলাশকে অন্তূর পরিবারটা চিনিয়েছে হামজা। এরপর পলাশ কেবল নিজের কাজ করেছে, যেটা তার কাজের পদ্ধতি সেভাবেই যা করার করেছে। কিন্তু এরপর জয় পলাশের সাথে যা যা করেছে তা ছিল ‘গাছে তুলে দিয়ে মই টান দেয়াʼ। আবার পলাশ অন্তূকে বারবার চেয়েছিল ধর্ষণ করার জন্য। যেটা অন্তূ বিয়ের পর জয়ের কাছে বৈধভাবে হয়েছে বারবার। ইচ্ছে, সম্মতি না থাকার পরেও বাঁধা না দেবার অপারগতায় মেনে নেয়া আর মনকে মিথ্যা সান্ত্বণা দেয়া একটি নারীর জন্য ধর্ষণের সংজ্ঞার সাথে মিলে যায়। যাকে বলে ম্যারিটাল রেইপ। লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে কাউকে খুন করা আর কী! পলাশের সেই লাইসেন্সটা ছিল না, জয়ের কাছে তিন কবুলের লাইসেন্স ছিল। কিন্তু জয় শেষ অবধি মাহেজাবিণকে ভেতর থেকে আকাঙ্ক্ষা করে বসায় যা অঘটন ঘটল।
এই গোটাটার পেছনে একটি মূল ঘটনা দায়ী—বড়ভাইদের ওপর অন্তিকের অবাধ্যতা, এবং তার জের ধরে আবার অন্তূর অন্যায় মেনে না নেবার প্রবণতা! মিস ক্যাথারিন ভেবে ক্লান্ত হয়ে উঠলেন। মাহেজাবিণকে দেখলেন।
মাহেজাবিণ শান্তচিত্তে তার রবের সামনে নিজেকে সমর্পন করছে। একেকটি সেজদা লম্বা তার। স্নিগ্ধ, গম্ভীর, চাপা বিষাদে মাখা মুখখানা! ওযুর পানি ছিটকে লেগে আছে মুখটায়। নারীর সহ্যক্ষমতার মাত্রা কতটুকু? পাশের ঘর থেকে শিশুকন্যার কান্নার আওয়াজ এলো সামান্য, মার্জিয়া দুটো চাপা ধমকে চুপ করালো মেয়েটিকে। মাহেজাবিণ নামাজ শেষ করে উঠলে ক্যাথারিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মনে পড়ল।
-“মাহেজাবিণ, অন্তিকের মেয়ের নাম কি হুমায়িরা রাখা হয়েছে?ʼʼ
-“অরিবা। অরিবা মুমতাহিণা।ʼʼ বলতে বলতে মাহেজাবিণ সোফায় বসল আবার, “আমি রেখেছি।ʼʼ
মিস ক্যাথারিন বললেন, “খুব সুন্দর নাম।ʼʼ এরপর তিনি আনমনা হলেন। জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেন না, ‘জয় আমিরের কাঙ্ক্ষিত নামটি রাখোনি?ʼ পিতার খুনী সন্তানের নাম ঠিক করতে পারে না। মার্জিয়া তা বরদাস্ত করবে না। যে সন্তানকে গর্ভে নিয়ে সে বিধবা হয়েছে সেই সন্তানের নাম তার স্বামীর খুনী রাখবে, প্রশ্ন ওঠে না তো! নামটা জয় আমির উচ্চারণ করেছিল বলে মার্জিয়া চার অক্ষরের সেই নামটিকেও ঘৃণা করে।
-“জানো, মাহেজাবিণ! আমাদের ক্যাথেলিক খ্রিষ্ট শাখার ভিত্তি হলো ট্রিনিটি অর্থাৎ ত্রিত্ববাদ–ফাদার, সন অ্যান্ড হোলি স্পিরিট! আমি কি প্রতিকী অর্থে তোমার অবরুদ্ধ নিশীথকে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার প্রবাহ ধরে নিতে পারি?ʼʼ
মাহেজাবিণ মাথা নাড়ে, “পবিত্র আত্মা কে, মাদাম? যদি আপনি আমাকে নির্দেশ করেন তো আমি পানাহ্ চাইছি। আপনি যা বললেন তা আমার ধর্মমতে শিরক। কিন্তু আপনি যখন প্রতিকী অর্থ ধরেছেন সেক্ষেত্রে জয় আমির ও তার সন্তান যদি পিতা ও পুত্র হয়, পবিত্র আত্মার স্থানটি আমার জন্য ফাঁকা থাকে। অথচ আমি পাপীষ্ঠা!ʼʼ
-“কী পাপ করেছ?ʼʼ
-“আমি এই হাতে মানুষ খুন করেছি, অথচ কারাবরণ করিনি। আমি অ্যাডভোকেট হতে যাচ্ছি, অথচ নিজের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে যাবার পরিকল্পনা রাখিনি। সবাই শাস্তি পেয়েছে, শুধু আমি বাদে।ʼʼ
‘অথচ আমি দেখছি তুমি ছাড়া আর কেউ শাস্তিই পায়নি। এন ইটারনাল পানিশমেন্ট হ্যাজ বিন গিভেন টু ইউʼ কথাটুকু মনে মনে বলে ক্যাথারিন আলতো হাসলেন, “একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রাণীহত্যা পাপ হবার পরেও কীভাবে প্রাণীহত্যা বৈধ হতে পারে?ʼʼ
-“হিংস্র, ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা বৈধ।ʼʼ
-“আমি তো ভাবছিলাম, এটা তুমি জানোই না, মূর্খ মেয়ে। কোন ধর্মের কাছে যাবে তুমি? সকল ধর্মই তোমাকে বলবে– ঠিক যেমন অহেতুক হত্যা পাপ, তেমনই আত্মরক্ষার জন্য হিংস্র পশুবধ বৈধ। কেননা তুমি যদি তখন সেই প্রাণীটাকে হত্যা না করো, উল্টো তুমি অথবা কোনো নিরীহ নিহত হবে। তুমি বলছো মানুষ খুন করেছ। শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এতবড় ভুল কথা কেন? মানুষের সংজ্ঞা জানো না তুমি? যে মানুষ অপর একটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর, সে মানুষিকতাহীন প্রাণী, যাকে সাধারণ ভাষায় জানোয়ার বা পশু বলা হয়। তুমি যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে খুন করেছ, তা না করলে বরং তুমি পাপী হতে পারতে।ʼʼ
