সাঝের প্রণয়ডোর পর্ব-৪০+৪১+৪২

0
2

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪০

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দেখতে দেখতে মেহরিমা নিজের মূল্যবান অশ্রু বিসর্জন দিতে ব্যস্ত। আজ নিজের প্রতি বড়ই আফসোস হচ্ছে তার। কেন অন্যের প্ররোচনায় পড়ে সে জাহানের ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে হারিয়ে এজন্য।

জাহান রুমে এসে মেহরিমাকে দেখতে না পেয়ে একটু চমকে যায়। হাত ঘড়িতে সময় চেক করলে দেখতে পায় বারোটা বেজে বিশ মিনিট। এত রাতে কই গেলো মেয়েটা? সে তো রুমেই পাঠালো ঘুমানোর জন্য, তাহলে কি রুমে আসে নি? আসলে তো বেডেই থাকত, নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেয়। মেহরিমাকে বেডে না পেয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকালে দেখতে পায় ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ বাহির থেকে। বেলকনির লাইল নেভানো দেখে সে ধরে নেয় মেহরিমা সেখানে নেই, কারণ মেহরিমা এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারকে ভয় পায়। সে রুমে না ঢুকেই আবার বাহিরে চলে যায় মেহরিমাকে খুঁজতে। মেহরিমার ফোনটাও জাহানের কাছে, তাই ফোন করলেও সে কোথায় তা জানা যাবে না।

নিচের রিসোর্টের গার্ডেন,রিসেপশন এরিয়া ও আশেপাশে সব জায়গাতেই পালাক্রমে খোঁজ চালায় মেহরিমার। কিন্তু কোথাও নেই। এবার সে বেশ ঘাবড়ে যায়। ফোন বের করে বোনকে কল লাগায়। হায়া আর আশিয়ান তখনও ঘুমিয়ে না পড়ায় ফোনটা রিং হওয়ার সাথে সাথে রিসিভ করা হয়। এত রাতে ভাইয়ের ফোন পেয়ে হায়া একটু ভয় পেয়ে যায়। সে ভাইকে জিজ্ঞেস করে–

—কি হয়েছে বড়দা ভাই? এত রাতে ফোন দিলে যে? কোন সমস্যা হয়েছে?

জাহান উত্তেজিত হয়ে বলে–

—বনু মেহরিমাকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। ও আবার আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে মনে হয়।

শেষের কথাটা কেমন ভাঙা গলায় বলে। যেন কান্নারা ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। হায়া ধরফরিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে, তাকে এমন করে উঠে বসতে দেখে আশিয়ানও চমকে যায়। হায়া শুধু বলে–

—আমি আসছি, তুমি উল্টাপাল্টা কিছু করবে না কিন্তু ভাই।

—হুম।

হায়া ফোন কেটে দিয়ে নিজের ড্রেস ঠিক করতে করতে বেড থেকে নেমে পড়ে। আশিয়ান তসর মতিগতি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে–

—কি হয়েছে? এমন করছো কেনো হঠাৎ করে? আর জাহান ফোন দিয়ে কি বললো?

হায়া ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে–

—মেহুকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি রেডি হন, ওকে খুঁজতে বের হবো।

কথাটা বলেই হায়া ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। আশিয়ানের মস্তিষ্ক তখনও কথাটা ক্যাচ করতে পারেনি। যখন বুঝতে পারে হায়া কি বলে গিয়েছে তখন বিস্ময়ে তার চোখজোড়া বড়বড় হয়ে যায়। সেও রেডি হয়ে অপেক্ষায় থাকে হায়ার বের হওয়ার।

______________________________

হায়া-আশিয়ান দৌড়ে গার্ডেনে এসে দেখে জাহান সেখানে রাখা বেতের সোফায় বসে আছে মুখ নিচের দিকে করে দুই হাতের উপর থুতনি ঠেকিয়ে। হায়া ভাইয়ের কাছে গিয়ে ডেকে উঠে–

—বড়দা ভাই।

বোনের ডাক শুনে মাথা তুলে তাকায় জাহান। জাহানের চোখমুখের অবস্থা দেখে হায়া-আশিয়ানের মায়া হয়। চোখজোড়া লাল হয়ে অশ্রু জমে পড়েছে, যেনো গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা করছে। জাহান ভাঙা ভাঙা গলায় বলে–

—চল রিসোর্টের আশেপাশের এলাকা খুঁজে দেখে আসি, না পেলে কাল না হয় পুলিশ রিপোর্ট করব।

কথাগুলো বলতে বলতে জাহানের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আশিয়ান জাহানের পাশে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলে–

—এত ভেঙে পরছিস কেন? আর এত নেগেটিভ ভাবনাই বা করছিস কেন? থিঙ্ক পজিটিভ জাহান।

জাহান আশিয়ানের কথা শুনে ঠিকই কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এরই মাঝে জায়িন-আদিবাও ছুটে আসে। হায়াই আসার সময় তাদের জানিয়ে এসেছে। জায়িন এসেই চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে–

—ভাই, তুমি ভাবীকে সব জায়গায় খুঁজেছো?

জাহান ধরা গলায় বলে–

—হ্যাঁ। রিসোর্টের ভেতরে সব জায়গা খোঁজা শেষ। এখন বাহিরের দিকে খুঁজি। না পেলে কাল না হয়…

হায়া জাহানকে থামিয়ে দিয়ে বলে–

—পাবো না কেন? ইনশা আল্লাহ পেয়ে যাবো কালকের আগে দেখো। তুমি এসব ভেবো না তো বড়দা ভাই। চলো খুঁজতে বের হই।

জাহান না উঠে সেভাবেই বসে বলতে থাকে–

—আমার উপর অভিমান করেই মেহু কোথাও চলে গিয়েছে। মেয়েটা কথায় কথায় শুধু অভিমান করে, আর ভোগান্তি আমায় পোহাতে হয়। আমিও যে কেন ওকে তখন জেলাস ফিল করাতে গেলাম, এখন নিজের উপরই রাগ হচ্ছে ।

আশিয়ান-হায়া, জায়িন-আদিবা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারা এই বিষয়টা সম্পর্কে অবগত। কি হয়েছিলো জানতে চান? তাহলে কয়েক ঘন্টা আগের ঘটনা শুনতে হবে।

__________________________

কয়েক ঘন্টা আগে~

রাত বাড়তে থাকার কারণে তারা সকলে ভাবে ডিনার করে তারপর না হয় বাকি আড্ডা দেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা একটা টেবিল বুক করে সকলে একসাথে বসে ডিনার করার জন্য। তারা ডিনারের জন্য আসবে তখনই জাহানের হসপিটাল থেকে কল আসে। সে কথা বলার জন্য বাহিরে এসে কলটা রিসিভ করে।

সকলে খাওয়া শুরু করে দিলেও মেহরিমা তার জন্য ওয়েট করতে থাকে। পনেরো মিনিট পর জাহান আসে। একা না সাথে একজন অতিব সুন্দরী রমনীকে নিয়ে আসে। জাহানের সাথে অন্য একটা মেয়েকে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় কথা বলতে দেখে মেহরিমার প্রেমিকা সত্ত্বায় জ্বলনের সৃষ্টি হয়। সে জ্বলন ব্যথায় রূপ নেয় যখন সে খেয়াল করে মেয়েটি জাহানের বাম হাতের বাহু বেশ সুন্দর করে ধরে হাঁটছে। তাদের দেখে কিউট কাপল লাগছিলো। এমন দৃশ্য দেখে কোন স্ত্রী কি সহ্য করতে পারবে? মেহরিমাও পারেনি।

