আত্মাহুতি

0
1098

‘তাই বলে করোনার মধ্যে বিয়ে কেন? তোমার বাবা নাকি বলেছিল অনার্সের পর বিয়ে দিতে চায়?’ বিষন্ন গলা সবুজের।
‘তা তো বলেছিলই। কিন্তু এই মহামারি এসে নাকি তাঁদের চোখ খুলে দিছে। আর নাকি এমন ছেলে পাওয়া যাবে না। আর ভার্সিটি কবে খুলবে, ঠিক নেই। এটা শুনে তাঁদের দ্বিগুণ উৎসাহ বিয়ের ব্যাপারে। সময়, স্রোত ও বিয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করে না।’
‘হোয়াট? মহামারি চোখ খুলে দিলে বিয়ের আয়োজন করা লাগে নাকি? নাকি মহামারির পর আর কোনো ভালো ছেলে পাওয়া যাবে না দুনিয়ায়? তুমি ওদের অপেক্ষা করাতে পারছো না?’
‘তুমি যদি সময়মত কিছু একটা করতে, তবে তোমার কথাটাই বলতে পারতাম, সবুজ।’ নির্লিপ্ত গলায় বলল তানিয়া।
‘আমি তো করতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু নতুন কোনো সার্কুলারই তো হবে না এই সময়ে। করোনা শেষ হোক। কিছু একটা হয়ে যাবে আমার।’
‘হয়ে যাবে, হচ্ছে, চলছে… এগুলো বাবা-মায়েরা শোনে না। তাঁদের সবকিছু নগদ চাই। এই মুহূর্তে চাই। বাকিতে তাঁরা বিশ্বাসী নয়।’
ফোনালাপ বেশিক্ষণ এগোলো না। এমন গুরুগম্ভীর কথোপকথনে প্রেমালাপ হয় না। যা হয়, তা হল ডিপ্রেশন। তাই সবুজ এখন ঘোরতর ডিপ্রেশনে ভুগছে। এক কাপ চা খেয়ে বইপত্র খোলা যাক।
আমেরিকার জাতীয় ফুল গোলাপ। বাংলাদেশের শাপলা। কিন্তু প্রপোজের সময় সবুজ তানিয়াকে গোলাপই দিয়েছে। এই জন্যই বোধ হয় বাংলাদেশ ক্ষেপে গেছে। তাই চাকরির নতুন সার্কুলার বন্ধ। এখন কি ইউএস যাবার ট্রাই করা ভালো হবে? আরও কিছু বইপত্র আনবে কী না GRE এর, বুঝতে পারছে না। নাহ, এসব ক্যারিয়ার রিলেটেড অনেক বই দিয়ে টেবিল সয়লাব। এর থেকে সমরেশ পড়লে ভালো হত। কিন্তু বেশিক্ষণ ধৈর্য্য থাকে না সাহিত্যের রস আস্বাদনের। জীবনেই নাই রস, বইতে তাই রস থাকলেও রুচিটা বোধ হয় নেই তার নিজেরই। এটাই হল সমস্যা। রুচি না থাকলে রস বোঝা মুশকিল।
মুশকিল আসান হয়ে এল বড় মামা। সাথে আট ইঞ্চি পিৎজা। দিনটা বেশ ভালোই কাটল। বড় মামা ছিল ছয় ঘন্টা। রাতের খাবার খেয়ে চলে গেল। সেই সাথে চলে গেল হয়ত সাময়িক সুখটাও। এবার আবার ডিপ্রেশনের পালা। তানিয়াকে পাব নাকি পাব না, এই ভেবে ডিপ্রেশনের সূত্রপাত হয়। এরপর সারারাত যায় ফেসবুকের নিউজফিডটা দেখতে দেখতে। শেষরাতে হয় ঘুম। ঘুম থেকে উঠলে হয় মধ্যাহ্ন। তারপর কীভাবে যেন পরের দিনের রাত চলে আসে। সূর্যাস্তও হয় এখন তাড়াতাড়ি। সূর্যও যেন সবুজের সাথে খেলায় মেতে উঠেছে। জীবনভর এখন অন্ধকার। ভবিষ্যতেও অন্ধকার। তানিয়াকে পাত্রপক্ষ দেখে গেছে। পছন্দও করে ফেলেছে। করবেই তো। তানিয়াকে দেখেই নিশ্চয়ই পাত্র বেটা বেহায়ার মত তাকিয়ে ছিল। আর তানিয়া সলজ্জে নিচে তাকিয়ে ছিল। সেটা দেখে সবাই হয়ত ধরে নিয়েছে তানিয়াও পছন্দ করে ফেলেছে।
সবাই মেয়েদের ইচ্ছাগুলোকে আইডিয়া করে নেয়। এই আইডিয়া করা, ধরে নেয়া – এসব বন্ধ হবে কবে? এগুলোর জন্য সবুজের এখন ইউরোপের দীর্ঘতম নদীর নামটা মনে আসছে না। বইয়ের কোন পাতায় আছে, সেটাও খুঁজে পাচ্ছে না। পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে। নিরুদ্দেশ যাত্রার মত বইয়ের পাতাও সামনে চলেছে। কিন্তু গন্তব্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জীবনের গন্তব্যটা কী সবুজ নিজেও খুঁজে পেয়েছে?
