#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
২.
ড্রয়িংরুম খালি হতেই পুনরায় তালুকদার নিবাসে হুল্লোড় বাধিয়ে দিলো মাশফিক। কেন সায়াহ্নকে চলে যেত দিলো, এ নিয়ে অফিসারকে আঙুল উচিয়ে উচিয়ে কথা শোনাতে লাগল ও। একইকাজ থেকে বাদ যায়নি আসিফ তালুকদারও। অফিসার তাদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছেন, সায়াহ্ন হামিদকে জেলে পোরা সহজ কথা না। কিন্তু কে শোনে কার কথা? অবশ্য শোনারও কথা না! গায়ে রাগ তো সব তালুকদারের মাঝেই বইছিল। এমনকি অভ্রও চাচ্ছিল, ভাই আর চাচার কথার মাঝে কথা বলতে। কিন্তু মোশাররফ তালুকদারের ভয়ে ওর আর এগোনোর সাহস হয়নি। সোফায় বসে কয়েকমিনিট অশ্রুবিসর্বজন দেবার পর মাথা তুলল সাঁঝ। বাবাকে কপাল চেপে ধরে পাশের সোফায় বসে থাকতে দেখল ও। গাল মুছে, নাক টেনে সাঁঝ নিজেকে ধাতস্থ করল। অতঃপর মাথার ঘোমটা ফেলে দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। বোনকে দাঁড়াতে দেখে মাশফিক থেমে যায়৷ সাঁঝ মৃদুপায়ে বাবার কাছে এগিয়ে তার পাশে বসে গেল। চোখ না খুলেও পাশে কে বসেছে তা অনুধাবন হলো মোশাররফ তালুকদারের। আস্তেধীরে মেয়ের দিকে তাকালেন তিনি। সাঁঝের গাল দুধে আলতার মতো লালচে। ঘন, মোটা, বাকানো পাপড়ির ভেজা চোখও লাল। কান্নার রেশ ওর চেহারায় স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতেও ঠোঁটে হাসি ফুটাল সাঁঝ। একহাত বাবার হাতের ওপর রেখে, আরেকহাতের ইশারায় বোঝাল,
– থ্যাংকিউ।
বরাবরের মতো আজও মেয়ের ভাষা বুঝতে সময় লাগেনা মোশাররফ তালুকদারের। তার বুকে হাহাকার বয়, আর মুখে জড়তাসমেত কথা ফোটে,
– কেন?
– যে পরিবার বাইরের একটা মানুষের কথায় কোনোকিছু না ভেবে আমার দিকে আঙুল তোলে, সে পরিবারের সাথে সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়ার জন্য। আমার সম্মান বাঁচানোর জন্য।
মোশাররফ তালুকদার একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর সাঁঝের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে, মাশফিকের দিকে তাকালেন। বাবার বুকে মাথা ঠেকিয়ে সাঁঝ ভাইকে দেখল। এতক্ষণ গলার জোর, গায়ের জোর, সবই ছিল এই ছেলেটার। কিন্তু এমুহূর্তে যেন সব ছেড়ে দিয়েছে সে। সাঁঝ পুলিশকে দেখিয়ে ভাইকে ইশারায় বোঝাল,
– ওনাদের যেতে বল।
মাশফিক করেও তাই। বিনাবাক্যে হাত বাড়িয়ে অফিসারদের বেরিয়ে যেতে বলল ও। মিসেস মোশাররফ আঁচলে চোখ মুছে কেবল চেয়েচেয়ে দেখলেন মেয়েকে। দুই ছেলেকে বড় করতে গিয়ে বা বড় করার পর, আজোবদি একবারের জন্যেও তার মনে হয়নি তার সন্তানেরা বুঝদার। মাশফিক-অভ্র কেউই তাকে এটা অনুধাবন করাতে পারেনি যে ওরা পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে, সামলে চলতে পারে। উল্টো দুজনেই হয়েছে পরিস্থিতি আরো নষ্ট করার দলে, সব পরিস্থিতিতে নিজেরাও বিগড়ে যাওয়ার দলে। অথচ ওপরওয়ালা ওদের ঘরেই এমন একটা বোন দিয়েছে, যে কিনা দুনিয়ার সব পরিস্থিতিকে মানিয়ে চলতে পারে। সব দুঃখ কষ্টকে মনে পাথরচাপা দিয়ে হাসিমুখে চলতে জানে। সাঁঝের এতো সবুরের উৎস মিসেস মোশাররফ বুঝে ওঠেন না। বলার শক্তি দেয়নি বলে ওপরওয়ালা তাকে মেনে নেবার এই ভয়ংকর শক্তি দিয়েছে কিনা, কে জানে! মোশাররফ তালুকদারের থেকে বিদায় নিয়ে পুলিশ চলে যায়৷ আসিফ তালুকদার মুখ খুললেন এবারে। বললেন,
– ভাই ওই সায়াহ্ন হামিদ! ওটাকে. . .
