গোধূলির শেষ আলো পর্ব ৩১+৩২

0
433

৩১+৩২
গোধূলির শেষ আলো?
পর্ব ৩১
Writer Tanishq Sheikh Tani

খালিদ ক্ষত শরীরে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে বাড়ির অন্ধকার উঠানে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাইরের বৈদ্যুতিক বাতিটা নষ্ট হওয়াতে এ বাড়ির উঠান এখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।যার জীবনই অন্ধকারে পর্যবসিত তার কাছে আলো অসহিষ্ণু।বাইরে ধুপ করে কিছু পড়ার শব্দ শুনে খাদিজা ভেতরের ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।সাথে মাজিদ ও মাজিদের বউও আসে।
“- ও বাজান! কি হইছে তোর? খাদিজা সুর করে কেঁদে ছেলেকে উঠাতে ব্যস্ত হয়ে যায়।শুকিয়ে আগের এক তৃতীয়াংশ হয়ে গেছে খালিদের শরীর তবুও খাদিজার একার পক্ষে ছেলেকে উঠানো সম্ভব হলো না দেখে মাজিদ এগিয়ে আসলো ভাইকে সাহায্য করার জন্য।
খালিদ মা ভাইয়ের হাত গোঙানি দিয়ে ছাড়াতে গিয়ে আবার উপুর হয়ে পড়ে গেলো।একপাশ অচল হয়ে যাওয়া জিহ্বা টাকে অতিকষ্টে নাড়িয়ে বাচ্চাদের মতো এলোমেলো উচ্চারণে ক্ষোভের সহিত বললো,
“- ধইসনা! ধইসনা তোলা আমারএএ।মওওরেএএ যাআআই আমিইই।নিজেই বার বার উঠার চেষ্টা করে উঠানের কাদামাটিতে গড়াগড়ি খায়।
“- কি হয়েছে শুনি! পঙ্গু অচল তাও তোর ভং কমে না।এতো তেজ কিসির জন্যি? চুপচাপ তুলতি দে! মাজিদ জোর করে খালিদের বাধার মুখেও ধস্তাধস্তি করে বারান্দায় নিয়ে আসে।
“- ছাআআআড়! খালিদ সচল হাতটা দিয়ে মুখ খামচে ধরতেই মাজিদ খালিদের জীর্ণশীর্ণ বুক বরাবর এক লাথি দিয়ে সরে যায়।
“- দেখলে মা দেখলে? এই পঙ্গু টার উপকার কি করে করবো কও? ভাই বলেই ওরে এতো দেখভাল করছি কই ওর শ্বশুরবাড়ির কেউ তো আসে না বউ তো আগেই আকাম করে ভাগছে।
“- খালিদ এমন কেন করছিস বাজান! ভাই তো তোর সাহায্য ই করতেছে
“- সর! দূউউরেএএ যাও! তুমি মাআআ না! ডাআআয়নিইই। থু!থু! তুমিইই আমারর তাআনিরর সব্বনাশ কওওচ্ছ।তুমি মাআআ নাআআ।খালিদ মাকে ঠেলে দূরে ফেলে দিতেই মুন্নি এসে ধরে খাদিজাকে।মাজিদ খালিদের পাগলামি দেখে আবার চুল টেনে ইচ্ছামতো মারে।মুন্নি খাদিজা বহু কষ্টে মাজিদকে সরিয়ে ঘরে নিয়ে আসে।খালিদ খাদিজা উদ্দেশ্য করে বলে যে খাদিজার কারনেই খালিদের এমন দূর্গতি।খাদিজা স্বার্থের লোভে ছেলের জীবন নষ্ট করেছে।এমন মায়ের গর্ভে খালিদকে কেন জন্ম দিলো আল্লাহ? কেন আতুর ঘরেই মরে গেলো না খালিদ?খাদিজার কারনেই কায়েনাতের মৃত্যু হয়েছে এসব কথা বলতে বলতে মাথা চাপড়ে পাগলের মতো কাঁদে। বুকে ব্যথা হচ্ছে খালিদের প্রচন্ড ব্যথা।বুকটা কেউ যদি একটু মালিশ করে দিতো এখন?কে দেবে? কে আছে খালিদের? মরার আগে একবার তানির পা ধরে মাফ চাইতে চায় খালিদ।একবার! মাজিদকে শান্ত করিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে খাদিজা খালিদকে উঠাতে আবার বারান্দায় আসে।কি সুপুরুষ ছেলে তার কি হয়ে গেছে? খাদিজার চোখের জল বন্ধ হয় না।ঝরনার জলের মতো ঝরেই যাচ্ছে। ঘরের ভেতর থেকে খালিদের সব কথা শুনেছে খাদিজা।মনে কষ্ট লাগলেও কথাটা যে সত্য তা খাদিজাও মানে।খাদিজার স্বার্থপরতার,আর তানির প্রতি বিদ্বেষ অবহেলার কারনেই আজ ছেলের জীবনে দুর্দশা নেমে এসেছে।সমর্থ ছেলের এমন দশা খাদিজাকে ভেঙেচুরে শেষ করে দেয়।
“- বাজান! ওঠ বাজান!
