কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-২৭+২৮+২৯

0
30

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২৭.

নিরুপমা একবার আগাগোড়া মেয়েটিকে দেখল।তার শরীরের পোশাক,তার বচনভঙ্গি,তার হাঁটার ধরন,তার কন্ঠে থাকা আত্মবিশ্বাস-সব।
তাকে দেখেই নিরুপমার একদম অন্যরকম অনুভূত হলো।মেয়েরা এমনও হয়?এতো প্রাণবন্ত! এতো হাস্যোজ্জ্বল!

মেয়েটির নাম সুচিস্মিতা।একদম চমৎকার আর অন্যরকম একটি নাম।সে তার নামের মান রেখেছে।সে নিজেও হয়েছে চমৎকার আর অন্যরকম।সুচিস্মিতা চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আট দশটা মেয়ে থেকে ভীষণ আলাদা।চিন্তাধারার দিক দিয়েও,আবার আচার আচরণের দিক দিয়েও।

তার পরনে একটা চেক প্রিন্টের শার্ট।সেটার উচ্চতা হাঁটু থেকে সামান্য উঁচুতে।সাথে পরেছে গ্যাবাডিনের একটা পেন্ট।পায়ে এক জোড়া সু,শক্ত করে ফিতা বেঁধে রেখেছে।
গলায় অবশ্য একটা ওড়নাও আছে।চুলগুলো বেণী বাঁধা।তার হাত ঘড়ির ডায়ালটা ভীষণ সুন্দর।নিরুর চোখ কয়েকবার সেটার উপর আটকেছিল।

সুচিস্মিতা তাকে দেখতেই তার কাছে এগিয়ে গেল।একটা হাত তার থুতনিতে রেখে বলল,’তোমার নাম নিরুপমা তাই না?’

নিরু উপর নিচ মাথা নাড়ে।ধিমি স্বরে জিজ্ঞেস করে,’অরু বলল,তাই না?’

‘হুম।তোমার ছেলেকে আনো নি কেন আজ?’

‘ঘুম থেকে উঠেনি আজ।ঘুম ভেঙে নিয়ে আসলে খুব কান্না করতো।তাই মায়ের কাছে রেখে এসেছি।’

‘বাহ্! বেশ করেছো।’

সুচিস্মিতা নিজ থেকেই জানতে চাইলো,’তোমার বয়স কতো নিরুপমা?’

‘তেইশ।’

‘বাহ! তাহলে তো তুমি আমার চেয়েও ছোট হলে।’

নিরু প্রশ্নাত্মক চোখে তার দিকে তাকায়।সে অরু হলে এতোক্ষণে ঠাস করে মিতার কাছে একটা প্রশ্ন করে ফেলতো।কিন্তু যেহেতু সে অরু না,আর মানুষের জীবন নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন তার পছন্দ না।তাই নিরুপমা মৌন থাকলো।

সুচিস্মিতা নিজ থেকেই বলল,’আমার বয়স ছাব্বিশ।বিয়ে শাদি করি নি এখনো।’

নিরুপমা জবাবে শুধু স্মিত হাসে।একটু কেশে নিয়ে বলে,’আপনার বাড়ির মানুষ খুব ভালো মিতা আপা।’

মিতা তাকে থামালো।হুশিয়ারি দিয়ে বলল,’এই কথা ভুলেও বলবে না।আমার বাড়ির মানুষ একদমই ভালো না।’

নিরুপমা অবাক হলো।
‘কেন?’

‘আমার আসলে কোনো বাড়িই নাই রে নিরু।মা বাবা সেই কবেই সেপারেশনে চলে গেছে।আমি তারপর যাযাবরের মতো বড়ে হয়েছি।পরিবার কি সেটা আমি একদমই জানি না।’

নিরুপমা মলিন মুখে বলল,’মাফ করবেন আপা।বুঝতে পারি নি।’

‘সেকি! আমি কেন মাফ করবো?তুমি এতো ভীতু কেন বলো তো?’

নিরুপমা জবাব দেয় না।সুচিস্মিতা তার আগাগোড়া পরখ করে।গাঢ় গলায় বলে,’তুমি খুব মিষ্টি একটা মেয়ে নিরু।তুমি ভীষণ স্নিগ্ধ।তোমাকে দেখলেই আমার শান্তি লাগে।তোমরা দুই বোন হচ্ছো দু’টো ফুল।’

নিরু লাজুক হাসল।মাথা নামিয়ে বলল,’আর আপনি হচ্ছেন হাঁড়িভর্তি খেঁজুরের গুড়।এত্তো এত্তো মিষ্টি!’

সুচিস্মিতা আচমকাই বলল,’তুমি কি আর পড়াশোনা করছো না নিরু?’

নিরুপমা দুই দিকে মাথা নাড়ে।কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বলে, ‘না আপা,আর করছি না।’

‘কেন?’

আসল সত্য টা নিরুপমা গোপন করে রাখল।মুখে বলল,’তুতুন খুব ছোট তো।তাই।’

সুচিস্মিতা মাথা নাড়ে।তারপরই গম্ভীর হয়ে বলে,’পড়াশোনা চালিয়ে যাবে নিরুপমা।কখনো পড়াশোনা বন্ধ করবে না।আমাদের মেয়েদের জীবনটা খুব আলাদা জানো? আমরা ভাবি আমাদের সব আছে।কিন্তু দিন শেষে আমাদের কিছুই থাকে না।
আমাদের কোনো নিজের বাড়ি নেই নিরু।জন্মের পর বাবার বাড়ি,মাঝ বয়সে স্বামীর বাড়ি,আর বৃদ্ধ বয়সে ছেলের বাড়ি।আমি ভেবেছি আমি একটা বাড়ি বানাবো।সেটা হবে আমার বাড়ি।আমি মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়াকে প্রচন্ড উৎসাহিত করি।আমার চোখের সামনে যখন কোনো মেয়ে তার প্রতিকূলতা কাটিয়ে বুক চিতিয়ে সমাজের সামনে দাঁড়ায়,তখন আমার খুব গর্ব হয়।’

নিরুপমা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শোনে।তার বচনভঙ্গি চমৎকার।সে যখন কথা বলে,তখন যেন তার চোখ দু’টোও কথা বলে।কতো সুন্দর সে চোখের ভাষা!

সুচিস্মিতা একটু থেমে বলল,’পড়াশোনা আমাদের একটা বেসিক নিড নিরুপমা।দেখবে যখন তুমি ধীরে ধীরে উপার্জন করা শুরু করেছো,তখন সমাজে তোমার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।আমাদের গ্রহণযোগ্য বাড়ে টাকায়।যার টাকা আছে,তার কথার মূল্য,যার টাকা নেই তার কথার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি।আমাদের দেশে ব্যক্তিত্ব মাপা হয় পকেটের ওজন দিয়ে।যখন তোমার পকেট গরম হবে,তখন আর এসব মেয়ে মানুষ,রক্ষণশীল পরিবার,সমাজের কটুক্তি কোনো কিছুই তোমাকে গুটিয়ে দিতে পারবে না।আসলে আমি বেশ কিছু সময় এনজিও তে কাজ করেছি তো।তাই আমি খুব দ্রুত মানুষ চিনে যাই।আমার কেন যে মনে হলো,তোমার এই কথা গুলো শোনা প্রয়োজন।তাই শোনালাম।তুমি রাগ হওনি তো?’

নিরুপমা ভেজা চোখে হাসে।তারপর দ্রুত চোখ মুছে কৃতজ্ঞতার স্বরে বলে,’না আপা।একটুও রাগ হয়নি।আমার সত্যিই এই কথা গুলো শোনার খুব প্রয়োজন ছিলো।’

সে আটসাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।মিতা হাসিমুখে বলল,’তুমি চাইলে আমায় জড়িয়ে ধরতে পারো নিরুপমা।আমার কিন্তু শুচিবায়ু নেই।

কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান।তারপরই নিরুপমা সাগরের উত্তাল ঠেউয়ের মতো প্রবল বেগে তার প্রশস্ত বক্ষে আছড়ে পড়লো।সুচিস্মিতা গভীর মমতায় তাকে আগলে ধরে।তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে বলে,’মন খারাপ করতে নেই নিরু।জীবন কাউকে রিক্ত রাখে না।প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না।আমি প্রার্থনা করি,তোমার জীবনটা যেন খুব সুন্দয় হয়।একেবারে স্বপ্নের মতোই সুন্দর।’

নিরুপমা সেদিন সত্যি সত্যি সামান্য কেঁদেছিল।কতোকাল পর কেউ তাকে জড়িয়ে ধরল! কতোটা সময় পর কেউ তার মাথায় হাত রেখেছিল! কতো দিন পর কেউ নিরুপমার ভেতরে থাকা কষ্ট গুলো দেখার চেষ্টা করল।কতোগুলো দিন হয়ে গেল নিরু কাউকে জড়িয়ে ধরে নি।এই সহানুভূতি,এই পাশে থাকা,এই একটুখানি উৎসাহর মূল্য কতোখানি,সেটা শুধু নিরুপমাই জানে।নিরুপমা সেদিন বদ্ধ পরিকর হলো।পড়াশোনাটা সে আবার শুরু করবেই।

সেই রাতে নিরুপমার ফোনে আবারো অপরিচিত নম্বরের কল এলো।সেই নম্বর দেখেই নিরু ঢোক গিলে।প্রথমে রিসিভ করে নি।কিন্তু তৃতীয়বার রিং হতেই ভয়ে ভয়ে সেটা তুলল।তারপর আস্তে করে কানের সাথে চেপে ধরল।

‘আসসালামু আলাইকুম।কে?’

অন্য পাশ নিরব।অবিকল সেদিনের মতোই।শব্দ বলতে নিরুপমা শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকই শুনতে পেল।তার মনে হলো অপর পাশে থাকা ব্যক্তি কোনো উঁচু অবলম্বনের উপর দাঁড়িয়ে আছে।কে হতে পারে সে?নিরুপমা অধৈর্য্য হয়ে শুধায়,’দয়া করে বলুন আপনি কে?আমার খুব ভয় হয়।আপনার পরিচয় দিন।’

মুঠোফোনের অপরপ্রান্তের মানুষটা যেন নিরব থাকার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।সে কোনোরকম কথা বলল না।নিরুপমা কাঁপা স্বরে বলল,’তানজিলা?’

…..!

‘মেহেক?’

……!

‘সানা?’

টুট টুট শব্দে ফোনটা কেটে গেল।নিরুপমার আজও মনে হলো,মুঠোফোন ধরে থাকা ব্যক্তিটা রাগে পড়ে তার কল কেটেছে।কিন্তু কেন?নিরুপমা তাকে রাগানোর মতো কি করেছে?উল্টো সে নিজেই তো তাকে ফোন দিয়ে চুপ করে বসে থাকে।সে হিসেবে রাগ করার কথা নিরুর।কিন্তু রাগ করছে ঐ মানুষটা।নিরুপমা একবার ফোনের স্ক্রিন দেখে।তারপরই অন্যমনস্ক হয়ে বলে,’কি অদ্ভুত মানুষ!’
.
.
.
.
এহতেশাম আর আশিক যখন ক্যাম্পে ফিরল,তখন বিকেল ঘনিয়ে এসেছে।ক্যাম্পের ভেতরে জিপ গাড়িটা ঢোকা মাত্র একতেশাম কপাল কুঁচকালো।তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকানোর পর আশিক নিজেও কপাল কুঁচকায়।

ক্যাম্পের এখানে সেখানে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।রান্নাঘরের হাঁড়ি খুন্তি সবকিছু পাহাড়ের সবুজ ঘাসের উপর এখানে সেখানে ছড়ানো।এহতেশাম এই দৃশ্য দেখেই অস্থির হয়ে উঠল।সবার আগে মন্দ চিন্তাই তার মাথায় এলো।ক্যাম্পে কিছু হয় নি তো?সে তাড়াতাড়ি গাড়ি থামিয়ে এক লাফে সেখান থেকে নেমে এলো।

যেতে যেতে তার উৎকন্ঠা আরো বাড়লো।সামনের একটা তাবুর একপাশ বিধ্বস্ত হয়ে ধ্বসে পড়েছে।শুধু রান্নাঘরের জিনিসপত্র না,যেতে যেতে এহতেশাম ঘাসের উপর আরো অনেক টুকিটাকি জিনিস দেখতে পেল।কি অদ্ভুত! এসব কে করেছে?এই অল্প সময়ের ভেতর ক্যাম্পে কি ঘটলো?তৈমুর যে একবারো তাকে ফোন করে কিছু জানায় নি।

সে তাড়াহুড়ো করে তৈমুরের তাবুতে যায়।তার পিছু পিছু আশিকও ব্যস্ত পায়ে তাবুর ভেতর প্রবেশ করল।তারপর দু’জনই বড় বড় চোখে সামনে তাকালো।

তাবুর ভেতরে এসেই এহতেশাম হোঁচট খেল।কিছুটা অবাক হয়ে আবিষ্কার করল,তার সাত ক্যাডেট তাবুর ভেতর লাইন করে পাশাপাশি দাঁড়ানো।তাদের মুখটা অমাবস্যার রাতে মতোই আঁধার হয়ে আছে।হাত দু’টো আড়াআড়ি করে পেছনে রাখা।মুখ কাচুমাচু করে তারা চুরির আসামির মতো নিরীহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।

এহতেশাম অবাক হয়ে বলল,’এসব কি?তোমরা এভাবে দাঁড়ানো কেন?আর বাইরে এমন জিনিসপত্র পড়ে আছে কেন?কি হয়েছে?’

তৈমুর তার কথা শুনেই পেছন ফিরল।এহতেশাম ঠিক সেই মুহূর্তে খেয়াল করল,তৈমুরের হাতে একটা বেত।তৈমুর তাকে দেখতেই রাগত স্বরে বলল,’স্যার! এরা সব কয়টা গাধা।সত্যি বলছি স্যার।এদের দিয়ে কিছু হবে না।’

বলেই সে রাগে আরো কিছুটা সময় গজ গজ করল।তার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।সাথে আকাশ ছুঁয়ে নেওয়ার মতো সুবিশাল রাগ।
এহতেশাম চোখ তুলল।একেবারে ঠান্ডা গলায় বলল,’আগে বলো হয়েছে কি?’

‘স্যার! আমি পুরো পাহাড়ে টহল দিচ্ছিলাম।সাথে একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম।মেজর আবিদ সকালের নাস্তা করছিলেন তাবুতে বসে।আচমকাই শুনি ছুটোছুটি আর চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ।আমি তো ভয়ে সব কিছু ফেলে সেখানে ছুটে গেলাম।পাহাড়ের মাথা থেকে তাবু পর্যন্ত যেতে কতোটা সময় খরচা হয় ভাবুন।আবিদ স্যারও অর্ধেক খাওয়া রেখেই ছুটে এলেন।এসে কি দেখি জানেন স্যার?’

এহতেশাম ভ্রু কুঁচকে বলে,’কি?’

‘এসে দেখি এই সাতটা গর্দভ আমাদের নতুন মেস কুককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।’

এহতেশাম বিষম খেল।
‘অদ্ভুত! এরা এমনটা করবে কেন?’

‘আর কি বলবো স্যার?নতুন নতুন লোকটা এলো এদিকে।তাও আবার সেই চট্টগ্রাম থেকে।আহাদ স্যারই তাকে পাঠালেন।আর এরা তাকে রীতিমতো নাকানি চুবানি খাওয়ালো।পুরো রান্নাঘরের সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার করেছে।দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে ইয়াকুব তার টেন্টের একপাশ খসিয়ে দিয়েছে।’

এহতেশাম তাজ্জব হয়ে বলল,’এরা কি পা’গল?’

‘সেটাই তো আমারও প্রশ্ন স্যার।এরা কি পা’গল?’

এহতেশাম আর তৈমুরের দিকে তাকালো না।সে তাকালো তার সাত ক্যাডেটের দিকে।যারা অপরাধীর মতো মুখ করে মাথা নামিয়ে রেখেছিল।এহতেশাম তাদের কাছাকাছি এগিয়ে গেলেন।ভরাট পুরুষালি গলায় জানতে চাইলেন,’কি?এই কাজ কেন করেছো তোমরা?ক্যাম্পে এসব নিষিদ্ধ তোমরা জানো না?’

সাত জনের কেউই জবাব দিলো না।তারা সেই আগের মতো করেই মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল।এহতেশাম কন্ঠস্বর আরো বেশি শীতল করে বললেন,’কি হলো?কেউ তো বলো।মাহিম?’

‘জ্বী স্যার।’

‘তুমি বলো।’

মাহিম মুখটাকে এইটুকু করে বলল,’স্যার আমরা তখন পুশ আপ করছিলাম।সকাল দশটা এগারোটার দিকে।তখন অয়ন দেখলো,সিভিল ড্রেসে কেউ একজন ক্যাম্পে হাঁটাহাঁটি করছে।মাথায় একটা ক্যাপ।মুখটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না।তাকে দেখতে কেমন যেন অন্যরকম মনে হচ্ছিল।সে ডেকে নিয়ে আমাদেরও সেটা দেখালো।

আমরা তার পোশাক দেখে ভেবেছি সে কোনো সিভিলিয়ান কিংবা স্পাই।অথবা এখানে এসেছে আমাদের ক্ষতি করতে।আমরা তখন তাকে ধরার জন্য ছুটে যাই।’

মাহিম বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেল।এহতেশাম স্থির চোখে তাদের সবার দিকে চেয়ে থাকলো।মনে হচ্ছে কান গরম হয়ে সেখান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে।

বাকি কথা শেষ করল জিতু।মাথা নামিয়ে অতিমাত্রায় চাপা স্বরে বলল,’আমরা যখন দলে দলে তাকে ধাওয়া করছিলাম,তখন সেও ভয় পেয়ে উল্টো দিকে ছুট দিলো।আমরা নিশ্চিত হলাম যে সে আসলেই গুপ্তচর।নয়তো এমন করে ছুটবে কেন?পরে তাকে বাগে পেতে বেশ কষ্ট হলো।তাকে ধাওয়া করতে গিয়ে ইয়াকুবের টেন্টের একপাশ বোঁচা হয়ে গেছে।আমাদের হাতে তো কোনো অস্ত্র ছিলো না তাৎক্ষণিক।তাই আমরা রান্নাঘর থেকে যা কিছু হাতের কাছে পেয়েছি,সব তার দিকে ছুড়ে মেরেছি।তারপর গিয়ে তাকে ধরতে পারলাম।কিন্তু এরপর জানলাম সে আমাদের নতুন মিলিটারি কুক।জানলে এই কাজ কখনোই করতাম না।কিন্তু বিশ্বাস করেন স্যার,তাকে দেখতে আসলেই অস্বাভাবিক লাগছিলো।’

অয়ন বলল,’আমরা পরে উনার কাছে মাফ চেয়েছি।উনিও আমাদের মাফ করেছেন স্যার।’

বলে সে আবার মাথা নামালো।তৈমুর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,’মাফ চেয়ে উদ্ধার করেছে আমাকে।আধ ঘন্টায় পুরো ক্যাম্প মাথায় তুলেছে যতোসব গর্দভের দল! ‘

আশিক দুই দিকে মাথা নেড়ে ফিক করে হেসে উঠল।বলল,’তোমরা দেখছি সত্যিই গরু।’

‘তো কি?এদের দিয়ে কিছুই হবে না।এরা মিশনে গিয়ে আসল শত্রুকে না মেরে নিজের পক্ষের গুপ্তচরকেই মেরে বসে থাকবে দেখো।’

তৈমুর ঝাঁঝালো কন্ঠে কথাটা বলল।এহতেশাম প্রায় সাথে সাথে পেছন ফিরল।তার চোখের মণি স্থির।তৈমুরের কথার প্রেক্ষিতে যেই স্পষ্ট রাগ তার মুখে প্রতীয়মান হওয়ার কথা ছিলো,সেটা হলো না।বরং তার কপালের রগগুলো শিথিল হয়ে তাকে আগের মতোই ভাবলেশহীন করে রাখলো।তাকে আজ নির্বিকারই দেখালো,সাথে আবার কিছুটা বিরক্ত।

এহতেশাম পুরু স্বরে বলল,’ক্যাপ্টেন তৈমুর! আপনাকে শুধু একদিনের জন্য তাদের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।তারা ভবিষ্যতে কি করবে,আদৌ কিছু করতে পারবে নাকি,সেই ভবিষ্যতদ্বানী আমি আপনাকে করতে বলি নি।আপনার এতো দূর ভাবার কোনো প্রয়োজন নাই।’