-“কিন্তু খুন তো খুন, মাদাম। আমি আগামীতে যখন কোনো খুনী আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াবো, আমার মনে পড়বে তারই মতো একটি পাপী আমার ভেতরেও আছে। আমি কেন আজ কাঠগড়ায় না দাঁড়িয়ে আইনজীবীর স্থানে?ʼʼ
মিস ক্যাথারিন একটু হাসলেন। জয় আমির আর মাহেজাবিণের মধ্যে প্রধান ফারাকটা কোথায়? এখানেই! জয় আমির পাপ স্বীকার করেছে কিন্তু অনুশোচনার ধারে কাছেও ঘেঁষেনি। সক্রেটিস বলেছেন–অন্যায় করে অনুতপ্ত না হওয়াটা আরেক অন্যায়। মাহেজাবিণ এমন একটি খুনের অনুতাপে ডুবে আছে আজও, যা নৈতিকতার গভীর দৃষ্টি থেকে দেখলে খুনই নয়। অথচ জয় আমির সামান্য অনুতাপ করেনি মরার আগ অবধি, শুধু পাপের স্বীকৃতি যথেষ্ট নয় পাপমোচনের জন্য, অনুতাপ ও শাস্তিগ্রহণ ছাড়া পাপমুক্তি নেই। এখানেই দুজনের পথ আলাদা হয়েছে। যে পাপী সে কখনও রোজ সেই পাপ নিয়ে অনুশোচনা করে না। আর যে করে সে পাপ পাপের উদ্দেশ্যে করেনি।
তিনি বললেন, “আমি বাইবেল, কোরআন, গীতা, ত্রিপিটক পড়েছি। সে হিসেবে এবং এ অবধি তোমার বলা ঘটনাপ্রবাহমতে বলব–তুমি পাপ না করে সীমাহীন শাস্তির অধাকারী হয়েছ। অভিনন্দন তোমাকে।ʼʼ
-“জেল হলো না, না জরিমানা, না মৃত্যু। আপনি কোনটাকে শাস্তি বলছেন? আমি তো জিতে গেছি!ʼʼ
-“মিছে সান্ত্বণায় বাঁচতে চাইলে আমি তোমায় মানা করব না। কিন্তু জিতেছে জয় আমির। জিততে পারোনি তুমি আর হামজা। প্রধান প্রতিদ্বন্দী দুজন রয়ে গেছ নরকে। জয় খুব জানতো, শাস্তি জীবনের অপর নাম। সে সেই জীবনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়েছে চরম চতুরতার সাথে। তুমি বোকা ফেঁসে গেছ দায়ভারের কাছে। তুমি জিততে পারতে যদি এই যে কতকগুলো প্রাণের দায়ভার তুমি কাধে তুলে নিয়েছ, স্বার্থপরের মতো তা ঝেরে কারাবরণ অথবা মৃত্যু বেছে নিলে। পালাতে যখন পারোনি, এবার এই জীবনের দড়ি টানতে টানতে হাত ব্যথা হলেও থেমো না, মাহেজাবিণ।ʼ
-“আপনি কি তিরস্কার করছেন আমায়?ʼʼ
-“করছি। এতবড় বোকাকে তিরস্কার করাই যায়! একটি নরকবাস তুমি বেছে নিয়েছ জীবনে।ʼʼ
মাহেজাবিণ আলতো হেসে হেলান দিলো সোফায়, “আব্বু এমনটাই বলেছিল জীবন সম্বন্ধে। নরক তো জীবনবাসই।ʼʼ
সে ওড়নাটা একটু আলগা করে নিলো। বাইরে সকালের আভা ফুটছে। এভাবেই সেদিন সকাল হলো একটু একটু করে, কিন্তু বৃষ্টি থামল না, বরং তোড়জোর বাড়ল। আলো ফোটার সাথে সাথে ঝুমঝুম করে ঝেপে এলো।
মিস ক্যাথারিন জিজ্ঞেস করলেন, “সেই দিনটা কি পুরোটাই বৃষ্টিমুখর ছিল, মাহেজাবিণ?ʼʼ
○
সকাল নয়টা বাজল। তখনও ঝরছে আষাঢ়ে বৃষ্টি। অন্তূ থরথর করে কাঁপতে লাগল। লোকটা শুয়ে আছে। হাত থেকে রক্ত পড়া থেমে গেছে। বৃষ্টির পানিতে তাজা রক্ত ধুয়ে সবুজ ঘাসে লাল মিশে যাচ্ছে।
আমির নিবাসের ফ্রন্টইয়ার্ডের ছাউনি পোর্টিকোর নিচে অবস্থান নিয়ে পুলিশবাহিনী তখন এফআইআর লিখতে ব্যস্ত। তারা সরকারের কাছে জবাবদিহি লিখছে। তারা লিখল, ‘জয় আমিরের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তাদের ফোর্সের একজন সদস্য নিহত হয়েছে ও আরেকজন মৃত্যুমুখে। এবং শেষ অবধি তারা নিজেদের আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ ক্রিমিনাল জয় আমিরের ওপর গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে।
এটা লিখতে গেলে বেগ পেতে হতো, যদি না হামজার দিন ফুরোতো। জয় আমিরের শরীরে তাজা চারটে গুলি বিঁধেছে। আত্মরক্ষার জন্য ক্রিমিনালকে একটি গুলিবিদ্ধ করে কাবু করাই যথেষ্ট, মারার হলেও এতগুলো গুলি একটি মানুষকে থামাতে চালানোর নয়। সুতরাং বাহিনীর সবগুলোর এ নিয়ে রাজনৈতিক উপরমহলের কাছে জবাবদিহি করতে কলিজা ফেটে যেত। কিন্তু সেই লিংকটা দূর্বল হয়ে গেছিল দুই-ভাইয়ের। এই সুবিধাটুকু পেয়ে পুলিশফোর্স নিশ্চিন্ত। ময়নাতদন্তেও নেয়া হবে না লাশ। চিহ্নিত অপরাধী জয় আমির, নিশ্চিত ফাঁসির আসামী ছিল। বিবেচনার ওপর কম করে হলেও যাবজ্জীবন দণ্ড শোনানো হতো।
মৃত আসামী জয়ের পরিবারে কে কে আছে? স্ত্রী বসে আছেন মৃতদেহের পাশে। আর কে আছে? রিমি ও তুলি প্রথমবার সেদিন আমির নিবাসে এলো। থমকে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ নারীদুটো। এতবড় নিবাস, এত আভিজাত্য! এই বাড়ির উত্তরসূরী জয় আমির! যে লোকটা একটা জীবন এই পরিচয়কে এড়িয়ে কাটালো, তার শেষ শ্বাসটুকু ঠিক তার পরিচয়ের জমিনে পড়ল! পাপ কি ধুয়েছে তাতে?
