গল্প জন্ম

0
920

গল্প জন্ম

আলেয়ার বিয়ের তেরো মাসের মাথায় প্রথম সন্তান হয়। ফুটফুটে মেয়ে। দু’টা চোখ আর নাকের দুই পাশটা হুবহু যেন আলেয়ার মতোন। থুতনিটা যদিও আলেয়ার স্বামী নজরুলের মতো। শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর, ননদ, সবাই খুব খুশি। তবে সবচেয়ে বেশি খুশি মনে হয় নজরুলই। মেয়েকে সারাক্ষণ কোলে নিয়ে রাখে। কাজে যাওয়া বন্ধ করে দেয় কয়দিন। আলেয়ার মনে হয় তার নিজের চেয়ে সুখী বোধ হয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
মেয়ের আলেয়ার মতো মুখ। তাই নজরুল নাম রেখেছে আলো। আলেয়ার আলো। আত্মীয়, প্রতিবেশী সবাই এসে এসে দেখে যায় একেকদিন। সবার মুখে হাসি। সবার এক কথা, ‘আহ্! কী সুন্দর হয়েছে গো মেয়েটা! ঠিক চাঁদ যেমন!’
দুই বছর পার হয়ে যায়। আলো ততোদিনে টুকটুক করে হেঁটে বেড়াতে পারে। আলেয়ার দ্বিতীয় সন্তান হয়। স্বামী নজরুল এবার খুব করে চেয়েছিলো যেন একটা ছেলে হয়। আল্লাহর ইচ্ছে, কী করার আছে! তাই এবারও মেয়ে, কিন্তু কী সুন্দর! যেন আলোর চেয়েও উজ্জ্বল তার গায়ের রঙ! পরীর মতো মুখ! অথচ স্বামীর দিকে চেয়ে আলেয়ার নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। নজরুল খুশি যে একেবারে হয়নি, তা নয়। কিন্তু কোথাও সামান্য হলেও দুঃখটা আলেয়ার চোখ এড়ায় না। আত্মীয়রা সব এবারও দেখতে আসে। পাড়া-পড়শী সবাই খুশি হওয়ার ভান করে। কেউ মাঝে মাঝে মুখ ফসকে বলে ফেলে, ‘এবার একটা ছেলে হলে বেশ হতো। ’
আলেয়া দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখে। দুই মেয়েকে নিয়ে তার সময় কাটতে থাকে। হয়তো একটা ছেলে হলে সত্যি অনেক ভালো হতো! কে জানে?
আরো আট মাস পর আলেয়ার পেটে তৃতীয় সন্তান আসে। আলেয়া কেন যেন আর এবার আশায় বুক বাঁধতে পারে না। ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায়। এবারেরটাও যদি মেয়ে হয়!
আস্তে আস্তে দিন যায়। আলেয়ার এই সময় খাবার-দাবার বেশি খাওয়ার কথা। দুশ্চিন্তায় সে খেতে পারে না। নজরুল তাকে ভরসা দেবার চেষ্টা করে। বলে, ‘আল্লাহ যা চান, তাই তো হবে। এত দুশ্চিন্তা কেন করো?’ আলেয়া নজরুলের কথা শুনে ভরসা পায় না। সে জানে এবারও মেয়ে হলে চারদিকে কতো কথা উঠবে, যেন সব দোষ আলেয়ারই! নজরুল হয়তো খুশি হওয়ার ভান করবে। কিন্ত আলেয়ার চোখে সে অভিনয় এড়াবে না কিছুতেই।
দশ মাস পর। একদিন মাঝরাতের দিকে আলেয়ার পেটে যন্ত্রণা শুরু হয়। সাথে সাথে আলেয়ার মনের ভেতরও ঝড়ের বেগ বাড়ে। সময় এসে গেছে! আর কয়েক ঘন্টা পর তাকে মুখোমুখি হতে হবে আবার এক লজ্জার! নিজেকে সে বলে, ‘এবার একটা ছেলে দিলে খোদার এমন-কি কোনও ক্ষতি হয়!’ নিজেকে বৃথা ভরসা দেবার চেষ্টা করে সে। মন শক্ত রাখতে চায় যতোটুকু পারে।
বাচ্চাটা যখন বের হয়, ঠিক সাথে সাথেই আলেয়া জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কতোটুকু সময় পার হয়ে যায় আলেয়া জানে না। হয়তো কয়েক মিনিট, নাকি কয়েক ঘন্টা। বাইরে ভোরের আলো ফুটছে তখন একটু একটু করে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা আলেয়ার বিছানায় এসে পড়ে। আলেয়া জ্ঞান ফিরে আযানের সুর শুনতে পায়। তার স্বামী নজরুল তখন আযান দিচ্ছে উঠোনে দাঁড়িয়ে।

ছেলে হয়েছে না মেয়ে, আলেয়া তখনও বুঝতে পারে না। তবু শান্ত এই ভোরে নজরুলের গলায় আযান শুনতে শুনতে তার মনটা ভালো হয়ে যায়।

#ছোট_গল্প