তৈমুর থতমত খেয়ে গেলেন।তাড়াহুড়ো করে বললেন,’না না স্যার।আমি সেভাবে বলি নি।আসলে স্যার রাগ হচ্ছিল তো।তাই উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছি।আপনি দয়া করে কিছু মনে করবেন না প্লিজ।’

এহতেশাম দারাজ গলায় বলল,’ইটস ওকে।’

তারপর পেছন ফিরে কটমট চোখে সাতজনের দিকে তাকালো।চোয়াল শক্ত করে বলল,’এখনই এখান থেকে বেরিয়ে আরো আড়াইশো পুশআপ দিবে।আশিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুনবে।একটাও যদি ফাঁকি দিয়েছো কেউ,তাহলে আবার শুরু থেকে শুরু হবে সব।’

সাতজন মাথা নাড়িয়ে রেলগাড়ির বগির মতোই লাইন করে বেরিয়ে গেল।আশিক আরেক দফা হাসল।তারপর সে নিজেও তাদের সাথে সাথে তাবু থেকে বেরিয়ে গেল।

সাতজনের আড়াইশো পুশ আপ শেষ করতে আরো অনেকটা সময় লাগলো।এর মাঝে এহতেশাম স্যারের রামধমক তো ছিলোই।সারাদিনের অগণিত ধমক,ছুটোছুটি,চিৎকার চেঁচামেচি আর পানিশমেন্টের ভারে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া ক্যাডেটরা কোনোরকমে রাতের খাবার খেয়েই ভঙ্গুর পায়ে তাদের তাবুর দিকে ছুটলো।ছুটির দিনেও যে এতো ভোগান্তি ভুগতে হবে,সেটা তারা আজ ঘুম থেকে উঠার আগেও টের পায় নি।

এহতেশাম সেদিন রাতে আনুমানিক একটার দিকে আবারো সেই নম্বরটিতে ফোন দিয়েছিল।

সে ছিলো পাহাড়ের শেষ মাথায়।পাশে দু’জন ফৌজি ব’ন্দুক হাতে টহল দিচ্ছিল।এহতেশাম সটান হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।অপেক্ষা করে একটি মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠের,যা ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে এহতেশামের সমস্ত শরীরে প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দিবে।যেই কন্ঠে এহতেশাম শুধু স্নিগ্ধতাই খুঁজে পায়।এর বেশি কিছু না।

বরাবরের মতোই ফোনটা রিসিভ হলো।অন্য পাশের মেয়েলি স্বরটা রিনরিনে গলায় সালাম দিলো।এহতেশাম সেই সালামের জবাব দিলো মনে মনে,নিঃশব্দে।তারপর তার কন্ঠে একবার নিজের নাম শুনার জন্য মেজর মুস্তাফার চিত্ত ব্যাকুল হয়ে।সে প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করে মেয়েটার কন্ঠে নিজের নাম শোনার।

অথচ মেয়েটা তাকে চিনতে পারে না।সে তার সব বান্ধবীর কথা স্মরণ করে।কিন্তু তার পত্রমিত্রর নাম একটি বারের জন্যও মুখে নেয় না।তার এই ভুলোমনা আচরণ তেত্রিশ ছুঁয়ে ফেলা শক্তপোক্ত গড়নের লোকটার মনে আঘাত করলো।সে চট করে ফোনটা কেটে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।তারপর হনহনিয়ে সে তার তাবুর ভেতরে হেঁটে গেল।নীলা আজকাল তাকে একদমই স্মরণ করে না।নীলার তার কথা মনেই পড়ে না।না সে তাকে চিঠি পাঠায়।আর না সে তার উপস্থিতি টের পায়।নীলারা সবসময় এমন হয় কেন?
.
.
.
.
অরুনিমার অভিমানের আজ দ্বিতীয় দিন।যদিও এতোবার কথা বলার পর অভিমান টিকে আছে নাকি,সেটা একটা ভাবনার বিষয়।

মিতা বলেছিল সে যেন মন খারাপ করে সাতদিন অভির সাথে কথা না বলে।অরুনিমাও অক্ষরে অক্ষরে সেটা পালন করতে চেয়েছে।কিন্তু সমস্যা হলো হামাদ সামনে এসে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে চুপ করে থাকতে পারে না।হামাদের সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগে।তার কাঁধে মাথা রেখে তার সারা শরীর ঘেঁষে বসে থাকতে অরুনিমার আনন্দ হয়।সে সামনে এসে বসলে অরু আর তাকে অবহেলা করতে পারে না।মন খারাপ,অবহেলা,এড়িয়ে যাওয়া-এই শব্দ গুলো তো অরুনিমার অভিধানে কখনো ছিলো না।

তবুও সে আজকাল মুখ ফুলিয়ে রাখে।কিছুক্ষণ কথা বলার পর যখন তার মনে পড়ে যে হামাদের সাথে তার কথা বলা বারণ,তখন অরুনিমা চট করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে।অথচ ভেতরটা আনচান করে ভীষণ।হামাদের কাঁধের কাছটায় কতোদিন নাক ঘঁষা হয়না! কতোদিন অরু তাকে ধরে শান্তিতে ঘুমায় না!

অরুনিমাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয়েছিল পরশুদিন।তারপর অভি সোজা তাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে।আসার পর হৃদি আর সৃজনী তার ঘরে এসেছিল।জাহানারাও স্টিকে ভর দিয়ে একদিন তার ঘরে এসেছিলেন।অরুনিমা তাদের সাথে খুব অল্প অল্প করে কথা বলেছে।সৃজনীর সাথে একেবারেই অল্প।

যাকে একবার অপছন্দ হয়ে যায়,তাকে অনেক চেষ্টার পরেও আর ভালো লাগে না।সৃজনীকে নিয়েও অরুনিমার ভেতর এমন কিছুই হয়েছিল বোধহয়।সে বাড়ি আসার পর সৃজনী তার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করল।এমনকি অভির সাথে খুব একটা কথাও বলল না।কিন্তু তা স্বত্তেও অরুনিমা তার সাথে আগের মতো সহজ হতে পারল না।অরুনিমার মনে হয়,এই জীবনেও সে কোনোদিন তার সাথে আগের মতো হতে পারবে না।তাদের মাঝে ঐ কিন্তুর দেয়ালটা চিরকালই থেকে যাবে।

অভির সাথে যে অরু কিছুতেই কথা না বলে থাকতে পারে না,তার পুরো দায় কিন্তু অরুর না।এতে দোষ অভিরও আছে।উল্টো অরুনিমার চেয়ে বেশি দোষ তারই আছে।

তারা যেদিন বাড়ি ফিরলো,সেদিনের কথাই ধরা যাক।অরুনিমা গাল ফুলিয়ে বালিশে শুয়েছিল।তার দুই চোখ জোর করে বুজে রাখা।অভি ঘরে পা রাখতেই সে আরো বেশি করে মুখটা খিঁচে নিল।

অভি শুরুতেই তাকে কিছু বলল না।সে সোজা গোসলে গেল।তারপর বেরিয়ে এসে চুল মুছতে মুছতে তীর্যক চোখে একবার তার দিকে তাকালো।অরুনিমা অল্প করে চোখ খুলে তার কার্যকলাপ দেখে।

অভি ঘরে এসেছিল রাত দশটা নাগাদ।হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে।এসেই তার চিরায়ত গম্ভীর কন্ঠস্বরে ডেকে উঠল,’অরুনিমা! উঠে বসো।’

অরু আস্তে করে মুখের সামনে থেকে চাদর সরায়।হামাদের হাতে খাবারের প্লেট।সে কি অরুকে খাওয়াতে এলো?তার হাতে প্লেট টা দেখেই অরুনিমার খিদে আরো বেড়ে গেলো।সেই যে একবার অভি তাকে খাইয়ে দিয়েছিল হাতে মেহেদি থাকার কারণে,তারপর আর কখনো সে তাকে খাইয়ে দেয়নি।

অভি তার কাছাকাছি বসে বলল,’উঠো।ভাত খেয়ে তারপর আবার শুয়ে থেকো।’

অরুনিমা পুনরায় মুখে চাদর টেনে বলল,’নাহ্।আমি খাবো না।তুমি খাও।’

অভি চোখ গরম করে তার দিকে তাকালো।কন্ঠে কিছুটা বিরক্তভাব ফুটিয়ে বলল,’অরুনিমা! এতো কাহিনি করছো কেন?উঠে খেতে বসো না।’

‘নাহ্।তোমার সাথে কথা বলি না।’

‘আমার সাথে কথা বলতে বলি নাই।বলেছি খেতে।খেতে হলে যে আমার সাথে কথা বলতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।’

অরু বাঁকা চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর আবার অন্য দিকে ফিরে বলল,’আমি কথা না বলে খেতে পারি না।’

‘তাহলে খেতে খেতে কথা বলো।তারপর আবার রাগ করবে।’

‘এটা হয় না।এটা বাচ্চারা করে।’

অভি ঘন ঘন দু’টো শ্বাস ছাড়ে।খুবই গম্ভীর স্বরে বলে,’অরুনিমা! গত দুই দিন যাবত আমি কিছু খাচ্ছি না।তুমি এমন করলে আজও আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে।তুমি কি চাইছো আমি না খেয়ে থাকি?’

অরুনিমা তার দিকে ফিরল।চোখ পাকিয়ে বলল,’তুমি কাল সিগারেট খেয়েছ।আমি দেখেছি।’

‘সিগারেটে ক্ষুধা মেটে না।’

‘তবে খাও কেন?’

‘জ্বালা মেটাতে।’

অরুনিমা চোখ গোল করে বলল,’বাপরে! যতো বড়ো মুখ না,অতো বড়ো কথা।’

অভি ভাত মেখে বলল,’এবার হা করো অরুনিমা।মাথা ঘুরছে আমার।একটু খেয়ে ঘুমাবো।’

‘তুমি আর আমি একসাথে খাবো?’

‘হুম।এতো বার প্লেট আনার কি দরকার?কেন?তোমার শুচিবায়ু আছে নাকি?’

অভি ত্যাছড়া চোখ করে তার দিকে তাকালো।অরুনিমা হাসিমুখে বলল,’নাহ্।আমার এসব নেই।’

‘ভালো।’

‘হামাদ! ও হামাদ!’

‘কি?’

‘তুমি আমায় আরেক জোড়া নূপুর কিনে দিবে।’

অভি বলল,’আচ্ছা দিবো।’

‘হামাদ!’

‘হুম।’

‘আবার একটা সিনেমা দেখাবে।এবার কিন্তু রোমান্টিক সিনেমা।’

অভি ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,’আচ্ছা ঠিক আছে।’

অরুনিমার মান ভেঙে গেল এক নিমিষেই।সে দ্রুত অভির গা ঘেঁষে বলল,’আচ্ছা।এখন খাইয়ে দাও।’

______

রাতে হাফসা আর সৃজনী তাদের ঘরে এসেছিল।হাফসা এসেই খাটে বসে বললেন,’অরুনিমা! কি হলো গো তোমার?এতো অসুস্থ হলে কেমন করে?’

তিনি হাত বাড়িয়ে তার কপালের তাপমাত্রা মাপলেন।তারপর বললেন,’একটু কমেছে মনে হয়।হ্যাঁ রে অভি,এতো সুন্দর একটা বউ পেয়েছিস।সারাদিন এমন অবহেলা করিস কেন?’

অভি শার্টের কলার টেনে বারান্দায় চলে গেল।এই কথা শুনতে শুনতে সে বিরক্ত।তাদের ভাষ্যমতে অভির উচিত সারাক্ষণ তার বউয়ের সাথে সাথে ঘোরা।সারাক্ষণ তার আশেপাশে থাকা।এই কাজ অভির দ্বারা করা সম্ভব না।সে বড়জোর দুই একবার ডেকে অরুনিমার খোঁজ রাখতে পারে।কিন্তু সারাক্ষণ অরু অরু করে মুখে ফেলা তোলা আর যাই হোক,তার পক্ষে করা সম্ভব না।

হাফসা বললেন,’অভি! সৃজনীর পায়ের অবস্থা দেখেছিস?’

অভি গম্ভীর মুখে বলল,’হুম।দেখেছি।’

‘কাল রাতে আবার র’ক্ত আসছিলো।কি যে কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা!’

অভি তাকালো তার দিকে।এক হাতে মাথার চুল ঠিক করতে করতে বলল,’সৃজু! নাপা খেয়েছিস?’

সৃজনী হাফসার গা ঘেঁষে মিনমিনে গলায় বলল,’নাহ্।’

‘দিদানের ঘরে প্লাস্টিকের বক্সে রাখা আছে।যা গিয়ে খেয়ে নে।’

‘পরে খাবো।’

অভি বিরক্ত হয়ে বলল,’পরে খাওয়ার জন্য তো এখন বলি নি।যা গিয়ে খা।ব্যথা নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগে নাকি?’

অরুনিমা তাদের কথা শোনে।তার দুই চোখ হঠাৎই কেমন মলিন আর নিষ্প্রাণ হয়ে উঠলো।অভি আবার সৃজনীর সাথে কথা বলছে।সে কেন সৃজনীর সাথে কথা বলে?কেন তাকে বার বার সৃজু বলে ডাকে?অরুনিমাকে তো কোনোদিন আদর করে অরু বলে ডাকেনি।সৃজনীর পা যদি শরীর থেকে আলাদাও হয়ে যায়,তবে তার কি?

হাফসা আর সৃজনী ঘর থেকে চলে যেতেই অরুনিমা মুখ খিঁচে বলল,’সারাদিন তুমি সৃজু সৃজু করো।থাকো তুমি তোমার সৃজু কে নিয়ে।’

অভি হতবুদ্ধি হয়ে তার দিকে তাকায়।এখন আবার কি ভুল করলো সে?সে কতোক্ষণ গোল গোল চোখে তার দিকে দেখে শেষে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,’তোমাদের মেয়েদের সমস্যা কি?সবকিছুতে এতো প্যাঁচ ধরো কেন?’

চলবে-

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২৮.

অরুনিমা গালের নিচে হাত রেখে বলল,’কিছুই ভালো লাগে না আমার।’

অভি সেই কথা গায়ে মাখল না।আলমারির একপাশ থেকে কাপড় বের করে বারান্দার দিকে হেঁটে গেল।বারান্দা থেকে আসতেই অরুনিমা বলল,’যদি কেউ দুইটা শাড়ি,তিনটা ঝুমকা,দুই ডজন চুড়ি,একটা রূপোর নূপুর কিনে দিতো ,তাহলে ভালো লাগত।’

অভি চোখ বাঁকা করে তার দিকে তাকালো।মুখের পেশি শক্ত রেখেই বলল,’এসবেও কোনো কাজ হবে না।দু’টো থাপ্পড় দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।চুড়ি নূপুরের কোনো দরকারই নাই।’

অরুনিমা দ্রুত গালে হাত ছোঁয়ায়।মুখ গোমড়া করে জবাব দেয়,’থাক।লাগবে না আমার নূপুর।’

অভি অন্য দিকে চোখ সরালো।অরু নিজ থেকেই বলল,’হামাদ! একটা কথা বলি?’

‘আবার কি?’

‘তুমি যদি চুল দাড়ি ছেটে ফেলো,তাহলেও আমার মন ভালো হয়ে যাবে।বিশ্বাস করো,তোমাকে অনেক সুন্দর লাগবে।প্রমিজ।’

‘আমি সুন্দর হতে চাই না।’

কথাটা বলেই সে হনহনিয়ে গোসল নিতে চলে গেল।অরু শুধু মুখ লটকে তার প্রস্থান দেখে।এতো গোয়ার কেন লোকটা?একবার চুল দাড়ি ছেটে মানুষ হলে কি সমস্যা?
.
.
.
.
সুচিস্মিতা অফিস থেকে বের হতেই রাস্তার অন্যপাশ দেখে মুচকি হাসল।জগলু দাঁড়িয়ে ছিলো পকেটে হাত গুঁজে।সে বের হতেই হাত দিয়ে ইশারা করে তাকে থামিয়ে দিলো।তারপর নিজেই রাস্তা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
সে সামনে আসতেই মিতা বলল,’আপনি আবার আসতে গেলেন কেন জুহায়ের?’

জগলু স্মিত হাসে।জানায়,’আপনি সেদিন এলেন না বিনুদার দোকানে?কতোটা সময় অপেক্ষা করলেন! তাই আমিও এলাম অপেক্ষা করতে।’

সুচিস্মিতা গাঢ় স্বরে বলল,’অপেক্ষা করতে কেমন লাগে জুহায়ের সাহেব?’

জুহায়ের মাথা নামায়।সামন্য হেসে বলে,’মানুষটা আপনি হলে ভালোই লাগে।’

‘বাবাহ্।একটা কথা বলুন তো সত্যি করে।’

‘কি?’

‘আপনি কি শুধু আমার সামনেই এমন সুপুরুষ হয়ে থাকেন?নাকি পৃথিবীর সব মেয়ের কাছেই আপনি এমন?’

জগলু বুকে হাত চেপে বলল,’আসতাগফিরুল্লাহ! আপনি এটা ভাবতে পারলেন?মিতা ছাড়া আজ পর্যন্ত আমি কোনো পরনারীর পাশে হাঁটিও নাই।’

‘তাহলে মিতার পাশে কেন হাঁটছেন?’

‘এভাবেই।’
জগলু হেসে ফেলল।কন্ঠ নামিয়ে বলল,’আসলে মিতার আগে কেউ কখনো আমায় এতোটা পাত্তা দেয় নি।’

সুচিস্মিতা জবাব দেয় না।শুধু একবার আড়চোখে জুহায়েরের সমস্ত মুখ দেখে।তারপর মুচকি হেসে বলে,’দোয়া করে দিলাম ভবিষ্যতেও যেন কেউ না দেয়।
আচ্ছা জুহায়ের,শুনুন।’

‘কি?’

‘আপনাকে তিনদিনের জন্য পুরোপুরি অবসর চাইছি।’

জগলু কপাল কুঁচকায়।
‘তিন দিন?’

‘হুম।’

‘কেন?’

সুচিস্মিতা অধৈর্য হয়ে বলল,’কারণ পরে জানবেন।আগে বলুন সামনের তিন দিন আপনার কোনো কাজ আছে?’

‘জ্বী না।’

‘গ্রেট!’

জগলু বলল,’আপনি করবেন টা কি তিনদিনে?’

‘উহু।কথা কম।’

মিতা রিকশা ডেকে সেখানে উঠে বসল।জুহায়ের বসল তার পাশে।একটু দূরত্ব নিয়ে।মিতা আড়চোখে একবার সেই দূরত্ব দেখে।তারপর আফসোস করে বলে,’আমি যদি আরেকটু মোটা হতাম,তাহলে ভালো হতো।’

জগলু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুধায়,’কেন?’

‘এমনিই।চলুন এখন।’

‘যাচ্ছিটা কোথায় আমরা?’

‘আপনার বন্ধুর বাড়ি।’

জগলু ভড়কে গিয়ে বলল,’আমার বন্ধু?’

‘হুম।ঐ বুনো ভাল্লুকের বাড়ি।’

‘অভিদের বাড়িতে?’

‘হুম।’

জগলু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো,’কেন?কেন সেখানে যাবেন?’

‘উহু।কাজ আছে।’

‘মিতা!’

‘কি?’

‘আপনি ঐ বাড়ির মানুষ দের চেনেন না।’

‘কেন?কি হয়েছে?তারা কি কোনো বাঘ?’

‘উহু।তারা খুব জাজমেন্টাল প্রকৃতির মানুষ।’

‘হোক গিয়ে।’

‘আপনার তো মন খারাপ হবে মিতা।’

সুচিস্মিতা হাসল।
‘না জুহায়ের।আমার এসবে মন খারাপ হয় না কখনো।’

‘আমি নিজেই অস্বস্তিতে তাদের বাড়ি যাই না।’

‘আপনার যেতে হবে না।আপনি বাইরে থাকবেন।আমি যাবো।’

‘ধ্যাত! সেটা কিভাবে হয়?’

‘তাহলে চুপচাপ চলুন।এতোকিছু আপনাকে ভাবতে হবে না।’

____

জাহানারা বেগমের একটা সিন্দুক আকৃতির বাক্স আছে।অরুনিমা কোনোদিন নেই বাক্স ছুঁয়ে দেখেনি।বাক্সটার প্রতি জাহানারার একটা সূচালো দৃষ্টি সবসময়ই পড়ে থাকে।সেই বাক্স তিনি ব্যতীত কেউ ছুঁয়ে দেখতে পারে না।

অরুনিমা মাঝে মাঝেই কথার ফাঁকে সেই বাক্সের দিকে তাকায়।একদিন জাহানারা পান চিবুতে চিবুতে বললেন,’আমার বাক্স থেকে একটা শাড়ি বাইর করো তো নতুন বউ।’

অরুনিমা মহা উৎসাহে তার সেই কাঠের বাক্সে হাত দিতেই তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন,’এ্যাই এ্যাই করো কি?তোমারে এডা ধরতে কইছি?’

