#হলুদ_বসন্ত
#অন্তিম
জাওয়াদ জামী জামী
” এই যে শোনোনা, এই শুনছ? ”
অবনীর ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল ইশরাক। অবনীর মুখখানা দু হাতের আঁজলায় ধরে ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল,
” কি হয়েছে, জান পাখি? কষ্ট হচ্ছে তোর? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমাকে বল? ”
” কাঁঠাল চাঁপা এনে দাও। ” ঠোঁট ফুলিয়ে বলল অবনী।
” কিহ্! ”
” কাঁঠাল চাঁপার ঘ্রান নিতে ইচ্ছে করছে। ”
” এত রাতে এই ঢাকা শহরে আমি কাঁঠাল চাঁপা কোথায় পাব! ”
” আমাদের বাড়িতে আছে। তুমি এনে দাও। ”
” বউ, এভাবে জিদ করেনা। বাড়িতে যেতে আমার সময় লাগবে ছয় ঘন্টা। আসতেও তাই। আমি আগামী শুক্রবার বাড়িতে গিয়ে তোর জন্য কাঁঠাল চাঁপা নিয়ে আসব। ”
” বুঝেছি তুমি আমাকে আর ভালোইবাসনা। তোমার পুচকুই তো আমাকে বলেছে, কাঁঠাল চাঁপা আনতে। সে ঘ্রান নিতে চায় এই ফুলের। ”
” নিজের ইচ্ছেকে আমার প্রিন্সেসের ঘাড়ে চাপিয়ে দিবিনা বলে দিলাম। আমার প্রিন্সেস তার পাপাকে রাত-বিরেতে কষ্ট দিতেই পারেনা। ”
” তার মানে তুমি প্রত্যক্ষভাবে আমাকেই দোষী করলে? আমি সব বুঝে গেছি। এখন আর আমাকে ভালো লাগছেনা তোমার। তাইতো বারবার আমার দিকেই আঙুল তুলছ। এখন প্রিন্সেসই তোমার সবকিছু। ”
” আল্লাহ এই মেয়েকে আমি কিভাবে বোঝাই, সে ছাড়া আমি শূন্য! আরে পাগলি মেয়ে, প্রিন্সেসও যেমন আমার কলিজার টুকরা, তেমনি তুইও আমার কলিজা। ওকে আমি কালকের মধ্যে তোকে সামনে কাঁঠাল চাঁপা এনে দেব।”
” আর একটা কথা ছিল। ”
” বল। ”
” গোলাপ, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, কামিনীসহ এখন যেসব সুগন্ধি ফুল পাওয়া যায়, সব লাগবে আমার। মোটকথা পুরো বাসায় ফুলের সুবাস থাকতে হবে। ”
অবনীর কথায় অবাক হল ইশরাক। মেয়েটাকে ফুলের জন্য উদগ্রীব হতে দেখে আপনাআপনি ভ্রু কুঁচকে গেল।
” কালকের মধ্যে পুরো বাসা আমি ফুল দিয়ে ভরিয়ে দেব। এখন একটু ঘুমা। আমার প্রিন্সেসের ঘুম পেয়েছে। তুই না ঘুমালে ওর শরীর খারাপ করবে। ”
ইশরাকের কথা শুনে অবনী বাধ্য মেয়ের মত বালিশে মাথা রাখল। এরপর ইশরাকের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
” প্রতিদিনই তাজা ফুল লাগবে কিন্তু। প্রতিদিনই তাজা ফুলের সুবাস চাই আমার। ”
” আমি সব ব্যবস্থা করব। এবার ঘুমিয়ে পর, জান পাখি। ” ইশরাক অবনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অবনীও চোখ বুজল।
এভাবেই প্রতিনিয়ত অবনী ইশরাককে বিরক্ত করেই চলল। পুরো নয়মাস জুড়ে চলল অবনীর এটা-সেটা নানান আবদার। প্রতিদিন মেডিকেল থেকে ফেরার সময় ফুল নিয়ে আসত। ওর প্রেগেন্সির তিনমাসের বেলায় ঢাকা মেডিকেলে জয়েন করে অবনী। প্রেগেন্সির আটমাসে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যায় সে। প্রেগেন্সির শুরু থেকেই ওর কাছে আছেন নাজমা আক্তার এবং মিনারা খাতুন। একজন যখন গ্রামে যান তখন আরেকজন থাকেন অবনীর পাশে। তারা কখনোই অবনীর নানান আবদারে বিরক্ত হননি। বরং হাসিমুখে ওর সকল চাওয়া পূরণ করার চেষ্টা করে।
