অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife) পার্ট০৭+৮

0
1316

#অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife)
#পার্ট০৭+৮
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
.
.
এত কিছুর পরেও মেয়েটাকে ভুলে গেলি?
.
.
.

মেলবর্নের Black Pearl বারে বসে মদ গিলছে মেঘ।ককটেল এর জন্যে বিখ্যাত এই বারে প্রায়ই আনাগোনা চলে তার।অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ বার গুলোর একটি হল এই ব্লাক পার্ল।বারের এককোনায় বসে একের পর এক পেগ গিলে চলছে সে।চোখ দুটো লাল বর্ন ধারন করে আছে।নেশায় চুরমার সে তবুও মদ খাচ্ছে।হঠাত করে রেওয়াজের গলা শুনে এক চুমুকে পেগটা শেষ করে তার দিকে চোখ তুলে তাকালো।
-মানে?
কোন রকমে টলতে টলতে বলল সে।
মেঘের সামনের টেবিলে ডায়রীটা রাখল রেওয়াজ।লাল কভারে মোড়ানো ডায়রীটা দেখে নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেও চিনতে অসুবিধা হয় নি তার।চিলের মত ছো মেরে মুহুর্তেই ডায়রীটা কেড়ে নিল সে।
মেঘের কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে বেশ বিরক্তির সুরে রেওয়াজ জিজ্ঞেস করল
-মেঘ কিছু বলছি তোকে?কিভাবে পারলি ওকে ভুলে যেতে?
-কার কথা বলছিস?
-মেঘ তুই ভালো করেই জানিস আমি কার কথা বলছি।I’m taking about Brishty.
.
.
উইস্কির গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরল মেঘ।নিজের রাগকে কন্ট্রোল করে বলল
-আমি ওর ব্যাপারে কথা বলতে চাই না।She is my past.
শেষ পেগটুকু গলায় ঢেলে উঠে চলে যাচ্ছিল মেঘ। ওর কাধে ভর দিয়ে থামাল রেওয়াজ।
-She is not your past.She is your wife.
ওয়াইফ কথাটা শুনেই মেঘের মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল।রেওয়াজের কলার চেপে চেচিয়ে উঠল
-She is not my wife damn it.সে এখন অন্য কারো অর্ধাঙ্গিনী।
বলেই রেওয়াজকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল মেঘ।রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে তার।কোন রকমে গাড়িতে বসে ফুল স্পীডে চালিয়ে বাসায় আসল সে।মাঝ রাতের কারনে রাস্তায় তেমন কোন গাড়ি নেই।
.
.
বাসায় ঢুকেই স্টোর রুমে চলে গেল সে।লাইট জ্বালিয়ে পাগলের মত কিছু খুজতে লাগল।এদিক ওদিক খুজে একটা বড় লাগেজ খুজে পেল সে।লাগেজ খুলে একটা ছবি হাতে নিল সে। বৃষ্টির আর তার বিয়ের ছবি।বিয়ের দিন সবাই যখন খাওয়া আর সেল্ফি তোলা নিয়ে ব্যস্ত সেই ফাকে টুপ করে একটা চুমু বসিয়ে দিয়েছিল বৃষ্টি মেঘের গালে।তাদের অজান্তেই মুহুর্তটা ক্যামেরা বন্দি করেছিল বৃষ্টির এক বান্ধবী।বিয়ের সময় বেশিরভাগ নতুন বউকে লজ্জা পেতে দেখা যায়।কিন্তু বৃষ্টি কিস করার পর থেকেই মেঘের গাল দুটো টমেটোর মত লাল হয়ে থাকে।সেই নিয়ে বৃষ্টির ফ্রেন্ডরা বেশ খানিকক্ষন হাসাহাসি করেছিল।
.
.
স্মৃতিগুলো মনে করেই অজান্তে হেসে ওঠে মেঘ। ছবিটা বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেদে যাচ্ছে সে।
-কেন ছেড়ে গেলে বৃষ্টি কেন?কি কমতি ছিল আমার ভালোবাসায়?কেন এমনটা করলে তুমি?টাকা আর স্ট্যাটাস কি এত বড় হয়ে গেল তোমার কাছে?আমার ভালোবাসা তোমার চোখে পড়ল না? কেন বৃষ্টি কেন?
