পাষাণী তুই পর্ব-০৫

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_৫
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
——–
মেঘ অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ইনায়ার কথা শোনার জন্য। ইনায়া দ্বিধায় পরে গেছে। কিভাবে মেঘ কে সব বলবে। মেঘ আর চুপ থাকতে পারে না। মুখ ফুটে বলে ফেলে,

“- কি বলবি তুই? চুপ করে না থেকে বল না! তোর কথা শোনার জন্য আমি অপেক্ষা করছি তো ইনায়া!

ইনায়া অবাক হয় মেঘের কথা’য়। মেঘ তার কথা শোনার জন্য এত অস্থির হচ্ছে কেন? ইনায়া বলল,

“- ভাইয়া এত অস্থির হয়ো না। আমি যা বলব তাই শুনে হয়তো তুমি খুব রিয়াক্ট করবে।

মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ইনায়া হালকা হেঁসে বলল,

“- ভাইয়া তোমার বিয়ে ঠিক করেছে?

ব্যস হয়ে গেলো। মেঘ এত জোরে বলে যে ইনায়া ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় ,

“- হোয়াটটটটটট….?

ইনায়া কান চেপে ধরে দাঁড়ায়। মেঘ ইনায়ার কাছে এসে বলল,

“- কি বললি, আবার বল!

ইনায়া এক চোখ বন্ধ করে আরেক চোখ অল্প একটু খুলে বলল,

“- শুনতে পাও নি তুমি?

কথাটা বলে ইনায়া যেন খুব অপরাধ করে ফেলেছে। মেঘ হুংকার দিয়ে ইনায়ার হাত চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলে,

“- তোর সাহস কি করে হয় আমাকে এই কথা গুলো বলার?

ইনায়া আশ্চর্য হয়ে যায়। সামান্য একটা কথা বলায় মেঘ এমন রিয়াক্ট করছে।ইনায়ার চোখ ছলছল করে ওঠে। মেঘ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাত ছেড়ে দেয়। ইনায়া ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল,

“- সামান্য একটা কথায় এতটা রিয়াক্ট না করলেও পারতে মেঘ ভাইয়া! আগে আমার পুরো কথাটা শুনতে। তারপর যা বলতে সব শুনতাম। কিন্তু তা না করে তুমি কি করলে….. অ্যই এম সরি! আমার কথা গুলো বলা ঠিক হয়নি বলে দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে যায়। ইনায়ার দৌড়ে চলে যেতে দেখে মেঘ ইনায়া বলে ডেকে ওঠে। ইনায়া চলে যায়। মেঘ রেগে স্বজোরে দেয়ালে ঘুষি দেয়! নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে তার। কেন এমনটা করল? নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারছে না মেঘ। পরপর কয়েকটা ঘুষি মারে দেয়ালে। হাত দিয়ে টপটপ করে রক্ত পরছে। সেদিকে মেঘের কোনো হুশ নেয়। তার ছোঁয়ায় তার প্রেয়সী ব্যথা পেয়েছে। মেঘ নিচে বসে পরে। হাত উঁচু করে চোখের সামনে ধরে তাচ্ছিল্যের করে বলে,

“- এই সামান্য রক্ত আমার প্রেয়সীর ব্যথার কাছে কিছু না মেঘ! এই হাত দিয়ে তোর ভালোবাসার মানুষ কে তুই আঘাত করছিস! তোকে তো তার শাস্তি পেতেই হবে। এটাই তোর শাস্তি! ইনায়া তো কিছু জানে না। তুই তো তাকে কোনো দিন একটা বার ও বলিস নি। ইনায়া আমি তোকে ভালোবাসি! ও তো তোর মনের মধ্যে থাকা না বলা কথা গুলো জানে না। তাহলে কেন তাকে ব্যথা দিলি!

আমাকে কেন বুঝিস না ইনায়া? কেন আমার না বলা কথা গুলো বুঝিস না! তুই কি আমার চোখের দিকে তাকালে বুঝিস না? আমার চোখ কি বলে! মেয়েদের সিক্সসেন্স তো খুব প্রখর! তাহলে তুই কেন এমন করিস!

মেঘের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে হাতে এসে পড়ে। মেঘ সেই এক ফোটা পানি চোখের সামনে ধরে হেঁসে বলল,

“- একতরফা ভালোবাসা খুব কষ্টের! সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি! একতরফা ভালোবাসা না কাউকে বলা যা আর না নিজে সহ্য করা যায়! তবুও কোনো দিন কাউকে জানতে দেয়নি সে ইনায়া কে ভালোবাসে! খুব খুব ভালোবাসে!

