কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-১২+১৩

0
23

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

১২.

হাশিম তখন মাত্র ঘরে এসেছে।তার মাথা ঝিমঝিম করছে।আজ আপাতত সে রাত জাগছে না।তার ঘুম প্রয়োজন।হাতের ব্যাথাটাও পুরোপুরি কমেনি।এখনো কেমন চিনচিন করছে।

সে খাটে গিয়ে বসতেই দরজায় পর পর দুইবার কড়াঘাত হলো,তাও আবার ভীষণ উচ্চশব্দে।হাশিম হকচকিয়ে উঠল।কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অন্যপাশ থেকে একটা গম্ভীর স্বর ভেসে এলো-‘হাশিম! দরজা খোল।’

সে কিছুটা আঁতকে উঠে।ঢোক গিলে বলে,’ভাইজান! তুমি?’

‘দরজা খোল হাশিম।’
এবার কন্ঠ আগের তুলনায় আরো বেশি জোরালো হলো।হাশিম অজানা আতঙ্কে আড়ষ্ট হলো।কাঁপা স্বরে বলল,’আসছি ভাইজান।’

সে কপালের চিকন ঘাম মুছে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।দরজা খুলতেই অভির ধাঁরালো চাহনিতে সে আরো বেশি মিইয়ে গেল,আপনাআপনি পিছিয়ে এলো দুই কদম।অভি একবার তার মুখ দেখেই তারপর তার বাম হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিলো।

হাশিম ধড়ফড় করে উঠলো।অভি খুব মনোযোগ দিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে তার আঙুল দেখলো।ছুরি বসানো দাগ।কোনো ভুল নেই।অরুনিমার কথায় কোনো ভুল নেই।

সে আরো একবার হাত টা দেখেই আচমকা হাশিমের নাক বরাবর ঘুষি বসালো।হাশিম ছিটকে মেঝেতে গিয়ে পড়লো।সে চোখ তোলার আগেই অভি ছুটে গিয়ে তাকে আরেকদফা প্রহার করল।দাঁত খিঁচে বলল,’কু/ত্তা! তুই সেদিন এহতেশামের ঘরে গিয়েছিলি?’

অরুনিমা দৌড়ে দৌড়ে তার ঘরের সামনে এলো।তার শ্বাস উঠে গেছে।অভি বলেছিল সে মেজাজ ঠান্ডা রাখবে।অথচ অরুনিমা কথাটা বলার পরেই সে পাগলা ষাঁড়ের মতোন ছুটতে ছুটতে এখানে এসেছে।

সে দরজার ধাঁরে দাঁড়িয়ে মুখে হাত চাপলো।হাশিম ব্যাথাতুর স্বরে বলল,’ভাইজান! পুরো কথা তো শুনবে।’

অভি ক্ষেপাটে সুরে বলল,’তোর কথা কেন শুনবো?তুই আমার নাম খারাপ করতে ঐ এহতেশামের ঘরে গিয়েছিস।বল কেন এই কাজ করেছিস?’

তার কন্ঠ শুনেই অরু আতঙ্কিত হয়ে ঢোক গিলল।সে যেভাবে চেঁচাচ্ছে,একটু পরেই পুরো বাড়ি ঘরের সামনে এসে জড়ো হবে।হলোও তাই।মিনিট দুয়েকের মাথায় পুরো বাড়ির মানুষ হাশিমের ঘরের সামনে এসে জড়ো হলো।হাশিম একবার চিৎকার দিয়ে বলল,’ভাইজান! আমি এসবের কিচ্ছু জানি না।তুমি ছাড়ো আমায়।’

অভি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,’মিথ্যা বলবি না একদম।আমি জানি এই কাটা দাগ কিসের।আমি আঘাত চিনি।’

হাশিমের তখন নাক ফেটে র/ক্ত বের হচ্ছিল।রিজোয়ানা ছেলের এই অবস্থা দেখেই হতভম্ব হয়ে গেলেন।এক প্রকার ছুটতে ছুটতে তার কাছে গিয়ে একটানে তাকে অভির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলেন।হাশিমের মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরে উঁচু স্বরে বললেন,’কি সমস্যা তোমার?আমার ছেলেকে এভাবে মারছো কেন?’

অভি কটমট করে তার দিকে তাকায়।তারপরই হাশিমের বাম হাত উঁচিয়ে ধরে বলে,’এই দেখো।তোমার ছেলে সেদিন এহতেশামের ঘরে গিয়েছে।আর দোষ দিয়েছে আমার।দেখো।চাচাজান।এই দেখেন।আপনার ছেলের হাত দেখেন।’

রিজোয়ানা বোকা বোকা চোখে তার ছেলের হাত দেখলো।হাশিমের তখন মাথা নামানো।অভি ছুটে গিয়ে তার কলায় টেনে বলল,’সমস্যা কি তোর?কেন গিয়েছিলি এহতেশামের ঘরে?বল আমাকে।’

হাশিম মাথা নামিয়ে আগের মতো করে বলল,’আমি যাইনি।আর কতোবার বলবো তোমায়?’

‘তুই গিয়েছিস।’

অভি ধৈর্যহারা হলো।আরো একবার হাত উঁচু করে হাশিমকে থাবা বসানোর আগেই রিজোয়ানা শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল।দু’জনের চোখ মিলতেই অভি কটমট করে উঠলো।রিজোয়ানার দুই চোখে তখন কঠোরতা এসে ভীড় করেছে।সে কড়া গলায় বলল,’আমার ছেলে যে বলছে তার কোনো দোষ নেই,সেই কথা কি তোমার কানে যাচ্ছে না?’

