সোহাগি সাঁঝমল্লার পর্ব-০৪

0
1

#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৪.

ঘড়িতে সাড়ে চারটা বাজছে। বিকেলের মোলায়েম আলো ছেয়ে আছে গোটা তালুকদার নিবাসে। মোশাররফ তালুকদার নিজের ঘরে কাগজপত্র দেখছিলেন। হঠাৎই তার কানে আসে রিমঝিম আওয়াজ। না দেখেও দরজায় কে আছে তা টের পেলেন ভদ্রলোক। আওয়াজ কিছুটা উচিয়ে বললেন,

– ভেতরে এসো সাঁঝ।

সাঁঝ হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। মোশাররফ তালুকদার ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন। মেয়েকে দেখে কাগজপত্র রেখে দিলেন তিনি। সাঁঝ এসে বাবার সামনের কাঠের ছোট টেবিলটায় বসল। ওর হাতের বইটা দেখিয়ে ইশারায় শুধাল,

– এটা পড়েছ?

– না। এটা তো পড়িনি! কোথায় পেলে?

মোশাররফ তালুকদার বইটা হাতে নিয়ে এপিঠ ওপিঠ দেখলেন। বহু বই সব পড়ে রাখা বাবার না সূচক জবাবে সাঁঝ খুশি হয়ে গেল যেন। বুঝাল,

– আসিফ কাকুর দোকানে।

– ইন্টারেস্টিং লাগছে অনেক! পড়া শেষ হলে আমাকে দিও।

ঘাড় দুলিয়ে হ্যাঁ বুঝাল সাঁঝ। সুজি মেঝে শুকতে শুকতে ঘরে ঢুকল। তারপর এসে লাফিয়ে সাঁঝের বসা টেবিলটায় উঠে বসল। মোশাররফ তালুকদার বইটা সাঁঝকে ফেরত দিয়ে বললেন,

– মাশফিক ফিরেছে?

– না।

– ও ফিরলে ওকে একবার দেখা করতে বলো আমার সাথে।

– আচ্ছা।

সুজিকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলো সাঁঝ। বাবাকে ব্যস্ত দেখার পরও তার ঘরে থাকার অভ্যেস সাঁঝদের তিন ভাইবোনের কারো নেই। মোশাররফ তালুকদার টের পেলেন, মেয়ে কিছু বলতে চায় তাকে। এজন্যই এখনো যাচ্ছে না এ ঘর থেকে।
নমনীয় কন্ঠে শুধালেন,

– কিছু বলতে চাও সাঁঝ?

সাঁঝ ভাসাভাসা চোখজোড়া নিয়ে বাবার দিকে তাকালো। সুজির গায়ে হাত বুলানোর গতি কমে ওর। একটা ঢোকও গিলল ও। তারপর হাত নেড়ে আস্তেধীর বুঝাল,

– একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

– অবশ্যই। বলো?

– উনি কাল কেন ওভাবে ওসব বলে গেলেন বাবা? আমি তো ওনাকে চিনি না। ওনার তো কোনো ক্ষতিও করিনি। তাহলে?

মেয়ের কিঞ্চিত অস্থিরতাতেই মোশাররফ তালুকদার আটকালেন। সেদিন সন্ধ্যের ঘটনা সাঁঝ জানে না। ওরমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। স্বরে কিছুটা হতাশা রেখে বললেন,

– পরশু সন্ধ্যায় জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে সায়াহ্ন তোমার ভাইয়ের বাইকের সিট পুড়িয়েছিল। মাশফিক এলাকার লোকজন ডেকে অপমান করেছে ওকে। সেই ক্ষোভ থেকেই ও কাল তালুকদার নিবাসে এসে এসব ঘটিয়ে গেছে।