সময় যতই বইতে থাকে, মেহরিমার দীর্ঘশ্বাসগুলো আরো ভারী হতে থাকে। সহ্য করার মতো না, তাও সহ্য করতে হয় তাকে কিছু অপছন্দনীয় ঘটনাকে।

জাহানের সাথে আসা মেয়েটি নাম তাসফিয়া তারান্নুম মাহি। তাসফিয়া জাহানের কলিগ প্লাস তাদের স্যারের মেয়ে। জাহান তাসফিয়াকে ভদ্রতা সুলভ ডিনারের অফার করে , তাসফিয়া তা বিনা বাক্যে গ্রহণ করে। সে অন্য একটি টেবিল থেকে চেয়ার এনে জাহানের পাশ ঘেসেই বসে পড়ে। মেহরিমা অভিমানী চোখে সবটা দেখে, এবং এ-ও বুঝতে পারে মেয়েটি তার অঘোষিত সতীন। এক মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের চাহনি মেহরিমা ঠিকই বুঝতে পেরেছে। খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে লোকমা বানাতে বানাতে ভাবে–

—সকলের না চাইতেও সব আছে। বাবা-মা, পরিবার, স্ট্যাটাস। আর আমার নিজের বলতে এই জাহান টাই তো আছে, তাও কেন সকলের আমার টার উপরেই নজর?

তাসফিয়া জাহানের উপর বেশ দূর্বল। হবেই বা না কেনো? ছেলে হিসেবে সৎ, হ্যান্ডসাম, হাই ক্লাস ফ্যামিলির ছেলে। একটা পার্ফেক্ট ছেলের মধ্যে আর কি কি যোগ্যতা থাকতে হয় তাসফিয়া জানে না, কিন্তু তার কাছে পার্ফেক্ট ছেলে জাহান সবার আগে। বেশ কয়েকবার তাকে পটাতে চেয়েছিল তাসফিয়া, কিন্তু জাহান তো এক মেহরিমায় মত্ত তার কি আর অন্যদিকে নজর দেওয়ার সময় আছে?

জাহান সবসময় গম্ভীর, স্ট্রেটফরওয়ার্ড, স্বল্প ভাষী। সেই ছেলে আজ একটু জেঁচে বেশি কথা বলছে দেখে তাসফিয়া যেমন অবাক হয়, তেমনি খুশিও হয়। যদিপ জাহান একটু আগে মেহরিমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তার সাথে তাও তাসফিয়া আরেকবার চান্স নিতে চাইছে তাকে পটানোর।

ডিনারের মেন্যুতে ইলিশ মাছের একটা আইটেম ছিল। তাসফিয়া মাছটার দিকে বলে–

—জানো, জাহান। ইলিশ মাছ আমার ফেভারিট, বাসায় মাম্মাম রান্না করলে আমিই একা ২পিছ খেয়ে ফেলি।

—ওহহ আচ্ছা। তাহলে আজ নিচ্ছ না যে, নাও।

মাছের বাটিটা তাসফিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে জাহান। তাসফিয়া মন খারাপের ভান করে বলে–

—আমি মাছের কাটা বাছতে পারি না।

জায়িনের খাওয়া শেষ তাই সে পানি খাচ্ছিল, এমন সময় তাসফিয়ার কথা শুনে পানি তার মাথায় উঠে যায়। বলে কি এই মেয়ে? তার ভাইয়ের বয়সই ছাব্বিশ হয়েছে কিছুদিন আগে, তার মানে এই মেয়েও তার ভাইয়ের বয়সের কাছাকাছি। ছাব্বিশ বছরের একটা৷ মেয়ে নাকি মাছ বেছে খেতে পারে না। বেচারা কথাটা সহজে হজম করতে পারেনি।

তাসফিয়ার কথা শুনে আদিবা উচ্চস্বরে হাসতে থাকে পেটে হাত চেপে। এদিকে তারা একমাত্র জামাইয়ের যে নাকে মুখে পানি চলে গিয়েছে, তাকে ধরে শান্ত করবে সেদিকে তার হুশ নেই। সে তার মতো করে হেসেই চলেছে। অনেকদিন পর এমন পেট ফাটানো হাসির কথা শুনল, তাই কিছুতেই হাসিটা কনট্রোল করতে পারছে না। হায়া নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে ভাইয়ের পিঠে মাথায় ডলে দিতে থাকে। তার মুখের দিকে তাকালে যে কেউ বুঝতে পারবে সে কঠোরভাবে হাসি আটকে রেখেছে। আশিয়ানের অবস্থাও তাই।

তাসফিয়া তাদের এমন অবস্থা দেখে সহজেই বুঝে যায় তারা তার কথায় হাসছে, কিন্তু সে তেমন একটা গায়ে লাগায় না বিষয়টা। বেহায়ার মতো জাহানকে বলে–

—তুমি একটু আমার মাছের কাটা বেছে দিবে জাহান?

জাহান আঁড়চোখে ডান পাশে বসা বউয়ের দিকে তাকায়। দেখতে পায় মেহরিমা মুখ গম্ভীর করে খাবার নাড়াচাড়া করছে,কিন্তু খাচ্ছে না। কোন বউই তার স্বামীর সাথে অন্য মহিলার লুতুপুতু দেখে হাসবে না নিশ্চয়ই। জাহান বুঝতে পারে মেহরিমা জেলাস, সে ভাবে আরেকটু জেলাস করানো যাক। দেখি যদি কোন ফয়দা হয় তাহলে তো ভালোই।

জাহান তাসফিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে–

—হ্যাঁ, অবশ্যই। দাও।

তাসফিয়া তো জাহানের উত্তর শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে নিজের প্লেটটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারটাও জাহানের কাছে নিয়ে গিয়ে বসে। সকলে হাসাহাসি বন্ধ করে তাদের কাণ্ডকারখানা দেখছে। তাসফিয়া হঠাৎই খুকখুক করে কেশে উঠে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে বলে গলায় নাকি কাটা বিঁধেছে। ন্যাকা, কাটা তো জাহান বেছেই দিচ্ছিল তাহলে আবার বিঁধল কিভাবে?

জাহান তাকে পানি খাওয়ায়, নিজের হাতে কয়েক মুঠ শুকনো তরকারি ছাড়া ভাতও খাইয়ে দেয়, তারপর গিয়ে তাসফিয়ার কাটা সরে। কিন্তু এসব কাজে যে আরেকজন কতটা কষ্ট পাচ্ছে তা হয়ত তাদের ধারণাও নেই। মেহরিমা নিজের খাবারে পানি ঢেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। স্মিত গলায় বলে–

—মাথা ব্যথা করছে, ভালো লাগছে না। আমি রুমে যাচ্ছি।

বউয়ের মাথা ব্যথা শুনে জাহানও আর বসে থাকতে পারে না, সেও তার সাথে আসতে চায়। কিন্তু মেহরিমা খেয়াল করে জাহান তেমন কিছুই খায়নি তাসফিয়াকে মাছ বেছে দেওয়ার চক্করে। সে জাহানকে বলে–

—আপনার আসা লাগবে না। আমার কাছে মুভ আছে সেটা লাগিয়ে নিলেই সেরে যাবে। আপনি খাবার খান, কিছুই তো খাননি।

