একটি সাঁঝরঙা গল্প পর্ব-১৩

0
106

#একটি_সাঁঝরঙা_গল্প
#তানিয়া_মাহি
#পর্ব_১৩

নিশোর সাথে দুপুরের আগ থেকে আর দেখা হয়নি ফালাকের। চুড়ি দিয়ে চলে যাওয়ার পর থেকে কোনভাবেই টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফালাক আজও শাড়ি পরেছে। সাদা-কালো রঙের মিশ্রণের শাড়িটায় যেন ফালাককে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। সেই রাতের মতো চোখে গাঢ় করে কাজল ঠাঁই পেয়েছে। ঠোঁটে হালকা কালো-খয়েড়ি রঙের লিপস্টিক তবে আজ একটু ভিন্নতা রয়েছে সাজে। আজ শাড়ির আঁচল ভাজে ভাজে কাধে রাখা হয়নি। শাড়ির আঁচল আটকে না রেখে ছেড়ে রেখেছে সে। সেদিনের মতো লম্বা বেণী না করে ঘাড়ের ওপর মোটাসোটা একটা খোঁপা করা হয়েছে।

বিছানায় ইয়াদ আর তোয়া বসে আছে। ফালাকের সাজ দেখছে আর আড্ডা দিচ্ছে তিনজনে মিলে। বাহিরে আবিরের গলা শুনতেই পিছনে ঘুরে তাকালো ফালাক৷ ইয়াদ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“আবির ভাই?”

ফালাক মৃদু হেসে বলল,“হ্যাঁ। ডাকব?”

ইয়াদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিল। বলল,“না থাকুক। আবির ভাই আসলে আমার লজ্জা লাগবে।”

তোয়া বলে উঠল,“কেন? ভাইয়ার তো জানা উচিৎ ফুপাতো বোন তার প্রেমে হাবুডুবু খায় অলওয়েজ। ”

ফালাক আর তোয়া একসাথে হেসে উঠল। ইয়াদ মুখ গোমড়া করে বলল,

“হাসিস না তো! তোদের হাসি আমার গা জ্বা*লিয়ে দিচ্ছে।”

ইয়াদের কথা শুনে দুজন আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। রুমে হাসির শব্দ শুনে আবির এগিয়ে এলো। দরজায় দাঁড়িয়ে বলে উঠল,

“রুমে এত হাসাহাসির শব্দ কেন?”

খাটের দিকে তাকাতে দুজনকে দেখে মৃদু হাসলো আবির। বলল,

“ভালো আছ তোমরা?”

দুজনই মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো।
____

সন্ধ্যায় সবার নাশতা করা হয়ে গিয়েছে। ফালাকের রুমেই সবাই বসেছে আড্ডা দিতে। আবিরও সেখানে আছে। জাভেদ সাহেব শুধু খাওয়া দাওয়া শেষ করে কাজ দেখতে বেরিয়েছেন। রাবেয়া বেগম তোয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোয়া মা, দেখ তো নিশো ঘুম থেকে উঠল কি না!”

তোয়া বসা থেকে উঠতে উঠতে বলল,“আচ্ছা যাচ্ছি। ভাইয়া আজ আমার সাথে বাসায় ফিরবে বলল।”

রাবেয় বেগম অবাক হয়ে তোয়ার দিকে তাকালেন।
“কী! কিছু বলেনি তো নিশো!”

পাশ থেকে আবির বলে উঠল,“আমাকে বলেছে। কয়দিন আর পরিবার ছেড়ে থাকবে। বাপের রাগ কমে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ফালাক তুই যা। দেখ, ও উঠেছে কি না! না উঠলেও ডেকে আনবি।”

ফালাক আবিরের দিকে তাকালো। অন্যদের ভাই ভিলেন হয়ে মাঝ রাস্তায় দাঁড়ায় অথচ তার ভাই! সবকিছু কীভাবে আগলে নিচ্ছে। সেই রাতে ছাদ থেকে বাসায় ঢোকার পর আবিরের রুমের দরজার নিচ দিয়ে আলো দেখে বুঝতে পেরেছিল আবির ছিল সিঁড়িতে তবুও কোনকিছু আঁচ করতে দিচ্ছে না। ফালাকও সেই রাতে ভাইয়ের সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার সাহস করেনি।