“- নাআআআ! ধরিস না! ছাআআর! পাআআপ পাআআপ। খাদিজার হাতের দিকে ভয়ংকর চাহনি দিয়ে দেয়ালে শিটে বসে খালিদ।যেন খাদিজার ছোঁয়া লাগলেই শরীরে বড় কোন ক্ষতি হবে।
খাদিজা আর সহ্য করতে পারে না।কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে যায়।রাত একটু গভীর হলেই খালিদ শরীরটা টেনে টেনে নিজের ঘরে চলে যায়।ঘরের চারপাশে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। তানিকে নিয়ে আসার প্রথম রাতের কথা মনে পড়ে। সব জীবন্ত রূপে ধরা দেয় খালিদের চোখের সামনে।তানির সেই লাস্যময়ী মুখ,দুচোখ ভরা লজ্জা।হলুদ শাড়ি পড়া যুবতি বউটাকে হাসতে দেখে খালিদের মনের মধ্যে ভালোবাসার ঢেউ আছরে পড়তো।এখন সেই ঢেউ তুসের আগুন হয়ে পিনপিন করে জ্বলে।একটা ভুল থেকে কি হয়ে গেলো? সাজানো স্বপ্নের জীবন এলোমেলো দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে গেছে।এ ঘরের ভালোবাসাময় প্রতিটি মুহুর্ত খালিদকে অপ্রকৃতিস্থ করে তুললো।নিজের পাপ,দোষ সব সুচের মতো শরীরে বিঁধতে লাগলো।খালিদ শরীরটাকে টেনে টেনে আবার বারান্দায় এসে বসে হাফ ছেড়ে কাঁদে। না খালিদ পারবে না ও ঘরে থাকতে।পাগল হয়ে যাবে।
সামনে নির্বাচন। এবার চেয়ারম্যান পদের জন্য আব্বাসের উত্তরসূরি হিসেবে তাজ দাড়িয়েছে।তাজের প্রতিপক্ষ মকবুল মাস্টার।গ্রামের লোকই নাকি তাকে দাড় করিয়েছে। বড় ভালো লোক মকবুল মাস্টার।
সোহাগের এবার কেন যেন মনে হচ্ছে মকবুল মাস্টারের জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।কারন তাজ আব্বাসের মতো ওতো ধূর্ত না।আব্বাস হলে কোনো প্রতিপক্ষই রাখতো না সেখানে তাজ ভালোকরে নির্বাচনি প্রচারণায় আসেও না।আগে যাও মদের আড্ডায় আসতো ইদানিং সেটাও আসে না।কি করে বাড়িতে কে জানে? তানিকে নিয়ে সোহাগের ভয়ের শেষ নেই।মেয়েটাকে কেন যেন সুবিধার মনে হয় না।এই তো তিনদিন আগের কথা তাজের না আসার কারন জানতে দুপুরের দিকে তাজের বাড়ি খোঁজ খবর নিতে গেলে হঠাৎই পুকুরের পাশের ঝোপঝাড়ের মাঝে তানিকে কি যেন খুঁজতে দেখে দাড়িয়ে পড়ে।ঐ মুহুর্তে তানিকে দেখে স্বাভাবিক একটা মেয়ের মতোই লাগছিল।একদম সহজ সাধারণ ভঙ্গিতে কি যেন তুলে তুলে শাড়ির কোচে ভরছিলো।সোহাগ কৌতূহল নিবারণ করতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলো কি করো ওখানে! সোহাগের গলা শুনে ভূত দেখার মতো চমকে যায় তানি।কোচ থেকে গড়িয়ে কি যেন পড়লো?সোহাগ ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখে ধুতরা গাছের ফুল আর ফল পড়ে আছে।সেটা আরও বেশি সংশয় সৃষ্টি করে সোহাগের মনে।এসব বুনো অব্যবহৃত জিনিস তানিকে খুটতে দেখে ভ্রুকুটি করে তাকাতেই তানি দৌড়ে বাড়ির ভেতর চলে যায়।