আমি একা পর্বঃ(১)

0
3491

#আমি_একা
#পর্বঃ(১)
#আরিয়া_সুলতানা

আমার মা কাঁদছে! এইদিকে আমি শান্তিতে জানালার পাশে বসে কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনছি। প্রতিবেশীরা এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে! বাধ্য হয়েই উঠতে হলো! দরজা ভেঙে ফেলবে এমন অবস্থা। দরজা খুলতেই হুড়হুড় করে ঢুকে পড়লো ওরা। বাবা ওদের ঢুকতে দেখেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

মা এখনো কাঁদছে। আমি আবার আমার রুমে যেয়ে দরজা লক করে জানালার পাশে বসলাম। হয়তো ভাবছেন আমি আমার মা’কে অপছন্দ করি অথবা আমি তাদের মেয়ে নই। এমনটা না! আমি তাদেরই মেয়ে আর আমার মা কাঁদলে আমার খারাপ লাগে। খুব খারাপ লাগে! কিন্তু আমি এসব নিয়ে এখন আর ভাবি না।

২মাস হলো ১৯-এ পাঁ দিয়েছি। শেষ কবে আমার জন্মদিনে বাবা-মা আমার সাথে কথা বলার টাইম পেয়েছিল তা আমার মনে নেই। আমার জন্মের পর ২বছর পর্যন্ত মনে হয় আমি বাবা-মায়ের আদর পেয়েছি। অনেকটা নিজেই নিজেকে বড় করেছি। কি ভাবছেন আমার বাবা-মা চাকুরীজীবী! মোটেও না! বাবা বেকার আর মা গৃহিণী। তবুও সংসার খুব ভালোই চলে আমাদের। কিভাবে চলে তা কখনো জানতে পারিনি। জানতে চাইতাম এককালে, যখন দেখতাম রেস্পন্স পাইনা কোনো তখন থেকে আর জানতে চাইনি। আমার জন্মের পর নাকি দাদা-দাদি বাবাকে ত্যাজ্য করেছে। তাই আরকি বাবার সাথে আমি তেমন ঘনিষ্ঠ নই। তবে দায়িত্ব পালনে সে কখনো দ্বিমত করেনি। কিন্তু বাবা কখনো আমার সাথে খেতে বসেনি। একদিন বসেছিলাম খেতে, বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে “অপয়া” বলে প্লেটে ভাত রেখেই উঠে গিয়েছিল। মা আমার গালে একটা চর মেরে বলেছিল “মানুষটাকে শান্তিতে খেতেও দিলিনা নচ্ছার, তোর আজকে ভাত নেই।” সত্যিই সেদিন আমার কপালে ভাঁত জুটেনি। তবে এর জন্য আমি নিজেকেই দায়ী করি। কি দরকার ছিল বাবার সাথে খেতে বসার।

বাবার ছেলের খুব সখ ছিল আর দাদা-দাদিরও! এইদিকে মা’র আর কনসিভ করার চান্স নাই। দাদা-দাদি বলেছিল বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা কিন্তু বাবা রাজি হয়নি মা’কে ছাড়তে। প্রেমের বিয়ে ওদের তাই-ই হয়তো মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর রাজি হয়নি আর এজন্যই ত্যাজ্য হতে হয়েছে। যখন আমার ৬ কি ৭বছর বয়স তখন থেকেই দেখছি মা-বাবার ঝগড়া। তারা ঝগড়া করতে করতে টাইমই পেতো না আমার দিকে তাকানোর। মাও আমার তেমন একটা খেয়াল রাখতো না। শত হলেও তার ভালোবাসার মানুষ আমার উপর বেজার হয়ে আছে। আমার মনে আছে যেদিন স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম শুধু মাত্র সেইদিনই মা আমার সাথে গিয়েছিল স্কুলে। বাবা কখনো যায়নি আমাকে নিয়ে কোথাও। বাবাকে প্রায়ই দেখতাম ঢাকায় গেলে অনেক অন্নেক খেলনা নিয়ে আসতো তবে তা তার বোনের ছেলের জন্য। আমাকে বাবা একটা পুতুলও কোনোদিন কিনে দেয়নি। আমাদের পাশের বাড়িতে একটা ছেলে ছিল পিয়াশ। ও আর আমি একি ক্লাসে পড়তাম একি স্কুলে! ওর সাথেই স্কুলে যেতাম আমি। যখন ১২বছর আমার তখন জানতে পারলাম যে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইছে কেনোনা তার প্রেমিকার পেটে তার বাচ্চা। এ বিষয় নিয়েই ঝগড়া চলতো তখন। মা বাবাকে বিয়ে করতে দিয়ে সতিনের সংসারও করবেনা আবার তালাকও দিবে না। এই বিষয় নিয়েই একদিন বাবা মায়ের গাঁয়ে হাত তুলে বসলো। তখন আমি সবে স্কুল থেকে ফিরেছি। দরজা খোলাই ছিল, বাবা আমাকে দেখে মায়ের দিকে ফিরে বলেছিল “দু’টো অলক্ষ্মী পুষেছি বাড়িতে!”
বাবা চলে যাওয়ার পর মা আমাকে গরম খুন্তি উঠিয়ে গলায় ঠেঁসে ধরেছিল। বলছিল “অলক্ষ্মীর জাত। তোর জন্যই যত সমস্যা আমার সংসারে! জন্মের পর থেকে জ্বালিয়ে মারছে! তুই মরিসনা কেনো?”
সেদিন সারারাত বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছিল। খাবারও দেয়নি মা। এরপর যখন ১৪র ঘরে পাঁ রাখলাম বুঝতে শিখলাম আমি অভিশাপ। আমি অলক্ষ্মী! আমার আসলেই কেউ নেই। একাকীত্বে ভুগতে শুরু করলাম। বয়সটা আবেগের ছিল। কেউ একটু ভালোবাসা দেখালেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলতাম। একটা বড় ভুল এভাবেই করে ফেললাম। জরিয়ে পড়লাম পিয়াশের সাথে ভালোবাসা নামক এক নোংরা খেলায়।