অভি গর্জন তুলে বলল,’তাহলে তার হাত এভাবে কেটেছে কিভাবে?উত্তর দিতে বলো।’

রিজোয়ানা দুই চোখে আগুন ঝরিয়ে উত্তর দিলেন,’ফল কাটতে গিয়ে হাত কেটেছে তার।আমি নিজে দেখেছি সবটা।সেদিন বিকেলে ফল কাটার সময় তার হাত কেটেছে।’

অভি কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়।তার চোখের দৃষ্টি তখনও ধাঁরালো।রিজোয়ানা কঠিন গলায় বললেন,’তুমি কিছু না জেনে আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছো কোন সাহসে?কোনো প্রমাণ ছাড়া তুমি আমার ছেলেকে কি বুঝে প্রহার করো অভি?তোমার এসব মাস্তানগিরি অন্য কোথাও গিয়ে করবে বলে দিলাম।’

অভি দমলো না।কিন্তু কিছুটা অস্থির হলো বটে।রিজোয়ানার থেকে চোখ সরিয়ে সে একবার আনমনে সমস্ত ঘরের মানুষদের দেখল।হুসেইন সাহেব কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাদের তিনজনকে দেখছিলেন।রিজোয়ানার সাথে তার দৃষ্টি মিলতেই রিজোয়ানা তেঁতে উঠা কন্ঠে বললেন,’আরো বের করেন একে জেল থেকে।তাকে আমরা জামিন এনে দিবো,আর সে বিনিময়ে আমাদের গায়ে হাত তুলবে,আমাদের সাথে অসভ্যতা করবে।’

অভি চোয়াল শক্ত করে তার কথা শুনে।অথচ বুকের ভেতর তখন তার দারুণ উথাল-পাথাল চলছে।মনে হচ্ছিল ভেতরটা কেমন ভীষণভাবে পোড়াচ্ছে।সে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সামনে তাকায়।রিজোয়ানা তার তর্জনী আঙুল অভির দিকে তাক করে হুশিয়ারী দিয়ে বললেন,’খবরদার! এরপর থেকে আমার ছেলের দিকে হাত তুললে আমি তোমার হাত ভেঙে দিবো।তুমি কি মনে করেছো?তোমার এসব সন্ত্রাসী কাজকর্মে আমরা ভয় পেয়ে যাবো?তুমি এভাবে আমাদের জিম্মি করবে?না অভি।আমরা তোমাকে ভয় পাই না।এই কথাটা মাথায় রাখবে।’

অভি তার কথা কতোটুকু শুনলো বোঝা গেল না।তার চোখ ছিলো রিজোয়ানার আঙুলের দিকে।রিজোয়ানার কথা শেষ হতেই সে খপ করে তার আঙুল চেপে ধরল।তারপর সেটা ভাঁজ করে রিজোয়ানার হাত নামিয়ে দিয়ে পুরু স্বরে বলল,’খবরদার! আমার দিকে আঙুল তুলবে না।আঙুল কে/টে রেখে দিবো।’

রিজোয়ানা বাকরুদ্ধ হলেন ক্ষণিকের জন্য।তারপরই একটা শ্বাস ছেড়ে ঠেস মে/রে বললেন,’তুমি তো এমন করবেই।সন্ত্রাসীর ছেলে তো সন্ত্রাসীই হবে।ভালো মানুষ তো আর হবে না।’

অভির মনে হলো তার সমস্ত শরীরে কেউ কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।প্রচন্ড উত্তাপে তার শরীর ঝ/লসে যাচ্ছিল।সে রক্তিম চোখে এক পলক রিজোয়ানা কে দেখেই হিংস্র শ্বাপদের ন্যায় চেঁচিয়ে উঠল,’একেবারে জানে মে/রে ফেলব যদি আমার বাবা কে নিয়ে কোনো কথা বলেছো তো।তোমার কি যোগ্যতা আছে আমার বাবা কে নিয়ে কথা বলার?একদম জ/বা/ই করে দিবো সব ক’টাকে।’

‘সে তো করবেই।তোমাদের তো খু/নের হাত খুব ভালো।’

হুসেইন সাহেব ধ’মকে উঠলেন,’চুপ করো রিজোয়ানা।মাথা ঠিক আছে তোমার?কাকে কি বলছো তুমি?’

তিনি এগিয়ে গিয়ে অভির কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।একেবারে কোমল গলায়,’অভি! শান্ত হও বাবা।তোমার চাচি হুশে নাই।তুমি দয়া করে আর কথা বাড়িয়ো না।আমি তোমার কাছে অনুরোধ করছি।’

অভি চোখ মুখ শক্ত করে তার দিকে তাকায়।রাগে তার সমস্ত শরীর পু/ড়ে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে কেউ জোর করে শরীরে কলঙ্ক মেখে দিয়েছে।সে টেনে টেনে কয়েকদফা শ্বাস নেয়।তারপরই হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

অরু একটা কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা তামাশা দেখে।রিজোয়ানা তাকে দেখতেই ফুঁসে উঠলেন।কড়া গলায় চেঁচালেন,’অভির কানে এসব কথা তুমি ঢেলেছো তাই না?বিয়ের দুই দিন যেতে না যেতেই তুমি সংসারে অশান্তি করা শুরু করে দিয়েছো?’

অরু কেবল ফ্যালফ্যাল চোখে তার কথা শুনে।সে কখন অশান্তি করলো?সে যা দেখেছে তাই তো বলল।তার মন খারাপ হলো হুট করে।হামাদ পাগল টাকে সে আর কোনোদিন কিচ্ছুটি বলবে না।সে একটা অধৈর্য আর মাথা খারাপ লোক।তার সাথে নিমাইয়ের তুলনা দিলে নিমাইকে অপমান করা হবে।
.
.
.
.
নিরুপমার রান্না শেষ করতে করতে দুপুর একটা বাজলো।সে রান্না শেষে আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।নিহাদ তখন ঘুমে।কাল রাতে সে তিনটার দিকে ঘুমিয়েছে।সকালে উঠে কিছুক্ষণ সজাগ ছিলো।তারপর আবার ঘুম।

সে গিয়ে মনোয়ারা বেগমের ঘরে উঁকি দেয়।গতকাল থেকে তার শরীর খারাপ।বাড়ির সব কাজ নিরু একা হাতে সামলাচ্ছে।সে গিয়ে মনোয়ারার শিয়রে বসলো।তার মাথায় একটা হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল,’মা! তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে?’

মনোয়ারা চোখ মেললেন।অস্ফুটস্বরে বললেন,’না।কিন্তু হাত পা কেমন ব্যাথা করছে নিরু।’

‘আমি হাত পা টিপে দিবো মা?’

