হলুদ বসন্ত পর্ব-৩৬

0
26

#হলুদ_বসন্ত
#পার্ট_৩৬
জাওয়াদ জামী জামী

তিনদিন পর

ফুলে ফুলে সাজানো বাসর ঘর দেখে বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল অর্নির। বাসর ঘরের দরজার সামনে বাসরলতার ঝাড় দুলছে। ঝাড়গুলো যেন যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের দ্বাররক্ষী। বিছানা জুড়ে রজনীগন্ধা আর গোলাপের পাপড়ি দিয়ে হৃদয় আকৃতি করা হয়েছে। বালিশেও ছড়ানো হয়েছে গোলাপের পাপড়ি। সৌরভে ম ম করছে পুরো ঘর। ড্রিম লাইটের মৃদু আলো, ফুলের সৌরভ মিলে এক স্বপ্নময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অর্নির বুক ধুকপুক করে উঠল। হঠাৎ যেন একটু লজ্জা আর অপার আনন্দ একসাথে মনে দোলা দিল। লজ্জারাঙা মুখে ঘরের সৌন্দর্য উপভোগ করছে অর্নি। হঠাৎই একরাশ লজ্জা এসে ভর করল অর্নির তনু মনে। মেহেদি রাঙা হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির রেখা ফুটল। তালুর মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে ‘ সাদাফ ‘ নামটি। মনের অজান্তেই চুমু দিল সেখানে। এরপর গিয়ে দাঁড়াল জানালার ধারে। জানালায় ঝুলছে বাসরলতার ঝাড়। বাতাসে দুলছে সেগুলো। অর্নি আলতোভাবে ছুঁয়ে দিল ফুলগুলোকে। কয়েক বছর আগে সাদাফ কোথাও থেকে বাসরলতা গাছ এনে লাগিয়েছিল৷ এরপর থেকেই প্রতিবছর দল বেঁধে ফোটে বাসরলতা। অর্নি কখনোই ভাবেনি সাদাফের লাগানো গাছের ফুল দিয়েই ওর বাসর সাজানো হবে।

দরজায় খুট করে শব্দ হতেই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসল অর্নি। হঠাৎই শরীরে জেঁকে বসল ভয়। দা হাতে আঁকড়ে ধরল জানালার গ্রীল। বুকের ভেতর হার্টবিটরা হাতুড়ি পেটাচ্ছে। এই বুঝি তারা বুক ভেদ করে বেরিয়ে আসল। হুট করেই অর্নি অনুভব করল, এক জোড়া হাত ওর শরীর আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। হাত দুটো কোমড় পেরিয়ে পৌঁছেছে তলপেটে। উন্মুক্ত পেটে বিচরণ করছে তারা। শিহরণে কেঁপে উঠল অর্নি। সাদাফ ততক্ষণে সাদাফ অর্নির উম্মুক্ত ঘাড়ে থুতনি রেখেছে। সাদাফের খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘষা লেগে জ্বালা করে উঠল। জীবনে প্রথমবার পুরুষের স্পর্শ পেয়ে অসার হয়ে গেল অর্নির শরীর। এতদিন ওদের অলিখিত ভালোবাসায় ছিলনা কোন ছোঁয়া, ছিলনা কোন প্রেমালাপ। সবকিছুই ঘটেছে নিরবে। ওদের ভালোবাসা ছিল বর্নহীন শব্দের ন্যায়। আছে অথচ দেখা যায়না।

” পছন্দ হয়েছে? ” ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল সাদাফ।

” হুঁ। ” কাঁপা কাঁপা গলায় বলল অর্নি।

” ভয় পাচ্ছিস? ”

মাথা নেড়ে সায় জানায় অর্নি। অর্নির বোকামিতে হাসল সাদাফ। ঠোঁট ছোঁয়াল কানের লতিতে৷

” আমি কি বাঘ না ভাল্লুক? ”

সাদাফের এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই অর্নির কাছে।

” তবে কি আজ রাতে আমাকে সন্যাসী হয়ে কাটাতে হবে? ” তখনো সাদাফের হাত দুটো অর্নির উন্মুক্ত পেটে বিচরণ করছে। সাদাফের ছোঁয়ায় বারবার শিউরে উঠছে মেয়েটা।

সাদাফের কথায় মুখ টিপে হাসল অর্নি। এতদিন লোকটা নিজেকে খোলসের ভেতর আটকে রাখলেও আজকে নিজেকে প্রকাশ করতে একটুও ইতস্তত করছেনা। সাথে সাথে অর্নির মনে প্রশ্ন জাগল, সব পুরুষরাই কি এমন হয়?