সাঁঝ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল বাবার দিকে। ব্যস এটুকু বিষয়? এটুকু বিষয়ের জন্য একটা মানুষ ওদের বাড়ি বয়ে চলে আসলো? মাশফিকের জন্য বাইরের মানুষের সামনে ওর গোটা পরিবারকে অপদস্ত করলো? সবচেয়ে বড় কথা, ওকে এতবড় অপবাদটা দিলো? মোশাররফ তালুকদার মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,

– এ একটু এমনই। একগুঁয়ে, জেদী। তুমি আর এসব নিয়ে ভেব না। ওর বাবার সাথে কথা হয়েছে আমার। আরকোনো ঝামেলা করবে না ও।

মাথা দুলিয়ে দৃষ্টি নামালো সাঁঝ। হুট করেই কিছুএকটা মনে পরে যায় ওর। চোখ তুলে পুনরায় বাবাকে বুঝাল,

– আরেকটা কথা!

– কি?

– বই দিতে লাইব্রেরীতে গিয়েছিলাম না আজ? ওখানের বইগুলোতে প্রচুর ধুলোবালি জমেছে। অভ্রর তো কাল ছুটির দিন। ভাবছি ওকে নিয়ে গিয়ে কাল সব পরিস্কার করে আসব। যাব কি?

মৃদু হাসলেন মোশাররফ তালুকদার। আদুরে গলায় বললেন,

– তুমি ছাড়া ওটার কাজ এত যত্নে আর কে করবে সাঁঝ? আর ওটা নামে গণগ্রন্থাগার। কাগজে কলমে ওটা তোমার নামের প্রোপার্টি। মানে তুমি ওটারসাথে যা খুশি তাই করতে পারো। অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই। বুঝেছ?

মাথা দুলাল সাঁঝ। তারপর সুজিকে কোল থেকে নামিয়ে বই নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসলো। সুজিকে আর মোশাররফ তালুকদারের ঘরে পায় কে? সাঁঝের পেছনপেছন ওউ তখন সাঁঝেরই ঘরে। বই নিয়ে বারান্দার বেতের দোলনাটায় বসে গেল সাঁঝ। ওর কোলে বই দেখে সুজি সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে শোয়ার জায়গা খুঁজল। অতঃপর বুকশেলফের এককোনের একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে আয়েশে শুয়ে পরল। বই সরিয়ে আজ জায়গাটা যেন ওরজন্যই খালি করেছে সাঁঝ।

বারোতলার বিল্ডিংটার সপ্তম তলায় লিফটের দরজা খুলল। প্যান্টের পকেটে ডানহাত বাঝিয়ে, চুইংগাম চিবাতে চিবাতে অফিসে ঢুকল সায়াহ্ন। একটুপর ওর শো শুরু। মুখে সিগারেটের গন্ধ নিয়ে মাইকের সামনে বসার কি দরকার! সবাইকে নিরাগ্রহে দেখতে দেখতে সায়াহ্ন নিজের ডেস্কের দিকে এগোচ্ছিল। তখনই ওর সামনে পরে হাসান। সায়াহ্ন ঘাড় কিছুটা বাকিয়ে দাড়িয়ে গেল। অফিসে হাসানের ম্যানেজারের ডানহাত হিসেবে পরিচয় আছে। সায়াহ্নর সামনেও সে পরিচয়টা খাটাতে চাইল ও। বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

– অফিসে সবাই আইডিকার্ড গলায় পরে। এক্সেপ্ট ইউ। অনেকদিন হলোই তো আছো সায়াহ্ন। নিয়মটা কবে থেকে মানবে?

– অফিসে থাকাকালীন আইডি গলায় পরে ঘুরতে হবে, জয়েনিং কন্ডিশনসে এমন কোনো শর্ত লেখা ছিল না। তাই আমি এটাকে নিয়ম বলে মনে করি না, মানিও না। Anything else dude?

