আবছা আলো পর্ব-০১

0
2

আবছা_আলো[১ম পর্ব]
Md. Nazmul Huda

তোমার কাছে দুইটা অপশন দিলাম।তার মধ্যে একটা’ই বেছে নিতে হবে।
তুমি তোমার বউকে ডিভোর্স দিয়ে দিবা।নতুবা আমাদের ছেড়ে দিবে।যাকেই ছেড়ে দেওয়া না কেনো তাদের সাথে কোনো ভাবেই যোগাযোগ করতে পারবে না।

সবার সামনে বসিয়ে বাবা আমাকে কথাটি বললেন।আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পৌনে চারটা বাজে প্রায়।তুবারও স্কুল থেকে ফেরার সময় এসে গেছে।
আমি নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে রাখলাম।আমার বাসায় মেহমান ভর্তী বলতে গেলে।এদের মধ্যে কি জবাব দিবো বা বাবার কাছে কি প্রশ্ন করবো বুঝতেছি না।

এরই মাঝে আমার মা পাশ থেকে বলে উঠলো।

-মিহির আমরা তোমার ছোট বেলা থেকেই সমস্ত চাওয়া পাওয়া পুরন করেছি।আমাদের তোমার কাছেও চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে।আমরা চাই তুমি তুবাকে ডিভোর্স দিয়ে আমাদের সাথেই থাকো।সেই থেকে যেহেতু তোমাকে আমরা দেখে রেখছি, সামনের দিন গুলিও দেখে রাখতে পারবো।তুমি অসুস্ত তো কি হয়েছে তোমার ট্রিটমেন্ট করার যথেষ্ট সম্পত্তি আমাদের আছে।তোমরা তো দুইটা ভাই এই সব সম্পত্তি তো তোমাদেরই।তাই না?আমরা চাই তুমি তুবাকে ছেড়ে দিবা।আমাদের এই আবদার টুকু রাখো।আর যদি না পারো তাহলে কালকেই আমাদের বাসা ছেড়ে দিতে হবে।এবং চিরতরের জন্য।

-মা!আর বাবাকেও বলছি।প্লিজ আপনারা এখন চুপ করে থাকুন।তুবা একটু পরেই বাসায় ফিরবে।এই কথা গুলো যদি ও শুনে তাহলে তুবা অনেক কষ্ট পাবে।আর হ্যা আমাকে সাতটা দিন সময় দিন।এই সাত দিনে আমি যা করার করবো।হ্যা আমি মানছি তুবা ভুল করেছে।কিন্তু এই ভুলটা কিন্তু আমার জন্য হয়েছে।এটা কিন্তু মিথ্যে নয়।

-আমরা এসব কিছুই শুনতে চাচ্ছি না মিহির।যা বলার এখানের সবার সামনেই বলতে হবে।

-বাবা হঠাৎ করে কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।আপনাদের কাছে যতটা সহজ আমার কাছে ঠিক ততটা কঠিন।এখানে আমার জীবন মরনের প্রশ্ন বাবা।
প্লিজ আমাকে এই মূহুর্তে চাপ দিয়েন না।সাতদিন পরে আমি যা করার করে নিবো।

আমার কথায় বড় খালু সায় দিয়ে উঠে চলে গেলো।আস্তে আস্তে সবাই উঠে আমার কাছ থেকে চলে গেলো।

বাবা আর মায়ের কথা শুনে আমার শরীর ঘামিয়ে একাকার।ফুল পাওয়ারে এসি চালু করা তার মাঝ থেকেই অস্থিরতার কাজ করছে।কি করবো বুঝতেছিনা।আর আজকের এই কথা গুলো যদি কোনো ভাবেই তুবার কানে যায় তাহলে তুবা যে অনেক কষ্ট পাবে।