অরু হকচকিয়ে উঠে বলল,’তাহলে?’

‘এটা না।আলমারির নিচের তাকে বাক্স আছে।ঐদিক থেকে বের করো।’

অরুনিমা মুখ লটকে একটা শাড়ি বের করল।জাহানারা আজ সকালে তাকে তার ঘরে ডেকে এনেছেন।অরুনিমার পুরো সকাল নষ্ট করার জন্য এটাই যথেষ্ট।আসার পর থেকে তার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে শুনতে অরু হাঁপিয়ে উঠেছে রীতিমতো।

তার ঘুরেফিরে এক কথা-বাচ্চা নেও।কি আজব কথা! অরু কোথা থেকে বাচ্চা নিবে?আকাশ থেকে পড়ে বাচ্চা?
সে শুধু মাথা নাড়ে।জাহানারা আরাম করে বসে বললেন,’শোনো নতুন বউ।বেডা মানুষ হইলো গিয়া ছাগলের মতো।যেখানে সেখানে মুখ দেওয়ার স্বভাব এদের।
তুমি কি তার স্বভাব পাল্টাইতে পারবা?তুমি খালি পারবা একটা বাচ্চা দিয়া তারে আটকায় ফেলতে।বাচ্চা ছাড়া সংসারের কোনো দাম নাই।বেডা মানুষ ঐ বাচ্চাতেই যা একটু আটকায়।এদের জাত তুমি এখনো চিনো নাই।’

অরুনিমা কটমট চোখে তার দিকে তাকায়।এই বুড়ির প্রিয় কাজই হলো অবসরে পান চিবুতে চিবুতে বেডা মানুষের বদনাম করা।জাহানারা বললেন,’সব বেডাই এক রকম।কিন্তু আমার পোলা হাতেম আছিল,পুরাই আলাদা।ওয় কি বেডা আছিল নাকি তাও আমার সন্দেহ।’

অরুনিমা চট করে প্রশ্ন করল,’কেন?’

জাহানারা মুখ কোঁচকালেন।বললেন,’তোমার এতো জানা লাগত না।’

অরুর মুখ ভোঁতা করে তার দিকে তাকায়।না জানা লাগলে বলল কেন?জাহানারা মুখে একটু সুপারি পুরে বললেন,’বেডা মানুষের আসল নেশা হইলো শরীলের নেশা।এজন্যই তো বউয়ের চামড়া ভাঁজ হইলে তাগো আর বউরে ভাল্লাগে না।শরীলের নেশাই আসল নেশা।’

অরুনিমা মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করে,’পা গ ল কোথাকার!’

জাহানারা অবশ্য সেটা শুনতে পান নি।তিনি আগের মতো করেই বললেন,’গাধা ছিলো আমার হাতেম।তার ভেতর কোনো শরীলের নেশা ছিলো না।তার কাছে নাকি মনই আসল।শোনো কথা।এমন বেডা তুমি জীবনেও দেখছ?এমন বেডাদের আমার কাছে ছাগল লাগে।আমার পোলা আছিল একটা ছাগল।আমার অভি দাদুভাই এদিক দিয়া সেরা।বউরে পাত্তাই দেয় না।’

বলেই জাহানারা খিলখিল অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।অরুনিমার পুরো শরীর ছ্যাৎ করে উঠল।মন চাইল একটা ধমক দিয়ে বলতে,’বুড়ির ঘরের বুড়ি! এক পা তোমার কবরে।তবুও তোমার শয়তানি বন্ধ হয় না তাই না?’

কিন্তু সে কিছুই বলল না।জাহানারা খাটের সাথে ঠেস দিয়ে বললেন,’হাতেম এমনই ছ্যাবলা ছিল যে সকাল দুপুর বউয়ের খানার খোঁজ নিতো।বেডা মানুষ বুঝি এতো বউ বউ করে? তার আছিল এক রেখা।রেখা ছাড়া তে কিছুই বুঝতো না।ইসসস,,ঐসব মাইয়ার জন্য নাকি বেডা মানুষের মনে প্রেম জাগে!’

তিনি কথা শেষ করার কিছু সময় পরেই অভি দরজায় এসে দাঁড়াল।অরুনিমার সাথে তার চোখাচোখি হতেই সে ভারি স্বরে বলল,’অরুনিমা!’

‘হুম।’

‘সকালের নাস্তা করেছো?’

‘নাহ্।’

‘কেন করো নি?যাও নাস্তা করে আসো।বারোটায় কিন্তু একটা ঔষধ আছে তোমার।’

অরুনিমা হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে।তার ঠোঁটজুড়ে বিজয়ীর হাসি।সে আড়চোখে একবার জাহানারার দিকে তাকায়।তার মুখটা একদম চুপসে গেছে।তার বাঘের মতোন দাদুভাই ছাগলের মতো করে বউয়ের খাওয়ার খোঁজ নিচ্ছে,এটা মানতে বোধহয় তার কষ্ট হলো বেশ।

অরুনিমা হেলেদুলে মহা আনন্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।এসেই অভির হাতটা খপ করে ধরে বলল,’তুমি কতো ভালো হামাদ!’

অভি মুখ কুঁচকে হাতটা ছাড়িয়ে নিল।অরু তার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,’তোমার দিদানের মাথায় সিট আছে।একটা না,দুইটা।’

অভি থামল।পাশ ফিরে মৃদুস্বরে বলল,’তুমি আর তুতুন গিয়ে ঐ দু’টো সিটে বসে পড়ো।’

অরু খিলখিয়ে হাসে।হাসির দমকে অভির কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলে,’ধ্যাত! দুষ্টু!’

অভি ভড়কে গিয়ে তার দিকে তাকায়।কি আশ্চর্য! এই মেয়ে তাকে ভয় পাচ্ছে না কেন? এমনভাবে কথা বলছে,যেন সে তার বন্ধু।অদ্ভুত তো!
.
.
.
.
জাহানারা মেয়েটাকে আগাগোড়া দেখে বললেন,’তুমি বেডি নাকি বেডা?’

সুচিস্মিতা প্রগাঢ় হাসল।ঠোঁট ফাঁক করে বলল,’আপনি যা ভেবে শান্তি পান,আমি সেটা।’

জাহানারা ক্ষণিকের জন্য চুপ হলেন।আরো একবার মেয়েটাকে অপাদমস্তক দেখলেন।একটা জিন্স।সাথে কালো শার্ট।চুলে উঁচু করে একটা ঝুঁটি।গলায় ঝুলছে নীল ফিতার একটি আইডি কার্ড।তার নামটা জাহানারা ইতোমধ্যেই ভুলে গেছেন।এতো কঠিন নাম তার মনে থাকে না।

মেয়েটা এসেছে অভির বউয়ের সাথে দেখা করতে।জাহানারাই তাকে নিজের ঘরে ডেকে এনেছেন।জাহানারা বললেন,’তুমি করো কি?’

মেয়েটা অবিচল কন্ঠে বলল,’আমি একজন জার্নালিস্ট।’

‘মানে কি?বাংলায় কও।’

‘সাংবাদিক।’

‘সাংবাদিক!!’

জাহানারা তাজ্জব হয়ে গেলেন।বললেন,’মাইয়া মানুষ হইয়া এসব করো?ঘরে কি মা বাপ নাই?এডি কেমন কথা?মাইয়া মানুষের এতো উড়া ভালো না।এডি সব নষ্টা মাইয়াদের কাজ।’

‘কেন?মাইয়া মানুষ এসব করতে পারবে না,এটা কি সংবিধানের কোথাও লিখা আছে?’

‘অতো সংবিধান মারাও কেন?আমাদের সবচেয়ে বড়ো সংবিধান হইছে কুরআন।কুরআন মানতে হইবো।’

‘আপনি মানেন কুরআন?’

‘হ।অবশ্যই মানি।’

‘আমাদের ধর্মে কিন্তু জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে।কেউ বলে হারাম,কেউ বলে মাকরুহ।অথচ আপনি নেশাগ্রস্থের মতো জর্দা দিয়ে পান চিবুচ্ছেন।’

জাহানারা থতমত খেয়ে গেলেন।সুচিস্মিতা হাসি দিয়ে বলল,’আমি তো পাপী।আমি জানি সেটা।আমি নিজে পাপী বলেই অন্যের পাপ বের করতে ভয় পাই।আপনি যেহেতু এতোই কুরআন মানেন।তাই আপনাকে জানালাম আরকি।কুরআনে একটা সূরা আছে।সূরা আল হুমাযাহ্।কখনো অর্থসহ পড়বেন কেমন?যারা মানুষের সামনে অথবা পেছনে নিন্দা করে বেড়ায়,তাদের পরিনতি কি হবে,সেটা ঐ সূরা পড়লেই বুঝবেন।অবশ্য আপনার তো জানারই কথা।আপনি তো কুরআন বাদে আর কোনো সংবিধান মানেন না।’

শেষের কথা টা সে একটু ঠেস মেরেই বলল।তারপর বরাবরের মতোই সৌজন্যসূচক হেসে সুচিস্মিতা তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।জাহানারা ফ্যালফ্যাল চোখে তার প্রস্থান দেখেন।তারপর বুকে একটা হাত চেপে রুদ্ধশ্বাস হয়ে বললেন,’সর্বনাশ! এই মেয়ে যেই ঘরে যাইবো,ঐ ঘরে আর ফেরেস্তা আইতো না।আল্লাহ জানে,আমার দাদুভাইয়ের বউয়ের সাথে তার কিসের এতো ভাব।এইসব পড়াশোনা জানা মাইয়া মানুষ তো সংসার করতে জানে না।খালি সংসার ভাঙতে জানে।আল্লাহ! তুমি মাফ করো।’

____

সব শুনে অভি বলল,’অরুনিমা যাক।আমি যাবো না।ইচ্ছে করছে না আমার।’

সুচিস্মিতা থমথমে মুখে তার দিকে তাকালো।এতোবার বোঝানোর পরেও কেউ এক কথা কিভাবে বলতে পারে?সে একটা দম ফেলে বলল,’জনাব হামাদ! আমরা সবাই যাচ্ছি।আপনি না গেলে অরুর মন খারাপ হবে।তাই আপনিও চলুন।’

‘আমি যেতে পারব না।’

মিতা কঠিন মুখে বলল,’কেন?’

‘এমনিই।’

জগলু দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।সেও মিতার সাথে সুর মিলিয়ে বলল,’চল না অভি।দুই তিনটে দিনেরই তো ব্যাপার।এমন করছিস কেন?’

‘তোরা যা না।তোদের তো যেতে মানা করছি না।আমাকে কেন টানছিস সবকিছুতে?’

অরুনিমা তার কাছে ছুটে গেল।তার বাম হাতের কবজি চেপে ধরে অনুরোধ করে বলল,’হামাদ! ও হামাদ! চলো না প্লিজ।তুমি না গেলে আমার কি হবে?’

‘তোমার বন্ধুরা তো আছেই অরুণিমা।’

অরু জেদ করে বলল,’বন্ধুরা থাকলেই হবে না।তোমাকেও থাকতে হবে।’

‘আমি পারবো না।’

অভি গটগট করে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।সুচিস্মিতা তার দিকে দেখতে দেখতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,’বুনো ভাল্লুক একটা!’

সে সামনে তাকায়।অরুনিমার সাথে দৃষ্টি বদল হতেই মৃদু চিৎকার করে বলে,’তুমি এই বুনো ভাল্লুকের সাথে সংসার করো কেমন করে অরু?দেখলেই তো মেজাজ গরম হয়।’

অরুনিমা কিঞ্চিৎ হাসলো।বলল,’না গো আপা।হামাদ আসলে খুব ভালো।সে তোমার সামনে একটু অদ্ভুত আচরণ করে।আমার আর জগ..থুক্কু জুহায়েরের সামনে সে আরো স্বাভাবিক আচরণ করে।তুমি চিন্তা করো না।আমি তাকে রাজি করিয়েই ছাড়বো।’

মিতা দু’চোখ সরু করে বলল,’শিওর?’

‘একদম একশো পার্সেন্ট।হামাদ কখনো আমাকে না করে না।হামাদ এই বাড়ির সবচেয়ে ভালো মানুষ।আমার বর বলে বলছি না কিন্তু।সে আসলেই অনেক ভালো।’

মিতা বলল,’শুধু তোমার জন্য ভালো।তোমার দিকে কি নরম করে তাকায়! আর আমাদের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন কাঁচা চি’বি’য়ে খাবে।’

সুচিস্মিতা যেতে যেতে বলল,’তৈরি থেকো অরুনিমা।আমি গাড়ি পাঠাবো।তখন তোমার বর আর তুমি চুপচাপ উঠে পড়বে।’
.
.
.
.
মনোয়ারা দরজা খুলতেই দেখলেন দরজার বাইরে একটা মেয়ে হাসিখুশি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।মনোয়ারা অবাক হয়ে বললেন,’আপনি কে?’

‘আমি সুচিস্মিতা।’

বলে সে একটু থামল।তারপর বলল,’আমি নিরুর বান্ধবী।’

‘নিরুর বান্ধবী?’ মনোয়ারা কিছুটা আশ্চর্যই হলেন।

সুচিস্মিতা বলল,’জ্বি।অনেক আগে থেকেই পরিচয়।অরুনিমার বিয়ের পর আবারো দেখা হলো আরকি।’

‘তুমি অরুনিমার পরিচিত?’

‘জ্বী।আমি তার হাসবেন্ডের দূর সম্পর্কের বোন।’

মুহূর্তেই ইন্দ্রিয় সচল হলে মনোয়ারার।তিনি দ্রুত সরে দাঁড়ালেন দরজা থেকে।তাড়া দিয়ে বললেন,’আরে আরে।এসো না।’

সুচিস্মিতা মুখে হাসি রেখেই ভেতরে এলো।মনোয়ারা বললেন,’তুমি কি শিকদার বাড়ির লোক?’

‘জ্বী না।আমি অভির মায়ের বাড়ির লোক।’

‘ওহহ আচ্ছা।’

মনোয়ারা তাকে বসার জন্য বললেন।মিতা বলল,’না।আমি বসবো না।আমাকে একটু কষ্ট করে নিরুর ঘরটা দেখান।আমার তার সাথে কথা আছে।’

নিরুপমার দুই চোখ প্রায় লেগেই এসেছিল।কাল রাতে তার ঘুম হয়নি।তুতুন একটু পর পর উঠে কান্না জুড়ে দিতো।আজ তাই সারাক্ষণ সে ঘুমে ঝিমুচ্ছে।হঠাৎই ঘরে এসে কেউ সহাস্য কন্ঠে তাকে ডাকল।

‘নিরুপমা! কেমন আছো তুমি?’

নিরুপমা ধড়ফড়িয়ে উঠে।চকিত ভঙ্গিতে সামনে তাকাতেই দেখে সুচিস্মিতা তার ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে।সে তাকাতেই মিতা হাসিমুখে বলল,’কি?শরীর কেমন?

‘মিতা আপা! তুমি?’

‘হ্যাঁ।তোমার তুতুন কে কোলে নিতে চলে এলাম।’

নিরুপমা হাসল।উঠে বসে তুতুনের দিকে ফিরে বলল,’কাল সারারাত ঘুমায় নাই।নিজেও ঘুমায়নি।আমাকেও ঘুমুতে দেয়নি।সকাল থেকেও ঘুমুচ্ছিলো না।পরে দুপুরে খেয়ে একটু ঘুমালো।’

মিতা বলল,’এখন আবার একটু কষ্ট করে তুলে দাও।ফার্মহাউজে গিয়ে আবার ঘুমাবে।’

নিরুপমা চমকের পিলে তার দিকে তাকায়।চোখ বড় বড় করে বলে,’ফার্মহাউজে যাবে মানে?’

‘মানে হলো আমি তোমাকে আর তোমার তুতুনকে দু’দিনের জন্য চুরি করে এক জায়গায় নিয়ে যাবো।’

‘সর্বনাশ! মা জানে?’

‘হুম জানে।আর রাজিও আছে।’

নিরুপমা চোখ বড় বড় করে বলল,’মা দু’দিনের জন্য আমায় তোমার সাথে ছেড়ে দিতে রাজি হলো?’

‘হলো তো।’

নিরুপমা ভীতু স্বরে বলল,’আপা।আমি যাব না।আমার ভয় লাগে।’

‘কিসের ভয়?আমি আছি না?’

‘তবুও।তুতুন তো অনেক ছোট।’

‘ছোট হলে?’

নিরুপমা দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল,’না না।আমার ভয় লাগে।’

‘ধ্যাত! বোকা মেয়ে।’

মিতা বলল,’সারাদিন এক ঘরের ভেতর পড়ে থাকো দেখেই চোখ মুখের এই অবস্থা।একটু বাতাসের নিচে এসে দাঁড়াও নিরু।দেখবে ভালো লাগবে।খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালে মন ভালো হয়।’

‘কিন্তু অতো বড় ফার্মহাউসে আমি একা কি করব?আমার তো খারাপ লাগবে।’

‘একা না।আরো মানুষ আছে।’

নিরু কপাল কুঁচকে বলল,’আরো মানুষ আছে?তারা কারা?’

‘বলবো না।একটু পরেই বুঝবে।’
.
.
.
.
অরুনিমা গাড়ির সিটে বসতেই জগলু স্টিয়ারিং ধরে রাখা অবস্থায় পেছন ফিরে বলল,’আপামনি।টাইট হইয়া বসেন।’

অরু খিলখিল করে হাসল।মুখে হাত চেপে বলল,’তোমাকে আজ অদ্ভুত লাগছ জগলু।’

‘আমি হলাম আজকের জন্য ড্রাইভার।অদ্ভুত তো লাগবেই।’

অরুনিমা হাসে।শক্ত করে বসার সিট খাঁমচে ধরে বলে,’বসেছি টাইট হয়ে।এবার গাড়ি স্টার্ট দাও।’

অভি তীর্যক চোখে তার দিকে তাকালো।তার মুখে কি দারুণ উচ্ছ্বাস! বেড়াতে যাবে বলে সে দুই ঘন্টা ধরে ব্যাগ গুছিয়েছে।ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক নাটক করে শেষে অভিকেও রাজি করিয়েছে।অভির জানি আজকাল কি হয়েছে।রামধমক দিয়ে অরুনিমাকে থামিয়ে দিতে তার ইচ্ছে হয় না।মনে হয়,অরু একটা দুরন্ত ঘুড়ি।আর অভি নাটাই হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক দর্শক।হাতে নাটাই থাকার পরেও সে ঘুড়ির লাগাম টেনে ধরছে না।উল্টো আরো বেশি ছাড় দিচ্ছে,আরো সুন্দর করে উড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।কি অদ্ভুত! কি অদ্ভুত!

অরুনিমা দু’হাত মুঠ করে বলল,’আমরা কোথায় যাচ্ছি গো জুহায়ের ভাই?’

জগলু স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,’সেটা তো গেলেই দেখতে পারবে।’

‘তুমি তো একদম আমাদের বাড়ির রাস্তায় যাচ্ছো।আরেকটু সামনে গিয়ে ডানে গেলেই আমাদের বাড়ি।চলো দু’মিনিট নিরু আপার সাথে কথা বলে আসি।’

অরু খুব মজার ছলে কথাটা বলেছিলো।কিন্তু সে প্রচন্ড অবাক হলো যখন দেখলো,জুহায়ের আসলেই গাড়িটা তার বাড়ির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।সেই অবাক মাত্রা ছাড়িয়ে গেল যখন অরু দেখলো বাড়ির সামনে নিরু আপা,তুতুন,আর মিতা আপা দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়ির দরজা খুলে মিতা বসলো ফ্রন্ট সিটে।আর নিরু বসলো পেছনের সিটে,অরুনিমার পাশে।
অরু তাজ্জব হয়ে জানতে চাইলো,’নিরু আপা! তুমি সত্যিই এসেছো?’

