অবশেষে তুমি আমার পর্বঃ২৫

0
3444

অবশেষে_তুমি_আমার
পর্বঃ২৫
তাসনিম_রাইসা

অধরা হাসিমুখে তুর্যয়ের আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। সেইদিন অধরা যে কাপড়টা পড়ে বাসায় আসছিল। সে কাপড়টা দু’জনের পাশেই পড়ে আছে। রাজের বুক ফেটে কান্না আসছে। পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। অধরা তার বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেলা করবে সে কল্পনাতেও ভাবেনি। রাজ ফোনের ভিডিওটা অধরার সামনে ধরলো।
– অধরা ভিডিওটা দেখেই রাজের দু’পা ঝাপটে ধরে বললো,’ রাজ প্লিজ আমাকে বিলিভ করো আমি এসব কিছু করিনি। আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। আমি সত্যিই যে তোমাকে মনে-প্রাণে স্বামী হিসেবে জায়গা দিয়েছি। কিভাবে পারি সেখানে অন্য কাউকে বসাতে? সেই শৈশব থেকে তোমার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। প্লিজ তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না।

– অধরার প্রতিটা কথা রাজের কলিজায় এসে লাগছে! মনে হচ্ছে অধরা এই নোংরামী না করে তার বুকে ছুরি বসিয়ে দিলেও এতটা কষ্ট হতো না। পৃথিবীর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য হচ্ছে নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যের বিছানায় দেখা। এসব যেন অন্য কারো সাথে না ঘটে। বুকের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। অধরাকে এভাবে দেখবে সে কল্পরাও করেনি। চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। যে অধরার ছোটবেলার ছবিটা বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমাতো। যে অধরার জন্য শত শত মেয়েকে রিজেক্ট করেছে। যে অধরার জন্য জীবনে কাউকে ভালোবাসেনি। আজ সেই অধরায় অন্য ছেলের সাথে শারীরীক সম্পর্ক করতে ব্যস্ত! রাজ নিজের চোখে দেখা জিনিস কিভাবে অবিশ্বাস করবে? এই অধরা পা ছাড়ো। তোমাকে সত্যি অনেক বিলিভ করেছিলাম। কিন্তু একটাবারো ভাবিনি তোমরা টাকার জন্য সব করতে পারো।

– রাজ আমার মা-বাবার কসম বিশ্বাস করো আমি এসব কিছু করিনি। তুর্যয় আমাকে কিডন্যাপ করেছিল। যখন জ্ঞান ফিরে তখন নিজেকে বন্ধ ঘরে আবিষ্কার করি। তার পর আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে তিয়াস আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারছো না? একবার বুকে এসেই দেখো না আমার বুকে যতবার হার্টবিট বাজে ততবার তোমার নামটিই জপে!

– বাহ! বাহ! আর কতো ড্রামা করবে টাকার জন্য? কত টাকা চাই তোর? আলমারী থেকে টাকা এনে ছুড়ে মারলো অধরার মুখে। এই টাকার জন্যই তো নিজের দেহ বিলিয়ে দিতে একবারো ভাবস না? আচ্ছা তুর্যয় কতটাকা দিয়েছিল তোকে?
– রাজ প্লিজ এগুলো আমাকে বলার চেয়ে মেরে ফেলো নিজ হাতে। তোমার মুখে এসব শুনার চেয়ে মৃত্যু শতগুণ ভালো!

– চুপ চরিত্রহীন মেয়ে। তোর চেয়ে পতিতারাও ভালো আছে। তারা বেইমানী করে না। আর কয়েকটা দিন বাকি ছিল তখন যা ইচ্ছা তাই করতি। আমি কিছুই মনে করতাম না। কিন্তু তুই এতো খারাপ আগে ভাবিনি। চিন্তা করিস না সামনে শুক্রবারে আমি আনিশাকে বিয়ে করবো। আজকের আনিশা আমাদের বাসায় আসবে। তোর সামনে ওকে বিয়ে করবো। তুই না বলিস আমি তোর স্বামী। তোর প্রথম ভালোবাসা। ফুলের মতো পবিত্র তুই! ছি! লজ্জা করে না তোর এসব বলতে?