মনোয়ারা নিভু স্বরে বললেন,’দে।’

নিরুপমা আধঘন্টার মতো তার হাত পা টিপে দেয়।তারপর ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে নিজের ঘরে আসে।নিজের ঘরে এসেই সে আস্তে করে দরজা বন্ধ করে।তারপর আলমারির নিচের তাক থেকে একটা বই খুব যত্ন করে বের করে আনে।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি বাই আর.পি বার্টসন।রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই।প্রায় দুই মাস পর নিরু হাতে নিয়েছে।এর আগে নিয়েছিলো মা আর অরু যেদিন নানুবাড়ি গিয়েছিলো সেদিন।

একেবারে নিঃশব্দে বইয়ের পাল্টা উল্টায় সে।পাতা উল্টানোর খচখচ শব্দ কানে গেলে মা টের পেয়ে যাবে।টের পেলে আরেক এলাহি কান্ড বাঁধবে।

নিরুপমা চোখ মেলে বইয়ের পাতা দেখে।সে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি।প্রথম বর্ষের পড়া শেষ হতেই মা তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল।তারপর নিরুপমা আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি।অথচ পড়াশোনার প্রতি তার ছিলো তীব্র অনুরাগ।বিবাহিত জীবনে পদার্পণের পর নিরু আর বই ছুঁয়ে দেখেনি।তালাক হয়েছে পরে একবার মায়ের কাছে পুনরায় গ্রেজুয়েনের কথা তুলেছিল।মা তাকে খুব করে শাসালেন।বললেন,’ডিভোর্সি মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়াশোনা করবে।এই কথা বাইরে গেলে মানসম্মান কিছু থাকবে?এক বাচ্চার মা হয়ে তুই আবার পড়াশোনা করবি নিরু?মাথাটা কি পুরোপুরি গেলো নাকি?’

নিরুপমা এরপর থেকে আর পড়াশোনা করার আবদার তুলে নি।অথচ প্রথম বর্ষে কেনা বইগুলো সে আর ফেলে দেয় নি।খুব যত্নে,মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে সেগুলো নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।তার খুব ইচ্ছে,নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা।আবার নতুন করে সবটা গোছানো।

নিরুপমার চোখ ঝাপসা হয়,সেই সাথে এলোমেলো হয় দৃষ্টি।সে নতুন করে সবটা শুরু করতে চায়।আরো একবার নতুন করে প্রাণভরে বাঁচতে চায়।জীবনে যা চলে গেছে সেটা ভুলে নতুন করে জীবনে এগিয়ে যেতে চায়।অথচ যতোবার নিরু আলোর দিকে পা বাড়াতে চেয়েছে,ততোবার সমাজের লোহার শিকল তার পা জোড়া শক্ত করে ভূমির সাথে বেঁধে দিয়েছে।নিরু সেই পা নিয়ে এগোতে পারে না।রাহাত তাকে তালাক দেওয়ার পর সে আর নতুন করে বাঁচতে পারে নি।কেউ তাকে বাঁচতে শেখায় নি।রাহাত তাকে যেই জায়গায় রেখে তালাক দিয়েছিলো,নিরুপমা রহমান বছরের পর বছর সেই জায়গাতেই পড়ে রইল।সমাজের তথাকথিত শেকল ভেঙে নিরুপমার আর সামনের দিকে পদক্ষেপ ফেলা হয়নি।

নিরুপমা মনোযোগ দিয়ে বইয়ের পাতা দেখে।তার দু’চোখ তখনও অসম্ভবের স্বপ্নে বিভোর।সে স্বপ্ন দেখে একদিন সে পড়বে।খুব বড়ো হবে জীবনে।তারপর রাহাতের সাথে তার হুট করেই একদিন দেখা হবে।তখন নিরু বুক ফুলিয়ে বলবে,’তুমি কি ভেবেছিলে?তুমি ফেলে দিলে আমি পচে যাবো?এই দেখো,আমি পচি নি।আমি খুব বড়ো মানুষ হয়েছি।তোমার টাকায় চলতাম বলে তুমি আমায় কতো খোঁটা দিয়েছো।এই দেখো,এখন আমি নিজেও কামাই করি।’

নিরুপমার দুই চোখ চিকচিক করে উঠে।অসম্ভব জেনেও স্বপ্ন দেখতে তার ভালো লাগে।সে জানে,সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে পুনরায় স্নাতক অর্জন তার পক্ষে সম্ভব না।তবুও নিরুপমা স্বপ্ন দেখে,অনেক অনেক বড়ো হওয়ার স্বপ্ন।রাহাত তাকে কথায় কথায় অপমান করতো।নিরুপমার মন চায় সেই অপমানের সবটুকু তাকে ফিরিয়ে দিতে।সে প্রতিহিংসা পরায়ণ না।সে রাহাতের ক্ষতি চায় না।রাহাত ভালো থাকুক।তার কি?
সে শুধু রাহাত কে প্রমাণ করে দিতে চায়,যেই মেয়েটিকে সে পচা ডোবার পতঙ্গ বলে সারাজীবন উপহাস করেছে,সেই মেয়েটা আদতে কোনো কীট না।সে সুনাগরিক,সে একটা পরিপূর্ণ মানুষ।সে চাইলেই জীবনে কিছু করে দেখাতে পারে।তার যোগ্যতা আছে নিজের পরিচয়ে বাঁচার।

নিরুপমা শক্ত করে বইটা বুকের সাথে চেপে ধরে।ইশশ! মা যদি একটিবার তাকে অনুমতি দিতো! তবে নিরু খুব মন দিয়ে পড়তো।নিরু আর কিচ্ছু চায় না।কেবল আরো একবার পড়াশোনা চালিয়ে যাবার সুযোগ চায়।সমাজের লোক নিন্দে করলে করবে।তাতে তার কি?কেবল কাছের মানুষরা তাকে ভুল না বুঝলেই হলো।
.
.
.
.
সেদিন বিকেলে সিদ্দিক রহমানের ছোট্ট বাড়িতে একজন লোক এসে দরজায় কড়া নাড়লেন।নিরুপমা মাথায় ঘোমটা চাপিয়ে দরজা খুলতেই তার মুখোমুখি হলো।

নিরু বিচলিত নয়নে তাকে দেখে।ছোট স্বরে বলে,’জ্বী আপনি কে?’

লোকটা বলল,’আমি ডাকঘর থেকে এসেছি।আপনার নাম কি নিরুপমা রহমান?’

নিরুপমা হকচকিয়ে গেল।অবাক হয়ে বলল,’জ্বী।আমিই নিরুপমা।’

লোকটা গম্ভীর মুখে বলল,’আপনার জন্য একটা চিঠি এসেছে নিরুপমা।আপনি চিঠিটা নিয়ে এখানে সই করে দিন।’

নিরুপমার দুই চোখে বিস্ময় খেলা করে।সে অবাক হয়ে শুধায়,’আমার জন্য চিঠি?’