——

রুমের দরজা বন্ধ করে খুব কাঁদছে ইনায়া। খুব কষ্ট হচ্ছে তার! তার মেঘ ভাইয়া তার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারল। সে তো খুশি মনে তাকে বলতে গিছিল। সে তার দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিল। বোন হিসেবে মন থেকে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন করার মানে কি? কোন এমন করল? তাদের বাসার সবাই কি বদলে গেছে? সবাই কি তার সাথে এমন করবে? ভেবেই আঁতকে ওঠে ইনায়া।

রাত বাড়তে থাকে। তবে ঘুম নেই দুই জন মানুষের চোখে। একজন অনুশোচনায় ভুগছে আরেকজন কষ্টে! ইনায়া মেয়ে কে জড়িয়ে ধরে নিরবে চোখের পানি ফেলছে। ইনায়ার বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার একমাত্র মেয়ে! যার জন্য ইনায়া এখনো বেচে থাকার স্বপ্ন দেখে। সব কিছু, সব বাঁধা পেড়িয়ে সামনে আগাতে চাই মেয়ে কে নিয়ে। মেয়ের হাত ধরে বাকি টা জীবন পাড় করতে চাই। ইনায়া কালকে তার বাবার সাথে কথা বলবে? কি এমন কাজ তার দ্বারা ছাড়া আর কারোর দ্বারা হবে না। যদি সত্যি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে থাকে তাহলে সেটা নিজ দায়িত্বে পালন করবে। দ্যান মেয়েকে নিয়ে দেশ ছাড়বে। চার বছর আগে সে একটা গিছিল। নিজের ভিতর ছোট্ট একটা প্রাণ নিয়ে। তখন মর্ম পৃথিবীতে ভূপৃষ্ঠ হয়নি

ইনায়া তখন জানত না সে মা হতে চলছে। যখন জানতে পারে তখন অনেক টা দেড়ি হয়ে যায়। মর্মের জন্মের পর ডিভোর্সের সব কাজ সম্পূর্ণ শেষ করে। ইনায়া বা চৌধুরী পরিবারের কেউ ইমরান দের পরিবারের কাউকে জানায়নি। ইনায়া নিষেধ করে দিছে। এমনকি কেউ কোনো দিন জানবে না বলে সবাই কথা দিয়েছে। মর্ম’র বাবা মা সব ইনায়া।

এই চার বছর ইনায়া যেমন একা সব সামলিয়েছে। তেমনি বাকি জীবন ও একা সামলাবে বলে ঠিক করেছে। তাদের মা মেয়ের জীবনে কাউকে আসতে দেবে না। মা মেয়ের সুখী পরিবার হবে।

তবে আজকের ঘটনা গুলো বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ইনায়ার। মেঘ আজকে একটা জিনিস লক্ষ্য করছে। যেটা আগে কখনো করেনি বা তার চোখে পড়ে নি। মেঘ যখন তার দিকে রক্তচক্ষু চোখে তাকিয়ে বলছিল তখন মেঘের চোখে সে অন্য কিছু দেখেছে। কিন্তু সেসবে তার কিছু যায় আসে না। সেসব পাত্তা দেয় না ইনায়া। কেন সে মেঘ কে নিয়ে ভাববে। মেঘ তার জীবনে এমন কেউ নয় যে তাকে নিয়ে ভাবতে হবে। তার জন্য সময় নষ্ট করতে হবে। ভাববে না ইনায়া। তবুও বারবার তার চোখের সামনে মেঘের চেহারা ভেসে উঠছে। ইনায়া চোখ বন্ধ করে নেয়। কিন্তু বারবার চোখের সামনে মেঘের চেহারা ভাসছে। ইনায়া চোখ খুলে উঠে বসে। মর্ম’র গায়ে ভালো করে কাঁথা দিয়ে উঠে যায়। বেলকনির চেয়ারে এসে বসে। হাতে তার ফোন। যখন নিজেকে খুব একা লাগে৷ মানসিক ভাবে নিজেকে ঠিক লাগে না। তখনই ইনায়া কুরআন তিলাওয়াত শোনে। এখন তাই করবে। মনের শান্তি বড়ো শান্তি! ফোনে ইয়াসিন সূরা অন করে চোখ বন্ধ করে নেয়। গভীর মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শুনছে।

★★★

—-

রাত একটা। বদ্ধ ঘরেের মেঝে তে উদাস হয়ে বসে আছে মেঘ। এতদিন তো তার বেশ ভালোই দিন কাটছিল। যবে থেকে ইনায়া আসছে তবে থেকেই সব উলট পালট হয়ে গেছে তার। আগের মতো কিছু নেই। হাতের রক্ত শুকিয়ে গেছে। কিচ্ছু করেনি। ইচ্ছে করে হাতে ব্যান্ডেজ টাও করেনি। মনে মনে ঠিক করে নেয় কাল সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে ইনায়ার কাছে ক্ষমা চাইবে। তার ভুলের জন্য ইনায়া যা শাস্তি দেবে তাই মাথা পেতে নেবে৷ খাটে হেলান দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে মেঘ। এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে মেঘ।

চলবে~