#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৭
হসপিটাল থেকে মাত্রই ফিরল আফিফ। কলিংবেল দিতেই তাদের বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি দরজা খুলে দেয়। তার কাছে মায়ের ও স্ত্রীর কথা জানতে চাইলে সে জানায় আজ শ্বাশুড়ি তার একমাত্র পুত্র বধূকে নিয়ে কিচেনে কি জানি করছে। কাজটা করার ইচ্ছে প্রথমে রাহাই প্রকাশ করেছে বলে আফরা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে তাকে সাহায্য করছে।
হেল্পিং হ্যান্ডের কাছে এমন উদ্ভট কথা শুনে আফিফের কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে৷ কি করতে চাইছে মেয়েটা? তাও আবার কিচেনে? আম্মুর আবার তাকে শেখাচ্ছে তার মানে মামলা বড়সড় কিছু। সে জিজ্ঞেস করে–
—আপনি দেখেন নি খালা ওরা দুই জন কি করছে?
—না গো আফিফ বাবা। আমারে তো রান্নাঘরে ঢুকবারই দিতাছে না।
—ওহহ।
আফিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করে না। তার মা যখন রাহার সাথে আছে তখন কোন গোলমাল হওয়ার চান্স নেই। সে নিজের ঘরে যাওয়ার আগে কাজের খালাকে বলে–
—খালা আমাকে একটা কফি দিয়ে যেয়েন প্লিজ। মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে।
—আচ্ছা বাবা। তুমি যাইয়া ফেরেশ হইয়া লও আমি তোমার কপি নিয়া আইতাছি।
কাজের খালার ভুলভাল ইংরেজি শুনে আফিফের হাসিই পায় বটে কিন্তু সে হাসে না। হাসলে খালা লজ্জা পাবে আর তাকে অপমানও করা হবে। আফিফ তার কথার সম্মতি দিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। ব্যাগটা রেখে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে শাওয়ার নিতে। যদিও গা টা ম্যাচম্যাচ করছে, জ্বর আসার পূর্বাভাস তাও সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর একটা ওয়ার্ম শাওয়ার না নিলে ক্লান্তিটা যেনো রয়েই যায় শরীরে।
শাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হয়ে আসে আফিফ। টাওয়ালটা বেলকনিতে মেলে দিয়ে এসে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিজের হাত দিয়ে নিজের মাথায় হালকা করে ম্যাসাজ করতে থাকে। তখনই রুমে আসে রাহা।
টুকটুক করে কফির কাপটা নিয়ে এগিয়ে আসে আফিফের দিকে। আফিফ তখন চোখ বন্ধ করে তার মাথা ম্যাসাজ করছে। রাহা হালকা করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে–
—আপনার কফি।
আফিফ চমকে উঠে রাহার কণ্ঠ শুনে। বাবার আদরের দুলালি হওয়ায় কিচেনের ধারে কাছেও যেতে দিত না রাহাত তাকে। নিজের পানিটা পর্যন্ত গড়িয়ে খায় না সে। সেই রাহা আফিফের জন্য কফি নিয়ে এসেছে, বিষয়টা তার কাছে বিস্ময়করই বটে। সে হা করে একবার রাহার দিকে আরেকবার তার হাতের মগটার দিকে তাকায়।
রাহা তার এমন রিয়েকশনে একটু বিরক্ত ও অস্বস্তি বোধ করে। সে বলে–
—কি হলো ধরুন।
আফিফ থতমত খেয়ে কফির মগটা হাতে তুলে নেয়। রাহাকে বলে–
—থ্যাঙ্কস।
—মেনশেন নট।
আফিফ একটা সিপ নেয় কফির। এক চুমুক খেয়েই সে বুঝে গিয়েছে কফিটা তার মা বা কাজের খালা বানায় নি, একদমই ভিন্ন স্বাদ কফিটার। পরপর আরো কয়েকবার চুমুক দেওয়ার পর সে শুনতে পায়, তার সামনে দাঁড়ানো রমণীটি বলছে–
—কেমন হয়েছে কফিটা?
আফিফ রাহার দিকে তাকিয়ে দেখে রাহা বেশ উদগ্রীব হয়ে আছে উত্তরটা জানার জন্য। তার মানে কফিটা সে বানিয়েছে? আফিফ রাহা’কে জিজ্ঞেস করে–
—আপনি বানিয়েছেন কফিটা?
রাহা কয়েকবার মাথা উপর নিচ করে। তার মানে সে বানিয়েছে। এবং সে এখন জানতে চাইছে কেমন হয়েছে কফিটা খেতে। আফিফ কথাটা শুনে মুখটা বেশ গম্ভীর করে নেয়। হঠাৎই করে এমন গম্ভীর মুখাবয়ব করায় রাহা ধরেই নেয় খেতে হয়ত ভালো হয়নি কফিটা। মুখটা মলিন করে বলে–
—ভালো হয়নি তাই না? আই এম সরি, আসলে আমি কখনো এসব করিনি তো তাই এমনটা হয়েছে। আন্টি আমায় হেল্প করেছে তাও, দিন আমায় মগটা আমি চেঞ্জ করে আন্টির হাতে বানানো কফি নিয়ে আসছি।
রাহা কথাটা শেষ করে আফিফের হাত থেকে কফির মগটা নিতে গেলে আফিফ সাথে সাথে মগটা সরিয়ে ফেলে। তার এমন কাজে রাহার কপালে ভাজ পড়ে। সে ভ্রু কুঁচকে বলে–
—কি হলো দিন? সরালেন কেনো?
আফিফ তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে–
—আমি কি একবারও বলেছি খারাপ হয়েছে খেতে?
—না বলেন নি। কিন্তু আপনার চোখমুখ তো অন্যকিছু বলছে।
—তা কি বলছে শুনি একটু?