জাহান তাও জোর করে যেতে চায় তার সাথে কিন্তু এর মাঝেও তাসফিয়া তার বাম হাতটা ঢুকিয়ে দেয়। সে বলে খাওয়ার পর তার নাকি তাদের পরবর্তী অপারেশন টা নিয়ে কি আলোচনা আছে। জাহান অগ্যাত বউকে একাই রুমে পাঠিয়ে দেয়। মেহরিমার সাথে অবশ্য বাকিরাও নিজেদের রুমে এসেছিল, কিন্তু আশিয়ান ও জায়িনদের রুম জাহানদের রুমের উল্টোদিকে। তাই তাদের রুমের বাক আসায় তারা নিজেদের নিজেদের রুমে চলে যায়। হায়া মেহরিমার সাথে যেতে চাইলেও মেহরিমা তাকে আশিয়ানের সাথে পাঠিয়ে দেয় তাদের রুমে।

_________________________

বর্তমান~

জাহান দূর্বল পায়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রশ্ন যখন ভালোবাসার মানুষটির তখন সবাই দূর্বল হয়ে পড়ে। জাহান হায়া আর আদিবাকে বলে–

—তোমরা দু’জন রিসোর্টেই থাকো, আমরা তিনজন যাচ্ছি মেহরিমাকে খুঁজতে। এর মধ্যে ও এসে পড়লে আমাদের ফোন দিয়ে জানিও।

হায়া আর আদিবা তার কথায় সম্মতি দিলে তারা তিনজন বের হয়ে পড়ে। তিনজন তিনটে আলাদা ডাইরেকশনে খুঁজতে চলে যায়। জাহান মেহরিমা নাম ধরে ডাকত ডাকতে খুঁজতে থাকে। কিন্তু তার পাওয়া যায় না। প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুজির পর তাদের তিনজনকেই ফোন দিয়ে রিসোর্টে ফিরে যেতে বলে হায়া। তার কথা মতো তিনজনেই রিসোর্টে এসে দেখে হায়াদের সাথে মেহরিমাও আছে। জাহান আশেপাশের কাউকে তোয়াক্কা না করেই সকলের সামনে মেহরিমাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে।

আশিয়ান-জায়িন হায়াকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করে কোথায় ছিল সে। হায়া তাদের জানায়–

— মেহরিমা নাকি রুমেই ছিলো, কিন্তু বেলকনিতে। ভাইয়া হয়ত বেলকনি চেক করেনি, কারণ তখন মেহু বেলকনি অন্ধকার করে বসেছিল। ভাইয়া তো জানে মেহু অন্ধকারে থাকতে পারো না তাই ভেবেছে মেহু জয়ত বেলকনিতেও নেই আর ও রাগ করে কোথাও একটা চলে গিয়েছে। এত রাত হয়ে যাওয়ার পরও ভাইয়া রুমে যাই নি দেখে, রিসেপশনে আসলে আমাদের সাথে ওর দেখা হয়। তারপরই আপনাদের আসতে বলি ফোন দিয়ে।

সবকিছু শুনে আশিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার থেকেও বড় বউপাগল তার শালা। আশিয়ান হায়া’কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসে। হায়ার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে–

—আমায় বউপাগল বলো, দেখো তোমার ভাই আমার থেকে বড় বউপাগল। বউকে না পেয়ে আমাদের সকলকে সহ খুঁজিয়েছে, তাহলে বুঝো বউয়ের প্রতি তার উন্মাদনা কতটা।

হায়া কোণা চোখে বরকে একবার দেখে নেয়। সময়-সুযোগ মতো পিঞ্চটা মেরে আশিয়ান দাঁত কেলিয়ে হাসছে। হায়া কোন প্রতিত্তোর না করে আশিয়ান থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রুমের দিকে হাঁটা দেয়। আশিয়ানও বউয়ের পেছন পেছন যেতে থাকে। জায়িন-আদিবাও নিজেদের রুমের দিকে হাটা দেয়। জায়িন রুমে যেতে যেতে আদিবার দিকে একটু ঝুঁকে এসে তার কানে কানে বলে–

—আব তুমহারা কেয়া হো গা বেব? তখন একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলে, এখন গিয়ে আগে ফোনগুলো বন্ধ করবো তারপর তোমার মুখ। আর ইউ রেডি জান?

আদিবা ভয়ে নিজের হাঁটা থামিয়ে জায়িনের দিকে তাকালে দেখতে পায় জায়িন কেমন অদ্ভুত ভাবে হাসছে। তার ওমন হাসি দেখে আদিবার গলা শুঁকিয়ে যায়। আদিবাকে আরো চমকিয়ে দিয়ে জায়িন হুট করে তাঁকে কোলে তুলে নেয়, হাঁটতে হাঁটতে বলে–

—থাক জান, একটু পর কত কষ্ট করা লাগবে। তাই তোমায় আর কষ্ট করে হেঁটে রুমে যাওয়া লাগবে না। আমিই নিয়ে যাচ্ছি।

তার কথা শুনে আদিবার ভয় আরো বেড়ে যায়। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–

—আমি তোমার সাথে যাবো না জায়িন ভাই।

আদিবার মুখে “ভাই” ডাক শুনে জায়িনের মেজাজ গরম হয়ে যায়। সে গম্ভীর গলায় বলে–

—আজ তুই রুমে চল শুধু। তোর ভাই বলা ছুটাচ্ছি।

____________________________

মেহরিমার মাথাটা জাহান নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। মেহরিমা জাহানের বুকে কান পাতলে শুনতে পায় জাহানের হার্টবিটের দ্রুত গতিতে চলার আওয়াজ। হুট করে জাহান মেহরিমাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে তার দুই বাহু চেপে ধরে বলে–

—এই কোথায় গিয়েছিলি? কাকে বলে গিয়েছিলি? আমায় এত কষ্ট দেস কেন? এমন তিলে তিলে কষ্ট না দিয়ে একবারে মেরেই ফেল। এই কষ্ট আমি আর নিতে পারছি না। কোথায় গিয়েছিলি বল?

মেহরিমা বিষাদী কণ্ঠে বলে–

—আমি তো রুমেই ছিলাম, বেলকনিতে।

—এত রাতে অন্ধকার বেলকনিতে কি করছিলি?

—ভালো লাগছিলো না কিছু তাই দাঁড়িয়ে ছিলাম।

মেহরিমা মাথা নিচু করে কথাগুলো বলে। জাহান তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে আর কিছু বলতে পারে না। তার হাত ধরে রুমে নিয়ে আসে। রুমে এসে মেহরিমাকে ছেড়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হওয়ার পরও দেখে মেহরিমাকে যেখানে দাড় করিয়ে রেখে গিয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে তখনও। জাহানের কপালে ভাজ পড়ে তাকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে মেহরিমাকে কিছু বলবে তার আগেই মেহরিমা এমন কিছু কথা বলে তা শুনে জাহানের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়।

শব্দসংখ্যা~২০২৩
চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪১

জাহানের কপালে ভাজ পড়ে মেহরিমাকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে মেহরিমাকে বলে–

—কি হয়েছে আবার? না ঘুমিয়ে দাড়িয়ে আছো কেনো?