‘জ্বী।’

সে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা হাতে নেয়।নেড়ে চেড়ে প্রাপকের ঠিকানা দেখতে চায়।অথচ সেই জায়গা টা একেবারে ফাঁকা।সে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,’কে পাঠিয়েছে?নাম লিখা নেই কেন?’

‘নাম বলা যাবে না।উপর থেকে অর্ডার আছে।’

নিরুপমা তাজ্জব হয়ে বলল,’কি অদ্ভুত! আপনি সত্যি সত্যি আমার ঠিকানায় চিঠি এনেছেন তো?আমার যতদূর মনে হয়,এতো বড়ো পদের কেউ কখনো আমাকে চিঠি পাঠাবে না।’

ডাক পিয়ন ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিলেন,’চিঠিটা আপনাকেই পাঠানো হয়েছে।আপনি তাড়াতাড়ি সই করুন।আমাকে আরো কয়েক জায়গায় চিঠি বিলি করতে হবে।’

নিরুপমা মুখ জুড়ে বিস্ময় নিয়েই রেজিস্ট্রার খাতায় সই করে।তারপর চুপচাপ দরজা বন্ধ করে ঘরে আসে।সে সত্যি সত্যি খুব আশ্চর্য হয়েছে।তাকে আবার কে চিঠি দিবে?সে তার ঘরে এসেই দুয়ার দিলো।নিহাদ তখন পাশের ঘরে,মনোয়ারা বেগমের খাটে বসে বল খেলছিলো।

***
মেটে রঙের খামের ভেতর হালকা হলুদ রঙের একটা ভাঁজ করা কাগজ।নিরুপমা কাগজ টা টান দিতেই ভেতর থেকে তিনটে কাঠগোলাপ মাটিতে ঝরে পড়লো।নিরু বিস্মিত হয়ে তিনটে গোলাপ দেখে।তারপর হাঁটু মুড়ে বসে সেগুলো হাতের মুঠোয় নেয়।

তিনটে কাঠগোলাপের অবস্থাই শোচনীয়।সপ্তাহ খানেক আগেই গাছ থেকে ঝরে গেছে।ইতোমধ্যেই কিছুটা শুকিয়ে গেছে।নিরুপমা সেই শুকনো তিনটে ফুল হাতে নিয়ে চিঠিটা খুলল।

___

নীলা,
কেমন আছেন?আমি চিঠি লিখার ক্ষেত্রে খুবই কাঁচা।আগে কখনো লিখিনি।এটাই জীবনে প্রথম।আপনাকে যে কোনোদিন চিঠি লিখবো,সেটা আমি আগে কখনো কল্পনাও করি নি।ভীষণ অস্থির হয়ে,নিজের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে এই সৈনিক আপনার কাছে তার মনের কথা ব্যক্ত করছে।

নীলা! আপনাকে যেদিন প্রথম সরাসরি দেখেছি,সেদিন আমি রাতভর ঘুমাতে পারি নি।দয়া করে জানতে চাইবেন না কেনো ঘুমাতে পারি নি,আমি এসব প্রশ্নে ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করি।
যাই হোক,এই মুহূর্তে আমি আপনার চেয়ে কয়েক শো কিলোমিটার দূরে,আর এখন সময় রাত তিনটে তিন।আমি ঘুমোচ্ছি না।পূর্ণিমার চাঁদের আলোর নিচে বসে আমি একমনে চিঠি লিখে যাচ্ছি।চিঠি লিখার কোনো বিশেষ নিয়ম আছে নাকি আমি জানি না।যদি থেকে থাকে,তবে আপনি আমার ভুল মার্জনা করবেন।

নীলা! আপনার চোখ দু’টো এতো উদাস কেন?কলেজ পড়ুয়া আপনি আর এখনের আপনির মাঝে বিশাল ফারাক।আপনি সবসময় হাসিখুশি থাকবেন নীলা।হাসিতে আপনাকে দারুণ লাগে।এইটুকু বয়সে আপনার মুখে কেন মলিনতার ছাপ পড়বে?বিষন্নতা আপনাকে মানায় না নীলা।সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি ছাড়া নিরুপমা রহমানকে আমার বরাবরই অসম্পূর্ণ মনে হয়।

আপনার প্রিয় ফুল নাকি কাঠগোলাপ?আচ্ছা নীলা,,আপনি কি সহজলভ্য কোনো ফুলকে প্রিয় বানাতে পারেন নি?আপনার এই কাঠগোলাপের খোঁজে আমায় কতোটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আপনি জানেন?আমাদের ক্যাম্পে কোনো কাঠগোলাপের গাছ নেই।এই কাঠগোলাপের খোঁজে আমাকে দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

যাক গে,সেই কথা থাকুক।যতোদিনে চিঠিখানা আপনার নিকট পৌঁছুবে,এই কাঠগোলাপ গুলো আর সতেজ অবস্থায় থাকবে না।কিন্তু আমার ধারণা,আপনি তবুও এদের যত্ন করে নিজের কাছে রাখবেন।কারণ নীলা ভালোবাসার যত্ন নিতে জানে।সবশেষে নীলা কে রাঙামাটির আর্মি ক্যাম্প হতে তিন তিনটে কাঠগোলাপের শুভেচ্ছা।যেই কাঠগোলাপ গুলো আপাতত আপনার কোমল হাতের ভাঁজে খুব যত্নে স্থান পেয়েছে।

ইতি,
নীলার অতি সাদামাটা চলনবলনের প্রেমে পড়া একজন ফৌজি

পত্র পাঠানোর সময়-রাত তিনটে তিন
পত্র পাঠানোর স্থান-“আর্মি ক্যাম্প”(রাঙামাটি)

চলবে-

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

১৩.

সকালের সূর্য উঁকি দিয়েছে অনেক আগে।জাহানারা বেগমের ঘরের পর্দা তখনো সরানো হয়নি।আবছা ঘরটার অন্ধকার ঠেলে সামান্য সূর্যকিরণ ঘরে এসেছে বটে,তবে পুরো ঘর আলোকিত করতে পারে নি।

জাহানারা সামনে তাকান।অভি তখন মাথা নামিয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলছিলো।জাহানারা করুণ কন্ঠে বললেন,’কাল রাতে তুমি আবার ঐসব ছাইপাশ খেয়েছো দাদুভাই?তোমাকে দিদান কতো অনুরোধ করছি।তুমি আমার কথা শুনলা না?’

