সাঝের প্রণয়ডোর পর্ব-৩১+৩২+৩৩

0
10

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩১

গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজে আশিয়ানের ঘুমটা ভেঙে যায়। চোখটা মেলতেই কিছুটা ঝাপসা লাগায় সে পুনরায় চোখ বন্ধ করে নেয়। তারপর আস্তে আস্তে আবারও চোখ খুলে। নাকে ফিনাইলের তীব্র ঝা্ঝওয়ালা গন্ধ আর সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথায় বুঝতে পারে সে এখন কোথায়।

আবারও কান্নার আওয়াজ পেলে সে ঘাড়টা ডান দিকে ঘুরালে দেখতে পায় এলোমেলো চুলে মুখ ঢেকে থাকা এক রমণী তার হাতটা ধরে কাঁদছে। আশিয়ান তার হাতের মুঠোয় থাকা রমণীটির হাত আলতো করে চাপ দেয়, যাতে রমণীটির বুঝতে পারে তার প্রিয়তমের জ্ঞান ফিরেছে। আশিয়ানের পরিকল্পনা সফল হয় বটে।

হাতে চাপ পড়ায় হায়া মাথা তুলে তাকালে আশিয়ানকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। হায়া’র মলিন মুখে নিমিষেই প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠে। সেই সাথে ঠোঁট ভেঙে কান্নাও করে দেয় আশিয়ানের বুকে মাথা রেখে। কাল তাদের এত সুন্দর একটা মুহূর্তের পর আজ প্রিয়তমের এমন অবশ্য সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে মা। তার উপর লোকটার জন্মদিন ছিলো আজ।

আশিয়ান ডান হাতটা উঠিয়ে হায়া’র মাথার উপর রেখে আলতো করে বুলিয়ে দিতে থাকে। ক্ষীণ স্বরে বলে–

—হয়েছে তো। আর কান্না করে না, আমি ভালো আছি দেখো।

হায়া বুঝি থামে এত সহজে? সে নিজের মনের মতো কান্নাকাটি করে তারপর থামে। কিছুক্ষণ পর সে আশিয়ানের বুকের থেকে মাথা সরিয়ে তার ক্ষতবিক্ষত মুখশ্রীতে এলোপাতাড়ি চুমু দিতে থাকে। চুমু দেওয়া শেষ হলে সে আশিয়ানের কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে পুনরায় কেঁদে দেয়। ছোট থেকে সে ভীষণ নাজুক ভাবে পালিত হয়েছে। তার ভালোলাগা, খারাপ লাগা সবটাতেই বেশি প্রায়োরিটি দিয়েছে তার পরিবার। বিশেষ করে তার বাবা ও ভাইয়েরা। হায়া তার এত বছরের জীবনে এমন দুঃসময়ের মুখোমুখি খুব কমই হয়েছে। বলতে গেলে হয়ই নি। তাই আজ আশিয়ানের এমন অবস্থায় সে একটু বেশিই ভেঙে পড়েছে।

হায়া’র কান্না কিছুতেই থামছে না দেখে আশিয়ান তার মাইন্ড একটু ডাইভার্ট করতে চায়। সে হায়া’র গালটা আলতো করে স্পর্শ করে বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা স্লাইড করতে করতে বলে–

—বাহ বউ! তুমিতো ভীষণ ফাস্ট আর রোমান্টিক। সেদিন বেলকনিতে বসে বলেছিলাম তোমার ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ আমার ব্যথা উপশমের প্রধান ঔষধ সেই কথা তুমি ভালোই মনে রেখেছো। তা থামলে কেনো? আরো কয়েকটা দাও। স্পেশালি এই জায়গাটায়। (নিজের ঠোঁট উঁচু করে দেখিয়ে বলে আশিয়ান)

অন্য সময় হলে হায়া লজ্জায় নেতিয়ে পরত কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম হয়। সে আশিয়ানের কাছ থেকে একটু সরে আসে। তারপর হুট করেই আশিয়ানের চোয়ালে হাত রেখে দু’জনের অধর এক করে দেয়। আশিয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেভাবেই পড়ে থাকে। সে যে রেসপন্স করবে তারও খেয়াল থাকে না। হায়া নিজের মতো আদর দিয়ে নিজেদের ওষ্ঠকে মুক্ত করে। ভাঙা ভাঙা গলায় প্রশ্ন করে–

—আরো লাগবে?

হায়া নরমাল ভাবে প্রশ্নটা করলেও আশিয়ান তা নরমাল ভাবে গ্রহণ করতে পারে না। আসলেই কি প্রশ্নটা নরমাল ছিলো? সে তার চোখ জোড়া বড় বড় করে হায়া’র দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে–

—এক্সিডেন্ট হলো আমার আর মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে ওর।

আশিয়ানের ভাবনার মাঝেই হায়া আবারও বলে উঠলো–

—কি হলো? বলছেন না কেনো? এই একমিনিট, একমিনিট আপনার কোথাও খারাপ লাগছে না তো? কোথায় খারাপ লাগছে আমায় বলুন… দাড়ান আমি ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসছি…

হায়া’র মধ্যে আগের সেই অস্থির ভাবটা আবারও দেখা দেয়। সে আশিয়ানকে ছেড়ে দিয়ে ডাক্তারকে ডাক দেওয়ার জন্য ছুট লাগালে আশিয়ান পেছন থেকে তার হাত ধরে ফেলে। অসুস্থ, নিস্তেজ গলায় বলে–

—আমার কোথাও খারাপ লাগছে না জান। তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো। তখন থেকে শুধু কান্নাকাটি আর পাগলামিই করছো।

হায়া আশিয়ানের কথামতো তার বেডের পাশের টুলে বসে পড়ে। আশিয়ানের ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সেটা ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে কান্নামাখা গলায় বলে–

—আমি কি করে শান্ত হয়ে বসবো বলেন তো? আপনার কিছু হলে আমি কিভাবে বাঁচতাম আপনি একবার ভাবতে পেরেছেন? এত বছর পরে একটু সুখের দেখা পেলাম সেটাও আমার থেকে আজীবনের জন্য দূরে চলে যাচ্ছিল। আমি মরে যেতাম আশিয়ান, একদম মরে যেতাম আপনাকে ছেড়ে।

কথাগুলো বলতে বলতে হায়া’র চোখ বেয়ে অসংখ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আশিয়ান নিভু নিভু চোখে প্রেয়সীর কান্না দেখতে থাকে। হায়া’র কান্না তার বুকে ব্যথার সৃষ্টি করলেও আজকের এই কান্না তাকে সুখ সুখ অনুভূতি দিচ্ছে। কেনো? কারণ এই কান্না যে স্বয়ং আশিয়ানের জন্য।

হায়া’র এই ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেলা আশিয়ানের কোন কালেই পছন্দ ছিলো না, ন্যাকামি লাগত তার এসব। কিন্তু আজ তার ভীষণ ভালো লাগে এই কান্না। হায়া’র চোখের অশ্রু বলে দিচ্ছে সে ঠিক কতটা ভালোবাসে আশিয়ানকে।

হায়া আশিয়ানের হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে রেখে ফুঁপিয়ে চলছে অনবরত। আশিয়ান নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নেয়, তারপর হায়া’র চোখের অশ্রু মুছিয়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে হায়া’র দাঁত থেকে তার ওষ্ঠ ছাড়িয়ে নেয়। মেয়েটা কান্নার দমকে ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে যার কারণে তার গোলাপি ওষ্ঠজোড়া রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। আশিয়ান হায়া’র নিচের ঠোঁট স্লাইড করতে করতে বলে–

—হুঁশশ, আর কাঁদে না। আমি ঠিক আছি আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ মাঝে মধ্যে বিপদ দেন বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য। এই ধরো তোমার একটা পরীক্ষা হয়ে গেলো, তুমি আমায় কতটা ভালোবাসো বা আমার অসুস্থতায় কতটা পাগলামি করতে পারো তা আমায় দেখিয়ে দিলো উপরওয়ালা। তোমার এসব পাগলামি দেখে আমি তোমার প্রতি আরো দূর্বল হয়ে পড়লাম, মন চাইছে তোমায় আদরে আদরে ভরিয়ে দেই। একটা এক্সিডেন্ট তোমায় আমায় আরো কতটা কাছে নিয়ে আসলো এটা তুমি একবার ভেবে দেখেছো? যেই তোমায় আমি ধরে বেধেও চুমু দেওয়াতে পারতাম না, সেই তুমি আজ নিজ থেকে চুমু দিলে। কত পাগলামি দেখালে। এজন্যই বলে, যা হয় ভালোর জন্যই হয়।

চুমু দেওয়ার কথাটা হায়া’র পছন্দ হলো না। কাল রাতেও তো কতগুলো আদর দিলো নিজ থেকে আর আজ সকালে আশিয়ান সেগুলো ভুলে গেলো?

