সাঝের প্রণয়ডোর পর্ব-৫২+৫৩+৫৪

0
7

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫২
[পর্বটি রোমান্টিক। যারা রোমান্সধর্মী পছন্দ করেন না তারা ইগনোর করবেন প্লিজ]

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই রাহার মাথাটা কেমন ভার ভার লাগতে থাকে। সেই সাথে সে নিজের উপর ভারী কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে। পিটিপিট করে চোখ মেলে তাকালে নিজেকে তাদের রুমে পায়। চোখ ঘুরিয়ে বুকের উপর ভারী বস্তুটার দিকে তাকালে রাহার চোখ দুটো কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। আফিফ নিজের শরীরের অর্ধেকাংশ রাহার উপর দিয়ে তার কাঁধে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে।সে আর আফিফ একটা চাদরের তলায়। রাহা অনুভব করে তাদের দুইজনের গায়ে বস্ত্র বলতে সেই চাদর টুকুই রয়েছে। বিষয়টা অনুধাবন করতেই তার হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়।

রাহা চোখ বন্ধ করে কাল রাতের কথা ভাবতে থাকে। আবছা আবছা করে মনে পরতে থাকে তাদের দুইজনের এই অবস্থায় আসার আগের সময়টুকুর কথা।

___________________

~গতকাল রাতে~

আফিফের মতো একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের পক্ষে বউয়ের এমন আদুরে স্পর্শে নিজেকে কন্ট্রোল রাখা খুবই কষ্টের হয়ে যায়। রাহা আফিফের কাঁধের কাছের শার্ট খামচে ধরে তার এডমস অ্যাপেলে একের পর এক চুমু দিয়েই চলছে। মাঝে মধ্যে আবার দাঁত দিয়ে টুকুস করে কামড় দিচ্ছে। কামড় গুলোয় ব্যথা কম অনুভূতিদায়ক যন্ত্রণা বেশি ছিল।

আফিফ বহু কষ্টে রাহাকে নিজের ছাড়ায়। রাহার হাত দু’টো নিজের এক হাতের মুঠোয় নেয় আর অন্যহাত দ্বারা তার থুতনি ধরে রেখেছে। রাহা কেমন উন্মাদের মতো করছে। রাহা বলে–

—এই শয়তান ছেলে থামালি কেন আমায়? আমি চুমু খাচ্ছিলাম না ঐ ফোলাফোলা জায়গায়। ছাড় আমায় আমি আরো চুমু খাবো।

রাহার কথা শুনে আফিফের চোখগুলো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে যায়। একে তে রাহা তাকে তুই করে বলছে, দুয়ে আবার চুমু খাওয়ার জন্য পাগলামি করছে। আফিফ পারে না হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে কাঁদতে। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–

—রাহা, এমন করছো কেন সোনা? একটু শান্ত হয়ে বসো। আমি তোমার জন্য লেবুর শরবত নিয়ে আসছি। সেটা খেলে ভালো লাগবে তোমার।

রাহা জেদ দেখিয়ে বলে–

—আমি কোন শরবত টরবত খাবো না। আমি তোকে খাবো।

—আমাকে খাবে মানে?

হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞের করে আফিফ।

—হ্যা, আমি তোর গলার ঐ উঁচু জায়গায় চুমু খাবো। ছাড় বলছি আমার হাত নাহলে কামড় দিলাম কিন্তু।

রাহা কথাটা বলার সাথে সাথে একটা কামড় দিয়েও দেয়। আফিফ ব্যথায় রাহার হাত ছেড়ে দেয়। রাহা যেই না আফিফের গলার কাছে নিজের মুখ আনতে যাবে আফিফ তখনই রাহাকে কোলে নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বড় বড় পা ফেলে রাহাকে বেডে রেখে দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। রাহা তার পেছন পেছন আসতে নিলে আফিফ দরজা বাহির থেকে লক করে নিচে চলে যায়, রাহার জন্য লেবুর শরবত নিয়ে আসতে।

আসলে রাহা পূর্ব কখনোই ওয়াইন খায়নি। সে বাবার বিগড়ে যাওয়া সন্তান হলেও তার বাবা তাকে কিছু সীমানা বেঁধে দিয়েছিল। যেহেতু সে বাবা পাগল মেয়ে তাই বাবার বেঁধে দেওয়া সীমানাগুলোর বাহিরে যায় নি। তাই আজ প্রথমবার তার পেটে লাল পানি প্রবেশ করে তাকে এতটা এলোমেলো করে দিয়েছে।

আফিফ লেবুর শরবত নিয়ে ফিরে আসে পনেরো মিনিট পরই। লেবু খুঁজে পাচ্ছিল না, মেইড জানায় লেবু নাকি শেষ হয়ে গিয়েছে। অগ্যাত এই রাতে তার মায়ের বাগান ক্ষেত থেকে লেবু এনে তারপর শরবত বানাতে হয়েছে।

কিন্তু বেচারা এখন বউয়ের ভয়ে রুমে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। নেশাগ্রস্ত হয়ে কেমন পাগলামিটাই না করছে রাহা। ভয় লাগছে আফিফের। তাও দোয়া দরুদ পড়ে বুকে ফু দিয়ে আল্লাহর নাম নিতে নিতে রুমে প্রবেশ করে। কিন্তু রুমে ঢুকে বেড খালি পায়। হঠাৎই পেছন থেকে দরজা বন্ধ করার শব্দ শোনা যায়। আফিফ যেই না পেছনে ঘুরবে তার আগেই রাহা বাদরের মতো লাফ মেরে তার কাঁধ ধরে ঝুলে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় আফিফের হাত থেকে জুসের গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়।।

রাহা আফিফের কাঁধ ধরে ঝুলতে ঝুলতে বলে–

—হাউমাউখাউ, আমি ভুত। এখন তোর ঘাড় মটকাবো জামাই।

কথাটা বলার সাথে সাথে রাহা আফিফের কাঁধে কামড়ে ধরে। ব্যথায় আফিফের লোম খাড়া হয়ে যায়। আফিফ সেই অবস্থাতেই কোন মতে বিছানার কাছে এসে রাহাকে ঝটকা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে দৌড়ে ড্রেসিং টেবিলের কাছে চলে যায়। সেখানে গিয়ে আয়নার সাহায্য কাঁধের দিকে তাকালে অবাক হয়ে যায়। রাহা যেই জায়গা টায় কামড় দিয়েছে সেখান থেকে রক্ত না বের হলেও লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে। আর কয়েক সেকেন্ড গেলেই হয়ত রক্ত বের হয়ে আসত জায়গাটা দিয়ে।