সাঁঝকে বুক থেকে মাথা তুলতে দেখে আসিফ তালুকদার থেমে গেলেন। ড্রয়িংরুমে আবারো নিরবতা বয় কয়েক সেকেন্ডের। একসময় সাঁঝ ইশারায় বলল,
– উনি যা বলে গেছেন, তা কি তোমরা বিশ্বাস করেছ?
– কি বলছিস তুই! ওই ছেলের কথা আমরা বিশ্বাস করব?
মাশফিক পুনরায় উত্তেজিত হয়ে পরে। সাঁঝ বুঝাল,
– এলাকার লোক?
– সবাই তোকে চেনে সাঁঝ! এমন কথা কেউ বিশ্বাস করবে না!
চাচার জবাব শুনে সাঁঝ এবার বাবার দিকে ফিরল। অতপর দুহাত নেড়ে বুঝাতে লাগল,
– ওনার বলা কথাটা আমার জীবনে প্রভাব ফেলবে না৷ তাই আমি চাই না এ নিয়ে আরকোনো ঝামেলা হোক।
. . .
– উনি যাই বলে যাক, তাতে আমার ক্ষতি তো হয়নি। বরং অন্যের এক কথায় প্রভাবিত হতে পারে, এমন একটা পরিবারে জড়িয়ে যাওয়া থেকে আমি বেঁচে গেছি। সে হিসেবে ও যা-তা বলে যাওয়া মানুষটা আমার-তোমাদের উপকার করেছে। তাইনা?
মোশাররফ তালুকদার ছোট্ট একটা দম ফেললেন। হাত বাড়িয়ে আবারো মেয়ের মাথা টেনে নিজের বুকে নিলেন। আস্তেকরে পুনরায় বাবার বুকে মাথা ঠেকাল সাঁঝ। অতিকষ্টে মুখ বন্ধ করে রাখা অভ্র বড়বোনের হাসিটা দেখল। ওরও বুঝে আসলো না, ওর আপু আসলে কিসের তৈরী? যার আগমনে কিছুক্ষণ আগে তাট অশ্রুর বাঁধ ভেঙেছিল, সে মানুষটার প্রতি একচুলও রাগ নেই, ক্ষোভ নেই তার। সাঁঝের মনোভাব হাসিটাতেই স্পষ্ট। জীবনকে সহজ করার উপায় একটাই! কারো ওপরে ক্ষোভ না রাখা, অভিযোগ না পোষা। তাই হয়তো ঘূর্ণিঝড়ের মতো এসে সব তছনছ করে দিয়ে যাওয়া সায়াহ্ন হামিদের বিরুদ্ধেও ওর কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু সবসময়ের মতো আজও মাশফিক সাঁঝের উল্টোটাই। ওরমাঝে রাগ, ক্ষোভ দুটোই ছিল। আর এ দুটোর দায়েই ও বুঝে উঠল না, ভুলটা ঠিক কোথায় হলো? দোষটা ঠিক কার? ওর নিজের জন্যই কি আজ এতসব ঘটলো? ওরই বা কি দোষ? ও কি জানতো সায়াহ্ন হামিদ কেমন? কেমন তার স্বভাব, কর্মকান্ড? ও কি জানত, জেদের বশে সে কতদুর যেতে পারে? ও কি জানতো, আগেরদিনের ঘটনাটা রেশ সে এই অবদি গরাবে?
•
সরোয়ার হামিদের পরিবার এ এলাকায় এসেছে এক সপ্তাহ আগে। তবে সায়াহ্ন এসেছে গতকাল। বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে গ্রামে ছিল কয়েকদিন। জার্নি শেষে নতিন বাসায় ফিরে সারাটা দিন বিছানায় পরেপরে ঘুমিয়েছিল ও। একেবারে সন্ধ্যেবেলা বেরিয়েছিল হাটাহাটির জন্য। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর সায়াহ্ন এক মোড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়। ঠিক সেসময়েই ফোন বাজে ওর। কথা বলতে বলতে সায়াহ্নর খেয়ালই হয়নি, কখন ও দোকানে দাড় করানো বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোনের দুনিয়া থেকে ও বের হয় তখন, যখন ওর কানে আসে বাইরের দুনিয়ার এক কর্কশ পুরুষালী স্বর,
– বাইকটা আমার!