বেশ হেঁয়ালি করে বলে আফিফ। আফিফের এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় রাহার কেন জানি রাগ হয়। সে তার কোমড়ে দুই হাত রেখে বলে–
—আপনার চোখমুখ বলছে কফিটা ভালো হয়নি। এখন দেন মগটা আমার কাছে।
লাস্টের কথাটা বেশ ধমকের সুরে বলে রাহা। আফিফ তার এমন ধমক শুনে অবাক হয়ে যায়। তার চেয়ে গুণে গুণে সাড়ে আট বছরের এক পুচকি কিনা তাঁকে ধমকাচ্ছে। বিষয়টা বেশ মজার লাগলো। আফিফ কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলে–
—বাহ তুমি দেখি রাগও করতে জানো। তা শুনো পুঁচকি মেয়ে, বেশি রাগ করা স্বাস্থ্যের জন্য কিন্তু ভালো না। চুল পড়ে গিয়ে অকালেই বুড়ি হয়ে যাবে। তখন আমাকে লোকে বলবে, এত সুন্দর-হ্যান্ডসাম ডাক্তারের টেঁকো বউ।
প্রথমে পুঁচকি পরে আবার টেঁকো বউ। আফিফের একের পর এক কথায় রাহার পিনপিনে রাগটা দাবানলের মতো রূপ নেয়। সে তার ওড়নাটা কোমড়ের একপাশে গিট দিয়ে আফিফের কাছে এগিয়ে এসে তার চুল টেনে ধরে। আফিফ রাহার এহেন কাজে হতভম্ব হয়ে যায়। মেয়েটা এতটা রেগে যাবে সে ভাবেনি। রাহা আফিফের চুল টানতে টানতে বলে–
—অসভ্য ডাক্তার। আমায় পুঁচকি আর টেঁকো বলেন, সাহস তো কম না। আজ আপনাকে আমি টেঁকো বানিয়ে ছাড়ব।
রাহার চুল টেনে দেওয়ায় আফিফের অবশ্য ভালোই লাগছে। আগে আদিবা এমন করে চুল টেনে দিত যখন তার মাথা ব্যথা করত, আর আজ রাহা নিজের অজান্তেই আফিফকে প্রশান্তি দিচ্ছে।
আফিফ তার ঘাড়ের দিকে ইশারা করে বলে–
—ঘাড়ের দিকের চুল গুলো একটু টেনে দাও তো। বাহ্! তােমার হাতে তো জাদু আছে। আমার মাথা ব্যথা চলে যাচ্ছে।
আফিফের মাথা ব্যথা শুনে রাহার হাতজোড়া থেমে যায়। মনের মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করে। লোকটা সারাদিন হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করে এসে একটু রেস্ট নিচ্ছিল আর সে কিনা তার শরীরের খবর না নিয়ে উল্টো ঝগড়া করছে। যেমন তেমন ঝগড়া না চুলোচুলি মার্কা ঝগড়া।
এদিকে রাহাকে থেমে যেতে দেখে আফিফ বলে–
—কি হলো থামলে কেনো? দাও আরো। ভালো লাগছিল আমার।
আফিফের কথাটা রাহার কাছে ব্যঙ্গাত্বক মনে হলো। সে আফিফের মাথা থেকে নিজের হাতজোড়া সরিয়ে আনে। তারপর অপরাধীর মতো মুখ করে বলে–
—আই এম সরি এগেইন।
—তা কেনো?
—আপনার মাথা ব্যথা করছিল আর আমি একের পর এক ব্লান্ডার করে চলেছি। প্রথমে বাজে কফি এখন আবার চুল টানলাম। আপনার ব্যথা লেগেছে নিশ্চয়ই?
নিচের দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলে রাহা। আফিফ তার কথা শুনে হেঁসে দেয়। তারপর বলে–
—আমার ব্যথা লাগে। বরং ভালো লাগছিল। ডাক্তার হয়েও ঔষধ নেওয়া আমার তেমন একটা পছন্দের না। আগে যখন আমার মাথা ব্যথা হতো তখন তো আদিবা আমার চুল টেনে মাথা ম্যাসাজ করে দিত। তুমি নিজের অজান্তেই আমার পেইন কিছুটা কমিয়ে দিয়েছ।
—সত্যি?
—হ্যা রে বাবা সত্যি।
রাহা চোখ ছোট ছোট করে বলে–
—আমি আপনার বাবা?
আফিফ রাহার কথায় আবারও থতমত খেয়ে যায়। সে রাহাকে কিছু বলবে তার আগেই রাহা হেঁসে দেয়। আফিফ হা করে তাকিয়ে দেখতে থাকে তার হাসি। তাদের বিয়ের দুই সপ্তাহ পার হয়েছে কাল। এতগুলো দিনে সে কখনোই রাহাকে এমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি। তাই আজ তাকে এমন ভাবে হাসতে দেখে আফিফ অবাক হয়ে যায়। রাহা মেয়েটা তার বাবা-মায়ের মতো ভীষণ সুন্দর। হাসলে দুই গালে এক ইঞ্চির মতো ডেবে যায়। মানে টোল পড়ে। টোল পড়া মানুষদের হাসলে কতটা সুন্দর লাগে আশা করি আপনারা জানেন।
রাহা নিজের হাসির প্রকোপ কিছুটা কমিয়ে বলে–
—আপনি কি আমার কথা সিরিয়াস নিয়েছিলেন আফিফ? কেমন থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন।
কথটা বলে রাহা আবার হেঁসে দেয়। তার হাসি দেখে আফিফও হেসে দেয়। ঘাড়ের পেছনের দিকে চুলকে বলে–
—তেমন কিছু না।
তাদের হাসাহাসির মাঝেই নিচ থেকে ডাক আসে ডিনার করার জন্য। আফিফের কফি ততক্ষণে প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে। রাহা মগটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঘরে থেকে বের হতে হতে বলে–
—তাড়াতাড়ি নিচে আসুন। সবাই অপেক্ষা করছে।
আফিফ তাকে পেছন থেকে ডেকে বলে–
—রাহা শুনুন।
—জ্বি।
রাহা ঘাড় ঘুরিয়ে আফিফের দিকে তাকায়। আফিফ বলে–
—আপনার হাসিটা সুন্দর। মাঝে মধ্যে এই সুন্দর হাসিটা দেখার সুযোগ এই অধমকেও দিয়েন।
আফিফের কথা শুনে রাহা লজ্জা পেয়ে যায়। সেই সাথে মনের কোণে একটা ভালো লাগাও কাজ করে। সে কোনমতে বলে–
—ধন্যবাদ।
কথাটা বলেই রাহা ফুরুত। আফিফ তার পালিয়ে যাওয়া দেখে বুঝতে পারে তার বউ লজ্জা পাচ্ছে। সে নিজে নিজে কিছুক্ষণ হেঁসে হাটা দেয় নিচের যাওয়ার জন্য।
__________________________________
মাথা নিচু করে অপরাধীর ন্যায় সোফায় বসে আছে মেহরিমা। তার ঠিক বিপরীত পায়ের সোফায় বসে আছে হায়া। তীক্ষ্ণ তার দৃষ্টি। হায়া কোন কথা না বলেই জায়গা ছেড়ে উঠে যেতে নিবে তখনই মেহরিমা তাড়াহুড়ো করে তার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। হায়া কয়েকবার মেহরিমাকে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু মেহরিমা শরীরের সব শক্তি দিয়ে ধরে রাখায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না।
হায়া হানিয়াকে বলে–
—আম্মু, তোমার বড় ছেলের বউকে বলো আমায় ছাড়তে মেজাজ খারাপ হচ্ছে কিন্তু আমার। ননদের সাথে এত জড়াজড়ি কিসের আজব তো?
হায়ার কথা শুনে মেহরিমা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মেহরিমার কান্না শুনে হায়ার রাগ কিছুটা পড়ে যায়। কিন্তু পুরোপুরি যায় না। সে মেহরিমাকে জড়িয়ে না ধরেই বলে–
—এখন কাঁদছিস কেন? ছেড়ে যাওয়ার সময় একবারও আমাদের কথা মনে পড়ে নি? আমার কথা বাদ দেয়, আমার ভাই টার কথা তোর একবারও মনে পড়েনি? এতটা কঠোর কি করে তুই হতে পারলি মেহরিমা? এত কঠোর হৃদয়ের মেহরিমাকে তো আমি চিনি না। আমি যাকে চিনতাম তার মনটা ছিল একদম কাদামাটির মতো নরম।
কথাটা বলে এবার জোর খাটিয়ে নিজের থেকে মেহরিমাকে ছাড়িয়ে নেয় হায়া। সোফার উপর একপাশে রাখা নিজের সাইড ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মায়ের উদ্দেশ্য বলে–
—আমি আসছি। রাত হয়েছে গিয়েছে। উনি আর মাম্মা টেনশন করবে।
কথাটা বলে হায়া হাঁটা শুরু করে মির্জা বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্য। হায়া চোখের আড়াল হতেই মেহরিমা প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পড়ে। হানিয়া তার কাছে এসে তাঁকে আগলে নেয় নিজের বুকের সাথে। নানান ধর কথা বলে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে।
______________________________
—এ কি? আপনি বালিশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
জাহানকে বালিশ নিয়ে সোফার দিকে যেতে দেখে মেহরিমা তটস্থ গলায় প্রশ্নটি করে। জাহান তার ছোট বক্তব্য দিয়ে বলে–
—সোফায়।
—কেনো? এত বড় বেড থাকতে আপনি সোফায় যাচ্ছেন কেনো?