হায়া নাক টেনে মেকি রাগ দেখিয়ে বলে–

—মিথ্যা বলবেন না অসভ্য লোক। কাল রাতেও তো কতগুলো দিলাম। আজ সব ভুলে গেলেন?

—সেগুলো তো আমায় উস্কে দেওয়ার জন্য ছিলো যাতে আমি তোমায় আরো বেশি করে আদর দেই।

কথাটা বলে আশিয়ান হায়া’কে একটা চোখ টিপ দিয়ে অসভ্য মার্কা হাসি দেয়। এদিকে আশিয়ানের কথা শুনে হায়া ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায়। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আশিয়ানের হাতটা সাবধানে রেখে তড়িঘড়ি করে কেবিন থেকে বের হতে হতে বলে–

—আমি সবাইকে ডেকে নিয়ে আসছি, আপনি চুপচাপ শুয়ে থাকুন।

আশিয়ান গলা উঁচু করে বলে–

—এই তুমি কি লজ্জা পেলে? দেখি এদিকে ঘুরো তো, তোমার লজ্জা পাওয়া মুখটা একটু দেখি কাল তো আদর করেই কুল পেলাম না মুখ দেখবো কখন। এদিক আসো তো…

হায়া সবটাই শুনে কিন্তু তাও আশিয়ানের দিকে ফিরে তাকায় না। সে পা চালিয়ে কেবিনের বাহিরে এসে পড়ে। ভীষণ লজ্জা পেয়েছে বেচারি। আশিয়ান তার এমন মুখ লুকিয়ে চলে যাওয়া দেখে হাহা করে হেঁসে দেয়।

___________________

আশিয়ানের কেবিন ভর্তি হয়ে রয়েছে তার ভালোবাসার মানুষদের দ্বারা। তার দুই পাশে মাথার কাছে বসে আছে তার দুই মা। একজন তার জন্মদায়িনী আরেকজন তার ভালো মা ওরফে তার শ্বাশুড়ি। দুইজনই কিছুক্ষণ পরপর তার দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠছে। দুই বংশের প্রথম সন্তান হিসেবে সকলের কাছে ভীষণ আদরের আশিয়ান।

স্পর্শ-আবরারের একমাত্র সন্তান আশিয়ান। তার স্বভাবতই সে তার বাবা-মায়ের যক্ষের ধন। স্পর্শ কেবিনে ঢুকে ছেলের কাটাছেঁড়া মুখ দেখে সে কি কান্না। আবরার অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করেছে। হানিয়ারও তাই করেছিলো। এই ছেলেটাই তো তাকে প্রথম “মাম্মা” বলে ডেকে মাতৃত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো।

আশিয়ান অসুস্থ গলায় বলে–

—আম্মু, মাম্মা আমি ঠিক আছি তো। তোমরা প্লিজ আর কান্না করো না। তোমাদের কান্না আমার ভালো লাগে না একটুও।

হানিয়া আশিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–

—তুই যে আমাদের কাছে কি সেটা বুঝবি না আব্বু। আমরা কি স্বাদে কাঁদছি? আমাদের সন্তান অসুস্থ আর আমরা কাঁদবো না? এখন হয়ত আমাদের অনুভূতি তুই বা তোরা বুঝতে পারবি না, যেদিন বাবা-মা হবি সেদিন ঠিকই বুঝবি সন্তানের গায়ে পড়া একটা ছোট্ট আঁচড়ও বাবা-মায়ের বুকে কতটা লাগে।

সন্তানের কথায় আশিয়ান আঁড়চোখে হায়া’র দিকে তাকায়। দেখতে পায় মেয়েটাও তার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। আশিয়ান হতাশ, বড্ড হতাশ।

জাভিয়ান আশিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে বলে–

—আব্বু, একটু সাবধানে গাড়ি চালাবে না? দেখলে তোমার একটা অসাবধানতা তোমায় কতটা ভোগাচ্ছে। পরবর্তী থেকে গাড়ি চালানোর সময় অন্যকিছু ভাববে না, জাস্ট গাড়ি চালানোতে মন দিবে।

জাভিয়ানের কথা গুলো শুনে আশিয়ানের কিছুটা একটা মনে পড়ে। সে চোয়াল শক্ত করে বলে–

—বাবাই আমি গাড়ি সাবধানেই চালাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার এক্সিডেন্টটা প্রি-প্ল্যানড ছিলে বলে আমি ধারণা করছি।

আশিয়ানের কথায় যেনো কেবিনের মধ্যে বোম ফেলায়। সবাই অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রি-প্ল্যানড মানে? কেউ ইচ্ছে করে আশিয়ানের এক্সিডেন্ট করিয়েছে? কিন্তু কেনো? ছেলেটা পাঁচ বছর পর দেশে আসলো কিছু মাস আগেই এরই মধ্যে এমন কোন শত্রু বানিয়ে ফেললো যে কিনা তার জীবন পর্যন্ত নিতে চাইছে?

আবরার চিন্তিত হয়ে বলে–

—কি বলছো তুমি? প্রি-প্ল্যানড মানে? কেউ তোমায় ইচ্ছে করে কেন মারতে চাইবে? দেশে ফিরলে তুমি এই কয়মাস, এর মধ্যেই এমন কোন কাজ করলে যার কারণে তোমার জান নিয়ে টানাটানি পড়ছে?

—জানি না আব্বু। কিন্তু আমার ৮০% সিউর এটা কেউ ইচ্ছে করে করেছে। ইদানীং কয়েকদিন ধরে আমায় উপর ছোট বড় অ্যাটাক হচ্ছিল, আমি সেগুলো জাস্ট নরমাল কোইন্সিডেন্ট হিসেবে অদেখা করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আজ আমি অনেকটাই সিউর যে কেউ ইচ্ছে করে এসব অ্যাটাক করাচ্ছে আমার উপর।

সবাই হতবাক হয়ে আশিয়ানের কথাগুলো শুনে। আশিয়ান আবারও বলা শুরু করে–

—আজ আমার বারোটার দিকে ক্লাস থাকায় আমি সাড়ে এগারোটায় বাসা থেকে ভার্সিটির জন্য রওনা দেই। গাড়ি চালাতে চালাতে আমি খেয়াল করি একটা ট্রাক আমার গাড়িটাকে ফলো করছে। আমি বারবার নিজের গাড়ি সাইড করে তাকে সামনে যাওয়ার জায়গা করে দেই কিন্তু সে আমায় ওভারটেক তো করেই না বরং আমার গাড়িকে হিট করতে চায়। আমি তার মতলব আন্দাজ করতে পেরে এমন একটা রাস্তায় গাড়িটা ঢুকিয়ে দেই যেখানে সেই বিশালাকৃতির ট্রাকটি ঢুকতে পারবে না। তারপর ভার্সিটিতে চলে যাই। বিকেলের দিকে ক্লাস শেষ করে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে রওনা হই অফিসের উদ্দেশ্য। তখন আমি সকালের এই ঘটনা একদমই ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎই লুকিংগ্লাসে সেই ট্রাকটা আবার দেখতে পেয়ে আমার সকালের সেই কথাটা মনে পরে যায়। কিন্তু এবার কোন পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই ট্রাকটি আমার গাড়িকে জোরে হিট করে দেয়। প্রথমে আস্তে দিলেও সেকেন্ড বার বেশ জোরেই দেয়। আমার গাড়িটি কয়েকবার পল্টি খেয়ে একটা গাছের সাথে গিয়ে লাগে। গাড়ির তেলের ট্যাঙ্ক লিক হয়ে সেখান থেকে তেল পড়া শুরু করেছিলো, বুঝাই যাচ্ছিল যেকোন সময় গাড়িটা ব্লাস্ট করবে। আমি অনেক কষ্টে কোন মতে গাড়ি থেকে বের হয়ে কয়েক কদম হাটতেই সেটা ব্লাস্ট করে।মাথায় চোট পাওয়ার কারণে আমি মাটিতে পড়ে যাই। জ্ঞান হারানোর আগে আমি দেখতে পাই দু’জন মাস্ক পরা লোক একটা রড জাতীয় কিছু নিয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। হসপিটালে আনার আগে আমার একবার অবশ্য জ্ঞান ফিরে ছিলো, তখন আমি নিজেকে এম্বুলেন্সে আবিষ্কার করি। আমায় উদ্ধার করা এক লোককে জানায়, গাড়ি ব্লাস্ট হওয়ার বিকট শব্দ শুনে, এবং সেখানকার আশেপাশের লোকেরা আমায় রেসকিউ করে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে। আর তারাই হয়ত তোমাদের কাউকে ফোন দিয়ে আমার কথা বলেছে।

