সাঝের প্রণয়ডোর পর্ব-৪৯+৫০+৫১

0
10

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৯

আফিফ নিজের চুল রাহার হাত থেকে ছাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু রাহা ছাড়ছেই না। ক্লান্ত হয়ে সে বিবশ মুখে বসে পড়ে আর চেষ্টা করে না রাহার হাত থেকে নিজের পছন্দের চুলগুলোকে মুক্ত করতে। রাহা এতক্ষণ আফিফের প্রতিহত করার প্রচেষ্টা দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল, যেই আফিফ প্রচেষ্টা করা ছেড়ে দিল রাহার মজায়ও যেনো কেউ একমুঠো ছাই ছিটিয়ে দিল।

রাহা আপনাআপনি আফিফের চুল ছেড়ে দেয়। তারপর একসাথে বেশ কয়েকবার চোখের পলক ঝাপিয়ে আফিফকে দেখতে থাকে। সাদা শার্টের হাতা গুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। রাহার সাথে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে বেচারা বেশ ঘেমে গিয়েছে যার দরুন কপাল বেয়ে ঘাম চুইয়ে চুইয়ে গলার নিচে চলে যাচ্ছে। গলার দিকে তাকাতেই রাহার কি জানি একটা হলো, সে ঘোরে চলে যায়। বিশেষ করে আফিফের অ্যাডামস এপেলের দিক থেকে তার নজর পরতেই তার শরীরে এক শিহরণ বয়ে যায়। সে অনুভব করে আফিফ লোকটা ভীষণ সুন্দর। সেটা তার মন হোক বা শরীর।

অন্যদিকে আফিফ তার ক্লাম্ত গা এলিয়ে দেয় সেফায়।চোখ বন্ধ করতেই কয়েক ঘণ্টার আগের দৃশ্য একের পর এক ভেসে ওঠে চোখের ক্যানভাসে।

______________________

কয়েক ঘন্টা আগে~

রাহা এতদিন আফিফের সাথে থাকার সময় খুব কমই জাহানকে মনে পরেছে তার। রাহা মনেপ্রাণে আফিফ ও তার সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিতে চায়। সে চায় তারও আর পাঁচটা মেয়ের মতো ভালোবাসায় ঘেরা একটা সংসার হোক। আফিফ তাকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখুক। আর এসব ভেবেই সে সবসময় নিজেকে অনেকটা বেশি ব্যস্ত রাখতীগ সংসারের কাজে যাতে অবসর সময়ে তার মাথায় জাহান রিলেটেড কোন কথা না ঘুরে। সফলও হয়েছে এমন পরিকল্পনায়, কিন্তু আজ যেনো তার এই একমাসের পরিশ্রম পন্ড হয়ে গেলো।

আজকের পুরোটা সময় সে জাহান-মেহরিমাকে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে খেয়াল করেছে। জাহানের চোখের মেহরিমার প্রতি এক আকাশসম ভালোবাসা তাকে বড্ড আহত করেছে। না চাইতেও তার মন বলে উঠেছে, এত ভালোবাসার মালিক আমি হলাম না কেনো? দীর্ঘশ্বাস বেড় হয়ে এসেছে তার। সে মেহরিমাকেও লক্ষ্য করেছে। সে নিজেও জানে, মেহরিমা মেয়েটা অনেক লক্ষী আর শান্ত স্বভাবের। মনটা একদম স্বচ্ছ কাঁচের মতো। আর তার এই ভালোমানুষির সুযোগ নিয়েছিল সে ও তার বাবা। জোর করে পেতে চেয়েছিল জাহানের পবিত্র ভালোবাসাকে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, দুনিয়ায় সবকিছু জোর করে পাওয়া গেলেও ভালোবাসা পাওয়া যায় না।

এসব ভেবেই নিজের প্রতি দুঃখ ও ক্ষোভ দু’টোই হয় রাহার। তখন একটা ওয়েটার হাতে একটা ট্রে-তে করে কতগুলো ড্রিংসের গ্লাস নিয়ে যাচ্ছিল। রাহা ওয়েটারটিকে ডাক দিয়ে তার ট্রে থেকে একটা গ্লাস উঠিয়ে নেয়। ওয়েটার টিও রাহাকে গ্লাসটি দিয়ে চলে যায়। রাহা দুই চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে ফেলে। খাওয়ার পর তার মাথা ধরে যায় ঝাঝে। আসলে সেটা ওয়াইন ছিল। পার্টিতে অনেক বড়বড় বিজনেসম্যান এসেছি, তারা ওয়াইন খাওয়ায় জাভিয়ান স্বল্প পরিসরে তাদের জন্য ওয়াইনের ব্যবস্থা করেছি। আর রাহা সেই ওয়াইনকেই সফট ড্রিংকস ভেবে খেয়ে নেয়।

শুরুতে রাহার খেয়ে ভালো না লাগলেও একটু পর ভালো লাগতে শুরু করে। শরীরটা কেমন হালকা হালকা লাগতে শুরু করে। আশেপাশের সবকিছু ভালো লাগতে শুরু করে। দূরে কয়েকজন পুরুষের সাথে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকা তার বরটাকে তো রাহার আরো ভালো লাগতে শুরু করে। রাহা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সে তার গালে একহাত রেখে মনে মনে বলে উঠে–

—আল্লাহ আমার বরটা এত কিউট কেন? আবার কি কিউট করে হাসছে? মনটা চাইছে একটা চুমু খেয়ে আসি।

রাহা তার মনের ইচ্ছে দাবিয়ে রাখল না। টলমলে পায়ে হেঁটে আফিফের কাছে চলে আসে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে ডান হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে আফিফের বাহুতে খোঁচাতে থাকে। আফিফ তার খোঁচা খেয়ে পেছনে ফিরে তাকালে রাহাকে ঠোঁট উল্টে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। চোখ গুলো কেমন ঘুমো ঘুমো হয়ে আছে। আফিফ রাহাকে জিজ্ঞেস করে–

—কি হয়েছে রাহা? কিছু বলবে?

—হুম।

রাহা বাচ্চাদের মতো করে মাথাটা উপর নিচ করে বলে। রাহার ভাব ভঙ্গি দেখে রাহাতের কপালে ভাজ পড়ে কয়েকটা। সে রাহাকে জিজ্ঞেস করে–

—কি বলবে? কিছু চাই তোমার?

—হুম।

—কি চাই?

—আপনাকে?

—আমাকে? কিন্তু কেনো?

খানিকটা অবাক হয়েই বলে আফিফ।

—চুমু খাবো তাই।

সরল গলায় কথাটা বলে রাহা। অথচ তার এই কথা শুনে আফিফের চোখগুলো বের হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। পেছন থাকা তার কলিগ গুলো রাহার কথা শুনতে পেরে ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে। জাহান আর সে একই পেশায় থাকা, জাহান তার কিছু কলিগদের ইনভাইট করেছে পার্টিতে। যারা একসময় আফিফেরও কলিগ ছিল।

আফিফ পেছনে ঘুরে হাস্যরস কলিগদের একবার দেখে নেয়। তারপর “এক্সকিউজ মি” বলে রাহার হাত ধরে তাকে একটা খালি জায়গায় নিয়ে আসে।তারপর তার হাত ছেড়ে দিয়ে বলে–

—রাহা কি হয়েছে তোমার? এমন উদ্ভট কথা বলছ কেনো?

