স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা পর্ব-৩০ এবং শেষ পর্ব

0
49

#স্বপ্নে_দেখা_রাজকন্যা
#অন্তিম_পর্ব

“ম্যাডাম আজ কিন্তু বিশেষ রাত, আজ কোনো বারণ আমি শুনবো না”

দীপশিখার কানে খুব ধীরে বললো জাওয়াদ। জাওয়াদের এমন কথায় লজ্জা এসে ভর করলো তার সারা দেহে। নতমস্তক সংকুচিত হয়ে গেলো তার শরীর। হৃদস্পন্দন বুলেট ট্রেনের বেগে ছুটছে। হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে এলো। তাকে চুপ থাকতে দেখে জাওয়াদ নিজের দিকে ঘোরালো। লজ্জায় রক্তিম প্রেয়সী মুখখানা মনের মধ্যে ঝড় তুললো। মেয়েটিকে আরো কাছে পাওয়ার নিষিদ্ধ ইচ্ছে হানা দিলো হৃদয়ে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এর ন্যায় হৃদয়ের তটেও হানা দিলো তীব্র প্রেম। গাঢ় স্বরে বললো,
“আজ অসংযত হতে ইচ্ছে হচ্ছে দীপশিখা? অনুমতি দিবে?”

দীপশিখার মাথা নত করে রয়েছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। বেসামাল পুরুষালী নয়ন তাকে দেখছে। দৃষ্টির এক মুহূর্তের টলোমলোতা যেন ভেঙে দিলো সময়ের ভারসাম্য। আচমকা জেগে উঠল সেই ইচ্ছে—যাকে এতদিন আটকে রাখা হয়েছিল বিবেকের পর্দায়। দীপশিখাকে কাছে টেনে আনল সে। ভীরু নয়, নির্জনে গোপন কোন অভিপ্রায়ে নয়—সরাসরি। অধরে ছুঁয়ে গেলো অধর। দীপশিখার ঠোঁটে এক বিন্দু কাঁপুনি, চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে জানে না, কাঁপছে ভালোবাসায়, না শরীরী বিস্ময়ে। বাতাস থেমে গিয়ে যেন আবার চলতে শুরু করেছে একটু জোরে। উঁচু গাছটার ডালে বসা এক জোড়া পাখি, যারা হয়তো এখন চোখ নামিয়ে নিচ্ছে লজ্জায়। মানুষদের অনুভূতি বোঝে তারা, তাদের পক্ষেই তো সম্ভব এমন মৃদু সহমর্মিতা।

জাওয়াদ তাকিয়ে আছে দীপশিখার মুখের দিকে। চোখে একরাশ মুগ্ধতা। দীপশিখা কিছু বলছে না, শুধু নিঃশ্বাস ফেলছে ঘন ঘন। হয়তো নিজেকেই সামলে নিচ্ছে ভেতরে ভেতরে। তার মুখে কিছু নেই, তবে তার ভেতরে বয়ে চলেছে একপ্রকার ঝড়। হঠাৎ জাওয়াদ প্রশ্ন করল, নরম স্বরে,
“তাকাবে না দীপশিখা?”

প্রশ্নটা যেন হাওয়ায় মিশে যায়, কিন্তু সাড়া আসে না। দীপশিখা তাকায় না, কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে সামলে রাখার এক অদ্ভুত নিষ্ফল প্রচেষ্টায়। জাওয়াদ আবার বলে, আগের মতোই ধীর ভঙ্গিতে,
“তাকাও তো একবার। দেখি, আমার প্রণয়িনীকে আমার প্রণয়রঙ্গে কেমন লাগছে?”

দীপশিখা চোখ তোলে না পুরোপুরি, তবে আড়চোখে দেখে নেয় এক ঝলক। জাওয়াদের ক্লান্ত, জীর্ণ মুখখানা যেন আলোয় ঝলসে উঠছে। অদ্ভুত এক আকর্ষণ, চোখে প্রশ্রয়, আর সদ্য পরিচিত ভালবাসা। সে পলক ফেলছে না। দীপশিখার মনে হয়, লোকটাকে হয়তো তাকে আজই প্রথম দেখছে। তবে এত গভীরভাবে কি তাকে কখনো দেখেছে সে? অন্তর্গত স্বীকারোক্তি দীপশিখার মনে নিজের মতো করে গুঞ্জরিত হয়,
“আপনি খুবই বেপরোয়া, জাওয়াদ সাহেব। প্রচণ্ড অসভ্য একজন প্রেমিক।”