অবনীর নয়মাসের কয়েকদিন আগেই নাজমা আক্তার ঢাকায় আসলেন। একজন কাজের মেয়ে আর কুলসুম বেগমের হাতে সংসার রেখে তিনি ঢাকায় এসেছেন। অবনীর শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছেনা। ওর হাত-পা ফুলে গেছে। ঠিকমত হাঁটতে পারেনা। গত কয়েকদিন থেকে ওর সাথে মেডিকেলে নাজমা আক্তার অথবা মিনারা খাতুন যাচ্ছেন।
” অবনী, খাবিনা, মা? ” নাজমা আক্তার অবনীর মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন। অবনী শুয়ে ছিল। মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটাচ্ছে ও।
” খেতে ইচ্ছে করছেনা, মা। আজ সকাল থেকেই কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে শরীরটা। আর তোমার নাতনীদের ছুটোছুটি তো আছেই। আমার মনে হয় বড় হয়ে ওরা রেসলিং খেলবে। তাই আগে থেকেই প্র্যাকটিস করছে। ”
” বালাইষাট। আমার নাতনীরা বাবা-মার মত মেধাবী আর যোগ্য হবে। ওরা কেন ওসব আজেবাজে খেলা খেলবে! ”
***
রাতে ইশরাক বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। ওর পাশে শুয়ে আছে অবনী। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। ইশরাক কাজের ফাঁকে ফাঁকেই অবনীর দিকে লক্ষ্য রাখছে। হঠাৎই অবনীর তীক্ষ্ণ চিৎকারে ইশরাকের মনযোগ ভঙ্গ হল। ল্যাপটপের ডাকনা বন্ধ করে উবু হল সে। দু হাতে জড়িয়ে ধরল অবনীকে।
” কি হয়েছে, জান? কষ্ট হচ্ছে তোর? ”
” ব্যথা হচ্ছে। প্রচন্ড ব্যথা। আমাকে হসপিটালে নিয়ে চল। ”
ইশরাক হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। মা, চাচীকে চিৎকার করে ডাকল।
অবনীর প্রতিটি চিৎকারে কাঁপন ধরাচ্ছে ইশরাকের বুকে। হসপিটালের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনী হচ্ছে অবনীর চিৎকার। ইশরাক, নাজমা আক্তার, মিনারা খাতুন, অর্নি, সাদাফ সকলেই ওকে শান্তনা দিচ্ছে কিন্তু কারও শান্তনাই অবনীর কান অব্দি পৌঁছাচ্ছেনা। ও চিৎকার কাঁদছে।
” অবনী, আর একটু ধৈর্য্য ধর। ডক্টর এসেছেন। আর কোন ভয় নেই। ” ইশরাক কাঁপা গলায় বলল।
” ইশরাইক্যা, তুই চুপ কর। তোর জন্যই আজকে আমাকে এত কষ্ট করতে হচ্ছে। তুই সবকিছুর জন্য দায়ী। আমাকে কষ্টের মুখে ঠেলে দিয়ে এখন এসেছিস শান্তনা দিতে? তোর শান্তনায় কে ভুলছে রে? ” ব্যথায় অবনীর কোন হুঁশ নেই। কার সামনে কি বলছে সেই ধারনা ওর নেই।
এদিকে ইশরাক অবনীর কথা শুনে লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে। মেয়েটার কাণ্ডজ্ঞান তবে হবে সেই চিন্তা ওকে পেয়ে বসল৷