পেছন ফিরে একবারও তাকায় না।সোহাগ তাজকে কথাটা বলবে ভেবেও বলতে পারে না কারন তাজ অসময়েও বারান্দায় নাক টেনে মরার মতো ঘুমিয়ে আছে।কয়েকবার ধাক্কাতেই তেজে ওঠে চোখ লাল করে।সোহাগ বন্ধুকে বিরক্ত না করেই চলে আসে।কিন্তু আজও মাথার মধ্যে তানির সেদিনের চমকে যাওয়ার কাহিনির রহস্য ভেদ করতে পারে না।ভেদ করতে পারে না ধুতরার ফুলের রহস্য! তাজের কথায় হয়তো ঠিক! পাগলরা তো বোনবাদারের জিনিসই খায়।কে জানে তানিও ওসব খায়।কিন্তু ধুতরার ফল,ফুলে তো বিষ আছে।ধুর! কিসের মধ্যে কি চিন্তা করি।নির্বাচনের অনেক কাজ পড়ে আছে।তাজ না করলেও সোহাগকে এসব কাজ ফেলে রাখলে চলবে না।জোয়ার্দার বাড়ির ক্ষমতা শেষ তো সোহাগের মতো চেলাপেলাদেরও খারাপ দিন শুরু।সোহাগ আড্ডা থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে। ঘরে পোয়াতি বউ একা।কখন কি হয় কে জানে?
!
!
তাজ চার পাঁচ দিন খাওয়া দাওয়া করতে পারে না ঠিকমতো।মদ না খেয়েও ঘুমে চোখ টেনে ধরে।সারাদিন বারান্দায় শুয়ে শুয়ে কাটে।রাতেও এমন। কিন্তু ঘুমটাও যে সুখের হয় না।কি ভয়ানক সব স্বপ্ন দেখে।ঘুমাতে ভয় করে তাজের।মনে হয় কেউ নজর রাখছে ওর উপর।ফাঁক ফেলেই গলা টিপে দেবে।নাক চেপে ধরবে।কিন্তু কে নজর রাখছে তাজ জানে না।তবে বুঝতে পারে।হ্যাঁ তাজ বুঝতে পারে একটা শিশুর কাঁদে। তাজের যখন ভয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তখন আবার হাসে।খিলখিলিয়ে হাসে।কাল অদ্ভুত কিছুর গন্ধ পেয়েছে। মধ্য রাতে কান্নার শব্দে ঢুলুঢুলু চোখে তাকাতেই নাকে ইলিশ ভাজার গন্ধ পায়।ঠিক সেই রাতে যেমন পেয়েছিল তেমন।তাজ ভয়ে গোঙাতে থাকে।হামাগুড়ি দিয়ে অচল অথর্ব পিতার খাট ধরে ভয়ে কাঁদতে থাকে।আব্বাস অন্ধকারে ছেলের ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে কিছু বলতে চাই।বার বার চোখের ইশারায় সামনের গ্লাসের দিকে তাকায়।তাজ নিজের ভয়ে এতোটাই বিভ্রান্ত বাপের ইশারায় তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।চোখে ঘন অন্ধকার নেমে আসছে ক্রমশ। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ঠিকমতো সব ধোঁয়াশা ধোয়াশা লাগছে।রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে উঠেও ভোর হয়না তাজের সকাল।দুচোখে আবছা আলো বিরাজ করে।ক্রমশ দিনের আলোর স্বচ্ছতার সাথে আবছা আলোটুকু বিলীন হতে থাকে।তানিকে চিৎকার করে ডাকে।আব্বাস জোয়ার্দার নিথর শরীর নিয়ে চোখের জল ফেলে কাঁদে।তানি দরজা ধরে অপলক দৃষ্টিতে নির্বাক চেয়ে হাসে।শব্দ ছাড়া হাসি।চোখে মুখে লুটোপুটি করে হাসির ঢেউ।চোখের জলের পবিত্র ধারায় মিলেমিশে একাকার হয় সেই হাসির ঢেউ।
!