—কিসের উদ্ভট কথা বলছি জামাই?

কথাটা বলে সে ঠাস করে আফিফকে জড়িয়ে ধরে। তার এমন কাজে আফিফ আরো একবার চমকে যায়। আফিফ তড়িঘড়ি করে রাহাকে নিজের থেকে সরিয়ে আশেপাশে একবার নজর বুলিয়ে নেয় কেউ দেখেছে কিনা। তারপর কিছুটা শক্ত গলায় রাহাকে বলে–

—রাহা এমন করছো কেন তুমি? কি হয়েছে তোমার? আর তুমি এমন টলছো কেনো? সোজা হয়ে দাড়াও দেখি।

রাহা হিহি করে হেঁসে বলে–

—টলছি কই জামাই? আমি তো আকাশে উড়ছি। দেখেন কি সুন্দর করে উড়ছি আমি। আপনি উড়েন আসুন।

কথাটা বলে রাহা আফিফের দুই হাত মেলে দেওয়ার জন্য আবারও তার অনেকটা কাছে চলে আসলে আফিফ কড়া একটা স্মেল পায়। সে রাহাকে দূরে না সরিয়ে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে শুঁকে দেখে রাহাকে দিয়ে ড্রিংকসের স্মেল আসছে।

আফিফ অবাক হয়ে রাহাকে জিজ্ঞেস করে–

—তুমি ড্রিংকস করেছো রাহা?

—না তো।

সরল গলায় উত্তর দেয় রাহা। আফিফ তার জবাব শুনে বলে–

—তাহলে এমন কড়া স্মেল আসছে কেনো তোমার থেকে? কি খেয়েছো তুমি?

—আমি তো তেমন কিছু খাই নি। শুধু জাহান আর মেহরিমাকে দেখে বুক ভারী হয়ে এসেছিল কষ্টে তখন একটা ওয়েটার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তার থেকে একটা এপেল জুসের গ্লাস নিয়ে খেয়েছি।

নেশাক্ত গলায় একের পর এক কথা বলে যাচ্ছে রাহা। আফিফ বুঝে যায় রাহা ভুল বসত হয়ত ওয়াইন খেয়ে ফেলেছে। তাকে এখান থেকে এখন না নিয়ে গেলে তার ও রাহার আরো ফেসলস হতে পারে। আফিফ রাহাকে এবার শান্ত ও কোমল গলায় বলে–

—তুমি এখানে লক্ষী মেয়ের মতো দাঁড়াও হ্যা। আমি আম্মু আর বাবাকে বলে আসছি, আমরা চলে যাবো এই কথা।

কথাটা বলে আফিফ রাহাকে ছেড়ে তার বাবা-মায়ের কাছে যেতে নিলে রাহা হুট করে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। আর বলে–

—না না, যেতে দিব না।

—আরে বাবা, এক মিনিটের ব্যাপার। আমি যাবো আর আসব। দেখো তোমার শরীর খারাপ করবে পরে আরো। ছাড়ো আমায় রাহা।

—না আগে চুমু খাও তারপর ছাড়ব।

আফিফ এবার বিপাকে পড়ে যায়। রাহা জেদ ধরে আছে চুমু না খাওয়া পর্যন্ত ছাড়বে না। অগ্যাত আফিফ রাহাকে আরেকটু আঁধারে নিয়ে গিয়ে তার কপালে চুমু দেয়। রাহা সেটায় সন্তুষ্ট হয় না। সে আফিফকে তার গাল দেখিয়ে দেয়। আফিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহার গাল গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। তারপর রাহা বামগালেও ইঙ্গিত করে। আফিফ সেটা তেও দেয়। সবশেষে রাহা তার ঠোঁট দুটো পাউট করে দেখালে এবার আফিফ দেয় এক রাম ধমক।

এমন না সে বিরক্ত রাহার কাজে। কিন্তু তার অস্বস্তি হচ্ছে পাবলিক প্লেসে বউয়ের এমন আবদারে। যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে বিশ্রী এক অবস্থা হবে। আফিফ রাহাকে কড়া গলায় বলে–

—চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি এসে যদি না পাই তাহলে বাসায় গিয়ে পায়ের গোড়া ভাঙব তোমার।

রাহা ভয় পেয়ে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আফিফ তার বাবা-মাকে বলে বোনের থেকে বিদায় নিয়ে তখনই বেরিয়ে যায়। সারাটা রাস্তা দু’জনের একজনও কথা বলে না। বাসায় এসেই রাহা তার চেপে রাখা রাগ বের হয়ে আসে। সে এতক্ষণ আফিফের চুল টানছিল তাকে তখন ধমক দেওয়ার জন্য।

_______________________

বর্তমান~

হুট করে নিজের কোলের উপর কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে আফিফ চোখ মেলে চায়। রাহাকে দেখতে পেয়েও সে কিছু না বলে পুনরায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। মিনিট খানিক পর নিজের অ্যাডামস এপেলে রাহার কোমল ওষ্ঠের ছোঁয়ায় আফিফ কেঁপে ওঠে। সেই সাথে ভীষণ চমকে গিয়ে শরীর উঠাতে গেলে রাহা আফিফের উপর নিজের সব ভড় ছেড়ে দিয়ে আয়েশ করে বরকে আদর করতে থাকে।

________________________________

জাহান পুষ্পে সজ্জিত পুরো কক্ষ টায় কয়েকবার চোখ বুলিয়ে নেয়। কিন্তু নাহ, তার বউ কোথাও নেই। ওয়াশরুম চেক করে সেখানেও নেই। সেইবার রিসোর্টে গিয়ে মেহরিমাকে না পেয়ে যেমন বিচলিত হয়ে পড়েছিল তেমনই বিচলিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু সেইবারের মতো ভালোভাবে সব জায়গা চেক না করে হুলুস্থুল করে না।

সে সব শেষে বেলকনির দিকে হাঁটা লাগায় দুরুদুরু বুকে। মনে মনে প্রার্থনা করছে সেখানে যেনো মেহরিমা থাকে। তার প্রার্থনা কবুলও হয়। মেহরিমাকে জাহান বেলকনিতে খুঁজে পায়। মেহরিমাকে দেখে জাহানের হৃৎস্পন্দন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। সে বেশ কয়েকবার মেহরিমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করে। মেহরিমাকে যতই দেখছে ততই তার গলা থেকে বুক পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মেহরিমা একটা সি গ্রীন কালারের জর্জেটের শাড়ি পরেছে,
যার ব্লাউজও স্লিভলেস। চাঁদের রূপালী আলো মেহরিমার বাহুদ্বয়ে পরে চকচক করছে।

মেহরিমা আকাশের জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদ দেখছিল বলে সে তখনও জাহানের উপস্থিতি টের পায় নি। মিনিট খানেক পর জাহান নিজের অনুভূতি গুলোকে কোন মতে সামলে নিয়ে হালকা করে গলা খাঁকারি দেয়, মেহরিমার এটেনশন পাওয়ার জন্য। মেহরিমা তার গলা খাঁকারি শুনে কিছুটা চমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। জাহানকে দেখে মেহরিমা প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে যায়। সে এমন ড্রেসআপ করতে চায়নি কিন্তু তার বান্ধবীরূপী বোন গুলো ধমকেধামকে তাকে এই শাড়ি পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। সেই সাথে বলে গিয়েছে কিভাবে কিভাবে বরকে হাতের মুঠোয় আনতে হয়।