” চুপচাপ আছিস যে? কিছু বল। গত তিনদিন না তোকে দেখতে পেয়েছি আর না তোর কথা শুনতে পেয়েছি। কত কষ্ট হয়েছে জানিস? ” অর্নিকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল সাদাফ।

” তুমিই বল, আমি বরং শুনছি। ”

” উঁহু। একতরফা যে কোনকিছুই বোরিং লাগে। এসব বাদ দিয়ে আমাকে বল, তোর আজকের অনুভূতি। ” সাদাফের গলার স্বরে কেঁপে উঠল অর্নি। কিছু একটা ছিল তার গলার স্বরে, যেটা পৌঁছে গেছে অর্নির শিরা-উপশিরায়, সমস্ত সত্তায়।

” এই অনুভূতির কোন ব্যাখ্যা হয়না। শুধু নিরবে উপলব্ধি করতে হয়। ”

” আরও অনেক অনুভূতিই নিরবে উপলব্ধি করতে হয়। করবি নাকি উপলব্ধি? অনুমতি দিলে নতুন কিছু অনুভূতির সাথে তোকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। যে অনুভূতি তোকে পরিপূর্ণ করবে। যার দরুন তুই পরিনত হবি নারীতে। এক তৃষ্ণার্ত পুরুষের কাঙ্খিত নারী হবি তুই। দিবি কি আমায় অনুমতি? ” ঘোর লাগা গলায় বলল সাদাফ।

সাদাফের কথার মর্মার্থ বুঝতে অসুবিধা হলোনা অর্নির। সাদাফের গলার মাদকতা ছুঁয়ে দিল অর্নির হিয়া। মেয়েটা এক ঝটকায় ঘুরে জাপ্টে ধরল সাদাফকে। সাদাফও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার নারীকে। তখনই সাদাফ অনুভব করল অর্নি মৃদু কাঁপছে। ওর কাঁপন থামানোর কোন চেষ্টাই করলনা সাদাফ। বরং আরও বাড়িয়ে দিতে চাইল। টুপ করেই ও চুমু দিল অর্নির গলায়। একটা, দুটো এরপর কয়েকটা। সাদাফের ছোঁয়ায় অর্নির প্রান যাই যাই অবস্থা হয়েছে। ওর কাঁপুনি আরও বেড়ে গেল। সাদাফের দৃঢ় বাহুডোরে ও নিজেকে হারিয়ে ফেলল। এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই সাদাফ ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল, যেন এই রাতের রানী সে।

***

” এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমার ভয় লাগছে তো। ”

” গত তিনদিন যাবৎ তোমাকে অয়েলিং করছি, কিন্তু তুমি মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছ। আমাকে বলবে কি, তুমি বুঝলে কিভাবে সাদাফ আর অর্নি প্রেম করছে? আজকে যদি না বল, তবে মাথার চুল একটাও রাখবনা বলে দিচ্ছি। ”

” তোর দেখার চোখ নেই, তাই দেখতে পাসনি। তুই তো ব্যস্ত ছিলি আমাকে ঘৃণা করার কাজে। তাই তোর চোখে ওদের গোপন প্রনয় ধরা পরেনি। জার্মান থেকে আসার পরই আমি ওদের হাবভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। ”

ইশরাকের কথাটায় ধাক্কা লাগল অবনীর বুকে। চোখে পানি এসে গেল। ফ্যাসফেসে গলায় ইশরাকের অভিযোগ খন্ডন করতে চাইল।

” আমি মোটেও তোমাকে ঘৃণা করিনি। হ্যাঁ, তোমার রাগ হয়েছিল, অভিমান হয়েছিল। সেগুলোকে ছাপিয়ে ঘৃণা স্থান পায়নি কখনোই। তুমি আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করছ। ”

অবনীর কথা শুনে চমকে ওর দিকে তাকায় ইশরাক। মেয়েটার চোখে পানি দেখে ওর বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠল। প্রায় সাথে সাথেই অবনীকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিল।

