অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife) পার্ট০৩+৪

0
1780

#অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife)
#পার্ট০৩+৪
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
.
.
-এম্নেই তো মেয়ে রুপের দেমাকে বাচে না।এমন ভাবখানা দেখায় যেন বিয়ে করে আমার ছেলের উপর মেহেরবানি করছে। আর এখন তো লাখ টাকার চাকরি পেয়েছে।আল্লাহ জানে আরো কত কি দেখতে হবে।
এসব আবত তাবল বকতে বকতে মা গিয়ে ঘরে ঢুকলেন।মা আর ছোট খালা গিয়েছিলেন বৃষ্টির বাড়িতে হলুদ নিয়ে।সেখান থেকে ফিরেই মা চেচামেচি শুরু করে দিয়েছেন। বৃষ্টিকে ফোন দিতেই ওপাশ থেকে বলে উঠল
-একটু পর ফোন কর না প্লিজ আমি মেহেদী পরছি।
-বৃষ্টি…মা..তোমাদের বাসায়…
-আন্টি আমাকে হলুদ লাগানোর পর সময় বাসায় একটা লেটার আসে।তোমার মনে আছে আমি আমেরিকার একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে জব এপ্লাই করেছিলাম।ওরা আমাকে কনফার্মেশন লেটার পাঠিয়েছে সাথে এপয়েন্টমেন্ট লেটারও।আমার ই মেইল আইডি অফ থাকার কারনে ওরা চিঠি পোস্ট করে পাঠিয়েছে।
-কবে থেকে জয়েন করতে বলেছে?
-এই তো পরশু থেকে।
-বৃষ্টি…..তুমি কি…জবটা???আই মিন পরশু তো আমাদের বিয়ে… তো….
-হ্যা পরশু বিয়ে তো?
-তুমি কি পরশু জব জয়েন করছ?
ওপাশ থেকে বৃষ্টি খিলখিল করে হেসে উঠল।অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল
-এই কথাটা শুনার জন্যে তুমি এতক্ষন থেকে তোতলাচ্ছ?মেঘ তুমি পারও বটে।বিয়ের আসর থেকে কেউ চলে যায়??বলেই আবার হাসতে লাগল
-বাট বৃষ্টি এটা তোমার ক্যারিয়ারের ব্যাপার।
-মেঘ রিলাক্স।কেন এত হাইপার হচ্ছ?এই জবটা আমি নিজের যোগ্যতায় পেয়েছি।সো যতদিন যোগ্যতা আছে ততদিন আমি এরকম হাজারো জব ইজিলি পেয়ে যাব।বাট তোমাকে হাতছাড়া করে জবের পিছনে ছুটলে আমি বুড়ি হয়ে যাব।তখন আমাকে সারাজীবন সালমান খানের মত আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে।
বলেই আবার হাসতে লাগল।
আমি কাপা কাপা কন্ঠে আবার জিজ্ঞেস করলাম
-বৃষ্টি তুমি কি জব জয়েন..
-আরে বাবা কতবার বলব করব না করব না করব না। এই তুমি বার বার প্রশ্ন করলে কিন্তু আমি মত পাল্টে দিব।
বৃষ্টির কথা শুনে বেশ স্বস্তি পেলাম।মনে হল যেন বড় একটা পাথর নেমে গেল বুক থেকে।
-তোমাকে মত পাল্টাতে হবে না।তুমি মেহেদীর ডিজাইন পাল্টাও?
-মানে?
কুট করে ফোনটা কেটে দিলাম।
.
দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই ঠোটের কোনে হালকা হাসি ফুটে উঠল।সত্যি সময় মানুষকে পাল্টে দেয়।যে মেয়েটা আমার জন্যে লাখ টাকার চাকরি,একটা ওয়েল সেটেল ক্যারিয়ার হাসি মুখে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল আজকে সেই মেয়েটার জন্যে সামান্য একটা গিফট কিনতেও আমার ভ্রু কুচকে যাচ্ছে।একাউন্ট ব্যালেন্স চেক করে দেখলাম আড়াই লাখ টাকা পড়ে আছে।মান্থ স্যালারি এখনো তুলা হয় নি।গার্লফ্রেন্ড হলে হয়তো কিনার সময় দুইবার ভাবতাম না কিন্তু সে তো আমার অর্ধাঙ্গিনী।হাজারটা অবহেলা সত্ত্বেও সে আমাকে ছেড়ে যাবে না। ফিরে গিয়ে সেই পেন্ডেন্টটা কিনে নিলাম।
.
.
বাড়ি ফিরে দেখি বৃষ্টি মায়ের মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছে। তারপর চুল আচড়ে সুন্দর করে বেনী করে দিল।দু জনেই গল্প করছে আর খিলখিল করে৷ হাসছে।আমার মনে হচ্ছে আমি বঊ শ্বাশুড়িকে নয় দুই বান্ধবীকে দেখছি।ওরা আপন মনে গল্প করে যাচ্ছে।আশেপাশের কোন খেয়াল নেই তাদের।আমি হালকা গলা ঝেড়ে ওদের পাশে গিয়ে বসলাম।
-কি ব্যাপার মা মেয়ে ছেলের বউকে পেয়ে ছেলেকে ভুলে গেলে?
মা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন
-খবরদার বৃষ্টিকে ছেলের বঊ বলবি না। ও আমার আরেকটা মেয়ে।
বলেই বৃষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।আমি মার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলাম।
-এই মেঘ। এটা কি রে?
-খুলে দেখ না মা।
মা ব্যাগটা খুলে শাড়িটা বের করলেন।খুশিতে তার চোখদুটো চকচক করে উঠল।কারন বাবা প্রায়ই মাকে এই রঙের শাড়ি কিনে দিতেন।
-মা তোমাকে কি চোখের পানি মোছার জন্যে এই শাড়িটা কিনে দিয়েছে তোমার ছেলে?চোখের পানি মুছ।
বৃষ্টির কথায় মা হালকা হেসে শাড়িটা নিয়ে রুমে চলে গেলেন।আমি জানি মা এখন আমাদের ফ্যামিলি এলবাম বের করে ছবি দেখবেন।
আমি বৃষ্টিকে লাঞ্চ রেডি করতে বলে ঘরে চলে এলাম।…..
চলবে

#অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife)
#পার্ট০৪
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
.
.
বৃষ্টি রুমে ঢুকতেই পেছন থেকে ওর চোখ দুটো চেপে ধরলাম।গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে নিয়ে ওকে বিছানায় বসিয়ে শাড়ি আর পেন্ডেন্টটা ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম।বৃষ্টি শাড়িটাতে একবার হাত বুলিয়ে বিছনার এক কোনায় রেখে উঠে চলে গেল।আমি গিয়ে ওর কাধে হাত রাখতেই আমার বুকে ঝাপিয়ে ছোট বাচ্চাদের মত কাদতে লাগল।আমিও দুহাতে ওকে বাহুবন্দি করে নিলাম।খুব জোরে আকড়ে ধরেছে আমাকে ও।ওকে থামানোর কোন ব্যস্ততা আমার নেই।কাদুক না একটু।অভিমান আর কষ্টগুলো যদি চোখের পানি হয়ে ঝরে যায় যাক না।
-মেঘ আমার শাড়ি গহনা কিচ্ছু চাই না। আমার তোমাকে চাই। তোমার সময় চাই।এই শাড়ি গহনা দিয়ে ঘন্টা দুয়েকের জন্যে হয়তো আমার ঠোটে হাসি ফুটবে।কিন্তু খরচ করা টাকাটা ফিরিয়ে আনার জন্যে তুমি আবার আমাকে ভুলে কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে যেটা আমাকে প্রতিটা মুহুর্তে কুড়ে কুড়ে খাবে। আমার চাই না এসব মেঘ।
আমি দুহাতে বৃষ্টির গাল ধরে ওরে কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলাম।
-আমার সবটা সময় তোমার। আমার সব কিছুতে সবচেয়ে বেশি তোমার অধিকার।এখন কান্না বন্ধ করে শাড়িটা পরে এসো।গত সপ্তাহে নতুন শার্টটা কিনলাম আর আজ তুমি কেদে দাগ বসিয়ে দিলে।এখন আবার খাটুনি খাটতে হবে নতুন শার্ট কিনার জন্যে।।।
-মেঘ….
নিছক চেচিয়ে বৃষ্টি আমার বুকে হাল্কা ঘুষি মারতে লাগল।খুশিতে চকচক করছে ওর চোখ দুটো।আমি চাই না ওর খুশিটা ওর কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিক। ওর উপর কোন আচ আমি আসতে দিব না।
-এখন যাও শাড়িটা পরে এসো। আমরা আজকে বাইরে ডিনারে যাব।
.
.

