অবশেষে তুমি আমার পর্বঃ৩৪

0
3159

অবশেষে_তুমি_আমার
পর্বঃ৩৪
তাসনিম_রাইসা

– এই সিকিউরিটি ভবিষৎতে যেন এরা বাসায় আসতে না পারে। বের করে দাও।

– রাজ আর আনিশাকে জোর করে বাসা থেকে বের করে দিলো। রাজ কাঁদছে। চোখের পানি টপটপ করে পড়ছে। এমন সম রাজের ফোনে একটা ম্যাসেজ আসলো। মেসেজটা দেখেই ফেসবুকের মেসেঞ্জারে একটা ভিডিও দেখে চমকে গেল। তাহলে তাকে আর অধরাকে আলাদা করার গেমটা তিয়াস খেলেনি! ভিডিওতে স্পর্ষ্ট দেখা যাচ্ছে ত্রিযামিনীর আর তুর্যয় দুজনে একটা রুমে বসে কথা বলছে।

-তুর্যয় থ্যাংকস আমাকে এতবড় হেল্প করার জন্য! তুমি না থাকলে পেত্নিটা আমার রাজকে তার করে নিতো। অবশেষে রাজকে অধরার কাছ থেকে আলাদা করতে পেয়েছি। আর সবটা হয়েছে শুধু তোমার জন্য। এখন রাজ তো লন্ডনে। অধরা যদি সব মেনে নেয়?

– আরে রাজ আমাদের ফাঁদে পড়ে যে অত্যাচার করেছে। অধরা কেন কোন মেয়েই রাজকে চাইবে না অধরার জায়গা থেকে। দেখো রাজ লন্ডন থেকে একাই ফিরবে।

-তোমার কথায় যেন সত্যি হয়। বড্ডবেশি ভালোবাসি রাজকে। তাকে ছাড়া যে আমি বাঁচবো না। যে কোন মূল্যে রাজকে আমার চায়। এজন্য যদি অধরাকে দুনিয়া থেকে সরাতে হয় তবুও আমি প্রস্তুত। বাসায় থাকতে মারার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। মেয়েটার ভাগ্য সবসময় তার সহায় ছিল। আরেকটা কথা আমার সৎবোনকে নিয়ে গেম খেলানোর জন্য তোমার একাউন্টে টাকা অলরেডি চলে গেছে। তুমি এতটা নিপুণভাবে কাজটা করতে পারবে ভাবতেও পারিনি। আচ্ছা জান্নাতকে কিভাবে কনভেন্স করলে তুমি?

– আরে শালীর পিছনে অনেকদিন ঘুরতে হয়েছে। তারপর প্রেম। দামি গিফট। পরে কয়েকবার ডেট। বাট তোমার বোনটাকে চালাক ভেবেছিলাম। কিন্তু না সে যতটা স্মার্ট তার চেয়ে বেশি হচ্ছে সে বোকা।

– তাই বুঝি?
– হ্যা। নয়তো কেউ বেবি নেয়?

-তোমার সৎবোনটা কিন্তু জোশ!
– হিহি। বাদ দাও। কি খাবে বলো?
– জান্নাত জানালার ওপাশ থেকে মুখ চেপে কান্না করছে। এতদিন যাকে বোন ভেবেছিল সে তার বোন নয়। যাকে মা বলে ডেকেছিল সে তার মা নয়। সৎ মা। তাকে যে আদর যত্ন করেছে। সব তার সম্পদের জন্য। জান্নাতের বুক ফেঁটে কান্না আসছে। আপন বলতে তার পৃথিবীতে কেউ রইল না। নিজের রক্তের বোন হয়ে কিভাবে পারলো এমন করতে। জান্নাত মোবাইলে ভিডিও করছে এসব।

-ভিডিওটা দেখা রাজের খুব খারাপ লাগছে। যাকে নিজের বোনের মতো বড় করেছে। যাকে মায়ের পর মা হিসেবে মেনে এসেছে। সে মানুষগুলো তাকে স্বার্থছাড়া ভালোবাসেনি। তার কলিজার টুকরাকে তার থেকে আলাদা করে ফেলেছে। রাজ ভাবলো ভিডিওটা অধরাকে দেখিয়ে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইবে।

– এদিকে রাজ বাসা থেকে চলে গেলে অধরা নিজের রুমটা বদ্ধ করে দিয়ে রাজের দেওয়া ছোট্ট বেলার পুতুলটা বুকে নিয়ে কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে। রাজ কেন করলে তুমি এমন? আমি তো তোমাকে ভালোই বাসতাম। যার বিনিময়ে তুমি কষ্ট ছাড়া কিছুই পেলাম না। জানো রাজ আমি আমার সন্তানকে তোমার পরিচয়ে নয় আমার পরিচয়ে বড় করবো। এই তুমি পুতুলটার মতো হলেও ভালো হতো। আচ্ছা রাজ বলো তো পৃথিবীর কোন মেয়ে তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে পারবে? আর তুমি হোটেল রুমে আনিশার সাথে। আমি এগুলো কিভাবে ভুলে যায়? না পারছি তোমাকে বুকে জড়িয়ে নিতে না পারছি দূরে সরিয়ে দিতে। জানো কলিজার টুকরা অধরার দেহে যতক্ষণ পর্যন্ত নিঃশ্বাস চলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার হৃদয়ে রাজ নামটাই থাকবে। চেষ্টা করলেও এখানে কাউকে নতুন করে বসানো যাবে না।

– ইশু বাহির থেকে দরজায় নক করছে। কারণ অধরা সকালে হালকা কিছু খেয়েছে। এখনো কিছু খায়নি। তিয়াস বাহিরে অধরার জন্য অপেক্ষা করছে। ইশু কয়েকবার নক করার পর অধরা চোখ মুছে দরজা খুললো।

– ইশু অধরার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। কারণ অধরার চোখ দুটি লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এই মাত্র কান্না করে বের হলো।

– কি হয়েছে এভাবে দরজায় নক করছিস কেন?
– আপু সারাদিন কিছু খাওনি! তুমি কি খাবে না?