***

আকাশে মেঘ জমেছে। ধীর গতিতে শীতল বায়ু প্রবেশ করছে খোলা বারান্দা দিয়ে। ধীর গতিতে চলছে সদ্য কেনা চার্জার ফ্যানটা। ঘরে আলো নেই। মাত্রই কারেন্ট গিয়েছে। নতুন ঘরের জন্য অনেককিছু কিনতে হবে। মাথার নিচে হাত দিয়ে শুয়ে আছে জাওয়াদ। তার বুকের মধ্যিখানে জড়োসড়ো হয়ে মিশে আছে দীপশিখা। জাওয়াদ তাকে আগলে ধরে রয়েছে। পাশ ফিরে একবার স্ত্রীর মুখখানা দেখলো। চাঁদের রুপালী স্নিগ্ধ আলোতে দীপশিখাকে অসম্ভব মায়াবী লাগছে। বুকের মধ্যখানটা নড়েচড়ে উঠলো। মেয়েটি তার আলিঙ্গনে অথচ মনে হচ্ছে যে ভেতরটা এখনো খালি। হৃদয় যেন আরোও গভীরভাবে তাকে চায়। বাহুডোর আরও শক্ত করলো সে, যেন একটু ঢিলে হলেই মেয়েটিকে হারিয়ে ফেলবে। এই চিন্তা মস্তিষ্কে হানা দিতেই বুকের মধ্যিখ্যানে অস্থিরতা ঘিরে ধরে। এতোটা ভালো কাউকে কখনো বেসেছিলো কি জাওয়াদ? কারোর জন্য নিজেকে ভুলে গিয়েছে এমন কি হয়েছে কখনো? মৃদু হাসলো জাওয়াদ। চুমু আঁকলো দীপশিখার কপালে। ঘুম আসছে। কতদিন পর এমন শান্তির ঘুম আসছে কে জানে।

***

নিশির কালো মোড়ক আলোর চাঁদরে মুড়ে নতুন দীপ্তিময় আভা লুটিয়ে পড়ছে মোজাইকের মেঝেতে। পাখির নরম কোলাহলে ঘুম ভাঙলো জাওয়াদের। চোখ মেলে প্রথমেই তাকালো নিজের পাশে। যেখানে তার প্রণয়িনী ঘুমিয়ে ছিলো। পাশে তাকাতেই চট করে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। পাশের অংশটা ঠান্ডা। দীপশিখাকে না দেখতে পেরে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো সে, অন্তস্থলে হাহাকার উঠলো। উদ্বিগ্ন এবং ত্রাসিত নয়নে তাকালো আশেপাশে। কুন্ঠিত স্বরে ডাকলো,
“চিংকি, চিংকি”

সাড়া না পেয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ব্যগ্র হয়ে খুঁজতে লাগলো সে দীপশিখাকে। রান্নাঘরের কাছে যেতেই পা আটকে গেলো। দুটো মেলামাইনের প্লেটে পরোটা বাড়ছিলো। জাওয়াদ সাথে সাথেই তাকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরলো। শক্ত আলিঙ্গনে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে সন্তর্পণে সামলে নিলো চিংকি। জাওয়াদের ঘন নিঃশ্বাস বিদীর্ণ করছে দীপশিখার চামড়া। দীপশিখা ধীর কণ্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে?”
“তুমি আমার দৃষ্টিসীমার বাহিরে যাবে না। আমার ভয় হয়”
“কিসের ভয়?”
“তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়”

দীপশিখা জাওয়াদের দিকে তাকালো। দুহাতে তার ভীত মুখখানা তুলে ধরলো। আশ্বস্ত স্বরে বললো,
“আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না”
“সত্যি তো?”
“সত্যি, সত্যি, সত্যি। এবার খেয়ে নিন”
“হ্যা, বিকেলে তোমাদের বাসায় যাব। আন্টিকে জানাতে হবে”

কথাটা শুনতেই দীপশিখার মন খারাপ হয়ে গেলো। মুখশ্রীতে নেমে এলো ঘোর আঁধার। গম্ভীর স্বরে বললো,
“বাবা ফোন করেছিলো”
“কি বললেন?”
“মা রেগে আছে। এখন যাওয়াটা ঠিক হবে না। সে কঠিন ভাবে জানিয়েছে, আমি গেলে সে ঘর ছেড়ে দিবে”

