অপ্রত্যাশিত পর্ব ৭+৮

0
2242

অপ্রত্যাশিত
পর্ব ৭+৮
লেখাঃ মুন তাহা

.
আমি : বাচাওওওওওওও
আবির : আরে পাখি আমি চুপ চুপ
আমি : আমি আর ভুত নিয়ে মজা করবনা ( কান্না করে )
কথাটা বলেই অজ্ঞান হয়ে গেলাম। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলাম আমি বেডে আর আবির আমার পাশে বসে আছে। আবির কে দেখে মনে হচ্ছে আমার অবস্থা দেখে ও অনেক ভয় পেয়ে গেছে। আমি বসেই আবির কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি।
আবির : পাখি আমি তো আছি এতো ভয় পাচ্ছো কেন?
আমি 🙁 কান্না করছি )
আবির : আচ্ছা হয়েছে তো এবার থামো
আমি : ওরা আবার আসবে ( কান্না করে )
আবির: কারা??( অবাক হয়ে )
আমি : ভুত ( ভয়ে )
আবির : হাহাহা। এবার ছাড়ো ফ্রেশ হয়ে আসি
আমি : নাহ। আর একটু হলেই তো মরে যেতা…( কথা শেষ করার আগেই আবির মুখ চেপে ধরলো)
আবির : কিচ্ছু হতে দেবনা তোমার
আমি : আর একটু লেইট করে আসলেই..
আবির : চুপ( রেগে )
আমি : হুম
আবির : পাখি
আমি : হু
আবির : ওওও পাখি। ফ্রেশ হয়ে আসি? নাহলে কিন্তু..
আমি : চুপ
আবির : হু। পাগলী
সকালে উঠে দেখি আমি আবিরের বুকের মধ্যে শুয়ে আছি আর আবির আমাকে দেখছে..
আমি : কি দেখছেন
আবির :দেখছি আমার বউটা কত সাহসী
আমি : হুহ
আবির : তবে যায় বলো ভয় পেলে আমারই লাভ। রাতটাও সুন্দর হয় আর সকালটাও
আমি : উঠেন এবার
আবির : পাখি
আমি : হুম
আবির : ভুত আসলে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিও। হাহাহা
আমি : ধ্যাত

এভাবেই কখন যে দুইবছর কেটে গেছে বুঝতেও পারিনি। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আমার সংসার। ফাহাদ ভাইয়ার কথা আবির কে বলার পর অমত করেনি। অরিন ও খুব খুব খুব খুশি। মা বাবা, আবির আর আমি। আবির কে যখন বললাম পরিবারে নতুন সদস্য আসছে তখন ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কেদেঁ দেয়। আমার মধ্যে নতুন একটা প্রাণ বড় হচ্ছে। পিচ্চি টার জন্য সবাই নতুন করে বাড়িটা সাজানোই ব্যস্ত। হঠাৎ একদিন বাথরুমে পড়ে যায়। আবির তখন অফিসে। আমাকে হসপিটালে নিয়ে আসে। অপারেশন করতে হবে, যে কোনো একজনকে বাচাতে হবে.. আমি আবিরের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। ওর এত স্বপ্ন সব নষ্ট হয়ে যাবে?
আমি : একটা কথা রাখবা? ( কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে )
আবির : বলো পাখি ( পাগল টা কান্না করছে)
আমি : বাচ্চাটাকে বাচাতে বলবা ডক্টরকে
আবির : কিচ্ছু হবে না তোমার। আমাদের বাচ্চাটাও আসবে আর তুমি ও ঠিক হয়ে যাবে..
আবির আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে..
আমি : বাচ্চার যেন কিছু না হয়। আমি মরলেও..
আবির : চুপ.. একদম চুপ। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি ময়না পাখি।

এরপর কি হলো মনে নাই। শুধু মনে হচ্ছিল মরে যাবো। জ্ঞান ফিরলে..
ডক্টর : এখন কেমন ফিল করছেন?
আমি : আমার বাচ্চা? ( ভয় পেয়ে )
ডক্টর : শান্ত হোন। আপনার বেবি সুস্থ আছে। আপনি অসুস্থ তাই ওকে আলাদা রাখা হয়েছে।
আমি : আচ্ছা আমার বাড়ির কেউ নেই?
ডক্টর : আপনার husband তো বাড়িতেই যায় নি। সত্যি অনেক লাকি আপনি।
আমি : এ..এই কয়দিন মানে?
নার্স:( পাশ থেকে ) আপনি দুইদিন অজ্ঞান ছিলেন।
আমি : ওর সাথে একটু দেখা করতে দেবেন প্লিজ
নার্স: আচ্ছা ওয়েট করুন

