#পাষাণী_তুই
#পর্ব_৪
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
মেঘ প্রথমে খেয়াল করিনি। সানায়া যখন ডাক দেয় তখন সামনে তাকায়। মেঘের পাশে আরেকজন ডক্টর। মেঘের পাশের ডক্টর বলল…
“- ডক্টর মেঘরাজ ইনাদের চিনেন আপনি?
মেঘ চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে দুজনের দিকে। ইনায়া রা দুজন তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেঘ কি বলে শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। তবে সানায়া ফট করে বলে ফেলে,
“- আরে ভাই চিনে না মানে। উনি তো আমার ভাইয়া।
মেঘের পাশের ডক্টর অবাক হয়ে বললেন,
“- আমার জানা মতে তো উনার কোনো বোন নেই। তাহলে..?
সানায়া’র মুখ টা চুপসে যায়। ইনায়া চুপ করে আছে। মেঘ মৃদুস্বরে বলল,
“- ডক্টর ইফাদ। সানায়া যা বলছে একদম ঠিক বলছে। আমি ওর বড়ো ভাই।
ডক্টর ইফাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,
“- ডক্টর মেঘরাজ একটু ক্লিয়ার করে বলবেন প্লিজ ?
মেঘ হালকা হেঁসে বলল,
“- ডক্টর ইফাদ, ও আমার মেজো চাচ্চুর ছোটো মেয়ে। সানায়া চৌধুরী। আর ও….. বলে থেমে যায় মেঘ।
“- আর উনি কে?
সানায়া হেসে বলে,
“- আমার বড়ো আপাই। ভাইয়ার আরেকটা বোন!
মেঘ মৃদু হেসে বলল,
“- হ্যাঁ ওরা দু’জন ই আমার বোন!
ইফাদ মুচকি হাসে! এত গুলো কথা হয়েছে তবুও ও ইনায়া একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ সবার কথা শুনেছে। ডক্টর ইফাদ মুচকি হেঁসে বলল,
“- মিস আপনার নামটা তো জানা হলো না?
ইনায়া নিরব থেকে জবাব দেয়,
“- ইনায়া! মেঘ ভাইয়া আমরা আসি! বাসায় যেতে হবে! সানায়া চল বলে হাত ধরে যেতে গেলে মেঘের কথা’য় থেমে যায়। মেঘ বলল,
“- ইনায়া আমার হসপিটালে আসলি চা কফি কিছু খেয়ে যা!
ইনায়া পিছনে ফিরে মুচকি হেঁসে বলল,
“- না থাক ভাইয়া। অন্য একদিন খাব।
“- আচ্ছা ঠিক আছে।
ইনায়া আর সানায়া হসপিটাল থেকে বের হয়ে যায়। দুজনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে মেঘ। ডক্টর ইফাদ মেঘ কে বলল,
“- মেঘরাজ, আপনার ওই বোনটা কি কথা কম বলে?
মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“- আপনার এমনটা মনে হলো কেন ইফাদ?
“- উনি প্রথম থেকেই চুপচাপ ছিলেন কিন্তু পাশের টা একটু চঞ্চল স্বভাবের দেখে তাই মনে হলো। আপনি আবার কিছু মনে করবেন না মেঘরাজ।
মেঘ হালকা হেঁসে বলল,
“- কি মনে করব? আমি কিছু মনে করিনি। আপনার যা মনে হয়েছে তাই বলেছেন।
ইফাদ বলল,
“- আচ্ছা চলুন যাওয়া যাক।
“- আপনি যান আমি আসছি। ইফাদ আচ্ছা বলে চলে যায়। মেঘ আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইফাদের কথা মাথায় ঘুরছে। ইনায়া কি কম কথা বলে? আসলেই তো? মেঘ খেয়াল করেনি। ইনায়া আগের থেকে অনেকটা কম কথা বলে। অহেতুক কথা বলে না। অথচ একসময় সবার সাথে বিশেষ করে তার সাথে কিভাবে মন খুলে কথা বলত, হাসতো। আর আজ মেয়েটা কতটা বদলে গেছে! ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে নিজেকে বদলে ফেলেছে। সেদিন যদি তার কথা শুনতো তাহলে আজ ইনায়ার জীবন টা অন্য রকম হতো। তাদের একটা সুন্দর সংসার হতো। কখনো বলা হলো না ইনায়া আমি তোকে ভালোবাসি! মেঘ তাচ্ছিল্যের হাসে। নিজের ভাগ্যের কাছে হেরে গেছে তার ভালোবাসা! ইনায়া কখনো জানতে পারল না। তাকে একটা পুরুষ পাগলের মতো ভালোবাসতো! তার সবটা জুড়ে শুধু সে ছিল!
*******
***
সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে বসে আছেন চৌধুরী বাড়ির সবাই। মেঘের বাবা আর ইনায়ার বাবা কিছু একটা আলোচনা করছেন। মেঘ বাসায় নেই । এখনো ফেরেনি। ইনায়া মাত্র ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে। দু’জন কে কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“- তোমরা কি নিয়ে আলোচনা করছো?
