#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১০
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
ইনায়া বাসায় ফিরে রুম থেকে আর বের হয়নি।। মর্ম মেঘের কাছে আছে। ইনায়া নিয়ে আসতে চাইলে মর্ম আসেনি। মর্ম বলেছে, মাম্মাম আমি হিরো মামা’র কাছে থাকি। তার সাথে গল্প করবো। ইনায়া আর জোর করেনি। মেঘের সাথে আষাঢ়ে গল্প জুড়ে বসেছে মর্ম।
এখন বিকাল চারটা। ইনায়া বেলকনির চেয়ারে বসে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে। সকালের ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি সে। ভুলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। মন থেকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। বারংবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মেঘের করা কান্ড গুলো। হুট করে চলে এসে ইমরানের কলার ধরে তাকে শাসানো। নিজের বউ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মর্ম কে নিজের মেয়ে বলা। সবটা ইনায়ার কাছে অদ্ভুত লাগছে। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক লাগছে এটা ভেবে যে মেঘ কেন এমন করল? একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কখনো চাচাতো বোন তার উপর আবার ডিভোর্সি। তাকে কি না নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। না না এটা হতে পারে না। আচ্ছা মেঘ ভাইয়া সেদিন তাকে কি বলেছিল। ইনায়া চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করে। ইনায়া বেশ কিছুক্ষণ সময় চোখ বন্ধ করে রাখে। অতঃপর চোখ খুলে তাকায়। তার মনে পরেছে। মেঘ একটা মেয়ে কে ভালোবাসতো। তবে দুরভাগ্য ক্রমে মেয়ে টা কে নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারে নি। নিজের মনের কথা বলার আগেই তার নাকি বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু…? সেই কিন্তু টাই রয়ে যায়। মেঘ তাকে আরো বলেছিল। মেয়ে টা যদি চাই তাহলে এখনো তারা এক হতে পারে। কিন্তু কিভাবে?
ইনায়া র মাথা ঘুরছে। অতিরিক্ত ভাবতে পারে না। তবুও ভাবতে তাকে হবে। তার দেশে আসার পিছনে খুব বড়ো একটা কারণ রয়ে আছে। তাকে সব সমাধান করতে হবে। তাও খুব দ্রুত।
ইনায়া ভাবছে, মেঘ যে মেয়ে কে ভালোবাসতো ইভেন এখনো ভালোবাসে। নিজের থেকেও বেশি। তার যদি বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তো তাদের এক হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ভাইয়া বলছে তারা এক হতে পারবে। কিন্তু কিভাবে? এখানে একটা কথা’য় আটকে যায়৷ সেটা হলো, মেয়েটার যদি ডিভোর্স হয়ে যায়। তবেই। যদি মেয়ে টা ভাইয়া কে পছন্দ করে বিয়ে করতে রাজি হয় তবেই তাদের এক হওয়া সম্ভব।
হুট করে ইনায়া র মাথায় একটা প্রশ্ন জাগে। বাই এনি চান্স মেঘ কি তাকে ভালোবাসে। যদি তাই হবে তাহলে তো মেঘ তাকে বলতো? কিন্তু মেঘ ভাইয়া তো তাকে কোনো দিন কিছু বলেনি। তবুও খটকা লাগে ইনায়ার কাছে। মেঘ ভাইয়া যদি তাকে সত্যি সত্যি ভালো বেসে থাকে তাহলে খুব সমস্যা হবে। যা সে কখনোই চাইবে না।
মেঘ যদি সত্যি তাকে ভালোবেসে থাকে। তাহলে তার ভালোবাসা অপূর্ণ ই থেকে যাবে। তার ভালোবাসা কখনোই পূর্ণতা পাবে। ইনায়া কখনোই চাইবে না তার জন্য মেঘের জীবন নষ্ট হোক। সে একজন ডিভোর্সি মেয়ে। তার একটা মেয়ে আছে।
আর ভাবতে পারছে না ইনায়া। এখন তার ঘুমোনোর প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সে মেঘের সাথে পরে কথা বলবে। ইনায়া বেলকনি থেকে রুমে চলে আসে। বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ফ্রেশ মুডে সে ঘুম দেবে।
★★★
সন্ধ্যা সাতটা। চৌধুরী বাড়ির সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। মেঘ আজ আর হসপিটালে যায়নি।। মর্ম দুপুর থেকে তার রুমেই ঘুমিয়ে ছিল। একটু আগে ঘুম থেকে উঠলে ইনায়ার রুমে দিয়ে আসে। ইনায়া তখন বেঘোরে ঘুমোচ্ছিল। মেঘ মর্ম কে রুমে দিয়ে চলে আসে। মর্ম নিজেই তার মাম্মাম কে ডেকে তুলবে।
মেঘ সোফায় এসে বাবার পাশে বসে। রাশেদ চৌধুরী ছেলে কে দেখে মুচকি হাসেন। বাবার হাসির বদলে মেঘ ও তাকে একটা হাসি ফিরিয়ে দেয়। রাশেদ চৌধুরী ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“- রাজ তোমার বয়স তো কম হলো না। এবার অন্তত বিয়ে টা করো আর আমাদের ও শান্তি দাও।
মুহূর্তেই মেঘের হাসি মুখটা কালো হয়ে যায়। মেঘ যে বিষয় এড়িয়ে চলে সেটাই বারবার তার সামনে চলে আসে। মেঘ চুপ করে থাকে। মেঘের চুপ থাকা দেখে রাশেদ চৌধুরী ফের বললেন,
“- দেখো রাজ, এভাবে চুপ করে এড়িয়ে গেলে কোনো কিছুরই সমাধান হবে না। তোমার যদি পছন্দের কেউ থাকে তাহলে আমাদের বলো। আমরা কথা বলে তার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করছি। তবুও এভাবে চিরকুমার থেকো না। আর যদি পছন্দের কেউ না থাকে তাহলে আমাদের পছন্দের মেয়ে কে তোমার বিয়ে করতে হবে। এটাই আমার লাস্ট ডিসিশন। বাকিটা তুমি ভেবো বলবে।
মেঘ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“- বাবা আমাকে কয়েকটা দিন সময় দেন। আমি নিজেকে সময় দেই তারপর আপনাদের বলছি। বলে ড্রয়িংরুম থেকে চলে যায়।
মেঘের চলে যাওয়া দেখে ফিরোজা চৌধুরী বলেন,
“- কোথায় যাচ্ছিস?