ঘটনাটা রিমির বিশ্বাস হলো না। জীবনে লুঙ্গি, প্যান্ট ধোয় না লোকটা। দরজাটাও আটকে ঘুমায় না। রিমি বা তরুর সকাল সকাল যেতে হয় যে তার রুম পরিষ্কার করতে অথবা নোংরা পোশাক নিতে। সে এরকম কত সকাল লোকটাকে চিৎপটাং হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেছে। আজ নাহয় বিছানা নয়, নোংরা ঘাসের ওপর পড়ে আছে, তাই বলে লোকটা একটু পর উঠে চিৎকার করে ভাত চাইবে না? তার কাছে হামজা ভাইয়ের খোঁজ করবে না? রিমির শ্বাস আটকে গেল।
তুলি শিয়রে হাঁটু ভেঙে বসে, ঝাঁকায় জয়কে, কর্কশ স্বরে বলল, “এই বাটপার, এই! বলেছিলি যে আমায় বিয়ে দিবি। আমি অসহায় বলে মিছে সান্ত্বণা দিয়েছিস? বিয়ে তো দিলি না? ওমন চুপচাপ শুয়ে থেকে খালাশ, না রে? আমি জীবন কাটাবো কী করে? তোরা একেকজন পূণ্যের কাজ করে করে একেটা একেকদিকে পাড়ি জমাচ্ছিস, আমাকে কে দেখবে? আমার মেয়েকে কে দেখবে? কোয়েলর দুধ নেই দু’দিন। ভাত চটকে দিলে বমি করে, কাঁদে। দুধ আনতে যাবে কে? দেখ দাঁড়িয়ে আছে, তোকে দেখছে। ও কাঁদলেও উঠবি না? জয়! ওঠ বলছি। আমার মেয়ে না খেয়ে আছে। আমার ভরা জীবন পড়ে আছে। আমাকে খেতে দেবার লোক নেই, দেখার কেউ নেই, বাপ নেই-মা নেই। কার আশায় রেখে গেলি? আপন ভাই নেই আমার, ফুফাতো ভাই হিসেবে কোন দায়িত্বটা পালন করে গেলি রে নিমোকহারাম? জয় ওঠ….ʼʼ
কোত্থেকে যেন হুড়মুড় করে একটা পাগল ছুটে এলো। পাগলটা হলো কবীর। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল জয়ের বুকের ওপর ঝুঁকে। হাতে-বুকে রক্ত মেখে গেল। কতলোক আজ ভূত নিবাসে জড়ো হয়েছে। বৃদ্ধরা হায় হায় করে উঠছে থেকে থেকে–’আমির পরিবারডারে ক্যান যে এমনে চিল-শকুইন্নাই ছিঁইড়া খাইল। এই চ্যাংরা এদ্দিন পর ক্যা আইছেলো এই শাপের বাড়িডাত? অর কি ডর নাই? বাপ গ্যাছে, চাচা, দাদা, মায়…ব্যাহায়ার মতোন আইছে ওয়ও জীবনডি দিতো।ʼ
খুবই অবাককর দৃশ্য দেখা গেল। একজন ক্রিমিনাল, দাগী আসামীর আইনের হাতে মৃত্যু এত মানুষের হাহাকারের কারণ হতে পারে না। কিন্তু করছে, কারণ এরা জানে না জয়ের জীবনের নারকীয় অপরাধগুলো।
-“ভাই? ভাবী, ভাইয়ের কী হইছে? জয় ভাই?ʼʼ
কবীরের ডাকে অন্তূ চোখ তোলে। তার খুব অবাক লাগে চারিপাশটা। সব কেমন গুলিয়ে গেছে। জয় আমির সত্যিই শাস্তি পেল না। এত পাপ করেও কিছু মানুষের মাঝে নিজের চলে যাবার এত হাহাকার রেখে গেছে যে লোক, তার শাস্তি কোথায়?
-“জয় ভাই? আমি কিন্তু একটুও সহ্য কইরব না এইসব। আপনে কইছিলেন পলাতক হইলে তারপর দ্যাশের বাইরে দেখা হবে। আমি তাই সেই আশায় সঙ্গ ছাড়ছি। আইজ কিন্তু কথার হেরফের হইছে ভাই। এইটা মানবোই না আমি। নাহ্! এই তো কথা আছিল না। আপনে কইলেন যা কবীর, আমি আসতেছি। আপনে যাইবেন না? আইজ আর আপনেরে ছাইড়া যাইতাম না। আবার ফাঁকি মারবেন আপনে জানি আমি। চলেন আমার সাথে চলেন। একসাথে যাব। এত পুলিশের সামনে পড়ছেন কেমনে? আপনে আমারে কথা দিয়া কথা রাখবেন না এইডা হইতো না। ওঠেন ওঠেন ওঠেন। এত রক্ত কীসের? ভাবী, এত রক্ত কার রক্ত? উঠে না ক্যান ওয়? আপনে কিছু কন কইলাম। আপনের কথা শুনে। কন কিছু। কন যে কইবরায় ডাকে।ʼʼ
অন্তূ জয়কে দেখে। কী মিছে আশ্বাস সবার! তার কথা নাকি জয় আমির শোনে। সে কত অনুরোধ, কত প্রচেষ্টা করেছে কিছু প্রাণ বাঁচাতে, তাদের সঙ্গে পাপীষ্ঠ জয় আমির কী করে এসেছে কে জানে! সে যে এতবার থামতে বলল, জয় আমির কি থেমেছে? বরং নিজের পরিকল্পনামতো ঠিক আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে গেছে সুকৌশলে, তবু পাপ থেকে ফেরেনি।