ফালাক ধীরপায়ে নিশোর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজায় হাত দিতেই বুঝলো দরজা খোলা।
হাত দিয়ে দরজাটা ঠেলে দিতেই দরজা খুলে গেল। বিছানার দিকে চোখ যেতেই দেখল রোজমেরিকে কোলের মধ্যে নিয়ে নিশো ঘুমুচ্ছে। ফালাক আস্তে আস্তে নিশোর দিকে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি যেতেই ফালাক দেখল নিশোর মাথার নিচের বালিশের ওপাশে বইখাতা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। সাথেই একটা ডায়েরি।

ফালাক ওপাশে গিয়ে ডায়েরিটা হাতে নিল। পুরো ডায়েরিতে অনেক প্রয়োজনীয়- অপ্রয়োজনীয় লেখা, কথা লিখে রেখেছে। ফালাক পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকলো। একদম শেষের দিকে কয়েকটা সাদা পৃষ্টার মাঝের একটা পৃষ্ঠায় লেখা-

তার পাওনা – চারশো+সাত হাজার চারশো ছত্রিশ টাকা।

কপালে ভাজ পড়ল ফালাকের৷ বইয়ের ভেতরকার টাকা সে দিয়েছে এটা নিশো বুঝে গিয়েছে! ফিরিয়ে দিতে হবে বলে লিখেও রেখেছে! অবাক হলো ফালাক। টাকার হিসেব লেখার পাশেই যোগ চিহ্ন দিয়ে কিছু একটা লিখেছিল সেটার বারবার কাটাকাটি করে মুছে ফেলেছে আর বোঝা যাচ্ছে না। ফালাক ডায়েরিটা একদম চোখের কাছে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। বেশ খানিকটা সময় চলে গেল কিন্তু সে বুঝতে পারছে। পৃষ্টা উল্টানোর পর ভালোভাবে খেয়াল করলেই দেখলো সেখানে ‘+ ভালোবাসা’ লেখা।

ফালাক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করে বলল,“ঠিকই লিখেছিলেন। টাকা পরিশোধের সাথে আমার ভালোবাসাও পরিশোধ করতে হবে। এমনি এমনি ভালোবাসি নাকি? আমি ভালোবাসি মানে আপনাকেও ভালোবাসতে হবে। ভালোবাসতেইই হবে। হবেই। এটাই ফাইনাল।”

ডায়েরিটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে নিশোর হাতের মধ্যে থেকে রোজমেরিকে নিজের কোলে তুলে নিল। চাপাস্বরে ডেকে উঠল,

“শুনছেন? বাড়ি যাবেন না? নাকি থেকে যেতে চাইছেন?”

নিশোর ঘুম হালকা। আশেপাশে কারও উপস্থিতিতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো। ফালাকের প্রথম ডাকেই ধীরে ধীরে তাকালো সে। সামনে ফালাককে শাড়িতে দেখে আনমনে বলে উঠল,

“বউ বউ লাগছে তোমাকে। ঘুমুতেও দেবে না? স্বপ্নেও এসে জ্বা*লাচ্ছো!”

ফালাকের কান পর্যন্ত কথাগুলো পৌঁছলো না। শুধু বুঝতে পারলো কিছু একটা বলল নিশো। ফালাক আবার ডাকলো। নিশো এবার সজ্ঞানে ফিরে এলো। সামনে ভালোভাবে দেখে এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝল ফালাক সত্যি সত্যি এখানে। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো সে। পাশে রাখা টিশার্ট তাড়াহুড়ো করে পড়ে নিল।

তোতলাভাবে বলে উঠল, “তু তু তুমি এ এখানে!”

ফালাক রোজমেরির গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,“দুপুরে খেতে যাননি। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। কখন খাবেন? বাসায় যাবেন না?”