নিরুপমা একটু লজ্জা পেল।মাথা নেড়ে বলল,’মিতা আপা ভুংচুং বলে নিয়ে এসেছে।’

অরুনিমা খুশিতে আটখান হয়ে তালি বাজিয়ে বলল,’জিও মিতা আপা।তুমি সেরাহ্।’

মিতা পেছন ফিরল না।রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রেখে সামান্য হেসে বলল,’ফার্ম হাউজে তো আগে আসো বাচ্চা।এরপর বলবে সেরা নাকি চলনসই।’
.
.
.
.
মিতা যেই ফার্মহাউস ভাড়া নিয়েছিল সেটা গাজীপুরের কাছাকাছি।লোকালয় ছেড়ে একটু দূরে।অনেকটা গ্রামীণ পরিবেশে।ফার্মহাউসের গেটে গাড়ি থামতেই নিরু কে ঠেলে অরু সবার আগে বেরিয়ে এলো।তার কোলে তুতুন।সে বের হতেই চারপাশ দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল,’তুতুন রে! এটা তো আরেকটা পৃথিবী।কি সুন্দর!’

নিরুপমা তার পেছন পেছন বেরিয়ে চারপাশ দেখে।সামনে কি সুন্দর বাগান।পেছনে একটা বাংলো বাড়ি।গেইটের বাইরে থেকেই একটা ছোট পুকুর দেখা যাচ্ছে।পুকুরের ঘাট আবার বাঁধানো।নিরুপমা বলল,’পুরাই আগেকার দিনের জমিদারদের বাড়ির মতো দেখতে।’

সুচিস্মিতা গাড়ির দরজা খুলে হাসিমুখে বেরিয়ে এলো।তারপর সামনে দেখে বলল,’অনেক খুঁজে এটা বের করেছি।আমি জানতাম,তোমরা দুই বোন এটা খুব পছন্দ করবে।’

সবার শেষে গাড়ি থেকে নামল অভি।মুখটাকে গোমড়া করে।
জগলু তার কাঁধে হাত রেখে বলল,’কিরে?এমন মুখ বানিয়ে রেখেছিস কেন?দেখ কতো সুন্দর জায়গা।’

অভি ঝাড়া মেরে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে দিলো।বিরক্ত হয়ে বলল,’সর তো এখান থেকে।ভালো লাগে না।’

গেইট খুলতেই অরুনিমা পুকুরের ধারে ছুটে গেল।তুতুন হাত নেড়ে বলল,’নামাও আমাকে।’

‘উহু।তুমি পড়ে যাবে সোনা।’

‘পববো না।’

মিতা পাশে এসে বলল,’নামাও অরুনিমা।কিচ্ছু হবে না।মিতা খালামনি থাকতে তুতুন সোনার কোনো ভয় নেই।’

অরু তাকে সুন্দর মতো কোল থেকে নিচে নামালো।নিরুপমা বিমুগ্ধ চোখে চারপাশ দেখতে দেখতে বলল,’এতো সুন্দর বাংলো তুমি আমাদের জন্য ভাড়া নিয়েছো আপা?’

‘হুম।এই মাসে টাকা বেঁচে গিয়েছিল।ভাবছিলাম কোথাও ঘুরে আসবো।পরে মনে হলো,সাথে তোমাদেরও নিয়ে যাই।একা একা ঘুরতে তো কোনো মজা নেই।’

বলেই মিতা স্বভাবসুলভ হাসল।অথচ নিরুপমা একনাগাড়ে কতোক্ষণ স্থির হয়ে তাকে দেখল।মিতা আপার চোখ দু’টো কি সুন্দর না?মিতা আপা এতো ভালো কেন?কি সুন্দর আদর দিয়ে কথা বলে সবসময়! এতো গুলো টাকা খরচা করে অকারণেই তাদের ঘুরতে নিয়ে এলো।নিরুপমার মন চায় গালের নিচে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতে,’এ্যাই যে মিতা আপা!সত্যি করে বলুন তো,আপনি কোনো পরী টরী নাকি?এতো মিষ্টি তো এখনের সময় মানুষ হয় না।’

অথচ নিরু কিছুই বলে না।সে কেবল মুগ্ধই হয়।তুতুনটা কি সুন্দর মিশে গেছে মিতা আপার সাথে! আসলে মিতা আপা মানুষটাই এমন।মিতা আপাকে যে আপন করতে পারে না,সে আসলে কোনো মানুষই না।

*****

সুচিস্মিতা শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুজতেই জগলু আঁতকে উঠে বলল,’সাংঘাতিক! রান্নাও পারেন নাকি আপনি?’

মিতা প্রগাঢ় হাসে।রান্নার বড়ো পাতিলটা চুলায় বসিয়ে গর্ব করে বলে,’আমি সবই পারি।যে রাধে,সে চুলও বাঁধে।’

ফার্মহাউসের দেখা শোনার দায়িত্বে যে লোক থাকেন,তার নাম আসলাম।মিতা আসলামের মাধ্যমেই তিন দিনের জন্য ফার্মহাউস ভাড়া করেছিল।তারা আসতেই আসলাম তাদের সব ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়েছে।একটু আগে মাগরিবের আযান পড়ে গেছে।নামাজ শেষ হতেই অরুনিমা আর নিরুপমা বিরাট বড়ো রসাইঘরে এসে দাঁড়ালো।তুতুন বাগানের ভেতর ছুটোছুটি করছিলো।জগলু তাকে দেখে শুনে রাখছিলো।অভি সন্ধ্যার দিকে তার ঘরে গিয়েছে।এখনও বের হয় নি।

নিরু গোল গোল চোখে বলল,’এতো বড়ো হাঁড়িতে তুমি রান্না করবে আপা?’

‘হ্যাঁ।কোনো সমস্যা?’

‘নাহ্।কিন্তু অনেক কষ্ট হবে তোমার।’

সুচিস্মিতা চুলো ধরিয়ে সামান্য হেসে বলল,’এসবে আমার কোনো সমস্যা নেই।’

অরুনিমা নখ খুটতে খুটতে প্রশ্ন করল,’তুমি বানাবে টা কি আপা?’

‘আজকে শুধু পোলাও কোরমা করব।কিন্তু কাল দম বিরিয়ানি রান্না করবো।’

‘সেটা কি?’

‘সেটা খুব মজার খাবার।তোমাদের বানিয়ে খাওয়াবো।’

নিরু বলল,’তুমি এতো রান্না জানো?’

‘হ্যাঁ।শখ থেকেই শিখেছি।’

নিরুপমা দেখলো,মিতা আপা খুব স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ছুটোছুটি করে এটা সেটা জোগাড় করছেন।ধুয়ে রাখা চাল চুলায় দিতে দিতে মিতা হাসি মুখে বলল,’আমার আসলে একটা বড়ো বাড়ির খুব শখ বুঝলে?বড়ো বাড়ি না ঠিক,আমি চাই একটা বিরাট বড়ো সংসার।বাড়ি ছোট হোক।কিন্তু মানুষ বেশি হোক।আমি সারাদিন মিডিয়ার কামলা খেটে রাতে বাড়ি এসে ভালো বউ হতে চাই।আমি কিন্তু দারুণ ঘরনি হবো অরু।মিলিয়ে নিও আমার কথা।’

অরু মাথা নেড়ে বলল,’তুমি শুধু দারুণ ঘরনিই হবে না আপা।তুমি খুব ভালো মা,বউ,ভাবি,বোন-সব হবে।’

সুচিস্মিতা জবাব দেয় না।স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি নিজ থেকেই তার দুই ঠোঁট দখলে নেয়।

____

খাবারের টেবিলে বসার পরেই সুচিস্মিতা ডাকলো,’রেখা আপা! একটু কোরমার বাটিটা নিয়ে আসো তো।আমি আনতে ভুলে গেছি।’

রেখা এখানকার পরিচারিকা।হুকুম পেতেই সে বাটি হাতে খাবার ঘরে এলো।অভি তাকে দেখতেই কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ল।সেই অস্বস্তি সময়ে সময়ে শুধু বেড়েই গেল।যতোবার মিতা তার নাম ধরে সম্বোধন করছিল,ততবার অভির ভেতরটা খচখট করে উঠছিল।অভি বারবার উন্মনা হয়ে যাচ্ছিল।কোনোকিছুই আর ভালো লাগছিলো না তার।সে এক পর্যায়ে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেল।যেতে যেতে শুধু ক্ষীণ স্বরে বলল,’আমি খাবো না আর।’

কিছু জায়গায় মানুষ ভীষণ আবেগী হয়ে যায়।অল্পতেই কেমন স্পর্শকাতর হয়ে উঠে।অভির সাথে মাঝে মাঝে এমনটা হয়।খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা মাঝে মাঝে তার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।মনে হয়,গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে।অতি তুচ্ছ বিষয়ে এমন প্রতিক্রিয়া অভি দেখাতে চায় না।কিন্তু সব প্রতিক্রিয়া কি মানুষের নিয়ন্ত্রনে থাকে?অভি ধরে নিয়েছে,এই একটি ব্যাপারে সে একটু আবেগী।হতেই পারে এমনটা।দোষ তো কিছু নেই।

অরু ঘরে এসেই দু’বার কাশলো।হাত দিয়ে ধোঁয়া ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,’এতো সিগারেট খেতে জানো তুমি!’

অভি জবাব দেয় না।তার দৃষ্টি দূর আকাশে।টিম টিম করে জ্বলতে থাকা তারা গুলো একমনে দেখলে খুব অদ্ভুত লাগে।মনে হয় তারা নড়ছে।এই সুবিশাল আকাশের বুকে জেগে থাকা নক্ষত্রদের কি কোনো গন্তব্য নেই?তারা দিনশেষে কোথায় যায়?এই কৃষ্ণকালো গগনই কি তাদের শেষ গন্তব্য?

অরুনিমা চাপা স্বরে ডাকে,’হামাদ!’

‘কি?’

‘তোমার মন খারাপ?’

‘নাহ্।’

‘তাহলে?’

‘কিছু না।’

অরুনিমা মন খারাপ করে বলল,’সবকিছু ভেতরে ভেতরে চেপে রাখো।সেজন্যই তো কারো সাথে মিশতে পারো না ঠিক মতো।মন মতো মনের কথা খুলে না বললে,শরীরের ভেতর কথা জমতে জমতে চেহারার এই অবস্থা হয়।

অভি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকল।অরু এগিয়ে এসে তার কাঁধ হাত রাখে।

‘ঐ হামাদ!’

‘কি?’

‘তোমার মন খারাপ কেন?বলো না।চলো না একটু গল্প করি।’

‘মন ভালো আমার।’

‘মিথ্যা কথা।’

অরু হঠাৎই একটা কাজ করল।হাত বাড়িয়ে অভির চোখের নিচে থাকা কালচে আঘাতের চিহ্নটা ছুঁয়ে দিলো।অভি চমকে উঠে তার দিকে তাকালো।দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল,’কি হয়েছে?’

‘তোমার এই ব্যাথাটা দেখলে আমার কষ্ট লাগে।’

—–!

‘কিভাবে পেলে এতো ব্যাথা?’

অভি ঈষৎ হাসল।তাচ্ছিল্য করে বলল,’খু’ন করতে গিয়ে।’

‘উহু।বাজে বকো না তো।’

‘কেন?তুমি জানো না?আমি দুই দুইটা খু’ন করেছি।আর একজনকে খু’নের চেষ্টা করেছি।কিন্তু সে বেঁচে গেছে।’

অভি একটু সরে দাঁড়াল।অরুনিমা বাধ্য মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।অভিকে জ্বালাতন করলো না,আগ বাড়িয়ে কোনো অবান্তর প্রশ্নও করল না।অভি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বলল,’নিচের ঐ মহিলাটার নাম রেখা।’

‘হ্যাঁ।তো?’

অভির নিখাঁদ কন্ঠস্বর।একটা ঢোক গিলে বলল,’আমার মায়ের নাম রেখা।এই নামের প্রতি আমার একটা আলাদা দুর্বলতা আছে।’

অরুনিমা মাথা তুলে শুধু একবার তার দিকে তাকালো।তার যে দুর্বলতা আছে,সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।অভি নিজ থেকেই বলল,’তুমি তো আমার বউ তাই না?কতোগুলো মাস হয়ে গেল বিয়ের।অথচ কোনোদিন কথা হয় নি সেভাবে! এসো।খাটে এসে বসো।আজ রাতে আমরা গল্প করবো অরুনিমা।’

অরু তাজ্জব হয়ে তার দিকে তাকায়।অভি নিজ থেকে তাকে কথা বলার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে,ব্যাপারটা আগে কখনো ঘটেনি।অরুনিমা বিনা বাক্য ব্যয়ে খাটের এক কোণায় গিয়ে বসলো।

অভি শুরুতেই বসেনি।সে জানালার একদিকে ঠেস দিয়ে সরাসরি অরুনিমার দিকে না তাকিয়ে দেয়ালে ঝুলানো একটা ফ্রেম দেখতে দেখতে বলল,’আমার কথা বলতে হলে তো আগে আমার মা বাবার কথা বলতে হবে।তাদের কে দিয়েই তো আমার পরিচয় তাই না?’

সে হঠাৎই ঘাড় বাঁকা করে প্রশ্ন করে,’তোমাদের বংশে কেউ মুক্তিযোদ্ধা আছে অরুনিমা?’

অরু একটু ভাবল।তারপর মাথা নেড়ে বলল,’নাহ্।ওমন কাউকে সরাসরি যুদ্ধ করতে তো শুনিনি।’

অভি ছোট করে বলল,’ওহহ্।’

অরুনিমা ধৈর্যশীল শ্রোতার মতো চুপ করে বসে থাকে।অভি একটু গলা খাকারি দিয়ে বলতে শুরু করল,

আমার বাবা মাধ্যমিক পর্যন্ত একটা সাদামাটা স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন।তখন এতো নামিদামি স্কুলও ছিলো না।বাড়ি থেকে অনেক দূর গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো।দাদা তখন ভালোই স্বচ্ছল ছিলেন।ব্যবসা করতেন।ঠিকাদারির কাজ করতেন।
মাধ্যমিক শেষে বাবা একটা মিশনারি’জ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন।তারপর উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান।অথচ স্কুল জীবনের শিক্ষকদের সাথে একবার সাক্ষাৎ করার জন্য তার ভেতরটা আনচান করতো সবসময়।সেই সূত্র ধরে বাবা একদিন রমিজ মাস্টারের বাড়ি গেলেন।তার সাথে দেখা করার জন্য।এরপর আরো কয়েকবার বাবা সেখানে গিয়েছিলেন।’

অভি থামল।অরুনিমা খুব মন দিয়ে তার কথা শুনছিলো।অভি কিছুটা সহজ হয়ে বলল,’তোমার কি এখানে কিছু অদ্ভুত লাগে নি অরুনিমা?’

অরু অবাক হয়ে বলল,’অদ্ভুত কেন লাগবে?’

‘তুমি যে বোকা।তাই অদ্ভুত লাগে নি।বাবার তো অনেক অনেক শিক্ষক ছিলেন।বাবা কেন শুধু ঐ একজন শিক্ষকের বাড়িই যেতেন বলো তো?’

‘কারণ উনি ছিলো তোমার বাবার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক।’

অভি এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
‘বোকা মেয়ে! আমার বাবা সেখানে রমিজ মাস্টারের জন্য যেতেন না।সেটা তো একটা ছুঁতো ছিলো।আমার বাবা যেতেন রমিজ মাস্টারের মেয়েকে এক পলক দেখার জন্য।স্কুল জীবন থেকেই যার প্রতি বাবার দুর্বলতা ছিলো।’

অরু এক হাত মুখে চেপে চমকে উঠে বলল,’সর্বনাশ!তোমার মা জানে এসব?’

অভি মাথা নামিয়ে সামান্য হাসল।তারপরই মুখ গম্ভীর করে বলল,’রমিজ মাস্টারের মেয়ের নাম রেহনুমা রেখা।তিনি আমার মা।আমার এক জীবনের সমস্ত দীর্ঘশ্বাস।’

অরু একেবারে পাথরের মতো জমে গেল।কিছুক্ষণ অপলক অভির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,’তোমার মা! তোমার বাবা তাকে এতো ভালোবাসতো?’

অভির আবারো হাসি পেল।সে হেঁটে এসে খাটের একপ্রান্তে বসে বলল,’ভালোবাসার তো এখনো কিছু শুরুই হয় নি অরুনিমা।আগে সবটা শোনো।

আমার মা বেশ রক্ষণশীল চিন্তাধারার মানুষ ছিল।আমার নানার তিন মেয়ে।কোনো ছেলে নাই।মা সবার বড়ো।বাবা বাড়িতে এলে মা ই তার জন্য চা করে নিয়ে যেতেন।ঐ এক পলকের দেখা।সেটার জন্যই বাবা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতেন।বাবা কোনোরকমে দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনা শেষ করেই দিদান কে বলে দিলেন তার মনের কথা।শেষে এটাও বললেন,দিদান যেন খুব দ্রুত সেখানে প্রস্তাব পাঠান।আমার মা কিন্তু দেখতেও চমৎকার ছিলেন।সুতরাং দিদানের আপত্তি থাকার কোনো কারণই ছিলো না।দিদান আপত্তি করেও নি।কিন্তু আমার বাবা আর মায়ের বিয়েটা হয়েছিল দিদানের মতের বাইরে গিয়ে।’

অরু অবাক হয়ে বলল,’কেন?’

‘কারণ তাদের বিয়ের আগেই আরো অনেক কিছু ঘটে গেছে।গোটা একটা দেশের জন্ম হয়ে গেছে।তারপর কোনোকিছুই আর স্বাভাবিক ছিলো না।

এরপর একাত্তর এলো।যুদ্ধ শুরু হলো।মুক্তিযুদ্ধ।আমার বাবা তখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তেজী যুবক।জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির মাঝে বাবা দেশকেই এগিয়ে রাখলেন।বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন।যাওয়ার আগে শুধু একবার মাকে দেখে গেলেন।মা বলেছিলেন বিজয়ী হয়ে আসতে।
বাবা নাকি উত্তরে শুধু মাথা নেড়েছিলেন।তারপর রেহনুমার সাথে হাতেম শিকদারের আর দেখা হয়নি নয়মাস।

ক্র্যাক প্লাটুনের নাম শুনেছো কখনো?ঢাকা শহরে গেরিলা আক্রমণ চালানো সেই বিখ্যাত ক্র্যাক প্লাটুন।যারা একাই পুরো হানাদারদের রাতের ঘুম উড়িয়ে দিতো।আমার বাবা সেই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ছিলেন।শুধু তিনি না,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত ছাত্র,মুজিব বাহিনীর সদস্যসহ অনেক সামরিক বাহিনীর সদস্য এই গেরিলা বাহিনীর অংশ ছিলেন।শহীদ রুমি কে নিশ্চয়ই চেনো।রুমিও ক্র্যাক প্লাটুনের হয়েই যুদ্ধ করেছে।যদিও তার আর বাবার ইউনিট আলাদা ছিলো।

সেই যুদ্ধ চলল নয় মাস।ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা নয় মাস যাবত কতো কতো ভয়ংকর মৃ’ত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী হলো,তার কোনো ইয়াত্তা নেই।তারপর নয়মাসের যুদ্ধ শেষে লাখ লাখ তরুণের ব’লি হওয়ার পর আমরা পেলাম টকটকে লাল একটা ফুল।আমাদের দেশ।আমাদের মাতৃভূমি।একটা খোলা আকাশ।সেই আকাশ টা কতো কতো ত্যাগের পর আমাদের হলো তুমি জানো?’

অরু জবাব দিলো না কোনো।মোহাবিষ্ট হয়ে সে শুধু অভির কথাই শুনে গেল।কতো সুন্দর তার বাচনভঙ্গি! কি নিখাঁদ কন্ঠস্বর! কতো সুন্দর গুছিয়ে কথা বলছে! কোনো তাড়া নেই,কোনো বিরক্তি নেই,কিচ্ছু নেই।শুধু চোখ ভরে আছে বিশুদ্ধ অনুভূতির উপস্থিতি।

অভি একটা তপ্তশ্বাস ছেড়ে বলল,’যুদ্ধ জেতার পর আমার বাবা সবার প্রথমেই ছুটে গেলেন রমিজ মাস্টারের বাড়ি।অথচ বাবার যুদ্ধ জেতার আনন্দ মাটি হয়ে গেল,যখন বাবা দেখলেন ঐ বাড়িটা কোনো বাড়ি না,রীতিমতো একটা মৃ’ত্যুপুরী হয়ে আছে।

আমার নানা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন।তাদের তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন।এই কথা জানার পরই হানাদারদের দল তার বাড়িতে হামলা চালায়।পাখির মতো গু’লি করে নানা সহ তার বাড়িতে অবস্থানরত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মে’রে ফেলে।কিন্তু মেয়েদের মারল না।এক নিমিষেই যদি মে’রে ফেলে,তবে নামের আগে ব র্ব র,হিং স্র,হা য়ে না-এ জাতীয় শব্দ যোগ করতো কেমন করে?’