মেহরিমা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে তখনও। হাত দুটো এমন ভাবে মোচড়ামোচড়ি করছে মনে হয় ছুটিয়েই ফেলবে কব্জি থেকে। জাহান তার অঙ্গ ও মুখভঙ্গি সূক্ষভাবে খেয়াল করে। এমনটা মেহরিমা তখন করে যখন যে কিছু বলতে চায়, কিন্তু বরাবরই তার ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের জন্য বলতে পারে না। মেহরিমা তার মনের কথাগুলো খুব কমই প্রকাশ করে।

ছোট থেকে অনাদর, অবহেলায় বড় হওয়ায় নিজেকে সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মনে মনে। হায়ার সাথে কিভাবে কিভাবে জানি ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গিয়েছিল, তারপর থেকে মেয়েটা একজন কথা বলার সাথী পেয়েছিল। হায়া’কে সে তার মনের সব ধারণা, চিন্তা, কথা না বললেও জাহানের থেকে যথেষ্ট বেশি কথা সে হায়ার সাথে শেয়ার করে। জাহান চায় মেহরিমা তাকে হায়ার মতোই প্রায়োরিটি দিক, তার সব গুরুত্বপূর্ণ বা অগুরুত্বপূর্ণ কথা, কাজ, চিন্তাভাবনা মেহরিমা তাকে নির্দ্বিধায় বলুক। সে মেহরিমাকে কয়েক হাজার বার বলেছে তার মনের ছোট থেকে ছোট কথা মেহরিমা যেনো বিনা সংকোচে তাকে বলে। কিন্তু মেহরিমা তো মেহরিমাই।

জাহান তোয়ালেটা হাতে রেখেই বুকে হাত গুঁজে সিনা টানটান করে মেহরিমার একদম সামনে দাঁড়ায়। মেহরিমা তাকে নিজের অতি কাছে দেখে চমকে গিয়ে পেছনে সরে যেতে নিলে জাহান গম্ভীর গলায় বলে–

—খবরদার সরবে না। কি বলবে এভাবেই বলো। যদি সরো তাহলে খবর আছে।

মেহরিমা জাহানের এমন গম্ভীর গলা শুনে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে যায়। সে নিচের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বলে–

—আপনি বেডে ঘুমান, আমি সোফায় ঘুমাচ্ছি। আমি এমন কেউ নই, যার জন্য আপনাকে কষ্ট করতে হবে রোজ রোজ।

একটু আগে জাহানের মাথা যাও একটু ঠাণ্ডা হয়েছিল কিন্তু মেহরিমার এই কথা শুনে আবার দপ করে গরম হয়ে যায়। এমন কেউ না মানে? মেহরিমা বউ হয় জাহানের, তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম একজন, তাহলে এমন কেউ হলো না কিভাবে? এই মেয়ে কি সারাজীবন নিজের এই বোকা বোকা কথা ও কাজ দিয়েই জাহানকে চটিয়ে রাখবে? এমনিতেই তার পূর্বের কাজের জন্য যে জাহান অভিমান করে আছে সেটা ভাঙানোর নাম নেই এখন আবার কিসব উল্টোপাল্টা বলছে। মেহরিমা যদি এমনই করতে থাকে, তাহলে তারা ভালোবাসা বাসি করবে কবে? ফুটবল টিম বানাবে কবে? জাহানের যে পুরো ১১জনের একটা ফুটবল টিম চাই, তার পারসোনাল ফুটবল টিম।

মেহরিমা কথাটা বলে জাহানের দিকে না তাকিয়ে বেডের থেকে একটা বালিশ নিয়ে সোফার দিকে হাঁটা দেয়। বোকা মেয়েটা যদি শান্ত জাহানের রাগান্বিত মুখশ্রী একবার দেখত তাহলে হয়ত বুঝতে পারত সে কতবড় একটা ভুল করে ফেলেছে।

মেহরিমা বালিশ রেখে যেই না শুতে যাবে তখনই জাহান চিলের মতো ছো মেরে মেহরিমাকে কোলে তুলে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে বেডের কাছে এসে তাকে ধপ করে ফেলে দেয় বেডের উপর। বেডটা যদিও তুলতুলে নরম তাও হুট করে কিছুটা উপরে পড়ায় সে হালকা একটু চোট পায়। মেহরিমা কোমড় চেপে ধরে ককিয়ে বলে উঠে

—আল্লাহ গোো, আমার কোমড় গেলো রেেেে….

জাহান তার ব্যথার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে তার মুখের কাছে ঝুঁকে এসে মেহরিমার থুতনি দুই আঙ্গুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে–

—যাক শেষ হয়ে তোর কোমড় আর পা। পরে আমার কোলে করে সব জায়গায় যাবি, ঘুরবি। বেশি বড় হয়ে গিয়েছে তোর পা। একবার আমায় ছেড়ে যেতে চাস আরেকবার বেড ছেড়ে সোফায় থাকতে চাস। একবার যদি তোকে ধরি না মেহরিমা, একদম চাবানো ছাড়া আস্ত গিলে ফেলবো। জন্মের মতো ছেড়ে যাওয়া বের করে দিবো, আমার খারাপ রূপটা দেখিস নি এখনও তুই।

থুতনির ও কোমড়ের ব্যথা তারউপর মনের ব্যথা তো আছেই, সব ব্যথায় মেহরিমা একদম ভেঙে পড়তে চায়। এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্নাটা আর চেপে রাখতে পারে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আর বলতে থাকে–

— ধরেন না, ভালো করেই ধরেন। বিয়ের এতগুলো দিন হয়ে গিয়েছে একবারও ধরেছেন? ধরবেন কেনো? মাথায় তো এখনও রাগ চেপে আছে। আরে ভাই একটা ভুল করে ফেলেছি, ছোট মানুষ ভেবে মাফ করে দেন না। তা না, খালি বকেন, চোখ গরম করেন, দূরে দূরে থাকেন। ভাল্লাগে না আপনার এই দূরত্ব। এ্যা….এ্যা…..

চোখ দুই হাত দিয়ে কচলাতে কচলাতে বাচ্চাদের মতো ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে থাকে মেহরিমা। মেহরিমার এমন কান্না আর আচরণ দেখে জাহান থতমত খেয়ে যায়। মেহরিমার থুতনি ছেড়ে তার উপর থেকে সরে আসতে নিবে তখনই মেহরিমা তার কলার চেপে ধরে তাকে আবারও নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসে। একবার নাক টেনে বলে–

—মাফ করে দেন না জাহান। ভুল করে ফেলেছি, আর কখনো এমন বোকামি করবো না। প্রমিজ করছি, আর রাগ করে থাকবেন না। আমার কষ্ট হয় তো রে বাবা!!!

ইশশশশ রে! এত কিউট করে বললে কে রাগ করে থাকতে পারবে? তারউপর মেহরিমা আজ প্রথমবারের মতো তার নাম ধরে ডাকল। জাহান চোখ বড় বড় করে মেহরিমাকে দেখছে। এই মেয়ের যে এত কিউট একটা রূপও আছে সেটা তাদের দেড় বছরের সম্পর্কে অজানা ছিলো। জাহান পলকহীন ভাবে মেহরিমাকে দেখতে থাকে।

কয়েক মিনিট অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরও জাহান যখন কিছু বলছে না তখন মেহরিমা কান্না কোনমতে থামিয়ে তার চোখে চোখ রাখে। মেহরিমা আবারও মোহনীয় গলায় বলে উঠে–

—জাহান কিছু বলুন।

হুট করে জাহানের কি যেনো হলো, সে মেহরিমার হাতজোড়া নিজের কলার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হনহনিয়ে বেলকনিতে চলে যায়। তার যাওয়া দেখে মেহরিমা আবারও কেঁদে দেয় সশব্দে। তার এমন ভাবে ছেড়ে যাওয়া মেহরিমার হৃদ কষ্টটাকে আরো বাড়িয়ে দিলো। মেহরিমা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, সে যখন জাহানকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তখন জাহানের কেমন লেগেছিল। সে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে।

বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পর জাহান যখন মেহরিমার কান্নার আওয়াজ আর পাচ্ছিল না তখন সে বেলকনিতে দাঁড়িয়েই উঁকি দেয়। দেখতে পায় মেহরিমা নড়চড় বিহীন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে আরো কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়েই মেহরিমাকে দেখতে থাকে।

রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় সে নিঃশব্দ পায়ে রুমে আসে। বেডের কাছে এসে আলতো হাতে মেহরিমাকে টেনে সোজা করে শোয়ায়। যেভাবে বাকা ত্যাড়া হয়ে শুয়ে আছে, সেভাবে সারারাত থাকলে সকালে শরীর ব্যথায় চিৎপটাং হয়ে থাকবে। তাদের আর বাসায় ফেরা লাগবে না।

মেহরিমাকে ভালো করে শুয়ে দিয়ে জাহানও তার পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। হাতের উপর মাথা রেখে একধ্যানে দেখতে থাকে তার ভালোবাসাকে। ছোঁয়ার আগেই ভালোবাসা যে গভীর হতে পারে, তার নিখুঁত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে জাহান। তার দৃষ্টি যেন নিঃশব্দ কোনো কবিতা, যার প্রতিটি পঙক্তি নিবিষ্টভাবে পড়ছে মেহরিমার চোখের পাতায় জমে থাকা নীরব অশ্রুবিন্দুর উপর। কখনও চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে তার মুখশ্রীর প্রতিটি রেখায় যেখানে একাকিত্বের কালিতে লেখা এক বিষণ্ন মহাকাব্য।

জাহান চাইলেই এই মুহূর্তে মেহরিমাকে নিজের করে নিতে পারে। এবং এও জানে, মেহরিমার মনেও নেই কোনো বাধা, নেই কোনো সংশয়। বরং সে নিজে থেকেই সঁপে দিতে চায় নিজেকে এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে। তবু জাহান থেমে থাকে। ছুঁয়ে দিতে পারার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে স্পর্শ করে না। কারণ তার ইচ্ছা মেহরিমা আরেকটু উপলব্ধি করুক সেই ব্যথার গভীরতার, যা ফেলে যাওয়া একজন মানুষের অনুপস্থিতি সৃষ্টি হয়।

তারপর, ঠিক তারপর নিজের ভালোবাসার সমস্ত আলোকচ্ছটা দিয়ে সে মেহরিমাকে আগলে নেবে। জাহান চায় মেহরিমার জীবনজুড়ে জমে থাকা না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাসগুলো সে মুছে দিতে। যত্নে, স্নেহে, আর অপার মমতায় বোনা এক অনন্ত আশ্রয়ে তাকে ঢেকে দিতে—যেখানে ব্যথার, অবহেলার, অনাদরের আর কোনো ঠাঁই নেই। আছে কেবল ভালোবাসা, অনুরাগ আর চিরস্থায়ী নৈঃশব্দ্যের মাঝে জেগে থাকা এক নিরন্তর প্রতিশ্রুতি।

জাহান নিজের হাতটা মেলে দিয়ে মেহরিমাকে সেই হাতের উপর শুয়ে দেয়। তারপর চার হাত-পা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মেহরিমাকে। তার বউ প্রথমবারের মতো একটা আবদার করেছে সে তা পূরণ না করে পারে বুঝি? মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরার পর যেনো জাহানের নিজের করা সব প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়তে চাইছে। মেয়েটাকে একটু স্পর্শ করার পরই তার মন চাইছে, তাকে একদম নিজের বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে নিতে। সে ঘোরের মধ্যে থেকেই আরো শক্ত করে মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরলে মেহরিমা ঘুমের মধ্যেই গুঙিয়ে উঠে।

তার গুঙানোর আওয়াজে জাহানের ঘোর ভাঙে। সে নিজের হাত-পায়ের বাঁধন গুলো কিছুটা হালকা করে কিন্তু একেবারে ছেড়ে দেয় না। নিজের মুখ এনে মেহরিমার চুলের ঘ্রাণ শুঁকতে থাকে। যতই তার কালোকেশের সুবাস নেয় ততই যেনো তার প্রতিশ্রুতি গুলো তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়ে যেতে যায়। সে মেহরিমাকে তো বলেই ছিলো একবার –

—তোমার এই সামান্য উপস্থিতিতেই যদি আমার ভিতর এমন ঝড় ওঠাতে সক্ষম হয়, তবে ভেবে দেখো যেদিন তোমায় হালালভাবে স্পর্শ করবো, সেদিন আমার অবস্থা ঠিক কেমন হবে! মেহু, এই অল্পস্বল্প স্পর্শে আমার মন ভরবে না।
যেদিন তোমায় আপন করে কাছে টানব, তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমার নাম মিশে যাবে। শুধু নামহীন ছোঁয়া থাকবে না, থাকবে ভালোবাসাময় অধিকার…
তোমার চোখে, তোমার চুলে, তোমার অস্তিততে আমি আমার ছায়া রাখতে পারব, সেদিন আমার ভেতরে চলতে থাকা তাণ্ডব শান্ত হবে।

নাহ, জাহান আর ভাবতে পারছে না। তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুমাতে হবে। নাহলে কখন জানি মেহরিমার ঘুম ভাঙিয়ে তাঁকে নিয়ে পাড়ি দেয় ভালোবাসার জগতে। জাহান মেহরিমার চুলে মুখ গুঁজেই চোখ বন্ধ করে। ঘুমের নাম-নিশানাও চোখের ত্রিসীমানায় নেই, তাও ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।

সময়ের ব্যবধানে জাহান একসময়ে ঘুমিয়েও পড়ে। জাহানের গাঢ় হয়ে আসা নিঃশ্বাস ও হাত-পায়ের বাঁধনগুলো যখন আরেকটু ঢিলে হয়ে আসে তখনই মেহরিমা বুঝতে পারে জাহান ঘুমিয়ে পড়েছে। সে আস্তে আস্তে নিজের মাথাটা উঠিয়ে জাহানের দিকে তাকায়। হ্যাঁ, মেহরিমা ঘুমায় নি। ঘুমায়নি বললে ভুল হবে, ঘুমিয়েছিল কিন্তু জাহান যখন বেলকনি থেকে এসে তাকে ঠিক করে শোয়ালো তখনই তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আসলে মেহরিমার ঘুম অনেক পাতলা। সে ঘুমন্ত অবস্থায় যদি কেউ তার আশেপাশে হাঁটাচলাও করে তাহলেও তার ঘুম ভেঙে যায়। আর আজ সেখানে জাহান তো তাকে নিয়ে কত টানাহেঁচড়ার করল।

মেহরিমা দুরুদুরু বুকে নিজের মাথাটা আরেকটু উঠিয়ে তার মুখটা এগিয়ে নিয়ে যায় জাহানের মুখের কাছে। একবুক সাহস নিয়ে সে নিজের কোমল ওষ্ঠজোড়া আলতো করে ছুঁয়ে দেয় জাহানের দাড়িতে ঢেকে থাকা থুতনিতে।

