ছোট গল্প পরাজিত

0
1036

ছোট গল্প
পরাজিত

জাহিদ, আজ, ভোর চারটার সময়। আম্মা, ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আসরের নামাজের পর। টিকাপাড়া গোরস্থান ময়দানে। আম্মার জানাযার নামাজ পড়ানো হবে। তারপর টিকাপাড়া, গোরস্থানে আব্বার কবরের উপর দাফন করা হবে। তুমি, দেরী না করে। বউ, বাচ্চাসহ, রাজশাহী রওনা দিয়ে দাও। মাথায় রেখো, কিন্তু কুমিল্লা থেকে রাজশাহীতে বিকাল পাঁচটার মধ্যে পোঁছাতে হবে।

তোমরা কি ভাবে যাচ্ছে? বড়ভাই। ভাবছি! অফিসের গাড়ী নিবো। না কি? ব্যক্তিগত গাড়ী নিব। অফিসের গাড়ী নিলে। রাস্তাঘাটে সুবিধা, একটু বেশী পাওয়া যায়। বোঝ না, প্রশাসন ক্যাডারে চাকুরী করি। রাস্তা ঘাটে জ্যামে পড়লে, সার্জেন্টরাই রাস্তা ক্লিয়ার করে দেয়। স্যার, স্যার, বলে সম্মান দেখায়।

তোমার কথা তো শুনলাম। জামিল ভাই আর তুহিন ভাই। তারা নিজ নিজ ব্যক্তিগত গাড়ী নিয়ে, আমার সাথেই রাওনা দিবো। তোমাকে ওদের কথা চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমারটা ক্লিয়ার করো। ঠিক আছে।

বড় ভাই, মাগরিবের নামাজের পর। আম্মার জানাজার নামাজটা, পড়ালো ভালো হতো না। আমি হাতে একটু সময় পেতাম। আম্মার নামাজের জানাযায় ভি,আই,পিরা উপস্থিত থাকবে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা দেখতেই এই সময়টা নির্দ্ধারন করা হয়েছে। তাছাড়া, সন্ধ্যার পরপরই। আমার একটা কনফারেন্স আছে। সবাইকে সুবিধা দিতে গেলে। সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমরা ঘরের মানুষ। আমাদের একটু সাক্রিফাইস করা দরকার।

এত সকালে! এতক্ষন ধরে। কার সাথে কথা বলছিলে গো। আকাশের আব্বু। বড় ভাইয়ের সাথে, আম্মার খবর কি? আম্মা আর আমাদের মাঝে নেই। আম্মা আজ সকাল চারটার সময়। হ্যার্ট এ্যার্টাক করে, শেষ নিঃম্বাস ত্যাগ করেছেন। তাড়াতাড়ি চল। তাড়াতাড়ি চল। সকাল সকাল ঢাকায় পোঁছাতে পারলে, ভাইদের গাড়ীতে করে রাজশাহী পোঁছাতে পারবে। আমাকে নিজের ব্যবস্থা, নিজেকেই করতে বলেছে। তাই, নাকি! চল, তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়ি।

জাহিদ, আমি তোমার ডাক্তারভাই বলছি? বল, জামিল ভাই। কোথায় আছো তোমরা। সিরাজগঞ্জ রোডে আছি। সিরাজগঞ্জ থেকে রাজশাহী আসতে তো, আরো তিন ঘন্টা সময় লেগে যাবে। মনে হচ্ছে, তোমরা সময়মত রাজশাহী আসতে পারবে না। রাস্তায় জ্যাম ছিলো তো। তুমি ব্যক্তিগত গাড়ী ভাড়া করলে না কেন? হঠাৎ করে অত টাকা যোগাড় করার সময় পায়নি। ভেরী স্যাড, তোমার তো আম্মার জানানায় উপস্থিত থাকা খুব দরকার ছিল। মনে হচ্ছে, তুমি তো উপস্থিত থাকতে পারছো না।

আকাশের আব্বু। দেখো তো, আমার কি জেনো মনে হচ্ছে? তোমার কোনো না কোনো ভাই, বাসষ্টানে গাড়ী পাঠিয়েছে। একটু আশে পাশে তাকিয়ে দেখতো। চল, ছয়টা বেজে গেছে। সরাসরি টিকাপাড়া গোরস্থান হয়ে, আম্মার কবর জিয়ারত করে বাসায় যাই।

ভাই, দেখছি! গোটা পরিবার নিয়ে গোরস্থানে চলে এসেছেন। দেরী হয়ে গেছে তো তাই। সরাসরি গোরস্থানে আসলাম। আপনার পরিচয়টা কি? আমি এই গোরস্থান দেখাশুনা করি, কেয়ারটেকারও বলতে পারেন। মৃতা আপনার কে হয়? আমার আম্মা। আপনার মায়ের তো দাফন হয়ে গেছে, যান মায়ের কবরে মাটি দিয়ে আছেন।