আবির আসার পর… ( কি অবস্থা হয়েছে মানুষটার। এলোমেলো চুল, শুকনো ঠোঁট, কেদেঁ চোখ দুইটার কি অবস্থা করেছে)
আমি : কি অবস্থা করেছো নিজের? একটুও যত্ন নাওনি..
আবির : ( আমার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ) চুপ। বেশি কথা বলোনা।
আমি : কিন্তু….
আবির : তোমার জন্য তো সব। এমন ভয় কেউ দেখাই? তুমি জানোনা তোমাকে ছাড়া আমার চলে না। কতটা ভালোবাসি বোঝোনা?
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললো। আর আমি শুধু ওকেই দেখছি। প্রচণ্ডরূপে ভালোবাসে আমাকে। একটু পরে নার্স আমার ছোট্ট ছেলেকে দিয়ে গেল..
দুই দিন পর বাড়িতে আসলাম। আমার শাশুড়ি মা কখনো আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। এক কথায় সবাই খুব খুশি। ছেলের নাম রেখেছে আয়ান। জানিনা সুখের সময় গুলো কেন এতো তাড়াতাড়ি চলে যায়। আয়ানের বয়স যখন তিন বছর তখন বাবা মারা যায়। সবাই অনেক ভেঙে পড়ি। মা আয়ানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করে আর আমিও কাজ শেষ করে যতটা পারি মাকে সময় দেই।
.
.
আমি : তোমার ছেলেটা খুব জেদি। এখন থেকে একটু শাসন করো নাহলে..
আবির : আহা পাখি এতো রাগ করছো কেন? ছেলের বাবাও খুব জেদি তাই তো ভালো থাকতে পারছে..
আয়ান: বাবাইইই
আবির : এই যে বাবা আসো
আয়ান: জানো মা আমাকে বকেছে
আবির : আচ্ছা বাবা মাকে আমি বকে দেবো
আয়ান: আমার গুড বাবাই। দাদুর কাছে যাই..
আবির : আচ্ছা যাও..
আবির পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে..
আবির : আমার পাখিটার রাগ এখনো কমেনি?
আমি 🙁 চুপ)
আবির: বাচ্চা মানুষ একটু দুষ্টুমি তো করবেই। এতো রাগলে হবে?
আমি :সাতবছরে তোমার বাচ্চা মনে হয়?
আবির : আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। এবার তো রাগ কম করো। এমন মুখ ভার করে থাকলে ভালো লাগে না
আমি : হু
আবির: পাখি… আমার যে এবার একটা ছোট্ট পরী চাই
আমি : একটাই আমাকে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে আবার আর একটা। সারাদিন অফিসে থাকো তুমি কি বুঝবা
আবির : বাব্বাহ। সেই ছোট্ট পাখিটা কত বড় হয়ে গেছে…
আমি : হুম সংসার সামলাতে হয় আমাকে..
আবির : আচ্ছা শোনো কাল আমাকে অফিসের কাজে ময়মনসিংহ যেতে হবে
আমি : না গেলে হয় না? ( মন খারাপ করে )
আবির : কেন কাল কি?
আমি : জানিনা কেন মনে হচ্ছে না যাওয়ায় ভালো
আবির : আমাকে নিয়ে বেশি ভাবো তো তাই এমন মনে হচ্ছে
আমি : হুম
সকালে….
আবির : পাখি…
আমি : হুম
আবির : ( আমার কপালে কিস করে ) সাবধানে থেকো
আমি : তুমিও
আবির মা আর আয়ানের সাথে দেখা করে চলে গেল। আমার মনটা কেমন যেন অশান্ত লাগছে।
দুপুরে অচেনা নাম্বার থেকে একটা কল আসলো……
আমি : হ্যালো কে?
ওপাশ থেকে : 017******* নাম্বারটা চেনেন?
আমি : হ্যাঁ কেন কি হয়েছে? ( ভয় পেয়ে )