জাওয়াদ অপরাধী স্বরে বললো,
“আমার জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে”
“বিয়ের সিদ্ধান্ত আমাদের দুজনের ছিলো জাওয়াদ সাহেব। তাই দায়ভারটাও দুজনের”

জাওয়াদ স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে। চিংকি বরাবরই বুঝদার নারী। তাই এমন কোনো উত্তরই যেন আশা করেছিলো সে। কোমড়খানা জড়িয়ে ধরে বললো,
“আমাদের সুখের জন্যই তারা আজ আমাদের উপর ক্ষিপ্ত। আমরা সুখে থাকলে দেখবে একদিন তাদের রাগ কমে যাবে”
“আমরা সুখী হবো তো?”
“ইনশাআল্লাহ”

বলেই চিংকির কপালে চুমু খেলো জাওয়াদ। বুকের মধ্যিখানে তাকে টেনে বললো,
“তুমি চিন্তা কর না। আমি তাদের মানিয়ে নিব”

******

সময়ের প্রবাহে জীবন আর আগের মতো স্নায়ুর প্রান্তে কাঁপে না। মাসখানেক যেন চোখের পলকে কেটে গেলো। দীপশিখা এখন সংসার গড়ছে—অধিক কিছু নয়, ছোট্ট পরিসরে, কিন্তু পরম মনোযোগে। নিজের হাতে আলতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে ঘরটাকে। নতুন কেনা আসবাবপত্রে নেই কোন বিলাসিতা, তবু প্রতিটা জিনিসে রয়েছে তার নিজের স্পর্শ, নিজের স্বপ্নের ছাপ। দু’রুমের ক্ষুদ্র ঘর—তাতেই সে রচনা করেছে একরাশ নির্ভরতা, যার প্রতিটি কোণে ঘুরে বেড়ায় ছোট ছোট খুশি, আর দেয়ালে দেয়ালে লেগে থাকে চুপচাপ ভালোবাসা।

মোজাইকের ঠান্ডা মেঝেতে কাঁচা সোনার মত ঝলমলে রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে। জাওয়াদ আয়নায় নিজেকে দেখে শার্টের কলার ঠিক করছে। ওদিকে রান্নাঘর থেকে চুপিচুপি চলে এসেছে চিংকি। নাস্তার গন্ধে মোড়া সকালটা যেন ওর চোখের কোণ ছুঁয়ে কেবল জাওয়াদকেই দেখছে।
“কি দেখছো?”

জাওয়াদ জিজ্ঞেস করল, কণ্ঠে অভ্যস্ত মমতা। চিংকি হেসে ফেলে,
“দেখছি আমার রাজপুত্রটাকে। ভাবছি, আমার মত ঘেটুপুত্রীর ভাগ্যে এমন বর এল কেমন করে!”

জাওয়াদ থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ভালো করে দেখল চিংকির মুখটা। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল,
“একটু আসো তো?”

চিংকি হালকা ভঙ্গিতে পিছু হটল,
“এই না না, আপনার অফিসের দেরি হয়ে যাবে। আমি জানি আপনার মতলব।”
“কি জানো?”

চিংকি উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল। জাওয়াদ ততক্ষণে এগিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে চিংকিকে। পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে বলল,
“কি দেখা যায়?”
“দেখা যায় একটা মোটা পটকা মাছের সাথে একটা ধলা গরু।”

বলেই হেসে ফেলে। জাওয়াদ চুপ করে তার ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“আর আমি দেখি একটা বোকা ছেলে আর তার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা।”
“আমি বুঝি রাজকন্যা?”

