পাষাণী তুই পর্ব-১১

0
1

#পাষাণী_তুই
#পর্ব_১১
#লেখনিতে_ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

“- পা-পা যা- বো। আমি পাপা’র কাছে যাবো! আমাকে পাপার কাছে নিয়ে যাবে মাম্মাম! চলো না মাম্মাম আমরা পাপা’র কাছে যায়! আমরা খুব মজা করব মাম্মাম!

মর্ম’র কথা’য় স্তব্ধ হয়ে যায় ইনায়া সহ চৌধুরী বাড়ির সবাই। সবার চোখে মুখে অবাকের ছাপ। ইনায়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে মর্ম’র দিকে। মর্ম কান্না করে চোখ মুখ ফুলিয়ে লাল করে ফেলছে। ইনায়ার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। তার এতটুকু মেয়ের মুখে পাপা শব্দ টা আসল কিভাবে? ইনায়ার মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে!

তাসলিমা চৌধুরী মর্মর কাছে এসে বলেন,

“- নানু এসব তুমি কি বলছো? তুমি এই কথা শুনলে কোথা থেকে ? পাপা মানে তুমি বোঝো..?

মর্ম ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“- আমি পাপা’র কাছে যাবো নানু। আমার পাপা কোথায়?

এই একটা কথা’য় ইনায়ার বুকের মধ্যে ছ্যাত করে ওঠে। আমার পাপা কোথায়? ইনায়া এখন কি জবাব দিবে।

ইনায়ার মনের অবস্থা সবাই বুঝতে পারছে। সানায়া মর্ম কে নিজের কোলে বসায়। তারপর ঠান্ডা মাথায় বলল,

“- প্রিন্সেস! তুমি তো আমার গুড গার্ল প্রিন্সেস! খালামণি যা বলে তাই শোনো। আমি একটা কথা বলছি তুমি মন দিয়ে শুনবে?

মর্ম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। সানায়া হেসে বলে,

“- প্রিন্সেস তুমি এভাবে বলছো কেন? মাম্মাম কষ্ট পাচ্ছে তো মা? এভাবে বলো না প্লিজ? তোমার মাম্মামই তোমার পাপা আর তোমার পাপাই তোমার মাম্মাম বুঝছো মা।

মর্ম বুঝলো না। এবার আরো জোরে চিল্লিয়ে বলল,

‘- আমি পাপা যাবো মানেই পাপা যাবো!

ইনায়া র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আর সহ্য করতে পারছে না। আর কত সহ্য করবে? ইনায়া মর্মের মুখের সামনে আঙুল তুলে বলে,

“- শোনো মর্ম, আমি অনেক্ক্ষণ সহ্য করেছি আর পারছি না। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। তুমি আর বাড়াবাড়ি করবে না। চুপচাপ মাম্মামের সাথে রুমে যাবে?

মর্ম বায়না ধরে বলল,

“- নাহ! আমি কোথাও যাবো না। আমি পাপা’র কাছে যাবো?

ইনায়া রেগে ধমকে মর্ম বলে থাপ্পড় দিতে যায়, কিন্তু দিতে পারে না। তার আগেই কেউ ইনায়া র হাত ধরে ফেলে। ইনায়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে লোকটা কে?

মর্ম ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। ইনায়া মানুষ টা কে দেখে খুব একটা অবাক হয় না। ইনায়া চোখ মুখ শক্ত করে বলে,

“- হাত ধরলে কেন মেঘ ভাইয়া?

মেঘ রক্তচক্ষু চোখে ইনায়ার দিকে তাকায়। মেঘের চোখ দিয়ে যেন আগুন জ্বলছে।। মেঘ রেগে বলল,

“- তোর মাথা ঠিক আছে ইনায়া। ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে কি বোঝে। মনে যা আসছে তাই বলছে। সেজন্য ওকে মারতে হবে? বাহ্! খুব ভালো! তবে শুনে রাখ, এই মেঘরাজ থাকতে মর্ম কে তুই মারতে পারবি না।

মর্ম চোখ খুলে মেঘ কে দেখে সানায়া র কোল থেকে নেমে মেঘের কাছে চলে যায়। মেঘ ইনায়ার হাত ছেড়ে দিয়ে মর্ম কে নিজের কোলে তুলে নেয়। মর্ম মেঘের গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদির সুরে বলে,

“- মাম্মাম পঁচা! তুমি খুব ভালো! আমাকে পাপা’র কাছে নিয়ে চলো না প্লিজ৷

মেঘ চুপ করে একটু আগের কথা ভাবছে। মেঘ বাসা থেকে একটু দুরে চলে গিছিল। আনমনে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। তখন তার ফোনে একটা মেসেজ আসে। সানায়া দিয়েছে। মেসেজে লেখা ছিল।

” ভাইয়া প্লিজ বাসায় আসো। খুব প্রবলেম হয়ে গেছে।

সানায়া’র এই ছোট্ট মেসেজ পেয়ে ছুটে আসে মেঘ।
আর এসেই দেখে ইনায়া মারতে যাচ্ছে মর্ম কে। মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তার। তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করে রাখে। ছোট্ট মর্ম র কথায় হুশ আসে মেঘের। মর্ম আবার বলে,

“- তুমি শুনতে পারছো না আমি বলছি। আমাকে পাপা’র কাছে নিয়ে চলো।

মেঘ বলল,

“- পাপা মানে বোঝো তুমি?