মেহরিমা চোখজোড়া বন্ধ করে লম্বা করে একটা শ্বাস নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে সাথে সাথেই ঐটা আবার বাহিরে ছেড়ে দেয়। তারপর চোখ খুলে মোহনীয় একটা হাসি ফুটিয়ে তোলে নিজের ওষ্ঠে। সেই হাসি দেখে জাহানের আশেপাশের সবকিছু থমকে যায়।

মেহরিমা তার ডানহাত উঠিয়ে এক আঙুল দিয়ে ইশারা করে জাহানকে নিজের কাছে ডাকে। জাহান সম্মোহনীর মতো হয়ে মেহরিমার আঙুলের ইশারায় তার দিকে যেতে থাকে। মেহরিমার থেকে আধা হাত দূরে এসে জাহান থেমে যায়।

পরবর্তী কাজগুলো মেহরিমা নিজেই করে। বেলকনিতে থাকা ছোট টি-টেবিলের উপর থেকে সাদা গোলাপের বুকেটা উঠিয়ে জাহানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তারপর মনোহরণ করা গলায় বলে–

—আমি জানি না, মনের অনুভূতি গুলো কিভাবে গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হয়। ছোট থেকে তো কাউকে অভিভাবক হিসেবে পাশে পায়নি যে কিনা শিখাবে। আমি আমার মতো করে, আমার অনুভূতি গুলোকে আপনার সামনে পেশ করছি। আপনি একটু কষ্ট করে হলেও বুঝে নিয়েন জাহান।

জাহান হা করে মেহরিমার কথা গুলো শুনছে। প্রতিত্তোর করার মতো কোন ভাষা পাচ্ছে না সে। মেহরিমা আবার বলতে শুরু করে–

—আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো হায়াকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া। কারণ সে যদি আমার মতো এতিমকে নিজের বন্ধু না বানাত, আমার হয়ত আপনাকে পাওয়া হতো না। এর জন্য আমি চিরকাল ওর কাছে ঋণী থাকব। প্রথম আপনাকে যেদিন ভার্সিটিতে দেখেছিলাম সত্যি বলতে আমিও কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। একজন ছেলের গেলে একজন মেয়ে অন্যের পুরুষের দৃষ্টি পড়ে ফেলতে পারে। আমিও পেরেছিলাম। কিন্তু তা নিছকই সহানুভূতি ভেবে ইগনোর করেছিলাম। দিনকে দিন আমার প্রতি করা আপনার পাগলামি গুলোতে আমি না চাইতেও মন দিয়ে ফেলছিলাম। মন চাইত আপনার সাথে আমিও ভালোবাসার পাগলামিতে মেতে উঠি, কিন্তু দিন শেষে একটা কথা ভেবে নিজেকে সামলে রাখতাম যে, আমি এতিম।

কথাগুলো বলতে বলতে মেহরিমার গলা ধরে আসছে। সে একটা ঢোক গিলে বলে–

—আমার সাথে আপনার বৈসাদৃশ্য আকাশচুম্বী। যার কারণে বারংবার আপনাকে ফিরিয়ে দিতাম। আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে যে আমি ভালো থাকতাম তা কিন্তু না। আমার নিরব আর্তনাদ গুলোর স্বাক্ষী আমার বালিশ ও সেজদার জায়গাটা। একসময় সব কিছু ভুলে, আপনার ভালোবাসায় এতটাই আসক্ত হয়ে পরেছিলাম যে, ঠিক করেছিলাম আর অপেক্ষা করাবো না আপনাকে। আপনারও অধিকার আছে ভালোবাসা পাওয়ার। কিন্তু তখনই রাহা আর রাহাত আঙ্কেলের কথাগুলো আমায় আবারও মনে করিয়ে দিল আমি কে? কি আমার পরিচয় এই সমাজে? তাই তো বোকার মতো আপনার পবিত্র ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে হারিয়ে গিয়েছিলাম। জানেন জাহান, চট্টগ্রামে যাওয়ার পর, আমি প্রতিটা সেজদায় দু’টো দোয়া চাইতাম। প্রথমটা হলো, আপনি যেনো পৃথিবীর সবচাইতে বেশি সুখী মানুষটি হন। দ্বিতীয়টি হলো, আমার মৃত্যু।

হ্যাঁ, নিজের মৃত্যু চাইতাম আমি। কারণ আমি তখন হাঁপিয়ে উঠেছিলাম ভালোবাসা না পেতে পেতে। তারপর যখন আমি আবার আমায় খুঁজে বের করলেন আর নিজের অর্ধাঙ্গিনীর স্বীকৃতি দিলে বিশ্বাস করবেন না, সেদিনের মতো খুশি আমি আমার বাইশ বছরের জীবনে কখনো হয়নি। এত কথা শেষ একটা কথাই বলতে চাই, আমিও আপনাকে অনেক ভালোবাসি জাহান। হয়ত আপনার মতো এতটা প্রখর না, কিন্তু কাউকে যতটা ভালোবাসা যায় তার সবটা দিয়ে আপনাকে ভালোবাসি।

প্লিজ আর আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবেন না। আমায় আবার আপনার ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিন। আপনার ভালোবাসা ছাড়া নিজেকে প্রাণহীন দেহ বলে মনে হচ্ছে। এই জন্মদুঃখী, অভাগীর একটা ব্যক্তিগত মানুষের বড্ড অভাব। আর আপনি ছাড়া এই অভাব আর কেউ পূরণ করতে পারবে না।

কথাগুলো বলতে বলতে মেহরিমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। জাহানের চোখেও অশ্রুতে আনাগোনা দেখা যায় কিন্তু ঠোঁটের কোণে মন মাতানো হাসি ফুটে ওঠে। মেহরিমা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জাহানের উত্তর শোনার জন্য। কিন্তু হঠাৎই জাহান মেহরিমার মনটাকে ভেঙে দিয়ে কোন উত্তর না দিয়ে রুমে চলে যায়।

শব্দসংখ্যা~২০০০
~চলবে?