চিংকি কেমন যেন গম্ভীর হাসি দিয়ে প্রশ্ন করল। জাওয়াদের বাহুর বাঁধন শক্ত হলো। তারপর চিংকিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গভীর চুম্বনে ভরিয়ে দিলো। নাকে নাক ঘষে বলল,
“তুমি শুধু রাজকন্যা নও, আমার হৃদয়ের রানী। তোমায় ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনাও করতে পারি না।”

চিংকি ওর গলায় হাত জড়িয়ে বলল,
“এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্ন মনে হয়—এই সংসার, এই একসাথে থাকা… মনে হয় এই বুঝি ঘুম ভেঙে যাবে।”

জাওয়াদ কপালের একপাশে চুমু দিয়ে বলল,
“ঘুম ভাঙতে দেবো না। যদি এটা স্বপ্ন হয়, আমি সারাজীবন ঘুমিয়ে থাকতে রাজি। তুমি ছাড়া পৃথিবী ধূসর লাগে।”

চিংকি গলা ছেড়ে বলল,
“এইবার অফিস যান”
“হ্যাঁ ম্যাডাম, তবে যাওয়ার আগে আমার পাওনাটা চাই।”
“কি পাওনা?”

জাওয়াদ হঠাৎ চুমু খেয়ে বলল,
“এইটা।”

চিংকি কপট রাগে বলল,
“ধ্যাৎ, ছাড়ুন তো।”

জাওয়াদ হেসে বলল,
“পাষাণ হৃদয়িনী, জানোই তো—তোমার বরটা তোমার বিরহ সইতে পারে না। ইচ্ছে করে চাকরি ছেড়ে তোমার চোখের সামনে সারা দিন বসে থাকি।”

চিংকি তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ… তারপর? একটা থালা নিয়ে চার রাস্তায় বসি? চলুন এখন, খেয়ে নিন।”

ছোট প্লাস্টিকের ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজানো। চেয়ার টেনে বসলো জাওয়াদ। নাস্তা খেতে খেতে জাওয়াদ বললো,
“আমাদের বিয়ের একমাস হতে চললো, তুমি আমাকে তুমি কবে বলবে?”
“আমার দ্বারা হবে না। আপনি তেই ভালো”
“আপনি?”
“হ্যা? আপনি”
“অন্তত জাওয়াদ সাহেব তো বাদ দাও”
“তাহলে কি বলবো? ওগো শুনছেন?”

জাওয়াদ বুকে হাত দিয়ে বললো,
“হায়! কোনদিন আমার প্রাণ নিয়ে নিবে তুমি”
“হইছে, এবার থামুন”
“পাষাণ নারী নিজের বরকে একটু ভালোবাসাও জাহির করতে দিবে না?”
“ইশশ, কি নির্লজ্জপনা। মানুষ দেখলে কি বলবে?”
“এই যে এই পুরুষের হৃদয়ে শুধু প্রেম আর প্রেম”
“আচ্ছা একটা কান্ড ঘটেছে”

চোখ তুলে চাইলো জাওয়াদ। মুখশ্রীতে বিস্ময়। দীপশিখার মাঝে ঈষৎ বিমূঢ়তা। জড় কণ্ঠে বললো,
“আপু আজ সকালে ফোন করেছিলো। বলছিলো আমাদের ওবাড়ি যেতে বলেছে”

কথাখানা চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো জাওয়াদের। হাসিমুখে বললো,
“এতো খুব খুশির খবর। তাহলে তোমার মন খারাপ কেন?”
“আমার ওবাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না”
“এ কেমন কথা? আমরা তো অপেক্ষাই করছিলাম কবে মা আমাদের ক্ষমা করে দিবে”
“হ্যা, করছিলাম বটে কিন্তু… মায়ের উপর আমার অভিমান হচ্ছে খুব। আমি জানি এই অভিমানটা খুব বেমানান। কিন্তু হচ্ছে। আমি কত তাকে ফোন করেছি। অথচ সে ফোন ধরে নি। আমি দিনে প্রতিদিন তাকে ফোন করেছি। সে ফোন ধরে নি। এখন আপুকে দিয়ে ফোন করিয়েছে। কেন? আমার সাথে কি কথা বলা যায় না?”

