অবশেষে তুমি আমার পর্বঃ২৯

0
3300

অবশেষে_তুমি_আমার
পর্বঃ২৯
#তাসনিম_রাইসা

চড়টা যেন রাজের গালে নয় কলিজায় লেগেছে।

– হঠাৎঅধরার ফোনটা বেজে উঠে! অধরা ফোনটা রিসিভ করতেও ওপাশ থেকে মেয়ে তিয়াসের নামে কি যেন বলে। অধরার হাতটা কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা মাটিতে পড়ে যায়। অধরা তিয়াসের শার্টের কলার ধরে বলতে লাগে,’ এই তুই আমাকে রাজের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এখানে এসেছিস? তুই কি মনে করিস তুই বললেই আমি রাজের কাছে ফিরে যাবো? আর কি করে ভাবলি আমি এসব জানতে পারবো না?

– অধরা প্লিজ এমন করো না! কেন এভাবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো? রাজকে না তুমি ভালোবাসো। তোমার চোখ শুধু রাজকেই দেখা যায় অন্য কাউকে নয়! এজন্য বলছি রাজকে মেনে নাও। ভুল তো মানুষই করে। যে ক্ষমা করে সেই তো উত্তম!

– তিয়াস প্লিজ লিমিট ক্রস করো না। তোমার প্রতি আমার একটা রেসপেক্ট বোধ আছে সেটা চায় না নষ্ট হোক।

– হুম জানি। তবুও যদি একটু ভেবে দেখতে?
– তিয়াস তুমি কি করবে তাহলে?

– আমি কি করি না করি সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি চাই শুধু তুমি হ্যাপি থাকো। আর আমি যতটুকু জানি তুমি রাজকে ছাড়া আর কারো সাথে হ্যাপি হতে পারবে না।
– তিয়াস আমি এসব শুনতে চায় না। গাড়িতে উঠো ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে।
– অধরা আরেকটিবার যদি ভেবে দেখতে?
– তিয়াস তোমার ইচ্ছা হলে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে পারো। আর ইচ্ছা না হলে আসতে পারো।
– তিয়াস আর কিছু বললো না, ‘ অধরার সাথে গাড়িতে উঠে পড়ল!

– রাজ মূর্তির মতো এখনো পলকহীনভাবে অধরার দিকে তাকিয়ে আছে।

– অধরার রাজের প্রতি কোন ভ্রক্ষেপ নেই। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। রাজ এখনো অধরার বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।সন্ধ্যা লেগে গেছে।আকাশটাও মেঘলা। আকাশ গর্জন করে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রাজের মাথার উপর পড়ছে। রাজ বৃষ্টির মাঝে হাটুগেড়ে বসে আছে।হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামলো রাজের কাছে। গাড়ি থেকে একটা মেয়ে ছাতা নিয়ে রাজের পাশে এসে দাঁড়ালো।বৃষ্টির ফোঁটার সাথে রাজের চোখের জলও সমান তালে গড়িয়ে পড়ছে।
– রাজ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল! মেয়েটা আর কেউ নয় আনিশা।

– অানিশা রাজের কাঁধে হাত রেখে বললো,’ এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে অসুখ করবে তো।” চলো বাড়ি চলো। আনিশা রাজের হাতটি ধরে টেনে দাঁড় করালো।

– অানিশা তুমি কেন এখানে আসলে?
– কেন আমি না তোমার বন্ধু। আমি না আসলে কে আসবে তোমার বিপদে?

– জানো আনিশা আমি অধরাকে ছাড়া হয়তো বাঁচবো না। অধরাকে কত রিকয়েস্ট করলাম যেন আমাকে ছেড়ে না যায়। তবুও আমাকে ছেড়ে গেলো।

– হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজে ভয় পেয়ে রাজ আনিশাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আনিশাও বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজে ভয় পেয়ে যায়। তবে রাজের মতো না।রাজ ছোটবেলা থেকেই বিদ্যৎ চমকালে ভয় পায়। কারণ তার সামনেই বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্য হয়।
– রাজ আনিশাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আনিশার পুরো শরীর কাঁপছে। রাজ ভয়ে জড়োসরো হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছোটবাচ্চা যেমন ভয় পেয়ে চুপসে যায় রাজ তেমন করে ভয়ে চুপসে গেছে।