অভি মাথা তুলল না।একটু আগে সে গোসল সেরে এসেছে।তার ভেজা চুল থেকে গড়িয়ে পড়া পানি তার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে।কাল রাতে সে অনেকদিন পর মদের বোতলে হাত দিয়েছে।আজ সকালে বিনু আর জগলুরা ধরাধরি করে তাকে বাড়িতে এনে রেখে গেছে।একটু আগেও সে উদ্ভট আচরণ করছিলো।এখন গোসল করার পর থেকে একটু স্বাভাবিক আচরণ করছে।

জাহানারা তার এই আচরণে কষ্ট পেলেন।অভি তার বড়ো আদরের।ঐসব খেলে সে অল্পতেই ম’রে যাবে।জাহানারা চান না তার কিছু হোক।অভির কিছু হলে জাহানারা বাঁচবে কেমন করে?জাহানারা এই ছেলেটাকে কতোখানি ভালোবাসে,সেটা অভি কবে বুঝবে?

জাহানারা এগিয়ে এসে তার কপালে হাত ছোঁয়ান।অভি এক ঝাড়ায় তার হাত ছাড়িয়ে নেয়।বিরক্ত হয়ে বলে,’ধরবে না দিদান।বিরক্ত লাগে একদম।’

‘এভাবে কেউ কথা কয়?মরে গেলে তখন বুঝবি দিদান কি জিনিস।’

অভি চোখ তুলল।আরো বেশি বিরক্ত হয়ে বলল,’তুমি মরছো না কেন?চারকূলের সব তো মরে সাফ হয়ে গেছে।একা একা বাঁচতে তোমার কষ্ট হয় না?’

জাহানারা মৃদু ধমকের স্বরে বললেন,’এটা কেমন কথা অভি?তুই চাস আমি মরে যাই?’

অভি ঘাড় নেড়ে বলল,’আমি তোমার কাঠের বক্স চাই।তুমি মরে গেলে আমি সেটা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।’

জাহানারা উচ্চশব্দে হেসে ফেললেন।হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল।অভি কপাল কুঁচকে বলল,’কি হলো তোমার?এমন পাগলের মতো হাসছো কেন?’

জাহানারা আরো একটু হেসে নিলেন।শেষে অভির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,’তুমি এতো অবুঝ কেন দাদুভাই?আমি মরলে তুমি শুধু আমার কাঠের বক্স নিবে?আর কিছু লাগবে না তোমার?’

অভি ভ্রু কুঁচকে বলল,’সম্পদের কথা বলছো?এই জঘন্য বাড়িতে আমি আর থাকবো না দিদান।তুমি মরে গেলে আমি শিকদার বাড়িতে পা ই দেবো না।এরা সব ক’টা কুকুরের জাত।’

জাহানারা দ্রুত তার মুখ চেপে ধরলেন।দুই দিকে মাথা নেড়ে ধমকালেন,’অভি! এসব কেমন কথা?চুপ করো তুমি।কেউ শুনলে কি মনে করবে?’

অভি গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,’মনে করুক।আমার কি?’

সে একটু থামলো।তারপর জাহানারার দিকে ঝুকে গভীর গলায় বলল,’দিদান! এরা কেউ আমাদের আপন না।এরা সব ক’টা সাপ।ফণা তুলে বসে আছে।সুযোগ দিলেই ছোবল মারবে।আমি এদের ছোবল মারতে দিবো না।’

জাহানারা তার মুখ চেপে ধরলেন আরেকবার।কিছুটা অনুনয় করে বললেন,’দোহাই দাদুভাই! এসব কথা তুমি মুখে আনবে না।’

অভি হাঁসফাঁশ করে বলল,’আমি এই বাড়িতে থাকবো না।তুমি মরে গেলে আমি জগলুদের বাড়ি চলে যাবো।’

‘আর তোর বউ?তার কি হবে?’

অভির হঠাৎ মনে পড়লো সে বিবাহিত।এই বাড়িতে তার স্ত্রী আছে।মনে পড়তেই মুখ কুঁচকে বলল,’তাকে তার বাড়ি রেখে আসবো।’

সে থামে।একটু পরেই নিজ থেকে বলে,’ঐ রিজোয়ানা আমার বাপ কে সন্ত্রাসী বলেছে।তাকে একটা চ/ড় মারতে পারলে আমি শান্তি পেতাম।’

জাহানারা কড়া গলায় বললেন,’অভি! এসব বলতে নেই।’

‘সে কেন আমার বাবা কে নিয়ে কথা বলবে?সে কে?তাকে গুনে কে?’

জাহানারা আর কথা বাড়ালেন না।তার দুই কাঁধে হাত রেখে আদুরে স্বরে বললেন,’তুমি ঐসব রাখো দাদুভাই।তুমি আমার পাশে আইসা বসো।দিদান তোমার মাথায় তেল মালিশ কইরা দেই।’

অভি নাক ছেটকায়।
‘ছিহ! ওসব তেল ফেল দিতে ভালো লাগে না।মাথা ঝিমঝিম করে আমার।’

‘আচ্ছা যাও,তেল দিবো না।দিদানের পাশে আইসা বসো।’

অনিচ্ছা স্বত্তেও অভি তার কাছে গেল।চওড়া গলায় বলল,’তোমার আহ্লাদ আমার অসহ্য লাগে দিদান।তুমি ঐ এহতেশাম কে পেলে আমায় ভুলে যাও।এহতেশাম বাড়ি এলেই তোমরা আমার সাথে কুকুর বেড়ালের মতো আচরণ করো।’

জাহানারা তাজ্জব হয়ে বললেন,’এডা তুমি কি কইলা?তোমারে ছাড়া আমি কোনোদিন খাইতে বসছি?তুমিই তো তিনটা বাজে বাড়ি ফিরো।কোনোদিন আবার ফিরো না।দিদান কি অতো রাত জাগতে পারি?’

অভি থম মেরে বসে থাকে।কতোক্ষণ সে সেভাবে বসেছিল,তার মনে নেই।অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে নড়েচড়ে উঠলো।আস্তে করে মাথাটা জাহানারার দুর্বল কোলে ফেলে কেমন অদ্ভুত স্বরে বলল,’দিদান!আমি আর এখানে থাকবো না।আমার অসহ্য লাগে সবাই কে।খোদা কেন আমাকে এখনো মারছে না?’