” আমি তোকে কখনো দোষারোপ করতে পারি? তোকে দোষারোপ করা মানে নিজেকেই দোষারোপ করা। কাঁদিসনা বউ। তোর চোখের পানির প্রতিটি ফোঁটা আমার বুকে পাথরের ন্যায় আছড়ে পরে। আমি তো শুধু কথার কথা বলেছি। আমি বুঝতে পারিনি তুই আমার কথায় কষ্ট পাবি। সরি, বউ। আর কখনোই এমন ভুল করবনা। শেষবারের মত মাফ করে দে আমাকে। ”

অবনীর সাধ্য নেই ইশরাকের এমন আবেগি গলা শোনার পর নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকার। মেয়েটা ইশরাককে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তাই তার ভালোবাসার পুরুষকে আবেগি হতে দেখে ঝটপট চোখ মুছল।

” তুমি একটা কিপ্টা, সেটাকি তুমি জানো? ”

লাইন ছেড়ে বেলাইনে প্রশ্ন আসায় হকচকিয়ে গেল ইশরাক।

” কিহ্? ”

” হুঁ। তোমার একটামাত্র ভাইয়ের বিয়েতে আমাকে একটা বেনারসি কিনে দিলেনা। এটাকে কি কিপ্টামো বলেনা? ”

” তোকে জামদানী কিনে দিয়েছি, তা-ও আবার দুইটা। এরপরও যদি আমাকে তোর কিপ্টে মনে হয়, তবে আমি যারপরনাই হতাশ হলাম। ”

” আমি মনে মনে একটা বেনারসির আশা করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সেই আশার মুখে ছাই দিয়ে জামদানী কিনে দিলে। ”

” মনে মনে আশা করলে আমি কিভাবে বুঝব? আমাকে বললিনা কেন, তোর বেনারসি লাগবে? ”

” তোমার টাকা খরচ হোক সেটা চাইনি তাই বলিনি। ”

” জামদানী কিনতে কি আমার টাকা লাগেনি? ”

” সাধেই কি তোমাকে কিপ্টে বলি? দুইটা জামদানী কিনে দিয়ে কেমন হা-হুতাশ করছ ভাবা যায়! একমাত্র বউয়ের জন্য জামদানী কিনো এখন আফসোস করছ আর কপাল চাপড়াচ্ছ তুমি! হায়রে কপাল আমার। ”

” ক্ষান্ত দে, কলিজার বইন। কালকেই তোই তোর বেনারসি পেয়ে যাবি। তা-ও আমার নামে বদনাম করিসনা। এবার একটু স্বাভাবিক আচরণ কর প্লিজ। মধুময় রাতটা নষ্ট করিসনা। আমার রোমান্টিক মনে বদনামের আগুন জ্বালাসনা। আজকের রাতটা কেমন রোমান্টিক দেখ? এমন রাতে বউদের লাজুক রূপে দেখতে চায় তাদের স্বামীরা। আর ভুলে যাসনা তুইও বউ আমিও একজন বেচারা স্বামী। ”

ইশরাকে মুখভঙ্গি দেখে হেসে উঠল অবনী। ও জাপ্টে ধরল ইশরাককে। ঠোঁট ছোঁয়াল ওর পুরুষের গালে। অবনীর কাছ থেকে প্রনয়ের ছোঁয়া পেতেই ইশরাকের বুকে ডামাডোল বাজতে শুরু করল। আজকের রাত বৃথা যেতে দেবেনা।

***

তিনদিন পর ওরা চারজন ঢাকায় ফিরল। ঢাকায় ফিরেই সাদাফ অর্নিকে কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিল। অর্নিসহ সকলেই ব্যস্ত হয়ে গেল। প্রতিদিন সকালে দুই বোন হাতেহাত মিলিয়ে রান্না করে। ইশরাক অফিসে বেরিয়ে গেলে সাদাফও অর্নিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর অবনী ধীরেসুস্থে বেরিয়ে যায়। যেহেতু ও বড় সেহেতু ওর দ্বায়িত্বও বেশি। রাতে সবাই বাড়িতে ফিরলে খাওয়াদাওয়া সেড়ে কিছুক্ষণ জম্পেশ আড্ডা দেয়। এভাবেই চলতে থাকে ওদের জীবন।

চলবে…