নিমিষেই বৃষ্টির মুখটা কালো হয়ে গেল।
-কি হল?যাবে না আমার সাথে?
-মেঘ মা?উনি তো বাসায় একা থাকবেন।উনার মেডিসিন….?উনাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
-বৃষ্টি তুমি মায়ের চিন্তা করো না।আমি রামিসা খালাকে বলে দিছি উনি রাতে এসে মাকে খাইয়ে উনাকে মেডিসিন খাইয়ে দিবে। এবার হ্যাপি?
আমার উত্তর শুনে বৃষ্টি খুশি মনে চেঞ্জ করতে চলে গেল।
.
.
আমার এইচ এস সি পরীক্ষার সময় বাবা মারা যান।তার পর থেকেই অনেক কষ্ট করে মা আমাকে পড়াশুনা করিয়েছেন।আমার সব আল্লাদ সব ইচ্ছা পূরন করেছেন।বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা খুব খিটখিটে হয়ে যান। তার মনের মধ্যে এই ভয়টা ঢুকে যায় যে হয়তো আমাকে বিয়ে দিলে আমার অর্ধাঙ্গিনী আমাকে তার কাছ থেকে সরিয়ে দিবে।আমাদের মা ছেলের সম্পর্কে ফাটল ধরবে।কিন্তু বিয়ে না দিয়েও তো উপায় নেই।তাই মা ঠিক করেন আমার খালাতো বোন আফরার সাথে আমার বিয়ে দিবেন। নিজেদের মধ্যে বিয়ে দিলে আমাকে হারানোর ভয় থাকবে না। আমার স্ত্রী চাইলেও আমাকে মায়ের কাছ থেকে দুরে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই বৃষ্টির সাথে আমার বিয়ের সময় মা ঘোর বিরোধিতা করেন।
শুধু আমার জেদের জন্যেই বৃষ্টির সাথে আমার বিয়ে দিতে বাধ্য হন মা।বিয়ের পর থেকে বৃষ্টির সাথে মায়ের কিটকট লেগেই থাকতো।প্রথম প্রথম বিষয়টা উপভোগ করলেও দিনদিন অসহ্য হয়ে৷ উঠল।আমার কেন জানি মনে হতে লাগল মা যা বলেন সব ঠিক। বৃষ্টি হয়তো আর বাকিদের মতো মায়ের সাথে খারাপ বিহেব করছে।
.
.
একদিন অফিস থেকে মাত্র বাসায় ফিরেছি।মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি মা তসবি গুনছেন আর নিশব্দে কাদছেন।মায়ের চোখের পানি দেখে আমার বুকটা কেপে উঠল।
-মা কি হয়েছে তুমি কাদছ কেন?
-বাবা রে আমার হাজারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তুই বৃষ্টিকে আমার বাসায় বউ করে আনলি৷ ওর জায়গায় আজ আফরা থাকলে হয়তো আজ এমনটা করত না।
.

মায়ের কথা শুনে মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে গেল।তাহলে কি সত্যি বৃষ্টি……?
-মা কি হয়েছে বলবে আমায়?
-সকালে বৃষ্টিকে বলেছিলাম সরিষা বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করতে।তোর বাবার খুব পছন্দের ছিল।উনার খুব ইচ্ছে ছিল তোর যখন বিয়ে হবে ছেলের বঊয়ের হাতে সরিষা ইলিশ খাবেন।দুপুরে রান্নাঘরে পানি আনতে গিয়ে দেখি রামিসা রান্না করছে আর বৃষ্টি ঘরে বসে আছে পানিতে হাত ডুবিয়ে।….
চলবে