!
১৫ বছর পর,,,,
“-হ্যালো শফিক ভাই! আপনার ম্যাডাম কই?
“-আপা! ম্যাডাম তো অভিযানে আছে।নিয়ে যাবো মোবাইল?
“- না! থাক! কাজ শেষ হলে আমার বাসায় নিয়ে আসবে সোজা।কিছু বললে বলবে আমার আদেশ।
“- জ্বী আফা!
ড্রাইভার শফিক মোবাইল রেখে ম্যাডামের অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকে।কাজের সময় ডিস্টার্ব ম্যাডাম একদম পছন্দ করে না।এমন সৎ নিষ্ঠাবান কাজের মানুষ শফিক চাকরি জীবনে দুটো দেখেনি।কাজের ক্ষেত্রে যতটা আপোষহীন,একরোখা, নীতিবাদী,জাদরেল ব্যক্তিগত জীবনে ততটাই কোমলপ্রাণ, পরোপকারী,মৃদুভাষী।মেয়ে মানুষ হয়েও কত ক্ষমতা! শফিক মনে মনে ভাবে বড় মেয়েটাকে সেও অনেক পড়ালেখা শেখাবে।ম্যাডামের মতোই ম্যাজিস্ট্রেট বানাবে।ভয় ডরহীন মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেবে।শফিকের কেন যেন মনে হয় ম্যাডামের জীবনে কোনো কষ্ট আছে।খুব মারাত্মক কষ্ট। তাইতো এমন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে।এতোবছর বয়সেও স্বামী সন্তান নেই।শফিক মনে মনে ভাবে একদিন বড় আপাকে জিজ্ঞেস করবে সাহস করে ম্যাডামের বিষয়ে।পরক্ষনেই চাকরি হারানোর সংশয়ে ভাবনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

চলবে,,,,গোধূলির শেষ আলো?
পর্ব ৩২
Writer Tanishq Sheikh Tani

বনানীর জ্যামে আটকে আছে গাড়িটা।যেখানে মানুষ একটু নিরিবিলি জীবনের আকাঙ্খা করছে সেখানে এমন শব্দ দূষণ, জ্যামের অস্বস্তিকর পরিবেশ সত্যি হতাশাজনক।আজ ১৪ বছর এই পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত তানি তবুও হাপিয়ে উঠেছে ভ্যাঁপসা গরমের কারনে।এসি বাড়িয়ে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো।তখনই গাড়ির গ্লাসে টুকটুক শব্দ হলো।
“- শফিক ভাই দেখেন তো কে?
“- ম্যাডাম ফুল বেচানি এক ছেরি।এই ছেরি যা ভাগ!
“- থামুন! এমন ব্যবহার করছেন কেন বাচ্চাটার সাথে? তানি উঠে বসে পাশের গ্লাস টা নামিয়ে ঝুঁকে তাকাতেই বড় রকমের ধাক্কা খেল।১৫ বছর আগের অতীত আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।পৃথিবীতে একটা মানুষের সাথে অন্য মানুষের মিল থাকতে পারে সেটা তানিও জানে।আজ চাক্ষুষ দেখেও নিলো।আগের মতো ভেতরটায় আবেগ নেই তাই সত্য আর ভুলের পার্থক্য করতে পারে।হুট করে আবেগে ভেসে নির্বুদ্ধিতাও করে না। কিন্তু মনটা সত্যি চাচ্ছে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে।তানি দরজাটা খুলে বাচ্চাটাকে কাছে ডাকলো।ড্রাইভারের ভয়ে বেলিফুলের মালা সহ দূরে মুখ কালো করে দাড়িয়ে আছে।তানির হাসিমাখা মুখের ডাক শুনে আবার ছুটে আসলো।
“- ম্যাডাম মালা নিবেন? একটা ১০ টাকা।নেবেন ম্যাডাম?
“- তোমার নাম কি মা!
“- কলি!