জাহানারার চোখ ভিজলো।অভি কানে হাত চেপে বলল,’দয়া করে থামো দিদান।তোমার ফ্যাচফ্যাচ কান্না আমার আরো বেশি বিরক্ত লাগে।’

জাহানারা বেগম নিরবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।অভি পুরোটা সময় নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল।তার মুখটা দেখলেই জাহানারা বেগমের ভেতরটা হু হু করে উঠে।তার কিছু হলে অভির কি হবে?সে তো অবুঝ।মেজাজ খারাপ হলে তার মাথা ঠিক থাকে না।সে কি বুঝে না,সে যে জাহানারার কতো প্রিয়?
.
.
.
.
নিরুপমা চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় গিয়ে বসলো।নিহাদ একটু আগে ঘুমিয়েছে।বারান্দায় খুব সুন্দর ঠান্ডা বাতাস বইছে।নিরুর এই বাতাসটা খুব ভালো লাগে।এই বাতাস তার একা একা উপভোগ করতে ভালো লাগে।সে কোমর সমান চুল ছাড়িয়ে দিয়ে একটা বেতের মোড়ায় বসল।

দখিনা বাতাসে তার চুল উড়ছে।নিরুপমা প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেয়।তারপর চায়ের কাপে চুমুক দেয়।বারান্দা থেকে সরু গলির আনাচ কানাচ দেখা যায়।সবুজদের বাড়ির জানালা দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।সবুজ পড়ার টেবিলে,কি যেন লিখছে।সবুজের ছোট্ট বোনটা দেয়ালে কলম দিয়ে যা মন চায় আঁকছে।নিরু মুচকি হাসলো।তারপর অন্যদিকে ফিরে সেদিকে তাকালো।মরিয়ম তার ছোট বোনের সাথে কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া করছিলো।নিরুপমা খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের ঝগড়া দেখে।তার হঠাৎ অরুর কথা মনে পড়ছে।ইশশ!কতোদিন দেখা হয় না তাদের!

মনোয়ারা কোনো একটা প্রয়োজনে ঘরে এসেছিলেন।ঘরে নিরুপমাকে না দেখেই তিনি বারান্দায় গেলেন।

‘নিরু!’
অত্যন্ত কঠোর কন্ঠস্বর।নিরুপমা দ্রুত পেছন ফিরে।মনোয়ারা চোখ রাঙিয়ে বললেন,’তুমি এভাবে চুল খুলে এখানে বসে আছো কেন?মানুষ তোমাকে দেখছে না?যাও ঘরে যাও।’

নিরুপমা দ্রুত মাথায় কাপড় টানে।অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনুতপ্ত হয়ে বলে,’সরি মা! খেয়াল করি নি।’

সে দ্রুত বারান্দা থেকে ভেতরে এলো।মনোয়ারা বললেন,’পাড়ার লোকে তোমায় নিয়ে কতোরকম ভালোমন্দ বলে তুমি জানো?আর তুমি এখন এভাবে চুল ছেড়ে বসে আছো?মানুষ কি বলবে নিরু?তুমি কি নিজের সম্মান বোঝো না?’

নিরুপমা থমকায়।ঠোঁট কামড়ে অনুভূতিটুকু গিলে নিয়ে বলে,’আর বারান্দায় বসবো না মা।আমার ভুল হয়েছে।মাফ করে দাও।’

‘অদ্ভুত!তুমি আমার সাথে তেজ দেখাচ্ছো!’

‘আমি কোনো তেজ দেখাইনি মা।আমি ক্ষমা চেয়েছি।ক্ষমা করো আমাকে।’

নিরুপমা তড়িঘড়ি করে গোসলখানায় ছুটে যায়।গিয়েই সে ঝরনা ছেড়ে তার নিচে এসে দাঁড়ায়।তার গায়ের কাপড় ভিজে চুপসে গিয়ে তার শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে।নিরু তার তোয়াক্কা করল না।

ঝরঝর করে ঠান্ডা পানি তার সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিলো।নিরু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে সেই পানিতে গা ভাসায়।শেষে একবার হাত তুলে চোখ মুছে।

তার কি হলো কে জানে,আচমকাই সে ধপ করে ফ্লোরে গিয়ে বসলো।তারপর চোখ তুলে উপরে তাকালো।আচ্ছা,এই পানির ধারা যেমন করে তার সমস্ত শরীর ধুয়ে দিচ্ছে,তেমন করেই কি নিরুর শরীরের দাগটুকু ধুয়ে দিতে পারে না?শরীরের এই গভীর দাগ নিরুপমা কেন তুলতে পারছে না?

সে গভীর মনোযোগ দিয়ে নিজের হাত পা দেখে।কই,কিচ্ছু তো দেখা যাচ্ছে না।নিরু তো কোনো কালির দাগ দেখতে পাচ্ছে না।সে তো তপা,শ্রাবণী,নিশি,অরুনিমাদের মতোই মানুষ।তবে মানুষ কেন তাকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করছে?

নিরু দেয়ালে ঠেস দিয়ে মাথাটা হাঁটুতে গুজে রাখল।একটা দীর্ঘশ্বাস আপনাআপনি তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো।সে আলাদা।তার শরীরটা নোংরা।এই নোংরা শরীর কখনোই নিরুকে আর দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দিবে না।নিরুপমা কলঙ্ক।নিরুপমা অপয়া।যেই অপয়ার হাত থেকে অরুর দাদি শ্বাশুড়ি পানির গ্লাসও হাতে নেয়নি।

সেদিন বিকেলে আবার একই ঘটনা ঘটলো।রাশেদ নামের লোকটা চিঠি হাতে নিরুপমাদের বাড়ির দুয়ারে এসে দাঁড়ালো।নিরুপমা তাকে দেখতেই অবাক হয়ে বলল,’আপনি?’

লোকটা তার দিকে আগের দিনের মতোই একটা চিঠি বাড়িয়ে দিলো।স্বাভাবিক গলায় বলল,’নিন আপনার চিঠি।’

নিরুপমা কপাল কুঁচকায়।
‘আমার চিঠি না।এটা নীলার চিঠি।আমি নীলা নই।’

লোকটা পুনরায় ঠিকানা দেখে বলল,’এটা আপনার ঠিকানাতেই এসেছে।প্রাপকের নাম নিরুপমা রহমানই লিখা।’

নিরুপমা বিভ্রান্তির চোখে তাকে দেখে।কি অদ্ভুত! সে তো নীলা না।তাকে কেন কেউ চিঠি দিবে?বারবার কি চিঠি ভুল ঠিকানায় আসতে পারে?