জাহান যেমন আজ প্রথমবারের মতো মেহরিমাকে এতটা গভীর ভাবে স্পর্শ করল, মেহরিমাও তার জীবনে প্রথমবারের মতো কোন পুরুষকে তার ভালোবাসাময় স্পর্শ দিল। দুইজনই দু’জনার স্পর্শে শিহরিত হয়ে কিছুটা কেঁপে উঠে। মেহরিমা মাথা নামিয়ে পূর্বের জায়গায় শুয়ে পড়ে। নিজেও হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে তার ভালোবাসার পুরুষ টিকে। খানিক মান-অভিমান ও নিজেদের বুকে একে অপরের জন্য অসীম ভালোবাসা নিয়ে দু’জনই নিদ্রাদেবীর কোলে ঠায় নেয়।

শব্দসংখ্যা~১৫০০
চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪২

[পর্বটা রোমান্টিক। যাদের রোমান্স পছন্দ না তারা প্লিজ স্কিপ করবেন]

প্ল্যান অনুযায়ী পরেরদিন সকালে আশিয়ানরা ফিরে আসে। সকলে আগের রুটিন মোতাবেক কাজবাজ শুরু করে দেয়। আশিয়ান,জাহান, জায়িন তিনজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কর্মে। তাদের রমণীগণ আপাতত ছুটিতে আছে।

জাহান আর মেহরিমার সম্পর্কের মলিনতা খানিকটা দূর হয়েছে। জাহান এখন বেডেই ঘুমায়। মেহরিমার তার কাজকর্ম দিয়ে প্রতিনিয়তই জাহানকে বুঝানোর চেষ্টা করে সে অনুতপ্ত তার করা কর্মের জন্য এবং জাহান যাতে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে পুনরায় নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেয়। কিন্তু জাহান সব বুঝেও যেনো অবুঝ।

_____________________

হায়া আশিয়ানের মধ্যে সেদিন রিসোর্ট থেকে ফিরে আসার পর থেকে নিরব মান-অভিমান চলছে। এর শুরুটা অবশ্যই নাটেরগুরু হায়া করেছে। হায়া ঘুরে আসার পর থেকে বায়না ধরেছে তার বেবি চাই। প্রথম বার কথাটা শোনার পর আশিয়ান ঘণ্টাখানেক থ মেরে বসে ছিলো। মানে কি ভাই? বেবি কি বাজারে বেচে নাকি যে চাইলো আর আশিয়ান কিনে এনে তার কোলে দিয়ে দিলো? একটা বেবিকে পৃথিবীতে আনতে কতগুলো প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেই সাথে সময়ও লাগে। হায়ার কথা হলো তার নাকি তার বান্ধবীদের থেকে আগে বেবি হওয়া চাই। তাহলে সে তার বান্ধবীদের মেয়েদের সাথে তার ছেলেদের বিয়ে দিতে পারবে। এসব কথা শুনে আশিয়ান একটুর জন্য অজ্ঞান হতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিয়েছে।

আশিয়ান হায়ার এখন বেবি নেওয়া নিয়ে অসম্মতি জানিয়েছে। সে সাফসাফ বলে দিয়েছে–

—গ্র্যাজুয়েশনের আগে কোন বেবি-টেবি প্রশ্নই আসছে না।

হায়াও সাফসাফ তার মতামত দিয়েছে যতদিন না আশিয়ান হায়াকে বেবি নিতে সম্মতি দিচ্ছে ততদিন যেনো আশিয়ান ভুলেও হায়াকে স্পর্শ না করে। হায়া ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে স্পর্শকে নিজের টিমে করে নিয়েছে। আবরারকেও খানিকটা হাত করে নিয়েছে নাতি-নাতনিদের সাথে খেলা করার লোভ দেখিয়ে। সকলে প্রায় একজোট হয়ে আশিয়ানকে মানানোর মিশনে নেমেছে।

________________________

আশিয়ানের আজ ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। বাসায় এসে কলিংবেল দিতেই প্রতিদিনের মতো হায়া দরজা খুলে দেয়। সারাদিন পর ভালোবাসার মানুষটিকে দেখে আশিয়ানের সব ক্লান্তি যেনো নিমিষেই দূর হয়ে যায়। তার মনটা ভীষণ করে চাইছে হায়াকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ঘণ্টাখানেক বসে থাকতে, কিন্তু আশিয়ান তা করতে পারছে না। হায়া দরজা খুলে দিয়েই কিচেনের দিকে চলে যায়। আশিয়ান তার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটা দেয়।

রুমে যেতে যেতে খেয়াল করে আজ বাড়িটা একটু বেশিই চুপচাপ ও শান্ত। নিচে তার বাবা-মাকেও দেখে নি। আশিয়ানের মনে প্রশ্ন জাগে–

—আম্মু আর বাবা কি বাড়িতে নেই? এত রাতে কোথায় গেলো তারা তাহলে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা নেই আশিয়ানের। রুমে এসে অফিস ব্যাগ রেখে পকেট থেকে ওয়ালেট ও হাত ঘড়ি খুলে ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখে। তখনই দরজায় নক পড়ে। আশিয়ান বুঝতে পারে হেল্পিং হ্যান্ড খালা এসেছে, হায়া আসলে পারমিশন নিতো না। আশিয়ান তাকে ভেতরে ঢোকার পারমিশন দিলে, খালা ভেতরে প্রবেশ করে হাতে থাকা সরবতেই গ্লাসটা আশিয়ানকে দেয়। আশিয়ান গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে খালাকে জিজ্ঞেস করে–

—খালা আম্মু আর বাবাকে নিচে দেখলাম না যে? তারা কি বাসায় নেই?

—না আশিয়ান আব্বা। ম্যাডাম আর স্যার তো ঐবাড়ি গেছে। পরশু নাকি জাহান আর জায়িন বাবাগো বইভাত হেই লেইগা।

—ওহহ আচ্ছা।

খালা চলে যায়। আশিয়ান সরবতটা শেষ করে টাউজার ও টাওয়াল নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। আশিয়ান ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে হায়া তার ফেলে যাওয়া নোংরা কাপড়গুলো বাস্কেটে রাখছে আর টুকটাক ঘরদোর গুচাচ্ছে। আশিয়ান ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার মাধ্যমে হায়াকে দেখতে থাকে। মুখটা গোমড়া করে রেখেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই আশিয়ান খেয়াল করছে হায়া তার সমানেই মুখটা এমন গম্ভীর করে রাখে।অন্যদের সাথে হেসেখেলে কথা বললেও আশিয়ানের সময়ই ব্যতিক্রম।

আশিয়ান ভালো করেই জানে, হায়া এমন করছে যাতে আশিয়ান হায়ার মলিনতা সহ্য করতে না পেরে হায়ার কথায় রাজি হয়ে যায়। কিন্তু এবার আশিয়ানও কঠিন ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হায়ার কোন ট্রিকসেই গলবে না। এমনিতেই হায়া পড়ালেখায় মহা ফাঁকিবাজ। পরীক্ষার সময় ছাড়া পড়তেই বসে না। এখন যদি বাচ্চা নিয়ে নেয় তাহলে তো পড়ালেখা একদমই ছেড়ে দিবে। সে একটা ভার্সিটির প্রফেসর হয়ে তার বউ কিনা গ্র্যাজুয়েশনটাও শেষ করবে না? এটা যে তার জন্য বড়ই লজ্জার বিষয়।

আশিয়ান মুখে ক্রিম মাখতে মাখতে আয়নায় পুনরায় নজর দিলে দেখতে পায় হায়া নেই। তার কপালে ভাজ পড়ে। এই মাত্র না এখানে ছিলো? তাহলে হঠাৎ করে কি গেলো? হঠাৎ হায়া বলে উঠে–