“- খুব সুন্দর নাম।কলি তুমি সবগুলো মালা আমাকে দাও! তানি মেয়েটার মুখে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেললো। শফিক অবাক হয়ে দেখছে পাথরের মূর্তিকে কাদামাটিতে পরিণত হতে।
“- এই নেন! তানিকে কাঁদতে দেখে কলি কিছুটা মনমরা হয়ে যায়।সাহস করে তানির হাতটা ধরে বলে,”-ম্যাডাম আপনি কান্দেন ক্যান? আমি কি দেখতে আপনার পরিচিত কারো মতো?
তানি মুহুর্তে বিস্মিত হয় মেয়েটির উপস্থিত বুদ্ধি দেখে।জলভরা চোখেই হেসে ফেললো! মেয়েটাকে এক হাতে ঘিরে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয়।
“- হ্যাঁ!
“- কার মতো?
“- আমার মেয়ের মতো?
“- ওহ! নাম কি আপনের মাইয়ার! সে কই এহন?
“- কায়েনাত! আল্লাহর বাগানের ফুল হয়ে গেছে গো মা।
“- ইশশ! থাক! কান্দিইয়েন না।আল্লাহ আপনারে আবার একটা মাইয়া দিবো।আমি আসি ম্যাডাম! ঐ যে আমারে বুলায়
“- যাবে? যাও! এই নাও ৫০০ টাকা।
“- এতো টাকা ক্যান দিলেন ম্যাডাম? আপনের মেয়ের মতো দেখতে তাই!
“- না! তোমাকে আমার ভালো লাগছে তাই।যাও।
মেয়েটি চকচকে ৫০০ টাকার নোট নিয়ে খুশিতে লাফাতে লাফাতে অদূরে দাঁড়ানো সাথীদের তানিকে দেখিয়ে টাকা দেখায় হাসি মুখে।সাথের বাচ্চাগুলোও বিস্মিত দৃষ্টিতে তানির দিকে তাকায়।জ্যাম ভেঙে গাড়ি আবার চলতে লাগলো।তানি জানালার বাইরে মুখ রেখে যতক্ষণ দেখা গেছে মেয়েটাকে দেখেছে।মেয়েটাও তানিকে এভাবে তাকাতে দেখে টা! টা! দিচ্ছিলো।তানি মৃদু হাসি দিয়ে শুধু একবার হাত নাড়িয়ে তাকিয়ে রইলো।মেয়েটা বেঁচে থাকলে কতো বড় হতো? এই বাচ্চা মেয়ের থেকে অনেক বড়।৩৪ বছর বয়সে বহুবার কেঁদেছে মেয়ের মুখটা ভেবে।আজ থেকে আবার কাঁদবে। ঘুমাতেও কষ্ট হবে তানির।সারারাত তাহাজ্জুদে বসে কাঁদবে। বাইরে সবার কাছে তানি সফল ব্যক্তিত্ব,কঠিন হৃদয়ের মেয়ে মানুষ।যার নিয়মনীতির ব্যত্যয় সহজে ঘটে না। কিন্তু ভেতরে সে নিজের কাছেই নিজে নিঃসঙ্গ,ভঙ্গুর।বেচেও যেনে মরার সামিল এ জীবন।মাথা ঝুঁকে কাঁদতে থাকে নিরবে।
শফিক লুকিং গ্লাস দিয়ে ম্যাডামকে কৌতূহলের চোখে দেখে যাচ্ছে। শফিকের জানামতে ম্যাডাম অবিবাহিত তবে ঐ ফুল বেচানিরে কেন বললো তার মেয়ে ওর মতো? শফিকের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়।এসব এলোমেলো ভাবনা ভাবতে ভাবতে খিলক্ষেতের শান্তি নীড়ে এসে গাড়ি থামায়।মুখটা ঘুরাতেও সংকোচ হচ্ছে শফিকের।তবুও ঘুরিয়ে চোখ নামিয়ে বলে,
“- ম্যাডাম চলে আসছি!