সোজাশব্দে ত্যাড়া জবাব। হাসান শ্বাস ফেলল। ভেতরের রাগকে ফেলতে চাইল মুলত। আর সেটা টেরও পেল সায়াহ্ন। হাতের ফাইল থেকে দুই পৃষ্টার একটা কাগজ বের করল হাসান। সায়াহ্নকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

– গেস্টের শিডিউল সমস্যাজনিত কারনে আজকের শো তে কিছু চেন্জেস্ আনতে হবে। জিএম থিম তোমাকেই ঠিক করে নিতে বলেছে।

পৃষ্টাদুটো হাতে নিয়ে মুচকি হাসল সায়াহ্ন। চুইংগাম ফুলিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল সেটা। ও বেশ ভালোমতোই জানে, এই শিডিউলসমস্যা হুট করে হয়নি৷ হলেও কমপক্ষে গত রাতে বা আজ সকালে হয়েছে। আর ওকে বিপদে ফেলার জন্যই শো শুরুর আধঘন্টা আগে ওকে এটা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা অবশ্য সায়াহ্নর জন্য নতুন না। হাসান প্রায়শই এমন পরিস্থিতি তৈরী করে। যেন ও থিম ঠিক করার জন্য সময় কম পায় আর জিএমের রোষের মুখে পরে। কিন্তু কোনেবারই হাসানের প্রত্যাশিত কিছু ঘটেনি৷ অল্প সময়েও কোনো না কোনো এনার্জেটিক থিম তৈরী করে সায়াহ্ন ওর শো কে ঠিকি এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাগজটা দেখে সায়াহ্ন চোখ তুলল। মাথা নেড়ে একদম নিশ্চিন্তে হাসানকে বলল,

– ওকে। ডান।

কপালে টনটনে ব্যথা অনুভব হয় হাসানের। অফিসে নিজের পজিশন নিয়ে সন্তুষ্ট ও। কেবল সন্তুষ্ট না সায়াহ্নর জনপ্রিয়তা নিয়ে৷ শো কে তুঙ্গে তুলতে গোটা চ্যানেল সায়াহ্নর মুখোপেক্ষী। যারফলে এই প্রচন্ড বেপরোয়া ছেলেকে কোমলনোমতেই কাবুতে আনতে পারছে না ও। হাসান চলে গেল। মুচকি হেসে সায়াহ্ন নিজের জায়গায় বসে গেল৷ ডেস্কটপে কিছু কাজ সেরে নিয়ে হাটা লাগাল অন এয়ার রুমের দিকে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তোফায়েল ওরদিক চেয়ে প্রসারিত হাসি দিলো একটা। হেডসেট কান থেকে নামিয়ে, মোটাসোটা দেহটা ইজিচেয়ারে এলিয়ে দিয়ে বলল,

– কি হে বোন্ধুহ্? নতুন এলাকার মুরুব্বিরা সবাই তোমাকে একজোটে ওয়েলকাম করলো যে! মন ভালো তো?

– আজকে অন এয়ার রেডিও মস্তির তোফা ভাইয়ের হাইড্রোক্লোরিক এসিড রিলিজের সাউন্ড প্লে করব। শুনবি?

তোফায়েলের মাথায় থাবা মেরে সায়াহ্ন মাইকের সামনের সিটে বসে গেল। তোফায়েল চুপ মেরে পুনরায় হেডসেট কানে দেয়। রোটেটিং চেয়ারটায় বসে সায়াহ্ন আগে সবটার ব্যাকআপ চেক দিলো। তারপর পটুহাতে একাধারে কল, গান, চ্যানেল ফেইডার কন্ট্রোলে নিয়ে মিক্সার অন করলো। ওপরপাশে বসা তোফায়েল গানের প্লেলিস্ট সাজিয়ে, কল-ম্যাসেজ প্রিভিউ করে বৃদ্ধাঙ্গুল উচিয়ে সব ঠিক বুঝাল। সায়াহ্ন অন এয়ারের বাটন এগিয়ে দেয়। উচ্ছল কন্ঠে বলতে শুরু করে,