– রাজ চলে গেলো বাসা থেকে।

– ত্রিযামিনী অধরার কাছে এসে বললো,’ কিরে তোর কয়টা লাগে? রাজ, তিয়াস এখন আবার তুর্যয়ের সাথে! আচ্ছা তোর পেটের বেবিটা যদি বড় হয়ে বলে তার বাবা কে?. তুই কি তিন জনের নাম বলবি?

– চুপ করবেন আপনি? কি সব উল্টাপাল্টা বলছেন?
– ওমা! নিজে বিছানায় যেতে পারবে আর আমি বললেই দোষ? আরেকটা কথা রাজ কিন্তু সত্যিই আপনাকে ভালোবাসতো। আর হ্যাঁ রাজ শুধু আমার! তুই নষ্টা এসে আমার জীবন থেকে রাজকে কেড়ে নিয়েছিস। দু’জনে মিলে কত রাত কাটিয়েছি আগে। বিয়েও করতাম দুজনে কিন্তু তুই করতে দিলি না।

– ত্রিযামিনীর মুখে রাজের সম্পর্কে এ কথা শুনে অধরার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠলো। তার রাজ এমন হতে পারে না।

– কি ভাবছিস? প্রমাণ আছে। চাইলেই দেখাতে পারি। এই বলে ত্রিযামিনী রাজ আর তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটা ভিডিও দেখে মুচকি হেসে চলে গেল।

– অধরার এবার বুকফেঁটে কান্না আসছে। তার রাজ আর আগের মতো নেই। তুর্যয়ের কথাটাই ঠিক, কেননা রাজ আমাকে ভালোবাসলে আনিশার সাথে হোটেলে রাত কাটাতো না। আর তাদের মধ্যে কিছু না থাকলে আনিশাকে বিয়েও করতে চাইতো না। কিন্তু আমি যে রাজকে ছাড়া বাঁচবো না। রাজ যদি আনিশাকে বিয়ে করে নেয় তাহলে কাকে নিয়ে বাঁচবো? যেভাবেি হোক এ বিয়ে বন্ধ করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে অধরা কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যায়।

– রাত্রে কারো ধাক্কাতে ঘুম ভাঙে। ঘুমে ঢুলুমুলু চোখ খুলতেই আনিশা আর রাজকে দেখতে পায়। বুকের ভেতরটা আচমকা ব্যথা অনুভব করে।

– এই তুই এখানে ঘুমাবি? উঠ এখান থেকে। এখানে আমি আর আমার জানেমন থাকবে। তোর মত পতিতা নয়!

– রাজ আমি চলে যাচ্ছি। তবে বিশ্বাস করো আমি খারাপ না।

– এই তুই যাবি এখান থেকে?
– অধরা কিছু না বলে চলে যায়। অধরা রুম থেকে বের হতেই রাজ দরজা লাগিয়ে দেয়। দরজা লাগিয়ে দিয়েই আনিশাকে জড়িয়ে ধরে বলে,’ আনিশা আমি সত্যিই তোকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমার জন্য তুই পারফেক্ট। পারবি না সারাজীবন তোর করে রাখতে?
– আনিশা এবার দু’হাতে রাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ হ্যাঁ পারবো কখনো আর কারো হতে দিবো না। সত্যি আমিও যে তোমায় ভালোবাসি। বিশেষ করে দেশে ফেরার কয়েকটা দিন সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবতাম।

– অধরা জানালার আড়াল থেকে সব দেখছে। অধরার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে রাজ আর আনিশার কথা শুনে। চোখের পানি বাঁধা মানছে না। না এখানে থাকা যাবে না। অধরা দৌড়ে অন্য রুমে চলে যায়। রাজ যখন বুঝতে পারে অধরা জানালার পাশ থেকে চলে গেছে। তখন আনিশাকে ছেড়ে দিয়ে বলে,’ সরি দোস্ত তোকে জড়িয়ে ধরে ওসব বলার জন্য! সত্যি বলতে অধরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনতেছিল!