মেহরিমার একের পর এক প্রশ্নে জাহান কিছুটা বিরক্ত বোধ করে। সে বিরক্তিকর গলায় বলে–
—ঘুমাতে যাচ্ছি। পেয়েছ তোমার প্রশ্ন? এখন আমি যেতে পারি? নাকি আরো প্রশ্ন আছে?
—বেডে কি হয়েছে? বেডে ঘুমান।
—অনেক সমস্যা হয়েছে। বড় সমস্যা হলো তুমি। দেখো আমরা এখন স্বামী-স্ত্রী। এমন একটা বৈধ সম্পর্ক যেটা সমাজ আর ধর্ম দ্বারা স্বীকৃতি প্রাপ্ত। একটা পবিত্র বাঁধনে বাধা এখন আমরা। স্বাভাবিক ভাবেই একটা আকর্ষণ কাজ করবে পাশাপাশি বা কাছাকাছি থাকলে। স্বামীর অধিকারের অজুহাতে, তোমায় হয়ত আমি গভীরভাবে ছুঁয়েও দিতে পারি। সেটা আমার জন্য সুখকর হলেও তোমার জন্য নাও হতে পারে। আফটার অল, তুমি তো আর আমায় ভালোবাসো না। স্বামীর অধিকার ছুতো দিয়ে নিজের স্ত্রীর অনিচ্ছায় তাঁকে কাছে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে ম্যারিটাল রে**প করার মতো কাপুরুষ অন্তত আমি নই। ছুঁয়ে দিলাম না তোমায়, তাতে কি হবে? শারীরিক স্পর্শর চেয়ে আত্মা আর মনকে স্পর্শ করা বড় পাওয়া আমার কাছে। তোমার মনকেই তো আমি স্পর্শ করতে পারলাম না, সেখানে শরীর স্পর্শ করা আমার কাছে দুনিয়ার কঠিনতম শাস্তিগুলোর একটি। তুমি চোখের সামনে আছো এটাই অনেক। শুভ রাত্রি।
কথাগুলো বলে জাহান সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ে কপালে হাত রেখে। মেহরিমা শুধু ছলছল চোখে তার বক্তব্য শুনেই গেলো। তার যা বলা উচিত ছিলো এবারও তা বলতে পারল না।
শব্দসংখ্যা~১৬৪৭
~চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৮
দিনগুলো বেশ ভালো ভাবেই কেটে যাচ্ছে সকলের। আশিয়ান-হায়া, জায়িন-আদিবা, আফিফ-রাহা এই তিন জুটি তাদের সংসার জীবনটাকে বেশ ইনজয় করছে। কিন্তু বাকি আরেক জুটি জাহান-মেহরিমা তারা যেন একটা রেখায় আঁটকে গিয়েছে।
জাহান-মেহরিমার বিয়ের দুই সপ্তাহ অর্থাৎ ১৪ দিন পার হয়ে গিয়েছে কিন্তু তাদের সম্পর্ক এখনও স্বাভাবিক হয়নি। জাহান এখনও কঠিন অভিমান করে রয়েছে মেহরিমার সাথে। কেন মেহরিমা তাকে ছেড়ে গেলো? সে কি মেহরিমাকে বারবার বলেনি, সে মেহরিমাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছে, নিজের আত্নাটাকে তার কাছে সপে দিয়েছে, তাহলে মেহরিমা কেন তাকে ছেড়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখালো? জাহান তো শয়তানের প্ররোচনায় পরে নিজের ক্ষতিও করে দিতে পারত, তখন? তখন জাহানের কোন ভালোটা হতো মেহরিমার এই ত্যাগের?
_____________________________
তালুকদার বাড়িতে সবাই ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে একসাথে। হানিয়া তার দুই পুত্রবধুদের বসিয়ে নিজেই বরাবরের মতো সার্ভ করছে। সে এখনই সংসারের দায়িত্ব পুত্রবধুদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চায় না। হাতে হাতে সাহায্য করে ঠিক আছে কিন্তু পুরোপুরি দায়িত্ব দেয়নি সে। দেখুক, শিখুক বাকি জীবন তো পরেই আছে সংসার করার জন্য।
জাভিয়ান খেতে খেতে তার বাবাকে বলে–
—বাবা, জাহান-জায়িনের বিয়ের তো অনেকদিনই হলো কিন্তু ওদের রিসেপশন করা হলো না। আমি ভাবছিলাম ভালো একটা ডেট দেখে ওদের রিসেপশনের ব্যবস্থা করে ফেলবো। তোমার মতামত কি এই বিষয়ে?
বৃদ্ধ মি.তালুকদার ছেলের মতামত চাওয়া দেখে মনে মনে বেশ খুশি হলেন। ছেলেদের বিয়ে দিয়েছে তাও এখনও সে বাবার থেকে মতামত না নিয়ে কাজ করে না। মি.তালুকদার ক্ষীণ স্বরে বলেন–
—তুমি যেটা ভালো মনে করছো করো। আমি তোমার সব বিষয়ে পূর্ণ আস্থা রাখি জাভিয়ান।
—তাও তুমি তোমার মতামত দাও।
—হুম করতে পারো। দাদু ভাইদের বিয়ে হয়েছে, অনেকেই বিয়েতে আসতে পারে নি আবার জাহান দাদু ভাইয়ের বিয়ে সম্পর্কে অনেকই জানে না। তাই রিসিপশনটা তাড়াতাড়ি করে ফেলাই ভালো হবে।
—আচ্ছা। মাম্মা (রোজি বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে জাভিয়ান) তুমি কি বলো এবিষয়ে?
রোজি বেগমকে তখন খাইয়ে দিচ্ছিল আদিবা। দুই নাতিবউ ভীষণ ভালোবাসে ছোট দাদীকে। তার শরীরের অবস্থা এতটাই নাজুক যে নিজ হাতে খেতে পর্যন্ত কষ্ট হয়। তাই তাকে হানিয়া বা মেহরিমা-আদিবা খাইয়ে দেয়। কাজটা তারা বেশ ভালোবাসার সহিত করে।
রোজি বেগমের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। আদিবা তার মুখ ধুয়ে আলতো হাতে মুছে দেয়। রোজি বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে–
—ভাইয়ার সাথে একমত আমি বাবা।
—আচ্ছা। খারাপ লাগছে তোমার? তুমি কি এখানে থাকবে নাকি শুয়ে দিবে আসবে তোমাকে?
—না খারাপ লাগছে না। এখানেই থাকি। খাওয়া ছেড়ে উঠতে হবে না কাউকে।
আদিবা বসে পড়ে ব্রেকফাস্ট করতে। এতক্ষণ তারা সকলেই চুপচাপ জাভিয়ানদের কথা শুনছিল। জাভিয়ান এবার ছেলেদের দিকে ফিরে। তাদের উদ্দেশ্য করে বলে–
—তোমাদের কি মতামত বয়েজ? কবে রাখলে তোমাদের সুবিধা হয়?