“- হুমম।তানি চোখ মুছে শাড়ির আঁচল টা টেনে নেমে হনহনিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়।
শফিকও গাড়ি লক করে গাড়ির পেছন থেকে মিষ্টি, ফল নামাতে থাকে।
মুনিয়া রান্না শেষ করে বুয়াকে দিয়ে টেবিল সাজাচ্ছিল। দাড়িয়ে বুয়াকে বুঝাচ্ছে এটা ওখানে! ওটা ওখানে।
“- পুলিশের চাকরি গেলে কি হবে? কারো কারো তো পুলিশগিরি ফলানোর অভ্যাসই যায় না।হু!খবরের কাগজ উল্টাতে উল্টাতে আদিল মুখ কালো করে বলতে থাকে।তা দেখে বুয়া হি! হি! করে হাসে মুখ টিপে।
“- এই জমিলা হাসা থামিয়ে হাত চালা কাজে।
জমিলা থতমত খেয়ে যাই মুনিয়ার বকা শুনে। চুপচাপ কাজে হাত দেয় মাথা নিচু করে।
“- হাসিস না জমিলা! একদম হাসিস না! স্বৈরশাসন চলে এ বাড়িতে বুঝলি? সব হাসা, কান্না বন্ধ। টোটালি বন্ধ। হাসি আসলে বাথরুমে চলে যাবি তারপর কল ছেড়ে হাসবি।মুক্ত পাখির মতো হাসবি?
“- ভাইজান! পাখি কি হাসে নি?
“- আরে হাসে হাসে।তোকে একদিন দেখাবো ঠিক আছে? শুধু তোকেই।
“- আইচ্ছা! কথাটা বলে আবার দাঁত বের করে হাসতে যাবে তখনই দেখে মুনিয়া রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে তাকিয়ে আছে।জমিলা তরকারির বাটি আনার জন্য তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে গিয়ে বাঁচে।জমিলা চলে যেতেই আদিলের ছোট ছেলে মাহদি ব্যাগ কাঁধে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে।
“- আব্বু ১০০ টাকা দাও না! বাবার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে মাহদি।
“- পারবো না রে বাবা!
“- কেন? প্লিজ আব্বু।বার্গার খাবো দাও না!
“- বললাম তো পারবো না।মানিব্যাগ তোর মায়ের কাছে।আমার পকেট ফাঁকা।
“-উফ! তোমাদের এই আজাইরা ঝগড়া! আর তুমি এমন কেন করো? তানি আন্টি আসলে তো যেই লাউ সেই কদুই হবা।শুধু শুধু আমাকে কষ্ট করতে হবে?
“- পাজি ছেলে!বাবার রাগের দাম দিস না। আবার বলিস আজাইরা ঝগড়া?বার্গার খাবে! বার্গার খেতে খেতে নিজে যে বার্গার হচ্ছিস সে খেয়াল আছে? যা তোকে কোনোদিন আর টাকা দেবো না।যা!
“- দেবে না তো?
“- না!
“- ভেবে দেখো!
“- ভাগ এখান থেকে।
“- আম্মু! দেখো আব্বু কি বলছে?
“- শুনিস না ওসব তুই। যা কোচিং এ যা।
“- আম্মু তুমি কত্ত ভালো আর আব্বু তোমাকে মোটেও ভালোবাসে না।বলে কিনা? এই মাহদি কালই আমি গ্রামে চলে যাবো।তোর মায়ের ঘর স্বামী হয়ে থাকবো না।তুমি নাকি চোর ডাকাত ছেড়ে আব্বুকে রিমান্ডে নাও।কি সাংঘাতিক কথা দেখলে তো আম্মু।
“- তুই যা! মুনিয়া আদিলের দিকে দাত কটমটিয়ে তাকাতেই আদিল ঢোক গেলে।মনে মনে ছেলেকে বকে।
“- ইয়ে আম্মু! মানে বন্ধুদের সাথে আজ,,,
“- ঐ যে পার্স ওখান থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে যা।আদিলের দিকে তাকিয়ে জগটা ধুপ করে টেবিলে রেখে রান্না ঘরে চলে যায়।
“- তুমি অনেক ভালো আম্মু। অনেক! আব্বু! শিখো কিছু শিখো!