– আরে সরি বলতে হবে না রাজ! আমিও অধরাকে দেখেছি। দেখেই তোকে জড়িয়ে ধরে ওসব বলছি। এসব বাদ দে। চোখের পানিটা রাজের আড়ালেই আনিশা মুছে ফেলল। আনিশা যে নিজের অজান্তেই রাজকে ভালোবেসে ফেলেছে সেটা আর বলতে পারলো না। রাজ তাকে বন্ধু হিসেবে যে রেসপেক্টটা করে তা সে নিজের জীবন দিয়েও শোধ করতে পারবে না।

– এদিকে শেষ রাতে অধরা ঘুম থেকে উঠে সুন্দর করে ওযু করে নামাযের সেজদায় কাঁদতে লাগে আর বলতে লাগে,’ হে রাহমানুর রাহিম। তুমি তো সর্বদ্রষ্টা তুমি তো জানো আমি কিছু করিনি। আমি পবিত্র। জানি না আমার সাথে কি হচ্ছে। আমার স্বামীকে তুমি আমার করে দাও। ও আমার আল্লাহ শেষ রাতে সমস্ত মানুষ যখন ঘুমায় তখন তোমার কুদরতী পায়ে সেজদা দিয়ে তোমার কাছে আমার স্বামীকে ভিক্ষা চায় ইয়া আল্লাহ। আমার সন্তানটার জন্য হলেও রাজকে আমার করে দাও। সমস্ত ষড়যন্ত্র থেকে হেফাযত করো আল্লাহ। ও আল্লাহ আমি পারবো না রাজকে ছাড়া বাঁচতে। আর কতো কষ্ট দিবে আমায়? আমি যে আর পারছি না। আমার বোনটাকে তুমি সুস্থ রেখো আল্লাহ। এসব বলে কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাযে ঘুমিয়ে যায়।

– সকাল বেলা ত্রিযামিনী ঘুম থেকে উঠে দেখে অধরার রুম খোলা! এদিকে নয়টা বেজে গেছে এখানো চা দেয়নি তাকে। ত্রিযামিনী অধরার রুমে এসে দেখে অধরা জায়নামাযের সিজদায়।

– ত্রিযামিনী মনে মনে বলে, পতিতার আবার নামায এই বলে অধরাকে লাথি দিয়ে জায়নামায থেকে ফেলে দেয়। লাথি খেয়ে অধরার ঘুম ভেঙে যায়।

– খুব ব্যথা লাগছে কোমড়ে ! ত্রিযামিনী মুচকি মুচকি হাসছে।
– অধরা অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে।

– এই এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? চা কি তোর বাবা বানিয়ে এনে দিবে? আর পতিতার আবার কিসের নামায?

– অধরা আর কিছু না বলে চা বানাতে চলে যায়। রাজ ত্রিযামিনীর কথা দরজায় দাঁড়িয়ে শুনেও কিছু বললো না।

– অধরার খুব কান্না পাচ্ছে। সন্ধ্যা বেলা রাজ আর আনিশা বিয়ের শপিং করে আসে। রাজ বাসার বাহিরে গেলে, ‘অধরা আনিশাকে বলে, ‘ আপু অনুমতি দিলে একটা কথা বলতাম। ” হ্যাঁ বলো।

– আপু আপনার বিয়ে হয়নি। কিন্তু আমার আর রাজের সে ছোটবেলা থেকে বিয়ে হয়ে আছে। মানছি আমার আর আমার পরিবারের অপরাধ ছিল তাই বলে,আমার গর্ভের সন্তানটা কেন তার বাবার ছায়া থেকে বঞ্চিত হবে। আপু আমি আপনার ছোটবোনের মতো। রাজকে আপনি ভিক্ষা হিসেবে দেন। আমি যে রাজকে ছাড়া বাঁচবো না আপু।

– আনিশা অধরাকে কিছু না বলে উঠে চলে গেলো। অধরা এখনো সেখানে বসেই কাঁদছে। কাল অধরার চুক্তির শেষ দিন। তারপর দিন রাজের বিয়ে আনিশার সাথে। কালকের পর চাইলেও রাজের কাছে থাকতে পারবে না। রাজ তাকে রক্ষিতাও করে রাখবে না। খুব কষ্ট হচ্ছে এগুলো ভেবে! অধরা সারা রাত নামায আর কান্না করেই পার করে দিলো।