চোখের ভাষায় জয়কে ডাকে, ‘বাঃ রে! সবার দেখছি কত কত আবদার, আবেদন আপনার কাছে। আমার নেই কেবল। আপনার কাছে শুধু আমারই কিছু চাওয়া-পাওয়ার ছিল না দেখছি। বেশ তো! যা চেয়েছি তা দেবেন না বলে পালালেন কত রঙ্গ-কৌশল। একটা পাপ-বিরতির জীবন, একটি বন্দিত্বের প্রায়শ্চিত্য…. অসম্ভব আবদার রেখে সবার থেকে আলাদা হলাম। সবার মতো আবদার প্রকাশ করে কাঁদতে পারছি না। আমার-আপনার ছিলই বা কী, জয় আমির? একটি অসম্পর্ক, একটা বিরোধ, তথাকথিত বৈধ একটি পরিচয়! তার ভিত্তিতে কী-ই বা চাইবার থাকতে আছে আপনার কাছে, বলুন তো! এক জীবনে কারও মেয়ে, বোন ও কিছু বন্দির কান্ডারী হতে গিয়ে স্ত্রী ও মা হওয়া হলো না। একটি বাপ, ভাই ও কিছু বন্দির দায়ে সন্তান ও স্বা….ʼ
অন্তূ থামে। খানিকক্ষণ জয়কে দেখে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে শ্যামলা মুখটার ওপর। বিগতদিনে বেড়ে ওঠা দাড়ি-গোফ চুইয়ে পানি পড়ছে। অন্তূ শুধায়,
-‘আপনি কে? আমার কে আপনি? স্বামী হবার যোগ্যতা কি আছে আপনার? একটা আমজাদ আলী প্রামাণিকের মতো পুরুষ আমি চেয়েছিলাম আপনার স্থলে। এলেন আপনি। দাবানলের আগুনের মতো দাউদাউ করে জ্বললেন, জ্বালালেন–আজ যখন নিভেছে আপনার শিখা, চারপাশে তাকালে দেখছি কেবল বন উজাড় ছাই, তছনছ হওয়া বিদ্ধস্ত প্রকৃতি। কোথাও একফোঁটা জীবন নেই, কেবল দহনের ধোঁয়া! কেন এসেছিলেন আমার জীবনে? আমি তো চাইনি, কস্মিনকালেও আপনার মতো নোংরা পুরুষকে চাইনি। অন্তূরা কখনও আপনাদেরকে চায় না। তবু এলেন–পোড়ালেন, চলে গেলেন। এ আপনার সেচ্ছাচারিতা নাকি আমার নিয়তি?
এলেন যখন, জীবনটা গুছিয়ে নিলেও হতো! আমার তো বাপ নেই, তিন কবুল পড়ার পর আপনার কি কর্তব্য ছিল না আমার এক জীবন কাধে বয়ে দেবার? অথচ আপনি আমার রুহ্ অবধি পুড়িয়ে ছাই করেছেন দিনের পর দিন। কারণ কবুলের মর্যাদা আপনি বোঝেন না, পাপীষ্ঠ! এত অসহায় হয়ে এক নারীজীবন কী করে পাড়ি দেব একটাবার জিজ্ঞেস করেছেন? জিজ্ঞেস করেছেন, বাপ হারিয়ে অন্তূ কত অসহায় হয়ে পড়েছিল! কখনও কান বাঁধিয়ে অন্তূর বুকের নিঃশব্দ আত্মচিৎকার শুনেছেন? আপনি শুধু আরমিণকে দেখেছেন। বিয়ের পর তথাকথিত স্বামী হিসেবে কথা ছিল আপনাকে অবলম্বন করে দাঁড়ানোর। অন্তূর বুকটা যে আজ হু হু করে কেঁদে উঠল! জয় আমিরটা দেখল না এই অন্তূকে। দেখলে অবাক হয়ে যেত। আফসোসে আরেকবার মৃত্যুকে বরণ করতো কি!?
-‘কিন্তু আপনি স্বামী হলেন না, আপনি হলেন জয় আমির। এত পাপ, এত নিষ্ঠুরতা! কোনোদিন শুধালেন না, এসব দেখে ব্যথা পাও? কোনোদিন জানতে চাইলেন না, আমার কাঠিন্যের নিচে নারীত্বের স্তর কতটুকু পুরু! কারণ আপনি নাকি আমার কান্না দেখেননি! তাতে বড় আফসোস আপনার। তাহাজ্জদে বসে মালিকের কাছে কেঁদে মাতাল হয়ে আপনার ঘরে ফেরার সময় হবার আগেই কঠিন হয়ে বসে থেকেছি, আপনিও সমস্ত সীমা পেরিয়ে পাপ করে গেলেন। সেই সুবাদে ভেতরের নারী অন্তূকে হারিয়ে আমি হলাম কেবল একজন হবু-আইনজীবী। তাই আপনিও কেবল আমজাদ আলীর প্রামাণিকের প্রতিবাদী অন্তূকে দেখলেন, উকিল হবার স্বপ্ন দেখা ন্যায়বিচারপ্রবণ আরমিণকে দেখলেন। জয় আমির, আপনি আমায় দেখেছেন কোনোদিন? যে মেয়েটা একটু একটু করে নারীজীবনের সমস্ত শখ-আহ্লাদের গলা কেটে কিছু প্রাণ বাঁচাতে আপনাদের সাথে লড়াই করে গেছে, শেষে না সেই প্রাণগুলো বেঁচেছে, না সে নিজে। আমার বয়স কত? চব্বিশ? বুড়ি হয়ে গেছি আমি? বলুন না! আপনি এমন এক বৈধ পুরুষ আমার, যে হয় যাবে কারাবাসে, নয় নরকবাসে। আর এ দুটোর কোথাও না গেলে অবাধ পাপাচারে। যেখানে শুধু নিরীহর রক্ত, ক্ষমতার দাপট ও ত্রাস!