আফিফের আস্তে আস্তে মেজাজ খারাপ হতে থাকে। সে পেছন ঘুরে রাহাকে বকা দেওয়ার জন্য, কিন্তু রাহাকে দেখে তার মাথা আবারও চক্কর দিয়ে উঠে। রাহা আফিফের একটা শার্ট পরে রয়েছে আর ট্রাউজার। ট্রাউজার টাও বোধহয় আফিফের কারণ সেটা রাহার পায়ের তলায় চলে গিয়েছে।

আফিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–

—এসব চেঞ্জ করলে কখন? আর কেনো?

—যখন আপনি আমায় ধোকা দিয়ে নিচে চলে গিয়েছিলেন। জানেন আমার মাথা না কেমন কেমন করছে তাই বমি করেছি। জামাটা একটু নোংরা লেগে গিয়েছিল তাই চেঞ্জ করে ফেলেছি।

কাঁদো কাঁদো গলায় বলে রাহা। আফিফের বুক চিরে কান্না বের হতে চায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহার কাছে এসে তার দুই গালে হাত রেখে কোমল গলায় বলে–

—রাহা সোনা পাখি, তুমি তো লক্ষী মেয়ে তাই না? তো লক্ষী মেয়েরা সবার কথা শুনে। তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো। আমি নিচে যাবো আর আসব, তোমার মাথা কেমন কেমন দূর করার ঔষধ নিয়ে আসছি, হ্যা?

রাহা নিজের গাল থেকে হাত সরিয়ে তাকে হ্যাচকা টান দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয়। তারপর তার পেটের উপর বসে মুখের দিকে ঝুকে এসে বলে–

—কোন ঔষধ লাগবে না। আমার বড় ঔষধ তো আপনি। এই আফিফ আপনি আমায় ভালোবাসেন না কেন? জানেন কেউ আমায় ভালোবাসে না।

কথাটা বলে সে আফিফের বুকের উপর শুয়ে কাঁদতে থাকে। আফিফ তার প্রতি মায়া হয়। সে রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—কে বলেছে কেউ তোমায় ভালোবাসে না? তোমার আম্মু, পাপা, ভাই। আমার আম্মু-বাবা সবাই তোমাকে কত ভালোবাসে।

—আর আপনি?

আফিফ রাহার প্রশ্নটা শুনে থমকে যায়। এমন না তার মনে অন্যকেউ আছে বা রাহাকে তার ভালো লাগে না। রাহা তার আশেপাশে থাকলে প্রচন্ড ভালো লাগে, মেয়েটা হাসলে যখন তার গালে সুন্দর দু’টো টোল পরে তখন তার মন চায় সেখানে একটি আদর দিতে। সে রাহাকে সবসময় স্পেশাল ফিল করাতে চায়। এসব যদি ভালোবাসার লক্ষণ হয় তাহলে আফিফ ভালোবাসে। হ্যা, সে তার স্ত্রীকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু সে একটু দ্বিধান্বিত।

রাহা তাঁকে আবারও প্রশ্ন করে–

—হায়াকে তার বর কত্তো ভালোবাসে। মেহরিমার বরের কথা তে বাদই দিলাম। সে তো বউ বলতে পাগল। আদিবাকেও তার বর ছোট থেকে ভালোবাসে। আর আমার বর? আমার ভাগ্যটা এবারও খারাপ। আসলে আমার মতো মেয়ের জন্য এমনটাই হওয়া উচিত। সবসময় বাবার টাকায় চলে অন্যদের ছোট করেছি, কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি। তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছি। তাই তো আল্লাহ এখন আমায় পানিশমেন্ট দিচ্ছে। আমি জানি তো আমি পঁচা মেয়ে। আমার সাথে এমনটাই হওয়া উচিত।

বমি করার কারণে নেশা প্রভাব কিছুটা কমেছে রাহার। সে এসব কথা বলছে আর কাঁদছে আফিফের বুকের উপর শুয়ে শুয়ে। আফিফ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করতে করতে বলে–

—কে বলেছে রাহা পঁচা? আমার দেখা লক্ষী মেয়েদের মধ্যে রাহা একজন। কাঁদে না সোনা পাখি।

—লক্ষী মেয়েদের তো সকলে ভালোবাসে। তাদের বর রাও, তাহলে আপনি কি আমায় ভালোবাসেন আফিফ?

আফিফ নিজের মনে দ্বিধা থাকায় কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। রাহার হুট করে কি হলো, সে আফিফের পরিধেয় শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। আফিফ থতমত খেয়ে তাকে থামাতে নেয় কিন্তু রাহা নিজের কাজ করে চলেছে। আফিফ অস্থির হয়ে বলে–

—এমন করছো কেনো রাহা? প্লিজ এমনটা করো না। তুমি এখন নেশাগ্রস্ত, যখন তোমার নেশা কেটে যাবে তখন তোমার এসব কিছুই মনে থাকবে না। আমায় দোষারোপ করবে। প্লিজ শান্ত হও একটু।

—কে বলেছে আমি নেশাগ্রস্ত। আই এম ফিট এন্ড ফাইন ডাক্তার সাহেব। আর আপনাকে দোষারোপ করার কি আছে? আমরা স্বামী স্ত্রী, এগুলো আমাদের মধ্যে কমন ব্যাপার। আপনি শান্ত হন আর আমার আদর নেন। পারলে নিজেও করতে পারেন আমি কিছু মনে করব না।

কথাগুলো বলতে বলতে সে আফিফের শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে ফেলে, তারপর সেখান টায় নিজের নরম অধরের উষ্ণ স্পর্শ দিতে থাকে। আফিফ তাকে থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু রাহা নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে আজ স্বামীর ভালোবাসা নিয়েই ছাড়বে।