“- হারামজাদা! পুরো মায়ের কপি।প্লটিবাজের নাতী।
“- আম্মু দেখো আব্বু আবার নানুকে,, উমমম
“- বাপ আমার ভালো। আর বলিস না।চুপ কর চুপ কর।নয়তো লেডি পুলিশ আমার খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেবে।কথা বলবে না।
“- তাহলে বলো রোজ ১০০।
“- না! তুই আমার নামে বদনাম করছিস কেন? এক পাই ও দেবো না।মটু আসুক আমু আজ।
“- আম্মুউউ
“- আরে থাম! দিবো যা ভাগ
মাহদি ৫০০ টাকা প্রাপ্তির খুশিতে হাসতে হাসতে বাবার সামনে থেকে চলে আসে।বাবা যে ছেড়ে দেবে এ আশা মাহদির নাই।কারন ও জানে বড় আপু আমাইরা আসলে দুজন প্লান করে এই আম্মুর কাছেই বকা খাওয়াবে।এমন আছে মাইর ও পড়বে পিঠে।কোনদিক দিয়ে কিভাবে বকা বা মাইর পড়বে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও কপালে আজ রাতে দূর্গতি আছে সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত।তবে তানি আন্টি রাতে থাকলে এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। যা হবে হবে ৫০০ টাকা তো পেয়েছি। মজা মেরে বার্গার, তেহারি খেয়ে আসবো।কথাটা ভেবেই খুশিতে আটখানা।জিহ্বায় জল চলে আসে।সদর দরজায় এসে খুশিতে আন্টিকে জড়িয়ে ধরে।
“- আন্টি মনি!
“- কেমন আছে আমার গলুমলু বাবাটা! হুমম।মাহাদিকে শক্ত করে জড়িয়ে গালে কপালে চুমু দেয়।
“-অনেক ভালো আন্টি!
“- তাহলে আলহামদুলিল্লাহ বলবি ঠিকআছে?
“- আচ্ছা! আন্টি আমি কোচিং থেকে ফিরে এসে তোমার সাথে গল্প করবো এখন যাই!
“- কেন! টাকা মেরেছিস আজও?
“- হি! হি! হুমম।আপু এসে পড়লে নিয়ে নেবে।আমি যাই যাই।
“- এই শোন! মাহাদি!
“- আন্টি রাতে যাবে না কিন্তু। আমি এসে অনেক কথা বলবো।মাহাদি দৌড়ে চলে যায় গেট পেরিয়ে।তানিকে ঢুকতে দেখে মুনিয়া দ্রুত পায়ে কাছে এগিয়ে আসে।
“- তানি! এতোক্ষন লাগে এইটুকু পথ আসতে? আয়!
“- তুমি তো জানোই ঢাকা শহরের জ্যামের অবস্থা।মহাখালী পেরিয়ে এই টুকু আসতে যে সময় লাগে ততসময়ে লন্ডনের টেমস নদি দেখে আসা যায়।
“- হি! হি! হি! তা যা বলেছিস।
“-আসসালামু আলাইকুম আদিল ভাই। কেমন আছেন আপনি?
“- আমি বন্ধি কারাগারে। আছি গো বোন কষ্টে। নিজের কথার কোনো দাম নাই ওও,,
“- আধিখ্যেতা! মুনিয়া মুখ বাকিয়ে বলে তানিকে নিয়ে সোফায় বসে।
“- হি! হি! হি! ভাই আপনি পাল্টালেন না। আবার কি নিয়ে মান অভিমান চলছে লাভ বার্ডদের?
“- ঐ পুরোনো ডং।তার কথা না শুনলেই তো এমন করে।এ আর পুরোনো কি।আমার আর সহ্য হয় না বুঝলি?বুড়ো হয়ে যাচ্ছে তবুও নেকামি করে।
“- দেখলি তানি! দেখ! জীবনে দিয়ে যারে আমি বেসেছিলাম ভালো সে আমারে ভুল বুঝিয়া পর করে দিল।আহ! কষ্ট। বুকে ব্যথা করছে রে তানি।ডাক্তার ডাক।
“- আদিল ভাই! আজব আপনি?আর আপা তুমি তো জানোই ভাই এমন তাহলে তার কথা শুনলেই পারো?
“- না! একদম ওর কথায় সায় দিবি না।ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে আমার কথার গুরুত্বই দেয় না।এমন কেন হবে? আমিও কি কম ভালোবাসি ওকে।কেন আমার কথা বোঝে না।বার বার এক কথা আমার কারনে এ বাড়ির ঘর জ্বামাই।কে বলেছিল তাকে ঘর জ্বামাই হতে?চলে যাক।কলেজের সুন্দরী সুন্দরী কলিগরা কোলে নিয়ে খাওয়াবে তাকে।
“- আহ! আপা কি শুরু করলে? কাদছ কেন?আদিল ভাই ক্ষমা চান আপার কাছে।নাও!