কোথাও তাকে নিয়ে সুস্থ সংসারের অপশন নেই। অথচ এই নারীজীবনে স্বামীর জায়গার দখলদারীত্ব সেই পাপীষ্ঠ পুরুষটির। কোনোদিন জিজ্ঞেস করেছেন, এই জীবনের নারীত্বকে বিসর্জন দিতে আমার কলিজা থেকে কতটুকু রক্ত ঝরে গেছিল? সেই ব্যথার তীব্রতা কতখানি ধারণা করতে পারেন? নারী হয়ে জন্মে নারীত্বকে বর্জন…
অথচ আপনি জয় আমির না হলে আমার একটা সংসার হতো, আমার সন্তান আমার গর্ভে থাকতো, আমার একটা জীবন হতো, একজন স্ত্রী ও মা আমি হতাম। সব কেড়ে নিয়েছেন। জবাব দিন– যখন এলেনই, কেন জয় আমির হয়ে এলেন? যে আপনি জয় আমির, সে কেন আমায় তিন কবুলে বাঁধলেন? আজ সেই আপনি যে স্বার্থপরের মতো পালালেন, আমি কোথায়, কার কাছে যাব? আমার আছে কে? আমার আশ্রয় কোথায়? আপনি কারাগারে যেতেন, তখনও আমাকে আমার সন্তান পিতার পরিচয়হীনতায় মানুষ করতে হতো, কারণ আপনার মতো পাপীর সন্তান হওয়া কোনো সন্তানের জন্য শুধুই লাঞ্ছনার। যেভাবে আপনি মানুষ হয়েছেন, আপনার মতো সেই একই জীবন আমার সন্তানও পেত, শুধু প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কেন? আপনাকে কেন কারাবাসেই যেতে হবে? এত পাপ কেন লেগে থাকবে আপনার হাতে? ঠিক আছে থাকল। আমি তার জবাবদিহি চাইতাম না। কিন্তু আমার জীবন নষ্ট কেনোওওওওওও করেছেএএন…. আপনার মতো জাহিলের স্ত্রী কেন হতে হয়েছে আমাকে?
আপনি আমার কাগজকলমের স্বামী, হৃদয়ে কতটুকু কেমন–জিজ্ঞেস করেছেন কখনও? জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলতাম, ‘আপনি একটি সূচের বিষমাখা সরু প্রান্ত, যা আমার হৃদয়কে প্রতিক্ষণে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত করেছে।ʼ তা শোনার পর কি স্বামী হবার চেষ্টা করতেন? তবু ক্ষমা পেতেন না। আমি ভুল ছিলাম। আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারিনি। যদি আপনার শাস্তি মৃত্যু হয় তো আমি ক্ষমা করেছি আপনাকে। কিন্তু অন্তূর ইজ্জত, আমজাদ প্রামাণিকের প্রাণ ও পরিবারের জীবনের ঋণ তোলা রইল।
এত হিসেব গড়মিল রেখে বর্বর শুয়ে থাকা পাপী পুরুষ, আপনি আমার স্বামী নন। আপনি আমার আসামী, দূর্ভাগ্যবশত আমার সন্তানের বাপ। আপনার কাছে আমার কিছু চাইবার নেই। এ বিরোধ মিটল না, আপনি শর্ত ছেড়ে পালালেন। কিন্তু যে আরমিণের আপনার কাছে কিচ্ছু চাইবার নেই, সেই আরমিণ আজ মিটে গেল। আজ থেকে সে কেবল একজন পাপীষ্ঠ বাপের পাপের প্রায়শ্চিত্যে অকালে প্রাণ দেয়া সন্তানের মা। মাহেজাবিণ আমির।ʼʼ
যেদিন এই লোক অন্তূকে পলাশের কাছ থেকে বাঁচিয়ে আনলো। অন্তূ কৃতজ্ঞতাটুকু জমিয়ে রেখেছিল। আমজাদ সাহেব তাকে কৃতজ্ঞতা শিখিয়েছেন। পরেরবার দেখা হলে মিটিয়ে দিতো বোধহয়। হয়ত একটু ইতস্তত করে গম্ভীর গলায় বলতো, ‘ধন্যবাদ, জয় আমির। তখন মানসিক অবস্থা ভীষণ খারাপ ছিল। আমার উচিত হয়নি থুতু দেয়া। একটা সত্যি কথা বলি? বিশ্বাস করবেন? আমি মিথ্যা বলি না। থুতুটুকু পলাশের জন্য বরাদ্দ ছিল। তা আপনাকে দিয়ে বসেছি। আমি আপনার ছোট বোনের মতো। আমার বড় ভাই আমাকে ওই পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে, আর আপনি আমার বড়ভাইয়ের মতো কাজ করে আমায় বাঁচিয়ে এনেছেন। সিনিয়র আপনি। আমি ছোট মানুষ। ভুল হয়েছে আমার।ʼ
কিন্তু এরপর? এই ক্ষমা চাইবার পর জয় আমিরের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো জানা নেই। কিন্তু অন্তূ জানতো না, ইতোমধ্যে তার সঙ্গে এর চেয়েও খারাপ কিছু করবার পরিকল্পনা জয় আমির ও হামজা করে রেখেছিল। হয় পলাশের রূফটপ নয়ত ক্লাবঘরের দোতলা। কিন্তু জয় আমির মাঝখানে থুতুর বদলা নিতে গিয়ে ঘটনা বদলে দিলো। অন্তূর জীবনটা কেড়ে নিলো নোংরা ছলনার কৌশলে। অথচ লোকটা তাকে বারবার ছলনাময়ী ডেকে গেছে। যে কিনা নিজে ছলনায় মেরেছে অন্তূকে!