সায়াহ্ন সামনে তাকায়। ছাইরঙা টিশার্ট পরিহিত মাশফিককে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তবে তখনো ও কান থেকে ফোন নামায় নি। পাশের রাস্তা দিয়ে তখন পাড়ার মুরুব্বিরা মাগরিবের নামাজ শেষ করে যাচ্ছিল। মাশফিক সেদিকে চেয়ে ডাক লাগাল,
– হোসেন কাকা?
ডাক শুনে টুপি-পান্জাবী পরা এক ষাটোর্ধ্ব বয়সের লোক তার আশপাশের আরো তিনজনকে নিয়ে এগোলেন। সায়াহ্ন বুঝে উঠল না, এখানে ঠিক কি হচ্ছে, বা হতে চলেছে। ব্যস অবুঝের মতো চেয়ে রইল মানুষগুলোর দিকে। মাশফিক এগোল। হাত বাড়িয়ে সায়াহ্নর পেছনে থাকা বাইকের সিট দেখিয়ে মুরুব্বিদের বলল,
– দেখুন বাইকটার অবস্থা।
নির্বোধের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল সায়াহ্ন। সিগারেটের ডগার আগুনে পুড়ে ফুটে হয়ে যাওয়া সিটটা দেখে কান থেকে আপনাআপনি হাত নেমে গেল ওর। কল কাটার কথাও আর মনে থাকল না। সায়াহ্ন হাতে নিভে যাওয়া ছোট্ট সিগারেটটা দেখল। আর মুরুব্বিরা পোড়া সিটটা দেখে নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। তারপর একজন সায়াহ্নকে ধমকে বলে উঠল,
– এলাকায় তোমাকে আগে তো দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না। নাম কি তোমার?
সায়াহ্ন অপ্রস্তুত হয়। প্রায় শেষ হওয়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে, কিছুটা আড়ষ্ট আওয়াজে জবাব দেয়,
– আব্ সায়াহ্ন, সায়াহ্ন হামিদ।
– বাবার নাম?
– সরোয়ার হ্. . .
– সে যাই হোক! মাগরিবের ওয়াক্ত চলে। দুইটা মিনিট সামনে হাটলেই মসজিদ। সেখানে গিয়ে নামাজ না পড়ে, তুমি এই দোকানে দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছ আর আরেকজনের বাইকের সিট পোড়াচ্ছ? পারিবারিক শিক্ষা বলে কি কিছুই নেই?
সায়াহ্ন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ছাব্বিশ বছরের বড়সর জীবনে বহুকিছুর অভিজ্ঞতা আছে ওর। থাকার মধ্যে কেবল ছিল না ব্যস এই মুরুব্বিদের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা। সেটাও আবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। যদিও বাবাকে সবসময় সামাল দিতে হয়। কিন্তু তাকে তো ওর কোনোঅংশে মুরুব্বি বলে মনেই হয়না। মনেমনে ভাবনা ভাবার পরপর এই বাবা ব্যপারটাতেই আটকাল সায়াহ্ন। হুট করেই ওর চোখ পরল, সামনে থেকে ওর বাবা আরেকজন মাঝবয়সী লোকের সাথে ওদের দিকেই এগোচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, তারাও সবে নামাজ পরেই বেরিয়েছে। আকস্মিকতায় পরিস্থিতি আর করণীয়, কোনোটাই সায়াহ্নর মাথায় ঢুকল না। মুরুব্বিদের একজন পুনরায় বলতে শুরু করেছেন,
– এখনকার ছেলেগুলো এতই যে বেয়াদব হয়েছে না! পাড়ার এই তোমাদের মতো ছেলেপেলের জন্য আমরা নিজেদের ছেলেদেরও মানুষ করতে পারি না। তোমাদের মা-বাবা তোমাদের শিক্ষা দিতে পারেনি, তার ফলটা ভোগ করতে হয় আমরা যারা ছেলেপেলেকে ভালোভাবে মানুষ করতে চাই, তাদের। বাসায়. . .