মেঘ যেতে যেতে বলল,
“- বাইরে
মেঘ সদর দরজা পেড়িয়ে বাইরে চলে গেলো।
____________________
মর্ম কাঁদছে! ইনায়া মর্ম কে সামলাতে ব্যস্ত। কিসের জন্য কাঁদছে তা বলছে না। ইনায়া ভাবছে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে এজন্য হয়তো কাঁদছে। কিন্তু মর্ম’র কান্না থামার কোনো নাম গন্ধ নেয়। ইনায়া মর্ম কে নিচে এনে সানায়া’র কাছে দেয়। সানায়া’র কাছে গিয়ে মর্ম আরো বেশি কান্না করছে। মর্ম কারোর কাছে থাকতে চাইছে না।
ইনায়া সোফায় গিয়ে বসে। মর্ম’র দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে। মর্ম এভাবে কোনো দিন কান্না করেনি। হঠাৎ করে মর্ম’র কি হলো। যার জন্য এমন করে কাদছে। ইনায়ার বাবার কোলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে মর্ম। তাসলিমা চৌধুরী ইনায়া র কাছে এসে বলেন,
“- মা রে তুই ওকে কোলে নে। মায়ের কোলে আসলে সন্তান চুপ হয়ে যায়।
ইনায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে ফের মর্ম’র দিকে তাকিয়ে বলল,
“- মা আমি অনেক চেষ্টা করেছি তবুও ওর কান্না থামেনি। এই পর্যন্ত এভাবে ও কাঁদে নি। এই প্রথম এত কান্না করছে কিন্তু কেন করছে বলছে না। আমার এখানে আসা টায় ভুল হয়েছে।
“- ও ছোটো তো মা। বাচ্চা মানুষ না বুঝে কাঁদছে।
ইনায়া সোফা ছেড়ে উঠে মর্ম’র কাছে যায়। অনেক গুলা চকলেট দেয় মর্ম কে কিন্তু মর্ম সেগুলো চেলে ফেলে দেয়। ইনায়া চমকে ওঠে। মর্ম এমন করছে কেন?
উপস্থিত সকলেই অবাক। মর্ম খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে। বলতে গেলে মায়ের বাধ্য মেয়ে। আর সেই মেয়ে কি-না এমন করছে। ইনায়া এবার রেগে যায়। মর্মর উপর ধমকে ওঠে। এতে মর্ম ভয় পেয়ে আরো জোরে কান্না করে। ইনায়া এবার অধৈর্য হয়ে পরে। মর্ম কে নিজের কোলে নিয়ে সোফায় বসে জিজ্ঞেস করে,
“- তুমি আমার গুড গার্ল মাম্মাম। তুমি কাঁদছো কেন মা? মাম্মাম কে বলো তোমার কি হয়েছে? মাম্মাম আছে তো সব ঠিক করে দেবে? তুমি কাঁদলে তো মাম্মামের কষ্ট হয় মা। তুমি তো বোঝো মাম্মাম তোমার কান্না সহ্য করতে পারে না। তাহলে কাঁদছো কেন মা? প্লিজ কি হয়েছে বলো আমাকে?
মর্ম ফুপিয়ে বলল,
“- পা..পা পাপা!
মর্মের কথা’য় চমকে ওঠে ইনায়া! মর্মের মুখে পাপা শব্দ টা আসলো কিভাবে? ইনায়া নরম গলায় বলল,
“- মা তোমার কি হয়েছে সেটা বলো?
মর্ম আবারও বলল,
“- পা-পা যা- বো।
চলবে~