অভি চাপা স্বরে প্রশ্ন করল,’তুমি কি বীরাঙ্গনার মানে বুঝো অরুনিমা?’

অরু ছলছল চোখে মাথা নাড়ে।অভি তাচ্ছিল্য করে বলল,’ঐ জা নো য়া র গুলো তো মেয়ে দেখলেই কু কু রে র মতো ঝাঁপিয়ে পড়তো।সেখানে আমার মা ছিলো যথেষ্ট রূপবতী।তারা এতোটাই অ মানুষ ছিলো যে আমার মায়ের সাথে ঐ জ ঘ ন্য কাজ টা করেও শান্ত হয় নি।আমার ছোটো খালামণি,যার বয়স ছিলো মাত্র দশ,তার সাথেও তারা এই কাজ করেছে।আমার ছোট খালামনি ঐ নিপীড়ন সইতে না পেরে এক রাতেই আল্লাহর মেহমান হয়ে গেলেন।আল্লাহ তাকে কবুল করুক।’

অভির কন্ঠ জমে এলো।বলতে গিয়েও সে বার বার থেমে যাচ্ছিল।অরুনিমা থুতনি পর্যন্ত নেমে আসা জলের ধারা মুছে কোনোরকমে বলল,’আমিন।’

‘আমার মেঝো খালামনি করলেন আরো ভয়ংকর কাজ।সমাজের মানুষের কটুক্তি থেকে বাঁচতে খালামণি আত্ম হ ত্যা করলেন।সমস্ত যন্ত্রনা ভোগ করার জন্য বেঁচে থাকল শুধু আমার মা।বাবা নাই,বোন দু’টো নাই,মা তো সেই কতো আগেই মারা গেছে।আমার মায়ের আর থাকলো কি বলো তো?

তবে স্রষ্টা কি এতো নি’র্দয় হয় বলো?তিনি মায়ের জন্য বাবাকে পাঠালেন।বাবা কিন্তু সমাজের মানুষের মতো করে মা কে ছেড়ে যান নি।ছি ছি করে ধিক্কারও দেন নি।বাবা মাকে আগের চেয়েও দ্বিগুন ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন।যেই করুণ স্মৃতি মাকে দিন দিন পা গ ল করে তুলছিলো,সেই স্মৃতি থেকে মা কে মুক্তি দেওয়ার জন্য বাবা সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেন।

ভালোবাসা কি অরুনিমা?যাকে দেখতে শান্তি লাগে,সেই আমাদের ভালোবাসা।যার একটু সঙ্গ,একটু সহানুভূতি আমাদের ভেতরটা পরিষ্কার করে তোলে,তার মতো মনের মানুষ আর কোথায় পাবো আমরা?আমার মা ছিলো আমার বাবার মনের মানুষ।মনের মানুষকে জীবনভর ভালোবাসার জন্য শুধু তার মনটাই লাগে অরুনিমা।সেই মনে অন্য মানুষ না থাকলেই হলো।শরীর দিয়ে কি যায় আসে?শরীরের তাড়না তো প তি তা ও মেটাতে পারে।মনের তাড়না মেটায় কারা?আমার বাবা সবকিছুর পরিশেষে আমার মা কেই চাইলেন।

কিন্তু আমার দাদি কখনো মা কে মেনে নিতে পারে নি।কখনো না।মায়ের ঐ ব্যাপারটা জানতেই দিদান বেঁকে বসলো।মায়ের মতো মেয়ের সাথে নাকি তার ছেলের বিয়ে দিবে না।শেষে বাবা তার মায়ের অবাধ্য হয়েই মা কে বিয়ে করেছিলেন।

বিয়ের দুই বছর পর আর কোনো উপায় না পেয়ে দিদানও তাদের মেনে নিয়েছিল।মন থেকে মানে নি,তবে বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছিল।তাদের বিয়ের কয়েক বছর পর আমার জন্ম হলো।বাবা তখন পড়াশোনা শেষে পত্রিকায় লিখালিখি করতেন।কোনো লিখা যদি ক্ষমতাসীন দলের বিপরীতে যেতো,তাহলেই শুরু হতো হুমকি ধমকি।কোনো এক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আর্টিকেল ছাপানোর দায়ে বাবাকে গু’লি করে মে’রে ফেলল ঐ নেতার কর্মীরা।
মা তখন এই এতো বড়ো বাড়িতে আমাকে নিয়ে একা।আমার বয়স তখন মাত্র এক।তারপর মা সাত বছর যাবত আমাকে বুকে আগলে মানুষ করেছে।আমি ছোট ছিলাম।কিন্তু অবুঝ ছিলাম না।এই বাড়ির মানুষরা যে আমার মায়ের সাথে কেমন কু কু রে র মতো আচরণ করতো,আমি সবই দেখেছি।দিদান আমাকে খুব ভালোবাসতো।কিন্তু দিদান বাদে আর কেউ আমাকে সেভাবে ভালোবাসেনি।তবুও টুকটাক স্নেহ অবশ্য করেছে।কিন্তু মা কে কেউ তিল পরিমান সম্মানও দেয়নি।আমি আমার মায়ের সবটা দেখেছি।আমার মায়ের আমি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।’

অভি পুরোপুরি গা ছেড়ে খাটে শুয়ে বলল,’তোমায় একটা কথা বলা হয় নি অরুনিমা।’

অরু চাপা স্বরে বলল,’কি?’

‘নিরুপমা কে আমার প্রথম দেখায় মায়ের মতো মনে হয়েছিল।তুতুনের জায়গায় নিজেকে রাখছিলাম বার বার।তখন ঐ মেয়েটার প্রতি আমার প্রচন্ড সহানুভূতি কাজ করছিলো।ভাবছিলাম,আমার মতো ছন্নছাড়া লোক নিরুপমাদের জীবন গোছাতে পারে না।তাদের প্রয়োজন খুব ধৈর্যশীল আর ঠান্ডা মেজাজের পুরুষ।আমি তো সেই পুরুষ নই।আর তোমাকে দেখে আমার কি মনে হয়েছিল জানো?
মনে হয়েছিল তুমি একটা বাচাল মেয়ে।আর সাথে অহংকারী।তখন মনে হলো আমার মতো ভবঘুরের জন্য তুমিই ঠিক আছো।
কিন্তু বিয়ের পর মনে হলো,এটাও ভুলই ছিলো।তুমি একটা ফুলের মতো স্নিগ্ধ মেয়ে।কোথায় তোমার একটা রঙিন জীবন।আর কোথায় আমার এই খুন খারাবির কালো জীবন!’

অভি একটু শ্বাস ছাড়ল।কিছুক্ষণ দম ফেলে চুপচাপ শুয়ে থাকলো।অরু তার পাশ ঘেঁষে বসলো।অভি সামান্য হেসে বলল,’আমি জানি অরুনিমা।তোমার বয়স অল্প।তোমার ঘুরতে ইচ্ছে হয়।এখানে সেখানে যেতে মন চায়।এটা সেটা খেতে ইচ্ছে করে।কিন্তু সমস্যা টা আমার।আমি এতো ভীড়ভাট্টা,এতো লোক সমাগম পছন্দ করি না।আমার একাকীত্ব ভালো লাগে।নিজের একটা ছোটো পৃথিবী তৈরি করে সেই পৃথিবীতে থাকতে ভালো লাগে আমার।

আমার মা একদিন বাজারে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি।আমি তখন বাড়িতে।পরে দুই দিন বাদে নাকি বুড়িগঙ্গায় মায়ের লা’শ পাওয়া গিয়েছিল।এর বেশি কিছু জানি না আমি।আমি মা কে দেখতেও যাইনি।ভয় হতো আমার।আমি মনে মনে কল্পনা করতাম,মা বেঁচে আছে,মা একদিন আসবে।

এরপর আমার জীবনটা একেবারে এলোমেলো হয়ে গেল।আমি নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিলাম আস্তে আস্তে।সামির তিয়াসা,হৃদি হাশিম,এহতেশাম কারো সাথেই তেমন মিশতাম না।আমি থাকতাম আমার মতো করে।একা একা।দিদান বাদে আমি কারো কাছেই যেতাম না।চাচাজান ভাবতো আমি মনে হয় পা গ ল টা গ ল হয়ে গেছি।কিন্তু আমি ছিলামই এমন।পুরো বাড়ির উল্লাস আমাকে স্পর্শ করতো না।আমার শুধু মা কে মনে পড়ত।মা মা’রা যাওয়ার পর আমি আর কারো সাথে সহজ হতে পারি নি।আমি বহু বছর এমন অসামাজিক হয়েই ছিলাম।বাকিরা মাঝে মাঝে আমার কাছে আসতো।কিন্তু সৃজু রোজ আসতো।সৃজুকে যে একদম ধাক্কা মেরে বিদায় করে দিতে পারি না ঘর থেকে,তার একটা কারণ এই অতীত।সেসময় সৃজনী বাদে তেমন কেউ আমাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

একাকিত্ব মানুষ কে অসামাজিক করে দেয়।এরপর মানুষ ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক আর হিংস্র হয়ে উঠে।আমিও ধীরে ধীরে কেমন যে হয়ে উঠলাম।মানুষ কে প্রহার করা তখন আমার কাছে মামুলি ব্যাপার।

আমাদের বাড়ির লোকজন আমার মা কে পতিতার চোখে দেখতো।অথচ আমার মা ছিল প্রচন্ড আল্লাহ ভীরু বান্দা।মাকে অপমান করে,কিংবা ঠেস মেরে কথা বললে আমার খুব গায়ে লাগতো।’

অভি থামলো।একবার চোখের নিচে থাকা সেই কাটা দাগ স্পর্শ করে বলল,’এহতেশামের বাপ কে তো কোনোদিন দেখোনি।তার মতো ইতর আর জা নো য়া র কিসিমের মানুষ আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।সে আমার সামনে আমার মা বাবাকে নিয়ে কেমন কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলতো।আমি তাদের সন্তান।মা বাবাকে নিয়ে বাজে ইঙ্গিতের কথা কোন ছেলে সহ্য করবে?তার চাচা দু’টো ছিলো আরো বেশি নিকৃষ্ট।বারবার আমার সামনে আমার মা বাবার ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতো।আমার জন্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতো।আমার জন্ম পঁচাত্তরে।আর যুদ্ধ হয়েছে একাত্তরে।কিন্তু ঐ অসভ্য গুলো আমাকে জারজ সন্তান বলতো।বারবার প্রতিবার।এহতেশাম তো এসব কথা তাদের থেকেই শিখেছে।শালা এদের পুরো গোষ্ঠীটাই শু’য়োর।প্রত্যেকটা অমানুষের বাচ্চা।’

বলতে বলতেই রাগে অভির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।অরু দেখলো প্রচন্ড ক্রোধে অভির কন্ঠ কাঁপছে।সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,’ঐ তিনটা শু’য়োর কে মা’রতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত।এজন্য আমি আরো তিনবার জেলে যেতেও রাজি আছি।যাওয়ার আগে একবার এহতেশামের বাপের গলাটা টিপে দিয়ে যেতে যাই।অসভ্য একটা!’

অরুনিমা ভয়ে ভয়ে বলল,’তুমি সত্যিই ওদের মে’রে ফেলেছো?’

অভি হাসল কেবল।
‘মা’রতে তো চাইনি।কিন্তু খু ন চেপেছিল মাথায়।আমার একটা পোষা বেড়াল ছিলো।আমি সবসময় তাকে আমার কাছে রাখতাম।তারা কি করেছে জানো?

তারা আমার বিড়ালটাকে লাথি মেরে তিনতালার ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে।’

অরুনিমা তাজ্জব হয়ে বলল,’কি অদ্ভুত! পা গ ল নাকি?’

‘পাগল না।আমাকে খোঁচাতে আর রাগাতে এদের ভালো লাগতো।এজন্য এসব করতো।আমি যখন আমার আদরের পোষ্যর এই দশা দেখলাম,আমার মাথার রক্ত সব টগবগিয়ে উঠল।রান্নাঘরে গেলাম।একটা রামদা হাতে নিলাম।আর গায়ে যতোক্ষণ শক্তি ছিলো,ততক্ষণ তিনটাকে ধরে কু পি য়ে ছি।’

অরুনিমা জড়োসড়ো হয়ে একপাশে চেপে বসল।ভীতু সন্ত্রস্ত গলায় একটু একটু করে বলল,’একেবারে জানেই মে রে দিলে?’

‘উহু।জানে মারে নি।চাচাজান আর হাশিম দয়া দেখিয়ে হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছিল।এহতেশাম পরের দিন ছুটিতে এলো।দুই দিন এরা আইসিইউতে ছিলো।তারপর এহতেশামের বাপ কোমায় চলে গেল,আর বাকি দু’টো কবরে।

ন্যায়ের ঝান্ডা উড়ানো মেজর এহতেশাম তখন আমার বিরুদ্ধে কেস ফাইল করলেন।আমি জেলে গেলাম।দুই বছর জেল খাটলাম।তারপর বেরিয়ে এলাম আগের চেয়েও অনুভূতি শূন্য হয়ে।

তোমাকে একটা কথা বলি।এহতেশাম কিন্তু নিরেট ভদ্রলোক না।সে একটা আস্ত ভন্ড।খু ন-খা রা বির হাত কিন্তু তারও পাকা।সবার সামনে ভং ধরে।তাকে আমি শিরায় শিরায় চিনি।এসব আর্মিদের দেখে গলে যাওয়ার কিছু নেই।এগুলো হচ্ছে এক একটা লেবাসধারী।ভেতরে ভেতরে খোঁজ নিয়ে দেখো,কতো মানুষ মে’রে ফেলে।কেউ হদিসও পায় না।এহতেশাম যে বান্দরবান আর কক্সবাজারে কয় হাজার শত্রু বানিয়ে রেখেছে,সে নিজেও জানে না।’

অরুনিমা হুট করেই প্রশ্ন করল,’তুমি কেমন করে জানো যে এহতেশাম ঐসব জায়গায় শত্রু বানিয়ে এসেছে?’

অভি চুপ হয়ে গেল সহসা।এই ব্যাপারে কোনো কথা বলল না আর।কিছুক্ষণ পর প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,’অরুনিমা।আমি এমনই।তুমি যেমনটা চাও,এমনটা আমি কোনোদিন হতে পারবো বলে মনে হয় না।আমি বরাবরই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন,লোকালয় থেকে আলাদা।’

অরু চোখ তুলল।দুই হাতে ভয় দিয়ে পুনরায় তার কাছে এগিয়ে এসে বলল,’আমার এই তুমিটাকেই ভালো লাগে হামাদ।’

অভি বিনিময়ে সামান্য হাসার চেষ্টা করল।বলল,’আমি মেয়েদের প্রতি খুব বেশি কঠোর হতে পারি না।যদি হতাম,তবে দিদানের সাথে আমি কোনোদিনই কথা বলতাম না।কিন্তু আমি দিদানের সাথে কথা বলি।তোমার সাথে নরম আচরণ করি।হৃদি,সৃজু,তিয়াসা,সায়মা-কারো সাথেই আমি অতিরিক্ত রূঢ় আচরণ করি না।মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ে।মনে হয় একবার যদি মা ফিরে আসতো।তাহলে আমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করতাম।তখন বোধহয় আমি খুব ভালো একটা মানুষ হতাম।’

অভি তার কথা শেষ করল এক বুক দীর্ঘশ্বাসের সাথে।অরুনিমা মলিন চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর আস্তে করে তার কাঁধে মাথা রাখল।জড়ানো স্বরে বলল,’তুমি তো এমনিই ভালো মানুষ হামাদ।আর কি ভালো হবে?’

অভি প্রতিউত্তর করল না।শুধু প্রশান্তিতে দু’টো দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।তারপর ডানহাতের তর্জনী তার চওড়া পুরুষালি বক্ষে ঠেকিয়ে গভীর স্বরে বলল,’কাঁধে মাথা রাখছ কেন অরুনিমা?এদিকে মাথা রাখো।দেখো কতোখানি ঝ ল সে গেছে ভেতরটা।বছরের পর বছর পুড়তে পুড়তে এখন শুধু অঙ্গারই আছে এখানটায়।হৃদয়?সে তো কবেই জ্বলে গেছে মানুষরূপী পশুদের তান্ডবে!’

চলবে-

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২৯.
[লিখতে লিখতে ভীষণ দেরি হয়ে গেল।পরে রিচেক দিবো।]

রুটিনমাফিক চেকআপ সম্পন্ন হয়েছে।রেইডার্স টিমের সব সদস্যরাই আপাতত সুস্থ,মিশনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।বিগ্রেডিয়ার সলিমুল খানের সাথে গতকাল রাতে এহতেশামের কথা হয়েছে।তিনি বললেন,সব ঠিক থাকলে আগামীকাল সকালেই যেন তারা বেরিয়ে পড়ে।

কর্ণেল আহাদ রাত থেকে ব্যস্ত ভীষণ।মূল টিমের পাশাপাশি আরো দু’টো সাব ইউনিট তৈরি করা হয়েছে।যদি কোনো কারণে পরিস্থিতি বেগতিক হয়,তবে এহতেশাম আহাদের নিকট সিগন্যাল পাঠাবে।তারপর আহাদ বাকি টিমদের নিয়ে বেরিয়ে পড়বে।

সকাল হতে হতে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এলো।বলা হলো,আগামীকাল রেইডার্স টিম এবং সহযোগী ইউনিটের সবাই এক সাথে বের হবে।কিন্তু টার্গেট এলাকার আশেপাশে শুধু মূল টিম থাকবে।বাকিরা থাকবে একটু দূরে,ছড়িয়ে ছিটিয়ে।জুম ঘরের ভেতরে কয়জন মানুষ আছে,তার উপর সবটা নির্ভর করছে।যদি জুম ঘরের ভেতরে মানুষ কম থাকে,তাহলে এহতেশামের টিমই তাদের প্রতিহত করতে পারবে।অন্যথায় সহযোগী টিম তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে।

আজ সকালে সব রকমের রাইফেল এবং শটগান বের করে একবার পরীক্ষা নিরিক্ষা চালানো হবে।
আজকের দিনটা ক্যাম্পের লোকজন কাটাবে তুমুল এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে।

আশিক সকাল থেকেই ফাঁকফোকর খুঁজছিল।কোনোভাবে যদি একটু আড়ালে যাওয়া যেত! পরে আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে আশিক একটু সুযোগ পেল।ফোনটা পকেট থেকে বের করেই সে পাহাড়ের এক মাথায় ছুটে গেল।মুঠোফোনটা কানের সাথে চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,’কেয়া! কেমন আছো তুমি?’

অন্য পাশের মেয়েলি কন্ঠটা লাজুক হয়ে জবাব দিলো,’ভালো।আপনি কেমন আছেন?’

‘আছি কোনোরকম।কাল তো আমাদের মিশন।আজ একটু পর পর চেকআপ দিচ্ছে সবাইকে।’

কেয়া বলল,’কয়দিনের মিশন?’

‘উহু।একদিনই।কয়েক ঘন্টায় যা করার করতে হবে।’

‘আপনারা কয়জন যাচ্ছেন?’

‘এই তো।আমাদের মূল টিমে আছে বারোজন।আর অন্য টিম গুলো তে সাত জন করে আছে।’

কেয়া চাপা স্বরে বলল,’সাবধানে থাকবেন।’

আশিক হাসল।রহস্য করে ডাকল,’কেয়া!’

‘জ্বী?’

‘যদি আমি ম রে যাই?’

‘আসতাগফিরুল্লাহ! এসব কি বলেন?’
কেয়া প্রবল স্বরে প্রতিবাদ করলো।জোর খাটিয়ে বলল,’আল্লাহর ওয়াস্তে এসব কথা বলবেন না।আল্লাহ কখন কাকে কবুল করে নেয়,কেউ জানে না।’

‘আরে! তুমি তো সিরিয়াস হচ্ছো।কুল ডাউন।মজা করছিলাম।’

‘এসব মজা আমার ভালো লাগে না একদম।’

‘কেয়া!’

পুরুষালি কন্ঠটা অনুনাদিত হয়ে ফোনের অপরপ্রান্তে ভেসে গেল।কেয়া মেলানো স্বরে বলল,’জ্বী?’

‘মুঠোফোনেও কি প্রেম হয় কেয়া?’