– হ্যালো, সালাম, আদাব, শুভ সন্ধ্যা বাংলাদেশ! হোয়াস্সাপ গাইস? অবশ্য আপ না হলেও, There should be nothing down now! অফিসে, দোকানে, পার্কে, রেস্টুরেন্টে, ট্রাফিকে, পড়ার টেবিলে কিংবা বিছানায়; এই মুহুর্তে তোমরা যে যেখানে বসে জীবনের ভারী ভাবনায় ডুবে আছো, ঢুলুঢুলু চোখে ঝিমাচ্ছ কিংবা অপেক্ষা করছ কোনো এক্সাইটিং স্টার্টআপের জন্য; তোমার বোরিং মুডকে দিয়ে দাও– ছুট্টি! কেননা এ মুহুর্তে তুমি কানেক্ট আছো রেডিও মস্তি এইটটি ফোর পয়েন্ট ও’র সাথে; শুনছ “The Shayanno Show’; আর তোমাদের সাথে আমি, তোমাদেরই ডিয়ারেস্ট আরজে, সায়াহ্ন হামিদ!
বরাবরের মতো আজও শো জুড়ে থাকছে তোমাদের ফেভারিট ট্র্যাক, লাইভ এসএমএস, মেইল, ফেসবুক-হোয়াটসএ্যাপ ম্যাসেজ, কল-ইন, কনফেশন আর একটা আমেজিং গেইম “Tracing the Truth” খেলার নিয়ম– আমি দুইটা মিথ্যা আর একটা সত্য বলব, আর তোমরা ধরবে সেখানের কোনটা সত্য। ভুল ধরলে থাকছে পেনাল্টি। অন এয়ার গান গাইতে হবে! যার মানে, সায়াহ্ন শো’র সাথে তোমার আজকে সন্ধ্যাটাও হতে যাচ্ছে মাস্টারপিস! দেরি না করে, এই ছুটেচলা জীবন থেকে এখনই ছিনিয়ে নাও একটুখানি “আমিময়” সময়। লিখে ফেলো তোমার স্টোরি, তোমার উইশ অথবা তোমার গানের রিকুয়েস্ট। আর পাঠিয়ে দাও রেডিও মস্তির ফেসবুক পেইজে-লাইভে, @*** মেইলে, অথবা 019*** হোয়াটসঅ্যাপে।
So buckle up boys & girls! গান আসছে, কলারস্ আসছে, আছে ঝুটিমুটি খেলা, আর আসছে তোমাদেরই জীবনের গল্প! গান, আড্ডা, মস্তিতে আজ সন্ধ্যা উদযাপন করব আমরা! So Stay tuned with Radio Masti guys!

উল্লাসিত, আনন্দিত, প্রাণবন্ত কন্ঠ! অথচ ছোটছোট কারনেই রেগে গিয়ে এই মানুষের হুঁশ থাকে না। মাথা দুলিয়ে হাসল মানহা। শো শেষ হবার পর গাড়ির অডিও সিস্টেম অফ করলো ও। ঠিক সাড়ে আটটায় গাড়ি থামালো রেডিও মস্তির বিল্ডিংটার সামনে। তারপর জানালা দিয়ে সেখানের গেইটে তাকাল। সায়াহ্ন যে সাড়ে আটটার একমিনিট আগেও বেরোবে না, এটা ও জানে। এজন্য সময়ের হিসেব করেই এসেছে মানহা। সাড়ে আটটায়ই গেইট দিয়ে সায়াহ্নকে বেরোতে দেখল ও। বাইরে বেরিয়ে সে পকেট থেকে ফোন বের করে সেটা কানে তুলল। এয়ারবাডে কল রিসিভ করে, কলদাতাকে দেখতে দেখতে মানহা বলল,