মর্ম মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। মেঘ মুচকি হেঁসে বলল,

“- আমার সাথে যাবে?

“- কোথায়?

“- পাপা’র কাছে।

মেঘের কথা’য় বাসার সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“- মেঘ এসব তুই কি বলছিস? তুই কি সব ভুলে গেছিস? এখন তুই ওর পাপা কে কোথায় পাবি?

“- আমি কিছু ভুলিনি। আমার সব মনে আছে।

রাশেদ চৌধুরী বললেন,

“- তাহলে…..
এসব অযৌক্তিক কথা বলছো কেন?

“- আমি কোনো অযৌক্তিক কথা বলছি না। বলে মর্ম কে নিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে আসে। মেঘের কান্ড দেখে বাড়ির সবাই মেঘের পিছন পিছন আসে।

মেঘ মর্ম কে নিয়ে তার রুমে আসে। দেয়ালে লাগানো বড়ো ফ্রেমের একটা ছবি টাঙানো। মেঘ মর্ম কে দেয়ালে তাকাতে বলে। মর্ম সেদিকে তাকাই। মেঘ বলল,

“- ছবি টা দেখতে পাচ্ছো?

মর্ম মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। মেঘ আবার বলল,

“- চিনতে পারছো?

“- হু।

“- বলো তো কে?

“- ইউ।

মেঘ একটা টানা নিশ্বাস নিয়ে বলল,

“- ওটাই তোমার পাপা!

দরজায় দাঁড়ানো সবাই হতবাক। মেঘ এসব কি বলছে? রাশেদ চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন,

“- রাজ কি বলছো ভেবে বলছো তো?

মেঘ হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয়। তিনি চুপ করে যান। মেঘ আবার বলল,

“- আমিই তোমার পাপা মর্ম!

মর্মের চোখ খুশিতে চকচক করে ওঠে। খুশি হয়ে বলে,

“- তুমি সত্যি বলছো হিরো মামা?

“- হ্যাঁ মা।

মর্ম ভাবুক হয়ে বলল,

“- কিন্তু খালামণি যে বলল তুমি আমার মামা হও।

“- ওটা মজা করে বলছে মা।

ইনায়া আর নিতে পারছে না। একটা মানুষ কিভাবে এত কিছু সহ্য করবে? এই কয়টা বছরে কম তো সহ্য করে নি। এখনো করছে। কিন্তু আর কত? আর কত কিছু সইবে সে। এখন মেঘের কথা’ শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। ঝড়ের বেগে মেঘের কাছে এসে মর্ম কে নিয়ে নেয়। মেঘ অবাক হয়নি। এটাই হওয়ার ছিল। ইনায়া মর্ম কে সানায়ার কোলে দিয়ে বলে, ওকে নিয়ে রুমে যেতে। সানায়া মর্ম কে নিয়ে চলে যায়।

ইনায়া প্রত্যেকের দিকে তাকায়। প্রত্যেকে ইনায়া আর মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“- তুমি মর্ম কে এসব বললে কেন মেঘ ভাইয়া?

মেঘ স্বাভাবিক ভাবে জবাব দেয়,

“- যেটা বলা উচিত সেটাই বলেছি।

“- তুমি ঠিক করো নি। কেন ওকে নিজের পাপা বললে অ্যান্সার মি?

মর্ম বাবা মা চাচা চাচির দিকে তাকিয়ে বলল,

“- তোমরা একটু বাইরে যাবে প্লিজ। আমি একটু ওর সাথে একা কথা বলতে চাই!

ইনায়া চেচিয়ে বলে,

“- ওরা কেন বাইরে যাবে? যা বলার সবার সামনে বলো? কেন এমন টা করলে?

মেঘ আবার বলল,

“- তোমরা যাবে প্লিজ।

চারজনে চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে যায়। তবে যাওয়ার আগে ফিরোজা চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দু’জন কে দেখে যায়।

★★

মেঘ ইনায়া কে খাটে নিয়ে বসায়। ইনায়া রেগে বোম হয়ে আছে। তাদের মা মেয়ের জীবনে মেঘ এসে সব ঝামেলা বাঁধিয়ে দিছে। মা মেয়ে খুব ভালো ছিল। এখন ইনায়ার আফসোস হচ্ছে কেন সে দেশে আসল? না আসলেই বুঝি এসব হতো না।

অচেনা দেশে খুব তো ভালোই ছিল। সেখানে ছিল না কোনো পরিচিত মানুষের পদচিহ্ন। ।

মেঘ ফ্লোরে হাটু গেড়ে বসে পরে। ইনায়া অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ ইনায়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেঘের চাহুনি অন্য রকম। যেন কিছু বলতে চাই। তবে গলায় যেন কথা আঁটকে যাচ্ছে। হাজার করে চাইলেও কথা বের হচ্ছে না। তবুও নিজেকে বোঝায় বলতে তাকে হবেই….??

চলবে ~