– না তোরা খেয়ে নে।

– আপু প্লিজ মন খারাপ করো না। তুমি না খেলে যে বেবির ক্ষতি হবে। তোমার জন্য না হোক তোমার ভবিষৎত প্রজন্মের কথা চিন্তা করে হলেও খেয়ে নাও প্লিজ আপু। তিয়াস ভাইয়া অপেক্ষা করছে। আমি তাকে আমাদের সাথে খাবারের অফার করছি।

– ওহ্ আচ্ছা ঠিক আছে।

– আপু একটা কথা বলি? যদি রাগ না করো!

– আরে আমার কি পাঁচটা-দশটা বোন যে রাগ করবো? বল কি বলবি?
– আপু তুমি কি সত্যি তিয়াস ভাইয়াকে বিয়ে করবে? আর তিয়াস ভাইয়া তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তোমার গর্ভের সন্তানকেও সে মেনে নিবে।

– হ্যাঁ ইশু আমি ও যে বড্ডবেশি ভালোবাসি। তবে তিয়াসকে নয় রাজকে।

– রাজকে ভালোবাসো তাহলে ওভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে কেন?
– ভালোবাসলেই এক জীবনে সবাইকে আপন করে পাওয়া হয় না। রাজকে এখন মেনে নিলে সেটা করুণা করা হবে। এছাড়া যে মানুষটা আমারি সামনে আরেকটা মেয়েকে নিয়ে রাত্রিযাপন করে। শুধু আনিশা না ত্রিযামিনীর সাথেও তার দৈহিক সম্পর্ক ছিল।আমি নিজে ভিডিও দেখেছি। ভেবেছিলাম কেউ ষড়যন্ত্র করে ভিডিও বানিয়েছে। কিন্তু আমাদের সাইবার স্পেশালিস্ট দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি সেটা সত্যিই রাজ ছিল। তাই বল আমি কিভাবে রাজকে কাছে টেনে নেয়? জানিস রাজকে কষ্ট দিতে আমারো খুব কষ্ট হয়। ও যখন ওভাবে কথা বলে তখন মন চায় ওকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কান্না করি। কিন্তু ওর আর আনিশার ওসব কথা মনে পড়লে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। বুক ফেটে কান্না আসে। তাই শত কষ্ট হলেও ওর দেওয়া সন্তানটাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকবো। আর ওকে বিশ্বাস করতে পারবো না। ওর একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কতটা কষ্টট করেছি। কত রাত জায়নামাযে বসে কাটিয়ে দিয়েছি । জায়নামাযে বসে গরম চায়ে নিজের শরীর ঝলসে ফেলেছি। তবুও ওকে ছেড়ে আসিনি। সারাদিন কষ্ট করেও রাতে তার বুকে গেলে সব ভুলে যেতাম।

-আপু প্লিজ এভাবে আর বলো না। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। তুমি এতটা কষ্ট বুকে নিয়ে কিভাবে বেঁচে আছো? তুমি রাজকে কোনদিন ক্ষমা করবে না। চরিত্রহীন মানুষকে কখনো ক্ষমা করা যায় না।
এখন চলো, খাবে।

– আচ্ছা চল।
– অধরা ফ্রেশ হয়ে তিয়াসকে নিয়ে খেতে বসল। খেতে খেতে তিয়াস বললো, ‘লন্ডন তো তোমার শহর অধরা। এখানের পথঘাট আমি ভালো করে চিনি না। তুমি যদি আমাকে তোমার শহরটা ভালো করে দেখাতে।

– আচ্ছা কাল সকালে রেডি থেকো। কালকের দিনটা তোমার জন্য। লন্ডনের সব দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে যেগুলো উল্লেখযোগ্য সেগুলো তোমাকে দেখাবো। এখন খাও।

– খাওয়া শেষ করে তিয়াস তার বাসায় চলে গেল। তার বাসা বললে ভুল হবে অধরায় বাসা।

পরের দিন অধরা তিয়াসকে সারাদিন ঘুরিয়ে যখন পার্কের বেঞ্চে দু’জনে বসে আছে। তখন রাজ অধরার বাসায় যাচ্ছিল। অধরা আর তিয়াসকে দেখে চমকে গেল সে।

– রাজ মনে মনে স্থির করলো ভিডিওটা সে অধরাকে দেখাবে।

– যখনি সে পার্কে ঢুকবে এমন সময় তিয়াসকে দেখলো অধরার সামনে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে হাটুগেড়ে বলতে, ‘ তুমি কি আমার রাজকুমারী হবে?’

– রাজ আর এটা দেখে সহ্য করতে পারলো না। দৌড়ে গিয়ে তিয়াসের গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বললো,’ অন্যের স্ত্রীকে প্রপোজ করতে লজ্জা করে না। কথাটা শেষ করার আগেই অধরা রাজের গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে,’ আপনার সাহস তো কম না আপনি জানেন আপনি কার গায়ে হাত তুলেছেন? সে কে আমার জানেন? আমার ফিউচার হাসবেন্ড। কাল পর্যন্তও আপনাকে ভালোবেসে ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম না আপনি সে ভালোবাসার যোগ্য নয়। এই বলে তার ফোনটা রাজের দিকে এগিয়ে দিল। রাজ ভিডিওটি দেখে চমকে গেল।

চলবে”””””