জায়িন বলে–
—আমার অফিসে আপাতত কোন প্রেশার নেই। আমি এইমাসটা ফ্রীই আছি। সামনে মাসের সেকেন্ড উইকে একটা নতুন ডিল সাইন করবো, তারপর থেকে হয়ত আবার বিজি হয়ে যাবো।
জাভিয়ান জাহানকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—জাহান তুমি ফ্রী আছো এই মাসে? নাকি তোমার কোন ক্যাম্প বা সার্জারি আছে?
—তেমন কোন প্ল্যান নেই বাবা। সার্জারি একটা আছে কিন্তু সেটা এই সপ্তাহতেই হয়ে যাবে। তারপর ইমার্জেন্সি কোন কেস না আসলে আমি ফ্রী আছি।
জাভিয়ান মেহরিমা-আদিবা ও হানিয়ার কাছ থেকেও মতামত নেয়। তাদেরও কোন সমস্যা নেই দেখে ঠিক করা হয় সামনের সপ্তাহের শেষের দিকে জাহান-মেহরিমা ও জায়িন-আদিবার রিসিপশন। হানিয়াকে জাভিয়ান বলে মির্জা বাড়িতেও যাতে খবরটা পৌঁছে দেয়। এবং ঐ বাড়ির সবাই যাতে এই সপ্তাহেই এই বাড়িতে এসে পড়ে।
_____________________________
হাায়া-আশিয়ান, মেহরিমা-জাহান ও আদিবা-জায়িন আজ প্রথম বারের মতো সকলে বাহিরে বের হয়েছে সময় কাটানোর জন্য। তাদের তিন জুটিরই বিয়ের পর একের পর এক ঝামেলায় ঘোরাঘুরি মন মানসিকতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আজ আশিয়ানই প্রস্তাব দেয় একটু আলাদা, নিভৃতে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর জন্য।
আশিয়ান এখন মোটামুটি ভালোই সুস্থ। মাথার ইয়া বড় ব্যান্ডেজটা খুলে ছোট্ট একটা ওয়ান টাইম লাগানো রয়েছে বর্তমানে। তারা সকলে একটা রিসোর্টে এসেছে ঘুরতে। শহর থেকে একটু বাহিরের সাইডে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সেই রিসোর্টের নাম
❝পুষ্পের নীরব নিকুঞ্জ❞ রিসোর্টের মালিক ভদ্রলোক নিজের ও তার প্রিয়তমার নামের সাথে মিলিয়ে রিসোর্টির নাম রাখেন। রিসোর্ট টি দেশি-বিদেশি নানান ধরণের ফুল দিয়ে সুরভীত হয়ে আছে।
আশিয়ানদের প্ল্যান আজকের দিন ও রাতটা তারা এখানে কাটিয়ে কাল সকালের ব্রেকফাস্ট সেড়ে বাসায় রওনা হবে। এসেই তারা সকলে ফ্রেশ হতে চলে যায়। আধা ঘণ্টার মাঝে ফ্রেশ হয়ে সকলে বের হয় আশেপাশে ঘুরতে।
আশিয়ান-হায়া, জায়িন-আদিবা বেশ ইনজয় করছে শর্টটাইমের এই অঘোষিত ট্রিপটা। শুধু ব্যতিক্রম অবস্থানে আছে জাহান-মেহরিমা। অন্য দুটো জুটি যেখানে হাতে হাত রেখে কাঁধে মাথা রেখে হাঁটছে সেখানে জাহান এই মুল্লুকে মেহরিমা আরেক মুল্লুকে। মেহরিমা আগে আগে হাঁটছে আর জাহান তার থেকে কিছুটা পেছনে পকেটে দুই হাত গুঁজে তাকে পাহারা দিতে দিতে যাচ্ছে।
মেহরিমা শুরুতে জাহানের পাশে হাঁটতে থাকে, কিন্তু জাহান মেহরিমার দিকে খেয়াল না করেই ফোন টিপতে ব্যস্ত। আসলে সে মেহরিমার পরীক্ষা নিচ্ছে।
হ্যাঁ, পরীক্ষা। জাহান দেখতে চাইছে তার রাগ ভাঙানোর জন্য মেহরিমা ঠিক কি কি করতে পারে। অনেক তো হলো সে নিজেকে প্রকাশ করেছে, মেহরিমা এখন নিজের দায়িত্ব নিজে বুঝে নিক। বর রাগ করেছে, সে রাগ ভাঙাবে। এখন কিভাবে ভাঙাবে সেটা মেহরিমার বিষয়।
মেহরিমা মন খারাপ করে আনমনে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে হাটছিল হঠাৎ শাড়ির সাথে বেঝে মুখ থুবড়ে পরে যেতে নিলে জাহান ঝড়ের গতিতে পেছন থেকে হেঁটে এসে মেহরিমার কোমড় আকড়ে ধরে তাকে নিজের বাহুডোরে বন্দি করে নেয়। মেহরিমা বেঁচে যায় নিচে পড়া থেকে।
মেহরিমার মাথা গিয়ে ঠায় পায় জাহানের প্রসস্থ বুকে। জাহানের হার্টবিট এতটাই জোরে বিট করছে যে, সে হয়ত নিজের হার্টবিটের আওয়াজ নিজেও শুনছে। মেহরিমার থেকে জাহান বেশি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভালোবাসা তো এমনই। প্রিয় মানুষটির ছোট্ট একটি আঘাতও বুকে ভীষণ বাজে ভাবে লাগে।
জাহান মেহরিমাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে তার দু’গালে হাত রেখে অস্থির হয়ে বলে–
—কোথাও ব্যথা পেয়েছো? নিজের প্রতি এতটা বেখেয়ালিপনা কেন তোমার? একটু কি খেয়াল রাখতে পারো না নিজের? এখন আমি এসে না ধরলে পড়ে গিয়ে ব্যথাটা পেতো কে?
শেষের কথা গুলো বেশ রাগান্বিত গলায় ভর্ৎসনা করেই বলে জাহান। উত্তেজনা বসত কথাগুলো একটু জোরে বলে ফেলায় আশিয়ান রাও শুনতে পায়। আশিয়ান-হায়া, জায়িন-আদিবা নিজেদের হাঁটা থামিয়ে পেছনে ঘুরে দেখে জাহান মেহরিমাকে বকছে।
হায়া ভয় পেয়ে যায় এটা ভেবে, মেহরিমা আবার তাকে কি না কি বলে রাগিয়ে দিয়েছে। সে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য ছুট লাগায়। তার পেছন পেছন বাকিরাও যায়। হায়া জাহানদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে বড়দা ভাই? মেহুকে বকছো কেনো?