– অপোজিটের রোডে আছি।

কল কেটে দিয়ে সোজা তাকাল সায়াহ্ন। অতঃপর মৃদ্যু দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গাড়ির দিকে আসলো। মানহার জানালায় ঝুঁকে বলল,

– দুমিনিট বসো, আমি আসছি।

– আগে গাড়িতে বসো। দরকারি কাজটাই দুমিনিট পরে করো।

দরকারি কাজ বলতে যে মানহা ওর সিগারেট খাওয়াকে বুঝিয়েছে, সেটা বুঝল সায়াহ্ন। আর কথা বাড়ল না। ঘুরে এসে ফ্রন্টসিটে বসে ফোন বের করল। মানহা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল,

– Chinese or Italian?

– ডিনারে চাইনিজ কবে খেয়েছ?

সায়াহ্ন ফোন থেকে চোখ তুলল না। আশানুরূপ জবাবটাই পেয়েছিল মানহা। রাতে বাইরে খেলে কখনো চাইনিজ খায় না ও। একই খাদ্যোভ্যাস সায়াহ্নেরও। পাঁচমিনিট ড্রাইভ করে একটা রেস্টুরেন্টে এসে পৌছাল ওরা। সায়াহ্ন গাড়ি থেকে নেমে ফোন পকেটে পুরে দাঁড়াল। ড্রাইভিং সিটে বসে দুদন্ড ওকে দেখল মানহা। সুদর্শন, সুঠামদেহী এই পুরুষটাকে দেখতে শুরু করলে যে কারো জন্যই চোখ ফেরানো দায় হয়৷ ওরও হতো। হয়ত আজও হচ্ছে। কিন্তু তবুও চোখ ফেরাল মানহা। সাইডব্যাগ কবজিতে ঝুলিয়ে, পেন্সিলহিলের আওয়াজ তুলে সায়াহ্নর পেছনপেছন রেস্ট্রুরেন্টে ঢুকল ও। অর্ডার করার অল্পসয়মেই খাবার চলে আসে। মানহা খেতে খেতে বলল,

– কোথায় ছিলে এ কয়দিন?

– ময়মনসিংহে।

– ময়মনসিংহে কেন?

সায়াহ্ন আটকাল। চোখ তুলে একপলক মানহাকে দেখে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগী হয়ে বলল,

– বন্ধুর বিয়ে ছিল।

– আর তুমি ওখানে গিয়ে আমাকে ভুলে গেলে।

সায়াহ্ন এবার ভ্রু কুচকে মানহার দিকে তাকাল। না বোঝার মতোকরে বলল,

– What do you mean?

– আমি যা মিন করেছি তা তুমি বুঝেছ।

– না আমি বুঝছি না। Make it clear.

সায়াহ্নর শান্ত ভঙিমা। একটা দম ছেড়ে চামচ রেখে দিলো মানহা। সায়াহ্নর চোখে চেয়ে বলল,

– Why should I make it clear Shayanno? তুমি কেন বোঝো না? গার্লফ্রেন্ড হই তোমার। অথচ তুমি আমাকে না তুমি দুম করে বন্ধুর বিয়েতে চলে গেলে। ওখানে গিয়ে একটাবার কল অবদি করো নি। আমার কলও রিসিভ করো না। ছয়দিন পর ঢাকা ফিরে ম্যাসেজ করছো দেখা করতে পারব কিনা। Is this how a relationship works?

মানহার কথা শুনে সায়াহ্নর চাওনি প্রসারিত হয়। আর সে চাওনিতে বিস্ময়! ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার থেকে ও যে মানহাকে চেনে, সে মানহা এভাবে কথা বলে না। কারো কাজে দখলআন্দাজ করে না, জবাবদিহিতা চায় না। সম্পর্ক টেকাতে আকাশপাতাল এক করে না বা সামনেরজনের থেকে আশাও করে না। এজন্যই তো এখনো মানহার সাথে আছে ও। যাতে কখনো কোনোকিছুর জন্য ওকে গার্লফ্রেন্ডের কাছে, অনুমতি, জবাবদিহিতা আর আবেগের বেড়াজালে বাধা না থাকতে হয়। অথচ সে মানহাও আজ ওরওপর অধিকারবোধ খাটাতে চাইছে! সায়াহ্নর নিজের চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। হৃদয়ের সবটুকো অবিশ্বাস নিয়ে ও অস্ফুটস্বরে বলল,

– What’s wrong with you?