নাজমা আক্তারও অবনীর কথা শুনে হাসছেন। হাসছেন মিনারা খাতুনও। সাদাফ অর্নি একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে আর মিটিমিটি হাসছে।
***
হসপিটালের কেবিনের বেডে শুয়ে আছে অবনী। ও তৃপ্ত নয়নে দেখছে ওর কলিজার টুকরোদের। ইশরাক অনভ্যস্ত হাতে একটা মেয়েকে কোলে নিয়েছে। আরেকজন আছে নাজমা আক্তারের কোলে। তাদের দু’জনের দিকে ঝুঁকে রয়েছে বাকি সকলে। তারা হাসিমুখে দেখছে তাদের প্রিন্সেসদের। যেন জীবন্ত দুটি পুতুল পিটপিটিয়ে তাকিয়ে দেখছে সকলকে৷ ঘন্টাখানেক আগে সকল চিন্তার অবসান ঘটিয়ে নরমালেই সন্তান প্রসব করে অবনী। মা এবং সন্তানেরা উভয়ই সুস্থ আছে। তবে প্রসবের পরপরই জ্ঞান হারায় অবনী। তাই ওকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।
ইশরাক মেয়েকে নিয়ে অবনীর পাশে গিয়ে বসল। অবনীর কপালে চুমু দিয়ে বলল,
” এবার আমার পক্ষে কথা বলার মানুষ এসে গেছে। তুই আমাকে বকাঝকা করবি আর আমার প্রিন্সেসরা আমাকে সাপোর্ট দেবে। আগে শুধু আমি একা তোকে বিরক্ত করতাম এবার তিনজন মিলে বিরক্ত করব। ”
” হুহ্ আমারও দিন আসবে। কোনমতে যেতে দাও ছয়টা মাস এরপর আমিও আমার প্রিন্সের আগমন সুনিশ্চিত করব। সে আমার পক্ষে থাকবে। তখন আমরা মা-ছেলে মিলে তোমার হালুয়া টাইট করব। ”
” কিহ্! আরও একটা বেবি চাই তোর? জীবনেও না। আমার আর কোন বেবি লাগবেনা। আর কি যেন বললি, হালুয়া টাইট? সেটা আবার কি জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ”
” সময় আসলেই বুঝবে হালুয়া টাইট কি জিনিস। আমি আবারও বলছি, আমার একটা প্রিন্স চাই। এবং ছয়মাস পরেই। এক্ষেত্রে তোমার কোন বারণ আমি শুনবনা। ” চেঁচিয়ে বলল অবনী।
অবনীকে চেঁচাতে দেখে ইশরাক পেছনে তাকাল। কিন্তু কাউকেই দেখলনা।
দু’জনকে ফিসফিস করতে দেখে কেবিন থেকে সকলেই বেরিয়ে গেছে তা ওরা লক্ষ্য করেনি।
” তুই আর ভালো হলিনা। বড় হয়ে মেয়েরা যদি দেখে তাদের মা ইন্টারন্যাশনাল ঝগড়ুটে, তখন ওদের ওপর কিরূপ প্রভাব পরবে বলতো? তাই সময় থাকতেই ভালো হয়ে যা। ”
শরীরটা দুর্বল থাকায় ইশরাককে কিছুই বললনা অবনী। ঝগড়া করার দুনির্বার ইচ্ছে ত্যাগ করে চোখ বুজল।
***
” আপু, আমি প্রিন্সেসদের নাম ঠিক করেছি। আকিকা কিন্তু ঐ নামেই হবে। তোমাদের কারও আপত্তি আমি শুনবনা। ” অর্নি মেয়েদের একজনকে কোলে নিয়ে বলল।
” কে আপত্তি করবে? কি নাম রেখেছিস? ” মেয়েদের কাপড় গোছাতে গোছাতে জিজ্ঞেস করল অবনী। ওরা তিনদিন হয় বাসায় এসেছে।
” ইযরা বিনতে ইশরাক, ইত্তিকা বিনতে ইশরাক। কেমন হয়েছে বল? ভাইয়া, নামগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে? দুটো নামই অর্থপুর্ন। ” অর্নী জিজ্ঞেস করল ইশরাকককে।
” অপছন্দ হওয়ার কোন কারনই দেখছিনা। তাহলে এই নাম দুটোই ফাইনাল। আগামীকাল আমি আর সাদাফ গ্রামে গিয়ে আকিকার ব্যবস্থা করব। তুই কি বলিস, অবনী? ”