জাহান তখনও রেগে থাকায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে–
—বকবো না তো কি করব বল? কি করেছে শুনবি? নিজে একটা হাফ ইঞ্চি পরে আছে দেড় ইঞ্চির শাড়ি। সামলাতে তো পারে না, শাড়িতে বেঁধে মুখ থুবড়ে পড়তে নিয়েছিল। আমি সময় মতো ধরে ফেলেছি নাহলে পড়ে হাত-পা ছিলত হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিউর।
জাহান মেহরিমার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলে, আর মেহরিমা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। সেই সাথে মুখটাও ফুলিয়ে রেখেছে। সে হাফ ইঞ্চি কোথায়? পুরো পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা সে। হাইটে একদম পার্ফেক্ট। তাও জাহান তাকে হাফ ইঞ্চি বলায় তার অভিমান হয়েছে।
অন্যদিকে হায়া জাহানের কথা শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে তো ভেবেছিল মেহরিমা হয়ত সেই উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করেছে। হায়া তার ভাইকে শান্ত করতে বলে–
—আচ্ছা আর রাগ করতে হবে না। মেহু আমার সাথে থাকবে এখম থেকে। আয় আমার সাথে।
কথাটা বলে হায়া মেহরিমার হাত ধরে নিজের সাথে নিয়ে যেতে নিলে জাহান তাকে থামিয়ে দেয়। মেহরিমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে–
—আমার সাথেই থাক। তুই নিজেও একটা উল্লুক সেটা ভুলে যাচ্ছিস কেন? আশিয়ান ভাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে জিনিসপত্রের সাথে ঠোকনাঠুকনি হয়ত কম খাস কিন্তু একেবারে যে খাস না সেটা আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। তোদের দুটোকে একসাথে ছাড়ি তারপর দুটোই পড়ে গিয়ে হাত-পা ছিলে আমাদের পেরেশানি বাড়া। তুই আশিয়ান ভাইয়ার সাথেই যা, আর এই উল্লুক আমার সাথে থাকুক।
হায়াকে উল্লুক বলায় আশিয়ান, জায়িন আর আদিবা হেঁসে দেয় সমস্বরে। আর এদিকে হায়া-মেহরিমা চোখ ছোট ছোট করে জাহানের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই হায়া জাহানের কাছে এসে তার বাহুতে ধুমধাম কয়েকটা লাগিয়ে দেয়। আশিয়ান তাকে তাড়াতাড়ি করে সরিয়ে আনে জাহান থেকে। হায়া কপট রাগ দেখিয়ে বলে–
—ছাড়ুন আশিয়ান, আমায় উল্লুক বলা বের করছি। কত বড় সাহস আমাকে আর আমার বেস্টুকে উল্লুক বলে। দাড়াও তুমি, বাসায় গিয়ে পাপার কাছে কান মলা না খাইয়েছি তোমায় তাহলে আমার নাম জেসমিন তালুকদার হায়া না।
আশিয়ান তাঁকে সেখান থেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যায়। জায়িন-আদিবাও আবারও চলে যায় নিজেদের মতো ঘুরতে। জাহান এবার মেহরিমার হাত ধরে আশেপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে হাঁটছে। মেহরিমা শুরুতে মুখ ফুলিয়ে রাখলেও পরে তার মনে বলে ‘এখন রাগ দেখিয়ে মুখ ফুলিয়ে রাখার সময় না মেহু, আগে জাহানের রাগ ভাঙা তারপর এই ভদ্রলোককে ইচ্ছে মতো নাকানিচুবানি খাওয়ানো যাবে।’
মনের কথা মেনে নিয়ে মেহরিমা আর রাগ করে থাকে না। সেও জাহানের সাথে প্রকৃতি উপভোগ করতে থাকে। সাহস জুগিয়ে আস্তে আস্তে নিজের মাথাটা জাহানের কাঁধে রাখে। মনে মনে ভয় পাচ্ছে সে, জাহান যদি তার কাঁধ থেকে মেহরিমার মাথাটা সরিয়ে দেয়। কিন্তু না, কয়েক মিনিট হয়ে যাওয়ার পরও জাহান যখন মেহরিমার মাথা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয় না তখন মেহরিমার মন খুশিতে নেচে উঠে।
মেহরিমা হাঁটতে হাঁটতে ভাবে–
—ধন্যবাদ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে। রোজ এত গুনাহ করার পরও আমার প্রতি এত রহম করার জন্য। আমার মতো একজনকে এতটা ভালোবাসার জন্য জাহানের মতো একজন মানুষকে দেওয়া জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
________________________
রাতের ডিনার করে রাহা বসে বসে ফোন স্ক্রোল করছে আর আফিফ নিজের কিছু কাজ সেড়ে নিচ্ছে। স্ক্রোল করতে করতে একটা গ্রুপ ফটো তে রাহার চোখ আটকে যায়। আশিয়ানদের গ্রুপ ফটো দেখছিল রাহা।
হায়া তাদের সকলকে ট্যাগ করে পোস্ট করেছে। একক পিকও আছে তাদের সবার। অন্যদের চাইতে সে বারবার জাহান আর মেহরিমার পিকগুলো জুম করে করে দেখছে। একটা একক পিকে মেহরিমা লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে পবিত্র একটা হাসি আর জাহান মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেহরিমাকে দেখছে। তখনই পিকটা তুলেছে কেউ। গ্রুপ পিক গুলোতেও জাহান মেহরিমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে রেখেছে। জাহান যে মেহরিমাকে পেয়ে কতটা খুশি তা তার চোখ মুখ দেখেই বলে দেওয়া যাচ্ছে।
ছবিগুলো দেখে রাহার বুক ভারী হয়ে উঠে। চোখে অশ্রু জমতে শুরু করে। হাসফাস করতে থাকে একটু নিশ্চিন্তে কান্না করার জন্য। হঠাৎই ফোনটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। এমন অদ্ভুত শব্দ হওয়ায় আফিফ একটু চমকে যায়। সে ল্যাপটপে কাজ করছিল তাই রাহার দিকে এতটা খেয়াল ছিল না তার। রাহাকে এমন তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে দেখে তার কপালে ভাজ পড়ে। তার উপর আবার ফোন ছুড়ে মারার আওয়াজও সে বেশ ভালো মতোই পেয়েছে।
সে ল্যাপটপ ছেড়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। বন্ধ হয়নি ফোনটা, তাই সে সহজেই দেখতে পারে স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করতে থাকা আশিয়ানদের ফটো গুলো। আফিফের বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। বুকের কোথাও চিনচিনে ব্যথাও করছে তার। আফিফ ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে নিজেও বের হয়ে আসে রুম থেকে। আন্দাজ করে হাঁটা দেয় তাদের ছাঁদের দিকে।
ছাঁদের কাছাকাছি এসে শুনতে পায় রাহার শব্দ করে কান্না করার আওয়াজ। আফিফ জোরে জোরে কয়েক বার শ্বাস টেনে ভেতরে নেয় তারপর সেগুলো মুক্ত করে দেয়। আবারও হাঁটা লাগায়। ছাঁদে এসে দেখতে পারে রাহা ছাঁদের ফ্লোরে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা, সে যে কি সূচালো আর তীক্ষ্ণ হয় তা যার সাথে না হয়েছে সে অনুভূতিটা বুঝতে পারবে না।
আফিফ নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে রাহার পেছনে গিয়ে সামান্য দূরত্ব রেখে বসে পড়ে। অপেক্ষা করতে থাকে রাহার কান্না থামার। প্রায় ১০/১২ মিনিট পর রাহার কান্নার তোপ একটু একটু করে কমতে কমতে একসময় বন্ধই হয়ে যায়। শুধু মাঝে মধ্যে তার নাক টানার আর ফুঁপানো আওয়াজ পাওয়া যায়।
একসময় সেই শব্দও বন্ধ হয়ে যায়। রাহা চুপ করে বসে অসংখ্য তারায় জ্বলজ্বল করতে থাকা আকাশ দেখতে থাকে। ঠিক তখনই আফিফ এমন কিছু কথা বলতে থাকে যা রাহাকে বিস্ময়ের সাগরে ডুবিয়ে মারতে যথেষ্ট।
শব্দসংখ্যা~১৭৫৮
~চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৯
[গল্পের শেষের কথা গুলো পড়ার অনুরোধ রইলো]
রাহাত আজ অন্যান্য দিনের থেকে একটু আগেই চলে এসেছে। ইদানীং তার মন মেজাজ ভালো যাচ্ছে না। বিয়ের পর থেকে মেয়ের সাথে একদিনের জন্যও কথা হয়নি। এমনটা না সে ফোন করে নি, করেছিল কিন্তু রাহাই ফোন রিসিভ করেনি। সে বুঝতে পারে মেয়ে তার ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। সেও বা কি করত? সব ধরণের চেষ্টা তো করেই ছিলো, কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে এসে তার বউ আর জাহান পুরো গেইমটা ঘুরিয়ে দিলো। হ্যাঁ, রাহাত মনে করে মুনতাহার জন্য সে তার মেয়ের ইচ্ছে পূরণ করতে পারেনি। অথচ বোকা রাহাত এটা বুঝে না জাহান যেখানে নিজেই মানা করে দিয়েছিল সে মেহরিমা ব্যতীত আর কাউকে বিয়ে করবে না, সেখানে মুনতাহা বেগমের কিছু বলা না বলায় কি যায় আসে?