‘হয়তো হয়।’

‘আমার কেমন যেন লাগছে।তোমার কথা মনে পড়ছে।মন চাইছে তোমাকে সামনে এনে বসিয়ে রাখতে।’

কেয়া হাসল।বলল,’সেটা আর সম্ভব কোথায়?’

আশিক হঠাৎই গম্ভীর হয়ে বলল,’কেয়া!’

‘জ্বী।’

‘তোমার সাথে কতো কিছু নিয়ে কথা হয়েছে।তুমি আমায় কতো কথা বলেছো।কিন্তু কখনো তো সেই কথাটা বলো নি।’

কেয়ার কন্ঠটা আগের চেয়েও ক্ষীণ হয়ে এলো।মিনমিন করে বলল,’কি কথা?’

‘সেটা তো তুমি ভালো করেই জানো।’

‘আমি জানি না।’

বলতে বলতে সে লজ্জায় আরক্ত হয়।আশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমস্ত নিরবতাকে গ্রাস করে বলল,’একটা কথা শুনো কেয়া।’

‘জ্বী বলুন।’

‘আমার না তোমাকে কেমন কেমন লাগে।মানে কেমন একটা যে লাগে।’

কেয়া ভড়কে গিয়ে বলল,’মানে?’

‘মানে তোমাকে দেখার জন্য আজকাল ভেতরটা আনচান করে।মন চায় তোমার সামনে বসে কথা বলতে।তোমাকে একটু কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে হয়।মনে হয় কাজ ফেলে শুধু তোমার সাথেই কথা বলি।তুমি আমাকে বলো তো,এটা কি কোনো রোগ কেয়া?’

ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে চাপা হাসির গুঞ্জন শোনা গেল।কেয়া তাৎক্ষণিক কিছুই বলল না।আশিক অধৈর্য হচ্ছিল ভীষণ।শেষে কেয়া হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বলল,’রোগ নাকি জানি না।তবে আজকাল এই রোগের উপসর্গ আমার মাঝেও দেখা দিচ্ছে ক্যাপ্টেন।এই রোগের কি কোনো ঔষধ আছে?’

শুকনো খটখটে প্রকৃতি।বৃষ্টির ছোঁয়া নেই কোথাও।তবুও কোথা থেকে তুমুল বর্ষণ এসে আশিকের সমস্ত হৃদয় সিক্ত করে দিলো।আশিক নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে ভেতরের সমস্ত ঝড় গোপন করে রাশভারি গলায় বলল,’তবে ঔষধ খেয়ে কি হবে?চলো দু’জনই একসাথে রোগী হয়ে পথে পথে ঘুরি।সব রোগের চিকিৎসা হতে হবে,এমন তো কোনো কথা নেই।’
.
.
.
.
অরুনিমা লাগেজে থাকা খুব সুন্দর মেরুন শাড়িটা বের করেই একবার গায়ের সাথে চেপে ধরল।আয়নার তার প্রতিবিম্ব ভালো দেখাচ্ছে।সে মুখে স্নিগ্ধ হাসি টেনে ডাকল,’হামাদ! দেখো তো।শাড়িটা সুন্দর না?’

অভি দেখছিল দেয়ালে ঝুলতে থাকা তৈলচিত্র।সেখান থেকে মনোযোগ সরিয়ে এক পলক অরুনিমা কে দেখে বলল, ‘ভালোই।’

অরুনিমা মুখ কুঁচকায়।অভিমানের সুর টেনে বলে,’সবসময় এমন কিপ্টেমি করে কথা বলো তুমি।কোনোদিনও বলো না যে খুব সুন্দর লাগছে।’ভালোই’ নয়তো ‘খারাপ না’ – এই দুইয়ের বাইরে তোমার আর কোনো কথা নাই।আমাকে বুঝি কখনোই খুব সুন্দর লাগে না?’

অভি উত্তর দিতে গিয়েও চুপ হয়ে গেল।শাড়ির রং সুন্দর।এর চেয়েও সুন্দর অরুনিমার মুখের হাসি।এর চেয়েও চমৎকার তার চোখের দ্যুতি।কিন্তু অভি এই ব্যাপার গুলোকে কোন উপমায় ব্যাখ্যা করবে?

অস্বস্তিতে মাথা নামায় সে।অরু আবার বলল,’তুমি বলো তো।আমি কি সুন্দর না দেখতে?’

অভি বিষম খায়।বহু কষ্টে কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে উত্তর দেয়,’হুম।সুন্দরই।’

‘তোমার এই সবকিছুর শেষে ই লাগানোর স্বভাব বাদ দাও তো।বিরক্ত লাগে।’

অরুনিমা লটকানো মুখে পুরো শাড়ি খুলে।বিড়বিড় করতে করতে বিষন্ন হয়ে বলে,’আজ আমি শাড়ি পরবো।মিতা আপা সুন্দর ক্যামেরায় আমার ছবি তুলে দিবে।’

অভি বসা থেকে উঠে ঘরের বাইরে যেতে উদ্যত হলো।অরু খপ করে তার হাত ধরে বলল,’এ্যাই হামাদ! যাচ্ছ কোথায়?’

অভি চমকায়।চোখ তুলে বলে,’তুমি শাড়ি পরো।আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।’

অরুনিমা হাত রাখে কোমরে।মুখটাকে অত্যাধিক মাত্রায় সংকুচিত করে বলে,’বাপরে! এমন পর পুরুষের মতো ভাব দেখাচ্ছ কেন হামাদ?তুমি আমার বর না?এখানেই থাকো।যেতে হবে না তোমার।কুচি ধরে দিবে।’

অভি ভ্রু উঁচিয়ে ধরে বলল,’আমি তোমার কুচি ধরবো?’

‘হ্যাঁ।কোনো সমস্যা?’

‘আমি জীবনেও এই কাজ করিনি।’

‘বিয়েও তো জীবনে করো নি।আমাকে তো করেছিলে।তাই জীবনেও কুচি না ধরে থাকলে,আমার কুচি ধরে কুচি ধরার উদ্বোধন করে ফেল।’

অভির চাহনি শান্ত।রাগ,বিরক্তি কিছু নেই।তবে কিছুটা সন্দিহান বটে।শুরুতেই সে ছিটকিনি তুলে দরজা বন্ধ করল।প্রশ্নাত্মক চোখে কিছুক্ষণ অরুকে দেখে বলল,’সত্যি ধরতে বলছো?’

অরুনিমা উত্তর দিলো না।অভিকে দুই হাতে পেছন ঘুরিয়ে বলল,’আগে আঁচল ফেলতে দাও।তারপর পেছন ফিরবে।’

অভি দাঁড়িয়ে থাকে সংয়ের মতো করেই।অরু ডাকতেই পেছনে ফিরল।অরুনিমা বলল,’আমি তোমার দিকে কুচিগুলো এগিয়ে দিবো।তুমি ধরবে।কেমন?’

‘আচ্ছা।’

অভি ধরে।প্রতিটা কুচি সাবধানে ধরে।প্রথমে জড়তা কাজ করছিল।কিন্তু অরুর চিৎকার চেঁচামেচি আর দুরন্তপনায় সেই জড়তা কেটে গেল নিমিষেই।তখন আর চোখের সামনে কারো উন্মুক্ত পেট আর পিঠ দেখার লজ্জা অভিকে আড়ষ্ট করল না।কিন্তু সামনে থাকা আধপাগল মেয়ে মানুষটির একের পর এক ভুল তাকে অতিষ্ট করে তুলল কিছুক্ষণেই।

অরুনিমা ঠিক মতো কুচি গুজতে পারছিল না।পেট টা ফুলে ছিল।দেখতে বাজে লাগছিলো তাকে।অভি মেজাজ দেখিয়ে বলল,’ছাড়ো তো তুমি।কোনো কাজের না।এদিকে এসো।আমি গুজে দেই।’

সে একটানে তাকে কাছে এনে তার পেটে কুচির অংশটুকু গুজে দিল।মুখে এতোটাই বিরক্তি ছিলো যে বিরক্তির প্রভাবে সংকোচ উড়ে গেল খুব দূরে কোথাও।

অথচ অরু কেঁপে উঠল সামান্য।পেটের ভেতর কিছু একটা গুটলি পাকাচ্ছিল নিজের মতো করে।সে দেবদাস সিনেমার পার্বতীর মতো করে দুই হাত মুখে চেপে লজ্জায় ছুটে গেল বারান্দার দিকে।

কিন্তু সে কবে পার্বতী ছিলো?যেতে যেতেই কোথায় যেন হোঁচট খেয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচে পড়ল।বহু কষ্টে গুজে দেওয়া শাড়ি মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে বেরিয়ে এলো।সবটা গড়াগড়ি খাচ্ছিল মাটিতে।অভি কয়েক পল অবাক হয়ে তাকে দেখে।তারপর কপাল চাপড়ে বলল,’অরুনিমা! তোমাকে আমি চড় মারবো।’

অরু তার বচনভঙ্গিতেই হেসে ফেলল।প্রাণোচ্ছল কন্ঠে বলল,’তোমার হাতে চড়ও কবুল।’

অভি একটানে তাকে তুলে দাঁড় করালো।মুখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে কানের পেছনে গুজে দিয়ে বলল,’একদম নড়বে না।আমি সব করছি।নড়লে থাপ্পড় দেব ধরে।’

অরু যন্ত্রের মতো দাঁড়ায়।আড়চোখে শুধু অভির বিরক্তি ধরা আর রেগে যাওয়া মুখটা দেখে।এই মুখ দেখে কেউ বলবে যে কাল অরু কার বুকে মাথা রাখার সুযোগ পেয়েছিল?

শাড়ি পরানো শেষ হতেই অভি জলদগম্ভীর গলায় হুশিয়ারি দিলো,’বেশি নড়লে খবর করে দিবো।’

অরুনিমা আয়নায় একবার নিজেকে দেখে।তারপর এগিয়ে এসে দু’হাতে অভিকে ধরে পা দু’টো উঁচু করে তার কাঁধের দিকে থুতনি ঠেকিয়ে বলে,’এবার বলো আমায় কেমন লাগছে?’

অভি থতমত খেল।অপ্রস্তুত হয়ে বলল,’কেমন আবার লাগবে?যেমন লাগার,এমনই লাগে।’

‘সুন্দর না খারাপ?’

‘সুন্দরই।’

অরু দুষ্টু হেসে বলল,’এতো কাছ থেকেও শুধু সুন্দরই লাগে?’

অভি কয়েক মুহূর্তের জন্য তব্দা খেয়ে গেল।একটু ধাতস্থ হতেই দুই চোখ সরু করে বলল,’কাছে এলে সৌন্দর্য বাড়ে?’

‘বাড়ে তো।তাছাড়া দেখতে যেমনই লাগুক,বিনিময়ে একটা গাল ভেজানো চুমু তো আমার প্রাপ্য।মুভিতে দেখো নি,নায়িকা শাড়ি পরলে নায়ক কি সুন্দর তার গালে চুমু খায়,পলক ফেলতে ভুলে যায়?’

অভি পর পর দুইবার পলক ফেলে।প্রচন্ড আশ্চর্য হয়ে বলে,’তোমার আপা বিয়ের সময় বলছিলো,তুমি নাকি বাচ্চা।কম বুঝো।এখন দেখছি তুমি আমার চেয়েও দুই লাইন বেশি বুঝো।’

অরু হেসে ফেলল।রোজকার মতো অভির কাঁধে নাক ঘঁষতে ঘঁষতে আহ্লাদী স্বরে বলল,’আপা হলো আপা।তুমি হলে তুমি।আপার কাছে আমি বাচ্চা।তোমার কাছে আমি বউ।শোনো হামাদ।আমি কিন্তু সব জানি।’

অভি ভ্রু তুলে।জানতে চায়,’কি জানো?’

অরুনিমা এবার একটু লজ্জা পেল।অভিকে ছেড়ে দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল,’বর বউ কিসব করে,সবই জানি।’

সে বলতে গিয়েই লজ্জায় এইটুকু হয়ে এলো।তারপর সেই আরক্ত মুখখানা নিয়েই সে শাড়ির আঁচল খাঁমচে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।শুধু অভি দাঁড়িয়ে থাকল হতভম্ব হয়ে।তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এটা সেই মেয়ে যে কিনা তার ভয়ে সবসময় ঘরের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকতো।
.
.
.
.
নিরুপমা নিহাদ কে নিয়ে খুব সাবধানে পুকুর ঘাটে গেল।নিহাদ তার গলা জড়িয়ে ঘুম ঘুম চোখে চারপাশ দেখছিল।নিরু বলল,’কি সুন্দর না বাবা?একদম ছবির মতো সুন্দর।’

নিহাদ হাই তুলে ঘুম জড়ানো গলায় বলল,’নামতে চাই মা।’

‘না রে বাবা।ঘাটে যা শেওলা পড়েছে! তুমি যদি পড়ে যাও?তখন মায়ের কি হবে?’

‘পববো না মা।নামাও।পিইজ?’

নিরুপমা তাকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে দুই দিকে মাথা নেড়ে কিছুটা অভিনয়ের সুরে বলল,’না না।আমার ছেলের যদি কিছু হয়।তখন আমি কোথায় যাবো?কাকে আদর দিবো?বলো তো?’

নিহাদ মায়ের বুকে মাথা ঠেকায়।ধিমি আওয়াজ ডাকে,’মা!’

‘বলো সোনা।’

‘আদল দাও।’

নিরু হাসে।মুখ নামিয়ে তার সমস্ত মুখে অজস্র চুমু খায়।আদর দিয়ে বলে,’আমার সোনা বাচ্চা একটা!’

নিরুপমা চোখ মেলে সামনে তাকায়।গাঢ় স্বরে বলে,’মা পড়াশোনা শেষ করে এমন একটা বাড়ি বানাবো তুতুন।তারপর সেখানে শুধু মা আর তুতুন থাকবে।আমরা ঘুম থেকে উঠে ঘাটে যাবো।তুতুন তারপর স্কুল ড্রেস পরে স্কুলের জন্য রেডি হবে।মা রান্নাঘরে গিয়ে নাস্তা বানাবে।উঠোনে এতোগুলো মুরগি ছুটোছুটি করবে।মা তাদের খাবার খেতে দিবো।কতো সুন্দর হবে সেই জীবন।তাই না?’

তুতুন উত্তর দিলো না।শুধু মায়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালো।শেষে মায়ের বুকে আলতো করে মাথা ঠেকিয়ে আঙুল চুষতে চুষতে বলল,’তোমাকে সুন্দো লাগচে মা।’

নিরুপমা হাসে।প্রাণখোলা স্বচ্ছ হাসি।আচমকাই ক্যামেরার ক্যাচক্যাচ শব্দে তার ঘোর কাটে।সে অবাক হয়ে পাশে ফিরে আবিষ্কার করে মিতা আপা তার ছবি তুলছে।নিরু চমকে উঠে বলল,’একি! না বলে তুলে নিলে?’

সুচিস্মিতা হাসিমুখে এগিয়ে আসে।বলে,’একদম।না বলে তোলা ছবি অনেক সুন্দর আসে।এই যেমন হাসিমুখে তোমায় চমৎকার লাগছিল।কিন্তু ছবির জন্য যদি বলতাম হাসতে,তাহলে এতো চমৎকার লাগতো না।’

মিতা বসল তাদের দু’জনের পাশে।তুতুনের গালে একটা টোকা মেরে বলল,’এ্যাই বাবা! খালামণির কাছে আসবে?’

তুতুন হাত বাড়িয়ে তার কাছে গেল।জিজ্ঞাসু হয়ে বলল,’তুমি উঠে গেচো?’

‘হ্যাঁ।তোমাকে কোলে নিব বলে তাড়াতাড়ি উঠে গেছি।’

জগলু আড়মোড়া ভেঙে তার পেছনে এসে দাঁড়ালো।বলল,’মিতা আপা! আজকের মেন্যু কি?’

মিতা পেছন ফিরে।চোখ রাঙিয়ে বলে,’আমি আপনার আপা হলাম কবে?’

‘ঐ তো।সবাই বলে।তাই আমিও বললাম।’

‘থাক।ধন্যবাদ।সবাই বললেই আপনাকে বলতে হবে না জগলু ভাই।’

সুচিস্মিতা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।জগলু তার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বলল,’আপনি আবার ভাই ডাকছেন কেন?’

‘কেন?ভালো লাগছে না?’

‘নাহ্।একদমই না।’

সুচিস্মিতা জবাবে কেবল হাসল।জগলু রান্নাঘরে এসেই কেবিনেটের উপর পা ঝুলিয়ে বসল।মিতা শাড়ির আঁচল কোমরে প্যাঁচাতেই প্রশ্ন করল,’আজ কি রান্না করছেন শুনি?’

‘দম বিরিয়ানি।’

‘বাবাহ্!’

‘হায়েদ্রাবাদি স্টাইলে।’

‘বাপরে! অতোদূর যাওয়ার কি দরকার?বাংলাদেশেই থাকুন।’

সুচিস্মিতা কেটে রাখা মাংসের টুকরায় মশলা যোগ করতে করতে বলল,’অফিস কলিগ সব রিভিউ দিয়েছে এটা নাকি খেতে খুব মজা।আমি মজা করে পারব নাকি জানি না।’

‘অবশ্যই পারবেন।মিতা পারে না,এমন কিছু বাংলাদেশে নাই।’

সুচিস্মিতা মৃদু হাসল।চোখ পাকিয়ে বলল,’এটা আবার বেশি বেশি।’

মিতা নিজ থেকে ডাকে।
‘জুহায়ের!’

‘জ্বী।’

‘ফার্মহাউজ কেমন লাগলো?’

‘চমৎকার!’
জগলু থামে।নিজ থেকেই সাথে একটু যোগ করে,’আপনারই মতো।’

সুচিস্মিতা তার দিকে চোখ তুলল না।শুধু মুচকি হেসে ঠেস মেরে বলল,’আপনার লক্ষণ ভালো না জুহায়ের।মেয়ে মানুষের সাথে অতিমাত্রায় অমায়িক পুরুষদের আমার কম পছন্দ।’

জগলুও সাথে সাথে পাল্টা জবাব দিলো।
‘তাহলে তো আপনার জন্য অভিই চলনসই।’

মিতার পুরো মুখ তেতো হয়ে এলো।সে চোখ মুখ খিঁচে বলল,’ছিহ! ঐ বুনো ভাল্লুকের নামও নিবেন না।আমি বুঝি না,হাতেম শিকদারের ছেলে এমন কিভাবে হতে পারে?আমি তো চেরাগ বাতি দিয়েও দু’জনের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না।’

জুহায়ের হঠাৎই কপালে ভাঁজ ফেলল।কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলো,’আপনি অভির বাবাকে চেনেন?’

সুচিস্মিতার হাতটা থেমে গেল সহসা।সে কিছুক্ষণ নিরব থেকে পরে আস্তে করে বলল,’ঐ একটু আকটু।ঐ বাড়িতে গিয়েছিলাম পরে শুনেছি।সেটা বাদ দেন।আপনি বলুন,ঝাল খেতে পারেন?’

‘জ্বী।’

‘গুড।’

মিতা কপালের ঘাম মুছে বলল,’রেখা খালা।বাসমতি চাল ভেজাতে বলেছিলাম।ভিজিয়েছো?’

রেখা তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরে এলো।উপরনিচ মাথা নেড়ে বলল,’জ্বী ম্যাডাম।ভিজিয়েছি আরো আগে।’

____

মিতা চুলায় বসানো পাতিলে সামান্য তেল দিয়ে কেটে রাখা পেয়াজ কুচি তার উপর ছেড়ে দিলো।রেখা তার পাশে দাঁড়িয়ে অর্ধেক কাজ গুছিয়ে দিচ্ছিল।মিতা হাসিমুখে বলল,’খালাজান!আমার মন চাইছে তোমাকেও আমার সাথে নিয়ে যেতে।তুমি কি সুন্দর বলার আগেই সব বুঝে যাও!’

রেখা মুচকি হাসলেন।মিতা আফসোস করে বলল,’আর মাত্র আজকের দিনটা।তারপর সবাই যে যার বাড়িতে।আমি আবার একা একা আমার সেই ঘরে।’

রেখা নামের ভদ্র মহিলা মাথা তুললেন।স্নেহ মাখানো কন্ঠে জানতে চাইলেন,’তোমার বুঝি মানুষ খুব পছন্দ?’

মিতা গাঢ় স্বরে বলল,’প্রচন্ড।দেখো না কেমন জোর জবরদস্তি করে সবাইকে ধরে এনেছি?কি করবো?আমার জীবনে মানুষের খুব অভাব খালাজান।আমার কেউ নেই।বাকের ভাইয়ের মতো আমারও কোথাও কেউ নেই।’

রেখা বললেন,’হলো না ম্যাডাম।বাকের ভাইয়ের মুনা ছিলো।আর আপনারও মুনা আছে।’

‘কি বলো?আছে নাকি?’