জাওয়াদ চেয়ার ছেড়ে দীপশিখার সামনে হাটু গেড়ে বসলো। তার হাতজোড়া বা হাতের ফাঁকে নিয়ে বললো,
“আমি জানি তোমার অভিমান হচ্ছে। কিন্তু এখানে দোষ আমাদের। তাই নত আমাদের হওয়া উচিত”
“তাই?”
“হু”
“তাহলে আমার বাড়ি যাবার পর আমরা আমার শ্বশুরবাড়ি যাব”
“শ্বশুরবাড়ি মানে?”
“বাবা অসুস্থ। গতকাল সিড়ি থেকে পড়ে পা মচকে গেছে। পাভেল ভাই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন ঝামেলা নেই। তবে শুনেছি একমাসে তিনি অনেক দূর্বল হয়ে গেছেন। আমাকে যেতে বলেছেন। আর আমি কোনো কথা শুনতে চাই না”

জাওয়াদের বুঝতে পারি রইলো না মেয়েটা কেন নিজের বাসায় যেতে চাইছিলো না। সে ভালো করেই জানে জাওয়াদকে আব্দুল হামিদের মুখোমুখি করাটা সহজ হবে না। জাওয়াদের ইগো, দম্ভ আর আত্মসম্মান মাঝে আসবে। তাই সে ইচ্ছে করে একটু ঢং করলো। জাওয়াদ তার গাল টিপে বললো,
“আমি অফিস যাবার পর তুমি ও বাসায় যাও তাই না?”
“আপনি যদি আমার মায়ের সামনে নত হতে পারেন, আমিও আমার শ্বশুরের সামনে নত হতে পারি। আমার শ্বশুর আপনার শ্বাশুড়ি থেকে অনেক ভালো”
“রেডি হয়ে থেকো। আটটায় যাব”

দীপশিখার মুখখানা ঝলমল করে উঠলো। এবার হয়তো সবার দোয়া তার সংসারকে আরোও নির্মল করে তুলবে।

******
নিশ্ছিদ্র নীরব সন্ধ্যা নামছে শহরের মাথায়। আকাশের বুকজুড়ে থালার মতো পূর্ণচাঁদ, অথচ তার আলো যেন শহরের বৈদ্যুতিক আলোকচ্ছটার মাঝে মিশে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ধীরগতির বাইকে জাওয়াদের পেছনে বসে আছে দীপশিখা। শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়েছে সে, আজ যেন তার মনটাও সাজানো। প্রথমে যাবে নিজের বাসায়, তারপর শ্বশুরবাড়ি। মাথার ভেতর টুকরো টুকরো কথা ঘুরছে। এই একমাসের বাসা ছেড়ে দিতে হবে, হয়তো। এই বাসাটা তো কেবল ইট-পাথরের নয়; এর প্রতিটা দেয়ালে তাদের দাম্পত্যের প্রথম প্রেম গন্ধ মাখানো। এই ঘরে জেগেছিল প্রথম প্রণয়ের সঙ্কেত, এই বারান্দাতেই ছিল বহু বিকেলের হাসিমাখা কথা। তবু দীপশিখার মনে ক্ষীণ মাত্রারও দুঃখ নেই। কারণ প্রতিটা শেষের মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে নতুন শুরুর আভাস। জাওয়াদের কোমর আলতো আঁকড়ে ধরে আছে সে।

চার রাস্তার মোড়ে এসে বাইক থেমেছে। সিগন্যাল বদলাচ্ছে না। সামনে লাল আলোটা সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ সতর্ক ভাবে গাড়িতে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। চারপাশে লোকজনের হুড্ডাহুড্ডি—সবাই যার যার বাড়ির পথে। তবে দীপশিখার মন শহরের কোলাহলের ধার ঘেষছে না। জাওয়াদের বলিষ্ট পিঠে কপাল ঠেকিয়ে, গলার ভেতরে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস নামিয়ে বলল সে,
“শুনুন, বাবা রাগারাগি করলে কিন্তু আপনি কিছু বলবেন না।”

জাওয়াদ হেসে বলল, “হুঁ।”

দীপশিখা কড়া গলায় বলল,
“এই হুঁ-তে হবে না, ভালো করে বলুন।”
“আজ্ঞে ম্যাডাম, আমি একদম চুপ করে থাকব।”

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর দীপশিখা স্বীকার করল নরম গলায়,
“আজ খুব আনন্দ লাগছে জানেন? মনে হচ্ছে এর চেয়ে বেশি কিছু চাইবার নেই আমার জীবনে।”

জাওয়াদ হাসল। চিংকির কথা শুনে তার মনে হলো এক প্রবীন বৃদ্ধা যেন তার জীবনের সব প্রাপ্তির পরে প্রশান্ত নিশ্বাস ফেলছে। সিগন্যাল এখনো ছুটেনি। সে দীপশিখার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“শোনো পাগলী মেয়ে, আমাদের পথটা তো মাত্র শুরু হলো। এখনই বুড়ো মানুষের মত এমন কথা বলো না।”