দীর্ঘ এক বক্তৃতা শেষে আশিয়ান থামে। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরে জোরেই নিঃশ্বাস নিতে থাকে। অসুস্থ হওয়ায় একসাথে এতগুলো কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। অন্যদিকে তার এসব কথা শুনে বাকি সবাই যেনো রিয়েক্ট করতেও ভুলে গিয়েছে। এমন জঘন্য ভাবে আশিয়ানকে মারা প্ল্যান করা হয়েছে বলে তারা ভাবতেও পারছে না। কিন্তু কে এমনটা করলো? কার সাথে আশিয়ানের এমন রক্তের শত্রুতা?

_________________________

—আমি এই বিয়ে কিছুতেই করতে পারবো না।

ভরা বিয়ের আসরে জাহানের এই ছোট্ট মন্তব্যটি পরমাণু বো**মার মতো কাজ করে। হাসি-খুশিতে জমে থাকা পরিবেশটা নিমিষেই শুনশান নীরবতা ছেয়ে যায়।

শব্দসংখ্যা~১৬৯২
~চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩২
#বিয়ে_স্পেশাল

আশিয়ানের অসুস্থতা ও জাহান-জায়িনের বিয়ের আয়োজন এসব নিয়ে মাঝের দিনগুলো কিভাবে যে হওয়ার মতো উড়ে চলে গেলো কেউ বোধহয় টেরই পেলো না। আজ জাহান-জায়িনের বিয়ে।

এরই মাঝে আশিয়ানের একটা অপারেশনও করা হয়। এক্সিডেন্টের কারণল তার মাথার পেছনের দিকে কিছু কাচ ফুটে থাকায় অপারেশনটা মূলত করা হয়। জাভিয়ান-হানিয়া চেয়েছিলো জাহান-জায়িনের বিয়েটা পেছাতে কিন্তু আশিয়ানই তাদের মানা করে এমনটা করতে। কারণ তার এক্সিডেন্টের আগেই বেশ কিছু আত্নীয়-স্বজন, চেনা পরিচিতদের দাওয়াত দেওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিলো। তারা না হয় ছেলে পক্ষ, বিয়ে পেছানোটা নিয়ে তেমন কোন কথা না শুনতে হলেও মেয়ে পক্ষকে কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে সেই বিষয়টা আশিয়ান সবাইকে বুঝায়।

প্রথমে সবাই তার কথা না মানলেও পরবর্তীতে হায়া বুঝালে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয় তাদের কথায়। প্রাণপ্রিয় ভাইদের বিয়েতে হায়া’র তেমন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। ভাইয়েরা যেমন প্রিয় তেমনি বরটা কেও তো সে পাগলের মতো ভালোবাসে। এই কয়েকদিন হায়া’কে আশিয়ানের পাশ থেকে টেনেও কেউ সরাতে পারেনি। আশিয়ান বলার পরও সে বাসায় যায়নি একেবারের জন্যও। তার এমন পাগলামি দেখে স্পর্শ-আবরার নিশ্চিত হয়ে যায় যে, হায়া থাকতে আশিয়ানের আর কাউকে তেমন প্রয়োজন পরবে না। তারা দু’জন হায়া’কে আশিয়ানের কাছে রেখে তালুকদার বাড়ি চলে যায় হানিয়া-জাভিয়ানকে বিয়ের আয়োজনে সাহায্য করতে।

_______________________

জায়িন সাদা শেরওয়ানি গায়ে জড়িয়ে মাথায় পাগড়ি পরে আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এমন সাজেই তো তার প্রেয়সী তাকে দেখতে চেয়েছিলো। সে সাজলো প্রেয়সীর মন মতো করে কিন্তু প্রেয়সীর জন্য না, অন্য কারো জন্য।

সমাজ বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না, কিন্তু সমাজের এই তথাকথিত কথাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে তালুকদার পুরুষদের কাছে, একবার না বারংবার। জায়িন যেদিন থেকে শুনেছে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেদিন থেকেই শুরু হয় তার নিরব অশ্রু ঝরানো। রাতের আধার, বদ্ধ রুম ও সেজদার জায়গা জানে সে কত করুণভাবে অশ্রু ঝরিয়েছে। কত আকুতি মিনতি করে নিজের রবের কাছে সাহায্য চেয়েছে নিজের ভালোবাসাকে আপন করে নেওয়ার জন্য। বারবার একটাই কথা বলে–

—এমন কিছু একটা করে দাও মালিক, যাতে আমি সারাজীবনের জন্য তোমার কাছে আরো একবার কৃতজ্ঞ হয়ে যাই। আমার মনের খবর তোমার থেকে ভালো কে জানে? তুমি আমার ধৈর্যগুলোর ফল দাও মালিক।

জায়িন অপেক্ষা আছে এমন এক চমকপ্রদ কিছু দেখার যা সে কখনো কল্পনাতেও আনে নি। এই অপেক্ষা সে “কবুল” বলে সেই অপরিচিত রমণীকে নিজের নামের সাথে জড়ানোর আগ পর্যন্ত করবে।

—জায়িন, হলো তোমার? লেট হয়ে যাচ্ছে তে আব্বু।

মায়ের ডাকে জায়িনের হুশ ফিরে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে টিস্যু নিয়ে মুখটা মুছে নেয়। তারপর মাথার পাগড়ি আরেকবার ঠিক করে নিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে আসে। মুখে জোড়াতালির হাসি ফুটিয়ে বলে–

—আমি রেডি আম্মু, চলো যাওয়া যাক।

হানিয়া ছেলেকে মন ভরে দেখতে থাকে। তার ছোট্ট জাহান-জায়িনের আজ বিয়ে। এই তো সেদিন না সে জানতে পারলো তার গর্ভে তার আর জাভিয়ানের ভালোবাসার অংশ ঠায় নিয়েছে, সেদিন কি কান্নাটাই না কাঁদল দু’জনে। তারপর আস্তে আস্তে বাবার পাগলামি ভরা ভালোবাসা আর মায়ের উজার করা স্নেহে বড় হতে শুরু করলো তারা। দিন কত তাড়াতাড়ি চলে যায় তাই না? হানিয়া যেটাকে “সেদিন” মনে করছে, সেই দিনটা ছিলো আজ থেকে আরো ২৬বছর আগে। মাঝে দিয়ে ২৬ টা বছর, দুই যুগেরও বেশি হয় কেমনে পার হয়ে গেলো তারা টেরই পেলো না।

হানিয়া ছেলের দুই গালে হাত রেখে তার মাথাটা নিজের মুখের কাছে এনে কপালে স্নেহের পরশ দেয়। তারপর কিছু একটা বিরবিরিয়ে পড়ে তার মাথা থেকে শুরু করে পুরো শরীরে ফু দেয়। চোখে অশ্রু নিয়ে বলে–

—আমার জাহান-জায়িনটা কবে এত বড় হয়ে গেলো টেরই পেলাম না। আজ তাদের বিয়ে, কয়েকদিন পর আমি দাদী হবো ভাবতেই মনটা ভরে উঠছে খুশিতে।

জায়িন মায়ের চোখে চোখ রাখাই ছিলো, সে সহজেই বুঝতে পারে আজ তাদের মা কতটা খুশি তাদের জন্য। মায়ের খুশি দেখে জায়িনের মনে প্রশান্তির হওয়া বয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই আদিবার কথা মনে করে বুকে চিনচিনিয়ে ব্যথা করতে শুরু করে।

এরই মাঝে জাভিয়ান তড়িঘড়ি করে এসে বলে–

—কি হলো নাকি তোমাদের? সেন্টারে পৌঁছাতেও তো টাইম লাগবে। চল তাড়াতাড়ি।

হানিয়া নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে–

—হ্যাঁ, এই তো রেডি জায়িন। তোমরা এখনি রওনা দিয়ে দাও।

জাভিয়ান হানিয়ার কথা শুনে বলে–

—আমরা রওনা হবো মানে? তুমি যাবে না আমাদের সাথে?