শত হোক আফিফ একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ। কোন নারী যদি নিজ থেকে কাছে যাওয়ার আহবান করে, আর সেই নারীটি যদি হয় হালাল তাহলে কোন পুরুষ কি তার আহবানে সাড়া না দিয়ে পারে? মহা মানবরা ছাড়া হয়ত পারে না। কিন্তু আফিফ তো মহামানব নয়, সে তো সাধারণ একজন।

আফিফ শক্তি খাটিয়ে রাহাকে উল্টে বেডে ফেলে দেয়। রাহা তখনও তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। আফিফ একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে–

—ভালোবাসা ছাড়া সম্পর্কের কোন নিশ্চিয়তা নেই রাহা। শারীরিক আকর্ষন কখনোই একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে না। তুমি আরেক বার ভেবে দেখো প্লিজ।

—আমার প্রতি যে আপনার বিশেষ একটা ফিলিংস আছে সেটা আমি বহু আগেই বুঝে গিয়েছি ডাক্তার। আপনি সেটা প্রকাশ করতে না চাইলেও আপনার চোখ আমায় তা জানিয়ে দিয়েছে। আর আমি যে আপনার প্রতি কিছু ফিল করি না এমনটা না। পাপার পর আপনার কাছে আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করি। আপনি একটু দেরি করে আসলে আমার বুকটা কেমন ধরফর করতে থাকে। “আপনি ঠিক আছেন তো”? এই প্রশ্নটা বুকের ভেতর ঝড় তুলে দেয়। আপনাকে সুস্থ সবল না দেখা অব্দি সেই ঝড় থামে না। এসব কিসের লক্ষণ ডাক্তার? আমার মন তো বলে এসব প্রেমে পারার লক্ষণ, কিন্তু মস্তিষ্ক বলে এত তাড়াতাড়ি কি করে আবার প্রেমে পরলাম আমি? মন ও মস্তিষ্কের এই আলাদা আলাদা উত্তরে আমি অতিষ্ঠ। আমাদের সম্পর্ক অন্যদের মতো ভালোবাসা দিয়ে না শুরু হোক, আপনি না হয় আমায় ভালোবাসা শিখিয়ে দিয়েন। আমি সব বুঝে শুনেই আজকে এই পদক্ষেপটা নিচ্ছি। আপনি প্লিজ আমায় ফিরিয়ে দিবেন না।

কথাগুলো বলতে বলতে রাহার চোখের কার্ণিশ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরতে থাকে। আফিফ এতক্ষণ একধ্যানে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছিল। রাহার কথা শেষ হতেই আফিফ রাহার চোখের পানি মুছে দিয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন করে। আফিফের গলায় থাকা রাহার হাতের বন্ধন আরো মজবুত হয়। রাহা আফিফের দ্বিধা বুঝতে পেরে নিজেই সর্বপ্রথম তাদের দু’জনের অধর এক করে দেয়। আফিফ মনে মনে কিছুটা সংশয় নিয়েই স্ত্রীকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেয়।

সময় গড়ানোর সাথে সাথে আফিফের সেই সংশয়ও মন থেকে দূর হয়ে যেতে থাকে। আগামীকাল কি হবে এটা ভেবে আজকের সুন্দর মুহূর্তটা সে নষ্ট করতে চাইছে না। রাহার সাথে একবার যখম তার নিয়ে হয়েই গিয়েছে এই জীবনে সে আর রাহাকে ছাড়ছে না।

আফিফ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে–

—এই এক জীবনে তোমার আফিফ মাহমুদের কাছ থেকে মুক্তি নেই সোনা পাখি।

______________________________

~বর্তমান~

গতকাল রাতের সব কথাই রাহার আস্তে আস্তে মনে পরছে। রাহা তৃপ্তিরদায়ক একটা শ্বাস নেয়। একটা হাত উঠিয়ে আফিফের চুলের ভাঁজে গুজে দিয়ে আলতো হাতে টানতে থাকে। আফিফের বোধহয় বিষয়টা ভালো লাগে যার কারণে সে একটু গুঙিয়ে উঠে। রাহা আস্তে করে তার মাথা উঠিয়ে আফিফের এলোমেলো চুলের উপর চুম্বন করে। বিরবিরিয়ে বলে উঠে–

—আমি সেচ্ছায় আপনার বন্দিনী হলাম ডাক্তার সাহেব।

_________________________

—আশিয়ান, আমি একটি সুস্থ-স্বাভাবিক লাইফ চাই। যেখানে অন্যায় অপরাধের বিন্দুমাত্র স্থান থাকবে না। এবং এই সুন্দর লাইফে আমি আপনাকেও আমার অর্ধাঙ্গ হিসেবে চাই। এর জন্য আমার একার এফোর্ট কখনোই যথেষ্ট হবে না, এর জন্য আমার আপনারও সাহায্য প্রয়োজন।

আশিয়ান হায়ার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে। হায়া কথাগুলো বলে থামতেই আশিয়ান তাকে নিজের দিকে ফেরায়। তার দুই গালে হাত রেখে বলে–

—আমিও তোমার সাথে একটা হ্যাপি ম্যারিড লাইফ চাই। এর জন্য আমায় যা যা করতে হবে আমি করব। তুমি বলো আমায় কি করতে হবে আমি সব করব তোমায় নিজের কাছে রাখার জন্য।

আশিয়ানের কথা শুনে সত্যিকার অর্থে হায়ার মনটা ভালো হয়ে যায়। আশিয়ান তাঁকে একটু বেশিই ভালোবাসে, যার প্রমাণ সে বারংবার দিয়ে আসছে তাদের বিয়ের পর থেকে। হায়া বলে–

—বিদেশে যাওয়ার পর থেকে আমায় বিয়ে করার দিন পর্যন্ত সব ঘটনা আমায় খুলে বলুন। আমি চাই না আপনার দ্বারা সংঘটিত অন্যান্য কর্মগুলো কথা আমাকে অন্যের থেকে শুনতে হোক। আপনার মুখে শুনলে আমি হয়ত এতটা বেশি কষ্ট পাবো না, যতটা না অন্যের মুখে শুনে পাবো। ফারাবী ভাইয়ার থেকে আপনার ঐকাজের কথা শুনে আমি কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম তা শব্দে প্রকাশ করতে পারব না।

আশিয়ান হায়ার কথাগুলো শুনে তার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে ভাবতে থাকে–

—আসলেই, আমার আর উচিত হবে না হায়ার থেকে কিছু লুকানো। আমার অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে হায়ার সবটা জানার অধিকার আছে। সত্যি গুলো একদিন না একদিন সামনে আসবে। সেই সত্য গুলো অন্যের কাছ থেকে জানার আগে আমার থেকেই নাহয় জানুক।

আশিয়ান হায়াকে নিয়ে বেলকনিতে রাখা ইজি চেয়ারে বসে পরে। হায়ার মাথাটা নিজের বুকের রেখে সে বলতে শুরু করে–

—আচ্ছা শুনো তাহলে……….