” প্রথমত, নাম দুটো খুব সুন্দর। দ্বিতীয়ত, তুমি আমাকে গ্রামে নিয়ে যাবেনা তাই এই বিষয়ে কোন মতামতও দেবোনা। ”
” আগে সুস্থ হ, তারপর গ্রামে যাবি। ”
” এই সুস্থ হওয়ার মেয়াদ কতদিনে পূর্ণ হবে জানতে পারি? ”
” অন্তত ছয়মাস। ”
” জানতাম এমন কিছুই বলবে তুমি। তুমি কি চাওনা আমার মেয়েরা তাদের বাপ-দাদার ভিটে দেখুক? ”
” চাই কিন্তু সেটা ছয়মাস পর। এবার চুপ যা। আমাকে কাজ করতে দে। ” ইশরাক ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল অবনীকে।
***
” তুমি কি লক্ষ্য করেছ, ইযরা, ইত্তিকা দু’জনেই দেখতে তোমার আর ভাইয়ার মত হয়েছে? ওরা আমার কিংবা আপুর মতও তো হতে পারত তাইনা? ” অর্নি ইযরাকে কোলে নিয়ে গোমড়ামুখে অভিযোগ জানাল সাদাফকে।
” আমরা দু’ভাই ওদের বাবা আর চাচ্চু তাই ওরা আমাদের মতই হয়েছে। ”
” আমিও তো ওদের খালামনি আবার ফুপুও হই। কই আমার মত তো হলোনা? এটা কিন্তু অন্যায় হয়েছে আমাদের সাথে। ”
” মন খারাপ করিসনা। অবনী বলেছে, ও আরও দুইটা বেবি নেবে। সেগুলো নাহয় তোদের মত দেখতে হবে। কিংবা আমাদের বেবি। ওরা হবে ওদের মায়ের মত। তবে সেটা আরও পাঁচ বছর পর। ”
” কেন? পাঁচ বছর পর কেন? এখনই নয় কেন? ”
” আগে পড়াশোনা শেস করবি তারপর। ততদিনে আমাদের প্রিন্সেসরাও বড় হয়ে যাবে। আবার নতুনভাবে আমাদের বাবা-মায়েরা খেলার সাথী পাবে। ”
” তুমি শুধু যুক্তি দাও। ”
” শোন, আগামী পাঁচ বছর প্রিন্সেসদের নিয়েই থাকতে হবে তোকে। পাঁচ বছর পর নতুন কেউ আসবে, তার আগে নয়। এটা নিয়ে আর কোন কথাই হবেনা। আমার কাছে সবার আগে তোর পড়াশোনা, তারপর অন্য কিছু। ”
সাদাফের ধমকে অর্নি ঠোঁট ফুলিয়ে বাচ্চাদের দিকে মন দেয়৷ ও বুঝে গেছে, সাদাফ পাঁচ বছরের আগে কিছুতেই বাচ্চা নিবেনা।
***
” এই যে, আয়মান, আহমারের পাপা, শুনছ তুমি? ” অবনীর কথা শুনে ইশরাক এদিক-ওদিক তাকায়।
” কাকে ডাকছিস? আয়মান, আহমার কে? ”
” আমাদের ভবিষ্যৎ ছেলেরা। আমার চোখের মণি ওরা। যেমন প্রিন্সেসরা তোমার দুই নয়নের মণি। তেমনি আমার ছেলেরাও আমার চোখের মণি। ”
অবনীর কথায় ইশরাক হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারেনা। ও হা করে তাকিয়ে থাকে অবনীর দিকে। ওকে নিরব থাকতে দেখে অবনী আবারও কথা বলল,
” হিংসা হচ্ছে বুঝি, আয়মানের পাপা? তোমার যদি দুইটা প্রিন্সেস থাকতে পারে, তবে আমার কেন দুইটা প্রিন্স থাকতে পারবেনা? ”
” প্রিন্স! তা-ও আবার দুইটা! মাথা ঠিক আছে তোর? তুই বাচ্চা সামলাবি না ডাক্তারি করবি? আর আমাকে কি তোর হ্যাচারির মালিক মনে হয়? যখন খুশি তখনই বাচ্চা পয়দা করব? ”
” তুমি হ্যাচারির মালিক, নাকি তোমার বাড়িটাই হ্যাচারি সেটা পরে দেখা যাবে। তোমার কথা আমি শুনলে তো। ”
ইশরাক আর কথা বাড়ায়না। সিদ্ধান্ত নেয় ধীরেসুস্থে বোঝাবে অবনীকে৷