ভাইজান, আপানার মায়ের জানাযায়। কত গাড়ি আর প্রশাসনের কত বড় বড় লোকজন এসেছিল। আপনার ভাগ্যটাই খারাপ। মায়ের মরা মুখও দেখতে পেলেন না। মায়ের জানাযায় আপনার তিন ভাইকে পাশাপাশি দাঁড়ানো দেখলাম, কত, বড় বড়! অফিসার আপনার ভাইরা। ভাই একটা কথা বলবো। কিছু মনে করবেন না তো। বলেন, আপনি সৎ ভাই না আপন ভাই। আপন ভাই।

মিলি আমি কি? বাসা ঠিকমত চিনতে পারছি না, নাকি। এখানেই তো আমাদের বাড়ী ছিল। এই যে ভাই, এখানে কি হচ্ছে? দেখছেন না, কি হচ্ছে? বোরিং হচ্ছে, বোরিং, বহুতল ভবন হবে। ওই যে কেয়ার টেকারের সাথে কথা বলেন, জাহিদভাই দেখছি। করিম চাচা, ভালো আছেন। আছি বাবা, তোমার মা মারা গেল, তোমাকে তো দেখতে পেলাম না। শুনতে পেয়েছি, তোমার গাড়ি নাকি রাস্তায় জ্যামে পড়েছিল।

করিম চাচা, আমাদের পুরাতন বাড়ী কই। আমরা গরীব মানুষ। তোমার ভাইদের দোয়ায় বেঁচে আছি। এখানে থাকার একটু আশ্রয় পেয়েছি। তুমি শিক্ষিত মানুষ বাবা। সব কিছু খুলে বলা যায় না, বুঝে নিতে হয়। তোমার সামনে দাঁড়াতে, আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমি যাই বাবা। করিম চাচা আমার আড়ালে যেয়ে, হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো।

মিলিকে, করিম চাচার দিকে এগিয়ে যাইতে দেখেই। আমি মিলির হাত ধরে ফেললাম। চলো মিলি, জোবেদা খালার সাথে দেখা করে আসি। এই জোবেদা খালা, আম্মার আপন বোন না হলেও আম্মাকে বড় বোনের মত আগলে রেখেছেন। খালা, খালা, আমি জাহিদ বলছি। জাহিদ ভিতরে আয়, বউমা বাচ্চাদের নিয়ে ভিতরে এস।

এতক্ষন পরে আসলি যে, আমি তো শুনলাম। তোদের তো সরাসরি গোরস্থানে যাওয়ার কথা। সেখানে আপার, জানাযার নামাজ পরে, হোটেলে উঠবি। আর এখানে এসেই বা কি করবি, তোদের তো বাড়িঘরের কাজ চলছে, থাকার কোন ব্যবস্থা নেই, এদিক সেদিক সবই অচেনা লোক। এখানে সেখানে রড়, সিমেন্ট আর ময়লা আর্বজনাতে ভর্তি । সাবধানে পা ফেলিস।

মিলি, আমার তো থাকার তেমন কোন জায়গা নাই। এই একটা বারান্দায় আর ঘরে তোর মা আর আমি গড়াগড়ি দিয়ে থাকতাম। তবে তোর ভাইরা আপাকে একটা বড় বাড়ি ভাড়া করে দিয়ে, আমাকে রাখতে চেয়েছিল। আপা রাজী হয়নি। বলে ওত টাকা পাব কোথায়, আমার কাছেই পড়ে থাকলো।
বুঝলাম না কিছুই, সেই ভোর রাত্রে, হঠাৎ করেই আপা বলতে লাগলো । আমার বুকটা ব্যাথা করছে, বোন। আমার বুকটা ব্যাথা করছে, বোন। আমি একটু তেল দিয়ে, বুকটা মালিশ করতেই, দেখি দমটা বাহির হয়ে গেল। কত বার তোর ভাইরা ঢাকা নেওয়ার জন্য গাড়ী পাঠালো। কিছুতেই গেল না। সারা দিন ওই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতো।

বাড়িটা ভাঙ্গার সময় কনট্রাক্টরের লেবাররা। আপার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল। আপাও যে ভাঙ্গা বাড়িটা দেখে, মাথা ঠিক রাখতে পারতো না। দেখ, দেখ ভাঙ্গা বাড়ির এটা সেটা টেনে এনে কিভাবে আমার ঘর ভর্তি করেছে। বাড়িটা ভাঙ্গার পর থেকেই আপার মাথার সমস্যা হয়ে গেয়েছিল। সারারাত্রি ঘুমাতো না। সারা দিন ঐ আমার ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকতো। আর কাঁদতো।