হানিয়া হালকা হেঁসে বলে–

—মায়েদের ছেলের বিয়ে দেখতে হয় না জানো না। এখন কথা না বাড়িয়ে রওনা দেন তো আপনারা।

জাভিয়ান হানিয়ার এমন কথা শুনে প্রচন্ড রেগে যায়। সে রাগান্বিত গলায় বলে–

—দেখো, মেজাজ খারাপ করবে না আজকের মতো একটা দিনে। আমি অবাক হয়ে গেলাম তোমার কথা শুনে। এসব কুসংস্কার তুমি কবে থেকে মানা শুরু করলে?

—যবে থেকে নিজে মা হয়েছি তবে থেকে। আমার কাছে সব কিছুর আগে আমার পরিবার ও সন্তানের সুরক্ষা।

জায়িন মায়ের আঁচল নিজের হাতে পেঁচিয়ে বলে–

—তুমি না গেলে আমিও যাবো না। এখন তুমি ডিসাইড করো তুমি যাবে কি না। আর আমি কিন্তু সিরিয়াস আম্মু আজ।

হানিয়া জায়িনের কাজ আর কথায় হেসে দেয়। সে হাসতে হাসতে বলে–

—একটু পর বউয়ের আঁচলে বাধা পরবে যে ছেলে সে নাকি এখন মায়ের আঁচল ধরে ঘুরছে।

জায়িন হানিয়ার কথা শুনে রেগে যায়। সে গম্ভীর গলায় বলে–

—আমার মা আমার কাছে সবার আগে। বউ থাকবে বউয়ের জায়গায় আর মা থাকবে মায়ের জায়গায়। আমার মা বউ ও মায়ের মধ্যে সমতা কীভাবে করতে হয় তা আমাদের শিখিয়েছে। তাই এসব কথা বলে লাভ নেই।

জাভিয়ান-হানিয়া জায়িনের কথা শুনে তৃপ্তির হাসি দেয়। হানিয়া তাদের বাপ-বেটাকে কত করে বুঝায় সে যাবে না কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া তালুকদাররা বুঝলে তো? এরই মাঝে স্পর্শ-আবরার আর বাকিরা এসে জাভিয়ান আর জায়িনের সাথে তাল মেলায়। হানিয়া না পেরে বলে–

—জাহান টা তো এখনো এলো না। আমি না হয় ওকে রেডি করিয়ে তারপর ওর সাথে আসবো নে।

স্পর্শ ফট করে বলে উঠে–

—তুমি যাও জায়িনদের সাথে। আমি আর আশিয়ানের বাবা জাহানকে নিয়ে আসবো নে। একটু আগে উনি জাহানকে ফোন দিয়েছিলো, প্রায়ই এসে পরেছে। আধা ঘন্টার মতো লাগবে নাকি। আমি ওকে ফ্রেশ করিয়ে, খাইয়ে, রেডি করিয়ে নিয়ে আসবো। তুমি টেনশন করো না তো।

স্পর্শ কথার পর হানিয়া না’ বলার আর কোন সুযোগ পায় না। অগ্যাত তাঁকে জাভিয়ান-জায়িনের সাথেই রওনা হওয়া লাগে।

____________________________

জাহান, স্পর্শ-আবরার একটু আগে এসে পৌঁছেছে কমিউনিটি সেন্টারে। জাহানের মন তো খুশিতে উড়ু উড়ু করছে। সে অপেক্ষায় আছে সেই সময়টার যখন সে তিন কবুল বলার মাধ্যমে তার প্রেয়সীকে নিজের রাণী করে নিবে।

জাহান আসার কিছুক্ষণ পরই বর-কনেদের স্টেজে আনা হয়। হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকা হলরুম গম্ভীর রূপ ধারণ করে। জাহান বড় হলেও জায়িনের বিয়েটা আগে পড়ানো হয়। জাভিয়ান-হানিয়া জায়িনের পাশে এসে দাড়ায়।

জায়িন এক প্রকার হতাশ হয়ে, সব আশা ছেড়ে দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করে সারাজীবন ভালোবাসা না পাওয়ার অনলে জ্বলার জন্য। জায়িন আর কনেকে মুখোমুখি বসানো হয়। তাদের মাঝে ফুল দিয়ে বানানো একটা পর্দা। কাজী আগে কনের কাছে যায় তার সম্মতি নেওয়ার জন্য।

জায়িন নিজের ভাবনায় এতটাই অন্যমনস্ক ছিলো যে এরই মাঝে কনের কবুল বলা হয়ে গিয়েছে। এবার কাজী আসে জায়িনের কাছে। কাজী সাহেব বলা শুরু করেন–

—জায়িন তালুকদার হায়াত, আপনি কি আদিয়াত মাহমুদের একমাত্র কন্যা আদিবা মাহমুদকে, ১০ লক্ষ দেনমোহর ধার্য করিয়া, ইসলামি শরিয়ত মানিয়া নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন? থাকলে বলুন, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।

“আদিবা মাহমুদ” নামটি শুনে জায়িন তড়াক করে তার মাথাটা উঠায়। সে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা কি তার ভ্রম নাকি বাস্তব? সে গাধার মতো হা করে কাজী সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কাজী সাহেব আরো কয়েকবার বলেন কিন্তু জায়িন নিজের অবাকতা কাটিয়ে উঠতে পারে না। সবাই অবাক জায়িনের এমন নিস্তব্ধতায়। কেউ কেউ কানাঘুঁষাও শুরু করে দিয়েছে। এমন অবস্থায় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ান জায়িনের কানের কাছে ঝুকে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–

—আব্বু কবুল বলে দাও। আদিবা মামুনি কিন্তু কেঁদে দিবে দিবে অবস্থা।

জায়িন বাবার কথা শুনে একবার তার মুখের দিকে তাকায়। তারপর হুট করেই হুড়মুড়িয়ে পরপর তিনবার কবুল বলে দেয়।

—কবুল, কবুল, কবুল।

তার এমন কাজে সে যেমন বেক্কল হয়ে যায় তেমনি উপস্থিত সকলেও। কাজী সাহেব এতবার বলার পরও যেই ছেলেটা কবুল বলছিলো সে হঠাৎই এক নিঃশ্বাসে কবুল বলে দেওয়ায় সবাই একটু চমকেই যায়। তারপর হঠাৎই সবাই হাহা করে হেঁসে দেয়।

হাসাহাসি থামিয়ে সদ্য বিয়ে করা বর-বউকে মুখোমুখি করা হয়। তাদের মাঝে থাকা ফুলের পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া হয়। জায়িন নিজের জায়গা ছেড়ে আদিবার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর আদিবার মুখের উপর থেকে ঘোমটা সরিয়ে দেয়। কনের সাজে থাকা প্রেয়সীকে দেখে জায়িন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের আশেপাশের সবকিছু ভুলে যায়। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে আদিবার দিকে। তার নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়–

—মাশা আল্লাহ, এ তো সাক্ষাত জান্নাতের হুর।

আদিবা ও তাদের আশেপাশে দাড়িয়ে থাকা কাজিন সমাজ জায়িনের কথাটা শুনে ফেলে। আদিবা এমন কথায় লজ্জা নিজের মুখটা আরো নামিয়ে নেয়। অন্যদিকে কাজিন সমাজ “ওহহহ হোোোো” বলে চেঁচিয়ে উঠে। জায়িনের তাদের চেঁচামেচিতে ঘোর ভাঙে। সে নিজেও কিছুটা লজ্জা পেয়ে গিয়েছে পরপর দু’বার বোকার মতো কাজ করায়।

জায়িন আদিবার পাশে বসে পড়ে। জাভিয়ান জায়িনের কাঁধে হাত রেখে বলে–

—কি বলেছিলাম না, তোমাদের কোন খারাপ চাওয়ার আগে আমরা যেনো নিঃশেষ হয়ে যাই। মিললো তো আমার কথার সাথে?