রেখা শুধু হাসে।
‘চোখ মেললেই দেখতে পারবে।’

সুচিস্মিতা কিছুটা লজ্জা পেল।মাথা নামিয়ে সংকুচিত কন্ঠে বলল,’আমার একটা বাড়ির খুব শখ খালাজান।একটা মস্ত বড়ো সংসার।যেখানে আশেপাশে শুধু আমার আপন মানুষরাই থাকবে।আমি খুব ভালো ঘরনি হবো খালাজান।কাউকে কিছু করতে দিবো না।সব আমিই করব।বিনিময়ে তারা আমাকে একটু ভালোবাসলেই হবে।আমার কোনোদিন কোনো ঘর হয়নি জানো?আমার একটা পরিবারের খুব শখ।’

রেখা আর্দ্র চোখে তার দিকে তাকালেন।জড়ানো গলায় বললেন,’অবশ্যই হবে ম্যাডাম।তুমি কতো সুন্দর মনের মানুষ! তোমার সংসার সুন্দর হবে না তো কারটা হবে শুনি?’

সুচিস্মিতা মাথা ঘুরিয়ে বলল,’দোয়া করবে কিন্তু মন থেকে।আমি যেন আবার তোমাদের এখানে আসতে পারি।তখন শুধু আমার ঘরের মানুষদেরই আনবো।’

মিতা পুনরায় রান্নায় মন দেয়।গরম তেলে মাংসের টুকরো ছাড়তে ছাড়তে বলে,’মেয়ে দু’টোকে দেখলে?ফুলের মতো লাগে,তাই না?অরু মিষ্টি,আর নিরু স্নিগ্ধ।অরুর জীবন ফুলের মতো,আর নিরুরটা কাঁটার মতো।মেয়েটা খুব চাপা স্বভাবের।মনে মনে দুঃখ জমায়।তার মাকে ভুলভাল বুঝিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি।নিরুর অনেক পড়াশোনা করার শখ।কিন্তু তার মা দেয় না।উপরন্তু কিসব আধবুড়োর সাথে তার বিয়ে দিতে চায়।যত্তোসব!’

রেখা খানিকটা চমকালেন।বললেন,’তুমি নিরুপমাকে নিয়ে এতো কিছু জানো?সে যে কাল আমায় বলল,তোমার সাথে নাকি তার তিন চারবারই দেখা হয়েছে?’

সুচিস্মিতা ব্যস্ত গিন্নিদের মতো দুই হাতে কাজ করে যাচ্ছিল।রেখার কথার কোনো প্রতিউত্তর সে করে নি।শুধু হাত ধুতে গিয়ে চাপা স্বরে নিজ থেকেই বলল,’নিরু আমায় এসব কিছুই বলে নি খালাজান।’
.
.
.
.
আজকের দিনটা অরুনিমার কাটল বাড়াবাড়ি রকমের ভালো।মিতা আপা তার নতুন কেনা ক্যামেরা তে তার আর হামাদের অনেক ছবি তুলে দিয়েছে।আজ সে হামাদের হাত ধরে অনেকটা সময় বসেছিল।হামাদ মুখ কুঁচকে রেখেছিল,কিন্তু হাত সরায়নি।

দুপুরে সে আর তুতুন যখন বাগানে ছুটোছুটি করছিল,তখন হামাদ হাত ধরে টেনে তাকে হল ঘরে নিয়ে এসেছে।তারপর নিজে থেকে ভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছে।

মিতা আপা আজ দম বিরিয়ানি রান্না করেছে।কি এলাহি কান্ড! আপা পুরা ঘেমে নেয়ে একাকার হয়েছে রান্না করতে গিয়ে।কিন্তু বিরিয়ানি খেতে হয়েছে অসাধারণ।জগলু মুখে দিতেই বলল,’মিতা! আরেকদিন বানিয়ে খাওয়াতে হবে কিন্তু।’

সবাই কতো সুন্দর কথা বলল,আড্ডা দিলো।শুধু হামাদ এক কোণায় মুখ লটকে বসেছিল।তুতুন অবশ্য দুইবার কোলে উঠেছে তার।তখন সে জোরপূর্বক টেনে টেনে হাসার চেষ্টা করেছে।যদিও সে চেষ্টা বৃথা গিয়েছে।তাকে কোনো ভাবেই হাসিখুশি মনে হলো না।বিকেল হতেই সে উসখুস করতে শুরু করল।অরুনিমা হাতে পায়ে ধরে তাকে আরেকটা রাত থাকার জন্য রাজি করিয়েছে।

সন্ধ্যা পড়েছে কিছুক্ষণ আগে।মিতা আপা আবার সেই রান্নাঘরে ব্যস্ত।তুতুন ঘুমালো একটু আগে।নিরুপমা সবে পুকুর ঘাটে এসে বসেছিল।অরু এসে বসল তার পাশে।নিরু তার দিকে ফিরেই জানতে চায়,’কি মনা?কিছু বলবি?’

‘না আপা।এমনিই তোমার কাছে এলাম।তোমার আদর নিতে।’

বলেই সে নিরুপমার কাঁধে মাথা রাখল।নিরুপমা বলল,’ক্লাস করিস অরু?’

‘করি।মাঝে মাঝে।’

‘মাঝে মাঝে কেন?রোজ করবি।’

‘ঘুম ভাঙে না আপা।’

‘এসব করবে না অরু।খুব মন দিয়ে পড়বে।আমাদের সবারই দিন শেষে একটা পরিচয় লাগে।’

অরু গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল।

‘নিরু আপা!’

‘বল।’

‘হামাদ খুব ভালো নিরু আপা।’

‘আমি জানি।’

‘কেমন করে জানো?’

‘যে মানুষ বউয়ের কাছে ভালো,সে এমনিতে ভালোই হয়।’

‘আপা!’

‘হুম।’

‘আমার না হামাদের কাছাকাছি থাকতে খুব ভালো লাগে।মানে মন চায় হামাদের কোলে উঠে বসে যাই।’

নিরুপমা ফিক করে হেসে দিলো।বলল,’বর তো।উঠে যেতে পারিস।দোষ হবে না।’

‘ধ্যাত! লজ্জার কথা।’
অরু বলল,’আচ্ছা আপা।আমি হামাদ কে কেমন করে বুঝাই যে তাকে আমার কতো ভালো লাগে?সে বুঝতেই চায় না কিছু।’

নিরুপমা ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকালো।গম্ভীর মুখ করে বলল,’সবই বুঝে অরু।তবুও না বোঝার ভান ধরে।’

‘তুমি কেমন করে জানলে?’

নিরুপমা পর পর দু’বার শ্বাস ছাড়ল।অন্যমনস্ক হয়ে বলল,’জানি না।মনে হলো আরকি।তুই এক কাজ কর।একদম সোজাসাপটা গিয়ে তাকে জানিয়ে দে।তাহলেই তো ব্যাপারটা মিটে গেল।’

অরুনিমা মুখ নামিয়ে বলল,’লজ্জা লাগে আপা।’

‘বসে থাক তোর লজ্জা নিয়ে।’

অরুনিমা হঠাৎই কেমন বিষন্ন হয়ে পড়ল।নিরুপমা তার অবস্থা বুঝতেই একহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে আদুরে স্বরে বলল,’অরু?তুমি না আমার লক্ষী বোন?আপা দোয়া করে দিচ্ছি,তোর সংসার খুব ভালো হবে।তুই খুব সুখে থাকবি।আমরা সচরাচর সুখ বলতে যেটা বুঝি,বাস্তবে সুখ সেটা হয় না।উপরন্তু এমন অনেক কিছু আছে,যা প্রথমে আমরা আমাদের দুর্ভাগ্য কিংবা দুঃখ বলে মনে করি,কিন্তু দিনশেষে সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়ায়।জীবন এমনই সোনা।আমরা যা ভাবি,অধিকাংশ সময় তার বিপরীতটাই হয়।’
.
.
.
.
‘মুস্তাফা,
এতোদিন পর চিঠি দিচ্ছি দেখে রাগ হবেন না আশা করি।চিঠি না দেওয়ার কারণ,পারিবারিক ব্যস্ততা।অরুনিমা এই কয়টা দিন খুব অসুস্থ ছিলো।জ্বরের প্রকোপ এতোই বেশি ছিলো যে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।সেসবের পেছনে ছুটোছুটি করতে গিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে কোনোভাবেই আপনাকে আর লিখতে পারি নি।আপনি কিছু মনে করবেন না মেজর।

আমার এখন মন খারাপ হচ্ছে।আপনার মিশনের সময় ঘনিয়ে আসছে।মিশনের আগে কি আপনি এই চিঠিটা পাবেন?যদি পেয়েও থাকেন,তবে কি ফিরতি চিঠি দেওয়ার মতো সময় আপনার হবে?কথা হয়েছিল,আরো দুই দফা চিঠি আদান প্রদান হবে আমাদের।কিন্তু আমার ব্যস্ততায় সেটা আর হয়ে উঠেনি।এজন্য আমি নিজের সাথেই রাগ হয়েছি।আপনি আমায় দু’টো বকা দিন তো প্লিজ।

আমার পত্রমিত্র,
আপনাকে আজ আমি একজন চমৎকার মানুষের কথা বলবো।তার নাম সুচিস্মিতা।নামটা খুব অন্যরকম না?ঠিক নামের মানুষটার মতোই।যদিও এই নামে আমি তাকে ডাকি না।আমি তাকে ডাকি মিতা আপা বলে।মিতা আপা হলো জগতের সবচেয়ে অন্যরকম মানুষদের একজন।মিতা আপা মাথায় হাত রাখলেই কোথা থেকে যেন শুভশক্তি এসে আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে যায়।

মিতা আপা একজন সাংবাদিক।প্রথমদিন তার পরিচয় শুনেই তব্দা খেয়ে গেলাম।একজন মেয়ে হয়ে এই বয়সে উপার্জন করছে,নিজের মতো করে চলছে।অথচ তার ভেতর কোনো অহংকারের লেশমাত্র নেই।

মিতা আপা যেন কলকল করে বয়ে চলা কোনো শান্তধারার নদী।যার বুকে মানুষের রাগ,দুঃখ,হতাশা,ভালোবাসা সবকিছু আপনাআপনি জায়গা করে নিচ্ছে।
আপনি জানেন,মিতা আপা আমাকে আমার অতীত নিয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করেনি।কেবল কাছে এলো,একগাল হাসি দিলো।তারপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।মিতা আপার আর কি পরিচয় দিবো বলুন?তাকে পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো শব্দ আমার ভান্ডারে নেই।সে অনন্যা।ঠিক তার নামের মতোই।সে যাদুকর।সে এতো ভালো যাদু জানে যে বুকে জড়িয়ে নিতেই সব কষ্ট গায়েব হয়ে যায়।

আমার জীবনটা ইদানিং ফুলের বাগান হয়ে যাচ্ছে মুস্তাফা।প্রথমে এলেন আপনি।তারপর এলো মিতা আপা।আপনারা এসেছেন বলেই আমি পুনরায় কলম হাতে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছি।কবে আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?আমি গ্রেজুয়েট হতে চাই।সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।মিতা আপা আর আপনি কেবল শক্ত করে আমার হাত দু’টো ধরে রাখবেন কেমন?আমি ভীষণ দুর্বল প্রকৃতির মানুষ।চারপাশে থাকা মানুষদের কটু কথায় আমি দমে যাই,হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই।আপনারা ধরে রাখলে আমি ভরসা পাবো।তখন খুব সহজেই এই আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিতে পারবো আমি।

আপনি কেমন আছেন?আপনার সাতটা ফুল কেমন আছে?ফুল বলছি,কারণ তাদের আমার ফুলের মতোই স্নিগ্ধ লাগে।এরা আমার অরুর চেয়েও ছোট।অথচ ঘর বাড়ি পরিবার পরিজন ফেলে এরা কতো কঠিন নিয়মনীতির মাঝে জীবনযাপন করছে! এদের ধমকের পাশাপাশি একটু ভালোবাসাও দিবেন।ভালোবাসা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।এর সামনে এসে সব প্রাণী দুর্বল হয়।হিংস্র জা নো য়া র থেকে শুরু করে নিরীহ প্রাণী পর্যন্ত সবাই।আমরা দিনশেষে আসলে ভালোবাসার কাঙাল।এই জীবনে কতো কিছুর পেছনে আমরা ছুটে যাই! অথচ একটু ভালোবাসা পেতেই আমাদের মনে হয় যে এই জীবনে প্রাপ্তির খাতা পূর্ণ হয়েছে।
আমরা দিনের শেষে ভালোবাসা বাদে আর চাই টা কি?

আপনি ভালো থাকবেন মুস্তাফা।একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।আমার বিশ্বাস আপনি খুব বিচক্ষণতার সাথে সবকিছু করবেন।আমার শুভকামনা নিবেন মেজর।জীবনের প্রতিটা বাঁক স্রষ্টা আপনার জন্য মসৃণ করুক।

আমি আজকাল জীবন নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখি।
জীবন হোক একটা উন্মুক্ত উদ্যান।যার কোনো সীমা নেই,শেষ নেই।সেই উদ্যানে মন ভরে ছুটে বেড়াবো আমরা।প্রজাপতি উড়বে চারপাশে।সুরেলা কন্ঠে কোকিল গান গাইবে।চারপাশে থাকবে তাজা ফুলের ম ম ঘ্রাণ।আকাশে থাকবে একটা রংধনু।প্রকৃতি সাজবে সবুজের মোড়কে।চারপাশে শুধু আনন্দ আর আনন্দ।তারপর আমরা সমস্বরে স্বর মিলিয়ে গাইবো-

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ॥
পান করি রবে শশী অঞ্জলি ভরিয়া–
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি–
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে ॥
বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে ॥

নিরুপমা রহমান
সমতট লেন,ঢাকা।

এহতেশাম পত্রটা ভাঁজ করে পুনরায় খামে রাখে।রাতের অন্ধকার আর নিস্তব্ধ ভাব ভারি হয় তার দীর্ঘশ্বাসের প্রভাবে।মাথার উপর চিকন এক ফালি চাঁদ সামান্য দ্যুতি ছড়াচ্ছে।রোজকার মতো আজও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে আসছে।এই রাত,এই আবহাওয়া,এই আর্মি ক্যাম্প,আর হাতে এই চিঠি-সবকিছু মিলিয়ে চারপাশ কেমন মনোরম লাগে মুস্তাফার।এই দৃশ্যটা নিতান্তই স্বাভাবিক না তার জন্য।এই দৃশ্য খুব আলাদা।খড়খড়ে কাগজে কালো কালিতে কিছু গোছানো লিখাই তো।এতো বিশেষ কিছু তো হওয়ার কথা না।

এহতেশাম কিছুক্ষণ খাম হাতে বসে থাকে।তারপর আস্তে করে তার পকেটে হাত রাখে।এরপর সেখান থেকে খুব যত্নে পাসপোর্ট সাইজ ছবিটা বের করে আনে।
কলেজ পড়ুয়া কিশোরীর মিষ্টি মুখখানা আজকাল স্বপ্নেও আসে।এহতেশাম আলতো করে ছবিটা ছুঁয়ে দেয়।যেন ছবিটার ভেতর প্রাণ আছে।জোরে ছুঁলেই ব্যথা পাবে।

নিরুপমা রহমান।জগতের সবচেয়ে বিচিত্র নারী।কোনো নারী যা পারেনি,নিরুপমা রহমান তা করে দেখিয়েছে।নিরুপমা একটা শক্ত খোলসে আবৃত হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।সেই হৃদয় শুধু সাদিক সাহেবের বড় মেয়ে কেই চায়।আর কেউ না।মিশন শেষের ঐ কল পাওয়ার মতো কাছের মানুষ তার নিরুপমাই আছে।বাকি সব তো নস্যি।এহতেশাম বুক ভরে শ্বাস নেয়।

তারপর এলোমেলো হয়ে কলম চালায়-

নীলা,

অদ্ভুত তো! এবার আপনি সালাম দেননি আমায়।যাই হোক।আমিই সালাম দিচ্ছি।কেমন আছেন নীলা?আপনার ঐ ফুলের মতো দেখতে ছেলেটা কেমন আছে?আমার পক্ষ থেকে তাকে আদর দিয়েন তো।

সুচিস্মিতার প্রতি তো আপনি আমায় আগ্রহী করে তুললেন।সাংবাদিকতা পেশাটা আমাকে বেশ টানে।সেখানে মেয়ে হয়ে এই পেশায় যে যোগ দেয়,বলতেই হয় ভীষণ সাহসী আর প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব।সুচিস্মিতার মতো মানুষ আপনার জীবনে এলো শুনে ভালো লাগছে।

কিন্তু যা ভালো লাগে নি তা হলো এই যে মানুষের প্রতি আপনি খুব নির্ভরশীল।আপনি নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে ভয় পান।আপনি সবসময় কারো না কারো উপর ভর ছেড়ে কিংবা ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে চান।আমি আর সুচিস্মিতা কেন আপনার দু’হাত ধরে রাখবো?আপনার পা নেই?নিজের পায়ে চলবেন নীলা।অন্য মানুষের নির্ভরতায় চলার কোনো মানে নেই।আমি আর সুচিস্মিতা যদি মাঝরাস্তায় গিয়ে আপনার হাতটা ছেড়ে দেই,তবে আপনি কি করবেন?আপনার আর কি করার থাকবে বলুন তো?তাই শুরুতেই কারো উপর নির্ভার হয়ে ভর ছেড়ে দেওয়া উচিত না।আমরা বড়জোর আপনাকে পথ বাতলে দিতে পারি।হাঁটতে হবে আপনার নিজেকে।সবকিছুতে মানুষের আশায় থাকবেন না।কখনো কখনো নিজের সহায় স্রষ্টা ব্যতীত আর কাউকে মনে করা উচিত না।নিজে যদি একা চলতেই না পারেন,তবে উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন কেন?

দুঃখিত! আবারো কঠোর হয়ে যাচ্ছি।কিন্তু আমি এমনই।দীর্ঘদিনের অভ্যাসের দরুণ আমার আচরণ এমন হয়ে উঠেছে।আপনি আশা করি আমার দিকটা বুঝবেন নীলা।

আপনি চিঠিতে আমায় শুভকামনা জানালেন।সেজন্য ধন্যবাদ।আমি আপনাকে চিঠিতে জানালাম ভালোবাসা।ভালোবাসা নিবেন নীলা।সেই সাথে ভালো থাকবেন।যদি স্রষ্টা জীবিত রাখে,তবে খুব দ্রুতই উন্মুক্ত প্রান্তরে আপনাকে নিয়ে ছুটে যাবো।সাথে তুতুনও।আমি,তুতুন আর আপনি।আর কেউ না।সেই প্রান্তরে প্রজাপতি উড়ে বেড়াবে নাকি জানি না।কিন্তু সেখানে দুঃখ গুলো ঠিকই উড়ে যাবে।আপনি মন ভরে কাঁদবেন।কেউ আপনাকে জ্বালাবে না।তুতুন থাকবে আমার কাছে।আমরা দু’জন আপনার কান্না দেখবো।যতোক্ষণ না আপনি ক্লান্ত হয়ে কান্না থামাবেন,ততক্ষণ আপনাকে কান্নার সুযোগ দেওয়া হবে।বলুন নীলা।আর কয় ঘন্টা কাঁদতে চান আপনি?কয় ঘন্টা কাঁদলে আপনার দুঃখরা আপনার হৃদয় ছেড়ে পালাবে?তাড়াতাড়ি বলুন তো?

শুনুন তুতুনের আম্মু,
এখন আমি আপনাকে ফোন দিবো।দিয়ে কোনো কথা বলবো না।আপনি যদি আমাকে না চেনেন,তাহলে আর কোনো শব্দ ছাড়াই ফোন কেটে দিবো।আপনার ভোগান্তি কমিয়ে দিলাম।এই পত্র যখন পড়বেন,তখন আপনি জানতে পারবেন,মাঝরাতে আপনাকে ফোন করে থম মেরে বসে থাকা সেই মানুষটা আমিই ছিলাম।এখন আমি আপনাকে ফোন করব।আপনি কি আমায় চিনতে পারবেন নীলা?