সেদিন বিয়ে থেকে এসে রাহাত মুনতাহাকে অনেক খারাপ কথা শোনায়। মুনতাহা তাকে বরাবরের মতোই বিষয়টা বুঝাতে চায়, ছলচাতুরী করে বিয়েটা তাদের হয়ে গেলেও তাদের মেয়ে কোনদিন সুখী হতো না। কিন্তু এবারও বুঝতে চায় না। সে নিজের লজিকে বলে–
—বিয়ে হয়েছে, থাকতে থাকতে একদিন না একদিন ঠিকই মেনে নিতো। ভালোবাসাও তৈরি হয়ে যেতো। কিন্তু তোমার কারণে আমার মেয়ে তার ভালেবাসার মানুষটিকে পেলো না।
মুনতাহা প্রতিউত্তরে বলছিলো–
—আসলেই কি ভালোবাসা হতো? হ্যাঁ, মেনে হয়ত একদিন জাহান নিতো, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা ভুলে গিয়ে রাহাকে আবারও ভালোবাসতে পারত? কই তুমি তো আজও আমায় ভালোবাসি কথাটা বললে না, আজও তুমি হানিয়াকে বুকের গভীরে সযত্নে লালন করে রেখেছো। যেখানে আমি নামক ব্যক্তিটির অস্তিত্ব টুকু অব্দি নেই।
মুনতাহার এই কথা সহ্য করতে না পেরে রাহাত সব সীমা অতিক্রম করে মুনতাহার গায়ে হাত তুলে। বিয়ের এত গুলো বছরে সেই দিন প্রথমবারের মতো রাহাত মুনতাহার গায়ে হাত তুলেছিল। হানিয়ার কথা তোলায় সে হাতটা তুলেছে মূলত। মুনতাহা নিষ্প্রাণ চোখে রাহাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। থাপ্পড়টা তার গালে না বুকে গিয়ে লেগেছে।
রাহাত থাপ্পড় মেরে নিজেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। রাগের মাথায় সে তার স্ত্রী, তার সন্তানদের মা’র গায়ে হাত তুলে ফেলেছে কথাটা মস্তিষ্কে অনুধাবন করতে পেরে রাহাত ঘাবড়ে যায়। হ্যাঁ, সে এই নারীটির সাথে দায়িত্ব নামক সম্পর্ক চালিয়ে এসেছে, নারীটি তার জীবনের সবটা দিয়ে রাহাতকে ভালোবাসলেও রাহাত তার প্রথম ভালোবাসাকে আজও ভুলতে পারে নি। তাই বলে গায়ে হাত দিবে? যেটার কথা রাহাত কল্পনাতেও কোনদিন আনেনি, আজ সেই কাজই নাকি সে করলে ফেললো? লজ্জা, অপরাধবোধে রাহাত সেদিন স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে বাহিরে চলে গিয়েছিল।
তারপর থেকেই সে আর মুনতাহা আলাদা রুমে থাকে। মুনতাহা থাকে গেস্টরুমে আর রাহাত নিজের রুমে থাকে। রাহাত তাকে রুমে আসার কথা বললেও সেদিনের থাপ্পড় মারার জন্য একবারও মাফ চায় নি। মুনতাহা তাকে শুধু একটা কথাই বলেছিল–
—যেই মানুষটার সাথে ২৩টা বছর সংসার করেও তার মনে জায়গা করতে পারলাম না, সেখানে তার রুম দিয়ে আমি কি করবো? থাকি না দু’জন দুই রুমে, ভালো থাকার অভিনয়টা দুই রুমে থেকেও খুব সুন্দর ভাবেই চালিয়ে যাবো আমি। এই বিষয়ে তুমি একদম নিশ্চিন্ত থাকো। ছেলেও কিছু টের পাবে না।
রাহাত মুনতাহার কথার প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারেনি। কোন মুখে বলবে? মুখ তো সে নিজেই খুইয়েছে। মুনতাহা যদিও বলেছিল রায়হান কিছু টের পাবে না কিন্তু সে তো অলরেডি সব জেনে গিয়েছে তাদের অজান্তেই। রাহাত-মুনতানার ঝগড়া, কথা কাটাকাটির সব কিছুই সে শুনেছে আর দেখেছে। তারপর থেকে সে তার বাবাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতে শুরু করেছে। পারত পক্ষে কথা বলে না সে তার বাবার সাথে, বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময় মায়ের কাছে থাকে নাহয় নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।
খাবারের টেবিলেও কম আসা-যাওয়া হয় তার। রাহাতকে মুনতাহা বেড়ে খাওয়ালেও নিজে ছেলেকে ছাড়া খায় না। রাহাতের খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর মা-ছেলে একসাথে বসে খায়।
__________________________
আজ অফিস থেকে রাহাতকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে মুনতাহা একটু অবাকই হয় কিন্তু কোন বাক্যালাপ করে না তার সাথে। আগে এমনটা হলে সে রাহাতকে প্রশ্ন করতে করতে মাথা খারাপ করে দিতো। কি হয়েছে আপনার? তাড়াতাড়ি আসলেন যে? শরীর খারাপ লাগছে? মাথা ব্যথা করছে? এক প্রকার অস্থির হয়ে নিজের প্রেশারই বাড়িয়ে ফেলত। রাহাত বরাবরই তেমন একটা গুরুত্ব দিতো না মুনতাহার এমন কেয়ার। কিন্তু আজ মুনতাহা কিছু জিজ্ঞেস না করায় তার মনটা কেমন খচখচ করছে।
রাহাত আঁড়চোখে মুনতাহাকে একবার দেখে হনহনিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। যাওয়ার আগে উঁচু গলায় বলে যায়–
—এক কাপ কফি লাগবে, মাথা ধরেছে আমার।
মুনতাহা রাহাতের মাথা ধরেছে শুনেও তার কাছে যায় না। কেন জানি আগের মতো টান আসে না রাহাতের প্রতি তার। মুনতাহা চুপচাপ কফি তৈরি করে দিয়ে হেল্পিং হ্যান্ডকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে থাকে।
এদিকে রাহাত চটপট ফ্রেশ হয়ে এসে বসে বসে ভাবতে থাকে সেদিনের ওমন কাজের জন্য সে মুনতাহার কাছে ক্ষমা চাইবে। নিজের স্ত্রী’ই তো, তার কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে এত ইগো কীসের? বয়স হয়েছে তাদের এখন, এখন বউয়ের এমন কলিকা জ্বলানো অভিমান কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না রাহাতের। সে মুনতাহার সাথে শুধু দায়িত্বের খাতিরে সংসার করছে এমনটা না। কিন্তু তাকে যে ভালোও বাসে না এটাও রাত-দিনের মতো ধ্রুব সত্য। সে অনেক চেষ্টা করেছে মুনতাহাকে ভালোবাসতে কিন্তু সে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।