জয় আমির যখন ঘুমাতো, অন্তূ কোনোদিন নজর বুলিয়ে দেখেনি। ইচ্ছে বা রুচি হয়নি। আজ দ্বিতীয়বারের মতো দেখল। বুক থেকে রক্ত চুইয়ে বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে যাচ্ছে। মুখে একরত্তি ব্যথার লক্ষণ ফুটে ওঠেনি, ঠোঁটদুটো এখনও হাসছে, যে হাসিটা তার ঠোঁটে চিরস্থায়ী। অন্তূ আবার অবিশ্বাসে পড়ে, এই লোক উঠে এসে গা ঘেঁষবে না? অন্তূর যে কী হলো আজ! আজ তার ভেতরে বড্ড নারীত্বের লাফালাফি সে টের পেল। সে আজ এক মুহুর্তের জন্য সদ্য বিধবা হয়ে উঠল। জয় আমিরকে তার ছুঁতে ইচ্ছে করল। তার দেখতে ইচ্ছে করল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ছুটে আসা বুলেট ওই পাষাণ বুকে কেমন ক্ষত তৈরি করেছে।
জয় আমিরের একটি আকাঙ্ক্ষিত আবদার ছিল। সে রুমে ঢুকেই অন্তূকে বলতো, ‘শার্টটা খুলে দাও তো, ঘরওয়ালি!ʼ
অন্তূ দেয়নি কক্ষনো। আজ সে জয় আমিরের বুকের ক্ষত দেখতে আলগোছে শার্টের বোতামগুলো খুলে আলগা করল। রক্ত জমাট বেঁধে ক্ষতর মুখ বুজে গেছে। থোকা থোকা রক্তের চাপ বুকের ওপর, সূক্ষ্ণ ছিদ্র দিয়ে তিরতির করে রক্তের ধারা বয়ে এসে বৃষ্টির পানির সাথে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। এই রক্তে হামজার ভাগ আছে। কত অংশ হামজার সেটা জানা নেই।
হামজাকে কনস্টেবল জানায়, “ও হামজা সাব, জয় আমির ক্রসে গেছে…ʼʼ
হামজার দম বন্ধ হয়, চেয়ারের ওপর গা ছেড়ে দেয়। কেমন মৃত পথযাত্রীর মতো সীমাহীন পিপাসায় যেন একটা ঢোক গিলল সে কোনোরকম। ঘেমে গেছে শরীর। তারপর মুহুর্তের মধ্যে গলা টিপে পায়ের তলে করে কনস্টেবলকে, “আরেকবার বল কথাটা। উচ্চারণ কর, খানকির চ্যাংরা। তোর জিহ্বা ছিঁড়ে চিবিয়ে খাবো…তোর আইনের মায়রে কেমনে চু÷দ<তে হয়, খালি একটাবার...ʼʼ কয়েকজন মিলে অসুস্থ হামজাকে ছাড়াতে পারে না যতক্ষণ না হামজার স্নায়ু শিথিল হয়ে সে হুড়মুড় করে পড়ে গেল মাটিতে। মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে লাগল শরীর। শ্বাস-প্রশ্বাস হাঁপানি রোগীদের মতো। জয় কোথায়? জয়ের গোসল হচ্ছে। সেই শেষরাত থেকে সে ভিজছে রক্ত ও পানিতে একাকার হয়ে। আমির নিবাসের ভিটায় একুশ বছর পর তার আবার গোসল হলো। এতক্ষণ সে ভেজা ঘাসে শুয়ে ছিল। এখন তার জন্য একখানা খাটিয়া এসেছে। তাকে সেখানে শোয়ানো হলো। এবারের গোসল শেষে হুমায়িরা দাবরে ধরে পোশাক পরিয়ে দিলো না। কারণ জয় আজ ছুটছে না। তাই কয়েকজন মৌলবি মিলে তার ক্ষত-বিক্ষত দেহটা সাদা ধবধবে তিন টুকরো কাপড়ে মুড়ল। মৌলবিরা জানে না জয় বেঁচে থাকলে ওই মৌলবিদের জানের ঝুঁকি ছিল। অন্তূ দেখল আমজাদ সাহেবের শেষ গোসলের দৃশ্য। এবার সে কেঁদে উঠল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, এবার শেষবারের মতো সে হারালো, আজ গিয়ে সে চির একলা হলো, আজ সে এমন এক নারী হলো যার আগে-পিছে শুধু। আজ সে ফ্রন্টইয়ার্ডের গোল পিলারের সাথে হেলান দিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকা দর্শক। নাকে ভুরভুর করে ঢুকছে কর্পূর, গোলাপজল, সুরমার গন্ধ! সেই গন্ধের সাথে আমজাদ সাহেবের শরীরের গন্ধ মিশে একাকার! অন্তূ আবেশে চোখ বুজে নিলো। অনুমতি-সাপেক্ষে বন্দি হামজাকে আনা হলো আমির নিবাসে। দুপুরের গড়িয়েছে তখন। গুড়োবৃষ্টি ঝরছে, গায়ে না লাগার মতো। কিন্তু আকাশে ঘন কালো কুটকুটে মেঘ। আকাশের দুঃখ কমছে না। হামজা পুলিশভ্যান থেকে নেমে বিভ্রান্ত হলো। এত লোক আর আমির নিবাস! পা জমে গেল মাটিতে। তবু সেই ভারী পা টেনে হামজা জয়ের সামনে পৌঁছাল, কিন্তু আর শরীর ভর রাখতে পারল না, পড়ে গেল মাটিতে। জয় শুয়ে আছে খাটিয়ায়। নাকে দুটো তুলো গোজা। কী আশ্চর্য স্বপ্ন! তুলোদুটো লাল হয়েছে। হামজা আস্তে কোরে সেই দুটো খুলে নিলো। কী বিশ্রী লাগছে তুলো নাকে। শ্বাস নিতে দেবে না নাকি এই মৌলবিরা? নাক দিয়ে নালির মতো সরু ধারায় রক্ত আসছে। হামজা মনোযোগ মেলে দেখে সেই রক্তের ধারা। কী শাস্ত সেই ধারা, গাঢ় লাল-খয়েরী রক্তের বর্ণ! ধীরে ধীরে জয়ের দাড়ি ও গাল চুইয়ে থুতনি ছুঁচ্ছে। হামজা তাই তার অবশ হাতখানা এগিয়ে রক্তগুলো আঙুলের ডগায় মুছে নেয়। জয়ের কী হয়েছে সে বুঝতে পারছে না। বোঝার জন্য সে আস্তে আস্তে জয়ের বুকের ওপরের কাফন সরালো। কী বিশ্রী দেখতে দুটো জখম, আরেকটু নিচে নামলে হামজা আরেকটা দেখতে পেত। হামজার হাতদুটো তড়িতাহত রোগীর মতো ঝিরঝির করে কাঁপে। সে ঝুঁকে ছিল জয়ের মুখের ওপর, আর সামান্য ঝুঁকে কপালে একটা চুমু খেল। জয়কে একটু বুঝিয়ে বলা দরকার, নয়ত বুঝবে না জয়, খুব অবাধ্য সে। সে তার কম্পিত শক্ত হাতদুটো দিয়ে জয়ের মুখটা আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। নেড়েচেড়ে দেখে জয়ের ঠান্ডা হয়ে মুখটা। -“শোন জয়! তোকে বলা হয়নি। আমার শরীরটা ভালো না। খুব শিগগির প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছি আমি। তুই শুনে কষ্ট পাস না। এজন্যই চেয়েছিলাম তুই চলে যা, তারপর আমি যাব। একসাথে চিকিৎসা আর নিরাপত্তা দুইটাই নিশ্চিত হবে। আমার আজকাল রাতে ভুলভাল স্বপ্ন আসে। আজও আসছে। আমি দেখছি তুই পালাসনি। যে আমির নিবাসের শিকারী ভিটে থেকে তোকে আঠারো বছর ধরে দূরে রেখেছি, তুই বরং আমার অবাধ্য হয়ে সেখানে গেছিস। তারপর তো জানিস ওখানে কী কী হয়। এসব স্বপ্নের কোনো মানে নেই, আমি জানি।