জায়িন বসা থেকে উঠে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখ দিয়ে সুখের অশ্রু গড়িয়ে পরে জাভিয়ানের কাঁধে। সে আলিঙ্গনরত অবস্থায় বলে–

—থ্যাঙ্ক ইউ বাবা। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। ইউ আর দ্যা বেস্ট ফাদার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড।

জাভিয়ান জায়িনের কাঁধ চাপড়ে তাকে স্বান্তনা দেয়। তারপর তাকে নিজের জায়গায় বসিয়ে হানিয়া-জাভিয়ান জাহানের কাছে এসে দাঁড়ায়। কাজী সাহেবও কনের কাছে গিয়ে তার সম্মতি নিয়ে আসেন। তারপর জাহানের কাছে এসে পূর্বের মতো বলতে শুরু করেন–

—জাহান তালুকদার হামজা, আপনি কি রাহাত চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে রাহনুমা চৌধুরী রাহাকে ১০ লক্ষ টাকা ধার্য করিয়া, ইসলামি শরিয়ত মানিয়া নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলুন, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।

জাহান কনের নামের জায়গায় রাহার নাম শুনে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকে কাজী সাহেবের দিকে। মানে কি? মেহরিমা না তার বউ? তাহলে তার জায়গায় রাহা কেনো?

কাজী সাহেব ও সকলে ভাবে জাহানও হয়ত জায়িনের মতো চমকে গিয়েছে, কিন্তু বিষয়টা তো তা না। জাহান অবাক চোখে তার বাবা-মায়ের দিকে তাকায়। দেখতে পায় তারা হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কাজী সাহেব আবারও কথাগুলো জাহানকে বললে জাহান নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে–

—আমি এই বিয়ে করতে পারবো না।

সকলের হাসি-তামাশা নিমিষেই শান্ত হয়ে যায়। এবার বাকিরা জাহানের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। জাভিয়ান হানিয়া জাহানের কাছে এসে বলে–

—কি বলছো তুমি এসব জাহান? কেনো বিয়ে করতে পারবে না রাহা’কে তুমি?

—কারণ আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া আর কাউকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মানতে পারবো না বাবা।

—হ্যা তো, তার সাথেই তে হচ্ছে তোমার বিয়ে। তোমার ভালোবাসার মানুষ, রাহা মামুনির সাথেই তে আমরা তোমার বিয়ে ঠিক করেছি।

জাহান হানিয়ার কথা শুনে যেমন অবাক হয় তেমন উত্তেজিতও হয়ে যায়। সে চিৎকার করে বলে–

—আমার ভালোবাসার মানুষ রাহা কোন কালেই ছিলো না আম্মু। আমি হায়া’র বান্ধবী মেহরিমাকে ভালোবাসি দুই বছর যাবত।

জাভিয়ান-হানিয়া হতভম্ব হয়ে জাহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরই মাঝে স্টেজে হায়া উঠে আসে। সেও প্রচন্ড অবাক রাহা’কে কনের জায়গায় দেখে। তার উপর সে যখন তার মায়ের মুখে শুনলো জাহানের ভালোবাসার রাহা নাকি তার ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষ তখন সে আরো অবাক হয়ে যায়।

হায়া তার বাবা-মাকে বলে–

—পাপা, আম্মু তোমরা এসব কি বলছো? রাহা কেন বড় দা’ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষ হবে? বড় দা’ভাই আর মেহু তো রিলেশনে আছে দেড়/দুই বছর যাবত।

জায়িন আর আদিবাও একই কথা বলে। জাভিয়ান তাদের কথা শুনে অবাক হয়ে বলে–

—তাহলে রাহাত যে বললো, রাহা মামুনি আর জাহান নাকি একে অপরকে ভালোবাসে। তাই তো আমরা এই বিয়েতে মত দিলাম। রাহাত কি তাহলে মিথ্যে বললো?

কথাটা বলেই জাভিয়ানসহ সকলে রাহাতের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। এদিকে রাহাত ভাবতেও পারেনি, তার তরি তীরে এসে এমন বাজে ভাবে ডুবে যাবে। জাভিয়ান রাহাতের সামনে এসে বলে–

—কি হলো রাহাত, তুমি তো আমায় বললে তোমার মেয়ে আর আমার ছেলে নাকি রিলেশন আছে। কিন্তু আজ তো দেখছি ভিন্ন কিছু। তুমি আমাকে মিথ্যে বললে কেনো?

রাহাতের মুখে কোন কথা নেই। সে আমতাআমতা করতে থাকে। জাভিয়ান এবার প্রচন্ড রেগে যায়। কথা যখন তার পরিবারের সম্মান আর তার ভালোবাসার মানুষগুলোর সুখের বিষয়ে হয়, জাভিয়ান তখন একচুল পরিমাণ কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নয়। সে রাগী গলায় চেঁচিয়ে বলে–

—কি হলো বলছো না কেনো? কেন আমাদের মিথ্যে বললে? কেন এমন ছলাকলা করে আমার ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছিলে? চুপ করে আছো কেন? বলো।

সেন্টারে উপস্থিত সকলে জাভিয়ানের এমন রাগ দেখে অবাক হয়ে যায়। একসময় এমন রাগী জাভিয়ানকে দেখে সকলের অভ্যাস থাকলেও সময়ের সাথে সাথে তারা ভুলে গিয়েছিলো জাভিয়ান কতটা রাগী ও ভয়ংকর। সন্তান হওয়ার পর জাভিয়ান ভুলেও কখনো তাদের সামনে রাগারাগি করত না। তাই তার সন্তানেরাও বাবার এমন রাগী সত্ত্বার সাথে পরিচিত নয়। জাহান, জায়িন, হায়া তিনজনেই বাবার এমন রাগ দেখে অবাক ও ভয় পেয়ে যায়।

এরই মাঝে সকলকে শুনতে পায় এক নারী কন্ঠস্বর। সে বলে–

—আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে মি.তালুকদার।

শব্দসংখ্যা~১৯৫০
~চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৩
#রহস্যের_সমাধান

অন্ধকার ঘরে বসে আছে এক যুবক। হাতে তার এপ রমণীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। যুবকটি একধ্যানে সেই ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছে আর ক্ষণে ক্ষণে তার চোখ দিয়ে টপটপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মধ্যে আবার বিরবির করে কিসব বলছেও যুবকটি। সে ছবিটায় একবার চুমু খাচ্ছে তো আরেকবার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আবার বিরবির করে কি বলছে। এক কথায় নানান ধরণের পাগলামি করছে যুবকটি।

তার এই পাগলামিরই মধ্যেই রুমে প্রবেশ করে দুইজন মাঝবয়সী নারী পুরুষ। নারীটির হাতে খাবারের ট্রে। পুরুষটি রুমে ঢুকেই হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে লাইট জ্বালায়। নিমিষেই আলোকিত হয়ে উঠে তিমিরে ডুবে থাকা কক্ষটি। রুমটি আলোকিত হতেই নারীটি বলে উঠে–

—জাহান, আব্বু কই তুমি?

হ্যাঁ, অন্ধকার রুমে পাগলামি করা ছেলেটা আর কেউ না জাহান তালুকদার। জাভিয়ান তালুকদার আর হানিয়া মির্জার বড় ছেলে। যে কিনা তার প্রেয়সীকে হারিয়ে অনেকটা ভেঙে পড়েছে। হারিয়ে ফেলেছে কেন বললাম? আচ্ছা এই প্রশ্নের উত্তরও একটু পর দিচ্ছি।

জাভিয়ান আর হানিয়া রুমের এদিক সেদিক খুঁজে। অবশেষে তারা জাহানকে পায় সোফার পেছনে। তারা চপল পায়ে সেদিকে হাঁটা দেয়। হানিয়া খাবারের ট্রে টা টি-টেবিলের উপর রেখে ছেলের কাছে এগিয়ে যায়।

জাহান হাঁটুতে মুখ গুঁজে কিসব যেনো বলছে। তারা দু’জন শুনতে পায় না তা। হানিয়া ছেলের এমন অবস্থা দেখে ভেঙে পড়তে চায়। কোন মা কি ছেলের এমন দূরাবস্থা দেখতে পারবে? পারবে না। হানিয়াও পারছে না ছেলের এমন করুণ অবস্থা। কিন্তু সে ভেঙে পড়ে না। সে ভেঙে পড়লে তার ছেলে যে আরো ভেঙে পড়বে সেই সাথে তার সাজানো গোছানো সংসার টাও।

জাভিয়ান হানিয়া ছেলের পাশে বসে পড়ে। হানিয়া জাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–

—আব্বু, কি করছো এখানে?