সে চুপচাপ হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নেয়।পূর্বের মতোই প্রেরক পরিচয় বিহীন একটি চিঠি।নিরুপমা চিঠি হাতে ঘরে এলো।নিহাদ খাটের উপর হাত পা ছড়িয়ে খেলা করছে।মনোয়ারা রান্নাঘরে।নিরুপমা পত্রখানা খুলল একেবারে মিশ্র অনুভূতি নিয়ে।

***
নীলা,
প্রথম পত্র পেয়ে তাজ্জব হওয়ার কিছু নেই।এমন পত্র আমি রোজই তোমায় পাঠাবো বলে ঠিক করেছি।এই সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি তোমাকে প্রথম পত্র পাঠানোর পর।এভাবে চিঠি লিখতে আমার ভালো লাগছে।চিঠি পড়ার সময় তোমার মুখে যেই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠছে,সেই প্রতিক্রিয়া কল্পনা করতে আমার ভালো লাগছে।

তুমি আমার পরিচয় জানতে চেয়ো না।আমি আপাতত নিজের পরিচয় তোমায় দিতে চাচ্ছি না।তুমি কেবল পত্রগুলো যত্নে রেখো।সেই যত্নের ভাঁজে আমি থাকবো।আমরা আর্মি পারসনরা জীবনে সবকিছুই পাই নীলা।ক্ষমতা,সম্মান,অর্থবিত্ত,পারিবারিক মর্যাদা-এক কথায় সব।শুধু যা পাই না,তা হলো যত্ন।মিলিটারি একাডেমি তে ঢুকার পর বছরের পর বছর যত্নের অভাবে কেমন যেন অনুভূতিশূন্য হয়ে যাচ্ছি নীলা।তোমায় দেখার পর আমার লোভ জেগেছে ভীষণ।একটু যত্ন,একটু ভালোবাসার লোভ আমাকে কেমন ব্যাকুল করে দিচ্ছে নীলা।

আমি ছুটিতে বাড়ি ফিরতে আগ্রহ পাই না।অথচ আমার সহযোদ্ধারা খুব আগ্রহ নিয়ে দিন গুনে।আমারও ইদানিং তাদের মতো দিন গুনতে ইচ্ছে হয়।আমিও দিন গুনতে চাই নীলা।তুমি কি আমায় সেই সুযোগ দিবে?’

তোমার জন্য রাঙামাটি থেকে এক গুচ্ছ ভালোবাসা।ভালো থেকো।আল্লাহ হাফেজ।

****

কি যে বিস্ময় নিয়ে চিঠিটা শেষ করলো নিরুপমা! শেষ হওয়ার পর কোনো এক অজানা কারণে সে আরো একবার পুরোটা চিঠি পড়লো।তার কেমন হাসি পেল।সে জানে কোনো কারণে এই চিঠি ভুল ঠিকানায় আসছে বার বার।নীলা নামের কোনো সৌভাগ্যবতীকে তার ফৌজি যত্ন করে চিঠি লিখছে।অথচ সেই চিঠি ভুল করে নিরুপমা নামের এক ডিভোর্সি মেয়ের কাছে আসছে।নিরু হতাশ হয়ে মাথা নাড়ে।নীলা পড়ার আগে চিঠিটা সে পড়ে নিচ্ছে।ব্যাপারটা একদমই ভালো না।এর একটা বিহিত করতে হবে।যে করেই হোক নীলা কে খুঁজে বের করতে হবে।এত্তো সুন্দর দু’টো পত্র তার আসল প্রাপকের কাছে যাবে না।এটা কি কখনো হতে পারে?
.
.
.
.
অরুনিমার জীবনে বিয়ের পর থেকে ভালো কিছু হয় নি।যা হয়েছে,সব খারাপই হয়েছে।হামাদ শিকদারের কাছে হাশিমের ব্যাপারটা বলার পর যেটুকু ভালো জীবনে অবশিষ্ট ছিলো।সেটাও নাই হয়ে গেছে।

রিজোয়ানা এখন তার সাথে ভালো ব্যবহার করে না।তাকে কেমন যেন তিরষ্কার করে কথা বলে।হাশিমের ঐ ব্যাপারটার পর থেকেই বাড়িতে তাকে সবাই মন্দ চোখে দেখে।অথচ অরুনিমা ভেবে পায় না তার ভুল কোথায়।সে কেবল অভিকে তার সন্দেহের কথা বলেছে।মারপিট তো করতে বলেনি?অভির কি দরকার ছিলো ঐসব করার।অভি কথা রাখেনি।অরুর তার প্রতি অনেক অনেক রাগ জমেছে।

অথচ অভির কোনো বিকার নেই।সে সেদিন রাতে বেরিয়ে গেল।তারপর মদ খেয়ে টাল হয়ে বাড়ি ফিরলো।পরদিন সকালে গোসল করে দাদির ঘরে গিয়ে বসেছিলো কতোক্ষণ।তারপর আবার বেরিয়ে গেলো।এরপর এখন পর্যন্ত সে বাড়ি ফিরেনি।অরুনিমার সাথে তারপর সে একটা কথাও বলেনি।মাঝে মাঝে অরুর কান্না পায়।মন চায় ঘর সংসার ছেড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে।এই বাড়ি,এই সংসার তার একদম ভালো লাগে না।অভি তাকে একটুও পাত্তা দেয় না।

বিকেলের পর সে একবার ছাদে গেল।অভি দশ মিনিট আগে বাড়ি এসেছে।আসার পরেই সে ছাদে উঠেছে।অরুনিমা ছাদে গিয়ে তার থেকে একটু দুরত্ব নিয়ে দাঁড়ায়।অভির হাতে তখন একটা অর্ধেক খাওয়া সিগারেট।নাকে মুখে ধোঁয়া ছেড়ে সে পাশ ফিরে।

অরুনিমা খুব মনোযোগ দিয়ে আকাশ দেখছিলো।অভি আড়চোখে একবার তার মতিগতি পরোখ করে।সেই রাতের পর দু’জনের কথা হয়নি।অভিও বলেনি।অরুনিমার সাথে বলার মতো কিছু সে খুঁজে পায় না।