ফালাকের কথা শুনে ওপর নিচ মাথা নাড়লো নিশো। প্রথম দুটো বাক্য ঠিক ছিল কিন্তু ফালাক নিজেই বাড়ি যাওয়ার কথা বলছে যে কি না সকালেই যেতে নিষেধ করল!

ফালাক রোজমেরিকে নিয়ে পায়চারি করা ধরল। বলল,“তাড়াতাড়ি চলে আসুন। মা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। শুনুন বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছেন যান। ভেবে দেখলাম আপনার চলে যাওয়াই ভালো। আপনি এখানে থাকলে পড়াশোনা ঠিকমতো হবে না। বাড়িতে মন দিয়ে পড়ুন। বাড়ি যেতে দিচ্ছি বলে ভাববেন না টিউশনি থেকে ছুটি পাবেন। যদি চান আমি ফেইল করি তাহলে আপনার আসতে হবে না। আমার মনে হয় আপনি এটা চাইবেন না। ”

নিশো ফালাকের কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলল,“টিউশনির চিন্তা তোমার করতে হবে না। তোমার প্রয়োজন ভালো রেজাল্টের আর আমার প্রয়োজন টাকার।”

“হ্যাঁ সেটাই৷ চলে আসুন ফ্রেশ হয়ে। বাসায় তোয়া এসেছে। বড়মার সাথে দেখা করাতে চেয়েছিলাম। বাসায় আনতে পারিনি কিন্তু আপনাদের আজ দেখা হচ্ছে। সবকিছু তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাক।”

“হুম। তুমি যাও আমি আসছি।”
“রোজকে নিয়ে গেলাম।”
“যাও।”

ফালাক বাসায় পৌঁছানোর পরপরই নিশো চলে এলো। রাবেয়া বেগম নিজে গিয়ে নিশোকে খাওয়ালেন। সাথে কত আহাজারি! কত কথা! কত আক্ষেপ! বাড়িটা আজ থেকে অন্ধকার অন্ধকার লাগবে, এ কয়েকদিনে বাড়ির পরিবেশ কত ভালো হয়ে গিয়েছিল, সবার একসাথে খাওয়া খাওয়া, মিস করবেন, কতকিছু!

নিশোর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আবির নিশোকে ডাকলো। রুমে সবাই আছে। তোয়া, ইয়াদ, আবির, ফালাক। নিশো আসার সাথে সাথে রাবেয়া বেগমও এলেন।

নিশো গিয়ে সোজা আবিরের পাশে বসলো। আবির বলে উঠল,
“এখনই যাচ্ছিস বাসায়?”

নিশো একবার ফালাককে দেখল। মেয়েটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিশো নজর সরিয়ে নিয়ে বলল,

“হ্যাঁ ভাই। তুই কিন্তু বাসায় যাবি। ঘুরে আসবি আর আমি তো আসবই।”
“ঠিক আছে আমিও যাব। তুই কিন্তু ফালাককে পড়ানো বাদ দিবি না৷ ওকে পাশ করানোর মতো পড়িয়ে দে। তোর কিন্তু বিসিএস এ টিকতেই হবে নইলে তোর সাথে ইহকালের সম্পর্ক আমার শেষ।”

নিশো মৃদু হাসলো৷ বলল,“ভাই তুই আমার মোটিভেশনাল স্পিকার। একদম প্রেমিকার মতো কথাবার্তা। মনে হলো তুই বলছিস আমি বিসিএস এ না টিকলে আমাদের ব্রেকাপ হয়ে যাবে।”

আবির নিশোকে ধাক্কা দিয়ে বলল,“ধুর শা লা। সিরিয়াস হইলি না এখনো।”

নিশো হাসতে হাসতেই বলল,“আরে হয়েছি হয়েছি।”

বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা চলল সবার। সবার সাথে সবার কথা হলেও নিশো আর ফালাকের ব্যক্তিগতভাবে কোন কথা হলো না শুধু এতটুকু সময়ের মাঝে দুজনের অল্প কয়েকবার চোখাচোখি হলো।
___