– আনিশা চোখ বন্ধ করে আছে। তার কাছে মনো হচ্ছে বৃষ্টিটা তার জীবনের পরম পাওয়া। সত্যিই বৃষ্টিটা তার জন্য আর্শীবাদ হয়ে এসেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রিয় মানুষটা তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।

রিম ঝিম বৃষ্টি যেন আনিশার ভালোবাসার শহরটাকে আলোকিত করে দিচ্ছে।
– এমন সময় আবার বজ্রপাতের শব্দ হলো! রাজ আনিশাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এবার আনিশা আর নিজেকে কন্টোল করতে পারলো না। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠলো। আনিশা রাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই বৃষ্টি থেমে গেল।

– রাজ বুঝতে পারলো সে ভয়ে আনিশাকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাই আনিশার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। আনিশা এখনো লজ্জায় রাজের দিকে তাকাতে পারছে না।

– রাজ ভনিতা ছাড়াই বললো,’ আনিশা কিছু মনে করো না খুব ভয়ে পেয়ে গেছিলাম তাই।

– মনে করবো না মানে? তুমি কেন আমাকে জড়িয়ে ধরলে? মেয়ে দেখলেই জড়িয়ে ধরতে চায়?
– আনিশা তুমি যা ভাবছো তা নয়। সত্যিই বিদ্যৎ চমকালে আমার খুব ভয় করে। তাই ভয় পেয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি। প্লিজ তুমি কিছু মনে করো না।

– আরে পাগল সরি বলছো কেন? শোন আমি কিছু মনে করিনি। আমি আগে থেকেই জানতাম বিদ্যৎ চমকালে তুমি ভয় পাও। এছাড়া আমি তো তোমার বন্ধু। তাই ধরতেই পারো। ইচ্ছা করে তো আে ধরোনি।

– সত্যি তুমি কিছু মনে করোনি?
– আরে ধূর পাগল কি মনে করবো? বরং আমি তো চায় তুই এভাবে সারাজীবন আমাকে জড়িয়ে ধরে থাক।

– কিছু বললে আনিশা?
– না কিছু না। তা এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে হবে? জ্বর আসবে তো।

– রাজ ছোট বাচ্চার মতো কান্না করে দিয়ে বললো,’ আনিশা আমার কলিজার টুকরা আমাকে ছেড়ে চলে গেলো।’ একটু বার আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। খুব কষ্ট হচ্ছে। ও না আমায় ভালোবাসতো। হ্যাঁ আমি মানছি আমি না জেনে ভুল করেছি। তাই বলে আমাকর ক্ষমা করে বুকে টেনে নেওয়া যায় না।

– রাজ প্লিজ মন খারাপ করো না। দেখবে অধরা আপু ঠিক একদিন তোমাকে বুঝবে।তোমার ভালোবাসা বুঝবে।
– আনিশা আমার অধরা আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ওরে ফেরাও!

– আপুর ফ্লাইট কখন?
– ৭.৩০ এ! শুনলাম সে ফ্লাইটে যাবে না। রাত দশটার ফ্লাইটে যাবে।
– ও এখনো তাহলে প্রায় দু’ঘন্টার বেশি বাকি চলো এয়ারর্পোটে।

– আনিশা গাড়ি চালাচ্ছে! রাজ পাশে বসে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।

– এদিকে তিয়াস অধরাকে এয়ারর্পোট নেওয়ার আগে বললো,’ অধরা তোমার তো মন খারাপ। চলো যাওয়ার আগে এক জায়গায় যাই?
– আমার মন খারাপ কে বললো তোমাকে?
– অধরা তুমি আমাকে না ভালোবাসলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমা মুখ দেখেই সব বলে দিতে পারি।
– অধরা মুচকি হেসে তিয়াসের কথা মতো গাড়ি ঘুরাতে বললো,’ এদিকে তিয়াস একটা এতিম খানার সামনে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে অধরাকে বের হতে বললো,’ অধরা গাড়ি থেকে বের হতেই অনেক গুলো ছেড়ে দৌড়ে এলো। না অধরার জন্য আসেনি। সবগুলো এতিম ছেলে দৌড়ে এসে তিয়াসকে ঘিরে দাঁড়ালো। সবার সাথে অধরাকে পরিচয় করে দিলো। এবং এতিমখানায় কিছু সময় পার করে তিয়াস অধরাকে নিয়ে এয়ারর্পোট চলে যায়। এয়ারর্পোটে ডুকতেই অধরা শর্ক খায়।রাজ এখানে! সাথে আনিশাকেও দেখা যায়!