***
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে আট মাস। আটমাস বয়সী মেয়েদের নিয়ে ইশরাক অবনী গ্রামে এসেছে। ওদের সাথে সাদাফ, অর্নিও এসেছে। সাদাফ এবার বিসিএস প্রশাসনে টিকেছে। বেচারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেছে। মাস্টার্স শেষ করার পর ইশরাক ওকে চাকরি করতে দেয়নি। ও চেয়েছে সাদাফ বিসিএস দিক। আর তাই পড়াশোনা করা জরুরী। সাদাফও ইশরাকের কথা মেনে নিয়ে কোমড় বেঁধে পড়াশোনা করেছে। আর ফলও পেয়েছে।
বাড়িতে আসার পর থেকেই মেয়েদের কাছে পায়নি অবনী। রাতেও ওরা দাদিমা, নানিমার কাছে থেকে গেছে। ইযরা আছে নাজমা আক্তারের কাছে, ইত্তিকা আছে মিনারা খাতুনের কাছে। অবনী মা এবং শ্বাশুড়ির রুমে উঁকি দিয়ে দেখে এসেছে। মেয়েরা ঘুমিয়ে গেছে।
রুমে এসে অবনী দেখল ইশরাক ফোনে ব্যস্ত। ও দ্রুত পায়ে ইশরাকের কাছে এসে ওর হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল। ইশরাক মোটেও অবাক হলোনা। অবনীর এমন কাজের সাথে ও পরিচিত।
” আয়মানের পাপা, আজকে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। ”
” তাই নাকি? কি সেটা? ” ইশরাকের কথা শেষ হতেই ওর হাতটা টেনে অবনী নিজের পেটে রাখল।
” এবার সত্যি সত্যিই আয়মান, আহমার আসতে চলেছে।”
অবনীর কথা শুনে এবার সত্যিই চমকায় ইশরাক। এই মেয়ে বলছে কি!
” মজা করিসনা, অবনী। আমার ঘুম পেয়েছে। আয় ঘুমিয়ে পরি। ”
” বিশ্বাস কর আমি মজা করছিনা। সত্যিই কেউ আসছে। ”
” অবনী, এমন বাচ্চামো কেন করিস বলতো? সবেমাত্র তোর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে। তুই বাচ্চা সামলাবি কখন, ক্যারিয়ারে মনোযোগী হবি কখন? তোর স্বপ্ন, বাবা-মা, চাচা-চাচীর স্বপ্ন সবকিছু ভুলে তুই সন্তান নিয়ে পরলি কেন বলতো? তুই চাইলে আরও দুই বছর পর বেবি নিতে পারতি। কিন্তু এখন কেন? ” চিন্তায় ইশরাকের কপালে ভাঁজ পড়ল।
” তুমি খুশি হওনি? রাগ করলে আমার ওপর? ”
” এই মুহূর্তে আমার থেকে বেশি খুশি কেউ হতে পারবেনা। আমি চিন্তা করছি তোকে নিয়ে। মেয়েরা এখনো ছোট, তোকে দিনরাত রুগীদের সাথে কাটাতে হয়, সংসার আছে, এরইমধ্যে আবার আরেকজন আসলে তাকে সামলাবি কেমন করে? ”
” ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। অর্নি তো আছেই আমার কাছে। ও থাকলে আমার চিন্তা কি? এছাড়াও আমার দুই মা আছে। আমি এসব নিয়ে চিন্তা করিনা বুঝলে? আমার অনেকদিনের স্বপ্ন চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে থাকবে আমার। আমি যেকোন মূল্যেই নিজের স্বপ্ন পূরণ করব আবার ক্যারিয়ারও গড়ব। ”
” হায়রে আজব স্বপ্ন! এখনকার মেয়েরা যেখানে একটার বেশি সন্তান নিতে চায়না, সেখানে আমার বউ চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে চায়। ” ইশরাক কৃত্রিম আফসোস দেখিয়ে অবনীকে বুকে টেনে নিল। অবনীও বাধ্য মেয়ের মত ইশরাকের বুকের সাথে মিশে রইল। ইশরাক ওকে এই অবস্থায় কি করণীয় সেগুলো নতুনভাবে বোঝাতে শুরু করল।