তুবাকে আমি ভালোবেসেই বিয়ে করেছি।প্রথম প্রথম বাবা মা রাজী না থাকলেও পরে ঠিকই মেনে নিয়েছিলো।কিন্তু আমাদের বিয়ের পরে তুবা আর ওর বাবা মায়ের কাছে যায় নি।অবশ্য তুবার বাবা মাও তুবাকে যেতে বলেছিলো কিন্তু আমাকে রেখে আর যায় নি।কারন তারা সর্ত দিয়েছিলো যে তুবাকে মেনে নিলেও আমাকে ওর বাবা মা মেনে নিতে পারবে না।আমার পরিবারে আমাদের বিয়েটা মেনে নেওয়ার একমাত্র কারন হলো আমি মোটামুটি ভালোই একটা জব করি।সো তারা আমাদের মানিয়ে না নিলেও আমি সক্ষম।

আমাদের বিয়ের চার মাস পরেই আমার বড় ধরনের বাইক এক্সিডেন্ট হয়।সবাই ভেবে ছিলো আমি মনে হয় আর বেচে থাকতে পারবো না।কিন্তু আল্লাহের রহমতে আমি বেচে রয়েছি।বেচে আছি ঠিকই কিন্তু তিলে তিলে মরে যাচ্ছি আমি।হয়তো বেচে যাওয়ার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ভালো হতো।তাহলে আর এতো কিছু শুনতে হতো না।আমি বেঁচে আছি কিন্তু পঙ্গুত্ব ভাবেই বেচে থাকতে হবে আমার।

হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয়।বাবা আমার ঠিক মত ট্রিটমেন্ট করতে থাকলেও দুইমাস পরে নানান ধরনের কথা শুনতে হচ্ছে। অহেতুক ভাবে তুবাকেও কথা শুনতে হচ্ছে।

একদিন রাতে হঠাৎ করে তুবা আমাকে বলে ও একটা জব করতে চায়।আম যদি বলি তাহলে তুবা জবটা করবে।আমি জিজ্ঞেস করলাম.

-কিসের জব?

-একটা প্রাইভেট স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা।আমার এক বান্ধুবী সেই স্কুলে জব করে।তুমি যদি বলো তাহলে আমি জবটা করবো।আর দেখো তুমি তো অসুস্থ,আমরা দুইটা মানুষ কিভাবে এই সংসারে ঘাড়ের উপরে বসে চলবো?

-যদি তুমি ভালো মনে করো তাহলে জবটা করতে পারো।তার আগে আমার বাবার কাছেও জিজ্ঞেস করতে পারো।

-হ্যা তার কাছেও জিজ্ঞেস করবো।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

সেই থেকে প্রায় রাতেই তুবা মুখ গুজে কান্না করতো।আমি কিছু জানতে চাইলেও তুবা চুপচাপ ভাবে থাকতো।আমি মাঝে মধ্যে ফ্যামিলির কথা শুনে কিছুটা আঁচ করতে পারতাম।তারপরে নতুন করে আর কিছুই জিজ্ঞেস করিনি আমি।সেই থেকে আমার বুঝতে আর সমস্যা হলো না তুবা কেনো হুটহাট জব করার সিদ্ধান্ত নিলো।

আমার এই পঙ্গুত্ব জীবন দেখেও তুবা আমাকে এখনো আগের মত ভালোবাসে।আমার দেখাশুনা ঠিকঠাক ভাবে করে।সময় মত ঔষধ খাইয়ে দেয় বা দুপুরের টাইমে ফোন দিয়ে ঔষধ খেতে বলে।

তুবা যখন ওর জবটার কথা বাবাকে জানায় তখন বাবা অসম্মতি দেয়।পরে আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলার পরে তুবা জবটা করার সুযোগ পায়।

সকাল নয়টার দিকে তুবা বাসা থেকে বেড়িয়ে যায় আর দুইটার দিকে ফিরে।কিন্তু তুবা এই কয়েকদিন ধরে বিকেল চারটার দিকে ফিরে।জবের পাশাপাশি তুবা টিউশানি করে।আমি নিষেধ করেছিলাম।তারপরেও টিউশানি করে তুবা।