শব্দসংখ্যা~২০০০
~চলবে?

[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ]

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৩

—আমি লন্ডন চলে যাওয়ার পর যখন একা থাকতে শুরু করলাম, তখন আমার একাকিত্ব আমার ভুল গুলো বুঝাতে শুরু করল। সবসময় বাবা-মায়ের ছায়াতলে থেকে বড় হয়ে সেখানে গিয়ে বড্ড একা হয়ে পরেছিলাম। তারপর আমি এমন ভাবে চলে যাওয়ার জন্য যখন আম্মু আর বাবা আমার সাথে কথা বলত না তখন তো কষ্টে বুকটা ফেটে যেতো। তারা আমার সাথে কথা না বললেও আমি তাদের খোজ খবর ঠিকই নিতাম।

—কিভাবে?

হায়া প্রশ্ন করে উঠে। আশিয়ান হায়ার চুলে ভাঁজে নিজের আঙুলের স্পর্শ দিতে দিতে বলে–

—আফিফের মাধ্যমে। তখন পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার একটাই মাধ্যমে ছিল আফিফ। আফিফের কাছ থেকেই পরবর্তীতে তোমার সম্পর্কে জানতে পারি। আমি যখন চলে গিয়েছিলাম তখন আমার কারো কথা মাথায় ছিল না। সকলের উপর প্রচন্ড রাগ নিয়ে, বিশেষ করে তোমার উপর একপ্রকার ঘৃণা নিয়ে দেশ ছেড়ে ছিলাম। তখন মাথায় শুধু এটাই ঘুরছিল– বিয়ে মানে আমার স্বাধীনতার অপমৃত্যু, অপর একজন মানুষের অযাচিত দায়িত্ব। আমি এসবের থেকে মুক্তি নেওয়ার জন্যই দেশ ছেড়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তোমার সামাজিক দূর্দশার কথা জানতে পারি ভীষণ গিল্টি ফিল হতে থাকে। লন্ডন যাওয়ার ছ’মাস পর বাবা-মা, ও বাবাই-মাম্মামের সাথে যোগাযোগ করি। বাবা আমার সাথে কথা না বললেও বাকিরা কথা বলে আর আমায় ক্ষমাও করে দেয়। তারপর আমি বাবাইয়ের কাছে তোমাকে দিতে বললে সে বলে, তোমার মাত্রই একটু অভারকাম করছ সবকিছু থেকে, এখন যদি আবার আমার সংস্পর্শে আসে তাহলে তোমার মেন্টাল হেলথ আবারও বিগড়ে যেতে পারে তাই আমি যেনো তোমার সাথে যোগাযোগ না করি।

বিষয়টা প্রথমে মেনে নিলেও কয়েকদিন যাওয়ার পর তোমার সাথে কথা বলার জন্য মনটা কেমন ছটফট শুরু করল। অপরাধবোধ নাকি অন্যকিছু জানি না, একসময় না পেরে তোমার সাথে যোগাযোগ করেই ফেললাম। কিন্তু তুমি তো দিলে আমায় ব্লক মেরে। তখন অদ্ভুত একটা জেদ চেপে বসল। তোমার থেকে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আমি কিছুতেই তোমার বিষয়টা ভুলতে পারব না, এই ভেবে একটা ফেইজ আইডি খুললাম। নামটা কি জানো?

—কি?

ঘুমুঘুমু কণ্ঠে বলে হায়া।

—রুমা মাহবুব।

নামটা বলে আশিয়ান দাঁত কেলিয়ে হেঁসে দেয়। অন্যদিকে আশিয়ানের মুখে এই নামটা শুনে হায়ার সব ঘুম পালিয়ে যায়। সেখানে ঠায় নেয় অবাকতা। রুমা মাহবুব তো তার সেই ফেসবুক ফ্রেন্ড যে কিনা প্রায় একবছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। হায়া মনে মনে সময়ের হিসাব করলে সেটা গিয়ে দাঁড়ায় আশিয়ানের বাংলাদেশে ফেরার সময়ে। তারমানে আশিয়ানই সেই রুমা মাহবুব।

হায়া বিস্ময় নিয়ে বলে–

—তার মানে আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ফ্রেন্ড টা আপনি?

—হ্যা আমার জান। আমি অজানা কারণে তোমার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। তোমার সাথে কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করত। আমায় ব্লক করার পর আমার সেই ছটফটানি আরো বেড়ে গেলো। আর তখনই আমি রুমা মাহবুব নামের ফেইক আইডি খুলে তোমার সাথে কথা বলা শুরু করি। আস্তে আস্তে তোমার মায়া আরো বাড়তে থাকে, এবং একসময় গিয়ে আমি উপলব্ধি করতে পারি আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু কিভাবে তোমায় আমার মনের লঘা জানাবো এসব ভাবতে ভাবতে দিন কাটছিলো তখনই তোমার আর ফারাবীর এনগেজমেন্টের খবর পাই। সেদিন লন্ডনে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়েছি। সেই ঠান্ডার মাঝে আমি দুই ঘন্টা শাওয়ার নেই। পরবর্তী অবশ্য এক সপ্তাহ বিছানায় চিৎপটাং হয়ে ছিলাম। সুস্থ হয়ে ওঠার পর সিদ্ধান্ত নেই, জীবনে প্রথমবারের মতো যাকে মনে ধরেছিল তাকেই সঙ্গিনী করব। তারপর আমার জব ছেড়ে রিসার্চের কাজে লেগে পড়ি। উদ্দেশ্য ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রিসার্চ পেপার জমা দিয়ে দেশে ফিরে তোমায় আমার ঘরনী করা। দেশে আসার পর তোমার ইগনোর আমায় আরো জেদি করে তুলেছি। সত্যি বলতে, তখন আমার মেইল ইগো কিছুটা কাজ করছিল। আর তখনই আমি ফারাবীর সাথে তোমার বিয়ে আটকাতে ওর বোনকে কিডন্যাপ করাই।