– পরের দিন ঘুম ভাঙলো রাজের ডাকে। রাজ রুমে প্রবেশ করেই বললো এই নাও ডির্ভোস পেপার। অামি সাইন করে দিয়েছি তুমিও করে দিয়ো। আর ইচ্ছা হলে বেবিটা নষ্ট করে দিয়ো নয়তো। এখানে পাঁচ লাখ টাকা আছে এগুলো নিয়ে আমার থেকে দূরে চলে যেয়ো।

– অধরা রাজের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সারারাত কান্না করাই চোখের পাতা ফুলে গেছে। চোখগুলো লাল হয়ে আছে।

-কি হলো এই নাও টাকা আর বের হয়ে যাও।

– রাজ আমার আর টাকা চায় না। তোমার পায়ের নিচে একটু আশ্রয় চাই। স্বামীর অধিকার চাইবো না। আমাকে না হয় রক্ষিতা করেই রেখো। আর বাড়ির সব কাজ আমিই করবো। আমাকে তাড়িয়ে দিয়ো না রাজ। আমি তোমাকে ছাড়া সত্যি বাঁচবো না।

– এই তুই যাবি। তোর মতো চরিত্রহীনের মুখে এসব মানায় না।

– রাজ তুমি বিশ্বাস করো ওই ভিডিও আমার না। আমার গর্ভের সন্তানের কসম!

– রাজ এবার অধরার গালে ঠাস করে চড় দিয়ে বললো,’ খবরদার নিষ্পাপ বাচ্চাকে নিয়ে কসম করবি না। ”তুই আমার সামনে আর কোনদিন আসবি না। এখন এই মুহূর্তে ডির্ভোস পেপারে সাইন করবি।

– অধরা এবার রাজের দু’পা ঝাপটে ধরে বললো,’ প্লিজ এভাবে বলো না। কলিজা ছাড়া বাঁচবো কিভাবে? তুমি যে আমার কলিজা। আমাকে মেরে ফেলো তাও তাড়িয়ে দিয়ো না। আমার কিচ্ছু চায় না দু’বেলা খেতে দিয়ো।

– রাজের ভিডিওটার কথা মনে পড়ে যায়। অধরাকে কষে চড় বসিয়ে দেয়।

– ঠোঁট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগে। রক্তমাখা মুখ নিয়ে অধরা বলে,’ রাজ ফুল যেমন পবিত্র তেমন আমিও পবিত্র। একদিন আমাকে পাগলের মতো খুঁজবে। তোমার পা ছুঁয়ে একটু সালাম করতে দিবে কলিজা? অধরা যখন রাজের পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবে রাজ অধরার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। রাজ যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক সেখানে অধরা সালাম করে যখনি বাসা থেকে বের হবে, ‘তখন বাসার সামনে আট -দশটা BMW গাড়ি এসে দাঁড়ায় । গাড়ি থেকে কয়েকটা মেয়ে বের হলো। প্রায় সবার কোমড়ে রাইফেল রাখা। একটা মেয়ে, বললো,’ ম্যাডাম আর ইউ ওকে?
ইয়েস! চেকটা দাও!
– অধরা চেক বই থেকে একটা চেক ছিড়ে সাইন করে রাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,’ এখানে টাকার এমাউন্ট বসিয়ে নিয়েন। আর হ্যাঁ আপনার সারাজীবন বসে খেতে পারেন এমন একটা এমাউন্ট বসিয়ে দিয়েন ।

– এমন সময় কালো স্লাইনগ্লাস পরে একটা মেয়ে বেরিয়ে এসে অধরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,”আপু অনেক কষ্ট হয়েছে তোমাকে ছাড়া।”

– ইশু তোকে ছাড়া আমারো কষ্ট হয়েছে। আমাদের সাইবার স্পের্শাল টিম এসেছে?

– হ্যাঁ আপু!
-এই যে ত্রিযামিনী ফোনটা দাও! ত্রিযামিনীর হাত কাঁপছে।

– এই কি বলছি ফোন দাও!
– অধরা ফোনটা নিয়ে ইশুর হাতে দিয়ে বললো,’ এখানে একটা ভিডিও আছে। এটার রিয়েল ক্রিপটা চাই আমি তাও দশমিনিটের মাঝে।

– আপু ছোট্ট কাজ হয়ে যাবে। তুমি কি আজই লন্ডন চলে যাবে?

— চলবে”””