আজও তোমারই অপেক্ষায় পর্ব-০৯

0
120

#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
৯.

রাদিফ এসেছে ঘণ্টা খানেক হয়েছে। আশা ভাইপোয়ের হঠাৎ আগমনে বেজায় খুশি। সাধারণত রাদিফকে শত বলেও ঢাকায় আনতে পারে না সে। আজ মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো রাদিফের আগমন ঘটে। আশা ভাইপোয়ের জন্য এটা সেটা রান্না করতে ব্যস্ত। হিমাও রাদিফকে দেখে খুশি হয়েছে। সে রাদিফকে দেখে হাসিমুখে বলেছিল,“ তুমি না বলে চলে আসলে, রাদিফ ভাই?”
রাদিফ তখন মাথা চুলকে উত্তর দেয়,“ তুইই তো দুই শুক্রবারে আসতে বলেছিলি, ভুলে গেছিস?”
হিমা কখন কি বলে নিজেও জানে না। সে প্রফুল্ল মনে বাড়ি ভর্তি মানুষ দেখে রাত নয়টায় মুভি দেখার আয়োজন করে। গেস্ট রুমেই মুভি দেখার জন্য একপাশে বসার জায়গা করে দিয়েছে হিমা। চিপস, পপকন নিয়ে ফিটফাট হয়ে বসেও পড়েছে সে। আপাতত তার ধ্যান তনু মন মুভি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। রাদিফ এসে সরাসরি হিমার পাশে বসে ফোন চালাতে শুরু করে।

মীর মাত্রই রুমে প্রবেশ করে। হিমার পাশে রাদিফকে দেখতে পেয়ে বলে, “ তুই কবে থেকে মেয়েদের মাঝে বসতে শুরু করেছিস, রাদিফ। শা’লা এদিকে এসে বোস!”

রাদিফ কাচুমাচু হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। সে যে হিমার সামনে বেশ লজ্জা পেয়েছে বুঝাই যাচ্ছে। রাদিফ লাজুক মুখে উঠে আসতে নিলেই হিমা বাঁধা দেয়। সে মীরের উদ্দেশ্যে বলে,” ভাই, বোনের সাথে বসলে সমস্যা কী! তুমিও পাশে এসে বসো মীর ভাই! এখানে অনেক জায়গা আছে।”

হিমার আহ্বান মীর অবজ্ঞা করার প্রশ্নই আসে না। সে তড়িৎ গতিতে হিমার পাশে গিয়ে বসে, একদম ঘেঁষে। হিমা তা দেখে একটু নড়েচড়ে বসে! মুভি শুরু হয়ে গিয়েছে। সালমান খানের বডিগার্ড সিনেমা চলছে। হিমা খুব আগ্রহে মুভি দেখছে। তার পাশেবসা মানুষ যে তাকে একমনে দেখে যাচ্ছে সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। রাদিফ বসেছিল হিমা থেকে কিছুটা সামনে। সে সকলের এতো সুন্দর মুহূর্তটা স্মৃতি হিসেবে রাখতে ক্যামেরাবন্দী করার জন্য উদ্যোগ নিলে হিমার দিকে মীরের তাকিয়ে থাকা নজরে আসে। সেই অবস্থাতেই রাদিফ ক্লিক করে ছবি তুলে নেয়। ক্যামেরার শব্দ শুনে হিমা সেদিকে তাকায়। রাদিফের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে নিজেই কয়েকটা সেলফি তুলে নেয়। মীরের এসব সহ্য হচ্ছিল না তাই রেগে বসা থেকে উঠে টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়।
“ এটা কী করলে,মীর ভাই! কি সুন্দর একটা মুহূর্ত ছিল! নায়ক নায়িকাকে এখনই খুঁজে ফেলেছিল! তুমি সব শেষ করে দিলে!”

“ আমার খুব ঘুম পাচ্ছে, হিমালয়! তোরা যা তো!”

মীরের গম্ভীর স্বর শুনে হিমা মন খারাপ করে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। এদিকে রাদিফ চলে যেতে নিলেই মীর বাঁধা দেয়। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে বলে,“ নতুন ফোন কিনেছিস? কই দেখালি না তো! টেবিলের উপর রেখে যা, দেখি সেটিংক্সটা ঠিকঠাক মতো সেট করতে পেরেছিস কি না।”

রাদিফ যেই ভয়টা পেয়েছিল সেটাই হলো।সে মিনমিন করে মীরকে ডেকে বলল,“ মীর ভাই, আজ থাক! আমার একটা কল!”
রাদিফ কথা শেষ করতে পারেনি তার আগেই মীরের কণ্ঠস্বর শুনে সে,“ যাওয়ার সময় বাতি নিভিয়ে দরজা চেপে যাস তো!”