—আমাকে দেখা শেষ হলে নিজে আসুন, ডিনার রেডি।

কথাটা বলে ভাব দেখিয়ে নিচে চলে যায়। আশিয়ান টি-শার্ট গায়ে দিয়ে নিচে এসে ডিনার করে নেয় তারা। আশিয়ান ডিনার সেরে উপরে চলে গেলেও হায়া নিচে রয়ে যায় টেবিল গুছাতে। আশিয়ান রুমে এসে ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কিছু কাজ করতে থাকে। হায়া একটু পর রুমে এসে তার বালিশটা হাতে নিয়ে বাহিরের দিকে যেতে যেতে বলে–

—আমি গেস্ট রুমে যাচ্ছি। কিছু প্রয়োজন হলে ডাক দিয়েন।

কথাটা বলে আশিয়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহনিয়ে বের হয়ে যায়। আশিয়ান বেআক্কলের মতো বসে থাকে। বিষয়টা বুঝতে তার কিছুক্ষণ সময় লাগে, কিন্তু ততক্ষণে হায়া রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। আশিয়ান নিজেকে ধাতস্থ করে উঁচু গলায় বলে–

—হ্যা যাও যাও। এখন তো আর আমাকে ভালো লাগে না, সব ভালোলাগা ভালোবাসা বেবির জন্যই। পঁচে গিয়েছি না আমি। দিবো না বেবি, গ্র্যাজুয়েশনের পরও দিবো না। যখন আমার মন চাইবে তখন দিবো।

কথাগুলো বলে একা একাই ফুস ফুস করতে থাকে। তারপর রাগ নিয়েই নিজের কাজে মন দেয়৷ কিন্তু বেশি একটা করতে পারে না। এরই মাঝে ধরণী কাঁপিয়ে বজ্রপাতের সাথে বৃষ্টি নামতে শুরু করে।

ল্যাপটপের কি-বোর্ডে হাত চালাতে চালাতে হঠাৎই আশিয়ানের মনে পড়ে যায় হায়া বজ্রপাতে ভয় পায়। সে ল্যাপটপটা তাড়াতাড়ি ফেলেই দৌড় দেয় গেস্টরুমের দিকে। গেস্টরুমের দরজায় কয়েকবার নক করার পরও যখন হায়া দরজা খুলে না তখন সে নিজেই লক মুচড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। রুমে এসে আশিয়ানের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। কেনো? কারণ রুমে হায়ার ছায়া পর্যন্ত নেই।

আশিয়ান ওয়াশরুম চেক করে দেখে সেখানেও নেই। সে এবার ভয় পেয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি করে বাড়ির অন্য রুমগুলো খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও পায় না। সে এই বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে বাহিরে আসে দারোয়ানের কাছে। বৃষ্টি নামার কারণে দারোয়ান চাচা তখন মেইন গেইটের পাশে তার ছোট্ট ঘরটায় অবস্থান করছেন।আশিয়ান ভীত ও তটস্থ গলায় দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে–

—চাচা হায়া কি বাহিরে গিয়েছিল?

দারোয়ান চাচা বলে–

—না আশিয়ান আব্বা, হায়া মামুনি তো কুনোহানে যায় নাই।

—আপনি নিশ্চিত তো চাচা?

—হ আব্বা। এহান থেকা দরজার পর্যন্ত সব দেহা যায়। কেউ গেলে বা হায়া মামুনি গেলে আমি অবশ্যই দেখতাম।

আশিয়ান কিছুটা আশা ও খানিকটা হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরে আসে। আশা এই জন্য যে, হায়া বাসার থেকে বাহিরে বের হয়নি। কি হতাশার কারণ, সে জানে না হায়া কোথায়। হঠাৎই আশিয়ানের মনে পড়ে সে ছাঁদে দেখতে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে কি হায়া গিয়েছে ছাঁদে? প্রশ্নটা মনে চেপেই আশিয়ান ছাঁদের দিকে পা বাড়ায়।

_____________________________

ছাদে এসে আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। যাকে খুঁজে খুঁজে আশিয়ান তার প্রেশার বাড়িয়ে ফেলছে সে কিনা এখানে সুন্দর বৃষ্টি বিলাশ করছে? আশিয়ানের প্রচন্ড মেজাজ গরম হয়ে যায়। সে বড়বড় পা ফেলে হায়ার কাছে এসে তার পেছনে দাঁড়ায়। ধমক দিয়ে বলে–

—এই ইডিয়েট, এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজছো কেনো? তোমার যে ঠাণ্ডার সমস্যা আছে ভুলে গিয়েছো?

আকস্মিক কারো ধমকে হায়া খানিকটা চমকে গেলেও সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেয়। সে পেছনে ঘুরে আশিয়ানের দিকে তাকায়। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিতে ভুলে না।

আশিয়ান হায়ার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে তার মাথা ঘুরে যায়। হায়া হোয়াইট কালারের সিল্কের শাড়ি পড়ে আছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজার কারণে হায়ার শরীরের সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম জায়গা দৃশ্যমান। ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে হায়াকে। হায়াকে এই অবস্থায় দেখে আশিয়ানের পুরো শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। কেমন একটা ঘোরে চলে যায় সে। হায়ার শরীর থেকে চোখ সরিয়ে তার চোখে চোখ রাখলে হায়ার দুষ্টুমি বুঝতে পারে। তাকে কাবু করার জন্য হায়া এসব করেছে সেটা আশিয়ান খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। আশিয়ানও না চাইলে তার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছে। আশিয়ান তার দুষ্টু নজর দেখে গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে–

—একটা কথা ব্যয় ব্যতীত চুপচাপ রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করো যাও। আমি কিন্তু ভীষণ রেগে যাচ্ছি।

হায়া তার কথা শুনে হেসে দেয়। সে আশিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে তার হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে ফেলে দেয়। বৃষ্টির পানি মুহূর্তেই ভিজিয়ে দিতে থাকে আশিয়ানকেও। হায়া আশিয়ানের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে, তারপর আশিয়ানের এক গালে নিজের অধরের গভীর স্পর্শ দেয়। আশিয়ানের পুরো শরীর সিরসিরিয়ে উঠে। সে খপ করে হায়ার কোমড় আঁকড়ে ধরে হায়াকে টেনে নিজের আরো কাছে নিয়ে আসে। হায়া নিজের প্ল্যান সাকসেসফুল হতে দেখে নিজের উপরই প্রসন্ন হয়।

হায়া একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে–

—রাগ কমেছে?