অরু আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ বলল,’আমার আজ মন ভালো নেই।’
অভি সেই কথা শুনে।তারপর সিগারেটে বড়ো করে টান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।অরু অভিমানী স্বরে বলল,’তোমাকে আমি বিশ্বাস করে বলেছিলাম কথাটা।তুমি সবার সামনে ঐসব করে আমাকে সবার কাছে খারাপ করেছো।’

‘আমি কাউকে খারাপ করি নাই।আন্দাজে কথা বলবে না।’

‘যাই হোক।তুমিই আমার মন খারাপের কারণ।’

অভি দায়সারা হয়ে বলল,’খুব ভালো।’

অরুনিমার উদাস চাহনি।অন্যমনস্ক হয়ে এদিক সেদিক ছুটে যাচ্ছে।অভি হঠাৎ বলল,’আমারও মন ভালো নেই অরুনিমা।’

অরু তার দিকে ফিরে।আচমকা গাল ভর্তি হাসি দিয়ে বলে,’তাহলে চলো দু’জন মিলে আকাশ দেখি।তোমার মন খারাপ আর আমার মন খারাপ কাটাকাটি হয়ে দু’জনেরই মন ভালো হয়ে যাবে।’

এমন খাপছাড়া কথায় অভির মেজাজ বিগড়ায়।অথচ কোনো এক অজানা কারণে সে মেয়েটা কে ধমক দিতে পারলো না।অভি সত্যি সত্যিই সেদিন উঠে আসতে পারেনি।সেই রাতে অরুনিমা রহমানের পাশে বসে সে টানা দুই ঘন্টা আকাশ দেখেছিলো।

****

ডাক অফিসের সামনে এসেই নিরুপমা শাড়ির আঁচলটা আরো একবার ঠিক মতো গায়ে জড়িয়ে নিল।আজ মঙ্গলবার।নিরুপমা দুইদিন ভাবনা চিন্তা শেষে অবশেষে ডাক অফিস পর্যন্ত এসেছে।তার কাছে যেই চিঠিগুলো আছে,সেটা আসল প্রাপক পর্যন্ত পৌঁছানো খুব জরুরি।চিঠি জিনিসটা খুব আবেগের।আর তার কাছে যেই চিঠি গুলো এসেছে,সেটা স্বচ্ছ ভালোবাসায় মোড়ানো।সে নীলার কাছে তার ফৌজির নিখাঁদ ভালোবাসা টুকু যত্নসহকারে পৌঁছে দিতে চায়।

অফিসের ভেতর গিয়ে রাশেদ কে খুঁজে পেতে তার একটু সময় লাগলো।রাশেদ কে দেখতেই সে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে বলল,’একটু শুনবেন?এই চিঠি গুলো আসলে আমার না।আপনি একটু কষ্ট করে ঠিক ঠিকানায় চিঠিগুলো পৌঁছে দিবেন?’

রাশেদ তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকায়।তারপর গম্ভীর হয়ে বলে,’আমি তো ঠিক ঠিকানায় পাঠিয়েছি।যে পাঠিয়েছে,সে এই ঠিকানাতেই লিখেছে।আপনার কোনো সন্দেহ থাকলে আপনি ফিরতি চিঠিতে তাকে সেটা জানান।’

নিরুপমা অস্থির হয়ে বলল,’কিভাবে ফিরতি চিঠি দিবো?আমি তার ঠিকানা জানি না।’

রাশিদ সামনের দিকে হেঁটে যায়।যেতে যেতে শান্ত গলায় বলে,’আপনি লিখুন।আমি পাঠিয়ে দিবো সময় মতো।’

____

নিরুপমা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে ডাকঘরের সামনে ফেলে রাখা বেঞ্চ গুলোর একটি গিয়ে বসে।সে কি লিখবে বুঝতে পারছে না।একেবারে অচেনা কাউকে পত্র পাঠানো কতোটা সমীচীন হবে সে জানে না।তবুও সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ফিরতি চিঠি পাঠাবে।কারণ তার কাছে থাকা চিঠি দু’টো নীলার হাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার শান্তি নেই।

সে কোলের উপর কাগজ ফেলে কিছু একটা ভাবে।কিভাবে শুরু করবে তার মাথায় আসছে না।দুই মিনিট ভাবার পর সে কাগজে কলম চালায়-

জনাব,
আমার সালাম নিবেন।আমি জানি না আপনি কে।আপনিও জানেন না আমি কে।কিন্তু ডাক বক্সের গোলযোগের কারণে আমরা অপরিচিত হয়েও পরিচিত হয়ে উঠেছি।

আপনি আপনার নীলার জন্য দু’টো চিঠি লিখেছিলেন।কিন্তু সেই চিঠি নীলার কাছে যায়নি।নিরুপমার কাছে এসেছে।আপনার নীলার ভালো নাম কি নিরুপমা?চিঠিতে একবার লিখেছেন তো,তাই জিজ্ঞেস করা।

যাই হোক।আপনার চিঠি রোজ রোজ আমার ঠিকানায় আসছে।অথচ চিঠির কথা গুলো পড়ে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না,এগুলো আমার জন্য লিখা চিঠি।আপনি খুব যত্ন করে নীলাকে লিখেছেন।আমি চাই নীলাও ততখানি যত্ন নিয়ে চিঠি দু’টো পড়ুক।আমি নীলা নই।

চিঠি দু’টো আমার কাছে আছে।নীলার ঠিকানা জানালে আমি দায়িত্ব নিয়ে সেগুলো তার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।আপনি দয়া করে তার ঠিকানা জানালে খুশি হতাম।

অনধিকার চর্চা করে আরেকটা কথা বলি।আপনার নীলা আপনাকে কি জবাব দেয়,সেটা জানার আমার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে।আপনি আরো একবার ভুল ঠিকানায় চিঠি পাঠাবেন কেমন?নীলা কি জবাব দিলো সেটা না জানলে আমার অস্বস্তি হবে।

আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য শুভকামনা।আশা করি নীলা কখনোই আপনাকে ফিরাবে না।নীলা এবং আপনার সুন্দর জীবনের বিবরণ দিয়ে আরো একটি ভুল ঠিকানায় চিঠি চাই।আপনার নীলাকে নিরুপমার হয়ে ভালোবাসা জানাবেন।নীলা আর আপনার সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করছি।

ইতি,
নিরুপমা রহমান
১০/১১/২০০২

চলবে-