মীরের শান্ত কথায় যে কতোটা অশান্তি আছে তা রাদিফ ঠিকই বুঝতে পারে। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে মীরের কথামতো নিজের ফোনটা টেবিলের উপর রেখে চলে যায়।
এদিকে রাদিফ চলে যেতেই মীর উঠে বসে। ফোনের লক খুলে সে সরাসরি গ্যালারিতে ঢুকে, যেখানে অধিকাংশ ছবিই হিমার। সাথে তার আর হিমার কয়েকটা ভিডিওও আছে। মীর সবগুলো ছবি এবং ভিডিও নিজের ফোনে রেখে সকল ছবিগুলো ডিলিট করে দেয়। এরপর ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে নিজের কয়েকটা সেলফি তুলে আবার শুয়ে পড়ে।

রাদিফ নিচে নেমে সোফায় বিষন্ন মনে বসে থাকে। হিমা এসেছিল আশার কাছে মীরের নালিশ করতে। আশা হিমার কথা কানেও নেয়নি। সে জানে মীর ও হিমার মাঝে প্রায়শই ঝগড়া হয়। আশার কাছে পাত্তা না পেয়ে সে বাইরে চলে আসে।রাদিফকে সোফায় বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করে,“ অমন শুঁকনো মুখে বসে আছো কেন, রাদিফ ভাই? গার্লফ্রেন্ডের সাথে কি ঝগড়া হয়েছে?”

হিমা উত্তরের আশায় রাদিফের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু রাদিফ কি উত্তর দিবে! মীর যে তার গার্লফ্রেন্ডের চেয়েও দামী বস্তুটাই রেখে দিয়েছে।
“ বলো না! রাদিফ ভাই কি হয়েছে?”

“ আমার মোবাইল এখন বাঘের খাঁচায়। না জানি ঐটার উপর কতো অত্যাচার হচ্ছে!”

হিমা রাদিফের কথায় কিছু বুঝলো না। সে নির্বিকার চিত্তে তাকিয়ে রইলো শুধু। রাদিফ তা দেখে হিমার কাছপ মিনতির সুরে বলে,“ আমার নতুন ফোন এনে দে, বোন! মীর ভাই না জানি ঐ মাসুম ফোনের সাথে কি না কি করছে!”

হিমা এতক্ষণে রাদিফের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারে। বেচারা রাদিফের জন্য হিমার বড্ড মায়া হয়! সে এবার সিদ্ধান্ত নেয়, সে নিজেই বাঘের খাঁচায় প্রবেশ করবে। এছাড়াও রাত হয়েছে খাবার খাওয়ার জন্য হলেও মীরকে ডাকতেই হবে। এ আর কী কঠিন কাজ! সে যাবে আর টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে মীরকে খাওয়ার কথা বলে চলে আসবে। ভাবনা অনুযায়ী হিমা সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠতে থাকে। এদিকে রাদিফের হিমার জন্য বড্ড মায়া হয়! বাঘের খাঁচায় প্রবেশ করে তার সাথে কি ঘটবে রাদিফ বুঝতে পারে। তার কাছে যদি ফোনটা থাকতো তাহলে এই দুজনের এই মুহূর্তটাও ক্যামেরাবন্দী করে রাখতো।

একে তো অন্ধকার তার উপর মীর গেস্ট রুমে আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে রেখেছে। হিমার আঁধার রজনী খুবই অপছন্দ। সে চাঁদনী রাতে মুগ্ধ হতে পছন্দ করে। হাঁটি হাঁটি পা পা ফেলে হিমা ঘরে প্রবেশ করে। সুইচের দিকে হাত বাড়াতে নিলেই মীরের কন্ঠস্বর শুনতে পায়,“ কেন এসেছিস, হিমালয়?”

“ তুমি ঘুমাওনি, মীর ভাই?”
হিমার সরল সহজ প্রশ্নে মীর উত্তর দেয়,“ আমার ঘুম তো তুই কেড়ে নিয়েছিস, হিমালয়!”

“ কী যে বলো না তুমি, মীর ভাই! ঘুম কি কেউ নিতে পারে? শুনেছি পেটে ক্ষুধা থাকলে ঘুৃম কম হয়। তুমি বরঞ্চ খেয়ে ঘুমাও।”

“ এক শর্তে আমি রাতে খাবো।”

মীরের কথায় হিমা হেসে ফেলে। সে ভুলেই গিয়েছিল তার মীর ভাই আর আগের মতে নয়! তার মীর ভাইয়ের মনে অসুখ বেধেছে। যার ঔষধী হিমার কাছেই আছে যা সে জানেই না। সে সহজমনে বলে, “ কি শর্ত শুনি?”