দৃষ্টি সরায় মানহা। আর মেজাজ খারাপ হয়ে কপালে ভাঁজ পরে সায়াহ্নর। ও পুনরায় বলল,

– Listen Manha! আমি তোমার থেকে অভিমান-অভিযোগের চিপ ড্রামা এক্সপেক্ট করি না। তবুও যদি তুমি এমন কোনো ড্রামা করতে ইচ্ছুক হও, Stop it right here. যা বলার তা স্পষ্ট করে বলো।

– তোমার মতে, একটা সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি কি সায়াহ্ন?

সায়াহ্নর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো মানহা। সায়াহ্ন আগ্রহী হলো। এই প্রশ্ন দিয়েই দু বছর আগে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ওদের। আর ওরা দুজনেই এর জবাব দিয়েছিল, একই মানসিকতা। আজ দু বছর পরও সায়াহ্নর জবাব বদলায় নি। সেবারের মতো ও আজও জবাব দিলো,

– দুজনের মেন্টালিটি সেম হওয়া। আর যতদূর আমি জানি, এটা শুধু আমার মত না, তোমারও মত। এজন্যই আমরা এখনো একসাথে।

– কিন্তু আমি যদি বলি এখন আমার মত বদলেছে?

সায়াহ্ন বলার কিছু পেল না। কেবল চেয়ে রইল মানহার দিকে। বড়লোক বাবার মেয়ে মানহা স্বভাবে সায়াহ্নরই সমতুল্য। কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করা, দুজনের এই সাধারণ বৈশিষ্ট্যই ওদের একে ওপরের সাথে থাকার কারণ। দুজনের মাঝের In a relationship স্ট্যাটাসটা কেবল রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ঘোরা কিংবা সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখার সময়টুকোতে। এরপর বাকিটা সময় মানহা যেমন নিজেরমতো চলে, তেমনি সায়াহ্নও। ওই দেখা করার আগমুহূর্ত ছাড়া কেউ কারো খোঁজ নেয়না, খোঁজ করেনা। এবং এ নিয়ে কখনো, ওদের কারো কোনো অভিযোগও ছিল না। কিন্তু আজ মানহা বিপরীতেই হাটছে বলে সায়াহ্নর মনে হলো। মানহা কাঁচের দেয়ালের ওপারের ঝিলমিলে শহরের দিকে তাকাল। বলতে লাগল,

– Last month I met someone. ছেলেটা পাপার পরিচিত। তোমাকে পছন্দ করে না বলে পাপা এর আগেও অনেককে আমার লাইফে পুশ করার চেষ্টা করেছে। And trust me, I was never influenced by them. Untill I met this strange man!
এই মানুষটা আলাদা। আমি যেমন চলি, যেমন মানুষ পছন্দ করি, একদমই তার বিপরীত। সময় অসময়ে টেক্সট করা মানুষদের আমার বেকার মনে হয়, আমি বিরক্ত হই। কিন্তু এই মহাব্যস্ত লোকটা নিয়মিত আমাকে কল-টেক্সট করে গুড মর্নিং বলে, খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করে। আমি কারো থেকে ইফোর্ট এক্সপেক্ট করি না, কখনো কারো জন্য ইফোর্ট দেওয়াও পছন্দ করি না। কিন্তু এই মানুষটা ইফোর্ট এক্সপেক্ট না করলেও ইফোর্ট দিতে ভালোবাসে। আমার কাছে গিফটস্, সারপ্রাইজ এগুলো ক্রিন্জ লাগে। কিন্তু তবুও এই লোকটা আমাকে হুটহাট গিফটস্ দিচ্ছে, স্পেশাল ফিল করায়।