[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫০

জায়িন রুমে ঢুকে একটু থতমত খেয়ে যায়। কারণ রুমটা আঁধারে ঢেকে রয়েছে। জানালার থাইগ্লাসগুলো লাগিয়ে তাতে পর্দা মেলে দেওয়ায় বাহির থেকে কোন আলো রুমে প্রবেশ করছে না, যার কারণে রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে।

সে একটা হতাশা মিশ্রীত শ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে রুমের লাইটের সুইচের কাছে যায়। সেকেন্ডের ব্যবধানে রুমটা আলোয় পরিপূর্ণ করে তুলে সে। লাইট জ্বালিয়ে পেছনে ফিরে জায়িন বড়সড় একটা ঝটকা খায়। সে দেখতে পায় তার আদর-যত্নে বড় করে তোলা বউ তারই বাসর পন্ড করে দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাচ্ছে। পার্টিতে পড়া শাড়ি খানা খুলে হ্যালো কিটির লেডিস টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরেছে।

বেচারা জায়িন বড্ড আহত হয়। কোথায় সে ভেবেছিল তার বউটা ফুলে সজ্জিত বিছানায় একহাত লম্বা ঘোমটা টেনে বসে বসে তার অপেক্ষা করবে, জায়িন রুমে এসে তার পাশে বসে আস্তে করে ঘোমটা তুলে তার চাঁদ মুখখানা দেখবে। কিছু প্রেমময় উক্তি দ্বারা প্রেয়সী কপোলে লজ্জার লালিমা রাঙিয়ে দিবে। বউয়ের সেই মোহনীয় রূপ দেখে জায়িন আবারও পাগল হয়ে পুনরায় তাকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিবে।কিন্তু কোথায় কি, বউ তো তার মাথায় বারি মারার নামান্তর কাজ করে বসে আছে।

এমন না তারা আজই প্রথম কাছে আসবে। কিন্তু ভাই বাসরটা তো তারও আজ প্রথম হবে। তাদের বিয়ের দিন বড় ভাইয়ের সেই করুণ অবস্থা দেখে জায়িন বা আদিবা কারোই মনের অবস্থা ভালো ছিল না। যার কারণে বাসর রাতে কিছুই হয়নি। ফ্রেশ হয়ে দুইজনই ঘুমিয়ে পরেছিল। কিন্তু তাই বলে আজও এমনটা হবে?

হঠাৎই জায়িনের মাথায় ক্রোধ চেপে বসে। না, সে কিছুতেই এটা সহ্য করবে না। সে পুরো বেশি পাওয়ারের লাইট নিভিয়ে দিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বেডে উঠে পড়ে। আদিবার পাশে আধশোয়া হয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—আদিবা, এই বউ উঠ। উঠ বলছি। এমনিতে তো কত রাত হয়ে যায় ঘুমাস না, কিন্তু আজ বারোটা বাজতে না বাজতেই ঘুমিয়ে পরলি যে? উঠ না রে বাবা, আজ না আমাদের বাসর। আমরা বাসর করব না।

কানের পাশে জায়িনের অনবরত বকবকানিতে আদিবা একটু নড়েচড়ে উঠে। তারপর পিটপিট করে চোখ মেলে জায়িনকে দেখতে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে আবারও ঘুমিয়ে পরে। তাকে চাইতে দেখে জায়িন খুশি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার খুশি নিমিষেই কর্পূরের ন্যায় উড়ে যায়।

আদিবা জায়িনের বুকে মুখ ডুবিয়ে ঘুমুঘুমু গলায় বলে–

—আজ সকাল থেকে দৌড়ের উপর আছি। সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত ভারী শাড়ি আর চার ইঞ্চি মোটা মেকআপের আড়ালে নিজেকে মুড়িয়ে পুতুলের মতো বসে ছিলাম। তারপরও জিজ্ঞেস করছো, কেন ঘুমিয়ে গেলাম এত তাড়াতাড়ি? কি নিষ্ঠুর তুমি জায়িন।

আদিবার কথাগুলো শুনে জায়িনের মায়া হয়। সে শুধু নিজের কথাই ভাবছিল, অথচ তার ভালোবাসার মানুষটির কথা একটুও ভাবল না। এই পর্যায়ে এসে জায়িনের নিজের প্রতি রাগ হয়। সে আর আদিবাকে বিরক্ত করে না বরং সে নিজেও গায়ের ব্লেজারটা খুলে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।

__________________________

জায়িনের ঘুম ভাঙে হালকা কাঁপুনি-মেশানো এক ডাকের শব্দে। গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক তিনটায়। চোখ মেলতেই তার নিঃশ্বাস আটকে আসে মুহূর্তে।

আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে আদিবা যেন রূপকথার কোনো পরী বাস্তবে তার ঘরে এসে হাজির হয়েছে। মাথাভর্তি খোঁপা করা চুলে গুঁজে রাখা এক টুকরো জুঁইফুল, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি ছোঁয়া, আর গায়ে হালকা রঙের শাড়ি যা তার কোমল গড়নটাকে আরও নরম, আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

জায়িন ধপ করে উঠে বসে, চোখ কচলে নিশ্চিত হয় সে জেগেই আছে।

—কিরে… মাঝরাতে এমন সাজগোজ? মাথায় আবার কোন পেত্নী চাপল নাকি?

আদিবা হেসে ওঠে। এক হাত কোমড়ে রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলে–

—পেত্নী কেন? আজ তো আমাদের বাসর রাত না, তাই ভাবলাম আমার স্বামীর পছন্দের মতো হয়ে উঠি। বলো তো, কেমন লাগছে আমাকে?

জায়িন আর উত্তর দিতে পারে না। শুধু অপলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। আদিবা এবার ধীরে ধীরে তার হাত দুটো দুই পাশে ছড়িয়ে দেয়, যেন নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছে তার কাছে। তার মেদহীন কোমর আর কোমল পেটের বাঁক চোখে পড়ে জায়িনের। গলার স্বর শুকিয়ে আসে তার, ঠোঁটের কোণায় খেলতে থাকে নিঃশব্দ হেসে যাওয়া।

আদিবা এবার ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এসে জায়িনের বুকে আঙুল বুলিয়ে বলে–

—আজ আমি শুধু তোমার, জায়িন। তোমার ভালোবাসা আমাকে ছুঁয়ে যাক এমনভাবে, যেন স্নিগ্ধময় ভোরও হিংসে করে তোমার আমার ভালোবাসা দেখে।

জায়িন এবার আদিবাকে নিজের কোলে টেনে নেয়। আদিবাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে মৃদু গলায়
বলে—

—আমি শুধু আজকের জন্য তোর না, তোর আগামী সব দিনের জন্য আমি তোর। তালুলদাররা ভালোবেসে হাত ধরলে সেই হাত মরার আগ পর্যন্ত ছাড়ে না, বুঝতে পারলি আমার ইনা, মিনা, টিনার আম্মু?

আদিবা জায়িনের সম্বোধন শুনে একটু হেসে উঠে, তারপর লজ্জা আর ভালোবাসায় মুখ গুঁজে দেয় জায়িনের বুকে। কিন্তু জায়িন বাঁকা এক চাহনি দিয়ে তাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে–

—তবে শোনো, আজ সারারাত আমি তোমায় ভালোবাসার সেই শাসনে বেঁধে রাখব, যেটা থেকে পালানো তো দূরের কথা, ভুলে যাওয়াও অসম্ভব। প্রস্তুত তো আমার রাজরানী?