দীপশিখা নিঃশব্দে হাসলো। জাওয়াদ বুঝবে না। জীবন থেকে কখনো খুব বেশি কিছু চাইবার ছিলো না তার। সে স্বল্পতেই সুখী ধরণের নারী। তাই আজ যখন তার ঝুলির সব ইচ্ছেগুলোর উপর ঠিক চিহ্ন পড়ছে তখন আর নতুন করে উচ্চাকাঙ্খা হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে আর কিছু পাওয়ার নেই। সৃষ্টিকর্তা তার মতো নারীকে দুহাত ভরে সুখ দিয়েছে যেন। সিগন্যাল ছেড়েছে। জাওয়াদ বাইকে স্টার্ট দিলো। ঠিক তখনই কোথা থেকে একটি পিকাপের আকস্মিক ধাক্কায় পিষে গেলো জাওয়াদের বাইক। আকস্মিক ঘটনা বুঝতে না বুঝতেই চা রাস্তার এক কোনায় ছিটকে পড়লো জাওয়াদ। হাত ছিলে গেলো। মাথায় চামড়া চিরে টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়লো। বাইকখানা দুমড়ে মুচড়ে গেলো মুহূর্তেই। পাঁচ লক্ষ টাকার বাইকের অস্তিত্ব যেন বিলীন হয়ে গেলো। জাওয়াদ নিজের হাটুর থেতলে যাওয়া মাংসটা দেখলো। তার মাথাটা ভার হয়ে গেছে। অব্যক্ত যন্ত্রণা হচ্ছে শরীরে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। লোকজনের ছোটাছুটি বাড়লো। ট্রাফিক পুলিশ ছুটে এলো। মানুষ ধরাধরি করে তুললো জাওয়াদকে। যখন শূন্য মস্তিষ্ক তার ভারসাম্য ফিরে পেলো তখন পা খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে গেলো সে বাইকের কাছে। অস্পষ্ট স্বরে গোঙ্গালো,
“চিংকি, চিংকি”

বাইকের কাছটায় আসতেই থমকে গেলো জাওয়াদের পৃথিবী। অসাড় হয়ে গেলো যেন হাত পা। শারীরিক যন্ত্রণা তাকে কাবু করছে না। তার দৃষ্টি ভিজে এলো। অসহায়ের মতো এগিয়ে গেলো নিথর রক্তস্নাত দেহটির কাছে। নীল শাড়িটা ভিজে আছে রক্তে। হেলমেটটা ভেঙ্গে গেছে। মাথার একাংশ থেকে মগজ বেড়িয়ে গেছে। নিথর, শান্ত প্রেয়সীর সাড়া নেই। ঘোলাটে দৃষ্টি আরোও ঘোলাটে হলো জাওয়াদের। থমথমে স্বরে আবার ডাকলো,
“চিংকি?”

কোনো সাড়া নেই। জাওয়াদের পুরো পৃথিবীটা মুহূর্তেই বেরঙ্গ হয়ে গেলো। বুকের ভেতর শুরু হলো তীব্র হাহাকার। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না সে। পিচঢালা রাস্তায় তার পৃথিবীকে নিঃশেষ হতে দেখছে যেন। কি করবে? মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আছে। চিংকির রক্তস্নাত দেহটাকে জড়িয়ে হাহাকার করে উঠলো,
“চিংকি, উঠো না। উঠো না।“

*****

হাসপাতালের প্লাস্টিকের চেয়ারে শুন্য, বিমূঢ় বসে আছে জাওয়াদ। তার মাঝে কোনো উত্তাপ নেই। নিথর যেন সে। পুলিশের ফোন পেতেই পাভেল, আব্দুল হামিদ, নীরুপমা, মোস্তাফা ছুটে এলেন। জাওয়াদের হাতের মাংস উঠে গেছে। মাথায় আঘাত পেয়েছে। অথচ সে নির্বিকার। নীরুপমা কিছু শুধাতে পারলেন না। জাওয়াদ শুধু ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। এর মধ্যেই ইমাঞ্জেন্সি থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। তার মুখখানা থমথমে। দুঃখিত স্বরে জানালেন,
“শি ইজ নো মোর”