হিমার উত্তরে মীর বাঁকা হাসে। অন্ধকারে হাতড়ে সে মোবাইলে আলো জ্বালায়। একদম হিমার মুখোমুখি হয়ে বলে,“ তোর নরম হাত দিয়ে আমাকে খাইয়ে দিতে হবে, তবেই আমি খাবো।”

মীরের অসম্ভব কথা সম্ভব করা হিমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে তাই জোর চিৎকার করে বলে,“ তুমি কি এখনে ছোট আছো,মীর ভাই? সকলের সামনে ছোট বোনের হাত দিয়ে খেতে লজ্জা করবে না?”

হিমার একটি কথাই মীরের মাথা গরম করার জন্য যথেষ্ট। সে হিমার কাছে এসে এক হাতে গাল চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,“ কীসের ভাই, কীসের বোন? না তুই আমার মায়ের পেটের বোন না আমি তোর ভাই। আর একবার যদি ভাই ডেকেছিস তো, সকলের সামনে তোর গালে কিস করে দিব। তখন আমাকে কেউ কিছু বললে, বলব তুই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিস।”

মীর এমন একটা কথাও বলবে তা হিমা ভাবতেও পারেনি। সে চোখ বড়ো বড়ো করে অস্পষ্ট স্বরে বলে,“ তাহলে কী বলে ডাকব? আঙ্কেল?”

মীরের এখন নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। সে হিমাকে ছেড়ে দিয়ে এদিক সেদিক কিছুক্ষণ পায়চারি করে। এদিকে হিমা মীরের অবস্থা দেখে ভীষণ মজা পাচ্ছে। মীরের আহত দৃষ্টি দেখে হিমার বড্ড হাসে পাচ্ছে। তার বলতে ইচ্ছে করছে, “ সকলের কাছে মীর বাঘ আর হিমার কাছে মীর ইঁদুর! হিমার জন্য মীর সাতখুন মাফ করেও দিতে প্রস্তুত থাকবে।” এসব ভেবেই হিমা মুচকি হাসছে। আকস্মিক মীর হিমার কাছাকাছি এসে হিমার কপালের সাথে নিজের কপাল ছুঁয়ায়। মীরের নিঃশ্বাস দ্রুত গতিতে চলছে। তার নিঃশ্বাস হিমার নাকে মুখের উপর পড়ছে। হিমার চোখ বন্ধ সে ভয়ে তাকাচ্ছে না। মীর চোখ খোলা রেখে একবার হিমাকে দেখে পুনরায় চোখ বন্ধ করে বলে, “ একদম হাসবি না, হিমালয়! তোর হাসিতে আমার অন্তরে পীড়া হচ্ছে। তুই কী বুঝিস না! সত্যিই কিছু বুঝিস না! আমার বুকের বাম পাশে একটিবার হাত রেখে অনুভব কর! এই হৃদয়ের পৃরতিটা স্পন্দন তোর নাম জপছে। তোকে খুব করে মনের কথা জানাতে চাইছে। তুই কি মনের কথা বুঝিস না! আর কতো অপেক্ষা করাবি! এবার তো আমার হো!”

হিমার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে। তার মীর ভাই তাকে এতো ভালোবাসে! এই সময়ে হিমার উচিত মীরকে জড়িয়ে ধরে মনের কথা জানানোর। কিন্তু হিমার মুখ নিসৃত কোন কথাই বের হচ্ছে না। সে আবেগে ভেসে যাচ্ছে।
হিমা কাঁপা হাতে মীরের বুকের বাপ পাশটায় হাত রাখে।যেখানে মীরের হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন হিমার জন্য বরাদ্দ।
হিমার কান্ড দেখে মীর ফিসফিস করে বলে, “ কিছু অনুভূতি মুখে জানাতে নেই, আমি তোর উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো, হিমালয়! আরেকটা কথা, আমি তোকে খুব বেশিই ভালোবেসে ফেলেছি, হিমালয়। যদি বলিস, কীভাবে? উত্তরে বলব, জানি না। আমার ভালোবাসার পরিমাপও জানাতে পারব না। পরিশেষে বলবো,তুই কী আমার হবি, হিমালয়!”

চলবে ইনশাআল্লাহ………