***
নয়মাস পর
হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে অবনী। ওর পাশে বসে আছে ইযরা, ইত্তিকা। মায়ের পাশে বসে ওরা খেলছে৷ অবনী মেয়েদের থেকে নজর সরিয়ে তাকাল ইশরাকের দিকে। ইশরাক ছেলেকে আদর করছে। অবনী মনে মনে ভাবল, আচ্ছা এটা কি বড়টা নাকি ছোটটা? হ্যাঁ, সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবারও অবনীর জমজ ছেলে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল ইশরাক। কিন্তু পরক্ষণেই আনন্দে কোলে তুলে নিয়েছিল ছেলেদের।
ইশরাকের হাসিমাখা মুখ দেখে অবনীর মন প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল।
” এবার খুশি তো, বউ? তোর আয়মান, আহমার চলে এসেছে? তোর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ” সবাই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলে ইশরাক অবনীকে জিজ্ঞেস করল।
” খুউউব খুশি আমি। সবেমাত্র চারটা হয়েছে। আর একটা হলেই আমি পরিপূর্ণ হব। ”
” সর্বনাশ! এটা কি মানুষ নাকি রোবট! তুই কি চাস, তোকে রেখে আমি আলাদা রুমে গিয়ে ঘুমাই? ”
” আমি তোমার সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে চাই, আবার আরও একটা সন্তান চাই । দু’টোই চাই আমার। ”
” মাফ কর আমাকে। অফিস থেকে আমাকে সুইজারল্যান্ড যেতে হবে। আগামী দুই বছর আমি সেখানেই থাকব। ” ইশরাক ইচ্ছে করেই মিথ্যা বলল।
” কোথাও যাবেনা তুমি। আমি কোথাও যেতে দেবোনা তোমাকে। প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেবে। ”
” তুই যদি প্রমিস করিস আর কখনোই ছেলেমেয়ে নেয়ার কথা মাথায় আনবিনা, তবেই আমি তোর প্রস্তাব ভেবে দেখব। তার আগে নয়। ”
কিছুক্ষণ ভাবল অবনী। এরপর মুখ খুলল,
” ঠিক আছে। একমাত্র স্বামীর জন্য নিজের পাঁচ নম্বর সন্তানের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। খুশিতো এবার? ”
ইযরা, ইত্তিকাকে ভেতরে আসতে দেখে ওদের হাত বাড়িয়ে নিজের কাছে ডেকে নিল ইশরাক। ছেলেরা ঘুমাচ্ছে অবনীর পাশে। দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে অবনীর মাথার পাশে বসে থাকল ইশরাক। মেয়েরা ওর বুকের সাথে মিশে আছে। অবনী আদর করছে ছেলেদের। ইশরাক অপলক তাকিয়ে থাকে তার রমনীর দিকে। যে মেয়েটাকে একদিন অপমানে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল, আজ সেই মেয়েটাই ওর সব। ওর প্রানপাখি লুকিয়ে রয়েছে এই মেয়েটার ভেতরে। ইশরাক একটু ঝুঁকে চুমু দিল অবনীর কপালে। অবনী চোখ তুলে তাকিয়ে মৃদু হাসল। ইশরাক সুখী, ভীষণ সুখী। ওর অবনীময় পৃথিবীতে নেই কোন দুঃখ, নেই কোন শোক, নেই কোন অভিমান, অভিযোগ। সেখানে শুধুই রয়েছে ভালোবাসা আর ভালোবাসা।
সমাপ্ত