সাথে সাথেই ভারী হয়ে গেলো পারিপার্শিক। হাহাকার গুঞ্জলো। মোস্তফা সাহেব বসে পড়লেন। নীরুপমা হাউমাউ করে উঠলো। জাওয়াদ এখনো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। তার মনে হচ্ছে উত্তপ্ত কয়লা যেন ভেতরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। হৃদয়ের ভেতরের ঝড় সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। ধাঁরালো কোনো ছুরি তার গলায় কেউ বসিয়ে দিয়েছে। স্বর জড়িয়ে বললো,
“আপনারা ঠিক মত চিকিৎসা করেন নি। আমি চিংকিকে অন্য কোথাও নিয়ে যাব”
“শি ইজ ডেড”
“আপনি বেশি বুঝেন। ও বলেছে ও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না”

আর্তনাদ করে উঠলো জাওয়াদ। পাগলের মতো প্রলাপ করতে লাগলো সে,
“পাভেল, অন্য হসপিটালে চল। দেরি করা যাবে না। চিংকি খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওর মাথার অপারেশন করতে হবে”

পাভেল বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলো। কি করে বোঝাবে এই পাগলকে? এতো কষ্টের পরে যে প্রেয়সীকে সে পেয়েছে, সেই প্রেয়সীর মৃত্যু সে কি করে মেনে নিবে? পাভেল তাও কঠিন স্বরে বললো,
“ও আর নেই জাওয়াদ”
“এরা কিছু জানে না। যেয়ে দেখ ঘুষ খেয়ে ডাক্তার হয়েছে”
“জাওয়াদ”

চিৎকার করে উঠলো পাভেল। কান্নামিশ্রিত স্বরে বললো,
“চিংকি আর নেই”

জাওয়াদ ধপ করে বসে পড়লো। তার পৃথিবীটা যেন সরে গেছে। মস্তিষ্ক কাজ করছে না। মনে হচ্ছে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে যেন। সব আসলেই শেষ হয়ে গেছে।

****

দীপশিখাকে শ্বশুরবাড়ি আনা তো হলো কিন্তু সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়ে। নতুন বধুকে আব্দুল হামিদ সাহেব বরণ করলেন কিন্তু সে কেবল ই লাশ। নীরুপমাকে হাই ডোজের মেডিসিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হলো। জাওয়াদ নিজ হাতেই সবটা করলো। তার চোখ পাথর হয়ে আছে। সে যেন জড় পদার্থ। অনুভূতি শূন্য একটা জড় পদার্থ। দীপশিখার শান্ত মুখখানা অনেকটা সময় দেখলো সে। এই ঘুমন্ত মুখখানার দিকে রাত রাতভর তাকিয়ে থাকতো সে। অথচ এই মুখখানা আর দেখা হবে না। তার জীবনে প্রেম তো এলো কিন্তু এতো ক্ষণিকের জন্য যে তাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দিল।

দীপশিখাকে কবর দিয়ে জাওয়াদ নিজ বাড়িতে গেলো। এই বাড়িটার প্রতিটি দেওয়ালে জুড়ে রয়েছে দীপশিখার স্মৃতি। আজ সকালেই তারা নিজেদের একমাসের বৈবাহিক জীবনের আলাপ করছিলো। অথচ এখন ঘরখানা ফাঁকা। দীপশিখার বাসার পরণের জামাটাতে এখনো তার গন্ধ লেগে আছে। অথচ মানুষটি নেই। জাওয়াদ ঘুমোতে চাইলো। অন্তত স্বপ্নে সে তার রাজকন্যাকে দেখতে পারবে। কিন্তু কিছুতেই যেন ঘুমোতে পারছে না। ঘুম আসছে না। চোখ বুঝতেই দীপশিখার রক্তাক্ত দেহটাই চোখের সামনে ভাসছে। হাহাকার করে উঠলো ভেতরটা। অসহায় স্বগোতক্তি করে উঠলো সে,
“আমাকে ঘুমাতে হবে। নয়তো আমি কখনো চিংকিকে দেখতে পারবো না। আমি ঘুমোতে চাই”