ʼʼ আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামল, হামজা থামল, থমকালো। জয় শুয়ে আছে। বিকেল হয়ে আসছে। আজকের ঘুমটা কেমন জয়ের? সে চোখের সবটুকু তৃষ্ণা মিটিয়ে জয়কে দেখল। তার ঘোলা চোখে জয়ের দাড়ি-গোফের জোয়ান মুখটা ঝাপসা হয়ে আসে। সে দেখে একটি কিশোরকে। হুমায়িরার ছেলে। বয়স দশ। যার পেট ভরানোর জন্য হামজার দু'মুঠো খাবার জোগাড় করা খুব জরুরী। জয়কে একটা স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। আমির নিবাস থেকে দূরে রাখতে হবে। হামজাকে ছুটতে হবে, খুব ছুটতে হবে। এই দিন দূর করতে হবে, প্রতিশোধ নিতে হবে। জয়কে সাথে নিয়ে অনেকখানি ছুটতে হবে। হামজা ডেকে উঠল, “জয়! শোন আমার কথা। একটাবার শোন। আমি তোর সব কথা মেনে নেব। তোর সন্তানকে মেরেছি না? তুই চাইলে আমি শরীরের ততখানি মাংস কেটে নিবি, শোধ যাবে। নাকি তবু হবে না? কী চাস তাহলে? রক্ত চাস? দেব। তাকা তুই। একটু হাস, ভাই বলে ডাক। আমি সত্যি মরে যাব। আমি অসুস্থ, বুঝলি! এক্সিডেন্টটা সিরিয়াস মামলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পাইনাল কর্ডে ঠাপ খেয়েছি। বেশিদিন বাঁচব না মনেহয়। তোকেই তো সব সামলাতে হবে তারপর। বুঝে নিতে হবে এখন থেকেই সব। আমি মরলে তুই কাঁদিস না। আমি তোর সন্তান মেরেছি। ওইজন্যই তো বলছি, তুই কিন্তু পুরোনো হামজাকে পাসনি, জয়। আজ আমার ভেতরে এক তিল পরিমাণ শক্তি নেই। তবে আমার মনেহয় এত বড় পাপ আমি আমি করিনি যার শাস্তি হিসেবে আমি তোকে এভাবে দেখব। আমার হাতে গড়া তুই। আমার সামনে দিয়ে চলে যাবি কী রে! আমার অধিকার নাই? এই তোর যে বুকে গুলি চলেছে, ওই বুক প্রসস্থ করতে আমার বুক ক্ষয় গেছে। এত সহজ নাকি, হ্যাঁ? ওই যে রক্ত ওখানে দলা ধরে পড়ে আছে, ওই রক্ত কার? এই ভিটা আর রক্তের সাথে তোর লেনদেন কবে চুকে গেছে। ওই রক্ত আমার। তোর রক্ত-মাংস সব আমার দান। সেই রক্ত তোর এই নেমোকহারাম ভিটায় বিসর্জন যাবে, আমি মেনে নেব না। ওঠ, কোর্টের তারিখ আছে সামনে। এবার পালানো হলো না। কিছুদিন জেল খাটা লাগবে এবার। চল, ওঠ।ʼʼ হামজা আচমকা তীরবিদ্ধ পশুর মতো গর্জন করে উঠল, “ওঠ শুয়োরের বাচ্চা। বেইমানের বাচ্চা। জীবন দিলাম আমি, পালন করলাম আমি, সেই জান তুই হেলায় দান করছিস বাপের ভিটায়? জানোয়ারের বাচ্চা তোর বাপের ভিটার অধিকার আছে তোর ওপর? তোকে মানা করিনি এখানে আসবি না? তোকে দেড় যুগ ভুলিয়ে রাখলাম, শিখালাম এই ভিটা তোর না, তোর না, তোর না। তোর কাল আছে, তোর মরণ আছে এখানে। তুই আমার অবাধ্য হলি কীতআ থআমআকরে? তোকে আটকাতে পারলাম না আমি। পাসপোর্ট কোথায়, হারামজাদা? কেন এসেছিস এখানে? জবাব দে, তাকা জয়। কেন এসেছিস? কথা বল, কথা বল, কথা বল...ʼʼ হামজার দম আটকে এলো। সে একটু শ্বাসের আশায় আকাশের দিকে তাকায়। আহত জানোয়ারের মতো ভোঁতা গোঙানি বের হয় গলা দিয়ে। সে কাঁদতে জানে না। অথচ চোখ আজ পাগল হয়েছে তার। বুকের মাঝখানে দুটো আঙুল গেড়ে বারবার ঘষতে লাগল। বৃষ্টিটা তার উপকারে এলো। বৃষ্টির পানির সাথে ঝুপুঝপ করে যে কত ফোটা নোনাজলও জয়ের মুখের ওপর পড়ল, জনগণ টের পেল না। মাটি খামচে ধরে খাটিয়ার পাশে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে রইল ক্ষণকাল। কোন উপায়ে সে বিশ্বাস করবে কথাটা? এসব মিথ্যা আয়োজন কখনোই যথেষ্ট নয় তাকে বিশ্বাস করাতে যে জয় নেই...