আশিয়ান কোন জবাব দেয় না। হায়া আশিয়ানের অপর গালটিতেও ভালোবাসার স্পর্শে সিক্ত করে দেয়। পূর্বের ন্যায় জিজ্ঞেস করে এবারও, কিন্তু এবারও আশিয়ান কোন জবাব দেয় না। হায়া তার কাজটা ক্রমাগত করতে থাকে। একসময় আশিয়ানও নিজের উপর থেকে কন্ট্রোল হারাতে থাকে। আশিয়ানের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে সে নিজেও হায়াকে নিজের ভালোবাসার স্পর্শ দিতে থাকে। হায়া স্বামীকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে তার আদরে সাড়া দিতে থাকে।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভেজার কারণে হায়ার শরীরে ঠাণ্ডায় কাঁপন শুরু হয়ে যায়। আশিয়ান হায়ার কাঁপন টের পেয়ে তাকে কোলে তুলে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটা শুরু করে। রুমে এসে বেডে বসিয়ে হাত বাড়ায় হায়ার কাধের আঁচলে। হায়া তৎক্ষণাৎ তার হাতটা ধরে ফেলে। ক্ষীণস্বরে বলে–

—নো বেবি, নো টাচ।

হায়ার কথা শুনে আশিয়ানের শান্ত, সুন্দর মুড টার বারোটা বেজে যায়। সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে কতক্ষণ হায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর হায়ার সামনে থেকো চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে হায়া হুড়মুড়িয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। আশিয়ান তাকে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে আর গম্ভীর গলায় বলে–

—ছাড়ো। এখন নিজে ধরলে কেন? আমি তোমাকে স্পর্শও করবো না আর বেবিও দিবো না। আমিও দেখতে চাই, তুমি কতদিন পর্যন্ত দূরে সরিয়ে রাখতে পারো নিজেকে আমার থেকে।

হায়া আশিয়ানকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার বুকে নাক-মুখ ঘসতে ঘসতে বলে–

—আপনি জানেন তো আমি পারি না নিজেকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে, তাও এমন করছেন। এত নিষ্ঠুর কেন আপনি? একটা বেবি দিলে কি হয়? অন্যরা কি বেবি নিয়ে পড়াশোনা করে না?

—অন্যরা আর তুমি এক নও হায়া। তুমি হলে মহা ফাঁকিবাজ। এমনিতেই পড়তে চাও না, বাচ্চা হলে পড়ালেখা একদমই ছেড়ে দিবে। আমি ভার্সিটির একজন প্রফেসর হয়ে আমার বউ কিনা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করবে না? বুঝতে পারছো আমার কলিগরা এসব জানতে পারলে আমার কতটা ফেসলস হবে।তাই আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল, তোমার গ্র্যাজুয়েশনের আগে কোন বাচ্চা নিবো না আমরা।

হায়া আশিয়ানের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে আশিয়ানের দুই গালে হাত রেখে বলে–

—আমি ফাঁকি বাজি করবো না পড়ায়। প্লিজ এমন করবেন না আশিয়ান। আমি আপনার সব লথা শুনবো। আগের থেকেও ভালো রেজাল্ট করবো প্রমিজ। প্লিজ এই কথাটা রাখেন আর কোন আবদার করবো না।

আশিয়ান চোখমুখ শক্ত করে হায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। হায়া আবারও বলে–

—আশিয়ান একটা বাচ্চা আমাদের ঘরে থাকবে, খেলবে ঘুমাবে। আমাদের দিনটা শুরু হবে ওকে নিয়ে আর রাতও হবে ওকে ঘিরেই। আপনি অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে ফেরার পর সে আপনার কোলে ওঠার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। তার অস্থিরতা দূর হবে তার বাবার স্পর্শে। সে যখন ঘুমের রাজ্যে বিভোর থাকবে তখন আমরা দু’জন পরম তৃপ্তি নিয়ে মন ভরে তাকে দেখবো। সে একটু বড় হলেই আমাকে মাম্মা আর আপনাকে পাপা বলে ডাকবে। একবার ভাবুন, আদো আদো গলায় তার পাপা ডাকটা। এমন করছেন কেন আশিয়ান? একটু সদয় কি হওয়া যায় না আমার প্রতি? আপনি শুধু নিজেরটা ভাবেন সবসময়। আজও তাই। শুধু নিজের ফেস লস হওয়ার কথা ভাবছেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কোন দাম নেই আপনার কাছে।

হায়া কথা গুলো বলতে বলতে কেঁদে দেয়।কাঁদতে কাঁদতে আশিয়ানকে ছেড়ে নিচে বসে পড়ে। সেখানে বসেই কাঁদতে থাকে। হায়ার শেষের কথাগুলো আশিয়ানের মস্তিষ্ক ও মনে বেশ ভালোভাবেই আঘাত করে। সত্যিই তো বলছে হায়া। অতীতেও সে নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে হায়াকে চরম ভাবে অপমানিত করেছে। কয়েকবছর পর আবার নিজের ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য দ্বিতীয় বারের মতো হায়ার বিয়েটা সেই ভেঙে দিয়েছিল। আজও নিজের কথাই ভাবছে। মেয়েটা বরাবরই তাকে শর্তবিহীন ভাবে ভালোবেসে যাচ্ছে আর আশিয়ান কিনা শুধু নিজের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিচ্ছে? নিজের ইচ্ছেগুলো হায়ার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, হায়া সেগুলোকে চাইছে বা না চাইছে সেদিকে আশিয়ান বিন্দুমাত্র নজর রাখছে না। ভীষণ স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে আশিয়ান।

তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই হায়া নিচ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। কাবার্ড থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যাচ্ছিল তখনই আশিয়ান তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয়। হায়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলছে না বা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টাও করছে না। আশিয়ান বুঝতে পারে হায়ার অভিমান হয়েছে।

আশিয়ান হায়ার ঘাড়ে মুখ গুঁজেই বলে–

—বেবি আসার পর আমার ভালোবাসার ভাগ কমে যাবে না তো?

হায়া তার কথা শুনে চমকে যায়। বেবি আসবে কিভাবে, যেখামে বেবির বাবাই তাকে আনতে চাইছে না? হায়া কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আশিয়ান তার জবাব না পেয়ে পুনরায় সুধায়–

—কি হলো বলো? বেবি আসার পর আমায় কম ভালোবাসবে না তো? তাহলে কিন্তু আমি ভীষণ রাগ করবো, বেবিকে লুকিয়ে রাখবো তোমার থেকে।

হায়া তার কথা শুনে বলে–

—বেবি তার ভাগের ভালোবাসা পাবে আর আপনি আপনার।

—বেবি দেওয়ার পর এটা বলবে না তো” বাচ্চা তো হয়েই গিয়েছে আর পড়ালেখা করে কি লাভ,এখন মন দিয়ে সংসার করি”?

আশিয়ানের এই কথা শুনে আরো চমকে যায় হায়া। আশিয়ানের কথাগুলো শুনে বুঝাই যাচ্ছে সে রাজি। হায়া ঝটপট করে বলে–

—না বলবো না।

—তাহলে চলো।

কথাটা বলে আশিয়ান হায়াকে কোলে তুলে নেয়। হায়া থতমত খেয়ে বলে–

—কই যাবো?

—বেবি আনার মিশনে।

কথাটা শেষ করে আশিয়ান হায়াকে একটা চোখ টিপ দিয়ে তাকে বেডে শুয়ে দেয়। হায়ার কাঁধ থেকে আচল সরিয়ে সেখানে মুখ গুঁজে দেয়। হায়াও খুশি মনে বরের ভালোবাসায় সাড়া দিতে থাকে। তারা দু’জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের ভালোবাসার চিহ্নকে দুনিয়ায় আনার কাজে।

_____________________________

দীর্ঘ ৮ঘণ্টা পর হায়াকে সুস্থসবল অবস্থায় দেখে সকলের প্রাণে জান ফিরে। আশিয়ান দৌড়ে এসে সকলের সামনেই হায়াকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণ নিজের সাথে জড়িয়ে রেখে হায়াকে বুক থেকে সরায় আশিয়ান। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে–

—কই ছিলে তুমি জান? জানো আমরা কত টেনশন করছিলাম।

হায়া কিছু বলার আগেই একটা পুরুষ কণ্ঠ বলে উঠে–

—হায়া আমার সাথে ছিল আর তাকে কিছু সত্য জানানোর জন্য আমি তাকে নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম।

শব্দসংখ্যা~২১০০
চলবে?

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]