*****

সময়ের ধারা কেউ আটকাতে পারে না। চিংকি নেই আজ এক সপ্তাহ। জাওয়াদ একটা জীবন্ত লাশের মত তার জীবন কাটাচ্ছে। তার কান্না পায় না, খাওয়া দাওয়া হয় না। কত রাত জেগে থাকে তার ঠিক নেই। ঘুমোতে গেলেই চিংকির রক্তাক্ত দেহ তার চোখের সম্মুখে ভাসে। পাভেল জোর করে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছে। সবাই তার এমন অবস্থাতে সংকিত। জ্যোতি রাতে বারবার ভাইকে দেখে। পাভেল এসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই যেন হচ্ছে না। হবেও না হয়তো। জাওয়াদ শুধু ঘুমাতে চাই। শান্তির ঘুম। যে ঘুমে তার স্বপ্নের রাজকন্যা তাকে দেখা দিবে। তার বদ্ধ ধারণা চিংকিকে সে দেখতে পাবে। ঘুমালেই দেখিতে পাবে।

গভীর রাত। ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। জাওয়াদের নির্ঘুম চোখ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এমন এক নির্মল জ্যোৎস্নাতে চিংকির তার বুকে মাথা রেখে বলেছিলো,
“জাওয়াদ সাহেব, আপনি আমাকে এতোটা ভালোবাসেন কেন?”
“আমি জানি না”
“জানি না বলে কোনো কথা আছে?”
“আছে হয়তো”
“আচ্ছা, ধরুন আমি যদি কখনো না থাকি। আপনার কষ্ট হবে?”
“আমি হয়তো নিঃশ্বাস নেওয়াই ভুলে যাব”
“এগুলো কাব্যিক কথা”
“সত্যি বলছি”

চিংকি সেদিন পাত্তা দেয় নি। অথচ সত্যি জাওয়াদ বেঁচে আছে। হ্যা, এই বেঁচে থাকা ঠিক বেঁচে থাকা নয়। সারাক্ষণ ভেতরে ভেতরে মরছে সে। কিন্তু কাউকে বোঝানোর ক্ষমতা নেই। চিংকির গন্ধ মিলিয়ে গেছে। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই নারীকে জড়িয়ে সে ঘুমিয়েছে। বারান্দা থেকে শ্রান্ত পায়ে সে নিজের ঘরে গেলো। আজ ডাক্তারের কাছে পাভেল নিয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে। ঘুমের ঔষধ। প্রতি রাতে একটা। কিন্তু জাওয়াদের ধারণা একটাতে কাজ হবে না। সে তিন পাতা ঔষধ হাতে নিল। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তা খেলো। ঘুম আসছে। মিনিট দশেকের মধ্যেই চোখ ভারী হয়ে গেছে। সে বিছানায় শুয়ে পড়লো। বুকের মধ্যিখানে চিংকির নীল ওড়নাটা। জড়িয়ে রেখেছে শক্ত করে। এই তো সে ঘুমিয়ে গিয়েছে। একটু পরে দেখলো চাঁদের রুপালি আলোয় ঝলমল করছে পৃথিবী। চিংকি একটি নীল শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত দিন পর দেখছে তাকে। মসৃণ ত্বকে চাঁদের আলো খেলা করছে। তাকে এতোটা স্নিগ্ধ লাগছে যেন অন্যজগতের মানবী সে। চিংকি রিনঝিনে কণ্ঠে বললো,
“আবার আমাকে স্বপ্নে দেখছেন জাওয়াদ সাহেব। এখন কিন্তু আবার আপনার জীবনে খারাপ দিন শুরু হবে। তখন কিন্তু আমার দোষ নেই”

জাওয়াদ এগিয়ে গেলো। ছুঁলো তার গাল। আঙ্গুল বুলিয়ে গাঢ় স্বরে বললো,
“আমার কোনো আফসোস নেই। বরং আজ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। আমি আবার আমার রাজকন্যাকে দেখছি?”
“আমি বুঝি রাজকন্যা?”
“হ্যা, আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা”

চাঁদের আলো গাঢ় হলো। পৃথিবীটা একটা রুপার থালার মতো লাগছে। পাশাপাশি বসে আছে জাওয়াদ এবং চিংকি। তাদের কত কথা জমে আছে। কতটা দিন, কতটা ঘন্টা তারা কথা বলে না। কথা ঝুলির মাঝে হাসির গুঞ্জন উঠছে। চিংকি হাসছে। আর জাওয়াদ, বোকার মতো দেখছে তার রাজকন্যাকে।

।।সমাপ্ত।।

মুশফিকা রহমান মৈথি