মায়ের আদরমাখা ডাকে জাহান সাড়া না দিয়ে পারে না। সে হাঁটু থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। উষ্কখুষ্ক চুল, বড়বড় দাঁড়ি, লাল লাল ফোলা চোখের জাহানকে দেখে হানিয়ার বুকটা ধক করে উঠে। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা ছেলের এমন করুণ অবস্থা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। জাহানের এমন মুখশ্রী দেখে হানিয়ার চোখে অশ্রুরা এসে ভীড় জমায়। হানিয়া অনেক কষ্টে অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে।

সে আঁচল উঠিয়ে জাহানের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে–

—নিজের কি অবস্থা করেছো দেখেছো একবার? এটা কি আমার সেই জাহান যে কিনা সকল প্রতিকূল মুহূর্তেও ধৈর্য ধারণে করে বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করতো? সেই জাহান আর এই জাহানের মধ্যে তো আমি আকাশ পাতাল দেখতে পারছি। তুমি কি বুঝতে পারছো তোমার এই অবস্থা দেখে আমরা দু’জন কতটা কষ্ট পাচ্ছি? এমন করো না আব্বু, সন্তানের এমন অবস্থা দেখা কতটা কষ্টের তুমি তা হয়ত জানো না।

কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে অনেক চেষ্টা করেও সেগুলো আর আটকাতে পারে না। এদিকে মায়ের কথা আর তার চোখে পানি দেখে জাহানও নিজেকে আর আটকাতে পারে না। সে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—আমি কি করবে আম্মু বলো, নিজেকে আমি কিছুতেই সামলাতে পারছি না। ও কোথায় গেলো? কেনো গেলো? আমি তো ওকে কম ভালোবাসি নি, তাও ও কেন আরেকজনের কথায় প্রভাবিত হয়ে আমায় ছেড়ে চলে গেলো? ও তো জানত আমি ওকে আমার সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, সেই ভালোবাসার এই দাম দিলো? আম্মু… আম্মু ওকে আমার কাছে এনে দাও। আমার দাম বন্ধ হয়ে আসছে ওকে ছাড়া। ও কেনো আমায় আমার মতো করে ভালোবাসলো না? কেনো?

সন্তানের এমন মন ভাঙা আর্তনাদে জাভিয়ান-হানিয়ার হৃদয় কেঁপে উঠে। জাভিয়ানের মনে পরে যায় আজ থেকে ২৭বছর আগে তার করা পাগলামিগুলোর কথা। সেও তো তার প্রেয়সীকে হারিয়ে এমনই ভাবে তার বাবার বুকে পড়ে আবদার করেছিলো, তার বাবা যাতে তার প্রেয়সীকে খুঁজে এনে দেয়। আজ ২৭বছর পর তার ছেলেও একই ভাবে আবদার করছে। জাভিয়ান কোনদিন নিজের স্বপ্নেও ভাবে নি তার কোন সন্তান তারই মতো ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে এমন উন্মাদনা গ্রহণ করবে।

জাভিয়ান বড়বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। মনের গহীন থেকে কেউ একজন বলে উঠছে–

—তোর সন্তানের এই বেহাল অবস্থার জন্য তুই একমাত্র দায়ী জাভিয়ান। কেমন পিতা তুই? সন্তানের মনের খবর তো রাখিসই না উল্টো তার কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াস। ধিক্কার তোকে জাভিয়ান, ধিক্কার। তুই সারাজীবন অন্যের কান্নার কারণই হয়ে আসলি।

এসব উল্টা পাল্টা কথা ভেবে জাভিয়ানও ভেঙে পড়তে চায়। তার চোখের পানিও আজ বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। নিজেকে আজ ব্যর্থ মনে হচ্ছে। সে যদি আরেকটু খোঁজ খবর নিতো, ছেলের সাথে খোলাখুলি এই বিষয়ে কথা বলত তাহলে হয়ত তার সন্তান আজ এত কষ্ট পেতো না।

আপাত দৃষ্টিতে এই কথাগুলো সঠিক মনে হলেও, কথাগুলো কি আসলেই শতভাগ সঠিক? আমি বলবো না। কারণ, রাহাতদের সাথে জাভিয়ানদের আজকালের সম্পর্ক না কিন্তু। বলতে গেলে তিন যুগেরও অধিক সময় ধরে তারা বিজনেস ও পারিবারিক ভাবে পরিচিতি। একটা সময় রাহাত কিন্তু জাভিয়ান-হানিয়া অনেক সাহায্যই করেছিলো (যারা #প্রতিশোধের_অঙ্গীকার গল্পটা পড়েছেন তারা জানেন) অতীতে সেই সাহায্য আরও বিভিন্ন কারণে তারা রাহাতকে বিনা প্রশ্নে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করত। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে রাহাত তাদের সাথে এমন জঘন্য একটা কাজ করে যা তারা কখনো ভাবতেও পারেনি।

এসব কথা হানিয়া জাভিয়ানকে বিগত কয়েকদিনে হাজার বার বলেছে যখন কিনা জাভিয়ান জাহানের এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করে এসেছে, কিন্তু জাভিয়ান তো জাভিয়ানই। সে নিজেকে অযথা দোষারোপ করে ভেতরে ভেতরে গুমরে গুমরে মরছে।

জাভিয়ান জাহানের চুল গুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—আমি সরি বাবা, আমার জন্য আজ তোমায় এতটা কষ্ট পেতে হচ্ছে। বাবাকে ক্ষমা করে দিও সোনা।

বাবার কথা শুনে জাহান মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে আস্তে আস্তে। নিজের চোখের পানি মুছে দিয়ে জাভিয়ানের চোখের পানিও মুছে দেয়। ভাঙা গলায় বলে–

—তুমি নিজেকে শুধু শুধু দোষ দিচ্ছো কেনো বাবা? তুমি তো রাহাত আঙ্কেলকে বিশ্বাস করেই আমায় সারপ্রাইজ দিতে গিয়েছিলে, কিন্তু রাহাত আঙ্কেল তোমায় ধোকা দিল। প্লিজ বাবা নিজেকে অযথা ব্লেইম করো না। আসলে আমি ভালো তো বাসলাম ঠিকই কিন্তু সেই ভালোবাসায় কোন জোর ছিলো না হয়ত, যার কারণে একটা দমকা হওয়া সব উড়িয়ে নিয়ে গেলো।

কথাগুলো বলতে বলতে জাহানের চোখ দিয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। জাভিয়ান ছেলের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে–

—উহুম, তোমার ভালোবাসায় অবশ্যই জোর আছে। তালুকদাররা আর যাইহোক কাউকে ভালোবাসলে নিজের সবটা দিয়েই বাসে। তোমার চোখের সামনেই সেই উদাহরণ আছে। আর এটা একটা পরীক্ষা মাত্র বাবা, তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা। উপরওয়ালা দেখতে চাইছেন তুমি কি আসলেই তার উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরতে পারো কিনা। কিন্তু তুমি করছো টা কি? অধৈর্য হয়ে নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছ। এমনটা করলে কি তুমি পরীক্ষায় পাশ করবে? না, বরং বাজে ভাবে ফেইল করবে। আমার জাহান আজ পর্যন্ত কোন পরীক্ষায় ফেইল করেনি, সে কিনা আজ জীবনের পরীক্ষায় এমন বাজে ভাবে ফেইল করবে? এটাও কি আমায় দেখতে হবে তুমি বলছো?