ছেলেকে ঘিরে হওয়া সমাগম দেখে ততক্ষণে সরোয়ার হামিদ কাছে চলে এসেছেন। মুরুব্বির কথা পুরোটাই কানে গেল তার। লোক বলে চলেছে দেখে সায়াহ্ন চোখ বন্ধ করে ঘাড় কিছুটা বাদিকে ঘুরাল। দুদন্ড দাড়াতেই ঘটনার সবটা টের পেলেন সরোয়ার হামিদ। এমনিতেও ছেলের কাজকর্মের ধরন সম্পর্কে অবগত তিনি। মুরুব্বির বলা শেষ হলে তিনি বেশ বিনীত কন্ঠে বললেন,
– হোসেন ভাই, ও আমার ছেলে। বেখেয়ালে ভুল করে ফেলেছে। এবারের মতো ক্ষমা করে দিন। ভবিষ্যতে আর কখনো এ জাতীয় কিছু হবেনা। আমি বলছি আপনাদের।
সায়াহ্ন চোখ খুলল। তবে বাবার দিক তাকাল না। এক সপ্তাহে এলাকায় আসা এসিপি সরোয়ার হামিদকে এলাকার লোক চিনবে না, এমনটা হওয়ার কথা না। সায়াহ্ন বুঝছে না, লোকজন অবাক হয়ে থেমেছে, নাকি ভয়ে। অবশ্য সেটা বোঝার চেষ্টা ও করলো না। ব্যস ভেতরেভেতরে তীব্র জেদ অনুভব করলো। চোখ তুলে ভেতরের সবটুকো ক্ষোভ নিয়ে মাশফিকের দিকে তাকাল সায়াহ্ন। এ ঘটনায় সে যে বেশ খুশি হয়েছে, সেটা তার চেহারায় খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে।
আদতেই খুশি হয়েছে মাশফিক। সারাদিন অফিসে কলুর বলদের মতো খেটে বাসায় ফিরছিল ও। এলাকায় ঢুকতেই মাগরিব হওয়ায় দোকানে বাইক পার্ক করে নামাজে চলে গিয়েছিল। নামাজ শেষে ফেরার পর নিজের বাইকে এক অস্পষ্ট অবয়ব দেখেছিল মাশফিক। কিছুটা এগোতেই ধুসর টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার পরিহিত সে মানবের মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে আর মাশফিকের চোয়াল শক্ত হয়। সাধারনত মানুষ মানুষকে চেনে দুটো সম্পর্কে। অনুরাগী হলে, নয়ত প্রতিদ্বন্দী হলে। “Your FM” এ কর্মরত মাশফিক “রেডিও মস্তি”র অনুরাগী তো না। তবুও এই মুখ ওর পরিচিত। আর সেটা প্রতিদ্বন্দী হিসেবেই। কেননা ওর বাইকে আরামে হেলান দিয়ে দাড়ানো মানুষটা আর অন্য কেউ না, রেডিও মস্তির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “The Shayanno Show”র উপস্থাপক– আরজে সায়াহ্ন হামিদ!
মাশফিক আর সাতপাঁচ ভাবেনি। এটা সেই চ্যানেলের সেই অনুষ্ঠান, যেটা ওর কর্মরত চ্যানেলকে ভরাডুবিতে রেখেছে। আর আজ সেই অনুষ্ঠানকে জনপ্রিয় করে তোলা রেডিও জকি ওর বাইকের সিট পুড়িয়েছে। হিংসের তোপে মাশফিকের কলিজা তো একটু বেশিই পোড়ার কথা! সে পোড়া হৃদয়ে খট করেই ভাবনা এসেছিল, আরজে সায়াহ্নকে এ মুহুর্তে খুব সহজে অপমান করা যায়, অপদস্ত করা যায়। এবং ঘটেছিলও তাই! মূলত মাশফিকের সে ভাবনাই বাস্তবায়িত হচ্ছিল তখন।
পরিস্থিতি দেখে মোশাররফ তালুকদার চিন্তিত হলেন। এক সপ্তাহের পরিচয়ে সরোয়ার হামিদের সাথে ভালো একটা সম্পর্কও হয়ে গেছে তার। বাজার, নামাজ, চায়ের আড্ডায় প্রায়শই কথাবার্তা হচ্ছে তাদের। যারফলে নিজের ছেলের বাইক পোড়ায় সেই সরোয়ার হামিদের ছেলের অপমানটা পছন্দ হচ্ছিল না তার। ইতিমধ্যে লোকজন সায়াহ্নকে ওর পরিবার তুলেই অনেক কথা শুনিয়ে ফেলেছে। লোকসম্মুখে আরো ঝামেলা চাচ্ছিলেন না উনি। তাই মাশফিককে চোখের ইশারায় বললেন বাইক নিয়ে চলে যেতে। তারপর পাশ থেকে সরোয়ার হামিদের কাধে হাত রেখে বললেন,