জোবেদা খালা, তুমি তো জানো। আব্বা মারা যাওয়ার পর, আব্বার সম্পত্তি ভাগ হওয়ার সময়, আম্মা তার নিজের অংশটুকুও আমাদের চারভাইয়ের নামে ভাগ করে দিয়েছে। সেখান হতে আপাও তো আমাকে দুই কাঠা জমি দিয়েছিল। সেটা বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম। সেটা দিয়ে তো ছেলের চাকুরীর ব্যবস্থা করেছি।

তোর ভাইরা এখানে ফ্ল্যাট বানাচ্ছে। তোকে কিছু বলেনি। খালা, আমাকে শুধু একবার বললো। আম্মার, জমিটা এভাবে ফেলে রাখার কোন মানে হয় না। খুবই মূল্যবান সম্পত্তি, ত্রিশটা ফ্ল্যাট হবে। আম্মার জমিটার উপর, আমরা তিন ভাই ফ্ল্যাট বানাতে চাচ্ছি, তোমার মত কি? আমি বললাম, আম্মার জমির উপর। তোমাদের ফ্ল্যাট বানানোর কোন অধিকার নেই। এটা তো আপার নিজের কেনা সম্পত্তি। মানুষের একটু টাকা পয়সা হলে গেলে, দয়া মায়া কিছু থাকে না রে, এবার দেখ তোর মাকে হারালি। আমি বললাম একটু ধৈর্য্য ধরো বাবা, আমার কথা শুনলো না।

আমি তোর বড়টাকে বলেছিলাম। আপা আমাকে বলেছে। তোমরা যতই ফ্ল্যাট বানাও, আপা কিন্তু কোনদিনও তোদের ঐ ফ্ল্যাটে উঠবে না। আমার কথা শুনলো না, এবার তো তোদের আশাপূরণ হয়েছে।

আকাশের আব্বু, আকাশের আব্বু। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি একবার শুধু, আম্মার মুখটা দেখতে চাই। আমাকে একবার, আম্মার মুখটা দেখতে দাও। তোমার কাছে, আমি আর কিছু চাই না। খালার বাড়ির সামনে, আমাদের সেই ডাইনিং টেবিলটা পড়ে থাকতে দেখে। নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলাম না। সেই ডাইনিং টেবিল নিয়ে কত স্মৃতি, কত ব্যাথা। খাওয়ার টেবিলে, আমাদের সবার ঠিক মত জায়গা হতো না বলে। আম্মা, আমাদের দুই ভাইকে টেবিলের উপরে কোনায় বসিয়ে দিতেন।

আমি আর নিজেকে, ঠিক রাখতে পারলাম না। ছোট মেয়েটা কোলে নিয়ে আর বড় ছেলেটার হাত ধরে খালার বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। জাহিদ থাম, কোথায় যাচ্ছিস। রাজশাহী রেলওয়ে ষ্টেশনে যাচ্ছি, খালা। রাত্রি বারোটায় ঢাকার ট্রেন ধরে ঢাকা যাবো, তারপার কুমিল্লা ফিরে যাবো। ভাইদের সাথে দেখা করে যা, তার আর কোন প্রয়োজন নেই।

আজকে চাঁদনী পসর রাত। ট্রেনের জানালা দিয়ে দূরে আকাশের দিকে তাকালাম, জোস্না মেটো পথে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ট্রেন, দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। নদীর টেউয়ের সাথে জোস্না ঢেউ খেলে যাচ্ছে, মায়ের স্মৃতি গুলো বার বার মনে পড়ছে। মাথায় অনেক কিছুই ঘুরপাক খাচ্ছে, সে সব নিয়ে আর মাথা ঘামাচ্ছি না।

মেয়েটা আমার দুই হাতের উপর। আর ছেলেটা আমার পায়ের উপর, মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। মিলির উপর দিয়ে সারাদিন, অনেক ধকল গেছে। সে আমার ঘাড় থেকে, কিছুতেই মাথা সরাতে চাচ্ছে না। হঠাৎ করে আমার ছোট মেয়েটার মুখের দিকে চোখ গেল। চাঁদনী রাত্রের জোস্নায়, মেয়েটার মুখের হাসিটাকে কেমন যেন রহস্যময়তা লাগছে। মেয়েটার রহস্যের হাসি, আমি নিজের সাথে তা মিলানোর চেষ্টা করছি।

এ,জে,এম মবিনুর রহমান
৩১.০৮.২০২০ খ্রিঃ।