ওপাশ থেকে : একটু আগে একজন accident করেছে আর তার কাছেই এই ফোন টা ছিল। আমরা তাকে সদর হসপিটালে নিয়ে এসেছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনারা চলে আসেন। হ্যালো…
কি বললো লোকটা? আবিরের কিছু হলো? ভাবতে পারছি না কিছু এখনই যেতে হবে…
মা: বউমা কোথায় যাচ্ছো? ( অবাক হয়ে )
আমি : ( মাকে আর আয়ানকে এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না ) আমি এখনই চলে আসবো মা। চিন্তা করেন না।
মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।আবিরের কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাব। আল্লাহ কে ডাকছি শুধু। আজকে পথটা যেন শেষই হচ্ছে না। কি করবো মাথা কাজ করছেনা। অবশেষে হসপিটালে….
দৌড়ে ভেতরে গেলাম…
আমি : নার্স একটু আগে যাকে এডমিট করা হয়েছে..( কান্না করছি )
নার্স: একজন মারা গেছে আর বাকি দের অবস্থা ও ভালো না। বলা যাচ্ছে না কি হবে..
কাদতে কাদতে ফ্লোরে বসে পড়লাম। আমার আবির যেন ওই মানুষটা না হয়। হঠাৎ কেউ আমার সামনে বসলো..
-পাখি?
আমি : তাকিয়ে দেখি আবির। আরও জোরে কান্না করছি
আবির : কি হয়েছে পাখি? আর তুমি এখানে কি করে?
আমি : তো..তোমার ফোন থেকে কে কল করে বললো তুমি… ( কান্না করে )
আবির : আচ্ছা আগে শান্ত হও। আমি তো তোমার কাছেই আছি এখন। প্লিজ পাখি একটু শান্ত হও…
কিছুক্ষণ পরে…
আবির : ঠিক আছো?
আমি : হু। এবার বলো
আবির : তোমাকে তো বলেছিলাম আজ বাইরে যাব আর তুমি বারন ও করছিলা তাই ঠিক করছিলাম যাব না
আমি : আর তোমার ফোন?
আবির : গাড়িতে উঠার পর তোমার কথা ভেবে আবার নেমে যায়। কিন্তু ভুল করে ফোনটা গাড়িতেই রেখে দিই।
আমি : আমার কি অবস্থা হয়েছিল জানো তুমি? ( ওর কলার ধরে )
আবির : কি ভেবেছিলে মরে গেছি? হাহাহা
আমি : সব কিছুতেই ফাজলামি ভালো লাগে না
আবির : আচ্ছা আচ্ছা সরি। আর এমন হবে না। এবার তো কান্না অফ করো
আমি : হু
আবির : এখানে সব কাজ শেষ। বাসাই চলো।
আমি : চলো
.
.
.
কেটে গেছে অনেক গুলো বছর..
আজ আমাদের ছেলের বিয়ে। আবিরের ইচ্ছা টাও পূরণ হয়েছে, আমাদের মেয়ে আয়রা ও বড় হয়েছে। কখনো ভাবিনি এতোটা সুখ আমার কপালে থাকবে।
আবির : কি ভাবছো পাখি?
আমি : চুলে পাক ধরছে তবুও ভালোবাসা কম হয় নি তোমার। কতবার বলেছি ছেলে মেয়েদের সামনে এই নামে ডাকবেনা
আবির : বড়দের কাছ থেকেই তো ছোটরা শিখবে তাইনা পাখি?হাহাহা
আমি : ( দেখছি মানুষটারে )
আবির : কি দেখছো? একটা কথা কি জানো পাখি, তোমার সাথে কাটানো সময় গুলো এক মুহুর্ত মনে হয়।
আমি : তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের অপ্রত্যাশিত গল্পের মতো। কখনো ভাবিনি একটা জীবন বেহিসাবেই তোমার সাথে কাটাতে পারবো।
আবির : আজ থেকে আবার নতুন করে প্রেম করব। হাহাহা
আমি : তুমি না….
আবির : আচ্ছা এবার চলো। তোমার ছেলে অপেক্ষা করছে। বউকে আনতে হবে তো…
আমি : হুম চলো……
.
#সমাপ্ত