আদিবার ঠোঁটে কাঁপতে থাকা একটুকরো হাসি আর চোখে জমে ওঠা আলোয় শুধু ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি ছিল।

আর বাকিটা রাত… ছিল ভালোবাসার অমলিন কবিতা।

_______________________

রাত দু’টোয় রাহাতের পানি তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে যায়। শোয়া থেকে উঠে বসে বেডসাইড টেবিলে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। তারপর আবারও শুয়ে পড়ে। বাম কাত হয়ে শুতেই তার নজরে পড়ে মুনতাহার ফাঁকা জায়গাটা। দীর্ঘ ২৫টা বছর একই বিছানায় শুয়ে এসে এখন একা একা শুতে ভালো লাগে না তার আর। মাঝরাতে যখনই তার ঘুম ভাঙে তখনই এই জায়গাটায় তাকিয়ে তার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

হঠাৎই তার মন ইচ্ছা পোষন করে স্ত্রীকে একপলক দেখার। তীব্র ভাবে ইচ্ছাটা বুকেই ধামাচাপা দিতে চায় কিন্তু অবাধ্য মন তা মানে না। অবাধ্য মনের প্রবঞ্চনায় রাহাত হাঁটা দেয় গেস্টরুমের উদ্দেশ্য, যেখানে বর্তমানে তার অর্ধাঙ্গিনীর বাস।

রাহাত গেস্টরুমের কাছে গিয়ে দেখে রুমটার দরজা হালকা করে ভিড়ানো। রাহাত রুমে উঁকি দিলে ডিম লাইটের আবছা আলোয় দেখতে পায় মুনতাহা গুটিশুটি হয়ে বিছানায় শুয়ে শুধু ছটফট করছে আর গোঙাচ্ছে। রাহাত তাকে এমন ছটফট করতে দেখে দ্রুত পায়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে। মুনতাহার এক গালে হাত রেখে ক্ষীণ গলায় তাকে ডাকতে থাকে–

—মুন! এই মুন! কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে?

রাহাত তার গালে হাত রেখে চমকে যায়। প্রচন্ড গরম হয়ে রয়েছে তার গাল। সে একে একে মুনতাহার গাল, কপাল, গলা চেক করে বুঝতে পারে মুনতাহার জ্বর এসেছে। আর এই সেই জ্বর না গা কাঁপানো সেই জ্বর। রাহাত মুনতাহাকে আরো কয়েকবার ডাকে কিন্তু মুনতাহা বেগম কোন সাড়াশব্দ করে না। অতিরিক্ত জ্বরের প্রকোপে মুনতাহা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

রাহাত মুনতাহার থেকে সরে এসে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে একটা বালতিতে করে পানি নিয়ে এসে মুনতাহাকে বেডের কিনারে শুইয়ে দিয়ে মাথায় পানি ঢালতে থাকে। মুনতাহার হুঁশ না থাকার কারণে তাকে কিছু খাওয়াতেও পারছে না। আধা ঘণ্টার মতো মাথায় পানি ঢালার পর মুনতাহার গায়ের তাপ মাত্রা একটু কমে। তার ছটফটানি বন্ধ হয়। রাহাত বালতিটা ওয়াশরুমে রেখে এসে একটা টাওয়াল ভিজিয়ে এনে তার হাত-মুখ ভালো করে মুছে দেয়। রাহাত কাজটা শেষ করে ভাবে এবার মুনতাহাকে কিছু খাওয়ানো উচিত। কিন্তু মুনতাহাকে একা রেখে যেতে তার মনটাও সায় দিচ্ছে না।

আকস্মিকভাবে সেখানে এসে উপস্থিত হয় তাদের ছেলে রায়হান। কাল তার এক্সাম থাকার কারণে আজ রাত জেগে পড়ছিল। প্রতিরাতেই সে মায়ের কাছে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকে নিঃশব্দে। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মনটাকে শান্ত করে তারপর ঘুমাতে যায়। রাহা আর রায়হান দুই ভাই-বোন দুই মেরুর মানুষ। রাহা যেমন বাবা পাগলি, রায়হান তেমন মা পাগল ছেলে।

অন্যান্য দিনের মতো আজও মা’কে দেখতে এসেছিল রায়হান। কিন্তু রুমের কাছে এসে মুনতাহার রুমের লাইট জ্বালানো দেখে সে একটু অবাকই হয়। তারপর দরজার কাছে নিঃশব্দে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার বাবার কাজগুলো দেখে। রায়হান খেয়াল করে পুরোটা সময় রাহাতের চোখ-মুখে দুঃশ্চিতায় ছেয়ে ছিল। তার মনটা হঠাৎই ভালো হয়ে যায়। বাবার জন্য তার মনে জমে থাকা ক্ষোভ গুলো কিছুটা কমে যায়।

হুট করেই রাহাতের নজর যায় দরজার দিকে। এত রাতে ছেলেকে জেগে থাকতে দেখে রাহাত কিছুটা অবাকই হয়। রাহাত তাকে বলে–

—রায়হান, এত রাতে না ঘুমিয়ে এখানে কি করছো আব্বু?

রায়হান তার ডাক শুনে ভেতরে প্রবেশ করে। শান্ত গলায় বলে–

—কাল পরীক্ষা তো তাই পড়ছিলাম পাপা। আম্মুকে দেখতে এসেছিলাম, এসে দেখি তুমিও এখানে আছো। আম্মুর কি হয়েছে পাপা?

—আর বলো না বাবা, তোমার আম্মুর সেই কি জ্বর। আমি না আসলে সারা রাত বোধহয় জ্বরে এভাবেই পড়ে থাকত।

—ওহহ।

মায়ের দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে রায়হান। রাহাত তাকে বলে–

—তুমি এখানে দশ মিনিটের জন্য বসতে পারবে? আমি তোমার মায়ের জন্য কিছু বানিয়ে নিয়ে আসতাম ততক্ষণে। আসলে তাকে একা ছেড়ে যেতে সিকিউর ফিল করছিলাম না।

—সেটা আবার বলতে হয়। আমি এমনিতেও থাকতাম। আম্মুর অসুস্থতা দেখে আমার আর ঘুমই আসবে না। তুমি যাও পাপা, আমি আম্মুর কাছে আছি।

রাহাত নিশ্চিন্ত মনে চলে যায় মুনতাহার জন্য স্যুপ বানাতে। পনেরো মিনিটের মাথায় এক বাটি গরম গরম স্যুপ নিয়ে হাজির হয় রাহাত। রাহাত বাটিটা টেবিলে রেখে ছেলেকে বলে–

—তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পরো আব্বু। আমি তোমার আম্মুর কাছে আছি না, চিন্তা করো না। রাতে ঘুম না হলে কাল এক্সামও ভালো হবে না।

—কিন্তু পাপা……

—তুমি চিন্তা করো না। এই স্যুপটা খাইয়ে ঔষধ খাওয়ালেই তোমার আম্মুর জ্বর ছেড়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। আর তাছাড়া আমি আছি তো তার পাশে।

“আমি আছি” শব্দটা ছোট হলেও এটার তাৎপর্য অনেক। রায়হান চলে যায় নিজের রুমে। মুনতাহার জ্বর না ছাড়া অব্দি রাহাত তার সেবা করতে থাকে।

~চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫১(জাহান-মেহরিমা বাসর স্পেশাল)

[১৮+ এলার্ট। পর্বটি প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত]

জাহান চলে যাওয়ায় মেহরিমা ভাবে জাহান হয়ত তাকে ক্ষমা করতে পারছে না। নিজের করা নির্বোধ কর্মের জন্য মেহরিমার নিজের উপরই প্রচন্ড রাগ হয়। ফুলের বুকেটা বেলকনি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তারপর নিজেকে নিজেই আঘাত করতে থাকে আর কাদতে থাকে।

এরই মাঝে জাহান ফিরে এসে তাকে এমন পাগলামি করতে দেখে হকচকিয়ে যায়। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে মেহরিমার কাছে এসে তার হাত দু’টো ধরে বলে–

—কি হয়েছে মেহু? এমন করছো কেনো? আর কাঁদছই বা কেনো?