নিশো বাড়ি ফিরেছে অনেকদিন হয়ে গিয়েছে। এই সময়ে সে নিজের পড়ায় সময় দিয়েছে। জীবনের এই সময়ে এসে সে বুঝেছে পছন্দের কিছু পেতে হলে, ঘরে বা বাহিরে সম্মান পেতে হলে সফলতা খুব বেশি জরুরি। নিজেকে পুরোটা সময় দিয়েছে সে। বাড়িতে আসার প্রায় সাড়ে তিনমাস হয়ে গিয়েছে জাফর ইকবাল সাহেব এখনো নিজের ছেলের সাথে কথা বলেন না। বাবা আর ছেলে একই বাসায় থাকলেও প্রতিদিন দেখা হয় না। খাবার টেবিলে কখনো একসাথে বসে না। নিশোর মা রূম্পা বেগম ছেলেকে হয়তো রুমে খাবার দিয়েছেন অথবা জাফর সাহেবের খাওয়া শেষ হলে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে খেতে বসেছেন।

নিশো ফালাকদের বাড়ি থেকে চলে আসলেও প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যাপর পড়াতে যায়। ফালাকের এইচএসসি পরিক্ষা শুরু হয়েছে। আবিরও মাঝেমাঝে নিশোদের বাড়ি আসে। ভাইয়ের ছেলে ঘনঘন এ বাড়িতে আসতে দেখে জাফর সাহেব মুখ গম্ভীর করে রুমে চলে যান। কিছু বলতেও পারেন না সহ্যও করতে পারেন না।

বিকেল চারটা।
নিশো বসে বসে পড়ছিল। রূম্পা বেগম এসে দরজায় নক করতেই পিছনে ফিরে তাকালো নিশো। মুচকি হেসে বলল,

“মা! এসো।”

হাতে নাশতার প্লেট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন তিনি। এগিয়ে গেলেন ছেলের পড়ার টেবিলের দিকে। প্লেটে বিভিন্ন ধরণের ফল দেখে নিশো মৃদু হেসে বলল,

“আজ এত ফল কেন, মা?”

রূম্পা বেগম প্লেটটা রেখে বললেন,“তুই পড়ছিস বলে এতক্ষণ আসিনি৷ অনেকদিন পর ফালাক এসেছে তাই তোয়া আর ফালাককে ফল দিয়ে তোর জন্য নিয়ে এলাম।”

ফালাক এসেছে শুনে আপনা-আপনি একটা শান্তি অনুভব করল নিশো৷ শীতল হাওয়া বয়ে গেল। রূম্পা বেগম হয়তো কিছু বুঝলেন আবার হয়তো কিছু না বুঝেই বললেন,

“যা গিয়ে দেখা কর। আজ টিউশনি নেই বলে প্রশ্নপত্র নিয়ে এসেছে তোকে দেখাতে।”

দরজায় নক করার শব্দ পেতেই মা-ছেলে দুজনই পিছনে ঘুরে তাকালো৷ ফালাককে দেখে রূম্পা বেগম বললেন,

“ওই তো ফালাক নিজেই চলে এসেছে। ফালাক, আয় মা। তুই, ভাইয়াকে প্রশ্ন দেখা। আমি যাই তোর জন্য কিছু রান্না করি। আজ কিন্তু বাড়ি ফেরা নেই। শেষ কবে এ বাড়িতে এসেছিলি মনেই নেই।”

ফালাক এগিয়ে আসতে আসতে বলল,“তোমার বর আবার বাড়ি থেকে বের করে দেবে না তো?”

রূম্পা বেগম ফালাকের গাল টিপে দিয়ে বললেন,“কেউ কিচ্ছু বলবে না। আমি সব দেখে নেব। কথা বল ভাইয়ার সাথে, আমি যাই।”

রূম্পা বেগম চলে গেলেন। ফালাক দ্রুতপায়ে নিশোর পাশের চেয়ারে এসে বসলো। হাসি হাসি মুখ করে বলল,“আপনাকে মিস করছিলাম।”

#চলবে……