মাঝে মাঝে এটা বলেও নিজেকে বুঝিয়েছে “যাকে এত ভালোবেসে আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারছি না, সে তো ঠিকই তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সুখের সংসার করছে, তাহলে আমি কোন ভিত্তিতে আমার স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে রাখছি? কেন তাকে ভালোবাসতে পারছি না? নিজেকে নিজেই সহস্রবার প্রশ্ন গুলো করেছে রাহাত কিন্তু উত্তর মেলেনি তার।
তার ভাবনা গুলোর মাঝেই দরজায় নক পড়ে। রাহাত একটু অবাক হয় নক করায়। এত বছর এই ঘরেই তো মুনতাহার রাজ ছিলো, আর আজ সেই ঘরেই প্রবেশের জন্য সে রাহাতের পারমিশন নিচ্ছে? বিষয়টা রাহাতকে ভীষণ আহত করে। রাহাত গলার স্বর বাড়িয়ে বলে–
—আসো, তোমার ঘরে প্রবেশের জন্য আমার অনুমতি লাগবে না মুন।
কথাটা শেষ করার সাথে সাথেই হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি রুমে প্রবেশ করে। তাকে কফি নিয়ে আসতে দেখে রাহাত যেমন চমকে যায় তেমনি কষ্ট পায়। এতটা কঠোরতা সে মুনতাহার কাছে আশা করেনি। হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা বলে–
—স্যার নেন আপনার কপি।
মহিলাটির কথায় রাহাতের ধ্যান ভঙ্গ হয়। সে গম্ভীর গলায় বলে–
—আপনার ম্যাম কোথায়? আপনি আসলেন যে?
—ম্যাডাম তো ডিনারের জন্য ব্যবস্থা করতাছে।
—ওহহ্।
কথাটা শুনে রাহাতের মনটা খারাপ হয়ে যায়। রাহাত অসুস্থ শুনেও মুনতাহা তাকে দেখতে আসল না, বিষয়টা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সে হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা টিকে বলে–
—আমার কফি লাগবে না। আপনি নিয়ে যান।
মহিলাটি রাহাতের কথা মতো কফিটা নিয়ে যায়। এদিকে রাহাত মন খারাপ করে কাউচেই বসে থাকে। দশ কি পনেরো মিনিট পর হঠাৎই নিচ থেকে চিৎকার চেঁচামিচির আওয়াজ শোনা যায়। তার মিনিট খানেক পর হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি দৌড়ে রাহাতের রুমে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে–
—স্যার, শীগগির নিচে চলেন। ম্যাডাম অজ্ঞান হইয়া গেছে।
—কিহ্হ্হ? কি হয়েছে মুনের?
কথাটা জিজ্ঞেস তো করে ঠিকই রাহাত কিন্তু উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না আর। দৌড়ে নিচে এসে কিচেনে চলে যায়। সেখানে এসে দেখে মুনতাহা অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে আছে। রাহাত মুনতাহার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেয়, মুখটা নিজের দিকে ঘোরালে দেখতে পায় মাথায় চোটও পেয়েছে। রাহাত অস্থির হয়ে মুনতাহার গালে আলতো চাপড় মেরে তাকে ডাকতে থাকে–
—মুন, এই মুন! কি হয়েছে? উঠো।
কিন্তু না, মুনতাহা উঠে না। রাহাত আর সময় নষ্ট না করে মুনতাহাকে কোলে তুলে নিয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে দেয়। তারপর বাসার ল্যান্ডলাইন থেকেই কল লাগায় তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে।
ডাক্তার পনেরো মিনিটের মধ্যে এসে পড়ে। তারপর মুনতাহাকে এক্সামিন করে বলে–
—আর প্রেশার অনেক লো, আর নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করে না হয়ত তাই এমনটা হয়েছে। আমি ঔষধ আর স্যালাইন দিয়ে যাচ্ছি। আশা করি তাতেই উনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশা আল্লাহ।
ততক্ষণে মুনতাহার জ্ঞানও ফিরে এসেছে। রাহাত তাকে সাহায্য করে রুমে যেতে। সে জোর করে মুনতাহাকে তাদের রুমে নিয়ে আসে, এবং সেখানেই ডাক্তার তাকে স্যালাইন দিয়ে চলে যায়। শরীর বেশি একটা ভালো লাগছে না বলে মুনতাহা বেশি কথা না বলেই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। রাহাত উদ্বিগ্ন মুখে তার মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
__________________________
—ভালোবাসা কি কেবল পাওয়ার নাম? হয়তো না।
কারও হাত ধরা মানেই কি তার হৃদয় ধরা যায়?
যদি ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েও বুঝো, সে অন্য কারও অনুভবে বন্দি, তাহলে সে পাওয়া কি আদৌ প্রাপ্তি, না কি এক গভীর শূন্যতার নাম?
ভালোবাসা তখন বিষ হয়ে ওঠে, যখন প্রিয় মানুষটি তোমার চোখে চেয়ে হাসে, কিন্তু সেই হাসির ছায়া পড়ে অন্য কারও নামের উপর। তখন তার ভালোবাসার অভিনয় তোমার হৃদয়ে এমন এক নিঃশব্দ মৃত্যু ডেকে আনে, যার ব্যথা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
ভালোবাসা তখন আর জীবন দেয় না, বরং বাঁচা আর মরার মাঝের এক অসহ্য যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়।
কথাগুলো বলে একটু থামে আফিফ। রাহা হা করে আফিফের কথাগুলো শুনছে। তার কথাগুলো শুনে রাহার মন খারাপ কিছুটা কমে যায়।
আফিফ আবারো এক মনে বলতে থাকে–
—ভালোবাসা কখনোই কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। যার হৃদয়ে তোমার জন্য কোনো জায়গা নেই,
তার পাশে থেকেও তুমি প্রতিনিয়ত একা হয়ে পড়বে।
ভালোবাসা মানে কেবল তাকে পাওয়ার নাম নয়,
বরং তার হৃদয়ে নিঃশর্তভাবে বাসা বাঁধার অধিকার পাওয়া। আর সে অধিকার চেয়ে নিতে হয় না,
তা দিতে হয়—ভালোবেসে, নিজে থেকে, মন থেকে।
ভালোবাসা যদি জোর করে আদায় করতে হয়,
তাহলে তা আর ভালোবাসা থাকে না—তা হয় একধরনের কারাগার, যেখানে হৃদয় বন্দি থাকে, আর আত্মা কাঁদে নিঃশব্দে।
আফিফের কথাগুলো শুনে রাহা ভাবনায় পড়ে যায়। রাহা ভাবতে শুরু করে–
— ঠিকই তো, আমি তো জানি জাহান মেহরিমাকে কতটা ভালোবাসে তাও আমি জোর করে তাকে পেতে চাইছিলাম। কিন্তু প্রকৃতি পক্ষে আমি জাহানকে ভালোবেসে নয়, নিজের জেদ বজায় রাখার জন্য নিজের করতে চাইছিলাম?