আশিয়ান এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে। হায়ার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে সে নিজের বুকের দিকে তাকালে দেখতে পায় হায়া ঘুমিয়ে পড়েছে। নিচের ঠোঁটটা বাচ্চাদের মতো একটু উল্টে ঘুমাচ্ছে। আশিয়ানের কাছে হায়াকে এত আদর আদর লাগছে যে, সে টপাটপ কয়েকটা চুমু এঁকে দেয় হায়ার অধরে। তারপর আলতো হাতে তাকে নিয়ে রুমে এসে অতি সাবধানে বিছানায় শুয়ে দেয়। জানালার পর্দাগুলো সুন্দর করে মেলে দিয়ে এসির পাওয়া বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও বিছানায় শুয়ে পড়ে। প্রিয়তম নারী টিকে নিজের বক্ষে আগলে নিয়ে নিদ্রা পরীর কোলে ঢলে পড়ে।

_________________________

বহু দিন কেটে যায় সময়ের শান্ত সরোবরে। আশিয়ান-হায়া, জাহান-মেহরিমা, জায়িন-আদিবা তাদের সংসার যেন একেকটি শব্দহীন গানের মতো, যার প্রতিটি নোটে মিশে আছে মমতা, ভালোবাসা আর নির্ভরতার অনুপম সুর। তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সকাল যেন হয়ে ওঠে নতুন শুভারম্ভ, আর প্রতিটি সন্ধ্যা ধরা দেয় একটি শান্ত পূর্ণতা হিসেবে।
তারা সকলেই পরিপূর্ণ হৃদয়ে নিজেদের সঙ্গীদের গ্রহণ করেছে। যেখানে গ্রহণে নেই কোনো অতৃপ্তি, নেই কোনো অভিমান। আছে কেবল গভীর সন্তুষ্টি, আর এক চিরন্তন ভালোলাগার আশ্রয়।

সন্তানদের সুখে দেখে তাদের সকলের বাবা-মায়েদের চোখ খুশিতে ভিজে উঠে মাঝে মধ্যেই। কিন্তু এই তিন জুটির বাহিরে আরেক জুটি রয়েছে আমাদের এই ভালোবাসার গল্পে যাদের মাঝে চলছে অঘোষিত বিচ্ছেদ। সেই জুটি কোনটা আপনারা কি আন্দাজ করতে পারছেন? হ্যাঁ, তারা হলো আফিফ ও রাহা। তাদের কাছাকাছি আসার সেই দিনটার পর থেকেই তাদের বিচ্ছেদ শুরু হয়েছে। কেনো চলছে সেটা তাদের কারোর কাছেই নেই।

____________________________

হায়া, মেহরিমা আর আদিবার ভার্সিটি আবার শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের রেজাল্ট দিয়েছে এবং হায়া ও মেহরিমা ফার্স্ট ক্লাস পেলেও আদিবা পায় নি। এতে যদিও তার কিছু যায় আসে না কারণ সে তো আর পড়ালেখাই করতে চাইছে না আর। কিন্তু তার স্বামী মহাশয় ও শ্বশুর বাড়ির লোক শুনলে তো। তাদের এক কথা, আগে পড়ালেখা পরে সংসার। সংসার তুমি করার সময় পাবে, কিন্তু পড়ালেখার সুযোগ একবার চলে গেলে একসময় না এটার জন্য আফসোস করতে হয়। তাই তো আদিবার শত বিতৃষ্ণা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

হায়া, মেহরিমা ও রাহা এক ভার্সিটিতে পড়লেও, আদিবা অন্য ভার্সিটিতে পড়ে। ভার্সিটিতে হায়া ও মেহরিমা একসাথেই থাকে। ছুটির পর মেহরিমার জন্য বাসা থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেটাতে করে মেহরিমা বাসায় এসে পড়ে। আর হায়া চলে যায় তার বাড়ি।

____________________________

ক্লাস শেষ করে দুই বান্ধবী ভার্সিটির মাঠের দিকে হাঁটা দেয়। আরেকটা ক্লাস রয়েছে কিন্তু সেটা এক ঘন্টা পর। তাই এই এক ঘন্টা তারা গল্প করে কাটাবে বলে ঠিক করেছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা মাঠে গিয়ে বসার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে। তখনই তাদের নজরে পড়ে খানিকটা দূরে একটু শান্ত জায়গায় উদাসীন মুখ ও অশ্রু ভর্তি চোখ নিয়ে বসে থাকা রাহাকে।

হায়া ও মেহরিমা নিজের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে। তারা দু’জন রাহা পাশে বসার পরও রাহার কোন খেয়াল নেই। সে এক ধ্যানে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। হায়া তার কাঁধে হাত দিয়ে ডেকে উঠে–

—রাহা, কি হয়েছে তোমার? চোখমুখ এমন লাগছে কেনো তোমার?

রাহা চমকে উঠে হায়ার গলা শুনে। তার চেয়েও বেশি চমকে যায় হায়া ও মেহরিমাকে নিজের পাশে বসে থাকতে দেখে। মেহরিমার দিকে এক নজরে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে হায়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার ভান করে বলে–

—কেমন আছো তোমরা?

—আমরা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কিন্তু তোমার কি হয়েছে? কাঁদছ কেনো তুমি?