মেহরিমার কান্না কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। কতগুলো দিন পর জাহান তাকে “মেহু” ডাকল। মেহরিমা জানে এই ছোট ডাক টায় জাহানের কত ভালোবাসা, আদর, যত্ন, আহ্লাদ মিশে আছে। তারও যে এই ডাকটা ভীষণই প্রিয়। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা পেতে কে না চায় না? মেহরিমা চায়। সে যে জন্মদুঃখীনী, তার যে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা সকলের চেয়ে একটু বেশিই।

হুট করে মেহরিমা নিচে বসে জাহানের পা আঁকড়ে ধরে। জাহান হকচকিয়ে গিয়ে পেছনে সরে যেতে নিলে মেহরিমা তার পা ছাড়ে না, বরং আগের থেকে আরো একটু বেশি শক্ত করে হাতের বাঁধন। মেহরিমা জাহানের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—জাহান প্লিজ শেষ বারের মতো মাফ করে দেন। আমি আর কখনো আপনার অবাধ্যতা করব না। আপনি আমায় থেকে আর মুখ ফিরিয়ে রাখবেন না জাহান। আ…আপনি ছাড়া আমার আর কে আছে বলেন যে কিনা আমায় ভালোবাসবে। আপনার ইগনোর আমায় ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমি মরে যাচ্ছি আপনার ভালোবাসার অভাবে।

জাহান মেহরিমার কথা ও কাজ দুটোতেই হতভম্ব হয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি করে নিচে বসে মেহরিমাকে নিজের বাহুতে আগলে নেয়। মেহরিমা তার সব শক্তি দিয়ে জাহানকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে। জাহান তাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে বিচলিত হয়ে যায়। সে মেহরিমার মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—হুশ, আর কাঁদো না। শরীর খারাপ করবে তো এরপর। মাফ তো সেই কবেই করে দিয়েছি তোমায়, এতদিন শুধু দেখছিলাম তুমি আমার রাগ ভাঙাতে কি কি করতে পারো।

মেহরিমা জাহানের বুক থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। মেহরিমার এমন বিধ্বস্ত মুখাবয়ব দেখে জাহানের বুকটা ধক করে উঠে। ইশশশ রে, মেয়েটার একটু পরীক্ষা নিতে গিয়ে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে জাহান। জাহান নিজের কাছেই নিজে পুনরায় ওয়াদা বদ্ধ হয় মেহরিমাকে ভালো রাখার, তার অপ্রাপ্তি গুলো জাহানের মাধ্যমে পূর্ণ করার।

মেহরিমা হিচকি তুলতে তুলতে বলে–

—তা..হলে ত..খন ওভাবে চলে গেলেন কে..নো কিছু না বলে?

জাহান তার হাত দিয়ে মেহরিমার চোখের পানি গুলো মুছে দেয়। কিন্তু সাথে সাথেই আবার মেহরিমার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। জাহান মেহরিমার কান্না থামানোর জন্য হুট করেই তার চোখজোড়ায় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ দিতে থাকে। একবার, দুইবার, পরপর অনেকবার। একটা সময় পর মেহরিমা কান্না থামিয়ে লজ্জা পেয়ে জাহানের বুকে পুনরায় মুখ গুঁজে দেয়।

জাহান বেলকনির ফ্লোরে বাবু হয়ে বসে পড়ে মেহরিমাকে টেনে তার কোলের উপর বসায়। তারপর একটা মাঝারি সাইজের বক্স আর ছোট একটা বক্স মেহরিমাকে দেখিয়ে বলে–

—এটা আনার জন্য গিয়েছিলাম রে পাগলি।

মেহরিমা বক্স গুলো দেখে বলে–

—কি আছে বক্সগুলোতে।

—আপনার ভালোবাসার কনফেশন ও আমাদের ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে কিছু গিফটস।

—মানে?

—মানে হলো, আমার কিছু দুষ্টু কলিগস আছে, তারা বলেছিল, বিয়ের পর ফার্স্ট নাইটে নাকি বউকে কিছু না দিলে তারা বিড়াল মারতে দেয় না। মানুষ বিড়াল মারে বিয়ের দিন, আর আমি? আজ আমাদের বিয়ের ১৬তম রাত চলছে, যদি আজও বিড়াল মারতে না পারি তাহলে, আমার পারসোনাল ফুটবল টিম বানানোর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

লাস্টের কথাটা জাহান আফসোস করেই বলে। কিন্তু তার চোখে-মুখে খেলা করছে দুষ্টুমিপনা। মেহরিমা জাহানের এমন ঠোঁটকাটা কথা শুনে লজ্জায় হাসফাস করতে থাকে।

জাহান বড় বক্সটা খুলে সেখান থেকে একটা লাভ সেইপের পেন্ডেটওয়ালা চেইন বের করে মেহরিমার কাঁধের থেকে চুল সরিয়ে সেটা পরিয়ে দেয়। চেইন পরানোর পর টুকুস করে একটা চুমু দিতে ভুলে না। মেহরিমা কেঁপে জাহানের টি-শার্ট খামচে ধরে। জাহান পরপর এক জোড়া কানের দুল, আর একজোড়া চুড়ি পরিয়ে দেয় মেহরিমাকে। সবগুলোই ডায়মন্ডের তৈরি আর একদম সিম্পল করে বানানো যাতে সবসময় পরে থাকতে পারে।

জাহান ওর্নামেন্টস গুলো পরিয়ে নিজের দিকে ফেরায় তারপর তার একগালে হাত রেখে বলে–

—এগুলো সবসময় পরবে বলে একদম সিম্পল করে বানিয়েছি, কখনো খুলবে না এগুলো ঠিক আছে?

মেহরিমা বাধ্যগত মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে জাহানের কথায় সম্মতি দেয়। সবশেষে জাহান ছোট বক্সটা থেকে একটা ডায়মন্ডের রিং বের করে মেহরিমার বাম হাতের অনামিকা অঙ্গুলে পরিয়ে দিয়ে সেখানে ছোট্ট একটা চুমু দেয়। মেহরিমার সেই হাতটা নিজের গালে রেখে মোহনীয় গলায় বলে–

—আই লাভ ইউ বউ, লাভ ইউ সো মাচ। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এতটাই গভীর যে, তা এই তিনটি শব্দে আটকে রাখা যায় না। যদি ভালোবাসা দেখানো যেতো, আমি বুকটা চিরে দেখিয়ে দিতাম, তোমার জন্য কী পরিমাণ অনুভব জমে আছে সেখানে।

আমার কথাগুলো শুনে তোমার গল্প উপন্যাসের থেকে টুকলি করা ডায়লগ মনে হতে পারে কিন্তু জানো মেহরিমা? আমি বাস্তবেই এমনভাবে তোমায় ভালোবাসি যে, নিজেকে তোমার বাইরে চিন্তাই করতে পারি না। বিয়ের আগে, আমি প্রায় প্রতিটি রাত এই বেলকনিতে বসে কাটিয়েছি তোমার কথা ভাবতে ভাবতে। ভাবনাগুলো এক সময় অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। তোমাকে ভাবা, তোমাকে কল্পনা করা, তোমার মুখখানা মনে করে নিঃশ্বাস ফেলা সবই এক ধরণের প্রশান্তি দেয় আমায়।