জাহান ছলঢ়ল চোখে বাচ্চাদের মতে করে বলে–

—আমি কি করবো তাহলে বাবা? আমি মানতে পারছি না মেহরিমা অন্য একজনের প্ররোচনায় আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে? কোথায় গিয়েছে সেটাও তো জানি না। ওর যে কেউ নেই বাবা। একা একটা মেয়ে কোথায় থাকছে? কিভাবে থাকছে? কি করছে? আমি কিচ্ছু জানি না। ও তো জানত আমি ওর ভালোবাসায় কতটা দূর্বল হয়ে পড়েছি, তাও এমনটা করলো আমায় সাথে।

—তোমার ভালোবাসাকে নিজের দূর্বলতা না বানিয়ে নিজের শক্তিতে রূপান্তর করো। এভাবে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে না নিয়ে মেহরিমা মামনিকে খোঁজার চেষ্টা করো। তোমার এসব প্রশ্ন আমাদের না করে তাঁকে খুঁজে বের করে তার থেকেই জানতে চাও। তুমি তো বুঝতেই পারছ তাকে রাহাত বাজে ভাবে ব্রেনওয়াশ করেছে, ছোট্ট মানুষ বুঝতে পারেনি কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক। তুমিই তো বললে ওর কেউ নেই, বাচ্চা মেয়েটা হয়ত কারো সাথে এই বিষয়ে পরামর্শও নিতে পারেনি। হটকারিতায় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তোমার উচিত তাকে খুঁজে বের করে তার ভুল গুলো সংশোধন করে দেওয়া।

জাহান মন দিয়ে বাবার কথাগুলো শুনে। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখে আসলেই তো, মেহরিমা বরাবরই ঠাণ্ডা ও নাজুক স্বভাবের একটা মেয়ে। তাকে যে যা বুঝায় সে মুখ বুঝে তাই বিশ্বাস করে ফেলে আর খুব সহজেই যে কাউকে বিশ্বাস করে ফেলে। মেয়েটা হাতে পায়ে বড় হলেও বলতে গেলে চলে অন্যের কথায়। তার এই স্বভাবটারই ফায়দা নিয়েছে রাহাত।

জাভিয়ান জাহানকে সোফার পেছন থেকে নিয়ে এসে বেডে বসিয়ে দেয়। হানিয়া ওয়াশরুমে গিয়ে মগে করে পানি এনে তাতে টাওয়াল ভিজিয়ে জাহানের মুখ হাত ভালো করে মুছে দেয় ভেজা টাওয়াল দিয়ে। তারপর খাবারে প্লেট নিয়ে তার সামনে বসে খাইয়ে দিতে থাকে। জাহান বিনা বাক্যে মায়ের হাতেই খেয়ে নেয়। রাত অনেক হওয়ায় হানিয়া জাভিয়ান জাহানকে শুইয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলে চলে যায়। শরীর ও মস্তিষ্ক ক্লান্ত থাকায় কয়েকদিনের নির্ঘুম জাহান আজ না পারতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

______________________________

রাত এখন প্রায়ই দুটো। আবছা আলোয় ঢেকে থাকা রুম টিতে শুয়ে আছে এক জোড়া নবদম্পতি। নবদম্পতি হলেও তারা অন্যান্য সব নবদম্পতিদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করে রয়েছে। তাদের দু’জনের মধ্যে একজনের অবস্থান বেডে তে আরেকজনের অবস্থান কাউচে। কেনো? কারণ বিয়েটা যে নিতান্তই এক্সিডেন্টলি হয়েছে।

আফিফ কাউচ থেকে উঠে বসে। চোখ উঠিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা তার নববধূকে দেখে। তিনজন আনায়সে ঘুমাতে পারবে এমন একটা বেডেটায় মেয়েটা কোনায় এসে শুয়েছে। তাকে দেখে যেকেউ বলে দিবে, সে যেকোন সময় পড়ে গিয়ে যবরদস্ত একটা ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। আফিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে এগিয়ে যায়।

আলতো হাতে সে তার নববধূকে বেডের মাঝামাঝি শুইয়ে দেয়। যখন সে তাকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসতে নিবে তখনই রমণীটি আফিফের এক হাত শক্ত করে আকড়ে ধরে বিরবিরিয়ে কিছু বলতে শুরু করে। আফিফ তার কানটা তার বধূর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সে কি বলছে তার শোনার জন্য, মেয়েটি বলছে–

—আপনি আমায় কেন ভালোবাসলেন না জাহান? আমি তো আপনাকে ছাড়া আর কারো কথা ভাবতেও পারছি না। কি আছে ঐ মেহরিমার মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই?

এরপর আরো কিছুক্ষণ বিরবিরিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় রমণীটি চুপ হয়ে যায়। আফিফকে আঁকড়ে ধরা হাত টাও ঢিলে হয়ে যায়। আফিফ খুব সাবধানে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাহার গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে চলে যায় বেলকনিতে। হ্যাঁ, রাহাই আফিফের বউ, যার সাথে বিয়ের দিন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আফিফের বিয়ে হয়।

আফিফ বেলকনিতে রাখা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে নেয়। গভীর রাতের হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে তার ভেতরের সব অস্থিরতা যেনো দূর হয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই গত কয়েকদিনের মতো আজও তার চোখের সামনে ভেসে উঠে তার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দিনটির ঘটনা।

_________________________

~ফ্ল্যাসব্যাক~

সকলে নারী কণ্ঠটির দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পায় সে আর কেউ না মুনতাহা চৌধুরী, ওয়াইফ অফ রাহাত চৌধুরী। মুনতাহা হেঁটে স্টেজে উঠে আসে। জাভিয়ানদের সামনে দাড়িয়ে কিছুটা চাপা গলায় বলে–

—আমি আপনাদের সবটা খুলে বলছি, কিন্তু সেটা একান্ত ব্যক্তিগত ভাবে। এখানে প্রেস-মিডিয়ার অনেক লোক আছে, আমার হাসবেন্ড ও আপনার বিজনেস পার্টনাররা আছে তাদের সাথে আমি এসব বলতে চাইছি না। আমার অনুরোধ, আপনারা হয় একটু আলাদা স্পেসে আসুন, না হয় উনাদের খাবার খেতে পাঠিয়ে দিন। এসব কথা বাহিরের লোকের সামনে বললে আমার হাসবেন্ডের পাশাপাশি আপনাদের সম্মানও নষ্ট হবে।

জাভিয়ান রেগে বলে–

—যেখানে আমার পরিবারের সুখের বিষয়ে কথা হচ্ছে সেখানে আমি জাভিয়ান তালুকদার কারো তোয়াক্কা করি না।

মুনতাহা এবার খানিকটা অনুরোধ করেই বলে–

—প্লিজ মি.তালুকদার, আমি জানি আমার স্বামী অপরাধ করেছে এবং এটা হয়ত ক্ষমা যোগ্য না কিন্তু আমি স্ত্রী হয়ে তাকে এমন ভরা সমাজে অপমান করতে পারবো না। আর আপনারাও তো সত্যিটা জানতে চান, তাই আমার অনুরোধ আপনারা হলটা কিছু সময়ের জন্য খালি করানোর ব্যবস্থা করেন।

মুনতানার অনুনয় করে বলা কথাটা জাভিয়ান ফেলতে পারে না। সে এনাউন্সমেন্ট করে কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় বিয়েটা হচ্ছে, একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে তাদের মধ্যে সেটা তারা ব্যক্তিগত ভাবে সমাধান করতে চায়। গেস্টরা যেনো ততক্ষণে খাবারের পব সেড়ে ফেলে।

আবরার আর আয়মান দায়িত্ব নেয় গেস্টদের খাবারের। তারা দু’জন মিলে গেস্টদের নিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে হলটা খালি হয়ে যায়। এবার জাভিয়ান বলে–

—বলুন মিসেস চৌধুরী, আপনার হাসবেন্ড কেন আমাদের এমন ধোঁকা দিলো।

— পিতৃ স্নেহ অন্ধ হয়ে এমনটা করেছে।

—মানে? খোলাসা করে বলুন একটু।

—আমার হাসবেন্ড আমাদের মেয়েকে নিজের জীবনের চাইতো বেশি ভালোবাসে। ছোট থেকে তার সব ছোট-বড়, ভালো-খারাপ আবদার মেনে এসেছে। সে এসব নিজের ভালোবাসা জাহির করার একটা মাধ্যমে মনে করলেও সে হয়ত ভাবতে পারেনি এতে মেয়েটা কতটা বিগড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে হঠাৎই রাহা নাওয়াখাওয়া অফ করে নিজেকে ঘরবন্দী করে নেয়, একদিন তো এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো আমরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি ও অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। এরপর ওদের বাবা-মেয়ের মধ্যে কি কথা হয় জানি না, গত সপ্তাহে আমায় রাহার বাবা রাহার বিয়ের কথা জানায়। সে জানায় জাহানকে নাকি রাহা পছন্দ করে তাই আপনাদের বন্ধুত্বটা আরো পাকাপোক্ত করতে সে তাদের দু’জনকে বিয়ে দিতে চায়। আমি তো জানতাম, ছেলে হিসেবে জাহানের চেয়ে ভালো ছেলে আমরা হয়ত দুটো পাবো না। তার কথা মেনে নিয়ে আমি বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করি। কিন্তু তার এই কাজের পেছনে যে কতটা ঘৃণ্য এক সত্য লুকিয়ে আছে তা আমি জানতে পারি কাল, যখন কিনা সবটা আমার হাতের বাহিরে চলে গিয়েছিলো।