কান্নার বিষয়টা হায়াদের সামনে প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় হায়া একটু বিব্রতবোধ করে। সে মেকি হেসে বলে–

—আরে কি আর হবে? কিছু হয়নি তো। আর কাঁদব কেনো? তাহলে অনেকক্ষণ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে ছিলাম তো তাই চোখে পানি জমেছে।

হায়া বা মেহরিমা কারোরই রাহার কথা বিশ্বাস হয় না। রাহার চোখই বলে দিচ্ছে সে ভালো নেই। এবার মেহরিমা তার কাছে এসে তার কাঁধে হাত রেখে কোমল গলায় জিজ্ঞেস করে–

—তুৃমি বলছো এক আর তোমার চোখ বলছে আরেক কথা। তুমি চাইলে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারো।

রাহা মেহরিমার কথা শুনে তার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটাকে একসময় সে ও তার বাবা কতটা কষ্ট দিয়েছিল আজ সেই মেয়েটাই তার বিষাদ কারণ জানতে চাইছে, তাও আবার এত কোমল গলায়। মেয়েটা আসলেই সহজ-সরল আর ভীষণ ভালো মনের। নাহলে তার জীবনের এতবড় একটা ক্ষতি করতে চাওয়া মানুষের সাথে এত ভালো আচরন করে নাকি কেউ? রাহা তো পারবে না নিজের শত্রুর সাথে এত ভালো আচরন করতে।

মেহরিমা আবারও বলে–

—কি হয়েছে রাহা? সব ঠিক আছে তো?

প্রশ্নটা শুনে রাহা দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে দেয়। হায়া ও মেহরিমা চমকে যায় তাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে।তারা বুঝতে পারে বিষয়টা সিরিয়াস তাই রাহা এমনভাবে কাঁদছে। রাহাকে তারা মন খুলে কাঁদতে দেয়। অনেক সময় কাঁদতে দেওয়া উচিত এতে করে মনের অর্ধেক বিষাদ দূর হয়ে যায়।

বেশ কিছুক্ষণ কান্না করার পর একটা সময় রাহা একা একাই থেমে যায়। রাহাকে থামতে দেখে মেহরিমা নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে তার দিকে এগিয়ে দেয় খেতে। রাহা চুপচাপ সেখান থেকে কিছুটা পানি খেয়ে নেয়।

পানি খাওয়া শেষে একটু সময় থম মেরে বসে থেকে নিজে থেকেই বলতে থাকে–

—জানো আমি মেয়েটা না ছোট থেকে ভীষণ স্বার্থপর ছিলাম। বুঝ হওয়ার পর থেকে নিজেরটা ছাড়া আর কারোটা ভাবতাম না। অনেকের থেকে তার প্রিয় জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছি বা নেওয়ার চেষ্টা করছি, যার শাস্তি এখন এসে পাচ্ছি।

ভাঙা ভাঙা গলায় কথা গুলো বলে রাহা। হায়া ও মেহরিমা কিছুই বুঝতে পারছে না। রাহা আবার বলে–

—আমার বোধহয় তোমাদের মতো সংসার করা হবে না। আফিফ আমায় ছেড়ে দিবে। তার জীবনে নতুন নারীর আগমন ঘটেছে।

রাহার কথাটা শুনে হায়া ও মেহরিমা যেমন কষ্ট পায় তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে যায়। মেহরিমা আফিফ সম্বন্ধে তেমন একটা কিছু না জানলেও হায়া বেশ ভালোই জানে। আফিফ সেই আদর্শবান বাবার ছেলে যে কখনো নিজের ব্যক্তিগত নারীর ব্যতীত অন্যকোন নারীর দিকে ভালোলাগার চোখে তাকায় না। সেই আফিফ কিনা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অন্য নারীকে জীবনে এনেছে?

~চলবে?

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৪

—কি হয়েছে একটু খুলে বলবে? আমি যতটা আফিফ ভাইয়াকে চিনি, সে এমনটা করতেই পারে না। আর বিয়েটা তো সে নিজের ইচ্ছেতেই করেছিল, তাহলে বিয়ের চার মাসের মাথায় আবার অন্য সম্পর্ক?

হায়ার প্রশ্ন শুনে রাহা ডুবে যায় তার জীবনের সুন্দরতম রাত কাটানোর পরের দিনে।

_________________________

অতীত~

আফিফ ঘুম থেকে উঠে নিজেকে এলোমেলো অবস্থায় পায়। চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এদিক সেদিক তাকালেও সেই রমনীটিকে পায় না যার জন্য আজ তার এই এলোমেলো অবস্থা। রাহাকে দেখতে না পেয়ে আফিফ চিন্তায় পড়ে যায়। রাহা আবার তাকে ভুল বুঝলো না তো? কথাটা মনে উঠতেই তার বুকটা প্রচন্ড জোরে ধক করে উঠে। সে তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে হসপিটালের জন্য রেডি হয়ে একেবারে নিচে নামে।

আজ তার উঠতে দেরি হয়েছে ঘুম থেকে। আফরা ও আদিয়াত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর রাহাই তাদের ব্রেকফাস্ট করে নিতে বলে। তারা দু’জন পুত্রবধূর কথা মতো ব্রেকফাস্ট করে নেয়। আফিফ নিচে নামলে রাহা আফরাকে দুপুরের রান্নার তাড়া দেখিয়ে নিজে কিচেনে থেকে যায়। আর আফরাকে বলে সে যেনো আফিফকে ব্রেকফাস্টটা বেড়ে দেয়। আফরা বেশি না ভেবে তাই করে।

আফিফ ব্রেকফাস্ট করতে করতে অনেকবার উঁকিঝুঁকি মারে কিচেনের দিকে, একটা বার রাহাকে দেখার জন্য। কিন্তু রাহা তার কাছে ধরাই দেয় না। আফিফের জরুরি একটা অপারেশন থাকায় সে রাহার সাথে কথা না বলেই চলে যায়। ভাবে এসে কথা বলবে বিষয়টা নিয়ে।

কিন্তু এসে আর রাহাকে বাসায় পায় না। কেনো? কারণ সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছিল। বিয়ের পর প্রথম সেদিন গিয়েছিল রাহা তার বাবার বাড়ি। তাও যেতো না কিন্তু তার মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে না গিয়ে আর থাকতে পারে না। আদিয়াত আর আফরা গিয়ে তাকে রেখে আসে চৌধুরী বাড়ি।

মুনতাহার শরীর বেশ ভালোই খারাপ ছিল। অসুস্থতার জেরে তাকে হসপিটালেও ভর্তি করা হয়। মাকে নিয়েই কয়েকদিন রাহা বেশ চিন্তিত ছিল যার কারণে আফিফের সাথে সেই বিষয়ে আর কথা হয় না। মূলত সে নিজেই বলে না। তার কেমন লজ্জা লাগছিল বিষয়টা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলায়। ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে একসময় স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলে। কিন্তু তার এই ভাবনাটাই তাদের সম্পর্কের কাল হয়ে দাড়ালো।