এই যে তুমি আজ আমার বাহুতে আবদ্ধ হয়ে আছো, এমন একটা দিনের আমার জীবনের পাওয়ার জন্য আমি কতকত প্রার্থনা করেছি সেসব আর না বলি।

আমি তোমার জীবনে সকালের স্নিগ্ধ রোদ্দুর হতে চাই, যে তোমার প্রতিটি দিনকে উজ্জ্বল করে তুলবে।
তোমার মন খারাপের দিনের শ্রোতা হতে চাই, যাকে নির্ভয়ে বলতে পারো—‘আজ আমার মনটা ভালো না’।
আমি চাই, তুমি যখন হাসো তখন সেই হাসির পেছনে আমি থাকি নীরব ছায়ার মতো, অথচ নির্ভরযোগ্য।

জাহান হঠাৎ থেমে যায়। মেহরিমার চোখে জল দেখে সে অস্থির হয়ে পড়ে। সে কিছুক্ষণ আগের মতো করে মেহরিমার চোখের জল মুছে দেয়।

তারপর কণ্ঠে আরো কোমলতা নিয়ে মৃদু স্বরে বলে—

—তুমি জানো, আমার সবচেয়ে বড় ভয় কীসের?

মেহরিমা প্রশ্মবোধক দৃষ্টি নিয়ে জাহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাহান নিজেই বলে–

—তোমার চোখের অশ্রু। তোমার চোখ থেকে একটা অশ্রুও যদি ঝরে, আর তার কারণ যদি আমি হই,
তাহলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না কখনো।

মেহরিমার কপালে দীর্ঘসময় নিয়ে একটা চুমু দেয় জাহান। তার কপালে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে রেখেই বলে উঠে–

—তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি আমার শান্তি।
এই জীবনে আমি যতদিন বাঁচি, প্রতিটি দিন শুধু তোমাকে ভালোবেসে যেতে চাই। আর একদিন যদি তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাও, তবে আমায় আর খুঁজে পাবো না।

শেষ কথাটা শুনে মেহরিমার বুক কেঁপে উঠে। সে নিজের হাত দিয়ে জাহানের মুখ চেপে ধরে। সে ধীরে ধীরে জাহানের গাল ছুঁয়ে বলে—

—আপনি জানেন, আমি কখনো ভাবিনি কেউ আমাকে এমনভাবে ভালোবাসবে। জীবনের এতগুলো বছর ভালোবাসাহীন, অবহেলা, অনাদরে বড় হওয়ায় ভালোবাসা শব্দটা থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল।কিন্তু আমার সেই বিশ্বাস আবারও ফিরিয়ে আনলেন আপনি। আপনার চোখে আমার জন্য যে ভালোবাসা দেখি, তা আমার আত্মায় ছুঁয়ে যায়। আপনার প্রতিটা কথায় যেন আমি নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাই।

সে চোখ নামিয়ে নিজের আঙুলে থাকা আংটিটার দিকে তাকায়। হীরেটার ঝিকিমিকির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল তখন তার মুখের হাসি। সে জাহানের চোখে চোখ রেখে বলে–

—আপনি আমার জীবনের সেই উপহার, যেটা চাইলেও কখনো কল্পনা করতে পারিনি। আমি চিরকাল আপনার এই ভালোবাসার ছায়ায় বাঁচতে চাই জাহান।আর যদি কখনো অভিমান করি, মন খারাপ করি…জানবেন, তার মাঝেও আমি শুধু আপনারই হয়ে থাকতে চাই।

এরপর সে জাহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পরিবেশও বোধহয় তাদের পবিত্র ভালোবাসার পূর্ণতা দেখে খুশি হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পর জাহান মেহরিমার মুখশ্রী তার বক্ষ থেকে উঠিয়ে দুই হাতের আঁজলায় নেয়। মেহরিমার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। তারপর বলে–

—বউ, আজ যদি আমি তোমায় আমার করে নেই, তাহলে কি তুমি রাগ করবে? আজ রাতে… আমি তোমায় শুধু ভালোবাসতে চাই না, তোমার সমস্ত সত্ত্বায় নিজেকে বিলীন করে দিতে চাই। তোমার শরীর নয়, আমি তোমার আত্মাকে ছুঁতে চাই।

মেহু, আজ রাতে আমি শুধু ছুঁতে চাই না, তোমার মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতে চাই। তুমি কি আমায় সেই ঘন নীরবতায় প্রবেশ করতে দেবে? যেখানে ভালোবাসা শরীরে নয়, আত্মায় লেখা থাকে?

জাহান কথাগুলো শেষ করে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে থাকে তার উত্তর জানার জন্য। মেহরিমা জাহানের কথাগুলো বুঝতে পেরে লজ্জায় লজ্জাবতী গাছের মতো আরো নেতিয়ে পড়ে। সেও চাইছে আজ জাহানের অস্তিত্বের সাথে মিশে যেতে, তাকে একান্ত নিজের করে পেতে চাইছে। কিন্তু ঐ যে লজ্জা! সে যে স্বাভাবিকের চেয়েও একটু বেশিই লাজুক।

মেহরিমার কাছে আবারও বাচ্চাদের মতো আবদার করে বলে–

—মেহু, আজ রাতে আমি কি তোমায় ভালোবাসতে পারি, বউ?

ইশশ, রে! কি কিউট আবদার। ভালোবাসার মানুষটি ভালোবাসতে চাইছে, তাও এত কিউট করে। মেহরিমা কেন কোন প্রেয়সীই তার প্রেমিক পুরুষকে ফিরিয়ে দিতো পারবে না এই আবদারে।

মেহরিমার হঠাৎই এক দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলে। সে জাহানের এক গালে হাত রেখে তার অন্য হাত দিয়ে জাহানের চোখ চেপে ধরে তাদের দুইজনের অধর মিলিয়ে দেয়। স্পর্শটার স্থায়ীত্ব ছিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল অবর্ণনীয়। মেহরিমার তার অধর সরিয়ে এনে জাহানের কাঁধে মুখ লুকিয়ে নেয়। লজ্জায় তার গাল দুটো গরম হয়ে এসেছে। মেহরিমা মুখে কিছু না বলেও জাহানকে তার সম্মতির কথা বুঝিয়ে দিয়েছে, নিজের কাজ দ্বারা।

অন্যদিকে মেহরিমার এমনভাবে উত্তর দেওয়ায় জাহানের চিত্ত উল্লাসে মেতে উঠে। আজ তার প্রেয়সী অনুমতি দিয়েছে তাকে ভালোবাসার। এত খুশি জাহান কই রাখবে ভেবে পায় না।

জাহান ঝট করে মেহরিমাকে কোলে তুলে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুমে এসে তাঁকে বেডে শুয়ে দিয়ে নিজে চলে যায় বেলকনির দরজার লাগাতে। বেলকনির দরজা লাগিয়ে রুমে ডিম লাইট জ্বালিয়ে গায়ে থাকা ব্রেজারটা খুলে দূরে ছুড়ে মারে। কোথায় গিয়ে পরল সেদিকে আপাতত তার মাথা ব্যথা নেই। শার্টের বোতাম গুলো খুলতে খুলতে বেডে উঠে আসে।