– It’s okay হামিদ ভাই। বাসায় যান ছেলেকে নিয়ে। এখানে সবাই এভাবে দাড়িয়ে থাকলে বিষয়টা আরে বাজে দেখাচ্ছে। এগোন।
সায়াহ্ন একপলক বাবার দিকে তাকাল। সরোয়ার হামিদ ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। শক্তচোখে! একমুহূর্ত না দাড়িয়ে হনহনিয়ে ওখান থেকে চলে এসেছিল সায়াহ্ন। সাথে নিয়ে এসেছিল মাশফিকের বিরুদ্ধে শরীরভরা রাগ, জেদ আর প্রতিশোধপরায়ণতা। আর এই তিনে মিলে রাতে ঘুমোতে পারেনি ও। একটুখানি চেষ্টা করতেই মাশফিক আর ওর গোটা পরিবারের খোঁজ পেয়ে যায়। পরদিন তালুকদার নিবাসের সামনে পৌছাতেই এটাও জানতে পারে, তখন মাশফিকের একমাত্র বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে। জনসম্মুখে হওয়া অপমানকে ফেরত দেবার জন্য সায়াহ্নর জন্য এরচেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতো? মাশফিক ওরসাথে যেচে যে ঝামেলা করেছিল, কোনো প্রয়োজন ছিল না তার। বাইকের সিট পোড়ানোর ভুলটা ওর ছিল। ওকে বলেই বিষয়টা সুন্দরমতো মেটাতে পারত সে। কিন্তু মাশফিক তালুকদার তো সেটা করেনি। উল্টো ঝামেলা তৈরী করেছে। সেটাও আবার কার সাথে? যে কিনা হিসেব মেটাতে সর্বোচ্চ আর সব করতে পারে, সেই সায়াহ্ন হামিদের সাথে। ব্যস! তারই প্রতিফলন ছিল ওর আজকে তালুকদার নিবাসের সমন্ধ-সাক্ষাতে বিনা দাওয়াতে চলে যাওয়া আর কেয়ামত বাধিয়ে দেওয়া।
সায়াহ্ন সিগারেটে টান দেয়। ফুঁ দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া উড়িয়ে দেয় পশ্চিমের আকাশে। হয়তো তারসাথে সাঁঝের বিয়ে ভাঙার আক্ষেপটাকেও উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু পারে না। মাশফিকের বোনের বিয়ে ভাঙার উদ্দেশ্য ওর ছিল না। ওর উদ্দেশ্য ছিল বাইরের মানুষের সামনে মাশফিককে অপমান করা, ওর গোটা পরিবারকে অপদস্ত করা৷ আর তা হাসিলে ওইসময় পাত্রপক্ষের সামনে মাথায় যেটা এসেছে, সেটাই বলে দিয়েছে ও। আগেপরে কিচ্ছুটি ভাবেনি। এমনিতেও ভেবেচিন্তে কিছু করাটা সায়াহ্নকে শোভা দেয় না। এমনকি করার পরে ভাবার ছেলেও ও না। কিন্তু আজ ও ভাবছে। তালুকদার নিবাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় থেকেই প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে ও নিজের করা কাজ নিয়ে ভাবছে। মেয়েটা বোবা। হয়তো বিয়েটা ওরজন্য জরুরি ছিল। অথচ অপবাদ দিয়ে ও সে মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিয়ে এসেছে। সায়াহ্ন পুনরায় সিগারেট পুনরায় মুখে পুরল। রুমে বিছানার ওপর থাকা ফোনটা জ্বলছে। কিন্তু সে সাইলেন্ট ফোনের ভাইব্রেশন ব্যালকনিতে পৌছাল না। স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত মানবের ডানহাতের সিগারেট ফুরিয়ে আসছে। বা হাতে ট্রাউজারের পকেটে গুজে সে দাড়িয়ে রইল চুপচাপ। চেয়ে রইল রক্তিম আকাশে। তার শহরে সাঁঝ নামছে। নিরবে, নিভৃতে. . .
#চলবে…