আমি নিশ্চুপ ভাবে দেখতাম। এছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয় আমার।সারাটিদিন তুবা বাহির থেকে এসে বাসায় রান্নাবান্না সহ সকল ধরনের কাজ করেও বিভিন্ন কথা শুনে।আমি অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকি।

ইদানীং তুবার সাথে বাসার সবাই কেনো যেনো খুব বাজে বিহেইভ করে।তারপরেও তুবা আমাকে কিছু জানায়নি।

দিন পনেরো আগে তুবার কাছে জিজ্ঞেস করি…

-আচ্ছা তুবা তুমি জব সহ টিউশানিতে টোটাল কতটা মাইনে পাও?

-এই মোটমাট তেইশ হাজারের মত হবে।

-তাহলে চলো আমরা আলাদা ভাবে একটা বাসা নিয়ে থাকি।এভাবে আর কতদিন কথা শুনবে তুমি?

-আরে কি যে বলো না!সমস্যা নাই তো আমার।তুমি বাদ দাও তো।

-উহু,আমি প্রায়ই বিভিন্ন কথা শুনতেছি,কিন্তু তুমি আমাকে কিছুই বলো নি।

-আচ্ছা বাদ দাও তুমি রাতে ব্যথার পিলটা খেয়েছো?

-হ্যা।আমি সুস্থ যে কবে হবো?

-আল্লাহের উপরে আস্থা রাখো,আল্লাহের রহমতে সুস্থ হয়ে যাবা তুমি।

এসব ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জল জমাট বাধলো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ছয়টা বেজে গেছে প্রায়।কিন্তু তুবা এখনো বাসায় ফিরেনি।আর একটু পরেই আজান দিবে।বাসায় তো এখনো ফিরছে না।আমি ফোনটা হাতে নিয়ে তুবাকে ফোন দিলাম।ফোনটা রিসিভ করলো না। কয়েকবারই ফোন দিলাম।ওর ফোন পিক না করাতে চিন্তায় পরে গেলাম।বাসার গেইটের দিকে তাকিয়ে আছি ব্যালকনিতে বসে।

দুপুরে ঔষধ গুলো না খাওয়ার জন্য কোমড়ে আবার ব্যথা শুরু হয়েছে।আর তাছাড়া দুপুরেও খেতে বসে উঠে আসলাম।ভেবেছিলাম তুবা আসলেই খাবো।

আমার খালাতো বোন ওর বয়স বারো কি তেরো হবে।হাতে চায়ের কাপ নিয়ে এসে বললো…

-ভাইয়া চা বানিয়েছি আমি,খেয়ে দেখো!

-তুই খাইছিস? নাকি আমার কাছেই আগে নিয়ে আসলি।

-আমি তোমার এই কাপ দিয়েও এক চুমুক দিয়েছি।

আমি চায়ে চুমুক দিয়ে ফিক করে হেসে দিলাম।
চেয়ারটা সামনে এগিয়ে ওর গালে হাত দিয়ে বললাম,,

-খুব সুন্দর চা বানাতে পারিস তো।

-আচ্ছা ভাইয়া ভাবি কি আর বাসায় আসবে না?

-হ্যা আসবে তো।বাহিরে কি কাজ করছে যেনো?

-কিন্তু খালামনি তো ভাবিকে অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন।এবং নিষেধ করেও দিয়েছেন বাসায় ফিরতে।তাই তো না খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।

-কি বলিস এসব?তুবা তো আমাকে কিছু জানাবে? আর মা তো কিছুই বললো না।

-আমি তো আর কিছু জানি না ভাইয়া।

এইটুকু বলেই বোন আমার কাছ থেকে চলে গেলো।তুবাকে আরেকটিবার ফোন দিলাম কিন্তু ফোন পিক করার নামই নাই।

তবে কি বাবা পরশু যেটা আমাকে বলেছে সেটা সত্যি?…..

[চলবে…..]