– অধরা রাজকে দেখে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো।

– রাজ অধরাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,’ কলিজার টুকরা আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। আমি তোমাকে ছাড়া সত্যি বাঁচবো না।
অধরা রাজকে ধাক্কা দিয়ে বুক থেকে সরিয়ে দেয়।

– সরিয়ে দিয়েই বলতে লাগে,’ এই আপনি পাগল? কে আপনি পাবলিক প্লেসে জড়িয়ে ধরে বলতেছেন আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবেন না?
– হ্যাঁ আমি তোমার পাগল! প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। এই আনিশা তুমি কিছু বলছো না কেন?

– অধরা আপু রাজ আপনাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসে। প্লিজ আপনি রাজকে একা রেখে যাবেন না।

– একা কোথায় রেখে যাচ্ছি? তুমি আছো না?

– আপু আমি রাজের ভালো বন্ধু। আর আপনি তার ভালোবাসা।

– তাই বুঝি? ভালো বন্ধু বলেই সারারাত একসাথে থাকেন? রাত কাটান। জড়িয়ে ধরেন।

– আপু আপনার দেখার মাঝেও ভুল আছেন।
– চুপ কর চরিত্রহীন মেয়ে। আরেকজনের জন্য উকালতি করছে আসছিস! তুই কি করে ভাবলি তোর কথায় আমি ওই চরিত্রহীনটাকে ক্ষমা করে দিবো? আমি কি সে রাতের কথা ভুলে যাবো?
– আপু সে রাতে রাজ আর আমার মধ্যে কিচ্ছু হয়নি!

– অধরা আনিশার গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়!
– এই সেদিন রাতে কি হয়েছিল না হয়েছিল আমি জানি। সেদিন রাতে রাজ আপনার ড্রেস চেঞ্জ করে দিয়েছে তাই না?
– ছিহ! আপনি না রাজকে ভালোবাসতেন। এই আপনার তার প্রতি বিশ্বাস।

– আমার কারো প্রতি কোন বিশ্বাস নেই।
– আপু ফ্লাইট ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।চলো ভিতরে যায়।

– অধরা তিয়াসকে লক্ষ করে বললো,’ তিয়াস তুমি প্লিজ লন্ডনে এসো। আর আমি এর পরের বার তোমাকে নিতে আসবো। আর নিজের কেয়ার নিয়ো। একদম অগুছালো থাকবে না।

– অধরার কথাগুলো রাজের কলিজার এসে বিঁধছে। তারই চোখের সামনে প্রিয় মানুষটা অন্যকে যত্ন নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু একটিবার তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।সে কি এতই অবহেলার পাত্র!

– তিয়াস মুচকি হেসে বললো,’ তুমি ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিয়ো। আর হ্যাঁ দূরে থাকতে পারি কিন্তু আমার হৃদয়ে সবসময় তুমিই থাকবে।
– অধরা তিয়াসকে আর কিছু বললো না।

– শুধু আসি বলে যখন ভেতরে ঢুকতে যাবে এমন সময়, ‘ রাজ অধরার হাতটি ধরে ফেললো!

– অধরা এবার আর সহ্য করতে পারলো না। ঠাস করে রাজের গালে চড় বসিয়ে দিলো।

– আর লোকজন ডেকে বললো,’ এই আপনারা দেখছেন না এই লুফারটা কিভাবে বিরক্ত করছে আমাকে? আর আপনারা কেন আছেন এখানে?
– এয়ার্রপোট পুলিশকে লক্ষ্য করে!

– পুলিশ এসে রাজকে ধরে ফেলে!

– রাজ অসহায় দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে অধরার দিকে। অধরা আর কিছু না বলে ভেতরে চলে গেলো। বিমানে বসে আছে অধরা। চোখের পানি কোন বাঁধা মানছে না।

– পাশ থেকে ইশু বললো,’ আপু শুনেছিস রাজ ভাইয়া নাকি ছাঁদ থেকে লাফ দিয়েছে। মনে হয় বাঁচবে না।

– চলবে””””’