জাহান যতই এক কদম করে এগোচ্ছে, মেহরিমা নার্ভাস হয়ে পড়ছে। জাহান যখন একদম মেহরিমার কাছে এসে পড়ে তখন মেহরিমা ঘাবড়ে গিয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়ে বেডশিট খামচে ধরে। তাকে এমনটা করতে দেখে জাহান বুঝে যায় মেহরিমা ভয় পাচ্ছে। বউকে ভয় দেখিয়ে তাকে আপন করে নেওয়ার মতো মানুষস জাহান না। সে চায় জাহান মেহরিমাকে যতটা স্পেশাল ফিল করাতে চায় এই মোমেন্টে, মেহরিমা যেন তা বুঝে।

জাহান মেহরিমার দুই গালে তার রেখে তার কপালের মধ্যিখানে গভীর ভাবো চুম্বন করে। জাহানের এই স্পর্শ মেহরিমার কাছে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। তার সকল ভয়, কাঁপানি সব দূর হয়ে যায়। জাহান এক এক করে মেহরিমার দুই চোখ, কপোল দ্বয় নিজের ওষ্ঠের স্পর্শ দিয়ে সিক্ত করে তুলতে থাকে। মেহরিমা যখন একদম শান্ত হয়ে যায় তখন জাহান তার অধর স্পর্শ করে স্বীয় অধর দ্বারা। মেহরিমা তার একহাত দ্বারা জাহানের পিঠ আর অন্যহাত দ্বারা তার কাঁধের কাছের চুল খামচে ধরে তাকে আরো নিজের কাছে টেনে আনে।

সময় তার আপন নিয়মে বইতে থাকে সেই সাথে জাহান আর মেহরিমার ভালোবাসা আরো গভীর হতে থাকে। দুই ভালোবাসার মানুষ তাদের ভালোবাসাকে পেয়ে সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সময় যতই পার হতে থাকে তালুকদার বাড়ির দো’তলার এই বদ্ধ রুমে সুখের আর্তনাদগুলো ততই প্রখর হতে থাকে।

_______________________________

দূরের মসজিদ থেকে আজানের পবিত্র বাণী ভেসে আসছে। আশিয়ানের ঘুমটা তখনই ভাঙে। ভোরে হয়ে এসেছে দেখে সে ভাবেন”এখন তাদের রুমে ফেরা উচিত”। যেই ভাবা সেই কাজ। সে তার বুকের উপর বিড়ালছানার মতো ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকা বউয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে ডাকতে থাকে–

—হায়া, ও বউ, উঠো। রুমে যেতে হবে যে, সকাল হয়ে এসেছে।

আশিয়ান কোন তাড়াহুড়ো ছাড়া আস্তে ধীরেই হায়াকে ডেকে তুলে। মূলত সে ভয় পাচ্ছে হায়াকে ডাকতে। কারণ, আজ সারারাত না সে ঘুমিয়েছে আর নাই বা মেয়েটাকে ঘুমাতে দিয়েছে। আধাঘন্টা হবে হয়ত তারা চোখ বন্ধ করেছে, আর এরই মাঝে আজান দিয়ে দিয়েছে। এখন হায়া উঠে তার মাথায় বাশ দিয়ে বারি মারতে চায় তাহলে আশিয়ান বেশি একটা অবাক হবে না।

হায়া একটি গাইগুই করতে করতে শোয়া থেকে উঠে বসে। গলা পর্যন্ত কাঁথা জড়িয়ে একহাত দিয়ে চুল খামচে ধরে বসে থাকে কিছুক্ষণের জন্য। দুইদিন ধরে এত দৌড়ঝাঁপ করার পর আজ আবার অশান্ত আশিয়ানকে সামলে সে প্রচন্ড ক্লান্ত। মাথা ভো ভো করে ঘুরছে তার। আশিয়ানের একটু খারাপই লাগে মেয়েটার বেহাল দশা দেখে। আজ সে একটু বেশিই বেপরোয়া হয়ে পরেছিল।

আশিয়ান নিজেই তার গায়ে কোন মতো শাড়ি পেঁচিয়ে দিয়ে কোলে তুলে নেয়। তারপর হাঁটা লাগায় রুমের উদ্দেশ্য। হায়া কোন বাঁধা দেয় না বা রাগ দেখায় না। মূলত সে এসব দেখানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই।

আশিয়ান রুমে এসে সোজা চলে যায় ওয়াশরুমে। হায়া ও সে একসাথে ফ্রেশ হয়ে বের হয়। আশিয়ান হায়ার সকল কাজ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে করে দেয়। দু’জনে একসাথে নামাজ আদায় করে আশিয়ান হায়াকে বেডে আধশোয়া করে বসিয়ে দিয়ে নিচে চলে যায় কিছু খাবার আনতে। বিশ মিনিট পর আশিয়ান মাঝারি এক বোল নুডলস আর বড় এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে আসে। রুমে এসে হায়াকে জাগ্রত অবস্থাতেই পায় আশিয়ান। আশিয়ান খাবারগুলো আস্তেধীরে হায়াকে খাইয়ে দিতে থাকে। এই পুরোটা সময় হায়া একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। আশিয়ান তাকে এত চুপচাপ দেখে ভেতরে ভেতরে বেশ অস্থির হয়ে পড়ে কিন্তু বাহিরে শান্ত থাকে।

আশিয়ানের মনের অস্থির তাও খানিক সময়ের মধ্যে গায়েব হয়ে যায় যখন কিনা হায়া বলে–

—আপনিও খান। আমার মুখে শুধু ঠুসছেন কেন?

হায়ার গলা কাঠকাঠ শোনালেও তার আড়ালে যে ভালোবাসা,যত্ন লুকিয়ে আছে সেটা আশিয়ানের থেকে ভালো আর কেই বা বুঝতে পারবে। আশিয়ান হায়ার সাথে সাথে নিজেও খেতে থাকে। দুধটাও হায়া অর্ধেক খেয়ে বাকি অর্ধেকটা আশিয়ানকে খাওয়ায়। আশিয়ান খাওয়াদাওয়া শেষ করে এঁটো থালাগুলো নিচে রেখে রুমে এসে দেখে বেড খালি। “বউ কই আমার?” সর্বপ্রথম এই প্রশ্নটাই আশিয়ানের মস্তিকে আসে। আশিয়ান ওয়াশরুমের দিকে তাকালে দরজা বন্ধ পায়। সে তড়িঘড়ি করে বেলকনিতে গেলে সেখানে তার বউকে পায়।

হায়াকে দেখতে পেয়ে সে বড় করে এক নিঃশ্বাস ছাড়ে। বউটা ইদানীং চোখের আড়াল হলে তার বুকে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। সে বিড়াল পায়ে হেঁটে হায়ার পেছনে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে তার অল্প ভেজা চুলে মুখ ডুবিয়ে দেয়। বিরবিরিয়ে কতবার ক্ষমা চায়, নিজের ভালোবাসা জাহির করে তার ইয়ত্তা নেই।

হঠাৎই হায়ার কিছু কথায় সে স্তব্ধ হয়ে যায়। মনের মাঝে বিরাজমান ভালোলাগা গুলো নিঃশেষ হয়ে গিয়ে সেখানে ঠায় নেয় ভয়।

শব্দসংখ্যা~২১০০
~চলবে?

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🥹]