প্রেমিকা একমাস হলো অন্য আরেকটা ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখছে, এমন কথাটা শোনার পরপরই যেকোনো প্রেমিকের পাগলপারা প্রতিক্রিয়া হবার কথা। অথচ সায়াহ্ন হামিদ মানহার কথার মাঝে একটা শব্দও বলল না। বরং সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে ও মানহার কথা শুনল। সে অন্য ছেলের গুড মর্নিং শোনে, গিফট নেয়, ইফোর্টে খুশি হয়। একটানা বলা শেষে মানহা ওরদিক তাকাল। মৃদ্যু একটা হাসির সাথে বলল,

– তোমার হয়ত এসব শুনে হাসি পাচ্ছে তাইনা সায়াহ্ন? তুমি যেই মানহাকে চিনতে, আমি যদি সে থাকতাম তাহলে নির্ঘাত আমারও হাসি পেত। কিন্তু কি করব বলো? লাস্ট উইক ইউকে তে গেছে ও। এই এক সপ্তাহ ওরসাথে কথা হয়নি সেভাবে। আর এই এক সপ্তাহেই আমি রিয়েলাইজ করেছি, তোমার সাথে যোগাযোগ না থাকলেও আমি বাঁচব। কিন্তু ওই লোকটার এসমস্ত ক্রিন্জ কাজকর্ম না থাকলে আমার বেঁচে থাকাটা কষ্ট হবে। এবার তুমিই বলো, এই ভাবনাকে আমি কি নাম দেই?

হুট করেই সায়াহ্ন হেসে ফেলল। মানহা অবাক হলো না। সায়াহ্নর মনোভাব জানে ও। প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে ওর কি ধারণা, সেটাও জানে। তাই ও সায়াহ্নর থেকে কোনো বুঝদার কথা আশা করলো না। সায়াহ্ন হাসি কমিয়ে খাবার নাড়তে নাড়তে বলল,

– তুমি আসলেও তুমি নেই মানহা! যাক! তাও ভালো! দুই বছর পরই হোক, you’ve got love of your life! Congrats!

সায়াহ্ন বেশ মজা নিয়ে বলছিল আর খাচ্ছিল। মানহা কিছু বলল না, অবাকও হলো না। কেননা ও জানত এসব শোনার পর সায়াহ্নর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে। দুজনের মাঝে কেউ যদি কখনো সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে যেতে চায়, সেটা অপরজন বিনাবাক্যে মেনে নেবে– ওদের প্রেম শুরুর শর্তগুলোতে এটাও একটা শর্ত ছিল। আর সায়াহ্ন হামিদ কখনোই কোনো শর্তকে অতিক্রম করত না। আজও করলো না। বরং আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করলো,

– By the way, আমার বিষয়ে তোমার নতুন বয়ফ্রেন্ড জানে?

– হুম। শুরুতেই বলেছি আমরা কি ধরনের সম্পর্কে আছি। He has no objection with it.

– গুড! আর তুমি যে নতুননতুন প্রেমে পরেছ, তোমার পাপাকে বলেছ এটা?

– হুম।

– ওহ ওয়াও! আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করো তো, আমাকে যে উনি ওনার অফিসে জয়েন করার অফার দিয়েছিলেন সেটা তোমার নতুন প্রেমিককেও দিয়েছেন কিনা!