রাহা ২০দিনের মতো তার বাবার বাড়ি ছিল। এই বিশ দিনে সে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার আফিফের সাথে কথা বলেছে। কেমন আছেন? খেয়েছেন? কি করছেন? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কথোপকথন।

রাহার এমন লুকোচুরি পনায় আফিফ ধরে নেয় রাহা তাকে খারাপ ছেলে ভাবছে, যে কিনা তার বউয়ের নেশাগ্রস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েছে। একসময় আফিফও তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা শুরু করে। মাঝে একটা ক্যাম্পিংয়ে যায় দুই সপ্তাহের।

আফিফ ক্যাম্পিংয়ে চলে যেতেই রাহা হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে ভাবে আফিফ ক্যাম্পিং থেকে ফিরলে তাকে সুন্দর একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার মাধ্যমে আফিফকে নিজের অনুভূতি জানাবে। কিন্তু ক্যাম্পিং থেকে ফিরে আসার পর আফিফের ব্যবহার বদলে যেতে থাকে। রাত করে বাড়ি ফিরে, বাসায় একদিন আসলে তিনদিন আসে না। সারাক্ষণ হসপিটালেই পরে থাকে। রাহা তিনটা প্রশ্ন করলে একটার উত্তর দেয়। যেই আফিফ সবার সাথে সবসময় হাসি মুখে কথা বলত, সে এখন কথায় কথায় রাগ দেখায়।

একদিন রাহা তাদের রুমের বেলকনিটা সুন্দর করে সাজায়। নিজের হাতে আফিফের জন্য কয়েক পদের রান্না করে। নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে আফিফের জন্য। কিন্তু আফিফ আসে রাত একটায়। রাহার বরাবরই ধৈর্য একটু কম। সে রাত নয়টা থেকে সব কিছু রেডি করে আফিফের জন্য অপেক্ষা করছিল। আর আফিফ বাসায় যায় রাত একটায়। যার কারণে তার বেশ রাগ হয়।

আফিফ বাসায় এসে তার ক্লান্ত শরীরটা টেনে রুম পর্যন্ত নেয়। রুমে এসে সোফায় বসে একটু জিরচ্ছিল তখনই রাহা রেগেমেগে তার সামনে এসে হাজির। গলাটা খানিকটা উঁচু করে বলে–

—এত লেট হলো কেন আজ হ্যাঁ? কোথায় ছিলেন? কার সাথে ছিলেন?

কোথায় ছিলেন পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু কার সাথে ছিলো এই প্রশ্নটা শুনে আফিফ প্রচন্ড রেগে যায়। এমনিতেই সেই বিষয়টা নিয়ে মানসিকভাবে এখনও ডিস্টার্ব সে তারউপর রাহার এমন প্রশ্ন যেনো আফিফকে বলছে সে ঘরে স্ত্রী রেখেও বাহিরে পরকীয়া করছে। আফিফ তড়াক করে দাড়িয়ে গিয়ে রাহার দু’হাতে বাহু চেপে ধরে বলে–

—সব কথার কৈফিয়ত কি তোমায় দিতে হবে? আর কার সাথে ছিলাম মানে? আমাকে কি চরিত্রহীন মনে হয়? শুনো আগে নিজের চরিত্র ঠিক করো তারপর অন্যের চরিত্রে আঙ্গুল তুলতে আসবে।

কথাটা বলে আফিফ রাহাকে ছেড়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। রাগের মাথায় কি বলতে কি বলে ফেলেছে আফিফের খেয়াল নেই। আসলে শান্ত মানুষদের রাগ এমনই হয়। তারা সবসময় রাগে না, আর যখন রেগে যায় তখন কি রেখে কি করে বা বলে তাদের নিজেরও খেয়াল থাকে না। পরে রাগ পড়ে গেলে তখন এটা নিয়ে আফসোস করে।

এদিকে আফিফের কথাটা শুনে রাহা স্তব্ধ হয়ে যায়। সে বাকরুদ্ধ হয়ে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। আফিফের কথাটায় যে খুব হার্ট হয়েছে সেটা যে কেউ তার মুখ দেখে বলে দিতে পারবে। কিছুক্ষণ পর রাহা নিজেকে সামলে নিয়ে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয় তখনই আফিফের ফোনটা বেজে ওঠে। রাহার সমানেই ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে যায়। কলটা কেটে যাওয়ার সেকেন্ড কয়েক পরপরই একটা ভয়েস মেসেজ আসে। রাহা কি মনে করে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে মেসেজটা দেখার উদ্দেশ্য। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ এসেছে। নিম্মি নাম দিয়ে নাম্বারটা সেভ করা। পাশে একটা রেড হার্ট ইমোজি। এটা দেখে রাহার ভেতরের কষ্ট আরে বেড়ে যায়। কিন্তু সে যখন ভয়েসটা শুনে আরো একবার স্তব্ধ হয়ে যায়। একটা মেয়ে ভয়েস মেসেজটা পাঠিয়েছে। সেটায় মেয়েটা বলেছে–

—আফিফ আপনি কল ধরছেন না কেনো? প্লিজ একটু বাসায় আসেন না। অনেক বড় সমস্যা হয়ে গিয়েছে। প্লিজ একটু কষ্ট করে আসেন।

ভয়েটা শুনে রাহার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তে থাকে। সে ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বেলকনিতে চলে যা। ঝটপট হাতে সব ডেকোরেশন নষ্ট করে শুধু খাবারের প্লেট গুলো সেন্টার টেবিলের উপর রেখে রুম থেকে বের হয়ে গিয়ে আদিবার রুমে গিয়ে কাঁদতে থাকে।

আফিফ অনবরত নিজের ফোন বাজার শব্দে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। তড়িঘড়ি করে কলটা তুলে দেখে সেই নিম্মি নামের মেয়েটি কল করেছে। আফিফ সময় অপচয় ব্যতীত কলটা রিসিভ করে কানে লাগায়। তারপর অপর পাশ থেকে কিছু একটা বলতেই সে অস্থির হয়ে বলে–