রাগে জোড়ে ছবিটা আছাড় মাড়ল মাটিতে মেঘ।সাথে সাথে ফ্রেমে থাকা কাচ ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।
-এইগুলো শুধু কাচের টুকরো না বৃষ্টি এইগুলো আমাদের সম্পর্ক। এই কাচের টুকরো গুলো যেমন জোড়া লাগানো যাবে না আমাদের সম্পর্কটাও আর কোনদিন জোড়া লাগবে না। আই হেট ইউ বৃষ্টি আই হেট ইউ।
রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে আসল মেঘ।দু একটা কাচের টুকরো পায়ে ঢুকে রক্ত ঝরছে টপটপ করে।টলতে টলতে কোন রকমে বেডরুমে এসে পৌছাল মেঘ।নেশা মাথায় চড়ে গেছে তার। এতক্ষন অনেক কষ্টে নিজেকে ধরে রেখেছে সে।বুকের মধ্যে তীব্র ব্যাথা হচ্ছে তার।বিছানায় মুখ থুবড়ে ঢলে পড়ল সে।ব্যাথাগুলো চোখের পানির সাথে মিলিয়ে ধুয়ে যাচ্ছে।ঠোট শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করছে।
-বৃষ্টি…….।
.
.
রাত পেরিয়ে ভোরের আলো চারদিকে ফুটে উঠছে।পাখিরা উড়ে চলছে নিজ ঠিকানায়।সোনালী আভা চোখে পড়তেই চোখ কুচকে নিল মেঘ।কাল রাতে বেশ করে মদ গিলেছে সে।মাথা ভার হয়ে আছে তার।উঠতে গিয়ে পায়ের ব্যাথায় কেকিয়ে উঠল।মাথায় হাত দিয়ে উঠে বসতেই পাশে জ্যাকসন আঙকেল লেবু পানি হাতে দাড়িয়ে আছেন। জ্যাকসন আঙ্কেলকে দেখে মেঘ বলে উঠল
-মাথাটা খুব ধরেছে আঙ্কেল।কাল্কে রাতে হয়তো একটু…
-হয়তো একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল আর হবে না।
মেঘ বাবা গত ৫ বছর থেকে এই এক কথাই শুনে আসছি।কাল রাতে তো পা টাকেও ছাড়েন নি।কি অবস্থা করেছেন নিজের।
মেঘ হালকা হেসে উঠে গিয়ে লেবু পানিটা খেয়ে নিল। এখন অনেকটা ভাল লাগছে তার।
-মেঘ বাবা রেওয়াজ বাবা এসেছেন। নিচে বসে আছে।
-চাচা আপনি যান আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।……..
চলবে
#অর্ধাঙ্গিনী(An Ideal Wife)
#পার্ট০৮
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
.
.
ফ্রেশ হয়ে কফির মগ হাতে নিয়ে নিচে নামল মেঘ।রেওয়াজ সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ছে।মেঘ গিয়ে রেওয়াজের সামানে মুখোমুখি হয়ে বসল। রেওয়াজ তখনো একমনে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে।মেঘ বেশ উসখুস করছে। বেশ খানিকক্ষন দিধাদ্বন্দে কাটানোর পর মেঘ মুখ খুলল
-রেওয়াজ আসলে….তুই…
-গেস্টরুম পরিষ্কার করার সময় সার্ভেন্টরা ডায়েরিটা খুজে পায়।আমি জানি মেঘ কারো পারমিশন ছাড়া তার ডায়েরি পড়া খারাপ বাট তোর আর আমার সম্পর্কে হয়তো এইটা ভুল কিছু না বলে আমি মনে করি।
.
কথাগুলো বলে মেগ্যাজিনটা বন্ধ করে সামনের টি টেবিলে রাখল রেওয়াজ।মেঘ অনেকটা অবাক হয়ে দেখছে রেওয়াজকে।এই কথাটাই সে এতক্ষন থেকে বলার চেস্টা করছিল। কিন্তু কিভাবে কি শুরু করবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিল না।রেওয়াজের বাসা থেকে আসার সময় ডায়রিটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে।নিজের উপর রাগ উঠছে তার।সেদিন ডায়রিটা রেখে না আসলে আজকে এই ঝামেলা পোহাতে হতো না।
.
-বৃষ্টি কোথায় মেঘ?