সরু চোখে তাকাল মানহা। সায়াহ্ন আবারো হেসে ফেলল। মাথা দুলিয়ে বলল “Kidding!” দুজনে মিলে হাসিখুশিভাবে খাবার শেষ করে ওরা। বিল পে করে মানহাকে নিয়ে রেস্ট্রুরেন্ট থেকে বেরোল সায়াহ্ন। তারপর প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে ওর গাড়ির সামনে দাঁড়ালো। মানহা ওর সামনাসামনি দাড়িয়ে বলল,

– Thank you Shayanno.

– For what?

– সবটা এত স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার জন্য।

– তো তুমি কি এক্সপেক্ট করেছিলে? ব্রেকআপের শোকে আমি কান্নাকাটি করব?

– না। ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার থেকে চিনি তোমাকে। প্রেমিকার বিচ্ছেদে দেবদাস হওয়ার মতো ক্যারেক্টার যে তুমি নও, ছ বছরের পরিচয়ে এটুক তো জানি!

সায়াহ্ন তেমনি হাসল। তারপর হাতঘড়ি দেখে নিয়ে বলল,

– যাইহোক! অনেক রাত হয়ে গেছে। যাওয়া উচিত আমাদের। তুমিও এগোও। আর হ্যাঁ! পারলে আমাকে এক্স না ভেবে ফ্রেন্ড ভেবো। I’ll be always there for you. নতুন সম্পর্কের জন্য শুভকামনা!

– Thank you.

মুচকি হেসে পা বাড়াচ্ছিল সায়াহ্ন। হুট করেই ওকে পেছন থেকে ডাক লাগাল মানহা। সায়াহ্ন দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। ভ্রু নাচিয়ে বুঝাল “কি?” মানহা একপা এগিয়ে বলল,

– তোমার জন্য একটা সাজেশন আছে। দেবো?

– লাভগুরু হয়ে গেছ। দাও!

– পরেরবার কোনো সম্পর্কে জড়ালে সেম মেন্টালিটি খুঁজো না। সেইম মেন্টালিটির তো ছিলাম আমরা। অথচ দুই বছরেও তুমি আমার প্রেমে পরতে পারোনি। তাই এবার ভালোবাসলে নিজের উল্টো কাউকে খুঁজো। তুমি বিরক্ত হলে সে যেন আহ্লাদী হয়, তুমি রাগলে সে যেন শান্ত থাকে। তুমি দুরে গেলে সে যেন তোমার কাছে থাকে; তুমি বললে, সে যেন চুপ থাকে। এমন!

সায়াহ্ন থমকায়। মানহার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল ও। “আসছি। অল দ্যা বেস্ট।” বলে ড্রাইভিং সিটে বসে গেল মানহা। ও গাড়ি নিয়ে চলে গেলে ধ্যান ভাঙে সায়াহ্নর। কিন্তু মাথা থেকে মানহার বলা কথাগুলো সরলো না। হয়তো সবচেয়ে গাঢ় হয়ে রইল ওর বলা শেষ লাইনটা। কেমন মেয়ে লাগবে সায়াহ্নর? ও বললে, কেউ যেন চুপ থাকে, এমন মেয়ে। চুপ থাকে? এই হুল্লোড়ময় দুনিয়াতে চুপ থাকে কে? কথা না বলে কে থাকে? বোবারা? দুম করে ওর মাশফিকের বোনের কথা মনে পরে যায়। মাথা তৎক্ষণাৎ ঝারা মারল সায়াহ্ন। কিসব উল্টাপাল্টা ভাবছে ও! এসব নির্ঘাত মানহার সাথে সময় কাটানোর ফল। সায়াহ্ন তখনতখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, প্রেম করা মানহার সাথে আর দেখাসাক্ষাৎ করবে না ও। প্রেমে পরে গোল্লায় গেছে এই মেয়ে! ওরসাথে যোগাযোগ রাখলে ওর মাথাও গোল্লায় যাবে! আর সায়াহ্ন হামিদ প্রেমে পরে গোল্লায় যাওয়াদের দলে নাম লেখাতে চায় না! কদাপি নহে!

#চলবে…