ইনায়ার বাবা রফিক চৌধুরী বললেন,
“- রাজের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলছি মা।
ইনায়া বেশি অবাক হয় না। কারণ মেঘের বিয়ের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। ইনায়া মুচকি হেঁসে বলে,
“- মেয়ে দেখা হয়ে গেছি নাকি?
রাশেদ চৌধুরী বললেন,
“- না রে মা। এখনো দেখি নি তবে আমার একজন কলিগ এর মেয়ে আছে। দেখতে শুনতে খুব ভালো। ভদ্র আছে।
আপনাদের তো বলাই হয়নি। রাশেদ চৌধুরী একটা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল। আর ইনায়ার বাবা একজন সাংবাদিক। দুই ভাইয়ের পেশা আলাদা।
ইনায়া বলল,
“- মেঘ ভাইয়া জানে চাচ্চু?
“- এখনো বলিনি তবে আজ বলব ভাবছি। তুই একটা কাজ করে দিবি ইনায়া মা।
ইনায়া চমকে বলল,
“- আমি আবার কি কাজ করব চাচ্চু।
“- তুই একটু রাজ কে বোঝা মা। আমরা আগেও অনেক মেয়ে ওকে দেখিয়েছি তবে ওর কোনো মেয়ে নাকি পছন্দ হয় না। বিয়ের কথা বললেই শুধু এড়িয়ে যায়। আবার বলেও না ওর কোনো পছন্দ আছে কি না। যদি থেকে থাকে তাহলে আমাদের বলে দিলেই তো হয়। ছেলে টা আমার বিদেশ থেকে আসার পরই কেমন হয়ে গেছে। পরিবারের সব কিছু থেকে দুরে থাকে। বিয়ে করতে চাই না।
“- আমি কিভাবে বলব চাচ্চু? তোমরা বলো তাহলে ভালো হবে।
রফিক চৌধুরী বললেন,
“- ইনায়া না তোর চাচ্চু যেহেতু বলছে তাহলে তুই একটু রাজ বাবা কে বল না। যদি তোর কথা একটু শোনে। বিয়েতে রাজি হয়।
ইনায়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“- আচ্ছা ঠিক আছে। ভাইয়া বাসায় আসল বলব।
“- ঠিক আছে।
দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন। দেখতে দেখতে রাত বাড়তে থাকে। রাতের ডিনার করার সময় হয়ে গেছে। মেঘ একটু আগে বাসায় আসছে। সে নিচে আসলে সবাই খেতে বসবে।
ইনায়া সোফায় বসে ফোনে কথা বলছে । মর্ম ঘুমিয়ে গেছে। ইনায়া তার ছোটো চাচ্চু দের সাথে যেখানে থাকতো সেখানে নিজের একটা রেস্টুরেন্ট আছে। ইনায়া কখনো কারোর বোজা হতে চাই নি। কেউ করতে দিতে না চাইলেও ইনায়া জোর করে একটা রেস্টুরেন্ট করেছে। নিজে স্বাবলম্বী হতে চেয়েছে। ফোনে তাদের সাথে ই কথা বলছে। কথা শেষ করে ফোন রেখে দেয়। ততক্ষণে মেঘ চলে আসে। সিঁড়ি বেয়ে নামছে কিন্তু চোখ ইনায়ার দিকে। ইনায়া ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই মেঘের দিকে নজর পরে। দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। মেঘ দ্রুত চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। ইনায়া স্বাভাবিক ভাবে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ যে ভাবে অন্য দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। যখন তখন হোঁচট খেতে পারে।
মেঘ নিচে নেমে সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে। একে একে সকলে ডাইনিং এ গিয়ে বসে। ইনায়া সবার শেষে খেতে বসে। সবাই চুপচাপ খাচ্ছে। খাওয়ার সময় রাশেদ চৌধুরী ইশারায় ইনায়া কে বলতে বলে। ইনায়া ইশারায় বলবে বলে। মেঘ খাওয়া শেষ করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। ইনায়া খাওয়া শেষ করে নিজের রুমে যায়। মর্ম ঘুমোচ্ছে। মর্মের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রুম থেকে বের হয়।
মেঘ ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। ইনায়া ছাদে এসে মেঘের সিগারেট খাওয়া দেখে অবাক হয়ে বলল,
“- ভাইয়া তুমি সিগারেট খাও?
সহসা কেউ কথা বলায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মেঘ। ইনায়া কে দেখে হাসল। ইনায়া এগিয়ে আসল। আবার বলল,
“- ভাইয়া তুমি তো আগে সিগারেট খেতে না?
মেঘ জোরে হেসে বলল,
“- আগে খেতাম না এখন খাই।
“- এটা কেমন কথা?
“- সিম্পল কথা।
মেঘ সিগারেট নিচে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে পিশে ফেলে। তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“- এত রাতে তুই এখানে কেন?
“- তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
“- আমাকে? কি কথা অবাক হয়ে বলল মেঘ।
“- কেউ যেটা বলতে পারেনি। সেটা আমাকে বলতে হবে?
“- মানে……
মেঘ অবাক হয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে। ইনায়া তাকে কি বলবে? এতদিনে যেটা বলতে পারেনি ও কি সেটাই বলবে?
চলবে~