সবাই শুধু প্রতারণাই করছে। পাওনা টাকাটা দিচ্ছে না স্টুডেন্টও। রাশেদের কাছে টাকা পেত। সেই ব্যাটাও গড়িমসি করছে। করোনার জন্য সবাই বাকির খাতা খুলেছে। কিন্তু তার কাছ থেকে কেন সবাই নগদ আশা করে? বাবা-মা বলছে, অমুক তো বিদেশে চলে গেল, অমুক কোম্পানিতে পাশের বাসার ছেলেটা ঢুকে গেল। মাস শেষে টাকা আসে। আর তোর কাছ থেকে শুধু বড় বড় কথাই আসে। বড় বড় কথা সে কবে বলল? সে শুধু বলেছে তার পরিকল্পনার কথা। সেটাও সহ্য হচ্ছে না। আসলে একটা নির্দিষ্ট সময় ছেলেমেয়েরা বাড়ির বাইরে কাটালে, ইউনিভার্সিটিতে পড়লে বাসায় বেশি দিন তাদের সহ্য করতে পারে না বাবা-মায়েরা। এইজন্যই তানিয়াকে থার্ড ইয়ারেই বিয়ে দিবে। অথচ আগে বলেছে, অনার্স শেষের পর বিয়ে দিবে। ঠিকই করেছে অবশ্য। সবুজের চাকরির ব্যবস্থা হতে হতে সমাজ বলবে, তানিয়া তো বুড়ো হয়ে গেছে। বুড়ো বেটি ওটা। এভাবেই বলে সবাই। মেয়েদের ব্যাপারে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব লোকের মুখের ভাষা একই। তাই দোষ তানিয়ার নয়, দোষ হল কপালের। সবুজের কপালে ভালো কিছু নেই। মরে যাওয়া বেটার অপশন। বাপের হোটেলে বসে অন্ন ধ্বংসের চেয়ে দড়িতে ঝুলে পড়লে বেশি ভালো হয়।
হাতটা কাঁপছে। ফ্যানে নাইলনের রশিটা সুন্দর মত ঝুলানো হয়েছে। শুধু গলায় পরা বাকি।
হঠাৎ কার যেন ফোন। ‘হ্যালো, সবুজ। শফিক ভাই তো সুইসাইড করছে। তাড়াতাড়ি আয়। আংকেল আন্টির কাছে চলে আয়। তোকে তো অনেক ভালোবাসত রে। তুই ছাড়া কারো সান্ত্বনাতেই কাজ হবে না।’
শফিকদের বাসায় যাচ্ছে সবুজ। সান্ত্বনা দিতে হবে। সবাইকেই বলতে হবে, আর কেউ যেন এমন না করে। কেউ কী জানে, সান্ত্বনা দিতে আসছে এক হিপোক্রেট?
নাহ, আর হিপোক্রেসি করা যাবে না। নিজের কাছে নিজেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে সবুজ। সূর্য কাল আবারও উঠবে। তবে সে কেন আবার জাগবে না? জীবনের সূর্য অস্ত যায় নি তার!
(সমাপ্ত)
……
#গল্প আত্মাহুতি
~ শাকিব শাহরিয়ার প্রিয়