মেজর মুস্তাফা
আর্মি ক্যাম্প,রাঙামাটি।

এহতেশাম পকেট থেকে ফোন বের করে নির্বিকার হয়ে ডায়াল করলো।তিনবারের মতো রিং হতেই কলটা রিসিভ হলো।অন্যদিনের মতোই ক্ষণিকের নিরবতা।তারপর অতি সূক্ষ্ম নারী কন্ঠটি মুঠোফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো।মেয়েটা অত্যাধিক মিহি সুরে বলল,’হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।কে বলছেন?’

______

আকাশের ঐ সুন্দর চাঁদটা দু’দিন যাবত নিরুপমার মনোযোগ টেনে ধরছে।বাড়ির জানালা দিয়ে সে যেই আকাশ দেখতো,সেই আকাশ আর এই ফার্মহাউসের আকাশের মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।এখানের আকাশকে মনে হয় একটা মস্ত বড় চাদর।সেই চাদরের ছায়াতলে ঢাকা পড়েছে সমস্ত কিছু।এই ব্যস্ত শহর,ক্লান্ত পথিক,শহরের রাস্তা,দোকানপাট সবকিছু।নিরুপমা মন ভরে সেসব দেখে।

তুতুন আজ ভীষণ ক্লান্ত।খাটে শোয়াতেই ঘুমিয়ে জল হলো।নিরুপমা তার দু’পাশে বালিশ রেখে উঠে এসেছে।মিতা আপা সারাদিন এতো ছুটোছুটি করে এখন মাথাব্যথায় অস্থির হয়ে ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে।অরু তার ঘরে।এই চন্দ্র বিলাশ তার একান্ত।কিছুক্ষণ আগে সবাই পাটি বিছিয়ে আড্ডা দিয়েছিল।নিরু একবার আনমনে মিতা আপার কথা মনে করল।সে ছাড়া এতো সুন্দর আয়োজন কে করত?নিরুপমা যে দু’টো দিন এতো ভালো কাটাবে,সেটা কি সে কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল?

নিরুপমা গালের নিচে হাত রেখে আকাশ দেখে,বাংলো বাড়ির নকশা খচিত দেয়াল দেখে।পুকুর ঘাটে বসলেই শরীরে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে ধাক্কা দেয়।পুকুরের ঠান্ডা পানি মৃদু শব্দে বয়ে যায়।গাছের পাতায় বাতাসের ধাক্কা লেগে সেটা অল্প অল্প নড়ে।নিরুপমা মনোযোগী দর্শক হয়ে সবকিছু দেখে।

ঠিক তখনি একটা যান্ত্রিক শব্দে তার ঘোর কাটে।মুঠোফোনটা একনাগাড়ে বেজেই যাচ্ছে কখন থেকে।নিরুপমা দ্রুত সেটা রিসিভ করে।কিন্তু রিসিভ করার পরেই কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেল।কানে চাপতে গিয়ে মনে হলো তার কন্ঠ আজ ভীষণ কাঁপছে।নিরুপমা রোজকার মতো সালাম দেয়।বিনীত সুরে জানতে চায় অপরপাশের ব্যক্তির পরিচয়।কিন্তু জবাবে নিরুপমা পেলো সেই আগের মতো নিস্তব্ধতা।মনে হলো এই নিরবতা মহাকাশের মতোই গভীর,অতলস্পর্শী।কেবল পাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ জানান দেয়,কলটা পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকেই এসেছে।

নিরুপমা অনেকটা সময় নিরব থাকে।হঠাৎই তার সমস্ত শরীরে তড়িৎ খেলে গেল।সেই তড়িৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।নিরুপমা হতচকিত হয়ে একবার স্ক্রিনে ভাসতে থাকা নম্বরটা দেখে।তারপর পুনরায় ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরে।তার কন্ঠনালি কাঁপছে।নিদারুণ উৎকন্ঠা কেবল ঘন ঘন শ্বাস ফেলে দমিয়ে নিয়ে সে রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে বলল,’মুস্তাফা?’

কথাটা বহু কষ্টে বুক চিরে বেরিয়ে এলো।নিরুপমার নিঃশ্বাসের গতি আরো কিছুটা বাড়ল।সে অবরুদ্ধ অভেদ্য স্বরে আবারো বলল,’মুস্তাফা! আপনি?’

অন্য পাশ টা আজ আর নিরব থাকল না।আগ বাড়িয়ে কোনো কথাও বলল না।শুধু একবার গলা খাকারি দিলো।নিরুপমা তাতেই জমে হিম হয়ে গেল।শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা র’ক্তের ধারা নেমে এলো অতি ধীর গতিতে।নিরুপমা জড়ানো সুরে বলল,’কেমন আছেন মুস্তাফা?’

অপরপাশের পুরুষালি স্বরটা অত্যাধিক ভারি হয়ে বলল,’ভালো।’

নিরুপমা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।একটা হিমশীতল বাতাস তার সমস্ত শরীর ছুঁয়ে গেল।নিশ্বাস আটকে আসছিলো নিরুপমার।কোনো কথা আর কন্ঠনালি পেরিয়ে বের হতে পারছিলো না।সদ্য কৈশোরে পদার্পণ করা কিশোরীদের মতোই নিরুপমা লাজুক হয়ে উঠল।একবার আজকের তারিখটা স্মরণ হতেই আনত স্বরে বলল,’কাল আপনার মিশন,তাই না?বেস্ট অফ লাফ মুস্তাফা।’

মুস্তাফা নামের মানুষটা কি খুব চাপা স্বভাবের?কেমন যে শব্দহীন,ছন্দহীন।চাঞ্চল্যের লেশমাত্র নেই তার মাঝে।নিরুপমা বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিল।অথচ মুস্তাফা অনড়,অবিচল।একেবারে নির্বিকার।যেন কিছুতেই তার চিত্ত ব্যাকুল হয় না।

নীলার সেই আবেগী স্বর শক্তপক্ত পেটানো শরীরের ভেতর তরতর করে প্রবাহিত হয়।কর্ণকুহুরে পৌঁছে যায় তরুণীর সেই লাজুক কন্ঠ,আড়ষ্টতায় মোড়ানো তরুণীর সলজ্জ আবেদন।নীলা থেমে থেমে বলল,’সাবধানে থাকবেন।আয়তুল কুরসি পড়বেন।আমি আপনার চিঠির অপেক্ষা করব।’

সে বলতে গিয়েই কেমন যে মিইয়ে গেল।মুস্তাফা টের পেল,তার কন্ঠ কাঁপছে।নিরুপমা আর কথা বলল না।একটা লম্বা সময় ধরে কালো রঙের ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরে রাখলো।তার চোখের পানি যে কখন গাল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে,সে টের পায়নি।মুস্তাফা তার অস্তিত্বের জানান দিলো কেবল দুইবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে।নিরুপমার মনে হলো,মুস্তাফা আজ তার কতো দূরে!
অথচ পত্র লিখার সময় মনে হতো,সে তার একদম কাছে বসে আছে।বসে বসে নিরুকে মন দিয়ে দেখছে।আজ কেন এতো দূরের মনে হচ্ছে তাকে?

নিরুপমা নিজ থেকেই বলল,’মিতা আপা কাল আমাদের একটা ফার্মহাউসে নিয়ে এসেছে।আমি আগে কখনো ফার্মহাউসে যাইনি।তুতুন খুব খুশি।আমার মন আজকে ভীষণ ভালো।’

বলতে বলতেই নিরুপমার দুই চোখ পুনরায় ভরে উঠল।দু’চোখের স্পষ্ট আবেগ নিয়ন্ত্রনে এনে নিরুপমা বলল,’আমার মন আসলে ভালো নেই।আমি মিথ্যে বলেছি।আপনি মিশন থেকে সুস্থ ভাবে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমার মন আর কখনো ভালো হবে না মুস্তাফা।’

অন্যপ্রান্তে থাকা গুরুগম্ভীর স্বভাবের ব্যক্তিটা পুনরায় গলা খাকারি দিলো।নিস্তব্ধ রাতের সমস্ত নিরবতা চিরে সেই শব্দ নিরুপমা পর্যন্ত এসে পৌঁছুলো একটা প্রতিধ্বনির মতো করে।লোকটা নিরেট স্বরে বলল,’টেইক কেয়ার,নি রু প মা।’

কিছু সময়ের মৌনতা।তারপর সদূর রাঙামাটি থেকে আগত ফোনকল টা যান্ত্রিক শব্দ করে কেটে গেল।এহতেশাম ফোন কেটেই ধীর কদমে নিজের তাবুর দিকে পা বাড়ালো।অবশেষে! অবশেষে নীলা তাকে চিনতে পেরেছে।তাকে কিছু বলতে হয়নি,কোনো ইশারা দিতে হয় নি,কিছুই করতে হয় নি।তবে নীলা তাকে চিনলো কেমন করে?ভেতর থেকে আপনাআপনি উত্তর এলো,’কারণ তুমি নীলার কাছের মানুষ।কাছের মানুষকে তো মানুষ নিশ্বাসের শব্দেও চিনে নেয়।’

এহতেশামের কৌতুহল জাগে।আসলেই কি সে নীলার এতো কাছের?সে সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে তাবুর দিকে হেঁটে গেল।এখন তার মাথায় শুধুমাত্র কালকের চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে।সোর্স তাদের খবর দিয়েছে ভেতরে আটজনের বেশি নেই।কিন্তু যদি আক্রমণ করতেই দেখে সেখানে আরো দস্যু ওৎ পেতে আছে?তখন?

নিরুপমা ফোনটা কান থেকে নামায়নি।সে হুট করেই বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিলো।এতো কষ্ট কেন হয় তার?নীলা বলেই কি মুস্তাফার কঠিন মুহূর্তগুলো তাকে আন্দোলিত করে?কোনো চিঠি কি কাউকে এতো বেশি দুর্বল করতে পারে?

নিরুপমা সেই রাতে উপলব্ধি করল,সে খুব দুর্বল নারীচরিত্র।ঠিক মিতা আপার বিপরীতে থাকা একটি নারী চরিত্র।যে সহজেই কাবু হয়,সহজেই যাকে সমাজ দমিয়ে দিতে পারে।আসলে রাহাতের কোনো দোষ নাই।নিরুপমার দুর্বল ব্যক্তিত্বই তার সংসার হারানোর জন্য দায়ী।নিরু এতো ভীতু কেন?প্রহর শেষের অস্তমিত সূর্যের আলোর ন্যায় এতো ক্ষীণ কেন তাদের অস্তিত্ব?

নিরুপমা আর কাঁদল না,মন খারাপ করল না।শুধু ঘাট বাঁধানো পুকুরে বসে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করল।রাঙামাটিতে নিশ্চয়ই একই সাথে সকাল হবে।অস্ত্র গোলাবারুদ সহ মিলিটারিদের একটি দল পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা দস্যুদের ধরাশায়ী করার জন্য বেরিয়ে পড়বে।তারপর?তারপর কি হবে?নীলার জন্য কি আর কখনো আসবে মুস্তাফার লিখা সেই কুচকুচে কালির সতেজ চিঠি?
.
.
.
.
সুচিস্মিতার প্রচন্ড মাথাব্যথায় সেদিনের আড্ডা খুব বেশি জমেনি।সে খুব দ্রুত ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।অরুনিমা অবশ্য নিরু আপার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেছে।তারপর বাগানে হাঁটাহাঁটি শেষে সেও ঘরে ফিরে এলো।

অভির চোখ প্রায় লেগেই এসেছিল।ঘরের বাতি জ্বলতেই সে কপাল কুঁচকালো।বিরক্ত হয়ে বলল,’তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করো।বিরক্ত লাগে আলো।’
অরুনিমা ভেংচি কেটে বলল,’তুমি এসবই বলবে।কোথায় কাছে এসে একটু মিষ্টি আলাপ করবে।তা না।তোমার আছে যতোসব বিরক্তিকর কথাবার্তা।’

অভি চোখের উপর থেকে হাত সরালো।গাঢ় স্বরে বলল,’চুল গুলো পাগল পাগল হরে রাখবে না।সুন্দর করে বেঁধে রাখবে।আমার চুল দাড়ি নিয়ে এতো চিন্তা তোমার।কখনো আয়নায় দেখেছো নিজের চেহারা?’

‘দেখেছি।পরীর মতো সুন্দর দেখতে।’

অভি জবাব দিলো না।কেবল তাচ্ছিল্য করে হাসল।
অরুনিমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক নিজেকে দেখে খানিকটা লজ্জার সুরে বলল,’একেবারে আগুন সুন্দরী বউ পেয়েছো হামাদ।অথচ এই রূপের তুমি দাম দিলে না।বুঝবে বুঝবে।হারিয়ে গেলে তখন খুঁজবে।’

তখন বসস্ত চলমান।বৈশাখ আসেনি,কালবৈশাখীর দমকা বাতাস বইতে শুরু করে নি।কিন্তু সেই রাতে ফার্মহাউসে ঝুম ঝুম করে অঝোর ধারায় বর্ষণ নেমে এলো।কর্ণকুহরে সেই শব্দ প্রবেশ করতেই অরুনিমা চঞ্চল হলো।পরনের শাড়ি আর খোলা হলো না।তার আগেই সে ছুটে গেল অভির কাছে।

‘হামাদ! ও হামাদ!’

অভি তন্দ্রাঘোরে কোনোরকমে বলল,’কি?’

‘চলো না বৃষ্টিতে ভিজি।বাগানে যাই।’

‘তুমি যাও।আমি ঘুমাবো।’

‘হামাদ! চলো না।এটাই শেষ।আর কিছু চাইবো না তোমার কাছে।’

অভি বিরক্তিতে চোখ খুলে।মুখ কুঁচকে কোনোরকমে বলে,’এতো বিরক্তকর কেন তুমি?’

‘আমি এমনই।চলো এবার।’

বাগানে যেতে যেতে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এলো।অরুনিমা মন খারাপ করে বলল,’ধ্যাত।আগের মতো আর জোরে বৃষ্টি পড়ছে না।’

অভি নির্বিকার হয়ে পকেটে হাত গুজে দাঁড়ায়।অরুনিমা মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকটা বেলি হাতের মুঠোয় নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো।স্বভাবসুলভ হেসে বলল,’হামাদ! এই নাও।তোমার জন্য ফুল।’

অভি হতবিহ্বল হয়ে তার হাতের দিকে তাকায়।এই পুষ্প প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা তার জীবনে প্রথম।সে হাত বাড়িয়ে বোকা বোকা হয়ে ফুল গুলো হাতে নেয়।খানিকটা বিস্ময়ে অরুনিমার দিকে তাকায়।

আচ্ছা।অরুনিমা নামের অর্থ হলো ভোরের লালচে আভা।একদম সূর্য উঠার সময় যে আভা ছড়ায়,সেই আভাই অরুনিমা।নামের সাথে কি মানুষের কাজের মিল থাকে?অরুনিমা কি সত্যিই সেই আলো যেই আলো অন্ধকার দূর করতে পারে?যেই আলোতে দুঃখ কষ্ট সব ঘুচে যায়?

কৃষ্ণপক্ষের শেষে এমন একটা আলোই কি সবাই আশা করে না?ঠিক অরুর মতোই স্নিগ্ধ,কোমল আর ঈষৎ কমলা রঙের মিঠে আলো!

****

বৃষ্টিতে ভিজে অরুনিমারও মাথা ধরে গেল।অভি তাকে দু’টো বকুনি দিয়ে মিতা আপার ঘরে পাঠালো।বলল মাথা ব্যাথার ঔষধ খেয়ে নিতে।অরু গিয়ে দেখল,মিতা আপা মুখের উপর চাদর টেনে ঘুমাচ্ছে।

সে পা টিপে টিপে ঔষধের বাক্সের কাছে গেল।রাতের দিকে আপা যেই ঔষধটা খেলো,সেটা বের করে চটপট একটা ঔষধ খেয়ে নিল।হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।মনে হলো,এক ঔষধে কাজ হবে না।দু’টো খেলে এক্ষুণি ঘুম এসে যাবে।
সে পর পর আরো একটা ঔষধ খেল।তারপর একহাতে মাথা চেপে চুপচাপ নিজের ঘরে গেল।

____

ব্যাথানাশক ঔষধে সচরাচর যেই নেশাদ্রব্যের ব্যবহার হয়,তার নাম মরফিন।খাওয়ার পর মানুষ অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়।মাথা ঘুরায়,ইন্দ্রিয় চাহিদা সচল হয়।কখনো আবার একটা ঘোরের ভেতর বিচরন করে মানুষ।

অরুনিমার ক্ষেত্রে হলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া।ঘরে গিয়েই সে তাল হারিয়ে ধপ করে খাটের এক কোণায় গিয়ে বসল।অভি ভ্র কুঞ্চন করে শুধায়,’কি হলো আবার তোমার?’

অরুনিমা উত্তর দিলো না।কিছুক্ষণ পর অভির কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,’হামাদ! ও হামাদ!’

‘কি?’

‘আদর করো আমাকে।’

অভি চমকে উঠে চোখ খুলে।পাশ ফিরে তব্দা খেয়ে বলে,’কি করবো?’

‘আদর।’

অরু এগিয়ে এলো।বিবাহিত জীবনের প্রথম চুম্বন অরুনিমাই করেছিল।ঠিক অভির গালে।তারপর তার সেই গভীর ক্ষতে।গালে গাল ঘঁষে বলল,’তুমি কি বোঝো না তোমায় আমি কতো ভালোবাসি?একটু আদর করলে কি হয়?’

অভি তার দিকে তাকায়।চোখ মুখ শক্ত করে বলে,’তুমি কোন ঔষধ খেলে অরুনিমা?’

অরুনিমা উত্তর দিলো না।ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে অভির উপর নিজের ভর ছেড়ে বলল,’তুমি আমায় কেন আদর দাও না হামাদ?আমি তো চাই,আমি তোমার এতো কাছে আসি,যেন পৃথিবীর আর কেউ তোমার এতো কাছে যেতে না পারে।’

অভি এক লাফে উঠে বসল।অরুনিমার থুতনি টেনে তুলে বলল,’এ্যাই মেয়ে! তুমি কি বলছো তুমি জানো?’

অরু উত্তর দিলো না।আগের মতোই তার গালে গাঢ় করে চুমু খেল।আস্তে করে বলল,’আমার তোমাকে চাই হামাদ।’

অভি তাকালো।কিছু মুহূর্তের নিস্তব্ধতা।তারপরই সব সংযম ভেঙে,সব অস্বস্তি দূরে ঠেলে সে একটানে অরুনিমাকে তার কাছাকাছি নিয়ে এলো।শক্তপক্ত পুরুষালি হাতের প্রথম থাবাতেই অরুনিমা কিছুটা হচকচাল।কিন্তু সরে এলো না।উল্টো নিজেকে আরো যত্নে সপে দিলো অপর পাশের মানুষটার কাছে।

বাইরের বর্ষণ আগের তুলনায় আরো বেশি তেজী হয়ে ধরনীর বুকে নেমে এলো।অভি এলোমেলো হলো,ভীষণ বেশি উদ্ভ্রান্ত হয়ে সে অরুনিমার রোগা পাতলা শরীরটা দুই হাতে জড়িয়ে নিলো।অগণিত আর্দ্র চুমু অরুনিমাকে কিছুটা নাজেহাল করে দিলো।তারপর অরুনিমা সত্যিকার অর্থেই অভির এতো কাছাকাছি গেল,যতো কাছাকাছি এর আগে কখনো কেউ আসে নি।

সেই স্পর্শে সময় এমনভাবে থমকে গেল,যে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল এক নিমিষেই এক নিঃশব্দ আবেশে ভেসে গেল।নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে শুধু এইটুকই জানানো হলো যে,এইটুকু আসার জন্য সম্পর্কের একটি বৈধতা অতীব প্রয়োজন।এইটুকু আসার পর আর ফিরে যাওয়া যায় না।তখন শুধু জড়িয়ে গিয়েই নিজের অনুভূতির জানান দিতে হয়।

অরু প্রচন্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেল রাতের মাঝামাঝি সময়ে।অভির চোখ তখনও টকটকে লাল।ঘুম নামে নি একটুও।অরু আচমকাই ঘুমের মাঝে অভির একহাত টেনে বলল,’হামাদ! তোমার কি আমাকে একটুও ভালো লাগে না?’

অভি থমকাল।সাথে সাথে উত্তর না দিয়ে কিছু একটা ভাবল।তারপর কেমন যে অন্যমনস্ক হয়ে বিষন্ন সুরে বলল,’ভালো লাগে তো অরুনিমা।আমার যেন কি হয়েছে।আজকাল তুমি ছাড়া আমার আর কিছুই ভালো লাগে না অরু।’

চলবে-