জয় নেই মানে কী? বাক্যটাই বেমামান। না আর ভাবা যাচ্ছে না। আশ্চর্যজনকভাবে তার গোটা শরীরে মুহুর্তের মধ্যে খিঁচুনি উঠে গেল। ডাক্তাররা বলবে এটা হলো সাইকোজেনিক নন-এপিলেপটিক সেইজ্যর্স। সে দুই হাতে ঘাস খামচে ধরে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে গেল কিছুক্ষণ। আবার পালা এলো জয়কে ডাকাডাকির। এক্ষুনি উঠবে জয়। কবীর এসে পাশে বসে, কবীবের শরীর থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। বদ্ধ উন্মাদের মতো দেখতে লাগে তাকে। সে হামজাকে সামলানোর অবস্থায় নেই। কবীর ঘাসের ওপর উদ্ভ্রান্তের মতো বসে থাকে। সে বিশ্বাস করার চেষ্টায় আছে, জয় ভাই নেই। নেই মানে কী? কোথায় গেছে? যায়নি, যাবে। সেই মৃতের খাটিয়া থেকে জয়কে দুইহাতে বাহুতে আঁকড়ে বুকের সাথে আষ্ঠেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো। পারলে এই মুহুর্তে বুকের ভেতরে লুকিয়ে ফেলা উচিত জয়কে। কারণ মৌলবিরা হিংসুক নজরে দেখছে, নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছে জয়কে। সে জয়কে বুকের সাথে চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আহত জানোয়ারের মতো এক আর্তনাদ করে উঠল, যে চিৎকার উপস্থিত জনতার পশম শিউরে তোলে। কতক্ষণ ওভাবে বুকের সাথে মিশিয়ে চেপে ধরে রইল বলা যায় না। জয়ের নাক দিয়ে রক্ত আসছে, সেই রক্তে হামজার দেহ মেখে উঠল। আস্তে আস্তে হামজার শরীরের প্রতিটা কোষ শিথিল হয়ে এলো। খিঁচুনি ভয়াবহ রূপ নিলো। জয়কে ছাড়িয়ে নেয়া তবু মুশকিল তার কাছ থেকে। কিন্তু তার হাতের স্নায়ুকোষ কথা শুনল না। দেহটা মাটির ওপর গলাকাটা মুরগীর মতো ছটফট করে লাফাতে লাগল। তুলির মেয়েটা কাঁদল এবার। মামা কাঁদছে, জয় শুয়ে আছে। এতক্ষণ ধরে কাঁদল, জয় উঠল না। তার মানে গুরুতর ব্যাপার। সে গিয়ে তার কচি কচি ছোট ছোট হাত জয়ের মুখে বুলিয়ে দিলো। রক্ত লেগে গেল তার কচি হাতেও। সে ফুপাতে ফুপাতে ডাকে, “জয়! ওথো না কেন? মামা দাকছে যে। ওথো জয়। আমরা দেখো নতুন একতা দায়গায় এছেছি। একতু ঘুরতে নিয়ে দাবে কি? ওথো না, জয়...তুমি শুয়ে থেকো পরে বাছায় গিয়ে। এখুন ওথো।ʼʼ তুলি সরিয়ে নিলো। তাতে কান্নার বেগ বাড়ল কোয়েলের। সে যাবে না জয়ের কাছ থেকে। কী বুঝল সে কে জানে। সে যেন বুঝতে পেরেছে, তারা দূরে গেলেই জয়কে সরিয়ে নেয়া হবে। অন্তূর হাঁটতে সমস্যা। তার জননদ্বার তখনও লাল তরলে সিক্ত, যেমনটা জয় আমিরের বুক। কয়েকজন স্থানীয় মহিলা জয়ের বউকে ধরে এনে খাটিয়ার পাশে বসায়। অন্তূও ঠিক হামজার মতো একইভাবে কেবল চোখ ভরে দেখে জয়কে। কিছু বলার নেই তাদের। শুধু বিশ্বাস করার হিসেব মেলানোর আছে, কী ঘটে গেছে! একজন জানের সঙ্গী, আরেকজন জানের দুশমন, অথচ দুজনের কাছে জয় সবচেয়ে জটিল বন্ধনে বাঁধা। অন্তূর হাতের মুঠোয় তখন জয়ের ব্যবহৃত গলার শিকল আকৃতির লকেটওয়ালা চেইন, ব্ল্যাক টাংস্টেনের আংটি, রূপার রিস্টলেট। সেসব জয়ের দেহ থেকে খুলে নিয়ে তার স্ত্রীর হাতে দেয়া হয়েছে। সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ওগুলোকে অনুভব করে। কঠিন ধাতব জিনিসগুলোতে জয় জয় রব। অন্তূ জয়ের ওপর ঝুঁকে বসে। অন্তূকে অবাক করে টুপ করে এক ফোটা চোখের পানি জয়ের গালের ওপর পড়ে। অন্তূ বিস্ময়ে পড়ে, “যেদিন আব্বুকে এভাবে দেখেছি, সেদিন মনে হয়েছিল আপনাকে এভাবে দেখলে আমি হাসব। অথচ হাসছি না আমি। আজ খুশির দিন হবার ছিল আমার, খুশি নই আমি। আমার হিংসে হচ্ছে আপনার ওপর। আজ আজাদ হলেন আপনি। কয়েদী আমি হলাম। আমার আসামী মুক্ত হয়ে গেল। আমার-তার লড়াই ফুরিয়ে গেল। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। আপনি দেখবেন না আমার কান্না? আমার বুক ভেঙেচুড়ে কান্না পাচ্ছে। এই জীবন খুব ভার হবে। আমার কাঁধে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে....সব দায় আপনার, জয় আমির।ʼʼ ঝুপঝুপ করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অন্তূ কথাগুলো বলে। তার কণ্ঠস্বর কী যে সুন্দর শুনতে লাগে— “আখিরাতে দেখা হলে এই বিরোধের খাতা আমি আবার খুলব। ততদিন মুলতুবী রইল।ʼʼ অন্তূ ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বসেই রইল। একসময় তাদের পাশ কাটিয়ে একদল খাটিয়া তুলে নিয়ে চলে যায়। জয় আমির নিজের পরিচয়, ভিটে-মাটি ও পেছনে একজন হামজাকে মাটিতে ছটফট করা অবস্থায় ফেলে দিব্যি চার পায়া খাটিয়ায় চড়ে কোথাও চলেছে। তার পাপ তার আগে আগে পা বাড়িয়েছে। সেটা অদৃশ্য বলে দেখা গেল না। মালিকের কাছে পাপের হিসেব আজ সবকিছুর আগে। সেখানে মায়া থাকবে না, স্মৃতি অথবা মানবিকতা নয়, থাকবে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার ও হিসেবের খাতা। প্রতিটা পাপ-পূণ্যের হিসেব দিতে জয় আমির ঘটা করে এগিয়ে গেল অনন্তে... যাযাবর জীবনযাপনকারী পাপীষ্ঠ জয় আমিরের স্থায়ী ঠিকানা হলো এতদিনে। তার ঠিকানা হলো পূর্বপুরুষদের পুরোনো গোরস্থান। ঘোড়াহাটের কেন্দ্রীয় কবরস্থান। এই ঠিকানায় দাখিল হবার পর হয়ত আজ জয় আমির কথা বললে কেবল গলা ছেড়ে বলতো, গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া, দরজা-জানলা কিছু নাই.... চলবে...