রাহার ভাবনার মাঝেই সে আবারও শুনতে পায়, আফিফ এবার তার দিকে তাকিয়ে, রাহার চোখে চোখ রেখে বলতে থাকে–
—যখন কেউ তোমায় নিঃস্বার্থ ভালোবাসবে, তখন তা বুঝতে শব্দের প্রয়োজন হবে না, তার চোখই হয়ে উঠবে নীরব স্বীকারোক্তি। চোখ হলো হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর ও সৎ ভাষ্যকার, যেখানে না-বলা অনুভূতিগুলো, অব্যক্ত প্রেম, লুকানো আকুলতা সব কিছু অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকে। মুখ হয়তো থেমে যায় সংকোচে, অথচ চোখ থামে না—চোখ বলে দেয় সব।
তুমি যদি একবার গভীরভাবে তাকাও, তাহলে অনুভব করবে—তার দৃষ্টিতে জমে আছে শত না-বলা কথা, হঠাৎ থেমে যাওয়া স্বপ্ন, বুকের গভীরে পুষে রাখা মায়া আর ভালোবাসার অনন্ত অপেক্ষা। সে যা বলতে পারেনি, তার চোখে সব বলা হয়ে গেছে।
চোখ—এ যেন এক নিষ্কলুষ আয়না, যেখানে হৃদয়ের গোপনতম আবেগেরা প্রতিধ্বনিত হয় নিঃশব্দে, অথচ গভীরতরভাবে। ভালোবাসা কখনো কখনো নীরব, কিন্তু সেই নীরবতাও চোখের ভাষায় হয়ে ওঠে সবচেয়ে প্রবল আর নির্ভুল প্রকাশ। ❝যখন চোখ কথার স্বাক্ষী হয়, তখন মুখের স্বীকারোক্তিও অপ্রয়োজনীয় বোধ হয়।❞ এখন আমি তোমায় একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো, তার সঠিক উত্তর দিবে ঠিক আছে?
রাহা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আফিফ তাকে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি কি জাহানের চোখে নিজের জন্য একবিন্দু পরিমাণ মায়া বা ভালোলাগা দেখেছো?
রাহা আফিফের প্রশ্ন শুনে মাথা নিচু করে নেয়। আফিফ অপেক্ষা করতে থাকে তার উত্তরে কিন্তু রাহা কোন উত্তর দেয় না। আফিফ নিজেই বলে–
—তোমার নিরবতাই তোমার হয়ে আমায় উত্তর জানিয়ে দিচ্ছে। যার কাছে তুমি এক বিন্দু পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ না তাহলে তাকে কেন এতটা গুরুত্ব দিচ্ছো? সে তো সুখে আছে, ভালো আছে নিজের ভালোবাসার মানুষটির সাথে। তাহলে কেন তুমি তার ভালো থাকাকে নিজের কান্নার কারণ বানিয়ে নিচ্ছো? তাকে যদি তুমি সত্যি ভালোবেসে থাকতে তাহলে এই ভেবে নিজেকে সামলাতে যে, আমার সাথে না হোক অন্য কারো সাথেই আমার ভালোবাসার মানুষটি ভালো আছে। তার ভালো থাকাতেই আমি খুশি, সুখী। কিন্তু তুমি কি করছো?
রাহা এবার আরো নিচে নামিয়ে নেয় নিজের মাথাটা। আবারও ফুপানোর আওয়াজ শোনা যায়। আফিফ এবার তার কাছে এগিয়ে এসে বসে। তার থুতনিতে হাত রেখে মাথা উঁচু করে তার চোখে চোখ রাখে। চোখে চোখেই অনেক কিছু বলতে থাকে তাকে, কিন্তু রাহা কি বুঝে চোখের কথা? বুঝলে তো আজ জাহান-মেহরিমার ছবি দেখে ছাদে এসে এমন হাউমাউ করে কাঁদত না।
আফিফ ভীষণ আবেগী গলায় বলে–
—আমি বুঝতে পারছি, তোমার জন্য হয়ত সবটা মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা কি জানো, এটা আমাদের ধর্মীয় কিতাবেও আছে, “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি” একটু কষ্ট করে নিজেকে গুছিয়ে নাও। উপরওয়ালা তোমার ভাগ্যেও সীমাহীন সুখ লিখে রেখেছেন। একটু ভরসা রাখো তারউপর।
আফিফের কথাগুলো রাহার কাছে ম্যাজিকের মতো কাজ করল বোধহয়। তার কান্না থেমে যায়। হঠাৎই আকাশে গুড়ুম গুড়ুম করে মেঘ ঢাকতে শুরু করে। তাদের দু’জনের সেদিকে কোন খেয়াল নেই। তারা হারিয়ে গিয়েছে একে অপরের চোখের গভীরতায়। আফিফের চোখজোড়া রাহাকে ভরসা দিচ্ছে সারাজীবন আগলে রাখার, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্ধি পাশে থাকার।
আর রাহা, রাহা বুঝে নিচ্ছে তার সুখের ঠিকানা। এরই মাঝে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে দেয়। তারা দু’জন তখনও সেখানে বসে থাকে। একে অপরের চোখে চোখ রেখে। হঠাৎই দূরে কোথাও বাজ পড়ার আওয়াজে রাহা চমকে উঠে আফিফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আফিফও আগলে নেয় স্ত্রীকে নিজের বাহুতে। তাদের বৈবাহিক জীবনের প্রথম বৃষ্টি বিলাস অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ভীষণই চমৎকার ভাবে হয়। আফিফ রাহার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–
—হাদীসে আছে, বৃষ্টির সময় করা দোয়া ফিরিয়ে দেন না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আজ একটা সুযোগ পেয়েছ। সুযোগটা হাতছাড়া করো না।
রাহা আফিফের বুক থেকে মুখ তুলে তার চোখে চোখ রাখে অবুঝের ন্যায়। সে জানত না এমন কিছু। আফিফ পলক ফেলে তাকে নিজের কথার আস্বস্ত করে। রাহা চোখ বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে করে মনে মনে বলে–
—আমি এই দুনিয়াতেই জান্নাতি সুখ পেতে চাই এই লোকটার মাধ্যমে রাব্বুল আলামিন।
রাহা তার দোয়া চেয়ে পুনরায় আফিফের বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ভীষণ স্বস্তি ও ভালোলাগার একটা জায়গা পেয়েছে সে।।
শব্দ সংখ্যা~২০৩৭
[ ১) “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি ” সূরা ইনশিরাহ: আয়াত-৬
২) দুটি সময়ে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, আজান ও বৃষ্টির সময়। (মুস্তাদরাক শরীফ, হাদীস নং-২৫৩৪)]
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]