“- আরে আমি কি করলাম।সত্যি এবার আমি ঘর জ্বামাই হওয়ার কথা মুখে বলি নাই।ওটা ঐ বান্দরটার কাজ।কাদে মুনু। বউটা আমার
“- দেখেছিস মিথ্যা বলে ছেলের নাম চালায়।আমি মরে যাই তারপর বুঝবে তুমি? সরো তুমি।
“- এসব বলো না মুনু।সত্যি আমি বলি নি।এই তওবা করছি কোনোদিন বলবো না ক্ষমা কর সুইট হার্ট।
“- সরো তুমি! ডং করো না আর।সকাল থেকেই তো নানা কথা বলছ।আমি বন্দী করে রেখেছি তাই না? যাও চলে যাও।কেউ আটকাবে না।
“- সরি মুনু।এই দেখো কানে ধরেছি।তুমি তো জানোই আমি তোমার কাছেই এতো আবদার আহ্লাদ করি।আমার মুনুটা ছাড়া আর কে আছে আমার মতো আদরের বাদর স্বামীকে সহ্য করার? এই তানি চোখ বন্ধ কর তো? তাড়াতাড়ি।
“- কেন?
“- আমি একটু আদর করবো তোর আপাকে।তাড়াতাড়ি কর।
“- এই একদম নেকামি করবে না।তানি কিছু বল ওকে।
“- আমি এসবের মধ্যে নেই বাবা।যা খুশি করো আমি যাই।
তানি মুনিয়া আদিলের খুনশুটি ভালোবাসা দেখে মুচকি হাসতে হাসতে উপরের ঘরে চলে যায়।ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে হিজাব খুলে আয়নার সামনে চুল এলিয়ে দাড়াতেই নিজেকে দেখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে দুএকটা সাদা চুল স্পষ্ট লক্ষণীয়।চোখের নিচে বলিরেখা দেখা দিয়েছে।১৫ বছর আগের সেই সৌন্দর্য অনেক মলিন হয়ে গেছে বয়সের সাথে সাথে।কতো হবে তানির বয়স? ৩৪/৩৫ হবে! ১৫ বছর আগের তানি আর এই তানিতে আকাশ পাতাল তফাৎ। সেই তানি ছিল দূর্বল, ভীরু, অসহায়।কিন্তু এই তানি উচ্চশিক্ষিতা,স্বনির্ভর, সরকারী উচ্চপদস্থ ম্যাজিস্ট্রেট।অসহায়ত্ব, ভীরুতা এখন আর ছুতেও পারে না।১৪০০ স্কয়ার ফিটের একটা ফ্লাট,সরকারি গাড়ি, চাকর বাকর, অর্থ কোনোকিছুরই কমতি নেই।মাথা উচু করে সমাজে বাঁচার মতো সব হাসিল করেছে তানি।এখন আর কারো পথ চেয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনার সময় নেই।সময়ের বড় অভাব তানির।সারাদিনে এক ফোটা অবসর নেই।অবসর চায় না তানি।চায় কাজের মাঝে অতীত দুঃস্বপ্ন ভুলতে।কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? সবটা হয় না।অতীত থেকে বহুদূর চলে আসলেও অতীত বার বার স্মৃতির পাতায় কড়া নাড়ে।মনে করিয়ে দেয় পরিবারের কথা। ভালোবাসার মানুষটার কথা।আচ্ছা কেমন আছে সে? হয়তো নতুন করে ঘর বেঁধেছে কারো সাথে।সুখে শান্তিতে আছে ঘরভরা সুখ নিয়ে।কিন্তু তানি তো তাকে ছেড়ে এতো এতো বিত্ত বৈভবের অধিকারী হয়েও সুখী নয়।সুখ যে ঐ মানুষটার বুকেই।”-খালিদ!কেমন আছেন আপনি? মনে কি পড়ে এই বোকা বউটার কথা? দুচোখের কোনা দিয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে তানির।

চলবে,,,