—আমি আসছি। আপনি কান্না করবেন না প্লিজ।

কথাটা বলে আফিফ ফোন কেটে একটা টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে বাসার কাপড়েই দৌড়ে চলে যায়। আফিফের গাড়ি স্টার্ট করার আওয়াজে রাহা আদিবার রুমের বেলকনিতে গিয়ে দেখে আফিফ রাত দুটো বাজে আবার কোথাও যাচ্ছে। নিশ্চয়ই নিম্মি নামক সেই রমণীর কাছে। দৃশ্যটা দেখে তার পাঁজর ভাঙার মতো কষ্ট হতে থাকে। হাঁটু ভেঙে সেখানেই বসে কাঁদতে কাঁদতে রাতটা পার করে।

পরেরদিন বেশ বেলা করে বাসায় ফিরে আফিফ। বাসায় এসে মায়ের সাথে কয়েকটা কথা বলে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কয়েক ঘন্টা ঘুমায়। তারপর ঘুম থেকে উঠে লাঞ্চ করে হসপিটালে চলে যায়। তখন রাহা ভার্সিটিতে ছিল বলে তার সাথে দেখা হয় না। রাতেও অনেক দেরি করে আসে। ছুটির দিনগুলোতেও বাসায় কম থাকে, বাহিরেই বেশি থাকে। বাসায় থাকলেও রাহার সাথে খুব কম কথা হয়। মূলত ঘরে ভেতরে তাদের তেমন কথাই হয় না। যা হয় বাবা-মায়ের সামনেই হয়।

__________________________

~বর্তমান~

—বিয়ের আগে আমি যদি কোন ছেলে নিয়ে ভাবতাম, পাগলামি করতাম তাহলে সেটা শুধু জাহান ভাইয়াকে নিয়েই। ছাড়া আমার এতবছরের জীবনে কোন ছেলে ফ্রেন্ড বানাইনি আমি। সবসময় মাথায় একটা কথাই ঘুরত, কোন ছেলে ফ্রেন্ড বানালে যদি জাহান ভাইয়া আমায় খারাপ ভাবে? আমাকে খারাপ চরিত্রের মেয়ে ভাবে? এসব ভেবেই আমি ছেলেদের থেকে কয়েকশ’ হাত দূরে থাকতাম।

বিয়ের পর আফিফের যত্ন, তার বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসায় আমি জাহান কেও ভুলে গিয়েছি। এখন আফিফ ব্যতীত অন্য কোম পুরুষের কথা ভাবতেই কেমন গা গুলায়, অস্বস্তি হয়। আমি অনুভব করতে পারি আমার পুরো সত্ত্বা জুড়ে এখন শুধু আফিফের রাজ। কিন্তু সে আমার পুরোটা জুড়ে থাকলেও আমি যে তার কোথাও নেই। আমাকে সে খারাপ চরিত্রের মেয়ে মনে করে। তাই তো অন্য একজনকে নিজের জীবনে নিয়ে এসেছে। হয়ত আমাকে ছেড়ে তাকেই নিজের জীবনসঙ্গিনী বানাবেন কয়েকদিন পর। কিন্তু তোমরা বিশ্বাস করো, আমি খারাপ চরিত্রের মেয়ে না। আমি আফিফের সাথে সংসার করতে চাই। আমি চাই আমাদের দু’জনের একটা সুখের সংসার হোক।

কথাগুলো বলতে বলতে রাহা আবারও হুহু করে কেঁদে। বেচারী জাহানকে ভুলতে পেরেছিল আফিফের সাপোর্টের কারণে। কিন্তু এখন আফিফও যদি তাকে ছেড়ে দেয় তাহলে সে বোধহয় নিজের ভালোমন্দ কিছু একটা করে দিবে।

কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎই রাহা বমি করতে শুরু করে। হায়া আর মেহরিমা তার পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দুয়ে তাকে শান্ত করায়। রাহার বমি থামলেও তার শরীর ছেড়ে দিয়েছে আর ঘামতে থাকে দরদর করে। রাহার এমন অবস্থা দেখে হায়া আর মেহরিমা ঘাবড়ে যায়। তারা রাহাকে ধরাধরি করে স্টুডেন্ট হেল্থ কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাসায় যেয়ে রেস্ট নিতে বলে।

হায়া মেহরিমাকে ক্লাসের পাঠিয়ে দিয়ে নিজে একটা উবার ডেকে সেটাতে করে রাহাকে নিয়ে রওনা হয় মাহমুদ বাড়িতে।

আশিয়ান থার্ড ইয়ারে হায়াদের একটা কোর্সের ক্লাস নেয়। সে ক্লাস নিতে আড়ঁচোখে কয়েকবার হায়াকে খুঁজে কিন্তু পায় না। হায়া রাহার বিষয়ে তাকে টেক্সট করে বললেও তার ফোন অফিস-রুমে থাকায় সে টেক্সট টা দেখেনি। বিধায় এখন বউকে না দেখে সে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠে।

________________________________

হায়া রাহাকে দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর দু’টো বেজে যায়। এসে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে কিন্তু কিছুই খেতে পারে না। তার দুই রকমের পছন্দের মাছ রান্না করে রেখেছে স্পর্শ কিন্তু আজ তার হঠাৎ কি যেনো হলো,মাছ দেখলেই গা গুলিয়ে আসছে। তাই সে ভাজি আর ডাল দিয়ে কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে রুমে চলে আসে। পেটের ক্ষুধা তার এখনও মিটেনি তাও তার কিছুই খেতো ইচ্ছে করছে না। ক্ষুধা পেটে রেখেই সে ঘুমিয়ে যায়।

_________________________

—আই লাভ ইউ রাহা। আই লাভ ইউ সো মাচ। উইল ইউ বি মাই সোলমেট?

মাঝরাতে তরতাজা একগুচ্ছ গোলাপ রাহার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাঁটু মুড়ে প্রপোজ করে উঠে আফিফ। রাহা হুট করে আফিফের এমন প্রপোজালে হতভম্ব হয়ে যায়। তার কি রিয়াক্ট করা উচিত, বা কি বলা উচিত সে বুঝে উঠতে পারছে না। বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বেচারীকে আফিফ ঘুম থেকে টেনে তুলে এনে হুট করেই প্রপোজ করে বসে।

চলবে?

[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]