রেওয়াজের কথা শুনে থমকে গেল মেঘ। মনে মনে এমন কিছুরই আশঙ্কা করছিল সে।বৃষ্টির ব্যাপারে কোন কথাই সে তুলতে অনিচ্ছুক।চাচ্ছে না সে তার অতীতকে মনে করতে।প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে বলে উঠল
-তুই বস।আমি জ্যাক আংকেলকে বলছি ব্রেকফাস্ট রেডি করার জন্যে।
কথাটা বলেই উঠে চলে যাচ্ছিল মেঘ।পেছন থেকে রেওয়াজের গলা শুনতে পেল।
-আমি ব্রেকফাস্ট করার জন্যে আসিনি মেঘ।আমি তোর আর বৃষ্টির ব্যাপারে জানতে চাই।
মেঘ রেওয়াজের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল
-বৃষ্টির আর আমার ব্যাপারে কথা বলার কিছুই নাই রেওয়াজ। তুই অযথা কথা বাড়াচ্ছিস।
রেওয়াজ এবার একটু নড়েচড়ে বসে বলল
.
.
-মেঘ তুই আমার ছোট বেলার বন্ধু।সেই ছোট্ট বেলা থেকে আমরা একসাথে বড় হয়েছি।আমাদের দুজনের শৈশব একসাথেই কেটেছে।তোর আর আমার মধ্যে সিক্রেট বলতে তো কোনদিন ও কিছু ছিল না।কলেজ পাশ করে আমি হায়ার স্টাডিজের জন্যে ইউএসএ চলে যাই।আংকেল মারা যাওয়ায় তুই ফ্যামিলির হাল ধরতে দেশেই থেকে গেলি। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে বৃষ্টিকে বিয়ে করলি।আমি ভিসা ইস্যুর জন্যে তোর বিয়েতে এটেন্ড করতে পারিনি।কিন্তু বিয়ের পর তুই পুরোটাই পাল্টে গেলি মেঘ।সারাদিন ব্যস্ত তুই৷ কল রিসিভ করতি না। সোশ্যাল মিডিয়া কি জিনিস সেটা তো ভুলেই গেছলি প্রায়৷হুট করে একদিন ফোন করে বললি অস্ট্রেলিয়ায় আসবি।তোর জন্যে আমার দরজা সব সময় খোলা ছিল।এখানে৷ এসে আমার কোম্পানিতে জয়েন করলি।নিজের পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে নিজের কোম্পানি দাড় করালি। ঢাকায় সামান্য ৫০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা মেঘ আজ মিলিয়ন ডলারের মালিক।
.
.
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে হাপাতে লাগল রেওয়াজ।চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে৷ আছে।মেঘ কফির মগটা রেখে আবার সোফায় বসে পড়ল।শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল
-আমার বর্তমান নিয়ে কেন ঘাটছিস রেওয়াজ?
-কারন তোর এই বর্তমানের পিছনে একটা ভয়ঙ্কর অতীত লুকিয়ে আছে।যেই অতীতটা তোকে গত পাচ বছর ধরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।মেঘ তুই গত কয়েকট বছরে অমানুষিক পরিশ্রম করে আজকের পজিশনে এসেছিস।এখন সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌছে তুই তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিস।রাতদিন মদের নেশায় ডুবে থাকিস তুই।মেলবর্নের প্রতিটা বারে তোর আনাগোনা চলে।এতদিন আমি চুপ করেছিলাম।বাট তোকে এই অবস্থায় দেখে আমি আর চুপ থাকতে পারছি না।
.
.
মেঘ মাথা নিচু করে চুপচাপ রেওয়াজের কথাগুলো হজম করছে।মেঘকে চুপ থাকতে দেখে রেওয়াজ আবার বলে উঠল
-Come on মেঘ। তুই আমার বন্ধুর চেয়েও বেশি। You are like a brother to me. তুই এইটুকু আমার সাথে শেয়ার করতে পারিস৷ ট্রাস্ট মি।
মেঘ চোখ তুলে রেওয়াজের দিকে তাকালো।রেওয়াজ হালকা করে মাথা নাড়ালো।মেঘ বলে উঠল
-কালকে বৃষ্টি আর আমার ম্যারেজ এনিভার্সেরি ছিল।……..
চলবে