সবাই অবাক হয়ে মুনতাহার কথা শুনতে থাকে। এরই মাঝে আয়মান আর আবরার এসে পড়ে গেস্টদের ওখান থেকে। তারা সবাই খাচ্ছে। মুনতাহা আবার বলা শুরু করে–

—কাল রাতে আমি রাহার কাছে ঘুমাতে গেলে দরজার সামনেই শুনতে পাই, ও ওর বান্ধবীকে বলেছে, রাহাত কিভাবে মেহরিমাকে জাহানের থেকে দূরে করেছে। মেহরিমা নাকি এতিম মেয়ে, এই কথাটাকে কেন্দ্র করে সে মেহরিমাকে বুঝিয়েছে এমন পিতৃ পরিচয়হীন মেয়ের সাথে জাহানের মতো একজন বিজনেস ম্যানের ছেলেকে মানায় না। রাহাত মেহরিমাকে তাদের আর্থিক অবস্থাটাও খুবই শুষ্ক ভাবে বুঝিয়ে দেয়। মেয়েটা নাকি একটু বোকাসোকা টাইপের, কয়েকদিন ক্রমাগত এসব বুঝিয়ে রাহাত তার মাথাটা বেশ ভালোভাবেই ওয়াশ করে ফেলে। যার কারণে আজ মেহরিমার জায়গায় রাহা বসে আছে। আর হ্যাঁ, রাহা তার বাবাকে এটাও জানায় যে, জাহান আর মেহরিমার সম্পর্কের কথা নাকি আপনারা জানেন না। সে এটারই ফয়দা নেয়। সে আপনার কাছে এসে হয়ত বলেছে, রাহা আর জাহান রিলেশনে আছে কি জাহান লজ্জায় এই কথাটা বলতে পারছে না আপনাদের, তাই তো মি.তালুকদার?

প্রশ্নটি জাভিয়ানকে করে মুনতাহা। জাভিয়ান মাথা নাড়িয়ে তার কথায় সম্মতি দেয়। মুনতাহার কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। ভালোবাসা ভালো তাই বলে অন্ধ ভালোবাসা ভালো নয়। রাহাত যেটা করে সেটা মূলত অপরাধ বলা চলে।

সব শুনে জাহান তার বাবার কাছে এসে বলে–

—বাবা, আমি এই বিয়ে করতে পারবো না। মেহরিমা না হলে কেউ আসবে না এই জাহান তালুকদারের জীবনে। তুমিই বলো বাবা, মনে একজনকে রেখে আরেকজনের সাথে সংসার করা যায়? হ্যাঁ, করা যায় হয়ত কিন্তু সুখী হওয়া যায়?

জাভিয়ান জাহানের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলে–

—চিন্তা করো না বাবা। তোমায় এই বিয়েটা করতে হবে না। তুমি যাকে ভালোবাসো, তার সাথেই তোমার বিয়ে হবে।

জাহান জাভিয়ানের কথা শুনে তাঁকে খুশিতে জড়িয়ে ধরে। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে–

—থ্যাঙ্ক ইউ বাবা, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ আমায় বুঝার জন্য। তোমরা থাকো আমি এখনি যেয়ে মেহুকে নিয়ে আসছি।

জাহান জাভিয়ানকে ছেড়ে ছুট লাগায় মেহরিমাকে আনতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এরই মাঝে তার পথ আটকে দাঁড়ায় রাহাত। এতসবের পরেও রাহাত জাহানের কাছে এসে বলে–

—বাবা, আমার মেয়েটা তোমায় ভীষণ ভালোবাসে। প্লিজ ওকে ফিরিয়ে দিও না। ও তোমার মন মতো হয়ে চলবে। আমার মেয়েটার বিয়ে ভেঙে দিও না বাবা। তুমি তো একবার দেখেছই বিয়ের আসরে বিয়ে না হওয়া মেয়ের অবস্থা সমাজে কেমন। আমার মেয়ের সাথে এমনটা করো না। আমি তোমার কাছে হাতজোড় করে বলছি।

জাহান বলে—

—আঙ্কেল আমি একজনকে ভালোবাসি। আজ যদি আপনি এমনটা না করতেন তার সাথেই কিন্তু আমায় বিয়েটা হতো। আমি রাহা আর হায়া’কে সবসময় একই নজরে দেখেছি। মনেপ্রাণে একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে আমি কি করে বিয়ে করবো বলেন? এতে আমি বা আপনার মেয়ে কেউ সুখী হতে পারবো?

—তাহলে আমার মেয়ের অবস্থাটাও যে হায়ার মতো হবে। আমার মেয়ে এসব সহ্য করতে পারবে না বাবা।

কথা গুলো বলতে বলতে রাহাত ঝরঝরিয়ে কেঁদে দেয়। পুরুষ মানুষ হয়েও আজ রাহাত এতগুলো মানুষের সামনে নিজের চোখের পানি ফেলতে লজ্জা পাচ্ছে না। উপস্থিত সকলেরই খারাপ লাগে তার কান্না দেখে।

তখনই আফিফ বলে উঠে –

—আপনাদের সম্মতি থাকলে আমি রাহা’কে বিয়ে করবো।

উপস্থিত সকলে ভীষণ ভাবে চমকে যায়। এমনকি আদিয়াত-আফরাও। আফরা আফিফের কাছে এসে বলে–

—কি বলছিস তুই? ও জাহানকে ভালোবাসে, তোর সাথে ওর বিয়ে হলে তুই সুখী হতে পারবি না। বাচ্চাদের মতো কথা বলিস না।

—আমি রাহা’কে বাধ্য করবো আমায় ভালোবাসতে। আমি উনার ভালোবাসা হাসিল করে নিবো আম্মু।

ভীষণই কনফিডেন্সের সাথে কথাগুলো বলে আফিফ। সকলেই বিভিন্ন ভাবে আফিফকে বুঝায়, আফিফও তাদের নিজের যুক্তিগুলো দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়।

জাহান রাহাতকে বলে–

—আঙ্কেল, রাহার জন্য আফিফ ভাইয়ার থেকে ভালো ছেলে আপনি হয়ত পাবেন না। সে আশিয়ান ভাইয়ের বন্ধু হলেও আমাদের সাথেও তার ভালোই বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্ব থেকেই বলতে পারছি কথাগুলো। আর মেহরিমা যদি আমার জীবনে না আসত তাহলে আমি হয়ত রাহার সম্পর্কে ভেবে দেখতাম, কি এই জীবনে আমি মেহরিমা ব্যতীত আর কাউকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে ভাবতে পারবো না। এখন আপনারা ভেবে দেখেন কি করবেন। আমি আসছি।

জাহান চলে যায় মেহরিমাকে আনতে, তার সাথে হায়াও যায়। রাহা ভগ্ন হৃদয়ে, অশ্রুমাখা চোখে জাহানের প্রস্থান দেখে। সবশেষে সকলের পরামর্শে সেদিনই আফিফ ও রাহার বিয়েটা হয়ে যায়। আদিয়াত এক মেয়েকে বিদায় দিয়ে আরেক মেয়ে নিয়ে মাহমুদ ভিলায় ফিরে যায়।

___________________

~ফ্ল্যাসব্যাক এন্ড~

সেদিন জাহান আর হায়া মেহরিমার হোস্টেল গিয়ে জানতে পারে মেহরিমা গত চারদিন আগে হোস্টেল ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। যাওয়া আগে একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছে তার রুমমেটকে, যদি হায়া বা জাহান তার খোঁজে আসে তাহলে তাদের যেনো চিঠিটা দেয়। চিঠি টায় লেখা ছিলো–

—আবেগের দুনিয়া থেকে বের হয়ে বাস্তবতা দেখুন জাহান। আমি আপনার যোগ্য নই, যে যোগ্য তার কাছে রেখে গেলাম। দোয়া করি সুখের সংসার হোক আপনাদের।

জাহান চিঠিটা পড়ে ভীষণ ভেঙে পড়ে। পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেও মেহরিমাকে পাওয়া যায় না। জাভিয়ান তার সব সোর্স লাগিয়ে দেয় মেহরিমাকে খুঁজতে কিন্তু ফলাফল শূন্য। আজ ১৪ দিন হতে চলেছে মেহরিমার নিখোঁজের।

শব্দসংখ্যা~২৬৫০
চলবে?

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]