আমার চেয়ে ১বছরের বড় ছিল পিয়াশ। প্রথম প্রথম সেও খুব ভালোবাসতো আমাকে। তবে তা ভালোবাসা দেখাতো নাকি আবেগ তা বুঝে উঠতে পারিনি কখনো। তবে আমি তা ভালোবাসা হিসেবেই গ্রহণ করি কারণ আমার সেই একাকীত্বের সময় এই আবেগ অথবা ভালোবাসাগুলোই আমাকে আগলে রেখেছিল। ভুলে থাকতে পারতাম আমি অপয়া। ভালোবাসতে শিখেছিলাম নিজেকে। নিজের যত্ন নিতে শিখেছিলাম। হঠাতই একদিন পিয়াশ এসে বললো ও নাকি চলে যাবে রংপুর ওর বাবা মায়ের সাথে। কাঁদছিলাম সেদিন খুব ওকে জরিয়ে ধরে!

যেদিন চলে যাবে সেদিন সকালে দেখা করতে বলেছিল ঘেরের পাশে! আমি একটা ১৭পেজের চিঠি লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে দিব বলে! অনেক ভালোবাসা, আবেগ, কান্না দিয়ে লিখেছিলাম চিঠিটা। আমার অনুভূতিতে ঠাঁসা ছিল লেখাগুলো। আমি জানতাম পিয়াশ চলে যাওয়ার আমি আবারো একাকীত্বে ভুগবো তবে পিয়াশ যে আমার জন্য মৃত্যুর ব্যবস্থা করে রেখে যাবে বুঝতে পারিনি। সকাল সকাল উঠে আমার সবচেয়ে সুন্দর জামাটা পড়ে চুল গুলো খুলে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। মা-বাবা দেখেছিলো আমি যাচ্ছি তবুও তারা কোনো প্রশ্ন করেনি। আসলে সময় পায়নি ঝগড়া করতে করতে। আমারো বেশ সুবিধাই হলো। ঘেরের আইল ধরে যেতে যেতে দেখলাম পিয়াশ দাঁড়িয়ে আছে একটা মাঁচা ঘরের সামনে। ওর কাছে যেয়ে স্বযত্নে ওর হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিলাম। পিয়াশ চিঠিটা মুঠোতে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকালো! হয়ে গেলাম ধর্ষিতা! নিজের আবেগের কাছে, নিজের ভালোবাসার কাছে, পুরো দুনিয়ার কাছে! জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম আমি হাসপাতালে। মা পাশে বসে আছে। সেদিন প্রথম মা’কে আমার জন্য কাঁদতে দেখে খুশি হয়েছিলাম। নিজেকে বলেছিলাম “হাজার হলেও মায়ের মন তো!” আমার গাঁয়ে রক্ত দেওয়া হলো দুই ব্যাগ!
মায়ের হাত ধরে কেঁদে বলেছিলাম সেইদিন “বাবা এলো না তাইনা? আমি আসলেই অলক্ষ্মী! তোমাদের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি! এখানে থেকো না। আমার কথা চিন্তা করো না, বেশি কিছু হলে কি হবে? মরেই তো যাব! চলে যাও মা এখানে থেকো না!” মা কথা শোনেনি। নিয়ে এসেছিল বাড়িতে। বাড়ি আসার পর ২বার আত্মহত্যার চেষ্টা করি। ৩য় বার আর ভাবিনি কারণ মায়ের এখন আমিই আছি। বাবা যখন মায়ের সাথে ঝগড়া করে তখন আমি সামনে গেলে মা’কে মারা শুরু করে। আমাকে একবার মেরেছিল। তবে যখন জানতে পারলো আমার রক্তে বি ভাইরাস আছে তখন আর মারেনি। কিছুদিন পর ক্যান্সারে পরিণত হলো। এখন আর আমি কোনোকিছু নিয়েই তেমন একটা ভাবিনা। তবে আফসোস করি খুব। বেপরোয়া হয়ে গিয়েছি। কোনোকিছুরই তোয়াক্কা করিনা। আমার কোমর পর্যন্ত ঘন চুল গুলো ঝরে পড়ে যাচ্ছে। ১০টা কি ১টা কেমো দেওয়ারও টাকা নাই। তা নিয়েও আর ভাবিনা। ভেবেও বা কি হবে! সময় তো প্রায় শেষ!

বাবা নাকি আজ থেকে দ্বিতীয় বউর কাছেই থাকবে। আমাদের সাথে আর থাকবেনা! মা থামাতে চেষ্টা করেছে পারেনি! তালাকনামা দিয়ে চলে গিয়েছে।
এ নিয়েও আমার মাথা ব্যাথা নেই। এমনিতেই বাবা আমাদের সাথে থাকতো না তেমন একটা। তবে মায়ের জন্য খারাপ লাগছে। রাতে মা আমার মাথাটা কোলে নিয়ে মাথার উপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, “গল্প শুনবি?”